নূরি

নূরি
আমি হাসান শরীফ নিতান্ত গরীব পরিবারের সন্তান। আমার পাশে যে বোরখা পড়ে মেয়েটা বসে আছে ও নূরুন্নাহার বড়োলোক বাপের মেয়ে, আমার স্ত্রী। আমি ওকে নূরি বলে ডাকি।
গরীবী বেশ আমার মন থেকে শরীরেও বিদ্যমান। যেমন আমার অফিসে রিক্সা করে গেলে বিশ টাকা ভাড়া লাগে আমি কতদূর হেটে গিয়ে বাসে উঠে পাঁচটাকা বাঁচাই প্রতিদিন পাঁচ টাকা বাঁচলে যাতায়াত খরচ অর্ধেক হয়ে যায়। যদিও আমি মনে মনে ভাবি এমন দিন খুব শীঘ্রই শেষ হতে হবে। খাওয়া পড়া সংসার চালিয়ে ছোট বোনের বিয়ে দিয়ে বাবা মাকে নিয়ে খুব স্বাচ্ছন্দ্যে দিন কাটাবো। টাকা পয়সা জমিয়ে মাঝেমাঝে পাহাড় সমুদ্র দেখতে যাবো। আমি যখন কলেজে পড়তাম বন্ধুরা তখন সিনেমা দেখা রেস্টুরেন্টে খেতে যেত আর আমি তখন টিউশন করে ক্লান্ত হয়ে মেসে ফিরতাম।
যদিও কখনো কোন বন্ধুর বার্থডের দাওয়াত দিতো গিফট কেনার টাকার অভাবে না করে দিতাম। বলতাম আমার টিউশানি আছে থাকতে পারবো নারে। টাকাটা হয়তো ম্যানেজ হতো বাট ওদের সাথে তাল মিলিয়ে ভালো শার্ট থাকতোনা বলে লজ্জায় যেতাম না। কলেজে মেসে যাই পড়ি কোন অনুষ্ঠানে অনেক ধরনের ফ্রেন্ডরা আসে ওরা যদি কিছু মনে নাও করে তবুও আমার অস্বস্তি হতো। তাই আমার টিউশানি না থাকলেও কোথাও গিয়ে একা একা সময় কাটায়ে আসতাম। এজন্য আমাকে আর কেউ দাওয়াত টাওয়াত দিতোনা। পড়াশোনা শেষ করে চাকরির জন্য চেষ্টা করতে লাগলাম অবশেষে একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি পেলাম। সরকারির চেষ্টা অবশ্য ছেড়ে দেইনি। আমার বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে তেমন সচ্ছল পরিবার না। ছেলে এসএসসি পাশ ফার্নিচারের দোকান আছে,বোনটাও এইট পর্যন্ত পড়ে আর পড়তে পারেনি। ছোট বোনকে অবশ্য পড়াচ্ছি ইন্টারে পড়ছে।
একদিনের ঘটনা, বাসে করে যাচ্ছিলাম এক মেয়ে সিটে বসে ছিলো দেখেই মনে হচ্ছিলো বড়লোকের মেয়ে সোনার চামচ নিয়ে জন্মেছে, চেহারায় আভিজাত্য। এক ছেলে মেয়েটার পাশে দাড়িয়ে ছিলো বারবার মেয়েটার উপরে ঝুকে যাচ্ছিল আমি বুঝতে পারছিলাম মেয়েটার অস্বস্তি হচ্ছে কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারছে না। আমি ছেলেটাকে বললাম ভাইয়া একটু সরে দাঁড়ান এভাবে গায়ের উপর পড়লে তো সমস্যা। মেয়েটা কৃতজ্ঞ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়েছিল আমি তখন খেয়াল করি সে যেমন দেখতে সুন্দর চোখ দুটো আরো মায়াবী। লাভ এন্ড ফার্স্ট সাইডে আমার বিশ্বাস ছিলোনা কারন আমি যে ধরনের ছেলে তাকে প্রথমে কেউ দেখলে বলবে এই তার পোশাক এই তার রুচি বলে নাক ছিটকাবে।এজন্য আমিও কাউকে দেখে মুগ্ধ হওয়ার কথা ভাবতেও পাররতাম না। আমি মেয়েটাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে যাই কিন্তু পরোক্ষণে ভাবি এ আমি কি ভাবছি আমি মাটি আর ও আকাশ ওর দিকে তাকালে মাথা উচু করে তাকাতে হবে আমার তো সেই যোগ্যতা নাই। ওর ড্রেসাআপ বলে দিচ্ছে ও কতটা মর্ডান আর রুচিসম্পন্ন। আমি বাস থেকে নেমে অফিসের দিকে হাটা দিলাম। পিছন থেকে কে যেন ডাকছে, এক্সকিউজ মি এই যে শুনছেন। আমি ঘুরে দাঁড়ালাম বললাম আমাকে বলছেন?
-হ্যা কখন থেকে ডাকছি আপনি কি জব করেন?
-হ্যা
-প্রতিদিন একই টাইমে যান?
-হুম!
-ওহ আপনার নাম্বারটা দেওয়া যাবে?
-কেন বলুন তো?
-বাপরে ছেলেরা মেয়েদের কাছে নাম্বার চাইলে মেয়েরা আপত্তি জানায়। এখন দেখছি ছেলেরাও কম যায়না।
-না আমি আসলে বলতে চাইছিলাম আপনি আমায় চেনেন না এজন্য।
-আচ্ছা পরে বলবো আগে নাম্বার টা দিন তাছাড়া আপনি আমি এখন দুদিক যাবো অনেকক্ষণ কথা বলার টাইম ও নাই।
-আমি নাম্বার দিলাম মেয়েটা চলে গেলো আমি একবারো বলিনি আপনার নাম্বার টা দিয়ে যান। রাতে খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়েছি তখন ফোনটা বেজে উঠল অপরিচিত নাম্বার দেখেই আমার বুকে ধক করে উঠল মনে হলো ঐ মেয়েটা ফোন করেছে। আমি রিসিভ করলে বলল,,
-হ্যালো আমি নূরুন্নাহার চিনতে পারছেন ঐ যে সকালে নাম্বার নিলাম।
-হ্যা চিনতে পেরেছি কেমন আছেন আপনি?
-এইতো ভালো। আচ্ছা আমরা ফেরবুকে এড হতে পারি?
-অবশ্যই, আমার আইডি নেম হাসান শরীফ।
-আচ্ছা সার্চ দিয়ে আপনাকে রিকুয়েস্ট দিচ্ছি এড করে নেন।
আমার কেমন অবাক লাগছে সকালে দেখা হলো যে মেয়েটার সাথে আর এই প্রথম কথা হলো অথচ মেয়েটার কথা বলার ভঙ্গি এমন যেন কতদিনের চেনা। মনে হচ্ছে আমার উপর তার অধিকারবোধ। অফিস থেকে এসে প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে ওর সাথে একঘণ্টা মেসেজে কথা হয়। আমি লজ্জায় কখনো নক করিনা কারন ও এত সুন্দরী মেয়ে তারউপর বড়লোক নিজেকে আমার ছোট মনে হয়। আমি ভাবি আমার সাথে কথা বলে ওর নিতান্তই সময় কাটে। ও এমন দেখতে যে শ শ ছেলে ওকে ভালোবেসে ফেলবে আর আমি তো ওর নখের ও যোগ্য নই।
-কি ব্যাপার রিপ্লাই নাই কেন?
-এইতো দিচ্ছি তো।
-অনেকদিন হলো আমরা পরিচিত একদিন দেখা করি সময় করে তাছাড়া আপনাকে আমার আরোও জানতে ইচ্ছে হয় আমাকে আপনার জানতে ইচ্ছে হয়না? নূরি বলে। কিন্তু আমার লজ্জা লাগে মনে মনে ভাবি আমি একটা সামান্য কোম্পানি জব হোল্ডার আমার পরিবার স্বচ্ছল ও নয়। নিজেকে কেমন আড়ষ্ট মনে হয়। নূরির পিড়াপিড়িতে গেলাম একদিন দেখা করতে। ও শাড়ি পড়ে এসেছে মনে হচ্ছে পরী আসছে। চলুন ঐ খানে বসি, আমরা পাশাপাশি বসে আছি।
-নূরি বললো আমাকে আপনার কেমন মনে হয়? মনে হয় বড়লোকের মেয়ে অহংকারী টাইপ?আপনি কেমন দূরুত্ব বজায় রাখেন আমার থেকে।
-তেমনটা নয় তবে আপনার সাথে আমার বন্ধুত্ব করতে লজ্জা লাগে আপনার পাশে দাঁড়ানোরই যোগ্যতা নাই আমার।
-আপনার সাথে আমার তিনমাস হলো পরিচয় জানেন হাসান সাহেব আপনাকে কেন জানি আমার কাছে নির্ভরযোগ্য, দায়িত্বশীল মনে হয়। সেদিন বাসে যখন আপনাকে দেখলাম দেখেই মনে হলো আপনার উপর নির্দ্বিধায় নির্ভর করা যায়। জানিনা আমার ধারণা ভুল ও হতে পারে। বাট এই ক মাসে আমার সেটা আরোও বেশি মনে হয়েছে।
-কি বলতে চাইছেন আপনি আমি ওতোটাও ভালো নই হ্যা?
-আমার চারপাশে অনেক পুরুষ যারা আমাকে পছন্দ করে যাদের ক্যারিয়ার থেকে শুরু করে ফ্যামিলি উঁচু পর্যায়ের এবং দেখতেও নায়ক বরাবর।
আমার পড়াশোনা প্রায় শেষের দিকে বাবা মা চাইছেন এখনি বিয়ে দিতে অনেক ভালো ভালো প্রপোজাল ও আসছে। কিন্তু প্রথম দেখাতে কোন ছেলের প্রতি এই ফিলিংস টা আসেনি যে তার উপর নির্ভর করা যায়।ভাববেন না আমি সেই নির্ভরের কথা বলছি, যার উপর ইমোশনালি, বিশ্বাসের ভরসা করা যায়। আমি একটা প্রেম ও করতাম ছেলে সরকারি জব করতো করে এখনো। এক সময় ভাবতাম ওকে আমি চোখ বন্ধ করে ভরসা করতে পারি কিন্তু একটা সময় বুঝতে পারি ওর আসলে আমার থেকে আমার ফ্যামিলি মর্যাদাকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। শুধু ও না ওর ফ্যামিলির মানুষ ও আমাকে স্বাচ্ছন্দ্যে গ্রহন করেছিলো। তারপর ওর সাথে আমার মতের অমিল হতে থাকে। মতের অমিল হতেই পারে দুজন মানুষ দু পরিবেশের, কিন্তু সেটা দুজনের মধ্যে ব্যালেন্স না করলে কিভাবে সম্ভব। তারপর আমাদের মনমালিন্য চললে ও আমার থেকে ভালো ফ্যামিলির বড়লোক বাপের মেয়কে বিয়ে করেছে। খুব জানতে ইচ্ছে হয় ও সুখী আছে তো? শান্তি তে আছে?সুখী যে সবসময় হওয়া যায় এমনটা নয় কিন্তু শান্তি টা আমি সবসময় পেতে চাইতাম, চাই। যাকগে আমি তো বকবক করেই যাচ্ছি আপনি যে কিছুই বলছেন না?
-বিয়ে করবেন আমাকে? নূরি অবাক হয়ে তাকায় হাসানেরর দিকে। কোন ভনিতা না করে সারাসরি কথা বলছে দেখে নূরির আরো ভালো লাগে।
-মজা করলাম, আমি এটা কল্পনাও করিনা আর আপনি আমার সম্পর্কে কিছুই জানেননা। আপনার বাবা যেমন একজন ব্যাংকের কর্মকর্তা তেমনি আমার বাবা যখন যে কাজ পেয়েছে করেছে এমনকি গ্রামে থাকতে মানুষের কাজ ও করে দিয়েছে টাকার বিনিময়ে সেই টাকায় আমাদের খাওয়া হয়েছে। আমি শহরে আসার পর নিজের খরচ নিজেই চালিয়েছি মানে নিজের সাথে লড়াই করে করে এই পর্যন্ত এসেছি।আপনার মা ও চাকুরীজীবী আর আমার মা গৃহিণী।
কিন্তু আমাদের প্রথম দেখায় আমরা এসব কথা বলছি কেন বলুন তো? আপনার আরোও ছেলে ফ্রেন্ড আছে আমার থেকে স্মার্ট তাদের সাথেও দেখা করেন অবশ্যই এসব আলোচনা করেন না? আমরা ও বন্ধু হতে পারি যদিও তেলে জলে বন্ধুত্ব আমার অস্বস্তি দেয়। নূরি সেদিন আমার হাত ধরে বলেছিলো হাসান আমি আপনাকে আমার লাইফে চাই। মানুষ চিনতে মানুষের ভুল হতেই পারে আমি যদি সেই ভুল করি তবে ঠকে গেছি বলে আফসোস করবোনা। কিন্তু আমি বড়লোক বলে যদি আপনার মনে আমাকে নিয়ে সংশয় থাকে তাহলে আমরা দুজনকে আরোও ভালোভাবে জানবো বুঝবো। হঠাৎ নূরির জরুরি তলবে দেখা করতে গিয়ে আমি ভূত দেখার মত ভড়কে গেলাম কালো বোরখা মুখে নেকাব করে চলে এসেছে।
-আমি বললাম আমি তো তোমাকে বলিনি বোরখা পড়।
-কিন্তু আমি বুঝেছি তুমি পছন্দ করো। তাছাড়া এটা ভালো কাজ আমি খারাপ কিছু করছিনা।
-আমি ওর মুখটা ধরে আমার দিকে ফিরিয়ে বললাম তুমি যাই পড়ো আমার কাছে একি থাকবে। তোমার সৌন্দর্যে যেমন এখন আমি ভস্ম হতে পারি তারমানে এই না সৌন্দর্য না থাকলেও আমি ভস্ম হবোনা।
আমাদের বিয়েটা হয়েছিলো খুব সাধারন ভাবে নূরির বাবা মায়ের সাথে ওকে অনেক যুদ্ধ করতে হয়েছে। অবশেষে তারা বিয়ে মেনে নিলেও আমাকে মেনে নেয়নি। তাই আমি সহ কয়েকজন মানুষ গিয়ে বিয়ে করে নিয়ে এসেছিলাম খুব সাদামাটা ভাবে। আমার মন খারাপ হয়েছিলো প্রচণ্ড নূরির জন্য কেননা যার বিয়েতে থাকার কথা আলোকসজ্জা সব আত্মীয়দের আগমন, আনন্দ, উল্লাস অথচ চুপচাপ বিয়ে করে আমরা চলে আসলাম। আমার মা নূরিকে সাদরে গ্রহন করলেন। এরপর শুরু হলো আমাদের বিবাহিত জীবন। নূরি কখনোই আমার বাবা মা বোনকে অবজ্ঞা করেনি বরং সমীহ করেছে। আর আমার বাবা তো তার তৃতীয় মেয়ে বানিয়ে ফেলছে নূরিকে। আমাদের পরিবারে খুব সহজেই নূরি মিশে গেছে। আমার মা ও প্রচণ্ড ভালোবাসে। বউ শাশুড়ির যেমন সম্পর্ক হয় সেরকম না। আর আমার সাথে নূরির ভালোবাসা আন্ডারস্ট্যান্ডিং কোন কমতি নাই। আমি নিজেকে খুব ভাগ্যেবান মনে করি। প্রতি শুক্রবার নূরিকে বলি চলো ঘুরে আসি। আমরা কাপলদের মত ঘুরি। যেদিন ঘুরতে না যাই আমি যা যা পারি রান্না করি। তারপর বিকেলে দুজন মিলে চা খাই আর গল্প করি।
-শোন নূরি আমাদের বিয়ের তো দুবছর হতে চললো এবার প্ল্যানিং করি। আমার বাবা হতে ইচ্ছে হয়।
-নূরির মুখ লাল হয়ে যায় হুম আমিও তাই ভাবছি আম্মা অনেকবার শুনিয়েছে আমাকে। বলেছে বউমা এবার আমাকে নাতি নাতনির মুখ দেখাও তোমার ছোট ননদের বিয়ে হয়ে যাওয়াতে আমার নিজেরে খুব একলা লাগে। নূরি কথা বলতে বলতে আমার হাতখানা নিয়ে কুট করে কামড় বসায়।
-আমি বলি কি হলো এটা? কামড় দিলা কেন?
-ইচ্ছে হয়ছে তাই!
-আচ্ছা তোমার কামড়ানোর এতো ইচ্ছা? এই নাও আমার পিঠ এগিয়ে দিলাম যত পারো পিঠে কামড়াও।
-ধুর! তুমিও না যাচ্ছে তাই, মাঝেমাঝে তোমার সাথে খুঁনসুটি করতে ইচ্ছে হয়।
আমরা ডাক্তারের চেম্বারে বসে আছি নূরি বোরখা পড়ে আমার পাশে বসা ওর হাতখানা নিয়ে ধরাতে দেখি ও ঘেমে যাচ্ছে ওর আটমাস চলছে। আমাদের ডাক পড়লে চেকাপ সম্পন্ন করে বাড়ি ফিরলাম মেয়ে বাচ্চা হবে আর বাচ্চাটা উল্টে আছে সিজার করতে হবে।
আমি অপারেশন থিয়েটারের বাইরে বসে আছি আনন্দ দুঃখ দুটো নিয়েই এক: বাবা হওয়ার বাসনা আরেক মা ও বাচ্চার যেন কিছু না হয় সেই আশংকা। সিজার শেষে মেয়েকে আনা হলো প্রচণ্ড অসুস্থ অক্সিজেন দিয়ে রাখা হয়েছে। ডাক্তার এসে জানালো মায়ের অবস্থা ক্রিটিক্যাল অপারেশন করে জরায়ু কেটে ফেলতে হবে নয়তো তাকে বাঁচাতে পারবোনা। আমি কোন দ্বিধা না করে বললাম যা ভালো হয় করেন রোগী কিভাবে বাঁচাবেন সেই চেষ্টা করেন।
প্রায় একমাস পর হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরছি নূরি এখন কিছুটা সুস্থ কিন্তু মেয়েকে বাঁচাতে পারিনি। এতো ফুটফুটে মেয়ে হয়েছিলো দেখে আমার মনে হয়েছিলো একটুকরো নক্ষত্র।
বাড়ি আসার পর মা তেমন কথা বলল না কারো সাথে এ সময় নূরির মানসিক যা অবস্থা আমি সারাদিন অফিস করি ফোন করে খোঁজ নেই খেলো কিনা। মা নূরির কাছেও আসেনা মায়ের মনে হয় এসব কিছুর জন্য যেন নূরিই দোষী।
আমি অবাক হয়ে ভাবি এতো ভালোবাসা নূরির জন্য ছিলো অথচ নূরি আর মা হতে পারবে না বলে একি আচরণ মার। মা কে বলি মা এতে নূরির কোন দোষ নেই তুমি ওকে একটু সাহস দাও ওর বাবা মা কাছে নেই শুধু হাসপাতালে এসে দেখে গেলো ওর মনের অবস্থা একবার ভাবো। মা চোখ মুছে বলে বাবা তুই আমার একটাই সন্তান আমার বংশে বাতি জ্বলবে না ভেবে আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি কিছু ভাবতে পারছিনা কিছু ভালো লাগেনা।
-আব্বা বলে তাই বলে মেয়েটার সাথে তুমি এমন করবে হাসানের মা? মেয়েটা কি আমাদের কম ভালোবাসে?
-আমরাও কি কখনো তাকে কম ভালোবাসা দিয়েছি?
আব্বা আর মায়ের তর্ক লাগে! আমি থামিয়ে বলি আচ্ছা মা তোমার মনের অবস্থা বুঝতে পারছি। ঠিক আছে যখন তোমার মন ভালো হবে একটু নূরির কথা ভেবো। আমার মেয়েটা মারা যাওয়া দেড় বছর হতে চলল সময় কিভাবে দ্রুত চলে যায়। কিন্তু নূরিও দিন দিন যেন নির্লিপ্ত হয়ে যাচ্ছে কেমন একটা গা ছাড়া ভাব। ওকে নিয়ে দূরে কোথাও ঘুরতে যাবো বলে আমি টাকা জোগাড় করছি। ওকে একটা সারপ্রাইজ দিবো হঠাৎ করে বলবো ওমুক দিন আমরা সমুদ্রে যাচ্ছি। ভাবছি কথাটা আজকে রাতেই বলব। আমি ওয়েট করছি নূরির রুমে আসার।
ও থমথমে মুখে রুমে ঢুকে বলল, শোন তোমাকে আজ আমি সিরিয়াস কিছু কথা বলব তুমি আমাকে ছেড়ে দাও। না দিতে পারলে আমি ই চলে যাবো তুমি আরেকটা বিয়ে করো আমার জন্য তোমার বংশে বাতি জ্বলবে না তাতো হয়না বলো? আম্মা আমাকে মাঝে মাঝে শুনায় এসব কথা শুনতে আমার ভালো লাগে না, আম্মার যেমন কষ্ট হয় তার চেয়ে আমার দ্বিগুণ কষ্ট হয়। আমি আমার মেয়েকে একটা দিন কোলে নিতে পারিনি এমনকি নিজের পেটে বাচ্চা ধারণ করে আর কোলে নিতেও পারবোনা। এক নিশ্বাসে কথা গুলো বলে কাঁদতে শুরু করলো নূরি। আমি নূরিকে দুহাতে কাছে টেনে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলাম। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম শুধু কি তোমার একার দুঃখ হয় আমার হয়না বলো? তেমনি মায়ের ও হয়, মা মুরুব্বি মানুষ, তার প্রকাশের ধরণ হয়তো তোমাকে আঘাত করে ফেলে, আমি মাকে বুঝিয়ে বলব। নূরি কাঁদো কাঁদো অবস্থায় বলে,
-না, মা বুঝবেনা মা কি বলেছে জানো? বলেছে বউমা তুমি হাসান কে আরেকটা বিয়ে দিয়ে দাও কত মানুষ তো দুই বউ নিয়ে সংসার করে। দুই বাসা নিয়ে না হয় থাকবে। যদিও সংসার খরচ বেড়ে যাবে কিন্তু আমার বংশ রক্ষা তো হবে। জানি তোমার কষ্ট হবে বউমা আমাকে স্বার্থপর ভাবতে পারো বাট আমার জায়গা থেকে একবার ভেবে দেখো।
হয়তো উনার জায়গা থেকে উনি ঠিক। আমার এই টানাপোড়েন আর ভালো লাগছে না।
-শোন আমরা আগামী সপ্তাহে সমুদ্র দেখতে যাবো এতে আমি অনেকদিন ধরে টাকা গোছাচ্ছি তোমাকে বলা হয়নি সারপ্রাইজ দিবো বলে তাছাড়া তুমি আর এখন তেমন কিছু জানতে চাও না। সমুদ্র বেড়িয়ে এসে আমরা একটা বাচ্চা অ্যাডপ্ট করবো ঠিক আছে? প্লিজ নাহার তোমাকে আমি হারাতে পারবোনা এইটা অন্তত জানো? তুমি কখনো আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাববেনা যা কিছু হয়ে যাক। তুমি আমার এই চাওয়াকে সম্মান করো প্লিজ। নূরি আমাকে আরো বেশি করে জড়িয়ে ধরে থাকে যেন কষ্টের ধুঁকধুঁকানিটা আমি শুনতে পাই। কক্সবাজার যাওয়ার দুদিন আগে মাকে বললাম মা বলতো আজকে যদি আমার বোনের এমন কোন পরিস্থিতি হতো তুমি কি তোমার জামাই কে বলতে পারতে বাবা তুমি আরেকটা বিয়ে করো? মা চুপ করে শুনে কিছু বলেনা।
-মা আমি আর নূরি সিদ্ধান্ত নিয়েছি ঘুরে এসে আমরা একটা বেবি অ্যাডপ্ট করবো মানে বাচ্চা দত্তক নিবো তোমার নাতি বা নাতনির ব্যবস্থা করবো প্লিজ মা মেনে নাও। আল্লাহর উপর ভরসা রাখো।
যাবার দিন মা নূরকে বলে,
-বউমা সাবধানে যেও আর আমার কথা কিছু মনে করোনা তুমাকে যে আমি ভালোবাসি না তা না কিন্তু মাঝেমধ্যে মনডা মানেনা তাই উল্টা পাল্টা কই নিজের মা ভেবে মাফ কইরো।তারপর নূরি মাকে জড়িয়ে ধরে মা ও নূরির মাথায় হাত বুলিয়ে বলে যাও সাবধানে যাইয়ো। নূরি আর আমি হাত ধরে সমুদ্র দেখি পাশাপাশি বসে যেন দুজনের মনের ফিলিং অনুভব করার চেষ্টা করি।
-জানো নূরি আমার ছোট বেলার স্বপ্ন যখন চাকরি করবো টাকা গুছিয়ে মাঝেমাঝে পাহাড় সমুদ্র দেখবো। আজ আমরা দুজন এসেছি ভবিষ্যৎ এ তিনজন হলেও আসবো তুমি সঙ্গী হবেনা আমার? নূরি পাশে থেকে ওর দুহাত দিয়ে আমার একহাত ধরে আমার কাঁধে মাথা রেখে নির্ভয়ে প্রশান্তি নিয়ে বলে আসবো!!

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত