মধ্যবিওের অসমাপ্ত গল্প

মধ্যবিওের অসমাপ্ত গল্প
বাবার ঔষধ শেষ হয়ে গেছে, এটা ভাইয়াকে বলতেই যাচ্ছিলাম কিন্তু উনি খট করে কলটা কেটে দিলেন। মা অপলক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। সেই দৃষ্টি উপেক্ষা করার ক্ষমতা আমার নেই। তার চোখে যেন অনেক আশা, অনেক চিন্তা, অনেক দুঃখ। বাবার শরীর দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে। মা হয়ত ভাবছেন তার আদরের খোকা শহর থেকে তার বাবাকে দেখতে আসবে।
আমি মায়ের এই আশাটুকুকে ভেঙে দিতে চাই না, তাই কল কেটে যাওয়ার পরেও আমি রেখে দিলাম না। কানেই ধরে রাখলাম। অভিনয় করলাম যেন আমি ভাইয়ার সাথে কথা বলছি। কথার মাঝে হঠাৎ খুশি হওয়ার অভিনয় করছি আর উচ্চস্বরে বলে উঠছি, “ভাইয়া কবে আসবে তুমি?” একথা শুনেই যেন মায়ের চোখ দুটো চকচক করে উঠলো। একটু পরে আমি কল কেটে দেওয়ার ভান করে মাকে বললাম, “ভাইয়ার অফিসে খুব চাপ যাচ্ছে আজকাল। কিন্তু ছুটি পেলে খুব শীঘ্রই চলে আসবে।” মা একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে শাড়ির আচলে চোখ মুছতে মুছতে বললেন, “মারে, খোকাকে তো আমরা কোলে পিঠে করে এত কষ্ট করে মানুষ করেছি। আমি জানতাম খোকা কখনো আমাদের অবহেলা করতে পারবে না৷ দেখিস আজ নাহয় কাল ও ঠিকই চলে আসবে।”
চোখ মুছতে মুছতে মা অন্য ঘরে চলে গেলেন। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। নিজের ওপর মাঝে মাঝে খুব রাগ হয়, আবার মাঝে খুব গর্ববোধ হয়। এটা প্রথমবার নয় যে আমি অভিনয় করলাম। ভাইয়া বিয়ের পর কেমন যেন বদলে গেছে। শহরে থাকে বড় বাড়িতে, বড় চাকরি করে আর ভাবীও বড়লোকের মেয়ে। তার কাছে আজ আমরা ছোটলোক, গরীব। ভাইয়া আগে প্রতিমাসে টাকা দিত কিন্তু এখন নাকি ভাবী প্রেগন্যান্ট হওয়ার পর মা বাবাকে দেওয়ার জন্য টাকা তার নেই৷ কিন্তু আমি মা বাবাকে এটা জানতেই দেইনি। রোজ কলেজ শেষে আমি প্রাইভেট পড়িয়ে মাসশেষে মা বাবার হাতে টাকা তুলে দিয়ে বলেছি, টাকাটা ভাইয়া পাঠিয়েছে। এই সামান্য ব্যাপারে ওদের চোখদুটো ছলছল করে উঠত। এটাই হয়ত আমার প্রাপ্তি।
আমি হই বা ভাইয়া, কেউ না কেউ তো মা বাবাকে একটু হলেও খুশি রাখতে পারছে৷ এটাই বা কম কী টিউশনির টাকা আজকাল যথেষ্ট হচ্ছে না। বাবার চিকিৎসার খরচ অনেক বেড়ে গেছে। আজকাল ভাইয়াকে কল দিলে কল ধরে না৷ হয়ত ভাবছে আমরা কল দেই টাকা চাওয়ার জন্য। এর মাঝে আমার এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হয়েছে৷ এডমিশন টেস্ট সামনেই। মা বললেন এডমিশনের আগে ভাইয়ার বাসায় গিয়ে উঠতে। সেখানে থেকে পরীক্ষা দেব।কিন্তু এ কথাটা বলতেও কেন যেন আমার বাঁধছে৷ আমি জানি না কি অপেক্ষা করছে আমার জন্য। ভাবী আমাকে একদম পছন্দ করেন না। গ্রামের মেয়ে তাই হয়ত আমাকে দেখে নাক ঝামটা দেন। তাহলে এরকম একজনের বাড়িতে আমি থাকব কি করে?
(১০ দিন পর)
ভাইয়ার বাসায় এসেছি দুইদিন আগে। কিন্তু এর মাঝেই অনেক কিছু হয়ে গেছে। ভাবী বাসায় রীতিমতো খুব ঝঝগড়াঝাটি করেছে । উনি ভাইয়াকে চিৎকার করে বলেছেন, বুয়া আসছে না অনেকদিন থেকে। শহরে এত সহজে বুয়া তো পাওয়া যায় না। উনি আরও অতিরিক্ত আমার কাজ কেন করবেন। আমাকে যেন হোস্টেলে রেখে আসা হোক। আমি কাঁদোকাঁদো স্বরে ভাবীকে বলেছি, “আমি সব কাজ করে দেব৷ আমার নিজেরও আর আপনাদেরও। কিন্তু আমাকে এখানে থাকতে দিন৷ মা বাবা খুব আশা নিয়ে আমাকে এখানে পাঠিয়েছেন।” আমার এ কথা শুনে ভাবী খুশি হয়ে আমাকে এখানেই থাকার অনুমতি দিলেন। কিন্তু সেদিন রাত থেকেই আমার জীবনটা কেমন যেন হয়ে গেল।
আমারই নিজের ভাইয়ের বাড়িতে আমার জন্য একটা বিছানা বরাদ্দ নেই। ভাবীর আত্মীয়রা এসে দামী চাদর বিছানো গেস্ট রুমে থাকেন, কিন্তু আমাকে থাকতে দিয়েছে রান্নাঘরে। ঘরের সব কাজ আমি নিজেই করছি৷ ঘর ঝাড়ু দেওয়া, মোছা, রান্না করা কিন্তু আমার কোন অভিযোগ নেই। ওরা আমাকে কিছুদিন থাকতে দিক তাহলেই হবে। মা এর মাঝে একদিন কল করেছিল। আমি এমন অভিনয় করেছি যেন আমি খুব ভালো আছি। মা খুব খুশি হয়েছেন কথা বলে। আমি হয়ত অভিনয় করা খুব ভালো শিখে গেছি। কেউ বুঝতে পারে না সহজে আমি কেমন অবস্থায় আছি। আস্তে আস্তে হয়ত একদিন আমার অস্তিত্বটাও থাকবে না।থাকবে শুধু অভিনয়ের একটা মুখোশ সময় চলছিল তার আপন গতিতে৷ আমি কাজ শেষ করে যতটা সম্ভব পড়াশুনা করি৷ এরই মাঝে একদিন ভাবীর ছোট মামা বাসায় এলেন। এই লোকটার বয়স প্রায় পঞ্চান্নর কাছাকাছি, চুল একেবারে নেই বললেই চলে, বিশাল শরীর আর ভাজপড়া চামড়া। শুনেছি ওনার নাকি আগে দুটা বিয়ে হয়েছিল৷ কিন্তু একজন মারা গেছে আরেকজন ছেড়ে চলে গেছে।
ছোট মামা আসতেই ভাবী আর ভাইয়া ওনাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। ভাবী আমাকে বলল চা নাস্তা রেডি করে আনতে। আমি চা নাস্তা বানিয়ে নিয়ে যেতেই দেখলাম লোকটা কেমন করে যেন আমার দিকে তাকাচ্ছে। উনি আমার আপাদমস্তক ড্যাবড্যাব করে দেখতে লাগলেন। ভাবীকে ইঙ্গিত করে বললেন, “মেয়েটা কে? নতুন কাজের মেয়ে নাকি?” ভাইয়া কিছু একটা বলতেই যাচ্ছিলো কিন্তু ভাবী তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “ও তো জাবেদের (আমার ভাই) দূর সম্পর্কের আত্মীয়। বলতে পারো কাজেই এসেছে। ছোট মামা! ছাড়ো তো এসব৷ তুমি অন্য গল্প করো। তুমি নাকি গাজীপুরে একটা নতুন গার্মেন্টস দিচ্ছ… সেই ব্যাপারে বলো ! ” আমি একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে রান্নাঘরে চলে আসলাম।।এসব অপমান এখন আমার সয়ে গেছে। কষ্ট পেলেও আর চোখে পানি আসে না। আচ্ছা আমার চোখ দুটো আস্তে আস্তে পাথরের মত নির্জীব হয়ে যাচ্ছে না তো?
রাত দুটা কি তিনটা। সময়টা ঠিক খেয়াল নেই৷ আমার ঘুম হঠাৎ ভেঙে গেল সিগারেটের গন্ধে। ছোটমামা তো আজ রাতে থাকবেন বলেছেন। উনি হয়ত রাত জেগে সিগারেট খান। আমি গন্ধটা উপেক্ষা করে ঘুমানোর চেষ্টা করতে লাগলাম। কিন্তু গন্ধটা আস্তে আস্তে তীব্র হচ্ছে৷ ব্যাপার কী? আমি উঠে বসলাম। স্ট্রিটলাইটের আলো জানালা দিয়ে ঘরে এসেছে। দেয়ালে প্রকাণ্ড একটা ছায়া দেখতে পাচ্ছি। ছায়াটা আস্তে আস্তে আমার কাছে আসছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছোট মামা আমার হাত শক্ত করে ধরে ফেললেন। এরপর মুখ টিপে ধরলেন। আমি অনেক জোড়াজুড়ি করেও ছাড়াতে পারছিলাম না নিজেকে ! এমন সময় তার হাতে একটা কামড় দিয়ে অনেক কষ্টে নিজেকে ছাড়িয়ে অন্য ঘরে চলে আসলাম। ভাইয়া ভাবী বলে চিৎকার করতে লাগলাম। চোখে পানি আসতে শুরু করেছে। সবকিছু ঝাপসা লাগছে। ভাইয়া ভাবী আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তাদের স্পষ্ট দেখতে পারছি না। আমি মেঝেতে লুটিয়ে পরে কাঁদতে শুরু করলাম৷ রান্নাঘর থেকে ছোট মামা বের হয়ে ইতস্তত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
ভাইয়া ভাবী জিজ্ঞেস করছেন কি হয়েছে। কিন্তু তাদের কোন কথাই যেন আমার কানে ঢুকছে না। কিছুই বলার পরিস্থিতিতে আমি নেই৷ খুব কান্না পাচ্ছে! চিৎকার করে মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে ইচ্ছা করছে! মা কেন নেই আমার কাছে? আজ যে তাকে আমার বড়ই প্রয়োজন আমার কিছু বলার আগেই ছোট মামা হড়বড় করে বলল, “এই মেয়েই আমাকে রাতে আসতে বলেছিল। নাহলে কি আমি আসি? সবই লোভ ! আমাকে ফাসাতে চায়, আমার কাছে টাকা আদায় করার জন্যই এসব নাটক করছে! ” ছোটমামার কথা শুনে আমার রীতিমতো হতভম্ব হয়ে গেছি। ভাইয়া ভাবী রাগী রাগী চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ভাবী ভাইয়াকে বলল, “আগেই বলেছিলাম একে না আনতে। কি হলো দেখলে তো? আমার সহজ সরল মামাকে ফাসাতে চায় তোমার বোন! একে সকাল সকাল বিদায় করবে!” ভাইয়া গম্ভীর স্বরে আমাকে বলল, “কাল সকাল হতেই তোকে ফিরে যেতে হবে।”
আমার চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো। মনে হচ্ছে যেন বড় কোন আশাভঙ্গ হলো। এমন তো হওয়ার কথা নয়! আমি তো ভাইয়ার থেকে এত আশা করিনি৷ এটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু তবুও আমার এত কেন কষ্ট হচ্ছে ? আমি তো আগেই বুঝেছিলাম, ভাইয়া আর আমাদের আপন নেই। তবু কেন তাকে আপন ভাবতে গেলাম? সময়ের সাথে সাথে কিছু কিছু মানুষ পুরোপুরি বদলে যায়।এই বাস্তবতাকে স্বীকার করতে না পারলে বড়ই কষ্ট পেতে হয় ! মেঝে থেকে মাথা তুলে ভাইয়াকে শুধু একবার বলতে ইচ্ছে করছে, “আমার খুব কষ্ট হচ্ছে ভাইয়া৷ এই পাপী, শয়তানটাকে প্লিজ তুমি মেরে ফেলো! ছোটবেলায় খেলার সময় কেউ আমাকে ধাক্কা দিলে তুমি যেমন তার সাথে মারামারি শুরু করে দিতে, আজও এই লোককে মারো প্লিজ! তুমি কেন এত বদলে গেলে ভাইয়া৷ আমি কি তোমার কেউ না? “

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত