সময়ের প্রতিশোধ

সময়ের প্রতিশোধ
নুপাপু, ওই পাগল বেডায় বাসায় খালুর কাছে আইছে” বুয়া শ্বাসবন্ধ করে একছুটে আমার সামনে এসেই বলতে লাগল। বসে বসে নখ কাটছিলাম স্টাইল করে। বুয়ার কথা শুনেই নখ বেকায়দা ভাবেই একপাশে কেটে গেল। মনটা এত এত খারাপ হল বিশাল এক ঝাড়ি দিতে যাব তখনই বুয়ার আবার এই কথা। বললাম কে এসেছে যে তুমি নিজেই হাই প্রেশারের রুগীর মত হয়ে কথা বলতেছ। বুয়ার তখন আবার একই কথার টেপ স্ট্যার্ট ” আফা, যে বেডার লগে আমনে তখন ক্যাইজ্জা করছেলেনে সেই বেডায় খালুরে বিচার দিতে আমাগো বাসায় আসছে “। আমার তো তখন মাথায় হাত। আব্বুর যে মেজাজ সত্যিই না আমার খবর করে ছাড়ে।
ঘটনাটা আপনাদের বলেই ফেলি, আমি নুপুর থাকি ঢাকাতে। শুনেছিলাম আমার জন্মের আগে আব্বু আম্মু ঢাকা এসে আস্তানা গড়েছিল একটু উন্নত ভবিষ্যতের জন্য। আব্বু এসেছিল আগেই আম্মু এসেছিল আরো অনেক পরে। আম্মুর মুখের কথা উনি যখন প্রথম এসেছিলেন তখন নাকি বাসায় আসার পথে বারবার উনার মাথার কাপড় পড়ে যাচ্ছিল। বুয়া প্রশ্ন করেছিল ” খালাম্মা বাতাস কি খুব বেশি ছিল “? আম্মু একগাল হেসে বলেছিল ” না রে বড় বড় বিল্ডিং দেখতে দেখতে বারবার মাথা উঁচু করছিলাম আর মাথার ঘোমটা পড়ে যাচ্ছিল “। আমার আম্মু বেশ সাধাসিধে টাইপের ঝামেলা হল আব্বুকে নিয়ে।
আব্বু আম্মুর একমাত্র মেয়ে হলেও আব্বু কখনও আদরের বাহার আমাকে দেখতে দেয় নি। তবে খুব ভালবাসে আমাকে কিন্তু কখনোই বুঝতে দেয় না। কিছু মুখ ফুটে চাওয়ার আগেই হাজির করে। আব্বুর সব কিছুই নিরবতা দিয়ে ঘেরা। ভালবাসা রাগ অভিমান হাসি আনন্দ সব নিরব। তবে মাঝে মাঝে রেগে গেলে আম্মুর উপর বুলডোজার চলে কথার। তাই আব্বু যখনই আম্মু বা আমাকে ডাক দেয় দুই জনেরই বুক পানিশূন্য হয়ে যায়। তবে আমার আম্মু আবার সব দিক দিয়েই সই। বেশি সই হল আব্বুর বকা কিভাবে খাবে সেই কাজ গুলো নিয়ে। আব্বু যে জিনিস গুলো শুনলে বা করলে রাগ করে আম্মু কেন জানি না ওই কাজগুলোই বেশি করে করে।আমি আর বুয়া এত বুঝাই তাও কাজ হয় নি। আম্মু ঘুরে ফিরে এক রশিতেই আটকায়। আব্বুর বকা ছাড়া দিন যেন উনার শুরু করা হারাম।
ও হ্যাঁ আর আমাদের বুয়া উনার কথা না বললে তো আমাদের ফ্যামিলি কমপ্লিটই হবে না। কোথা থেকে এসেছিল এখন আর অত মনে নেই। কিন্তু উনি যে আছে তা স্বশব্দে জানান দেয় উনার শব্দ। আব্বু মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে বলে ” এই মহিলারে আল্লাহ কাক বানাতে গেছিল ভুলে মানুষ বানিয়ে ফেলেছে”। সারাদিন অনর্গল কথা বলবে। একা একা থাকলেও কথা বলে। আম্মুরও সুবিধা হয়েছে তার সাথে বুয়ার ভিষণ মিল। বুয়ার সাথে সব সমস্যা আব্বুর। বুয়াকে যেমন আব্বু দেখতে পারেনা, বুয়াও আব্বুকে দেখতে পারে না। কিন্তু আব্বুকে সামনাসামনি বলার সাহস কখনও হয় নাই বুয়ার। যত গজগজ আম্মুর সামনেই করে আব্বুকে নিয়ে। সেদিন তো আম্মুকে বলেই ফেলেছিল ” খালাম্মা যদি আমি আফনের বাপের বাড়ির লোক হইতাম এই জনমেও খালুর লগে আপনের বিয়া দিতাম না। মানুষটা সুবিধার না। ” আম্মু হেসে বলে ” তোমার খালু উপরে যেমনই থাক মনটা খুব ভালো “।
এখন আসি মূল কথায় আজকে সকালের গিয়েছিলাম ভার্সিটির উদ্দেশ্যে। সাজুগুজু করে স্টাইল করে চুল বেঁধে গোলাপি কুর্তা আর জিন্স পরে যেই না বাসার একটু সামনে গিয়েছি অমনি একটা গাড়ি এসে রাস্তার পানি সব আমার গায়ে দিয়ে গেল। তখন মনে হচ্ছিল গাড়িটালে থামিয়ে ড্রাইভারটাকে বাঁশের কাঁচা কঞ্চি দিয়ে এমন জায়গায় পিটাই যাতে কাউকে বলতেও না পারে দেখাইতেও না পারে। শুধু একটু পর পর হাত বুলাবে আর কুই কুই করবে। যাই হোক দাঁত কিড়মিড় করতে করতে বাসায় আসার পথে দেখি একটা ছেলে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসতেছে। এমনিতেই নাচুনে বুড়ি তার উপর ঢোলে বাড়ি।
মেজাজ তো খারাপ ছিলই আর লোকটার হাসি দেখে নিজেকে আর কন্ট্রোল করতে পারলাম না। সোজা যেয়ে কলার ধরে বসলাম। এই মিয়া কখনও কোন মেয়ের নাজেহাল অবস্থা দেখে দাঁত কেলাতে শরম করে না। নাকি মেয়েদের উনিশ-বিশ অবস্থা দেখলেই হাসির বন্যা বয়ে যায়। রাস্তায় লোক জমা শুরু হয়েছে। কোন দিন থেকে বুয়াও এসে হাজির। মোটামুটি সে কোমরে শাড়ি বেঁধেই ফেলেছে ওই লোককে ক্যালানি দেওয়ার জন্য। এমন সময় লোকটা বলে উঠলো ” আমি সরি। আসলে আপনার গায়ে কাদাপানি দেখে হাসি নি আমি তো হেসেছি আপনি রাগে গজগজ করছিলেন আর কি কি যেন বলছিলেন তাই”। এত লোকের সামনে সরি বলার পরে তো আর কিছু বলার নেই। তাই কলার ছেড়ে দিয়ে বুয়াকে সামলিয়ে নিয়ে বাসায় এসে গোসল করে যেই না নখ নিয়ে বসেই অমনিই বুয়ার আগমন সাথে ভয়ংকর সংবাদ। এখন কি করব। বুয়া তো প্রায় কান্নায়ই শুরু করে দিচ্ছিল যে আব্বুকে সে কি বলবে।
আমি তো পাগল প্রায়। সাথে সাথে আম্মুর রুমের দিকে দৌড় দিলাম।অর্ধেক পথেই দেখি আব্বু ড্রয়িং রুমে ওই লোকটার সাথে কথা বলতেছে। আমাকে দেই আব্বু ডাক দিল ” নুপুর শুনে যাও”। মাথা নিচু করে আব্বুর সামনে হাজির হলাম। ” শোনো এই তোমার রাতুল ভাই। আমার ফুফাতো বোনের ছেলে। মাষ্টার্স করবে ইষ্ট ওয়েষ্ট ইউনিভার্সিটি থেকে তাই আমাদের বাসায় থেকেই পড়বে “। তখন তো মনে মনে ভিষণ রাগ হচ্ছিল। কেন এই আবাল টাইপের লোকটা আমাদের বাসায় থাকবে আমিই বা কি করব। তখন প্রথম থাকে ভালো করে দেখলাম। প্রায় ছয় ফুটের কাছাকাছি হবে লম্বায়। বড় বড় চোখ। মাথা ভরা চুল কিন্তু এলোমেলো। ব্লাক জিন্স পরনে আর অফ হোয়াইট টিশার্ট।ড্রেস আপ দেখলে বোঝা যার ভিষন ফ্যাশন সচেতন। আমার দিকে চেয়ে মুচকি মুচকি হাসতেছে আবার। আম্মুকে তলব করা হল। আম্মুর পিছনে বুয়াও আসলও। মোটামুটি আমি আর বুয়া পারি না তাকে তখনই বের করে দেই বাসা থেকে। আম্মু তাকে আমাদের গেষ্ট রুমটা দেখিয়ে দিল।
জীবন মোটামুটি হাবিয়া দোজখ হয়ে গেল আমার। আগে আব্বু খোঁটা দিত পড়া নিয়ে এখন আব্বুর সাথে আম্মুও শুরু করেছে৷ এই সবই রাতুল সাহেবের অবদান। নিজে এত পড়ে যা দেখে এখন সবাই ভাবে আমি হলাম ফাঁকিবাজ। একদিন বিকালে আম্মু চায়ের কাপ হাতে ধরায়ে দিল বলল রাতুল ভাইয়াকে দিয়ে আসতে আমি কিচ্ছুক্ষন গাঁইগুঁই করলাম যে যাবো না। পরে না পেরে গেলাম তার রুমে। যেয়ে দেখি রুম খালি। ভেবেছিলাম নিচে গেছে মনে হয় তাই রুম ঘুরে ঘুরে তদন্ত করতে লাগলাম কখন যে ওয়াশরুমের দরজার কাছে চলে গেছি টেরই পাই নি। ঠিক তখনই ওয়াশ রুমের দরজা খুলে রাতুল ভাইয়া একদম আমার সামনে পরনে শুধু তোয়ালে পরা। আমি তার দিক থেকে চোখ সরাতেই পারছি না। ভেজা শরীরে তখনও বিন্দু বিন্দু পানি জমে আছে। মাথার চুল থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ছে। ইসস লোকটা তো আমাকে পাগল করে ছাড়বে। কতক্ষন তাকিয়ে ছিলাম নিজেও জানি না। ” ম্যাডাম আপনি কি আমার পথ ছাড়বেন আমি কি জামা কাপড় পরবো? না কি এই অবস্থায়ই সারা জনম পার করবেন” রাতুল ভাইয়ার এই ডায়লগে আমি তাড়াতাড়ি সরে গেলাম। সেই ছিল ভাল লাগার শুরু। তারপর থেকে বিরক্তিটা একদম চলে গিয়েছিল বিরক্তির জায়গা দখল করেছিল অদ্ভুত এক না বলা ভালো লাগা।
সেদিন রাত্রে সবে চোখ লেগে এসেছিল তখন দেখলাম ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে। রাতে বৃষ্টিতে ভিজতে আমার খুব ভালো
লাগে তাই কিছু না ভেবেই সোজা ছাদে চলে যাই। দরজা খুলেই সোজা বৃষ্টি আর আমি দুজন দুজনার হয়ে গেলাম। কতক্ষন ভিজেছি বলতে পারি না কিন্তু হঠাৎই ছাদের দরজার দিকে চোখ পড়তেই আমি স্থির হয়ে গেলাম। রাতুল ভাই দাঁড়িয়ে সেখানে।থ্রিকোয়াটার প্যান্ট আর ব্ল্যাক টিশার্ট গায়ে দেওয়ালের সাথে ঠেশ দিয়ে দাঁড়িয়ে আমাকেই দেখছে। আমি ধীরে ধীরে নিচে নামার জন্য দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম কেমন যেন এক ঘোর লাগা দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে আছে। ভিজে জামাতে আমি যেন খুব কুঁকড়ে গেলাম। আস্তে করে বললাম সরে যান আমি নামবো। কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল ” পুড়ে যাচ্ছি যে আমি ভিজবো তোমার সাথে। নেবে আমাকে তোমার সাথে ভিজতে”। আস্তে করে আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল খোলা ছাদে।
আকাশের দিকে মুখ করে দুহাত ছড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজছিল আর আমি দেখছিলাম। কিছুক্ষন পরে বলল ” আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ বৃষ্টি ছিল এটা “। এমন করেই কেটে যাচ্ছিল আমাদের দিন গুলো। হঠাৎই রাতুল ভাইয়া স্কলারশিপ পায় সুইডেনে। সেদিন বিকালে রুমে শুয়ে পড়ছিলাম তখন এসে হাজির আমার রুমে জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে। বলল ” আমার রুমে এসো রাতে একবার সবাই ঘুমিয়ে গেলে “। আগে কখনোই এমন রাতে একা রুমে যাই নি তারপরও কেমন জানি লাগছিল তাই রাজি হয়ে গেলাম। সবাই ঘুমে গেলে রুমে যেয়ে দেখি রাতুল ভাই বাইরের আকাশ দেখছে। খালি গায়ে শর্টস পরনে সে এক অন্য রুপ দেখলেই পাগল হয়ে যেতে হয়। আস্তে করে পাশে দাঁড়ালাম। দাঁড়াতেই রাতুল ভাইয়া ভূমিকা ছাড়াই কথা শুরু করল। ” দেখো নুপুর, আমি সুইডেনে স্কলারশিপ পেয়েছি “। এটা শোনার পরেই খুশিতে কিছু বলতে যাচ্ছিলাম তার আগেই রাতুল ভাইয়া থামিয়ে দিল আমাকে।
শোনো নুপুর আগে আমি আমার কথা শেষ করি। তোমাকে আমি পছন্দ করি কিন্তু আমি সুইডেন যাবো সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কিন্তু আমি তো তোমাকে কথা দিয়ে যেতে পারছি না। কবে ফিরবো সেটাও জানি না। আমার অপেক্ষায় না থেকে বিয়ে করে নিও”। এই বলেই সে ঘুরে আবার দাঁড়ালো বুকটা ফেটে যাচ্ছিল কান্নায়। চোখ লাল হয়ে গিয়েছিল কিন্তু বুকে পাথর চেপে বলেছিলাম তুমি ভালো থেকো। শুভ কামনা রইল অনেক অনেক। এই বলেই চলে এসেছিলাম। এর পরে যে কয়েকদিন রাতুল ভাই ছিল আমি আর সামনে যাই নাই। শেষদিন মানে যেদিন ফ্লাইট ছিল অনেক অনেক চেষ্টা করছিল দেখা করতে কিন্তু আমি সেদিনও সামনে যাই নি। কতরাত যে কেঁদে কাটিয়েছি তা জানে আমার চোখ আর মাথার বালিশ।
এর ছয় মাস পরেই জিদ করেই অনিককে বিয়ে করে নেই। আব্বুই পছন্দ করে এনেছিল আমিও হ্যাঁ বলে
দিয়েছিলাম। অনিক কেন জানি না খুব ভালবাসতো আমাকে। অন্তত যা বলতাম করার আপ্রাণ চেষ্টা করত। হঠাৎ করেই একদিন বলেছিলাম বাইরে সেটেল হব। জিজ্ঞেস করেছিল কোথায় যাওয়ার ইচ্ছা। চিন্তা না করেই বলে দিয়েছিলাম সুইডেন। এর পর পাগলটা কেমন করে জানি ছয়মাসের মধ্যেই দুই জনের থাকা জব সব কিছুর ব্যবস্থা করে ফেলে সুইডেনে। পাড়ি দিলাম বাবা মা কে ফেলে সুইডেন। সুখের ঘর কান্না আমাদের। পাঁচ বছরে ঘর উজ্জ্বল করে এলো সাদি আর সাইফ। এই চার জনের সংসার দিব্বি চলে যাচ্ছিল।একদিন অনিকের বার্থডে ছিল আমরা মা ছেলেরা মিলে ছোট্ট একটস সারপ্রাইজ পার্টি দিলাম কাছেরই থিম পার্কটায়। অনিক তো সেই খুশি। ঠিক এমন সময় মনে হল আমার দিকে কেউ তাকিয়ে আছে।
খেয়াল করতেই আমি জমে গেলাম বরফের মত। এ যে আর কেউ না রাতুল ভাই যার কারনে আমার এই দেশান্তরি হওয়া। এগিয়ে গেলাম নিজ থেকেই।সাবলীল ভাষায় জিজ্ঞেস করলাম কেমন আছে সে। উওরের আশা না করেই পরিচয় করিয়ে দিলাম সবার সাথে। অনিক জিজ্ঞেস করল এটা কে? শুধু উওর দিলাম পরিচয় একজন। অনিকের হাতে হাত দিয়ে আর সাদি সাইফের হাত ধরে যখন চলে আসছিলাম রাতুল ভাই একটা কথাই বলেছিল ” ভালো থেকো”। অনুভব করছিল ঠিক আজ থেকে দশ বছর আগে আমি যেমন কান্না ধরে রেখেছিলাম আজ হয়ত অন্যকেউও নিজের আবেগ ধরে রাখছে প্রানপণে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত