অবুঝপনা

অবুঝপনা
ভরদুপুরে আম্মুকে রান্নার কাজে সাহায্য করছিলাম। হঠাৎ পিয়াসের ফোন,, নিলু বলেই হাওমাও করে কাঁদতে শুরু করে দিলো। আমি বললাম,,এই পিয়াস কাঁদছো কেন? কি হয়েছে তোমার? একটু আগেও তো ভালো ছিলে। নিলু তুমি কই,, বলেই সে আবার কাঁদতে শুরু করে দিলো। আমার মনে হলো এই মুহূর্তে ঠাটিয়ে একটা থাপ্পর বসিয়ে দিতে পারতাম ওর বাম গালে। ঢং ধরেছে দুপুর বেলা। এই হয়েছেটা কি বলবা তো? ভ্যা ভ্যা করে কাঁদছো কেন? কান্নার গতি একটু কমিয়ে পিয়াসের কথার দরজাটা একটু খুললো মনে হয়। নিলু আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে বাবা। আমি তোমাকে ছাড়া বাচবোনা নিলু। আমাকে নিয়ে যাও তুমি। আমি রিতীমত কাঁদবো নাকি হাসবো বুঝতে পারছিনা। আমার মুখের শব্দভান্ডার সব ছুটি নিয়েছে। আস্ত একটা গর্দভ। রাগ,ক্ষোভ আর একরাশ বিরক্তি নিয়ে ফোনটা রেখে দিলাম। পরক্ষনে আবার ফোন। দিতেই থাকবে যতক্ষন না রিসিভ করবো। তাই ফোনটা অব করে রাখলাম। একটা ছেলে ও,,আর ও বললো টা কি!! ও কি পাগল,না পাগল হওয়া তো সম্ভব নয়। তাহলো কি সাইকো? না সেটাও নয়। ও কেমন জানি।
পিয়াসের সাথে আমার সম্পর্কটা ৩ বছরের। ভার্সিটি লাইফ থেকে।।এলোমেলো চুল, বোকাসোকা ভাব, গাল ভর্তি দাড়ি, অতি সাধারন একটা ছেলের প্রেমে পড়ে গেলাম কি করে তা জানিনা। দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও ওকে বোঝাতে পারিনি আমি ওকে ভালবাসি। তারপর কোন এক বৃষ্টিস্নাত দিনে,ক্যাম্পাসের মাঝবয়সী কদম গাছটার একগুচ্ছ কদম নিয়ে ওর সামনে কাপাকাপা হাত নিয়ে বলেছিলাম আমি তোমাকে ভালবাসি পিয়াস। স্টেটকাট বলে দিলাম। হা হা হা। অসম্ভব মেধাবী সে। খুব সুন্দর করে কথা বলে। খুব সহজ সরল। বাবা মায়ের বাধ্য ছেলে। মায়ের কথার অবাধ্য সে হয়না। তারপর পড়াশোনা শেষ হতে না হতেই সরকারী একটা চাকুরীও পেয়ে গেল। ওকে আমি এখনও বুঝতে পারিনা। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলো। ফোনটা অন করলাম। অসংখ্য মেসেজ দিয়েছে সে। কল দিলাম ওকে। একটা রিং বাজতেই রিসিভ হলো,,নিলু কই ছিলে তুমি। ফোন বন্ধ কেন। তুমি কি আমাকে ভুলে যেতে চাইছো। নিলু আমাকে ছেড়ে যেওনা। আমি মরে যাব। ওর কথা শুনে আমার মন খারাপ হওয়া উচিত কিন্তু তা তো হলো ই না।
বরং ভ্রু উঠে গেল কপালে। অস্বস্তিকর। বিরক্তিকর। ওর কথা আমার কাছে পটাশিয়াম সাইনাইটের মত লাগছিলো। এই পিয়াস কি বলছো এসব। তুমি একটা পুরুষ বুঝলে। এই কথা আমি তোমাকে বলবো কিনা তুমি আমাকে বলছো। পাইছো টা কি তুমি। আমি তোমাকে ছাড়া বাচবোনা নিলু। আমি অন্যকাউকে বিয়ে করতে পারবোনা। আমাকে এরা জোর করে বিয়ে দিয়ে দিবে। তুমি কিছু করো। আমার মাথায় কাজ করছেনা,এসব কি বলছে ও!! পিয়াস কি সত্যি সত্যি পাগল হয়ে গেল। তা কি করতে হবে আমাকে বলো শুনি। নিলু তুমি আমাদের বাসায় এসে বলবে তুমি আমাকে ভালবাসো। আমাকে বিয়ে না করলে থানায় মামলা করবো। কি!এসব বলবো আমি। মাথা খারাপ তোমার। রাখছি আমি পরে কথা হবে। বেলকোনিতে বসলাম,মৃদু বাতাস। পিয়াসের কথা খুব মনে পড়ছে। মানুষটা ভীষন ভালো। খুব সাধারন। এমন মানুষকে হারানোটা নিশ্চয় বেদনাদায়ক।
ওর মত মানুষের সাথে শুধু এই জীবনে না,পরজীবনেও থাকতে চাই। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠলাম চেঁচামেচি শব্দ শুনে। পিয়াস বাসায় চলে এসেছে। ওমা এ কি! পিয়াসের হাতে মস্ত বড় একটা ব্যাগ। আম্মু ওর সামনে দাড়িয়ে। আন্টি আমি নিলুকে ভালবাসি আমি ওকে বিয়ে করতে চাই। বাসা থেকে পালিয়ে চলে এসেছি একবারে। আম্মু একবার আমার দিকে আর একবার পিয়াসের দিকে তাকাচ্ছে। হঠাৎ সোফায় বসে পড়লেন। হয়তো আমার মতই ভাবছে, ছেলেটা পাগল কিনা। ভাগ্যিস বাবা বাসায় নেই। নইলে ওর খবর ছিলো। আমি একটু কাছে গিয়ে ওকে ইশারা করলাম চলে যেতে। আমি যা বলি তাই শোনে সে। পেছন ফিরে একবার তাকিয়ে ছলছল চোখে চলে গেল সে।
এই প্রথম আমার চোখের কোনে ফোটা ফোটা অশ্রু জমতে শুরু করেছে। পিয়াসকে ফোন দিতেই সে ভ্যা ভ্যা করে কেদে দিলো। আমি বললাম,তুমি ক্যাম্পাসে যাও আমি আসছি। পাশাপাশি বসে আছি আমি আর ও। পিয়াস তুমি কেন। তুমি একটা চাকুরী করো। তোমার যথেষ্ট বয়স হয়েছে। আমার বাসায় প্রস্তাব পাঠালেই তো বাবা বিয়েটা এমনিতে মেনে নিতো। এসব কেন পিয়াস।
বাসায় যাও। এখনই। সবাই কি ভাববে। আমার কোন কথার উত্তর না দিয়ে সে হাটতে শুরু করলো। আমি আর পিছু ডাকিনি। পিয়াস এখন আর আমাকে ফোন দেয়না। কেমন জানি হয়ে গেছে। হঠাৎই ওর ফোন,,নিলু কাল আমার বিয়ে। অথচ কেউ জানেনা, এটা আমার মৃত্যুকূপ। বলেই ফোনটা রেখে দিলো ও। বিয়ের দিন রাতে পিয়াসকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছেনা। ওর ফোনটাও বন্ধ। আমি ভয় পেয়ে যায়। সারা শরীর কাপতে থাকে। সব জায়গায় খোজ লাগিয়েও ওর খোজ কেউ দিতে পারছেনা। আমার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। বিয়ের সাজে বসে আছি। ওর পছন্দের শাড়ীতে। ওর মনের মত করে সেজেছি। ও আমাকে বিয়ে করে ওর স্বপ্নের ঠিকানায় নিয়ে যাবে। আমি অপেক্ষারত। ওর সাথে আমারই বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো। ওকে না জানাতে আমিই নিষেধ করেছিলাম। আমি কি করবো বুঝতে পারছিনা। ঘর থেকে হয়ে রাস্তায় নেমে পড়লাম। নিয়নবাতিগুলো চকচক করছিলো চারিদিকে। আমি পাগলের মত পিয়াস পিয়াস বলে চিৎকার করতে লাগলাম। কিছুদূর যেতেই দেখলাম, ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসে বসে কাদছে ও। আমার মনে হলো এবার আমি নিশ্বাসটা নিতে পারলাম বুকভরে। পিয়াস, এই পিয়াস। বলেই ওর বুকে ঝাপিয়ে পড়লাম। ও আমাকে জড়িয়ে ধরলো এই প্রথম।
কাদতে কাদতে বুক ভাসিয়ে দিচ্ছে। নিলু তুমি পালিয়ে চলে এসেছো? চলো নিলু আমরা পালিয়ে যায়। বিয়ে করে ফেলবো আজই। তোমাকে ছাড়া বাচবোনা আমি। আমি অবাক হই একটা মানুষ এতটা সহজ সরল হয় কি করে! ও কি এখনও বুঝেনি। আমার সাজগোজ দেখেও কি ওর কিছু মনে হয়নি। আমি ওর দিকে তাকিয়ে থাকি। এক ছটা নিয়ন বাতির বিজলি ওর মুখে এসে পড়েছে। চোখে জল ছলছল করছে তখনও। আমি ওর হাত ধরে হাটছি,জানিনা ঠিক কোথায় গিয়ে শেষ হবে পথচলা। নাকি আদৌ শেষ হবে কিনা। তবে ফিরে যাচ্ছি স্বপ্নের ঠিকানায় এক অবুঝপনা বালকের হাতে হাত রেখে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত