সাদা-কালো পৃথিবী

সাদা-কালো পৃথিবী
‘চেহারার এ কি হাল হয়েছে খেয়াল করে দেখেছিস?’ ছোট ফুফুর কথার জবাবে কিছু বলার ইচ্ছে আমার নেই। এমনকি তার সঙ্গে বলার মত কথাও আমার নেই। চুপচাপ বসে রইলাম আগের মতই। মা এক থালা খিচুড়ি এনে ফুফুর হাতে দিয়ে গেলেন। খিচুড়ি আমার বেজায় পছন্দ। এই কারণেই মা ভেবেছেন হয়তো আমি আর না করবো না, খেয়ে নিব। ‘হাত ধুয়ে খেয়ে নে। এরকম খাবার দাবারে অনিয়ম করলে চলে নাকি!’ আমি ক্ষুধার্ত গলায় উত্তর দিলাম, ‘আমি খাব না ফুফু। তুমি খাবার নিয়ে চলে যাও।’ ফুফু জোরালো স্বরে বললেন, ‘খাবি না মানে কি? এভাবে না খেয়ে থাকলে তো তুই অসুস্থ হয়ে পড়বি।’ জল ভরা চোখে ফুফুর চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘আমাকে কি তোমার সুস্থ মনে হয়?’ ফুফু নিশ্চুপ হয়ে তাকিয়ে রইলেন। আমি এক গ্লাস পানি খেয়ে শুয়ে রইলাম।
সন্ধ্যায় ফুফু এলেন কক্ষে। চুলে তেল দিয়ে দিলেন। ফুফু চলে গেলে আয়নার সামনে বসলাম। নিজেকে দেখে নিজেই অবাক হলাম। চোখের নিচে গাঢ় কালো দাগ জমেছে, মুখটাতে ব্রণে ভরে গিয়েছে। হাসতে ভুলে গিয়েছি আমি। শেষ কবে হেসেছিলাম মনে নেই। ঠোঁট দু’টো জুড়ে মলিনতার ছাপ এঁটে রয়েছে। চোখ ভর্তি কেবল শূণ্যতা।
সকাল থেকে মা তোড়জোড় করছে আমাকে পার্লারে পাঠাবে বলে৷ দুইদিন পরে আমার বিয়ে, চেহারার হাল এরকম থাকলে তো লোকজন সন্দেহ করে বসবে। ‘মা, তোমাকে আমি বলেছি আমি পার্লারে যাব না।’ মা ধমকের স্বরে বললো, ‘তুই বললে হবে নাকি! পাত্রপক্ষের কাছে আমাদের মানসম্মান খোয়া যাক এটাই তো তুই চাস।’ আমার কথা এবারও গ্রহণযোগ্যতা পেল না। বাধ্য হয়ে পার্লারে আসতে হলো। মেজ খালাকে পাঠানো হয়েছে আমার পাহারাদার হিসেবে। আমি যতক্ষণ পার্লারে রইলাম, তিনি আমার সাথেই রইলেন।
আগামীকাল গায়ে হলুদ। পরশু বিয়ে। বাড়ি জুড়ে বিয়ের আয়োজনে মেতে উঠেছে সকলে। আত্মীয়রা আসতে শুরু করেছে। যত বেশি সময় এগিয়ে আসছে তত বেশি আমি যেন অন্ধকারে তলিয়ে চলছি। মা সারাক্ষণ আমাকে নজরে রাখেন। আঠার মত লেগে থাকেন আমার সঙ্গে। এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে গেলেও মা সঙ্গে যান। সবার হাতে মুঠোফোন, যে যার মত ছবি তুলে চলছে। আমার মুঠোফোনটা কোথায় রাখা আছে আমার জানা নেই। তিনদিন আগে বাবা ফোনটা কেড়ে নিয়েছেন৷ শুধু এখানেই থেমে থাকেনি। আমাকে বাড়ির বাহিরে যেতেও কড়া নিষেধ করেছেন৷ আমার সকল বন্ধু-বান্ধবীদেরকেও বিয়ের দিনের আগে আসতে বারণ করে দিয়েছেন৷ ওদের কাছে আমাকে কতটা নিচে নামিয়ে দিলেন, আমার ভাবতেও অবাক লাগে।
আদিবের সঙ্গে কথা বলা খুব প্রয়োজন। সুযোগ’ই হচ্ছে না কেনোভাবে। মায়ের চোখ দু’টো ফাঁকি দিয়ে কারো ফোন সংগ্রহ করে কথা বলাটা এখন বেজায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আজ চারদিন হলো আদিবের কোনো খবর আমি জানিনা। চোখ ভিজে এলো। চারপাশে এত বেশি মানুষ যে মন খুলে কান্না করার উপায়ই নেই। ‘কোথায় যাচ্ছিস?’ মায়ের কড়া প্রশ্নে থেমে দাঁড়ালাম। মুখ ঘুরিয়ে উত্তর দিলাম, ‘ওয়াশরুমে যাচ্ছি। যাবে আমার সঙ্গে?’ মা চুপ করে রইলেন। আমি ওয়াশরুমে ঢুকেই দরজা আঁটকে দিলাম। ভেতরটা ভেঙ্গেচুরে যাচ্ছে, কান্না আঁটকে রাখা খুবই কষ্টকর। বেসিনের পানির ট্যাপটা চালু করে দিলাম। পানি পড়ার সঙ্গে আমার কান্নার শব্দ মিলিয়ে যাচ্ছে। চোখেমুখে পানি দিয়ে বের হয়ে এলাম। মা’কে দেখি ওয়াশরুমের সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। নিজেকে ফাঁসির আসামি মনে হয়। পালিয়ে যেতে না পারি যেন এই জন্যই এত নজরবন্দী থাকা।
সন্ধ্যায় গায়ে হলুদ। মেজ খালার সঙ্গে আবার আমাকে পার্লারে আসতে হলো। যদি সম্ভব হত আমি এখান থেকে দৌড়ে পালিয়ে যেতাম। আমার এই বন্দী জীবন থেকে মুক্তি মিলতো। আমি একটু আমার মত করে বাঁচতে পারতাম।
নানা বাহানায় অনেকগুলো বিয়ে ভাঙ্গতে সক্ষম হলেও বাবা এবার কঠোর সিদ্ধান্তে জানিয়ে দিলেন, ‘চয়নকেই তোমার বিয়ে করতে হবে।’ বাবা মাকে হাতে পায়ে ধরে অনেকবার বলেছি আদিবের কথা। তাদের কথা একই, ‘আদিবকে ভুলে যাও।’ একটা মানুষকে ভুলে যাওয়া এতটাই কি সহজ যে চাইলাম আর অমনি ভুলে গেলাম! যে মানুষটার সঙ্গে আমার এত শত স্মৃতি জড়িয়ে আছে, একসঙ্গে বাকিটা পথ হাঁটার কথা দেওয়া আছে, ভালো থাকার আর ভালো রাখার কথা আছে, যে মানুষটা স্বপ্নে আছে তাকে কি করে ভুলব আমি! ‘আদিবকে ছাড়া আমি আর কাউকে বিয়ে করবো না।’ এক রোখা গলায় বাবাকে কথাটা জানিয়েই বিপদ ডেকে আনলাম।
পনের দিন পরে ঠিক হওয়া বিয়ের তারিখটা দুম করে এই সপ্তাহেই নিয়ে এলেন। মুঠোফোন কেড়ে নিলেন, বাহিরে বের হওয়ার বিষয়েও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেন। সবার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হওয়া আমি ধীরে ধীরে একাকিত্বে তলিয়ে গেলাম। বাহিরে ঘোর অন্ধকার। বাড়ি জুড়ে লাইটিং করা হয়েছে। সবাই যার যার সাজসজ্জা নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু মায়ের চোখ দু’টো পড়ে আছে আমার দিকে। পরনে হলুদ শাড়ী, দু’হাত ভর্তি মেহেদী, হলুদের সাজে সাজানো হয়েছে আমায়। বাবা মায়ের মুখে আনন্দের হাসি। আফসোস, আমার ভেতরটা যদি একবার দেখতে পেতেন তারা। অনুষ্ঠানে আমার একটা বন্ধু-বান্ধবীও আসে নি। সবাইকেই দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল, বাবার আচারণের জন্যই কেউ আসার প্রয়োজন মনে করলো না। চোখ জোড়া ছলছলিয়ে উঠতেই দেখি তিয়াশা এসেছে। মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে একটু আলাদা সময় আমার হাতে এলো। ‘আমি ভেবেছিলাম তুইও আসবি না।’
তিয়াশা হেসে বললো, ‘তুই আমার একমাত্র ভালো বান্ধবী, না এসে পারি!’ ‘তোকে বেশ সুন্দর লাগছে।’ ‘তোকেও কিন্তু সুন্দর লাগারই কথা ছিল। এত সাজের মাঝেও তোর মুখটাতে আনন্দের অভাবটা স্পষ্ট জেগে আছে।’ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম, ‘আনন্দ কি থাকা উচিৎ?’ তিয়াশা আস্তে আমার পাশে এসে বসলো। ফিসফিস করে বললো, ‘আমি কিন্তু একা আসি নি। আদিব ভাইও এসেছে। বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে।’ তিয়াশার কথা শুনে চোখ কপালে উঠলো। ‘আদিব এসেছে? বাবা দেখেনি তো?’ ‘নাহ্ কেউ দেখে নি।’ ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াতেই দেখি রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোর নিচে দাঁড়িয়ে থাকা আদিবের মুখটা। চোখ ভিজে পানি নামলো। তিয়াশা মুঠোফোনটা এগিয়ে দিল। ‘তোমাকে ভীষণ সুন্দর লাগছে।’ কথাটা যেন বুকের ভেতরটার ক্ষতটাকে আরও বাড়িয়ে দিল। ‘আমাকে নিয়ে যেতে পারো না আদিব?’ ‘তুমি চলে এসো দয়া করে। আমি একা ভালো নেই।’
ডুকরে কেঁদে উঠলাম। তিয়াশা পাশ থেকে হাতটা চেপে ধরে সান্ত্বনার দৃষ্টিতে তাকালো। কান্না চেপে বললাম, ‘কাল খুব সকালে তুমি কি একটা গাড়ি নিয়ে আসতে পারবে?’ ‘অবশ্যই আমি তোমায় নিতে আসবো।’ মা চলে আসার ভয়ে তাড়াতাড়ি কথা শেষ করলাম। মনের ভেতর একটা প্রশান্তি অনুভব হচ্ছে এখন। একটু বাদে তিয়াশাও চলে গেল। আমি চুপচাপ বসে আছি। আদিবের কথা ভীষণ মনে পড়ছে। এ’কদিনে বেশ শুকিয়ে গিয়েছে। রাতে ঘুমোয় না নিশ্চয়ই। হয়তো গোপনে খুব কাঁদে। হাসি খুশি মুখটাতে হাসির চিহ্ন নেই একটুও। বাবা মায়ের চোখে আদিবের দোষ হলো আদিব বেকার। তার উপর মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। পড়াশোনা শেষ হয়েছে মাত্র, এ যুগে চাকুরি পাওয়া খুব কঠিন। আর সস্তা বেতনের চাকুরির কোনোই মূল্য নেই সমাজে। মায়ের কথা হলো, ‘আদিব কোনো দিক থেকেই আমাদের সঙ্গে যায় না। ওরকম একটা ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার প্রশ্নই আসে না।’
অথচ আমি ওই মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলের সঙ্গেই জীবনটা কাটিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছি। আমায় এই আড়ম্বর জীবন থেকে ওই মধ্যবিত্ত জীবনটাই বেশি আকর্ষণ করে, আমি ওখানেই সুখ খুঁজে পাই। আমি ওখানেই ভালো থাকবো, এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস। এই জাঁকজমকপূর্ণ জীবনে আমি কেবল প্রতিযোগিতা দেখেছি, প্রশান্তি খুঁজে পাইনি। শান্ত নিরিবিলি বট গাছের ছায়ায় বসে নদী দেখা হয় নি কখনও, মাথায় করে বয়ে বেড়ানো ঝালমুড়িওয়ালার কাছ থেকে কখনও ঝালমুড়িও খাওয়া হয় নি, শীতের সন্ধ্যায় রাস্তার পাশে বসে মাটির চুলোয় বানানো গরম গরম পিঠার স্বাদও গ্রহণ করা হয় নি। এরকম সুন্দর সব জিনিস থেকে বঞ্চিত হওয়া আমাকেই একজন দেখিয়েছে কিভাবে সাদামাটা জীবনযাত্রায় আনন্দ লুকিয়ে থাকে। শিখিয়েছ, ভালো থাকার জন্য খুব বেশি কিছুর দরকার পড়ে না। আমি সেই মানুষটার জন্যই আমার ভেতরে ভালোবাসা খুঁজে পেয়েছি।
আদিব আমার জীবনে একটা সেরা উপহার। যার কারণেই বিলাসী জীবন থেকে সরে গিয়ে আমি আমাকে আবিষ্কার করতে পেরেছি। সুখের সন্ধান পেয়েছি। আমার পছন্দের রঙ লাল আর আদিবের সাদা। আমার আর আদিবের মাঝে একটা মজার বিষয় সবসময় ঘটে। আমি যেদিনই লাল রঙের পোশাক পরতাম, আদিব কেবল সেদিনই সাদা রঙের জামা পরতো। অথচ আমরা কেউ জানতাম না, কে কি পরবো। এই বিষয়টা সবসময় আমাদেরকে অবাক করে দিত৷ আশে পাশের কেউ বিশ্বাসই করতেই চাইতো না যে এটা কাকতালীয়। বাড়ি জুড়ে বিয়ের আমেজ। মনটা ভীষণ বিষন্ন লাগছে। আদিবের কাছে পৌঁছাতে পারবো তো! দুশ্চিন্তা যেন কুঁড়ে খাচ্ছে আমায়। হঠাৎ দেখি চয়নসহ বেশ কয়েকজন বাড়িতে এসেছে। আজ তো তাদের আসার কথা নয়। মনের ভেতর কেমন যেন করে উঠলো।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছোট ফুফু এসে বললেন, ‘আয় তো মা তোর কক্ষে আয়। শাড়িটা বদলে নে তো।’ আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম, ‘শাড়ি বদলাতে হবে কেন?’ ‘চয়নের বাবা আর আত্মীয়েরা এসেছেন। কাজী সাহেবও এসেছে। দুই পরিবারে কথা হয়েছে, বিয়েটা আজ রাতেই হবে। অনুষ্ঠান আগামীকাল করা হবে।’ ফুফুর কথায় মাথায় আকাশ ভাঙ্গলো। বাবা হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত নিলেন কেন! কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। শাড়ি না বদলেই সোজা বাবার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। বাবা একাই ছিলেন কক্ষে। ‘তোমার সঙ্গে আমার কথা ছিল।’ বাবা নিশ্চুপ হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, ‘সমাজে আমার এই অবস্থান এক দিনে তৈরি হয় নি। এত দিনের অর্জিত সম্মানটা নষ্ট হয়ে যেতে পারে যে কোনো মুহূর্তে ছোটখাটো ভুলেই। আমি অবশ্যই চাইবো না কেউ আমার সম্মানে আঘাত হানুক। কেউ আমাকে হেয় করার সুযোগ পাক।’
এসব কথা আমায় কেন বলছেন তিনি! বাবার কথা বুঝে উঠতে না পেরে আমি চুপ করে তাকিয়ে রইলাম। বাবা নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘আদিব এসেছিল সন্ধ্যায়। তোমার দারোয়ান কাকা তাকে রাস্তায় দেখেছে। নিশ্চয়ই তুমিও দেখেছো। বাবা হিসেবে আমি তোমাকে কোনো ভুল করার সুযোগ দিতে পারি না। যাও প্রস্তুত হও।’ গাল বেয়ে পানি নামছে। নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করে চলছি। রাগত্ব কন্ঠে বললাম, ‘যদি বিয়ের পরে পালিয়ে যাই, আঁটকে রাখতে পারবে আমায়?’ বাবা চোখ লাল করে আমার গাল বরাবর হাত এনে থাপ্পড় দিতে গিয়েও থেমে গেলেন। কড়া গলায় বললেন, ‘সে সুযোগ নিশ্চয়ই তুমি পাবে না।’ আঁটকে রাখা সকল অনুভূতিরা এখন বাঁধ ভাঙ্গা স্রোতের মত ঝরে পড়ছে চোখ ভিজে। ভেতরটায় হাউমাউ করে কেঁদে উঠছে। চারিপাশে শূণ্যতারা ছেয়ে আছে। নিজেকে ভীষণ অসহায় মনে হচ্ছে। ফ্লোরে বসে পড়লাম। বাবার পা ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলাম। অনেক অনুরোধ করে বলতে লাগলাম, বিয়েটা আমি করবো না।
বাবা এক রোখা কন্ঠে বললেন, ‘এই বয়সে এরকম আবেগ সবার মনেই থাকে। যার তার সঙ্গে রঙ্গিন স্বপ্ন সবাই দেখলেও বাস্তবতা খুব কঠিন। তোমাকে আমি বোকামি করার সুযোগ অবশ্যই দিতে পারি না। এখন কষ্ট হবে খানিকটা, স্বাভাবিক। বিয়ের পরে কয়েকদিন গেলে দু’জনই সব ভুলে হাসিখুশি জীবনযাপন করবে।’ ‘এতটাই কি সহজ বাবা?’ রুক্ষ গলায় উত্তর দিলেন, ‘পৃথিবীতে কোনোকিছুই কঠিন নয়।’ বিয়েটা হয়ে গেল রাতেই। খুব সকালে আমি ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াই। রাস্তায় কেউ নেই, দারোয়ান কাকা গেটটা তালাবদ্ধ করে রেখেছেন৷ কাল রাত থেকে একনাগাড়ে কাঁদতে কাঁদতে এখন চোখে আর পানিও নেই৷ শুকিয়ে গিয়েছে সব। শুধু ভেতরটা ছটফট করে ওঠে খানিক পর পর, মনে হয় কেউ আমার সবটা ছিনিয়ে নিয়ে গেল। পুরো রাতে এক মুহুর্তের জন্য দু’চোখের পাতা বন্ধ করতে পারিনি। চোখ বন্ধ করলেই মনে হয়, কেউ বুঝি আমার সর্বস্ব নিয়ে পালিয়ে গেল। এই অনুভূতি ভাষায় বর্ননা করার মত নয়। নিজেকে এতটাই অসহায় মনে হয় যেন আমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই।
ভোরের আলোয় শহর ভরে গেল। সবাই যার যার মত ব্যস্ত হয়ে উঠলো নিজেদের কাজে। বাড়ি জুড়ে আয়োজন চলছে। আমাকে একা থাকার সুযোগ কেউ দিচ্ছে না। কারো না কারো চোখের দৃষ্টিতে আমি আঁটকে থাকি। মা এসে বললেন, ‘কিছু খেয়ে নে। রাত থেকে তো কিছুই খাস নি।’ শান্ত গলায় বললাম, ‘বাবাকে বলো ভালো দেখে দামী একটা বিষ ভর্তি কৌটা নিয়ে আসতে।’ মা চুপচাপ চলে গেলেন। আমি ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। বুঝে উঠতে পারছি না আদিব কেনইবা এলো না। যেতে পারবো না জানি, তবুও এলে শান্তি পেতাম। আজ হোক আর কাল হোক, আদিবের সঙ্গেই আমি ঠিক পালাবো। বাবার সম্মান তখন কোথায় রাখে আমি নিজ চোখে দেখতে চাই। কয়দিন আমাকে আঁটকে রাখে, আমিও দেখে ছাড়বো।
ভেতরটা খুব ছটফট করছে। অনুভূতিটা এমন যেন এই মুহুর্তে আদিবকে না দেখলে আমি মরে যাব। এত কষ্ট কখনও হয় নি। এ’কয়দিনেও এমন অস্থির লাগেনি। আজ হঠাৎ এমন লাগার কারণ আমি জানি না। বরযাত্রী চলে এসেছে। খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ হলেই কনে বিদায়ের পালা। তিয়াশাও আসে নি আজ। আর যাই হোক তিয়াশার আসার কথা, বাবা কি তবে ওকে আসতে বারণ করেছে! বুঝে উঠতে পারছি না কিছুই। একটুপরেই এবাড়ি থেকে চলে যেতে হবে। যাবার আগে একবার তিয়াশার সঙ্গে কথা বলা খুব প্রয়োজন। বাবা মা চোখের পানি মুছছেন বারবার, মেয়ে বিদায় হবে আজ। তাদের জন্য আমার চোখে পানি নেই একটুও, চোখ ভর্তি ঘৃণা জমে আছে।
হঠাৎ দেখি তিয়াশা এসেছে। সবাইকে উপেক্ষা করে আমি তিয়াশার হাত ধরে টেনে এনে ব্যালকনিতে দাঁড়ালাম।
ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে প্রশ্ন করলাম, ‘আদিব আসে নি?’ তিয়াশা চুপ রইলো। আমি আবার প্রশ্ন করলাম, ‘আসে নি কেন আদিব?’ তিয়াশা ভাঙ্গা গলায় বললো, ‘সে আসবে না।’ কথাটায় কেমন যেন একটা যন্ত্রণা খুঁজে পেলাম। কর্কশ গলায় বললাম, ‘আসবে না মানে? আমি কি শখ করে আহ্লাদে বিয়ে করেছি নাকি! বিয়ের আগে পালাতে পারিনি তো কি হয়েছে বিয়ের পরে পালাবো। তাই বলে রাগ করবে? এত বছর বসে এই ভালোবাসে আমাকে?’
তিয়াশা চোখ তুলে তাকায় আমার দিকে। চোখ বেয়ে পানি নামছে তিয়াশার। আমি কিছু বুঝে উঠতে পারছি না। ভেতরটাতে বারবার প্রশ্ন জাগছে, তিয়াশা কেন কাঁদছে? চোখ ভর্তি হাজারটা প্রশ্ন নিয়ে তিয়াশার গায়ে হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কি হয়েছে?’ তিয়াশা আমাকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। আমার ভেতরটাতে যন্ত্রণারা ছটফট করে উঠলো। চিৎকার দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কি হয়েছে তিয়াশা?’ কান্না জড়ানো কন্ঠে তিয়াশা বললো, ‘আদিব ভাই আর নেই। তিনি ঘুমের ঔষধ খেয়ে একেবারেই ঘুমিয়ে গিয়েছেন।’ বিশ্বাস করতেই ইচ্ছে হলো না। তিয়াশাকে ধাক্কা দিয়ে বুক থেকে সরিয়ে দিলাম। এমনটা আদিব করতেই পারে না। আমাকে আদিব ভালোবাসে, এভাবে আমার ক্ষতি করতে পারে না। আদিব ছাড়া আমি শূণ্য, আদিব জানে। এমনটা সে কখনোই করবে না।
‘তুই মিথ্যা বলছিস তিয়াশা।’ ‘আমি হাসপাতাল থেকে তোর এখানে এসেছি। তোর বাবাই আদিব ভাইয়ার পরিবারে তোর বিয়ের কথা জানায়।’ পায়ের তলার মাটিটা কেউ যেন টান মেরে সরিয়ে নিয়ে গেল। বুকের ভেতরটা ফেটে খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যাচ্ছে। চারপাশ অন্ধকারে ছেয়ে আসছে। বিষাক্ত যন্ত্রণারা আমাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। শরীরে যেন একটুও শক্তি নেই। ধপ করে বসে পড়লাম। তিয়াশা এসে শক্ত করে ধরলো আমায়। মুখের কথাও জড়িয়ে যাচ্ছে। তিয়াশার দিকে তাকিয়ে থেমে থেমে বললাম, ‘আমার এখন কি হবে?’ তিয়াশা শক্ত করে চেপে ধরে বললো, ‘কিচ্ছু হবে না, আমরা আছি তো সবাই। তুই একটু শক্ত হ দয়া করে।’ আমাকে একটু আদিবের কাছে নিয়ে যাবি?’
চোখের সামনে সব আবছা দেখছি। কথা বলতে ভীষণ কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তিয়াশা চিৎকার করে বাবা-মা’কে ডাকলো।
বিছানায় নিয়ে শোয়ানো হলো। বাবার দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘নিজ হাতে একটা খুন করলে তুমি বাবা। আমার বাবা এতটা নিষ্ঠুর, ভাবতেও ঘৃণা হয়। এখন সম্মানটা কোথায় রাখবে বাবা?’ নিশ্চুপ বাবার কাছে কোনো উত্তর নেই। এমন উত্তর বিহীন হাজার প্রশ্নেরা ভীড় জমিয়েছে মস্তিষ্কে।
বারবার যে কথাটা বেশি কষ্ট দেয় সেটা হলো, ‘তুমি আমায় এভাবে ছেড়ে গেলে কেন আদিব?’ ভাগ্যের কি পরিহাস, আমার পরনে লাল টকটকে শাড়ি আর আদিব ওদিকে ধবধবে সাদা কাফনে মোড়ানো। রঙের এই দুনিয়ায় এত রঙের মাঝে আদিব কেন সাদা পছন্দ করতে গেল! আদিব বলতো, ‘পুরো পৃথিবীটা সাদা, চোখ বন্ধ করলেই ঘোর কালো। পৃথিবীটা দিনশেষে সাদা কালোর।’ তখন মর্মার্থ না বুঝলেও এখন ভীষণ টের পাই। রঙ হারিয়ে আজ আমিও রঙহীন, ধূসর৷ পৃথিবীটা সত্যিই সাদা কালোর।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত