সৎ মা

সৎ মা
সৎ কথাটার অর্থ ন্যায়পরায়ন,সততা। কিন্তু সৎ কথাটার সাথে যদি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর “মা” শব্দটা যোগ করা হয় তাহলে পুরো অর্থটাই পাল্টে যায়! কি অদ্ভুত তাই না? ওহ্ সরি, আগে নিজের পরিচয় দিয়ে নেই তারপর বাকি সব বলবো।
আমি ঈশিতা। সবে ৮ম শ্রেনীতে উঠেছি। আমার বাবা কাঁচামালের ব্যবসা করেন। আমারা তিন ভাই বোন। আমিই সবার ছোট। আমার বড় দুইটি ভাই আছে। আমার মা নেই। একেবারে যে নেই এমনটাও নয়। আমার মা মারা যায়নি। তবে ৪-৫ বছর আগে আমার মা আমাদের তিন ভাই বোন আর আমার বাবাকে ছেড়ে তার ভালোবাসার মানুষটির হাত ধরে চলে গেছেন। বড় আম্মুর(চাচি) থেকে শুনেছি আমার মায়ের নাকি ছোট বেলায় বিয়ে হয়েছিল। আমার মা দেখতে নায়িকাদের মতো সুন্দর ছিল। ফর্সা, লম্বা,স্লিম, সুন্দর চেহারার অধিকারী ছিলেন। একদম পারফেক্ট ছিল।
ছোট বেলার সব কথা মনে না থাকলেও কিছু কথা মনে আছে আমার। আমরা তিন ভাই বোনই তখন ছোট ছিলাম, বিশেষ করে আমি। আমার বাবা তখন দেশের বাহিরে থাকতেন। মায়ের কোন জিনিসের অভাব রাখেনি বাবা। কিন্তু ভালোবাসার কাছে নাকি সব কিছু তুচ্ছ! তাই হয়তো আমাদের কথা না ভেবে চলে গেছে আমার মা। আমার বাবা দেশের বাইরে থাকা কালীন দুই দুই বার আমার মা আমাদের রেখে তার ভালোবাসার মানুষের কাছে চলে গিয়েছিল। কিন্তু আমার বাবা শুধু মাত্র আমাদের কথা ভেবে মাকে বুঝিয়ে ফিরিয়ে এনেছিল। সমাজ কি বলবে সেইসব না ভেবে মাকে মেনে নিয়েছিল। বাবা ফেরার আগে মা অনেক শপিং করেছিল। সাথে ভীষণ খুশিও ছিল। সবাই ভেবেছিল হয়তো মা এইবার শুধরে যাবে। মাঝে মাঝেই রাতের বেলা মা ছোট্ট আমিটাকে বউ সাজিয়ে দিতো। সাথে নিজেও অনেক সাজতো। তারপর আমাকে জড়িয়ে ধরে জোরে জোরে কান্না করতো। আমি ছোট ছিলাম বলে তখন এইসব বুঝতাম না! কিন্তু আজ বুঝি।
মা হয়তো দুটানার মাঝে ছিলেন! কাকে বেছে নিবেন এইটা বুঝতে না পেরে এভাবে কান্না করে নিজে নিজেই হালকা হতেন! আমার বাবা-চাচারা ৫ ভাই তিন বোন ছিলেন। বাড়ির সবাই মায়ের কান্নার আওয়াজ পেলেও কান্নার কারণটা বুঝতে পারতো না। মাকে দেখলে মনেই হতো না মায়ের তিন ছেলে মেয়ে আছে। তাই হয়তো মা যার জন্য আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন সে মায়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। বাড়ির সবার সাথেই মায়ের ঝগড়া হতো। মা কাউকে মানতেন না নিজের মতো চলতেন। বাবা আমাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে যতো টাকা পয়সা মায়ের কাছে পাঠাতেন মা সব তার মোবাইল আর তার ভালোবাসার মানুষের পেছনে খরচ করতেন। বাবা বাড়ি ফেরার ৭ দিনের দিন মা আমাদের ছেড়ে একেবারে চলে গিয়েছিল। মা তার বাবার বাড়ি যাবে বলে বেড়িয়েছিল বাবার সাথে। বাবা মাকে রেখে বাড়ি ফিরে এসেছিল কারণ মামাদের সাথে বাবার ঝগড়া হয়েছিল। তার ৩-৪ দিন পর পোস্ট অফিস থেকে মায়ের পাঠানো ডিভোর্স পেপার আসে। হয়তো আগে থেকেই ভেবে রাখা ছিল সব!
তখন আমি সবে ৩য় শ্রেনীতে উঠেছি। আগে কখনো মাকে ছেড়ে থাকিনি তো তাই একটু কষ্ট হতো। ছোট মানুষ বলে কাউকে কিছু বোঝাতেও পারতাম না। কিন্তু আমার চাচিরা সবাই এতো ভালো কি বলবো! মা চলে যাওয়ার পর আমার ছোট কাকি নিজের তিন ছেলে মেয়ের সাথে আমাদের তিন ভাই বোনকে আপন করে নিয়েছিলেন। আমার ছোট কাকাও দেশের বাইরে থাকতেন। মায়ের চলে যাওয়ার খবর পেয়ে তিনি আমাদের তিন ভাই বোনের জন্য প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা বরাদ্দ করেছিলেন। আমার মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে আমার বাবা দেশের বাইরে ছিল বলে মা অন্য কারো হাত ধরে চলে গেল,কই আমার কাকি তো এমন কিছু করেন নি!
সে আজো আমার কাকার সাথে ভালো আছে। তাহলে আমার মা কি আমার বাবার সাথে ভালো থাকতে পারতো না?! আমার মা কাকিকে কম অপমান করেননি। কিন্তু তবুও সে তার ফেলে যাওয়া ছেলে মেয়েদের জন্য এতোটা করেছেন। বড় আম্মু,মেজো আম্মু চাচি আম্মু কাকি সবাই এতো এতো আদর করতো যে সারাদিন মায়ের কথা মনেই হতো না! কিন্তু রাতে কেন জানি মায়ের কথা খুব মনে পড়তো। ভাইয়ারা বুঝতে শিখেছিল তাই ওরা মায়ের কথা শুনতেও চাইতো না। কিন্তু মায়ের আমাকে ছেড়ে চলে যাওয়াটা আমি মেনে নিতে পারিনি। রাতের পর রাত কান্না করতে করতে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। জ্বরের ঘোরে নাকি মা মা বলে কাঁদতাম। বালিশ ভিজিয়ে ফেলতাম কান্না করে আর চাচি আম্মু বালিশ উল্টে দিতো। আমি ছোট থাকায় বাবা আর ভাইয়াদের রান্না করে খাওয়া ভীষণ মুশকিল ছিল। চাচিরা আর কতো করবেন? সারা জীবন তো এভাবে চলতে পারে না।
তাই সবাই সিদ্ধান্ত নিয়ে বাবাকে আবারও বিয়ে করালেন। নতুন মা আমাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করতে পারে ভেবে বাড়ির কাছেই বিয়ে করানো হয়েছে বাবাকে। তারও আগে বিয়ে হয়েছিল, দুটো ছেলে মেয়ে আছে। সবাই ভেবেছিল নিজের সন্তান ছেড়ে থাকার কষ্ট তো সে বুঝতে পারে তাহলে নিশ্চয় আমাদের কষ্টটাও সে বুঝতে পেরে আমাদের আপন করে নিবে! বিয়ের হওয়ার কিছুদিন পর তাও এক বছরের মতো মায়ের জায়গাটা আমার নতুন মা দখল করেছিল। কিন্তু কথায় আছে না সবার কপালে সুখ সয় না! নতুন মা থেকে তিনি ধীরে ধীরে আমার সৎ মায়ে রুপান্তরিত হতে লাগলো। নতুন বিয়ে হওয়ার পর তিনি নিজের হাতে খাইয়ে দিতেন আর এখন ধারালো বটিতে মাছ মাংস সবজি কাটিয়ে আমার হাত ক্ষত বিক্ষত করেন। নতুন নতুন আমাকে মা বলে ডাকতেন আর এখন বিশ্রী ভাষায় সারাক্ষণ গালিগালাজ করেন। আমার বড় আম্মু ও কিন্তু আমার বড় আব্বুর ২য় স্ত্রী। আশ্চর্য জনক ভাবে আমার সৎ মায়ের নামটা আর বড় আম্মুর নামটাও একই। একি বাড়িতে দুটো সৎ মা! কি আশ্চর্য বিষয় তাই না!?
বড় আব্বুর প্রথম পক্ষের স্ত্রী মারা যাওয়ার পর আবার বিয়ে করেছেন তিনি। প্রথম পক্ষের দুই মেয়ে আর দ্বিতীয় পক্ষের দুই মেয়ে দুই ছেলে। আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে কাউকে কখনো বলতে শুনিনি যে বড় আম্মু আয়শা আর আলেয়া আপুর সৎ মা! আয়শা আর আলেয়া আপুকে কখনো বড় আম্মুর বিরুদ্ধে কথা বলতে দেখিনি। আয়েশা আপুর ৪ মেয়ে ২ ছেলে। বড় মেয়ের বিয়েও দিয়েছে। আর আলেয়া আপুর ২ মেয়ে। দুই বোনের একই বাড়িতে আপন দুই ভাইয়ের সাথে বিয়ে হয়েছে। মানে বোনে বোনে জা হয়েছে। তারা নিজেদের মেয়ে বিয়ে দিয়ে শ্বাশুড়ি হয়ে গেছে অথচ এখনো আমাদের বাড়িতে এলে তাদের আদরের কমতি নেই। বড় আম্মুর নিজের মেয়ে শ্বশুর বাড়ী থেকে এলেও মনে হয় আয়েশা আর আলেয়া আপুদের মতো যত্ন করে না। একবার আয়েশা আপু আর আলেয়া আপু আমাদের বাড়ি থেকে ঘুরে যাওয়ার পর আমরা সব চাচাতো ভাই বোন মিলে বড় আম্মুকে বলেছিলাম সে কেন নিজের মেয়ের থেকে ওদের বেশি আদর করে?
তার স্পষ্ট জবাব সৎ মা শব্দটা ওদের মনে যেন দাগ কেটে না বসে সেইজন্য। তার কথা নিজের ছেলে মেয়েরা তো ছোট থেকেই বাবা মা দুজনকেই পেয়েছে কিন্তু ওরা তো পায়নি। মাকে হারিয়ে কেঁদেছে ওরা কিন্তু সৃষ্টিকর্তার দয়ায় আমার সন্তানদের তা করতে হয়নি। তাহলে ওদের একটু বেশি ভালোবাসলে ক্ষতির কিছু তো নেই। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে বিষয়টি একদমই উল্টো। মাঝে মাঝে ভাবি একই বাড়িতে দুজন সৎ মা, তাদের নামটাও একই। অথচ তাদের চিন্তা ধারা কতো আলাদা! আমার মা যাবার আগে আমার দুই ভাইকে শুধু বলেছিল তোদের বোনকে দেখে রাখবি, কষ্ট পেতে দিবি না কখনো। শুনতে সিনেমার মতো হলেও আমার ভায়েরা আমার জন্য সব করতে প্রস্তুত। আমার ভাই দুটো বড্ড রাগী। বড় ভাইয়ের সহজে রাগ উঠে না কিন্তু ছোট ভাইয়া একটুতেই রেগে যায়।
আমার সৎ মা সবসময় আমাদের মাকে নিয়ে কথা শোনায়। বড় ভাইয়া একটু ভোজন রসিক বলে উঠতে বসতে কথা শোনায় তাকে। বড় ভাইয়া ইন্টার ২য় বর্ষের ছাত্র আর ছোট ভাইয়া এইবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। আমাদের তিন ভাই বোন কে দেখলে নাকি দেখতেই ইচ্ছে করে সবাই বলে এমনটা। মায়ের মতই সুন্দর হয়েছি আমরা। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে এই সৌন্দর্যের কদরই নেই। কোচিং ক্লাসে যেতে হয় সকাল ৬টা থেকে। বড় আম্মুকে দেখতাম রাইসার জন্য সকাল বেলা রান্না করে ওকে খাইয়ে দুপুরের জন্য আবার টিফিন দিয়ে দিতো। কিন্তু আমাকে ভোর সাড়ে চারটার সময় উঠতে হয়। বাসি থালা-বাসন ধুয়ে-মেজে রান্না করে খাওয়ার সময় পাই না। তাই টিফিন নিয়ে যাই পরে খাওয়ার জন্য। মাঝে মাঝে যখন খুব খারাপ লাগে তখন রান্না না করে এমনি চলে যাই। অবশ্য বাড়ি ফিরে এর জন্য কথা শুনতে হয় কিন্তু কিছু করার থাকে না আমার। মাঝে মাঝে ভাইয়ারা আমার জন্য টিফিন নিয়ে দিয়ে আসে।
বড় ভাইয়াকে একবার মা জিজ্ঞেস করেছিল পড়াশোনা তো লাটে উঠেছে ভবিষ্যতে করবিটা কি? ভাইয়া হাসতে হাসতে বলেছিল কবি হতে পারলে বেশ হতো। অনন্ত কবিতার মাঝে সৎ মায়ের আদরের বর্ননাটা তো সবাইকে জানাতে পারতাম। সেদিন মায়ের সাথে ঝগড়া হয়েছিল ভাইয়ার। একদিন মা আমাকে বলেছিল আমি নাকি বাবার মেয়ে না! বলেছে কার না কার মেয়ে আমার তো সন্দেহ হয় তোরা আধো তোর বাবার সন্তান কিনা! তোর মায়ের যা স্বভাব কার না কার সন্তান! সেদিন মা যা যা বলেছিল তারপর আমি আর চুপ থাকতে পারিনি। মাকে চুপ করতে বলায় সেদিন প্রথম আমার গায়ে হাত তুলেছিল। বাড়িতে ভাইয়ারা ছিল না। বাড়ির সবাই দৌড়ে এসে মায়ের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল। ভাইয়ার কাছে খবর যেতেই ছুটে এসেছিল। আমার ভাইয়ারা খুব ভালো কিন্তু কেউ আমার উপর অত্যাচার করলে তাদের থেকে খারাপ আর কেউ নেই। ছোট ভাইয়া ভীষণ রাগী।
তবুও ছোট ভাইয়া মাথা ঠান্ডা রেখে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল কি হয়েছে। আমি বলতে পারিনি,কান্নায় ভেঙে পড়েছিলাম। আমার গালের আঙ্গুলের ছাপ আড়াল করতে পারিনি। সেদিন ভাইয়া সবার বাঁধা অমান্য করে মাকে মারতে গিয়েছিল। মা তখন সবার সামনে আবারও আমাদের জারজ সন্তান বলেছিল। সেখানে তখন বাবাও ছিল। মায়ের কথাটা শুনে যতোটা না খারাপ লেগেছিল তার থেকে বেশি খারাপ লেগেছিল বাবার চুপ করে থাকাতে। বাবা একটি বারের জন্য প্রতিবাদ করেনি। বরং ছোট ভাইয়াকে ভীষণ মেরেছিল মাকে মারতে গিয়েছিল বলে। আমাদের স্কুলের বেতন দিতে চাইতো না বাবা। বাধ্য হয়ে ছোট ভাইয়া ছোট খাটো একটা চাকরি নেয়। ক্লাস ৯ এ ভাইয়া চাকরি করে আমার আর বড় ভাইয়ার খরচ দিতো। তারপর বড় ভাইয়াও আস্তে আস্তে অনলাইনে জব করতে শুরু করে।
ছোট ঈদের আগে বাবাকে বলেছিলাম আমাকে ঈদের জামা কিনে দিবে না? বাবা কিছু বলার আগেই মা বলেছিল ওকে একটা জামা কিনে দিলে আমাকে দুইটা দিতে হবে। কিছুই বলিনি শুধু হেসেছিলাম। বাবা আমার হাতে ৫০০ টাকা দিয়েছিল বদলে মায়ের জন্য দুটো থ্রি-পিজ আনতে হয়েছিল। এই যুগে ৫০০ টাকায় কি পাওয়া যায় বলতে পারেন? এমনিতেও তো ভাইয়ারা বাবার টাকা নেয় না শুধু খাওয়া খরচ ছাড়া। তাদের দাবি তাদের কিছু লাগবে না শুধু তাদের বোনের যেন কষ্ট না হয়।
বাড়ির সবাই দামি জামা কিনেছে আর আমার জন্য ৫০০ টাকা বরাদ্দ বলে মনটা ভীষণ খারাপ ছিল। হয়তো ভাইয়ারা বুঝতে পেরেছিল। তাই তো দুই ভাই ১২০ টাকা করে দুটো টি-শার্ট কিনে বাড়ির সবার থেকে বেশি টাকায় আমাকে শপিং করিয়েছিল। অবশ্য বাবা আর মায়ের জন্যও কাপড় কিনে দিয়েছিল। বড় ভাইয়া মিষ্টি জিনিস ভীষণ ভালোবাসে। কিন্তু আমাদের জন্য তো এক প্রিজ করেই বরাদ্দ ছিল। আমি আর ছোট ভাইয়া আমাদের ভাগের টুকু বড় ভাইয়াকে দিয়েছিলাম। আমি মাকে না বলে আবার এক প্রিজ সেমাই নিয়ে ভাইয়াকে দিয়েছিলাম বলে আমাকে চুর বলে চড় মেরেছিল। সেদিনও ভাইয়া মাকে মারতে গিয়েছিল আর বাবা উল্টো ভাইয়াকে মেরেছিল। দুই ভাই রাগ করে সারাদিন বাড়ি আসেনি। হয়তো আমার কথা ভেবে রাতে বাড়ি ফিরেছিল।
বাড়িতে পড়ার জন্য জামা নেই আমার। যে দুটো জামা বাড়িতে পড়ি তাতে শরীরের প্রতিটি অঙ্গ বোঝা যায়। এই গরমে মোটা কাপড়ের ওড়না জড়িয়ে থাকি সারাদিন। আজকাল মেয়েরা টি-শার্ট পড়ে ফ্যাশনের জন্য। কিন্তু আমি টি-শার্ট পড়ি ভাইয়ার টাকা বাঁচানোর জন্য। আমার জন্য আলাদা টি-শার্ট কিনতে হয় না ভাইয়াদের গুলোই পড়ি। জামা বানাতে গেলে কাপড় কিনতে হবে আবার দর্জির মুজুরি দিতে হবে। কিন্তু এতো টাকা কোথায়? স্কুলে যাওয়ার সময় দুই ভাইয়া ডেকে নিয়ে ১০ টাকা করে দিতো। টিফিনে ১০ টাকা খরচ করে বাকি ১০ টাকা জমিয়ে রাখতাম। সেদিন খেতে বসেছিলাম তিন ভাই বোন মিলে। ভাতের চামিচ থেকে ভাতটা ভালো করে না ছাড়িয়ে রেখেছিলাম। এইটা দেখে মা আমার ভাতের থালা টা সামনে থেকে নিয়ে ফেলে দিয়েছিল। সারাদিন আর খেতে দেয়নি কাউকে। দুই ভাই নিজেরা না খেয়ে আমাকে খাইয়েছিল আর বাকিটা রেখে দিয়েছিল যাতে পড়ে খেতে পারি। কিছুদিন আগে মাকে বলেছিলাম মা, তোমারও তো একটা মেয়ে আছে আমার বয়সি।
আমার মাঝে কখনো তাকে দেখতে পাও না? মা বলেছিল তোদের মতো পরিচয়হীন ছেলে মেয়ের সাথে আমার ছেলে মেয়ের তুলনা হয়না। চুপ না থেকে বলেছিলাম আমরা পরিচয়হীন না। আমার বাবা তোমার বর্তমান স্বামী। মা আমার গলা টিপে ধরেছিল। এতো জোরে ধরেছিল যে শব্দ করে কাউকে ডাকতে পর্যন্ত পারিনি। শুধু চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল আর ছটফট করছিলাম। ভাগ্যে মরন ছিল না তাই ছোট ভাইয়া এসে পড়েছিল। আমার এমন অবস্থা দেখে ভাইয়া আর নিজেকে সংযত রাখতে পারেনি। ভাইয়া সেদিন প্রথম মাকে মেরেছিল ঠিক যেভাবে আমার গলা টিপে ধরেছিল ঐ একই ভাবে। মা এই বিষয়টা নিয়ে সবার কাছে বিচার চেয়েছিল। বাবা গ্রামের মাতব্বরদের ডেকে বিচার করতে বলেছিল। ভাইয়া আমাকে বিচার সভায় নিয়ে গিয়ে সবাইকে দেখিয়েছিল আমার গলার দাগটা। গলার অনেক জায়গায় চামড়া উঠে এসেছিল আমার। বিচার যখন আমাদের পক্ষেই হলো তখন মা কান্না কাটি করে আবার আমাদের দোষারোপ করলো।
সেদিন বাবা আমাকে ঘুম থেকে তুলে বললো আজ থেকে যেন বাড়ির সব কাজ আমিই করি। না হলে আমাদের আর খেতে দিবে না। সারাদিন কাজ করে ভাইয়াদের মোটা মোটা প্যান্ট ধুয়ে দিতে আমার কষ্ট হবে বলে ভাইয়ারা নিজেদের কাপড় নিজেরাই ধুয়ে নিতো। কিন্তু আমার সেই মা তার নিজের সব কাপড় আর বাবার কাপড় আমাকে দিয়েই ধুইয়ে নেয়। একটু ভালো কিছু রান্না হলে এক পাতিল ঝোল দিয়ে রাখে। যাতে আমরা কম খাই। যেদিন একটু ভালো করে রান্না করতো সেদিন তার নিজের ভাই-ভাবি আর তাদের ছেলে মেয়েদের ডেকে খাওয়াতো আবার সাথে দিয়েও দিতো। আর আমাদের খাওয়ার সময় তরকারি থাকতো না। তখন বড় আম্মু তরকারি দিতো।
এখন আর আমাদের হয়ে বাড়ির লোক ঝগড়া করে না। কারণ বাবা তাদের বাজে বাজে কথা শোনায়। বাবা বলে দিয়েছে আমাদের সাথে কি করবে না করবে তা নিয়ে যেন কেউ কথা বলতে না আসে। সেদিন কাকি বিরিয়ানি রান্না করে আমাদের তিন ভাই বোনকে পেট ভরে খাইয়েছে। বিশ্বাস করেন ফুঁপিয়ে কেঁদেছি আর খেয়েছি। কারণ সেদিন মা বিরিয়ানি রান্না করে আমাদের খেতে দেয়নি। বিরিয়ানি আমার খুব পছন্দ। রুম থেকে সুভাস পাচ্ছিলাম কিন্তু খেতে পারিনি। হয়তো কেউ কাকিকে বলেছিল। কাকি একটু ভালো কিছু রান্না করলেই চুপিচুপি ভাইয়াদের ডেকে খাইয়ে দেয় আর আমার জন্য পাঠিয়ে দেয়। কাকি এখন আমাদের বাড়িতে থাকে না আলাদা বাড়ি করেছে। কিন্তু তিনি যা করেন নিজের বাবাও করে না। সেদিন ছোট ভাইয়া কাকিকে বলেছিল কাকি একটু চিড়ে মেখে খাওয়াবে? অনেক দিন খাইনি! কাকি আমাকে যেতে বলেছিল। গিয়ে যে ভাইয়ার এমন কথা শুনবো ভাবিনি। কাকি কাঁদতে কাঁদতে চিড়ে মেখেছিল।
মাঝে মাঝে এতো খারাপ লাগে মনে হয় জন্মের সময় মরে গেলে বেঁচে যেতাম। যাদের মা মরে যায় তারা তো তাও মায়ের কবরের পাশে গিয়ে কাঁদতে পারে। কিন্তু আমরা কোথায় গিয়ে কাঁদবো? আল্লাহ তায়ালা এমন একজন মা দিয়েছেন যিনি নিজের সন্তান ছেড়ে অন্য কারো সাথে চলে গেছে। সে তো ভালোই আছে শুধু আমাদের জীবনে সৎ মা শব্দটা এনে দিয়ে গেছে। আজ মা থেকেও নেই, বাবা থেকেও নেই। আমরা ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করতে পারিনা কারন আমাদের বর্তমানই তো অনিশ্চিত। পৃথিবীতে যে মা না থাকলে কেউ থাকে না সেইটা প্রতিদিন বুঝতে পারি আমরা। আমাদের মা যেমনই হোক অন্তত আমাদের ভালো তো বাসতো। কিন্তু আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি এমন মা যেন কারো না হয়। যে মা আমাদের সুখ ছিনিয়ে নিয়ে নিজের সুখ বেছে নেয় তাকে মা বলতেও কষ্ট হয় আমার। কিন্তু কি করবো নারির টান বলে কথা! তার নামে খারাপ কথা শুনলে ঠিক থাকতে পারি না। সারাদিন হাঁসি মুখে থাকলেও রাতে আর ঠিক থাকতে পারিনা। চোখের পানিতে বালিশ ভিজিয়ে ফেলি। বারবার বালিশ উল্টাতে উল্টাতে ঘুমিয়ে যাই প্রতিদিন।
যে গালে মায়ের আদর থাকার কথা সে গালে সৎ মায়ের চড় পড়ে। মাঝে মাঝে নিজের জীবন দেখে নিজেরই হাসি পায়। যখন কষ্ট গুলো চেপে রাখা কঠিন হয়ে যায়! মনে হয় এবার বুঝি মরে যাবো এইসব সহ্য করতে না পেরে তখন তিন ভাই বোন মিলে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কান্না করি। শান্তনা দেওয়ার মতো কেউ নাই বা থাকলো, ভাইয়ের বুকে কান্না করে হালকা হতে তো পারি! অনেকের ভাগ্যে হয়তো এইটুকুও নেই। জীবনটা কতোটা কঠিন সেইটা আমি বুঝতে পারি। মন চাইলেই কারো কাছে বায়না করতে পারিনা। যখন কাউকে দেখি তার বাবাকে জড়িয়ে ধরতে সাথে সাথেই চলে আসি। কারণ বলা তো যায় না যদি লোভ জেগে যায়! কাকি এখনো তার বড় মেয়েকে জোর করে খাইয়ে দেয়। মেহেরা আপু ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে তবুও তাকে এখনো খাইয়ে না দিলে নিজে থেকে খেতে যায় না আপু। যখন আপু ভীষণ রাগ করে কাকা বুঝিয়ে নিজের হাতে তুলে খাওয়ায়। অথচ আমি আপুর থেকে ছোট হয়েও এইসব থেকে বঞ্চিত!
কি দোষ আমার? কেন এভাবে আমার ছেলে বেলাটা অবহেলা আর লাঞ্ছনায় কেটে গেল? কেন কষ্ট হলেও কাউকে বলার অধিকার নেই আমার? আমি কি ভীষণ অন্যায় কিছু করিছি? যদি অন্যায় করেই থাকি তার জন্য এতো বড় শাস্তি? আমি তো ছোট মানুষ এতো কষ্ট যে সহ্য হয়না আমার! সৃষ্টিকর্তা কি বুঝতে পারে না আমার কষ্ট? কেন সে আমাকে এমন একটা জীবন দিয়ে পাঠালো কেন? কেন আমর কষ্ট গুলো গলা অব্দি আটকে থাকে? কেন আমর কষ্ট গুলো চোখে জল হয়ে গড়িয়ে পড়ার সুযোগটাও পায় না? মনের মধ্যে হাজারটা প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও কেন কাউকে প্রশ্ন করার সুযোগ নেই আমার? কেন আমার ভাই দুটো এতোটা অসহায়ের মত ঘুরে বেড়ায়? কেন আমাদের তিনটি জীবন এতোটা বেদনাময়? কেন কখনো একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারি না আমরা? কেন? কেন? কেন? জানি উত্তর আসবে না! কারণ আমাদের জীবনটাই একটা গোলক ধাঁধা হয়ে গেছে!
এখন আর আগের মত অল্পতেই চোখে পানি আসে না। হয়তো শুকিয়ে গেছে! কিন্তু কষ্ট গুলো কমেনি বরং বেড়েছে। শুধু চেপে রাখার কৌশলটা আয়ত্ত হয়ে গেছে! হয়তো সারাজীবন এইভাবেই কাটবে আবার হয়তো ভুল করে সুখের ছোঁয়া আসবে আমাদের জীবনে! লোকে বলে কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে! কে বলতে পারে যদি কেষ্ট মিলেই যায়! অপেক্ষায় থাকবো সেই দিনের আর নিজের মতো চেষ্টা করবো এগিয়ে যাওয়ার। আল্লাহ তায়ালা যেমন বলেছেন আমাদের সকলের তাকদির তাঁর দ্বারা নির্ধারিত ঠিক একই ভাবে এটাও বলেছেন যে আমি ততোক্ষণ পর্যন্ত বান্দার ভাগ্য পরিবর্তন করিনা যতোক্ষন পর্যন্ত বান্দা নি়জে চেষ্টা না করে। তাই আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছি। নিশ্চয় তিনি আমাদের জন্য ভালো কিছু রেখেছেন!

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত