আত্মহত্যা সমাধান নয়

আত্মহত্যা সমাধান নয়
‘আত্মহত্যা কোন সমস্যার সমাধান হতে পারে না’ চোখ খুলেই মধ্যবয়সী এক অপরিচিত লোকের মুখে এই কথা শুনে কিছুটা অবাক হয়ে গেলাম। নিজেকে সামলে আশেপাশে তাকিয়ে বুঝলাম আমি হাসপাতালের বিছানায়। করুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা যুবকটি আবারও বলল
‘আত্মহত্যার কারণ কি বলুন’
ভালোভাবে তাকিয়ে যুবাকে পর্যবেক্ষণ করে তার গায়ে থাকা এপ্রন এবং গলায় ঝুলানো স্টেথোস্কোপ দেখে বুঝলাম ইনি একজন ডাক্তার।
‘আপনি একজন ডাক্তার আপনার দ্বায়িত্ব আমাকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তোলা, আমার ব্যাক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন না প্লিজ’
‘আমার দ্বায়িত্ব আমি পালন করে আপনাকে সুস্থ করেছি বলেই আপনি কথা বলতে পারছেন’
‘আমাকে এখানে কে এনেছে?’
‘জি আমি’
‘আপনি কি রাস্তায় ঘুরে ঘুরে রুগী খুঁজে তাদের এনে চিকিৎসা দেন?’
‘আপনার কি মাথায় সমস্যা আছে? আত্মহত্যার কারণ বলুন আমি চলে যাচ্ছি, হাসপাতালে আপনি ছাড়াও আরও অনেক রুগী আছে’
‘আপনি কারণ জেনে কি করবেন?’
‘এটা পুলিশ কেইস। আপনার আত্মহত্যার কারণ জেনে পুলিশকে রিপোর্ট দিতে হবে’
‘পুলিশ কোইস মানে?’
‘পুলিশের রিপোর্ট ছাড়া আত্মহত্যার রুগীদের চিকিৎসা দেওয়ার নিয়ম নেই, রাত অনেক হয়েছিল মায়া হওয়ায় চিকিৎসা দিয়েছি’
‘কেন দিয়েছেন চিকিৎসা? আমরা কি আত্মহত্যা করি চিকিৎসা পেয়ে বাঁচার জন্য?’
‘ডাক্তার হওয়ার আগেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম কোন রুগীকে চিকিৎসার অভাকে চোখের সামনে মরতে দিব না তাই তো ডিউটি শেষে ব্রিজের উপর হাটার সময় একটা মেয়েকে ওইভাবে মরতে দেখে নিজের কাঁধে করে হাসপাতালে নিয়ে আসলাম’
‘সত্যি আপনিই আমাকে নিয়ে এসেছেন?’
‘জি’
‘আমি আপনাকে সব বলছি কিন্তু দয়া করে এই বিষয়টা পুলিশ অব্দি নিবেন না’
‘আগে বলুন তারপর সিদ্ধান্ত নিব এটা পুলিশের কাছে যাবে কি যাবে না’
‘সবটা শুনে আমার মনে হয় না আপনি পুলিশকে জানাবেন’
‘ঠিক আছে। আগে পরিচয় পর্ব শেষ করি আমি ড. ফাহিম হাসান, আপনি? ‘আমি মিতু। আসলে কাল আমার বিয়ে, ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিয়ে ঠিক করেছে চাচা চাচী’  ‘আপনার বাবা মা কিছু বলে নি?’ ‘যদি বলতে পারতো! বাবা-মা, ভাই,বোন কেউ নেই। ছোট বেলা থেকেই মানুষ হয়েছি চাচা চাচীর কাছে। বাবা-মায়ের মতো ভালোবাসতো তারা, চাচাতো বোন নিতু সবসময় আদর করত’ ‘তাহলে এখন ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে দিচ্ছে কেন?’
‘চাচা চাচীর ধারণা আমার কারণে নিতু আপুর বিয়ে হচ্ছে না। নিতু আপুকে যখনই ছেলে পক্ষ দেখতে আসতো তখন তারা আমাকে পছন্দ করতো তাই আমি নিতু আপুকে দেখতে আসলে লুকিয়ে থাকতাম কিন্তু তারা আপুকে দেখে বলতো “আমরা আপনাদের ছোট মেয়েকে দেখতে চাই”
‘নিতু আপু কি দেখতে খুব অসুন্দর ছিল?’
‘নিতু আপুর সৌন্দর্যের কাছে চাঁদও হার মানবে কিন্তু আপুর হাতের কারণে সব বিয়ে ভেংগে যায়’
‘হাতে কি হয়েছে?’
‘ছোট বেলায় আপুর খুব জ্বর হয়েছিল, খিচুনি হয়ে ডান হাত পেরালাইজড হয়ে যায় ‘
‘সবই বুঝলাম কিন্তু আপনি বিয়ে না করে আত্মহত্যা করলেন কেন?’
‘আমার বয়স আন্দাজ করতে পারবেন?’
‘এটা কেন? কত হবে ১৮/১৯/২০?’
‘১৮+ আর আমার বিয়ে ঠিক করেছে ৫৫ বছর বয়সী একজন লোকের সাথে আর আমাকে এটাও বলা হয়েছে জীবিত থাকলে এই বিয়ে করতেই হবে আর যদি বিয়ে করতে না চাই তাহলে যেন মরে যাই। এখন বলুন আত্মহত্যা কি সমাধান নয়?’
‘না কোন অবস্থাতেই আত্মহত্যা সমাধান হতে পারে না’ ‘ঠিক আছে তাহলে আপনিই সমাধান দিন’ ‘সমাধান দিচ্ছি এর আগে বলুন এখন কি করবেন? মানে আমি তো আপনাকে বাঁচিয়ে ফেললাম এখন বিয়ে করবেন নাকি আবার মরে যাবেন?’ ‘তার আগে আপনি বলুন আমি কি আপনাকে বাঁচাতে বলেছিলাম?’ ‘না’ ‘তবুও বাঁচিয়েছেন, এখন আমার দায়ভার আপনাকে নিতে হবে। আমি কোন উপায় পাই নি বলেই তো আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলাম’ ‘হাহাহা, আপনি হাসালেন আমায়। ঠিক আছে দায়িত্ব যখন নিয়েছি পালন তো করতেই হবে। বেশ কিছুদিন যাবত একটা কাজের মানুষ খুঁজছিলাম আপনি আমার কাজ করে দিবেন আর আপনার দ্বায়িত্ব আমার’
‘ছিঃ এটা কোন সমাধান?’
‘সমাধান তো এখনো দেয়নি এটাতো দ্বায়িত্ব নিলাম’
‘কাজের লোক বানিয়ে বলছেন দ্বায়িত্ব?’
‘আচ্ছা এখন সমাধানে আসি। সমাধান নং এক: আপনি চাচা চাচীকে বুঝাতেন, সমাধান নং ২: আপনি বাড়ি থেকে পালিয়ে অন্য কোথাও ঠাই নিতেন, আত্মহত্যা কখনো সমাধান হতে পারে না’ ‘চাচা চাচীকে বুঝিয়ে পারি নি আর বাসা থেকে বেড়িয়ে কোথায় যাব, কার কাছে থাকব এই দুনিয়ায় কেউ নেই যে আমার তাই আত্মহত্যার পথটা বেছে নিয়েছি’ ‘ভুল পথে চলে গিয়েছিলেন। আত্মহত্যা সমাধান নয় তাই নিজেও এই পথে যাবেন না আর অন্যকেও যেতে দিবেন না’ এই বলে ফাহিম বসা থেকে উঠে চলে যাচ্ছিল রুমের বাহিরে। পিছন ফিরে বলল ‘আর হ্যাঁ দ্বায়িত্ব যখন নিয়েছি পালন করবই আত্মহত্যার পথে যেতে দিব না। নিশ্চিন্ত থাকুন এ বিষয় পুলিশের কাছে যাবে না’ মানুষটা চলে যাচ্ছে, আমি এক ধ্যানে তার দিকে তাকিয়ে ভাবছি কে এই মানুষটা? অপরিচিত এই মানুষটাকে কেন এত আপন মনে হচ্ছে?

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত