সোনালি দিন

সোনালি দিন
-স্কুলের, কলেজের বান্ধবীরা সব কেমন আছে? এই প্রশ্নটা যেন নিজেকে করা হলো। কিন্তু করেছে এক মেয়ে। যে আমাকে বাজারে দেখলো আজ।
-আরে আপু তুমি না স্কুলে ফার্স্ট গার্ল ছিলে। আমার আইডেল ছিলে তুমি। আমি মেয়েটার দিকে তাকালাম। না, ওকে আমি চিনতে পারছি না। হয়ত স্কুলে ফ্রক পড়ে দেখা ছোট কোন মেয়েকে, ভারী শরীরের শাড়ি পড়া অবস্তায় যে কেউ ভাবতে পারে না সে কে ছিল। ওর সাথে টুকটাক কথা হলো। ওর বোন আমার ক্লাসমেট ছিলো। আমি ওদের বাসায় ও যেতাম। বেশ খাতির পেতাম। আমার মনে আছে ওর বোন তমাকে ছাড়া আমি বেঞ্চে বসতাম না। আর কাউকে কোনদিন বসতে দিতাম না। আজ আমি জানিও না সে কোথায় থাকে? বাসায় এসে বসলাম। বাচ্চা গুলো বলে যাচ্ছে তারা নাগেটস খাবে। আমি ফ্রিজ খুলে বের করে সব বানিয়ে দিলাম। আজ সব পুড়ে যাচ্ছে। একটু আনমনা তাই। মাথায় ঘুরে যাচ্ছে আমি মনে করতে পারছি না স্কুলের সব মেয়েদের নাম। তখন অন্য ক্লাসের মেয়েদের নাম ঠিকানাও ছিলো মুখস্ত।
চোখের সামনে ভেসে উঠছে। স্কুলের ঘন্টা পড়েছে। সবাই দাড়াচ্ছি জাতীয় সংগীতের জন্য। যারা শপদ বাক্য পড়াতো তাদের তখন আলাদা একটা ভাব ছিলো। এলোমেলো ক্লাস রুম। ফার্স্ট বেঞ্চের স্টুডেন্ট দের পারফেক্ট হোম ওয়ার্ক। ক্লাসের ফাঁকে আচার প্যাকেট চালাচালি। স্যারের এক কথায় পুরো ক্লাসের লুটোপুটি। যে সব মেয়ে ক্লাসের পড়া শিখে আসতো আর যে সব ক্লাসে দাঁড়িয়ে থাকতো তার সাথে টিফিনের সময় ভাগাভাগি করে খেতে কারো মনে সত্যিই কিছু ছিলো না। বান্ধবীরা ছাড়া যেন জীবন ভাবা যেতো না। কিন্তু কি সুন্দর বান্ধবীদের কোন ভাবনা ছাড়ায় চলছে জীবন। কারো মনে নেই কারো কথা। প্রশ্ন গুলো ঘুরছে মাথায়। আচ্ছা যে আপুটা বির্তকে সব সময় ফার্স্ট হতো সে কি এখনো এমন তর্ক করতে পারে? নাকি ধনী শশুড়বাড়িতে তার তর্ক শুধু বেহায়াপনা?
সে মেয়েটা কি এখনো তেমন সারাদিন চুল খোলা রাখে? নাকি ডেলিভারির পর সব ঝড়ে গিয়ে বেসিনে জমা হয়েছে?
ক্লাসের তুমুল দুষ্টমি করা মেয়েটা কি এখনো দুষ্টের শিরোমণি? নাকি সে সব কি এখন মানায় বলে এক থাপ্পড়ের বাচ্চার দুষ্টমি সামলায় সে? ঔ যে সেজেগুজে আসতো রোজ, আমরা ভাবতাম এত সময় পায় কি করে সে। সে কি এখনো সাজে? নাকি চোখের নিচের জমা কালিতে চাপা পড়েছে সব? আমাদের বান্ধবীদের মধ্য নিপা। যে সব কিছু পারফেক্ট করে আনতো। বক্তব্য মুখস্ত জোর গলায় বলার জন্য প্রতি অনুষ্টানে ডাক পেতো। শুনেছি তা নাকি আর পড়ালেখায় হয় নি। শশুড়বাড়ি গিয়ে একটু জোর গলায় আওয়াজ বের হয় নি তার। ভ সে রোগা পটকা বান্ধবী কি এখনো ফু দিলে উড়ে যাবে? নাকি ডায়েট করেও না শুকাতে পেরে ভয়াবহ ডিপ্রেশনে আছে? সায়েন্সে ফুল মার্কস পাওয়া সে অহংকারী মেয়েটা কি ডাক্তার হয়েছে? শুনেছি কোন একটা কলেজে ডিগ্রি পড়ছে সে।
আচ্ছা খুব তারাতাড়ি একাউন্টিং এর ম্যাথ করে যে অন্য বান্ধবীদের বুঝাতো আমার মতো। সে কি ব্যাংকার হয়েছে এখন? নাকি মাসের বাজারের হিসাব মিলাতে ক্যালকুলেটারের বিদ্যা কাজে লাগায় সে আমার মতো?
আচ্ছা খুব শীতেও যখন স্কুলের ড্রেস পড়ে ঘুম ঘুম চোখে উপপাদ্য করতাম প্রথম ক্লাসে কোথায় ব্যাবহার করছি সে চিত্র? সকালে প্রাইভেট তারপর স্কুল তারপর কোচিং করেছি সারাদিন দুইটা সিঙ্গারা খেয়ে। এখন দিনে ছয় বেলা খেয়ে কি মনে আছে? A for apple আর B for ball কে সুর করে পড়ার জন্যই কি রাতের দুইটা অবধি জেগে পড়তাম? মুখস্ত করতাম ইংরেজির লেটার, প্যারাগ্রাপ? ইতিহাসের সাল গুলো? নাকি বীজগণিতের খুব সহজে মিলে যাওয়া উৎপাদক গুলো? অর্নাসে সকাল সাত টায় প্রাইভেট তাই সাড়ে পাঁচ টায় উঠে রওনা দেওয়া বান্ধবী জয়া নাকি এখন উঠে আট টায়। বাচ্চা নিয়ে ঘুমাতে পারে না। কি অদ্ভুত না? কলেজের সে মেয়েটা যার বান্ধবী হতে পেরে সবাই নিজেকে ধন্য ভাবতো সে বান্ধবী নাকি চাকরি করে। সেদিন দেখলাম সে চাকরি ছেড়ে দিয়েছে কি দরকার গাড়ি বাড়ি সব আছে।
কলেজের শেষ দিন যার পিঠে লিখেছিলাম, জানি তুই আর্স্টিট হবি। সে কি রান্না ঘর থেকে বের হয়ে এক গাদা রং নিয়ে বসার সুযোগ পায়? যে মেয়ে বিয়ে করবে না মা বাবা ছেড়ে যাবে না। চাকরী করে বাবা মা দেখবে বলতো সে মেয়েটা কি এখনো অমন কঠিন আছে? নাকি বয়স হয়ে গেছে এখনো বিয়ে হয় নি বলে তার মা বাবাও কথা শুনাতে ছাড়ে নি আজকাল? সে কলেজে কাদুনে মেয়েটি এখনো কেউ ক্লাসে ফেলে গেলে কান্না করে? শুনেছি শত অবহেলাও সে স্বামীর ঘর ছাড়ে নি। কঠিন কঠিন ম্যাথ গুলো মিলাতে না পেরে কান্না করে দেওয়া মেয়েটি নাকি এখন বাচ্চার কান্না সামলাতে না পেরে কিংবা একবেলা খাওয়াতে না পারলে কান্না করে।
সে মেয়েটা যার জন্য পুরো ক্লাস টা মেতে থাকতো। সারাক্ষন হাসতো। যাকে চিমটি দিয়েও কান্না করাতে পারতাম না। সে কি এখনো প্রান খুলে হাহাহা করে হাসে? নাকি আজ সে একটা মানুষের সামান্য অবহেলায় হু হু করে কাঁদে?
কেমন আছে স্কুল কলেজের বান্ধবীরা? তাদের ও কি ইচ্ছে হয় কড়া রোদে ভ্যাপসা গরমেও আবার ক্লাস করতে? কথায় কথায় হেসে লুটোপুটি খেতে? দুইটা বেনি দুপাশে ঝুলিয়ে ব্যাগ নিয়ে এলোমেলো পা ফেলে রাস্তা দিয়ে হেটে যেতে? বইয়ের পাতায় কারো নামের প্রথম অক্ষরের সাথে নিজের নাম জুড়ে এলোমেলো ছবি আকঁতে। কেমন আছে স্কুল কলেজের বান্ধবীরা?

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত