শ্যাম তনয়া

শ্যাম তনয়া
আজ ৮ বছর হলো রুদ্রকে ছেড়ে এসেছি। না, সে আমাকে ছেড়েছে। আমার দোষ একটাই আমি কালো। কালো মেয়েদের চিন্তাভাবনা ছায়াও কালো হয়। তাদের মুখে মায়া থাকে না। হাসিতে মুক্ত ঝরে না। তাদের নাকের বিন্দু বিন্দু ঘামে কারো মনে ঝড় তুলে না। কিন্তু কোন এক অজানা কারণে এই রুদ্রের সাথে আমার প্রেম হয়েছিল। হয়ত সে আমায় প্রেমে ফেলেছিলো। আমি জানতাম আমি কালো। কিন্তু আমাদের বাসার সবাই ফর্সা। বাবা কালো। কিন্তু বোনেরা কখনো আমাকে সেটা বুঝতে না দিলেও অন্যরা সে সুযোগ কেন ছাড়বে? বাসায় এসেছে অথচ বলে যায় নি,
-এই মেয়েটা একটু বেশিই কালো বাবার মতো তাই না?
মায়ের বাবার গায়ের রং নিয়ে কোন সমস্যা ছিলো না। কিন্তু অন্যরা যখন বলতো মাকে কখনো প্রতিবাদ করতে দেখি নি। উলটা প্রসংশা পেতেন যে উনার আসলে কোন সমস্যা নিয়ে। কত ভালো মনের মানুষ। ব্যাপারটা মা খুব উপভোগ করতো। আমি মাকে কখনো খারাপ ভাবি নি বা মা আমাদের কখনো অযত্ন করে নি। কিন্তু এই ব্যাপারটা আর কারো চোখে পড়তো না। আমার গায়ের রং ফর্সা করতে মা চেষ্টা করতো আমাকে তাই যথেষ্ট ভালো পোশাক পড়ানো হতো যা আমার সাথে মিলতো। ভালো রুচিবোধ গড়ে দিয়েছিল মা। স্কুলে অনেক ভালো বন্ধু ছিলো। কলেজেও সবাই আমার ব্যবহারে আমাকে ভালোবাসতো। কিন্তু ফর্সা না হওয়া আমার অপরাধ। তাই প্রায় অপমানিত হয়েছি। এক বান্ধবীর বাসায় গিয়েছিলাম। ওর বোন প্রেগন্যান্ট ছিলো। আমি জানতাম না। ওনার সামনে বসেই গল্প করছিলাম। তখন তার দাদী এসে তুলে নিয়ে যায়। বলে,
– এইটা কি মেয়ের সাথে গল্প করছিস তেইল্লে কালি। বাচ্চাও হবে তখন এমন।
আমি আর কখনো কোন বান্ধবীর বাসায় যায় নি। বাবা বুয়েট থেকে পাশ করা ইঞ্জিনিয়ার। বেশ নাম ডাক আছে৷ অনেকে আমাদের বাসায় আসে আমার মা কে দেখতে, মা সে ব্যাপারটা খুব উপভোগ করতো। বড় বোনের ইরা খুব ভালো ভাবেই বিয়ে হয়। সাজানো যখন হলো তখন একদম পরীর মতো লেগেছিলো। আমি মেঝ মেয়ে মিরা আমার উপর সাজ তেমন ফুটে না। আমার ছোট বোন সীমা কেও পরীর মতো লেগেছিলো তাই আপুর দেবরের পাগলামীতে ওকেও ছয় মাস না যেতেই বিয়ে দিতে হলো সবে ইন্টার পাশ করার পর।
আমি রয়ে গেলাম। বাবা মায়ের কোন সমস্যা নেই। কিন্তু অন্যরা তা কেন মানবে? অবশ্যই তারা বলবে আমি কালো আমার অপরাধ। ভর্তি পরীক্ষার সময় কোচিং এ পড়ার সময় আমার রুদ্রের সাথে দেখা হয়েছিলো। প্রায় আমার পাশে এসে বসতো। অনেক ছেলে ফেন্ড ছিলো কিন্তু এইভাবে কেউ দেখতো না। ওর কথায় জাদু ছিলো। আমি আমার পড়ালেখা না করে ওর সাথে ঘুড়তাম। অদ্ভুত ভাবে ভালোবেসে ফেলি। তার অবদার ও মিটিয়ে ফেলি। যার কাছে আমার কালো গায়ের রং টায় সোনার মতো লাগতো ধীরে ধীরে তা কয়লা হয়ে গেলো। আমার বুয়েটে পড়ার স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। আমি আইন নিয়ে পড়তে থাকি। এখন আমি নামকরা আইনজীবি।
আমার সামনে রুদ্র বসে আছে সাথে তার সুন্দরী বউ। তার বউয়ের ডির্ভোস চায়, কারণ সে বেশি প্রসেসিভ আর সন্দেহ প্রবণ। তাকে যে দয়া করে বিয়ে করেছে এই নয়, তা নিয়ে সে সন্তুষ্ট নয়। সে তার মডেলিং পেশা ছাড়তে পারবে না। রুদ্র প্রথমে চুপ থাকলেও পরে ধীরে ধীরে বের হয় কাদা ছোড়াছুড়ি দুইজনেরই। আমি তাদের ডির্ভোস করায়। কিন্তু রুদ্রকে দিতে হয় বড় অংকের টাকা। রুদ্র আমাকে কিছু বলতে চাইলেও আমি আর শুনি নি। এর মধ্যে আমার বিয়ের জন্য অনেক ভালো ছেলের সন্ধান এসেছে। তবে আমি বলেছি আমি কালো ছেলেই বিয়ে করবো। কারণ আমি চাই না কেউ বলুক
-ইস, কপাল বটে এত সুন্দর জামাই পেয়েছে। কিংবা আমার জামাইর এই নিয়ে আপত্তি না থাকলে তাকে মহান বানানো হোক। আমি চাই যে শুধু আমি সত্তাটাকে ভালোবাসবে। আমার সাজ, শাড়ি আর গয়নাকে নয়। পেয়েছিও এমন একজনকে। সে অনেক বড় সরকারী অফিসার। এক কেইসের সূত্রে পরিচয়। যেমনটা চেয়েছি তার চেয়ে বেশি পেয়েছি। আমার ফোন বেজে যাচ্ছে,
– মিরা তোমার জন্য কি চিতল মাছ রান্না করবো নাকি? আজ তোমার জম্মদিন বলে কথা।
-তুমি কেন রান্না করবে, কাজের মেয়ে কোথায়?
-আরে ওকে ছুটি দিয়েছি ওর বাচ্চার অসুখ।চিন্তা করো না তোমার কালো জামাইর রং কালো হবে না।
– আচ্ছা রাতুল তুমি রাখো আমি এসে করছি তোমার কালো বউয়ের রং ও কালো হবে না। সে বিকট শব্দ করে হাসছে। আমিও হাসছি। তখন ছোট বোন শিলার ফোন আসছে। ওকে রাখতে বললাম। ফোন রিসিভ করতেই,
-আপু তুমি আমার ডির্ভোস টা কখন করাবে?
-আবার কি হয়েছে?
– আজ আরেকটা মেয়ের সাথে দেখেছি ওকে। বাচ্চাগুলোর কথা একবার চিন্তা করে না।
-আচ্ছা আমি দেখছি।
-তুমি মাকে একটু বলবে প্লিজ।
-সমস্যা নেই তুই ওটা আমার উপর ছেড়ে দেয়।
– আর দুলাভাইকে প্লিজ কোন জবে ব্যবস্থা করতে বলেছো?
আমি ফোন কেটে দিয়। যে ছেলেটার পাগলামীর কারণে মাত্র ইন্টার পাশ করে বিয়ে করে সংসারে ঢুকেছে আমার বোনটা দুই বাচ্চার মা হতেই সে পাগলামী অন্য মেয়ের দিকে চলে গেলো। মা কিছুতে ডির্ভোসে মত দিচ্ছে না। কারণ ওকে বাবার বাসায় গিয়েই উঠতে হবে। তাই সে চাকরী খুঁজেছে রাতুলের কাছে। আমার আত্মসম্মান কিছুতেই আমার ইন্টার পাশ বোনের জন্য চাকরী খুঁজতে সায় দেয় না। মাকে ফোন করে বুঝায় আমি,
– শিলা সত্যি ভালো নেই। মানুষের কথায় কি হবে যদি ও না বাঁচে? আর ওর বাচ্চা গুলো তোমাদের সাথে থাকলে তোমাদের ও অসুখ বিসুখ সেরে যাবে। মা তখন বলতে শুরু করে,
-অসুখ কি সাধে বাড়ে তোর বাবার কি আমার দিকে নজর আছে? সারাদিন বই নিয়ে পড়ে থাকে। সারাজীবন সে চাকরী করেছে আমি সংসারের চাপ সামলাতে গিয়ে ক্লান্ত সে খবর তোর বাবা রাখে। আমার সাথে কোন কথায় নেই তার। মা রোজ বলে এইসব আমি চুপ করে থাকি। মুখে আটকায় কিছু বলতে গেলে। মা তো, ভীষণ ভালোবাসি। কিন্তু আজ বললাম,
-মা এইটার জন্য তুমি দায়ী। তুমি তোমার আর বাবার মধ্যে সুক্ষ্ম দেওয়াল করেছো। যখন তোমাকে কেউ বলতো বাবার সাথে তোমার ঠিক যায় না। তুমি কখনো তার প্রতিবাদ করে বাবার হাত ধরে হেঁটে যাও নি। বাবাকে অসম্মান করেছো আমি বলি নি। তবে এইটা তোমার কাছে সামান্য হলেও বাবার মনে একটা বাধা তুমিই তৈরী করেছো। এখন তোমাকে সুন্দর বলার জন্য কিংবা বাবার সাথে তোমার ঠিক যায় কি যায় না সেটা দেখার ও কেউ নেই। আছে শুধু বাবা যে তোমার সাথে ঝগড়া আর খুনসুটিতে দিন কাটানোর বদলে তোমার থেকে হাজার মাইলে দূরে বইয়ের মধ্যে সঙ্গী খুঁজে নিয়েছে, সে অনেক আগে তুমি খেয়ালই করো নি৷ হয়ত চাইলে এখনো তুমি সে দেওয়াল ভাঙ্গতে পারো। কারণ তোমাকে বাবা অনেক ভালোবাসে। ভেবেছি মা বকা দিবে বেশি বুঝি বলে, কিন্তু মা চুপ। অনেকক্ষন পর বললো,
– তুই কিভাবে জানিস এইসব? তোকে বলেছে তোর বাবা?
– না মা, আমি জানি না, আমি বুঝি কারণ বাবার মতো আমিও কালো।
– কিন্তু আমি তো কখনো-
-আমি জানি মা, তুমিও আমাদের অনেক ভালোবাসো। তাই তুমি বাবার সাথে তোমার ভালোবাসা ভাগ করে নাও।
আজ আমাদের ভীষণ খুশির দিন। রাতুল খুশিতে মিষ্টি খাওয়াচ্ছে সবাইকে। আমাদের একটা মেয়ে হয়েছে।
রাতুল বার বার কোলে নিচ্ছে আর বলছে,
– আমার মেয়ে একদম আমার মতো হয়েছে। হয়ত ও প্রথম বাবা যে মেয়ে কালো হওয়ায় খুশি সাথেও আমিও হয়তো প্রথম মা সে কালো মেয়েকে নিজের পরিচয় মনে করছে। এই যে আমার শ্যাম তনয়া।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত