একলা থাকার দিনে

একলা থাকার দিনে
আগামীকাল কোরবানি কিন্তু আজকেই আমি আমাদের পাঁচ বছরের সম্পর্ক সমাপ্ত করতে চাই । আমার নিজের উপর প্রচুর ঘৃণা হচ্ছে কারণ তোর মত একটা স্বার্থপর মানুষকে আমি পাঁচ বছর ধরে ভালবেসেছি কিন্তু কখনো বুঝতেই পারিনি যে তুই একটা বেঈমান স্বার্থপর । “
” আর কিছু বলবে ? “
” অনেক কিছু বলবো বলে বাসা থেকে ঠিক করে এসেছিলাম । কিন্তু আমার পোড়া কপাল কারণ তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে আমি কিছু বলতে পারি না শুধু ভালবাসতে ইচ্ছে করে । তাই তোমার সাথে আর কথা না বাড়িয়ে অল্পতেই চলে যাচ্ছি । ঠান্ডা মাথায় সামান্য কিছু কথা বলে আমি তোমার সামনে থেকে চিরকালের জন্য চলে যাবো ।
” ওহহ আচ্ছা ।”
” আমি অনেক চেষ্টা করছি তোমার মাঝে পরিবর্তন আনার জন্য কিন্তু আমি ব্যর্থ । তাই তোমার জীবন থেকে সারাজীবনের জন্য চলে যাচ্ছি আশা করি এ জীবনে আর দেখা হবে না । আগামীকাল কোরবানি আর কোরবানির তিনদিন পর আমি মা-বাবার কাছে ফ্রান্সে চলে যাবো । মা-বাবা আমার জন্য ছেলে যেই পছন্দ করে রেখেছে আমি গেলে তার সাথে আমার বিয়ে হবে । “
” অনেক ভালো হবে আশা করি । “
” একটা কথাও বলবে না তুমি মানুষ যখন একটা কুকুর লালন পালন করে তখন সেই কুকুরের জন্যও তার মায়া লাগে । কিন্তু আমি দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে তোমাকে তিল তিল করে ভালবেসে এসেছি আর সেই তুমি আমাকে কষ্ট ছাড়া কি দিলে ? নিজের মা বাবাকে ত্যাগ করে শুধু তোমার জন্য বাংলাদেশে থেকে পড়াশোনা করি তবুও একটাবার আমাকে বোঝার চেষ্টা করেছো কখনো ? “
” আমার তেমন ইচ্ছে ছিল না বৃষ্টি , তাছাড়া তোমার চেহারা কলেজে সবচেয়ে সুন্দর ছিল তাই তোমার প্রতি একটা ভাললাগা কাজ করেছে । কিন্তু এখন বাস্তব পৃথিবীর মাঝে তাকিয়ে দেখি পৃথিবীতে আবেগের কোন স্থান নেই । তোমাকেও আমি অনেক ভালবাসি কিন্তু বিয়ে করে সংসার করার মানসিকতা নেই । “
” একদিন আমার কথা মনে পরবে তোমার , তখন এই বৃষ্টির ভালবাসার অভাব বুঝতে পারবে কিন্তু কিছু করার থাকবে না । “
” তুমি জানো যে ছোটবেলা থেকে দুঃখ কষ্টের মাঝে আমার বেড়ে ওঠা তাই সুখ জিনিসটা একদমই সহ্য করতে পারি না । তোমাকে বিয়ে করে ঠিক যতটা সুখী হতে পারবো , তারচেয়ে বেশি সুখ পাবো যদি তোমাকে হারিয়ে কষ্টের মধ্যে থাকতে পারি । “
” তুমি একটা বেঈমান তাই আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলেও আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করবে না । মনে রেখো আমার এই এই সুন্দর ফুলের মতো জীবন থেকে সকল হাসি মুছে দেবার শাস্তি তুমি পাবে । “
” বললাম তো সমস্যা নেই আমি প্রস্তুত । “
” আমার জীবনের সুতোয় বাঁধা মোহনায় দাড়িয়ে করুন কষ্টের কথা গুলো আমি তোমার কাছে লিখে দিচ্ছি ঐ আকাশের গায়ে । কারণ তোমার সময় হবে না তাই কোন এক পড়ন্ত বিকেলে সময় নিয়ে পড়ে নিও । যদি তোমার জীবন সায়ান্হে কোন এক অস্ত পারের দিনে মনে পড়ে আমাকে তাহলে আকাশের বুকে তাকিয়ে আমার কথা গুলো পড়ে নিও । “
” আর কিছু বলবে ? “
” তুমি খুব ভালো করে জানো আমি তোমার উপর মানসিকভাবে দূর্বল ,
তাই তুমি ইচ্ছা করেই আমাকে অবহেলা করে করে কষ্ট দিচ্ছ । আমি কিছুই বলতে পারি না তোমাকে কারণ দূর্বলতা টা আমার প্রচুর বেশি তাই সবসময় নীরবে সহ্য করেছি । আর তাই মুখ ফুটে সবসময় মনের মধ্যে জমানো অভিমান প্রকাশ করতে পারি না ৷ আমি যতবার তোমাকে আঁকড়ে ধরতে চাই তুমি ততবারই আমাকে দুরে ঠেলে দিয়েছ কিন্তু তুমি কখনো ভাবোনা তোমার কথায় আমার বুকের মধ্যে কষ্ট লাগে কিনা ! আচ্ছা একটা প্রশ্ন করবো ? তোমার পিছনে পরে থাকা বৃষ্টি একটা সময় বদলে যাবে ।
তোমাকে কল দিবে না তোমার কাছে গিয়ে বারবার অপমানের পরেও মিষ্টি হেসে ভালবাসি বলবে না । চোখের পানি মুছতে মুছতে একদিন অপরিচিত কােন একজনের সাথে সংসার সাজিয়ে নেবো ৷ দিনের পর দিন তার সাথে একই সাথে একই ছাঁদের নিচে কাটিয়ে দেব । হঠাৎ করে কোন এক অপরাহ্ণের বেলাশেষে অবসরে বেলকনিতে কফির মগ হাতে দাঁড়িয়ে থাকবো । সেদিন তোমার স্মৃতি গুলো চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে দেখা দেবে , তোমাকে একটা মুহূর্ত দেখার জন্য আঁখি ছলছল করবে । সেদিন তোমার কথা ভাবতে ভাবতে সময় ফুরিয়ে যাবে , সাজের বেলা ঘরের বাতি জ্বালাতে ভুলে যাবো । তবুও আবারও একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে সবকিছু মিথ্যে তুচ্ছ ভেবে আপন মনে নিজেকে শান্তনা দেবো । “
” আমার একটা কাজ আছে , তুমি চাইলে আমরা আরেকদিন দেখা করে তোমার বাকি কথাগুলো শুনতে পারি ৷ “
” তার আর দরকার নেই , ভালো থেকো সবসময় । “
” ঠিক আছে আল্লাহ হাফেজ । “
দীর্ঘ পাঁচ বছরের সম্পর্ক সমাপ্ত করলাম । বৃষ্টিকে খুব ভালবাসি আমি কিন্তু তবুও নিজের ইচ্ছেগুলো বুকের মধ্যে চাপা দিয়ে তাকে দুরে সরিয়ে দিলাম । পকেট থেকে মোবাইল বের করে ডাটা অন করে বৃষ্টি বাবার কাছে কল দিলাম। আমার হাতের এই স্মার্ট ফোনটা গতবছর আমার জন্মদিনে বৃষ্টি উপহার দিয়েছিল । কিন্তু তার জন্মদিনে আমি কখনো বড় ধরনের কিছু উপহার দিতে পারি নাই । তার জন্য বৃষ্টি কোনদিন আফসোস করে না কারণ সে আমার কাছে এক বিন্দু ভালবাসার জন্য ছুটে এসেছে বারবার । আর আমি কোন এক অপ্রত্যাশিত কারণে তার মনে কষ্ট দিয়েছি শতবার ।
” হ্যাঁ সজীব বলো । “
” আঙ্কেল বৃষ্টির সাথে আমার সকল সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে , একটু আগে বৃষ্টি আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেছে । আগামীকাল ঈদের তিনদিন পর নাকি আপনাদের কাছে চলে যাবে । “
” অনেক ধন্যবাদ বাবা , তোমাকে আমি নিজের সন্তানের চেয়ে বেশি স্নেহ করি । আমি জানতাম যে একজন বিপদগ্রস্ত বাবার এই উপকার তুমি করবে । তোমার জন্য অসংখ্য দোয়া রইল , আশা করি তুমি একদিন অনেক বড় হবে । “
” সত্যি সত্যি যদি সেই আশা করেন তাহলে বৃষ্টির সাথে আমাকে বিয়ে দিতে সমস্যা কি আঙ্কেল ? নাকি শুধু আশীর্বাদ করার জন্য বাক্যটা ব্যবহার করেন ?”
” তোমাকে এর আগেই বলেছি বৃষ্টিকে আমরা অন্য যায়গায় বিয়ে দেবো বলে ছেলে পক্ষকে পাকা কথা দিয়েছি ৷ কিন্তু বৃষ্টি আমাদের একমাত্র মেয়ে তাই তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করতে গিয়ে তার চোখে খারাপ হতে চাই না ৷ আর সে জন্যই তোমার সাহায্য নিয়ে বৃষ্টিকে নিজের কাছে আনার প্রচেষ্টা করলাম । প্রথমে ভেবেছিলাম তুমি অন্য দশটা ছেলেদের মত হয়তো বৃষ্টির জীবন থেকে যেতে রাজি হবে না । কিন্তু একজন নিরুপায় পিতার অনুরোধ তুমি এভাবে রক্ষা করবে ভাবিনি সত্যি অনেক কৃতজ্ঞতা রইল তোমার প্রতি । ”
” আঙ্কেল এখন তাহলে রাখি আন্টিকে আমার সালাম জানাবেন আর আপনারা ভালো থাকবেন সর্বদা সবসময় । “
” আচ্ছা ঠিক আছে তুমিও ভালো থেকো । “
রাস্তা দিয়ে গন্তব্যহীন পথিকের মতো হেঁটে হেঁটে হাউজিং সোসাইটির ভিতর চলে গেলাম । আরেকটু সামনে গেলেই মায়ের বাসা , দ্বিতীয় স্বামীর সাথে সন্তানদের নিয়ে সুখেই আছেন । একবার মনে হলো দেখা করে গেলে কেমন হয় ? অনেকদিন মায়ের সঙ্গে কথা বলা হয়নি , আগামীকাল ঈদের দিন তাই আজকে দেখা করে দু একটা কথা বলা যেতে পারে । বাড়ির গেইট নতুন করে বছর খানিক আগে লাগানো হয়েছে কিন্তু রংটা বেশি ভালো লাগে না । তাকিয়ে থাকলে কেমন যেন চোখ বন্ধ হয়ে আসে । খুলনা শহরেে বাড়ির গেইটে দারোয়ান বেশি থাকে না কিন্তু মায়ের এই বাড়িতে আছে । ষাট বছর বয়সের কাছাকাছি এক বৃদ্ধ দারোয়ানের দায়িত্ব পালন করেন ।
ভিতরে গিয়ে বুঝতে পারলাম বাড়িতে অনেক মানুষ জন আছে মনে হয় মায়ের এই সংসারের সন্তানেরা মানে আমার সৎ ভাইবোন সবাই এসেছে । দুুর দুরন্ত থেকে তারা তাদের মা-বাবার সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে এসেছে । কিন্তু আমার জীবনে ঈদ মানে আর দশটা দিনের চেয়ে বেশি কষ্টের । কারণ সবাই যখন প্রিয়জনদের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে তখন বড় আফসোস লাগে ৷ ড্রইং রুমে বসে আছি , কাজের মেয়ে আমাকে বসে থাকতে বলে ভিতরে মা’কে ডাকতে গেছে । সামনে দৈনিক পত্রিকা আছে তাই হাতে নিয়ে চোখের সামনে মেলে ধরে বসে আছি ৷ দু একটা লাইন পড়ে দেখলে ভালো হতো কিন্তু ইচ্ছে করছে না , আজকাল ইচ্ছে গুলো বড্ড অবাধ্য হয়ে গেছে । কাজের মেয়েটা ড্রইং রুমে প্রবেশ করলো তার হাতে চায়ের কাপ কিন্তু বিস্কুট জাতীয় কিছু নেই ৷ তার পিছনে পিছনে মা প্রবেশ করলো , আমি আগের মতো বসে আছি ।
” সামনে সোফায় বসতে বসতে বললাে তুমি আজকে হঠাৎ করে ? আগামীকাল ঈদ তাই বাড়িতে মেহমান গিজগিজ করছে , তুমি দুদিন পর আসলেই পারতে ।
” আমার কেন যেন মনে হচ্ছে আপনার সাথে আমার আর দেখা নাও হতে পারে । গত বেশ কিছুদিন ধরে আমি মা’কে স্বপ্নে দেখতে পাচ্ছি মা জানতে পেরেছে আমি অনেক কষ্ট আছি তাই তিনি বারবার তার কাছে যেতে বলছে ৷ “
” এ সকল কথা বলার জন্য এসেছো ? “
” নাহহ আপনার কাছে আমার কিছু প্রশ্ন ছিল সেই প্রশ্ন গুলো করেই আমি চলে যাবো । আপনি হয়তো উত্তর দিতে চাইবেন না তবে আমি আপনার মুখ থেকে উত্তর আশা করি না ৷ প্রশ্ন গুলো শোনার পরে আপনার চেহারার ভাবমূর্তি দেখে আমি উত্তর বের করে নিতে পারবো ৷ “
” কি প্রশ্ন ? “
” আপনি আমাকে এতদিন সবসময় বলেছেন আমি আপনার বড় বোনের ছেলে ৷ আমার মা-বাবা রোড এক্সিডেন্টে মারা গেছে তারপর থেকে নাকি আপনি তিন বছর লালন পালন করেছেন । এরপর আপনার বিয়ে ঠিক হয়ে গেল আর আপনার স্বামী আমাকে মেনে নিতে পারবে না বলে আমাকে আপনি আর আপনার মা মানে আমার নানি এই দুজন মিলে এতিমখানায় দিয়ে আসলেন । “
” হুম যা সত্যি তাই ? “
” কিন্তু এটা তো সত্যি নয় ! কারণ আমি জানি আপনার দ্বিতীয় বোন নেই এবং আমি আপনার প্রথম স্বামীর সন্তান । আপনার প্রথম স্বামীর সাথে যখন ডিভোর্স হয় তখন আমি আপনার গর্ভে ৬ মাসের শিশু । আমার জন্ম হবাে পরে আপনি আর নানি রুপসা এলাকা ছেড়ে এই খালিশপুর চলে আসেন । কিন্তু আমার জন্য আপনি আপনার জীবন নষ্ট করতে চাননা বলে আমাকে নতুন পরিবেশে সবার কাছে বোনের ছেলে পরিচয় দিয়েছেন । “
” মা একটু ঘাবড়ে গিয়ে বললো , এতকিছু কিভাবে জানলে তুমি ? “
” সত্যি নাকি মিথ্যা ? “
” মিথ্যে । “
” ঘটনা সত্যি সেটা কিন্তু আপনার চেহারা দেখা বোঝা যাচ্ছে । “
” তুমি কি চাও এখন ? “
” একবার মা বলে ডাকতে চাই । “
” হঠাৎ করে এমন পাগলামি করার মানে কি ? “
” জানিনা আমি তবে শুধু জানি নিজের ইচ্ছে গুলো বড্ড অবাধ্য তাই তাকে ফেরাতে পারিনা । “
” তুমি আজকে যাও , আমি ঈদের সপ্তাহ খানিক পরে তোমার সাথে বাহিরে কোথাও দেখা করবো তখন তোমাকে সবকিছুর সত্যতা জানাবো । “
” আমি যতটুকু জানি তারচেয়ে বেশি জানার ইচ্ছে করছে না তাই আপনাকে আর কষ্ট করতে হবে না ৷
” রেগে যাচ্ছ কেন ?”
” আচ্ছা ভালো থাকবেন সবসময় আমি তাহলে চলে যাচ্ছি , আর কখনো আপনার সাথে দেখা করার ইচ্ছে নেই ।
তবুও যদি চলতি পথে হঠাৎ করে কখনো দেখা হয়ে যায় তাহলে কিন্তু ভয়ের কিছু নেই আমি কাউকে কিছু জানাবো না । স্বামী সন্তানদের নিয়ে আপনি সুখে বসবাস করুন । মায়ের কাছ থেকে বেরিয়ে একা রাস্তা দিয়ে হাঁটছি , গন্তব্য খুলনা রেলওয়ে স্টেশন । মাঝে মাঝে ওখানে গিয়ে কিছু রাস্তার পরিচয়হীন বাচ্চাদের সাথে আলাপ হয়েছে । কিন্তু আমার নিজের যেখানে খাবার জোটে না সেখানে ওদের জন্য কি বা করতে পারি ? ওদের মধ্যে ফাতিমা নামে ৭ বছরের একটা মেয়ে তিনদিন ধরে জ্বর ৷ তার সাথে দিনের মধ্যে একবার করে দেখা করা উচিৎ , গতকাল বিকেলে দেখেছি জ্বর মোটামুটি কমে গেছে । আজকে রাতের মধ্যে যদি সম্পুর্ন সুস্থ হয়ে যায় তাহলে তো শোকর আলহামদুলিল্লাহ ।
খুলনা জোড়া গেট সংলগ্ন বিশাল গরু কেনা-বেচা হাট বসেছে তাই ভাবলাম একটু ভিতর থেকে ঘুরে আসি । কত নানান ধরনের মানুষ গরু কিনতে এসেছে তাদের সবার দরদাম করার দৃশ্য মুগ্ধ হয়ে দেখা যায় । অনেকেই গরু নিয়ে ব্যাবসা করতে এসেছে তাদের কাজ শুধু বিক্রি করা । আবার কেউ কেউ নিজের অতি যত্নে পালিত গরুটা বিক্রি করতে এসেছেন । তার মুখে কোন হাসি নেই , একটা পশু এতদিন নিজের কাছে রেখে আজকে কোরবানির জন্য বিক্রি করে দিচ্ছেন । তিনি ভালো করে জানেন যে যখন গরুটা বিক্রি হবে তখন ঈদের দিন সেটা কোরবানি করা হবে । এ জীবনে তার সেই আদরে বড় করা পশুটার সাথে আর দেখা হবে না । বৃষ্টি আমাকে ঠিকই বলেছিল , রাস্তার একটা কুকুর যদি কারো সাথে সাথে থাকে তাহলে তার প্রতিও মায়া জন্ম নেয় ৷ বৃষ্টির ধারণা তার প্রতি আমার কোন মায়া নেই তাই সে অনেক কষ্টে আমাকে যা ইচ্ছে তাই বলে চলে গেল । এক পাশে একটা ছোট্ট জটলা দেখা যাচ্ছে , অনেক মানুষ ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে । আমি সেদিকেই এগিয়ে গেলাম কারণ আমার কোন কাজ নেই তাই সময় পার করার জন্য কৌতুহল নিবারণ করা যেতে পারে ।
ভালবাসার দৃশ্য ।
হ্যাঁ ঠিকই পড়েছেন আপনারা , যেটা আমি চোখে দেখতে পাচ্ছি সেটা হচ্ছে ভালবাসার দৃশ্য । বিশাল একটা গরু চারজনে মিলে রশি দিয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে , গরুর সামনে দশ/এগারো বছরের একটা মেয়ে গলা জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে । গরুটা চোখ বন্ধ আদর উপভোগ করেছে , মেয়েটি শব্দ করে কান্না করছে কিন্তু গরুটি শব্দ করতে পারছে না তাই নীরবে চোখের পানি ছেড়ে দিয়েছে । গরুর চোখ বেয়ে পানি পরছে আর মেয়েটা তার মলিন ময়লা জামা দিয়ে মুছে দিচ্ছে । ভালবাসার অনুভূতি সকল প্রাণীর মাঝে বিদ্যমান কিন্তু আমরা মনুষ্যজাতি সেটা ভাষায় প্রকাশ করতে পারি । কিন্তু পশু পাখি তারা আমাদের মতো কথা বলতে পারে না তাই তাদের ভালবাসা আমাদের কাছে প্রকাশ করতে পারে না ৷ কিন্তু তারা নিজেরা নিজেদের মাঝে ঠিকই ভালবাসা অবিরাম অন্তহীন কেন্দ্রীভূত সুবিস্তীর্ণ দৃশ্যপথ ।
লুঙ্গি পরা এক ব্যাক্তি মেয়েটিকে গরুর কাছ থেকে টেনে পাশে দাঁড়িয়ে রইলো । রশি ধরা চারজন মিলো গরু টানতে টানতে গরুর বাজার থেকে বের হবার চেষ্টা করতে লাগলো । মেয়েটা এবার লুঙ্গি পরা লোকটাকে বলছে , ” বাবা ওরা আমার লালু কে নিয়ে যাচ্ছে , কালকে ছুরি দিয়ে জবাই করে দেবে । ৩০/৩৫ ফুট যাবার পর গরুটা পিছনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল , অনেক বড় গরু তাই তার শক্তিও অনেক বেশি । চারজন মিলো টেনে নিতে হিমশিম খাচ্ছে । এই মুহূর্তে লুঙ্গি পরা লোকটা হয়তো অন্যমনস্ক হয়ে গেছে কারণ তার মেয়ে হাত থেকে ছুটে দৌড়ে গরুর কাছে চলে গেল আমিও জোরে জোরে হেঁটে পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম । মেয়েটি বলছে , আমাকে তুই ক্ষমা করে দিস লালু কারণ আমি তোকে বাঁচাতে পারলাম না । তুই চিন্তা করিসনা তোকে আল্লাহর খুশির জন্য কোরবানি করা হবে ৷ আমাদের মসজিদের ইমাম সাহেব হুজুর যখন সকাল বেলা আরবি পড়ান তখন তিনি বলেছেন যে আমাদের এক নবী নাকি আল্লাহর খুশির জন্য তার প্রিয় জিনিস কোরবানি করতে ।
তাই তিনি নাকি তার সন্তানকে কোরবানি করতে চেয়েছিলেন কিন্তু আল্লাহ তখন নবীকে পরীক্ষায় পাশ করিয়ে দিয়ে পশু কোরবানি করার নিয়ম চালু করেছে । তুই একবার ভেবে দেখ যদি সেদিন সেই নবীর সন্তান কোরবানি হতো তাহলে তো আজকে আমার বাবা আমাকে কোরবানি দিতো কারণ আমি আমার বাবার কাছে সবচেয়ে প্রিয় । কিন্তু আমার পরিবর্তে আজ তোকে কোরবানি হতো হচ্ছে কারণ এটাই আল্লাহর হুকুম । তুই মন খারাপ করিস না , আল্লাহর দরবারে আমার জন্য দোয়া করিস । মেয়েটাকে এবার আর তার বাবাকে ধরতে হলো না কারণ সে নিজেই সাইডে দাড়িয়ে আছে । চারজনে মিলে রশি টানা শুরু করেছে পিছন থেকে একজন জোরে জোরে লাঠি দিয়ে আঘাত করছে । মেয়েটি চিৎকার দিয়ে বললো , লালুকে ওভাবে মেরো না গো আমার লালু কষ্ট পাবে । উপস্থিত জনতার অনেককেই চোখের পানি মুছতে দেখা গেল । গরুর বাজারে এসে এমন ইমোশনাল হয়ে কান্না করতে হবে এটা হয়তো তাদের ভাবনার মধ্যে ছিল না । মাগরিবের আজান দিতে আর বেশি সময় হয়তো নেই , আমিও আস্তে আস্তে রেললাইন ধরে স্টেশনের দিকে চললাম ।
ফাতিমার জ্বর অনেকটা কমে গেছে কিন্তু সকাল থেকে নাকি কিছু খায়নি তাই শরীর দুর্বল । আমার পকেটে চারশো টাকার মতো ছিল , এখানের আরেকটা ছোট ছেলে বাবুলকে চারশো টাকা দিয়ে হোটেল থেকে খাবার আনতে বললাম । বাবলু টাকা নিয়ে চলে গেল আর আমি ফাতিমা , শাহনাজ , রনি আরো ৫/৬ জনের সাথে রেললাইনের উপর বসে গল্প করছি ৷ প্রায় ঘন্টা খানিক পার হয়ে গেল কিন্তু বাবলু আর ফিরে আসলো না । আমি সামান্য অবাক হলাম কারণ মনে সন্দেহ জাগলো যে বাবলু কি টাকা নিয়ে পালিয়ে গেল নাকি ? আরো আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করে আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল কারণ বাবলু ফিরে না আসাতে কষ্ট পেলাম ৷ এদিকে এরা সবাই ক্ষুধা সহ্য করতে না পেরে হা হুতাশ করতে লাগলো ৷ আমি বিকল্প কিছু চিন্তা করতে লাগলাম কিন্তু আমার কাছে এই মুহূর্তে মোবাইল ছাড়া আর কিছু নেই । ওদের সবাই কে সাথে নিয়ে ডাকবাংলোর দিকে হাঁটা শুরু করলাম । উদ্দেশ্য হাতের মোবাইলটা বিক্রি করে এদের জন্য সামন্য কিছু খাবার কিনবো তারপর যদি সম্ভব হয় তাহলে সবার জন্য একটা করে জামা গেঞ্জি ।
পিচ্চি গুলোকে বাহিরে দাঁড় করিয়ে রেখে আমি ডাকবাংলো মোড়ে খুলনা শপিং কমপ্লেক্সে মোবাইল বিক্রি করতে গিয়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল । গতবছর এই মোবাইল তেরো হাজার টাকা দিয়ে বৃষ্টি কিনে দিয়েছিল কিন্তু আজকে তারা সেই মোবাইল মাত্র তিন হাজার টাকা দাম বলে । বহুকষ্টে জোরাজোরি করে তিন হাজার আটশো টাকা বিক্রি করলাম । এরপর ওদের নিয়ে নর্মাল একটা হোটেলে গিয়ে ভাত খেতে দিলাম , মাত্র ছয়জনের বিল এসেছে চারশো সত্তর টাকা ৷ তারপর ওদেরকে নিয়ে পশ্চিম সাইডের খোলা বড় মার্কেটে গেলাম ৷ সেখানে গিয়ে নিজের বাজেট অনুযায়ী তাদের জন্য দু একটা সস্তা জিনিস কিনতে লাগলাম । আশেপাশের অনেকে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে কেউ কেউ মিনিট পাঁচেক তাকিয়ে আবার নিজের কেনাকাটা করতে ব্যস্ত । হঠাৎ একটা অতিব সুন্দরী তরুণী পিছন থেকে বলে উঠলো ” আপনি ওদের নিয়ে একটু দাড়াবেন প্লিজ আমি আপনাদের একটা ছবি তুলতে চাই । “
” কি করবেন ছবি তুলে ? “
” সোস্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল করে দেবো কারণ আমি চাই আপনার মতো করে অনেকে এগিয়ে আসুক । “
” ঠিক আছে ছবি তুলতে পারেন কিন্তু আমার মুখটা স্পষ্ট করে পোস্ট করবেন না । “
” আচ্ছা ঠিক আছে আপনার মুখের উপর একটা স্টিকার সেট করে পোস্ট করবো । “
” ধন্যবাদ । “
মেয়েটি আমাদের ছবি তুলে মোবাইল ব্যাগের ভেতর রেখে আরো কিছুক্ষণ কথা বললো । তার সাথে তার পরিবারের আরো ৩/৪ জন আছে কিন্তু তারা দাঁড়িয়ে আছে অদূরে ৷ আমি কথা বলার এক পর্যায়ে তাকে বললাম , ” যদি কিছু মনে না করেন তাহলে একটা কথা বলতে চাই । ” মেয়েটি হাসতে হাসতে বললো , অবশ্য অবশ্য বলুন আমি কিছু মনে করবো না । “
” আসলে আমি একটা বেকার ছেলে , টিউশনি করিয়ে আমার খরচ চলে । আমার কাছে যা টাকা ছিল তা দিয়ে সবার কাপড় কিনতে পারিনি । কেবল দুজনের কাপড়ের টাকা হচ্ছে না তাই আপনি যদি ওদের দুজনের জন্য খুব সস্তা দামে দুটো জামা কিনে দিতেন । তাহলে ওরা অনেক খুশি হতো । ” মেয়েটি এবার আমতা আমতা করে বললো , সরি ভাইয়া আসলে আমরা পাঁচজন একসাথে এসেছি । অনেক কিছু কেনাকাটা করতে হবে তাই কত কি খরচ হবে বুঝতে পারছি না । আপনি অপেক্ষা করুন তারপর আমরা কেনাকাটা করে যদি পারি তাহলে অবশ্যই কিনে দেবো ।” আমি ঠোঁটের কোনে মিষ্টি হাসি আনার চেষ্টা করে বললাম , আপনাকে দেখে সম্ভ্রান্ত ঘরের সন্তান মনে হয় ।দুজনের জামা কিনতে সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা খরচ হবে কিন্তু সেই টাকাটা দার করতে আপনার অপেক্ষা করতে হবে । আমি জানি এই অপেক্ষা শেষ হবে না আর আমিও আপনার কাছে কোনকিছু চাই না । “
মেয়েটা কিছু না বলে দাঁড়িয়ে আছে তখন আমার সাথে থাকা শাহনাজ মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলল , আপনার মোবাইলে আমাদের যে ছবি তুলেছেন সেই ছবি ডিলিট করে দেন । আপনার মতো মানুষের মোবাইলে আমাদের ছবি শোভা পাবে না ৷ সজীব ভাই তার নিজের মোবাইল বিক্রি করে আমাদের জামা কিনে দিচ্ছেন আর আপনারা মেলা টাকার মালিক তবুও দিতে চাননা । রাস্তায় বসে ভিক্ষা করে না খেয়ে যেদিন মরে যাবো সেদিন আল্লাহর কাছে আপনাদের মতো মানুষের সব কথা বলে দেবো । কথাবার্তা অন্য দিকে মোড় নিচ্ছে তাই বাচ্চাদের নিয়ে মার্কেট থেকে বেরিয়ে পরলাম । আসলে আমি সবার জন্যই কাপড় কিনতে পেরেছি কারণ হিসাব করেই খরচ করা হয়েছে । কিন্তু ওই মেয়ের কাছে দুজনের কাপড় কেনার কথা বলে তার মনটা পরীক্ষা করে নিয়ে আসলাম ৷ আর আশেপাশের সবাই তখন সবকিছু দেখুক ।
যদিও খুব সস্তা দামের জিনিস তবুও নতুন কিছু পেয়ে তারা মহাখুশি ৷ সবাই নাচতে নাচতে আমার সাথে হাঁটছে এ এক মাহা আনন্দের অনুভূতি । আমি বাচ্চাদের রেলস্টেশনে রেখে আবার একা একা রাস্তায় হাঁটতে লাগলাম । রাতটা কোন যায়গা পার করা যায় সেটাই ভাবছি , আচ্ছা রুপসা ব্রিজে গেলে কেমন হবে ? রাতের আধারে হাঁটতে হাঁটতে এখন রুপসা ব্রিজ যেতে রাত বারোটা বেজে যাবে ৷ তবুও আজকে নাহয় হিমুর মতো রাতের আধারে হাঁটতে হাঁটতে পার করে দেবো । সকাল বেলা আবার খুলনার দিকে আসলাম কারণ অনেক দিনের ইচ্ছে ছিল নিউমার্কেট বায়তুন নুর জামে মসজিদে বড় ধরনের কোন একটা জামায়াতে নামাজ পড়বো । আজকে যেহেতু ঈদুল আজহার নামাজ তাই আজকেই ইচ্ছেটা পূরণ করতে হবে ৷ তাই সকাল সকাল নিউমার্কেট চলে আসলাম এবং দ্বিতীয় জামায়াতে নামাজ আদায় করলাম ৷ নামাজ শেষ করে শিববাড়ি মোড়ে এসে দাঁড়িয়ে আছি চোখে ঘুম টলমল করছে । আচ্ছা হিমুর ও কি এমন করে ঘুম পেতো ? হঠাৎ করে দেখলাম বাবলু রাস্তার পাশে বসে আছে ৷ তার ঠোঁট কেটে গেছে কনুইয়ের চামড়া উঠে গেছে অনেক স্থান থেকে ।
” আমি কাছে গিয়ে বললাম , কিরে বাবলু তোর এ অবস্থা কেন ? “
” বাবলু আমাকে দেখে থতমত খেয়ে গেল মাথা নিচু করে বললো , মাফ করে দাও সজীব ভাই । “
” আগে বল তোর শরীরে এত কাটাছেঁড়া কেন ? “
” পিছনে একটা বাড়ির সামনে গরু কোরবানি দিচ্ছে তাই তাদের কাছে গেছিলাম কিছু মাংস চাইতে । প্রথমে দিতে চাইল না কারণ তাদের নাকি গরীব দুঃখীর জন্য যা ছিল সবকিছু দেয়া শেষ । আমি তখন পা জড়িয়ে ধরলাম আর অমনি আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল । বলে , শালা টোকাইর বাচ্চা তুই আবার মাংস দিয়ে কি করবি ? “
” আমাকে নিয়ে যেতে পারবি সেখানে ? “
” হ্যাঁ পারবো । “
” চল তাহলে । “
বাবলুর সাথে শিববাড়ির পিছনে একটা গলির ভিতর গিয়ে একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটা লোককে বাবলু দেখিয়ে দিয়ে বললো , ওই লোকটা । আমি তাকিয়ে দেখি ৩৮/৪০ বছরের একটা মানুষ । সামনে গিয়ে বললাম ” আসসালামু আলাইকুম । “
” ওয়া আলাইকুম আসসালাম , কিছু বলবেন ? “
” বাবলুকে দেখিয়ে দিয়ে বললাম , আপনি এই বাচ্চা টাকে মেরেছেন কেন ? “
” ছোটলোক শ্রেণির টোকাই , একবার বললাম যে হবে না তবুও জোরজবরদস্তির করে । “
” তাই বলে এভাবে আহত করবেন ? ভুলে যাবেন না যে ওরাও মানুষ । “
” রাস্তার টোকাই শ্রেণীর আবার মানুষ কি রে ? ওরা তো সব বিয়ের আগে জন্ম নেওয়া আকামের ফসল , এদের একেকটার জন্ম হয় কন্ডম এক্সিডেন্টে । “
” আর সেই সব এক্সিডেন্ট কিন্তু আপনাদের মতো ভদ্রলোকরা বেশি করে । কিন্তু টাকার জোরে কোন এক মফস্বলের হাসপাতালে খালাস করিয়ে স্টেশনে কিংবা ড্রেনে অথবা ডাস্টবিনে ফেলে দেয় । “
” কি বললি তুই ? আমাকে চেনো তুই ? দাড়া তুই আজকে কি করি দেখ । এ কথা বলেই তিনি অদূরে দোকানে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটা ছেলের নাম ধরে ডাক দিলেন । “
মুহূর্তের মধ্যে ৮/১০ পাঞ্জাবি পরা ছেলে দৌড়ে এলো আর ওই লোকটার কথা অনুযায়ী এলোপাতাড়ি কিল ঘুষি মারতে লাগলো । মাত্র এক মিনিটের মধ্যে আমি রাস্তায় পরে গেলাম আর পাঞ্জাবি পরা ছেলে গুলো আমারা ইচ্ছে মতো মারতে মারতে তাদের ঈদের আনন্দটা আরো বাড়িয়ে নিলো । যতক্ষণ জ্ঞান ছিল ততক্ষণে কাউকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসতে দেখলাম না , মনে মনে ভাবলাম পৃথিবী তুমি বড়োই বিচিত্র । যখন জ্ঞান ফিরেছে তখন আমি হাসপাতালে আর দেয়ালের ঘড়িতে চারটা পঁচিশ আরেক পাশে লেখা আছে খুলনা ২৫০ শয্যা হাসপাতাল । আর আমার পাশে স্টেশনের সব বাচ্চারা ঘিরো বসে আছে । চোখ মেলে তাকিয়ে দেখি সবাই চিন্তিত হয়ে বসে আছে বাবলু আমার নড়াচড়া দেখেই ডাক্তার সাহেব ডাক্তার সাহেব বলে বেরিয়ে গেল । একটু পরে একজন ডাক্তারের সাথে বাবলু প্রবেশ করলো ।
” আমি ডাক্তারকে বললাম , আমি একটু আপনার সাথে কথা বলতে চাই । “
” জ্বি বলেন । “
” আমার শরীরের অবস্থা কি বেশি খারাপ ? “
” হ্যাঁ একটু বেশি খারাপ তবে আমরা আমাদের সব টুকু দিয়ে চেষ্টা করবো । “
” আপনার মোবাইল দিয়ে দুইজনের নাম্বারে কল দিয়ে কথা বলাবো । “
” আচ্ছা ঠিক আছে নাম্বার বলেন । “
” আমি প্রথমে বৃষ্টির নাম্বার বললাম । বৃষ্টি রিসিভ করে বললো , আসসালামু আলাইকুম । “
” ওয়া আলাইকুম আসসালাম , আমি সজীব । “
” এটা কার নাম্বার ? “
” এটা একজন ডাক্তারের নাম্বার । “
” তোমার মোবাইল কোথায় ? আমি গতকাল রাত দশটা থেকে কল দিচ্ছি । “
” আর আমি রাত নয়টা পঞ্চাশ মিনিটে মোবাইলটা বিক্রি করে দিয়েছি ৷ এখন তোমার কাছে একটা বিশেষ কারণে কল করেছি । “
” বলো “
” তুমি এখনই দুই কেজি আটা দিয়ে রুটি বানিয়ে আর একটা বড় বাটিতে গরুর মাংস নিয়ে ২৫০ শয্যা হাসপাতালে আসো । “
” সেখানে কেন ? “
” আমি খুবই অসুস্থ মনে হয় বাঁচতে পারবো না তাই মৃত্যুর আগে তোমার হাতের রান্না খেতে ইচ্ছে করে ।”
” তুই কোনদিন মানুষ হবি না , আজকের দিনেও তুই সারারাত সারাদিন মোবাইল বন্ধ রেখে এখন কল দিয়ে ফাজলামো করো ? “
” আমি সত্যি বলছি , তুমি চাইলে ডাক্তারের সাথে কথা বলে দেখতে পারো । “
” তোমাকে তো আমি ভালো করে চিনি , নিজের পরিচিত একজনকে ধরিয়ে দিয়ে এমন নাটক আগে বহুবার করেছ । রাখলাম আমি অনেক কাজ আছে ।
” তুমি তাহলে আসছো তো ? “
” নাহহ ।”
” ঠিক আছে ভালো থেকো । “
বৃষ্টি কল কেটে দিল আমি বাবলু আর ফাতিমাকে আমার একান্ত কাছে ডেকে বললাম , তোদের সেই বৃষ্টি ভাবির কথা মনে আছে ? একবার আমার সাথে তোমাদের সাথে দেখা করতে গেছিলো । “
” হ্যাঁ ভাই মনে আছে । “
” বৃষ্টি এখানে রুটি আে গরুর মাংস নিয়ে আসবো তখন যদি আমি ভিষন ঘুমিয়ে থাকি তাহলে তোরা খাওয়া শুরু করবি । “
” তুমি খাবে না ? “
” যদি ঘুম ভাঙ্গে তাহলে খাবো আমার জন্য দুটো রুটি রেখে দিস । “
” আচ্ছা ঠিক আছে ৷ “
ডাক্তার সাহেবের মোবাইল আবার বেজে উঠলো তিনি মোবাইলের স্ক্রিনে তাকিয়ে বললেন , ওই নাম্বার থেকে কল এসেছে ৷ বললাম , আপনি কথা বলেন নিশ্চয়ই আপনার কাছে কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে পারে ।
” এক মিনিটের কম সময় কথা বলে ডাক্তার কল কেটে দিলেন । বললাম , বৃষ্টি আসবে তাই না ডাক্তার সাহেব ? “
” হ্যাঁ তিনি আসছেন এখনই , রুটি বানানো আছে আর মাংসও নাকি রান্না করা শেষ । “
” আপনার ধারণা কি ? আমি বাঁচবো না মরবো ? “
” বাঁচা মরা সবকিছু আল্লাহ হাতে । “
” আমি চাই যদি আমি মারা যাই তাহলে যেন দশ মিনিটের মধ্যে মারা যাই , কেন জানেন ?
” কেন ? “
” কারণ বৃষ্টি আসলে এখানে প্রচুর কান্নাকাটি করবে আর মেয়ে মানুষের কান্নাকাটি একদম সহ্য করা যায় না । “
” আপনি চুপ করে একটু বিশ্রাম করুন বড় ডাক্তার এলে অপারেশন করা হতে পারে । “
” যদি বৃষ্টি আশার আগে আমি সত্যি সত্যি ঘুমিয়ে যাই তাহলে বৃষ্টিকে বলবেন খাবার গুলো ওদেরকে যেন খাইয়ে দেয়। “
” ঠিক আছে আপনি এবার চুপ করুন । “
” আরেকটা কথা আছে সেটাও বলতে হবে । “
” বলেন । “
” বৃষ্টিকে বলবেন যাকে আমি আমার খালা হিসেবে তার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম আসলে সে আমার খালা না। তাকে বলবেন সে আমার মা । ডাক্তার চলে গেল আর আমি চোখ বন্ধ করে স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করছি । আর অপেক্ষা করছি কোন একটা বড় যাত্রার । যেই যাত্রা গুলো আমার বারবার মনে পরে শুধু *একলা থাকার দিনে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত