প্রাপ্তি

প্রাপ্তি
সন্ধ্যা বেলা কাপড় ভাজ করছিলাম। এমন সময় সাকিত এসে পিছন থেকে আমার ঘাড়ে মুখ গুজে বলতে লাগল,
-সারা, ইদানিং তুমি আরো কিউট হয়ে যাচ্ছো এটা কি খেয়াল করেছো? সাথে অল্প একটু গুলুমুলুও হয়ে গেছো। ইদানীং মেজাজটা কেমন খিটখিটে হয়ে গেছে। তার উপর কলেজ থেকে এসেই জড়িয়ে ধরা, মাথা যেন আগুন উঠেগেল। যে কয়টা কাপড় ভাজ করেছিলাম রাগে রাগে সব কয়টা এলোমেলো করে বলতে লাগলাম,
-তোমার কি কান্ড-জ্ঞান কোনোদিন হবেনা! দেখছো আমি কাপর-চোপর সাইজ করছি, আর ওনার অমনি ঘামা শরীর নিয়ে জড়িয়ে ধরা মনে হলো। যতসব অসহ্য।
-দুর। ফাজলামো বাদ দিয়ে আগে ফ্রেস হওতো। আমি খাবার নিয়ে আসছি। এটা বলে তোয়ালেটা হাতে দিয়ে রান্নাঘর থেকে খাবার আনতে গেলাম। খাওয়া শেষে প্লেট গুলো রান্না করে রাখতে গেলাম। ফিরে এসে দেখি শাকিত ছাদের দিকে তাকিয়ে মাথার নিচে হাত দিয়ে শুয়ে কি যেন ভাবছে। আমি ওর পাশে অন্য দিকে ফিরে শুয়ে পড়লাম।
তখন সে জোর করে আমাকে ঘুরিয়ে এনে আমার মাথাটা তার বুকের উপর রাখল। এরকম করে না শুলে আসলে নাকি তার ঘুম আসে না। কিছুক্ষনের ভিতর ঘুমিয়ে পড়ল কিন্তু আমি ঘুমাতে পারলাম না। একটাই কারণ আমি যে অপূর্ণ! তিনটা বছর হয়ে গেল শাকিতকে আজও আমি বাবা ডাকটা শুনাতে পারলাম না। মানুষটা বিরক্তও হয় না। আমি ওর উপর এত রাগ দেখায় হাসিমুখে সব সহ্য করে। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছি, কি সুন্দর করে ঘুমাচ্ছে পিচ্ছিদের মত করে! মনেভরে ওকে দেখছি। মনে পড়ে গেল সাত বছর আগের সেই ভার্সিটি লাইফের কথা শাকিত ছিল চুপচাপ স্বভাবের লোক। সব সময় পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকত। কালো ফ্রেমের একটা চশমা পড়ে থাকত আর চুলগুলো ছিল ঘাড় পর্যন্ত লম্বা।।
সে ছিল আমাদের ডিপার্টমেন্টে আমাদের ইমিডিয়েট সিনিয়র। কিন্তু অসুস্থতার কারণে নাকি এক বছর পড়তে পারিনি তারপর আমাদের সাথে কন্টিনিউ করে। ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট হওয়ার কারণে সবাই ওর কাছ থেকে ইম্পর্ট্যান্ট নোট নিতো। সে হিসাবে আমিও প্রয়োজনীয় নোটস নিতাম। আমি এমনিতেই একটু ফাঁকিবাজ ছিলাম। সব সময় সাকিতের পিছনে পিছনে ঘুরে ঘুরে বেড়াতাম।কেন জানি ওর পিছনে ঘুরঘুর করতেও ভালো লাগতো। তখন ও শুধু ছিলো সাকিত ভাই। এরকম নোট নিতে নিতে তার সাথে খুব ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। একদিন দুইজন লেকের পাড়ে বসে আছি ও বলতে শুরু করল।
– জানো সারা তোমাকে আমার নোট গুলো দিতে দিতে কখন আমার মনটাও যে দিয়ে দিয়েছি বুঝতে পারিনি। এখন কি করা যায় বলোতো।
আমি তখন হাসবো না কাঁদবো কিছু বুঝতে পারছিলাম। কারণ আমিও যে মনে মনে তাকে চাই।এভাবে শুরু হলো প্রেম। এভাবে দিন এগোতে লাগলো। শাকিতের আমাদের কলেজেই চাকরি হয়ে গেল। আমার আব্বু আম্মু ওকে অনেক পছন্দ করতো তাই তারা কোনো অমত করেনি। আমাদের বিয়ে হয়ে গেল। কিন্তু বিয়ের এক বছরের মাথায় আমার শাশুড়ি আম্মা নাতি-নাতনি চাই চাই করে সব সময় আমাকে চাপ দিতে থাকে। কিন্তু কি করব, আমিও যে মা হতে চাই। আমারও তো ইচ্ছা হয় মা ডাক শোনার এক বছর পরে যখন আমি কনসিভ করতে পারছিলাম না তখন আমি ডাক্তারের কাছে যেতে চাইলাম শাকিত খুব রাগ করত বলতো আল্লাহ দিলে এমনি হবে ডাক্তার দেখাবোনা।
তারপরও চুপি চুপি আমি ডাক্তারের কাছে যেতাম। কিন্তু কোন সমস্যায় ধরা পড়তো না। একবার ভাবলাম হয়তো শাকিতের সমস্যা আছে। তাই কোনভাবে তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার প্লান করতে থাকলাম। একপর্যায়ে আমার কসম দিয়ে আমি নিয়ে গেলাম এবং বিভিন্ন টেস্ট করার পর দেখলাম তারও কোন সমস্যা নেই। এভাবেই 10-15 দিন পার হয়ে গেল। তারপর বাড়াবাড়ি শুরু করে দিলাম। নিজের ইচ্ছাতেই মেয়ে দেখতে শুরু করলাম শাকিতের বিয়ে দেব বলে। ওর যে সন্তানের শখ তা ওর ডাইরি পড়লেই বোঝা যায়। তাই মেয়ে দেখা শুরু করে দিলাম অবশ্য খবরটা আমি কাউকে জানায় নি আমার মা ছাড়া।
মা আমাকে সব পাগলামি করতে নিষেধ করল আর বলল বেশি ঘাড় ত্যাড়ামো না করতে। করলে আমার শ্বশুর বাড়ির সবাইকে জানিয়ে দেবে যে আমি সাকিতের জন্য মেয়ে খোজা শুরু করেছি। কিন্তু আমি আমার ডিসিশন থেকে অনড়। শাকিতকে আমি বিয়ে দেবোই। একদিন শাকিতকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে যাওয়ার নাম করে মেয়ে দেখাতে নিয়ে গেলাম। মেয়ে জানতো যে তাকে দেখতে যাচ্ছে, কিন্তু সাকিত জানতো আমি আমার স্কুল লাইফের এক বান্ধবীর সাথে তাকে পরিচয় করাতে নিয়ে যাচ্ছি। যাওয়ার পরে পরে দেখলাম মেয়েটা রেস্টুরেন্টে বসে আছে। এক টেবিলে আমরাও গিয়ে বসলাম। আমি ওয়াশরুমে যাওয়ার নাম করে একটু দূরে আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকলাম। তারপর ওদের ভিতর বিভিন্ন কথা কথা হল কিন্তু আমি কিছুই শুনতে পেলাম না। একপর্যায়ে দেখলাম শাকিতের চেহারা পাল্টে গিয়ে লাল বর্ণ ধারণ করছে। অর্থাৎ সে রেগে যাচ্ছে তারপর মেয়েটি চলে গেল। আমি শাকিতেরর কাছে গেলাম শাকিত টানতে টানতে আমাকে রেষ্টুরেন্টের বাইরে নিয়ে গাড়িতে তুলে বাসায় এনে ঘরের ভিতরে খাটের উপরে ছুড়ে ফেলে দিল। বলতে লাগলো
– তোর সাহস কি করে হয় আমার জন্য মেয়ে দেখার। আরে সন্তান আমার না হলেও চলবে। তোকে আর কত বোঝাবো?? তুই বুঝিস না কেন? চাইনা আমার সন্তান। শুধু তুই হলেই চলবে।
আমার খুব কান্না পাচ্ছিল কারণ শুধু আমি আমি করলেও সে যে একটা সন্তান চাই সেটা আমি ভালো করেই জানি।
তারপর সে রাগে রাগে আমার শাশুড়ি আর ছোট ননদ কে ডাক দিল। তারা এসে আমাকে আচ্ছামতো ঝাড়ি দিতে লাগলো। আরে সব পাগলামি বাদ দিতে বলল। এভাবেই দিন কাটছিল আমি তাকে যত ব্যবহার অবহেলা করি না কেন, তার ভালোবাসা যেন দিন দিন বেড়েই যাচ্ছিল। এক মাস পর, আমার ওজন অনেকটা বেড়ে গেছে শরীরটা ভালো লাগছে না। গত পরশুদিন আমাকে সাকিত ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছিল কিছু টেস্ট করানোর জন্য।। আমি সেসব না কিছুই ভাবছি না সংসার করতে করতে আরও 10 দিন কেটে গেল। হঠাৎ একদিন সাকিত কে জিজ্ঞেস করলাম
-আচ্ছা, সেদিন যে টেস্টগুলো করলে সেগুলো কিসের ছিল? আর রিপোর্টএ কিইবা আসলো? কিন্তু তার কোন জবাব নেই সে বলল
-কিছু না ভাবলাম তোমার জ্বর হয়েছে তাই ব্লাড স্টেস্ট করিয়েছি তুমি তো দেখলেই নাকি!?
এসব নিয়ে ভাবাভাবি বাদ দিলাম। কিন্তু যতই দিন দিন যাচ্ছিল ততই যেন সবকিছু অস্বস্তি লাগা শুরু হচ্ছিল। এদিকে শাকিত আমাকে বেশি বেশি আদর করা শুরু করেছে। এগুলো আরো বেশী খারাপ লাগে। কারণ যে একটাই ওই যে, সন্তান। একদিন আমি ঘরে শুয়ে ছিলাম। শাকিত আর আমার শাশুড়ি আমাদের একার আত্মীয় মারা গেছিল বলে তাদের বাসায় গিয়েছিল। আমি অসুস্থ হয়ে গেছিলাম তাই আমার ননদকে নিয়ে হসপিটালের উদ্দেশ্যে গেলাম। ডাক্তার চেকআপ করে বলল
-কোন সমস্যা নাই এই সময় এরকম হয়। আমি বললাম
-এই সময় মানে কোন সময়? আর আমার অসুস্থতা আমি বুঝতে পারছি আর আপনি বলছেন কোন সমস্যা নাই?
ডাক্তার শায়লা তখন মুচকি হেসে বলতে লাগলো
-তুমি যে মা হচ্ছো তো এই সময় একটু অসুস্থ তো হবেই তাই না? আমি ফ্যাল ফ্যাল করে তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। আমি মা হচ্ছি মানে বলে কি ডাক্তার! আমি বললাম
-আপনি কি বলছেন আমি মা হচ্ছি মানে কি?? তখন তিনি বললেন
– কেন সাকিত তোমাকে বলিনি তুমি দেড় মাসের ভ্রুণ ক্যারি করছো।
শুনে সাকিতের উপর খুব রাগ হলো। তারপর সেখান থেকে বাসায় চলে আসলাম। খুব রাগ হলো শাকিতের উপর সাথে নিজের প্রতিও রাগ হলো। আমার পেটে আমার সন্তান আর আমি কিনা জানিনা। আমাকে জানানোও হলো না। আসুক সে আজকে। তার খবর আছে। বিকালে যখন সাকিত কলেজ থেকে ফিরে আসলো আমি চুপচাপ ঘরে খাটের উপর বসে পা ঝুলিয়ে বসে আছি। সাকিত ক্লান্ত অবস্থায় ফিরে এসে আমার কপালে চুমু দিয়ে বলল
-কি ব্যাপার খুব খারাপ লাগছে?? আমি তার সাথে কোন কথাই বললাম না মুখ ফুলিয়ে চুপচাপ বসে থাকলাম। তার সাথে আমি কোনো কথা বলবো না হুহ। তারপর সে ননদকে ডাক দিল। বলল
-তোর ভাবীর কি হয়েছে রে?
-তোর সাথে কোন কথা নাই। কিভাবে প্রেগন্যান্সির তুই ভাবিকে জানাসনি।
-তোর মেন্টাল ভাবী আমার জন্য কোনো সুন্দর মেয়ে দেখে কিনা সেই ভেবেই কিছু বলিনি। আমি রেগেই আছি।
কিন্তু আমি রাগতো মুখে মুখে দেখাচ্ছি। ভিতরে আছে লোকটির প্রতি এক পৃথিবী ভালোবাসা। তার প্রাপ্তি আমি ছিলাম আর আমাদের সবার প্রাপ্তি আসতে চলেছে দুনিয়াতে। পৃথিবীটা এতো সুন্দর কেন!

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত