আঁধারে আলোর যাত্রী

সাইকেল চালাচ্ছেন তাজউদ্দীন। নবাবপুর রোডে একটা ঘোড়াগাড়ির পেছনে পড়েছেন তিনি। ঘোড়াগাড়িটাকে ক্রস করতে পারছেন না।

বিপরীত দিক থেকেও গাড়িঘোড়া আসছে। রিকশা আসছে।

বসন্তকাল। সন্ধ্যার পরে দখিনা বাতাস বইতে শুরু করেছে। এই সময় সাইকেল চালাতে বড় ভালো লাগে ৩২ বছর বয়সী তাজউদ্দীনের।

তার গায়ে একটা হাফহাতা সুতির শার্ট। পরনে প্যান্ট। পায়ে স্যান্ডেল।

চোখে চশমা।

তিনি যাচ্ছেন আওয়ামী লীগ অফিসে। পার্টির সেক্রেটারি মুজিব ভাই তাকে জরুরি তলব করেছেন।

তাজউদ্দীন ঘোড়াগাড়িটাকে ওভারটেক করতে পারলেন। ডানহাতে সাইকেলের বেল বাজালেন, ক্রিং ক্রিং।

পার্টি অফিসের সামনে গিয়ে সাইকেল রাখলেন।

তালা দিলেন সাইকেলে।

তারপর ভেতরে ঢুকলেন।

মুজিব ভাই বসে আছেন। তাঁকে ঘিরে আছে কর্মীরা। তিনি আবার মন্ত্রীও। এমনিতেই ভীষণ জনপ্রিয় মানুষ। তার ওপর পার্টির সেক্রেটারি হিসেবে সারাদেশে সব নেতাকর্মীর সঙ্গে তাঁর নিত্য যোগাযোগ। সবার নাম জানেন। ব্যক্তিগত বিষয়ের খোঁজখবরও নেন।

তাঁকে দেখেই তিনি বললেন, তাজউদ্দীন আসছো। আসো।

তারপর নিজেই উঠলেন। বললেন, তোমার সঙ্গে আলাদা কথা বলতে হবে। এইদিকে আসো।

তিনি তাঁকে একটু আড়ালে নিয়ে গেলেন।

তারপর বললেন, তুমি তো জানো মওলানা সাহেব পদত্যাগপত্র দিয়েছেন?

জি জানি। খবরের কাগজে পড়েছি।

হ্যাঁ। আমরাও খবরের কাগজেই পড়েছি। পদত্যাগপত্র তো খবরের কাগজে দেবার জিনিস নয়। এটা পাঠাতে হবে পার্টির সেক্রেটারির কাছে। সেক্রেটারি কমিটিতে তুলবে। তাই না?

জি।

তাঁর পদত্যাগপত্র আমরা গ্রহণ করি নাই। তুমি তো জানো, তিনি প্রায়ই পদত্যাগের কথা বলেন; কিন্তু আসলে তিনি বলেছেন, জীবনেও তিনি আওয়ামী লীগ ছাড়বেন না। জানো তো!

জি তিনি বলেছেন এ-কথা।

অলি আহাদকে তুমিও পছন্দ করো। আমিও পছন্দ করি। পররাষ্ট্রনীতি নিয়া লিডারের সঙ্গে তোমারও মতভেদ আছে আমারও আছে। তাই বলে এই কারণে তো পার্টি ভাঙা যায় না। আমরা আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব। পার্টি সিদ্ধান্ত নিলে সবাই সেটা মানতে বাধ্য। আমরা ঠিক করেছি, যারা মন্ত্রী থাকবে, তারা আর পার্টিতে থাকবে না। যারা পার্টিতে থাকবে, তারা মন্ত্রী থাকবে না। আমি মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করব। বুঝলা?

কিন্তু অলি আহাদ এটা কী করল? সে মওলানা সাহেবের পদত্যাগপত্র কেন সংবাদের জহুর হোসেন চৌধুরীর কাছে পৌঁছাইয়া দিলো? কাজটা কি সে ঠিক করেছে?

জি না।

তো এখন তোমাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হবে। তোমাকে মওলানা সাহেব বিশেষভাবে স্নেহ করেন। তুমি বললে তিনি না করতে পারবেন না। যাওয়ার সময় এক ঝুড়ি ফল নিয়ে যাবে।

জি কোথায় যাবো? তিনি তো আত্মগোপন করে আছেন।

হ্যাঁ। তিনি লুকায়া আছেন। তবে তাঁর অবস্থান জানা গেছে। তিনি আছেন সিরাজগঞ্জ মহকুমার সোহাগপুর গ্রামের কাছে। যমুনা নদীতে। নৌকায় আছেন। তুমি তাঁর কাছে যাবা। আমি চিঠি দিয়ে দিচ্ছি। তাঁকে বলবা, সোহরাওয়ার্দী সাহেব তাঁকে দাওয়াত করেছেন। এই পেস্ননে ধরেই নিয়ে আসতে পারলে সবচেয়ে ভালো। তাঁকে এখান থেকে একবারে করাচি পাঠায়া দেব।

তাজউদ্দীন আহমদ ঠান্ডা মাথার মানুষ। নিজে প্রগতিশীল।  বামপন্থার দিকেও তাঁর খানিকটা ঝোঁক আছে। স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি তিনিও সমর্থন করেন। কিন্তু এ-মুহূর্তে তিনি আওয়ামী লীগে থাকা এবং শেখ মুজিবের প্রতি আস্থা রাখাই কর্তব্য বলে স্থির করে নিয়েছেন।

১৯৫৭ সাল। ওই সময় দেশে বিমানবন্দর কমই ছিল। তখন সি-পেস্নন ছিল তাই প্রচলিত, এবং নিয়মিত। নদীর বুকে উড়োজাহাজ নেমে যেতে পারত।

তাজউদ্দীন আহমদ উত্তেজিত। সি-পেস্ননে চড়া হবে।

তিনি শেখ মুজিবের কথামতো সঙ্গে নিয়েছেন আম, জাম আর লিচু। লিচু ভালো পাওয়া গেছে। তবে আম যা পাওয়া গেছে, তা টক হবে। খেতে টক হলেও বাইরে দেখতে উজ্জ্বল হলুদ। এক ঝুড়ি ফল আর শেখ মুজিবের চিঠি নিয়ে তাজউদ্দীন তেজগাঁ এয়ারপোর্টে ছোট্ট  সাদা রঙের পেস্ননে উঠে বসলেন।

মুজিব ভাই সবকিছুর ব্যবস্থা করেই রেখেছিলেন।

ভাসানী তাজউদ্দীনকে দেখে বললেন, আইসো। এক নৌকা থাইকা আরেক নৌকায় উঠতে পারো তো মিয়া, নাকি?

তাজউদ্দীনের হাতে ফলের ঝুড়ি। সেটা তিনি আগে তাঁর  বোট থেকে ভাসানীর নৌকার পাটাতনে রাখলেন। তারপর নিজে বোটের পাটাতনে দাঁড়িয়ে এক পা বাড়িয়ে দিলেন ভাসানীর নৌকার পাটাতনে।

তাজুউদ্দীনও গ্রামেরই ছেলে। যদিও ছোটবেলায় নদীতে নদীতে সাঁতার কাটা তাঁর হয়ে ওঠেনি; কিন্তু তিনি ভালোই সাঁতার জানেন।

কে পাঠাইছে তোমারে? মজিবরে?

জি।

ক্যান পাঠাইছে?

আপনাকে নিয়ে যেতে এসেছি।

কেন?

দলের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। সেজন্য আপনি পদত্যাগ করে বসেছেন। তাতে দেশের ক্ষতি হবে। জনগণের ক্ষতি হবে। আপনি দলে থাকুন। তাহলে দলকে ঠিকপথে রাখতে পারবেন। আওয়ামী লীগ সবচেয়ে জনপ্রিয় দল। এই দলকে ঠিকপথে রাখতে পারলে দেশের ভালো।

আওয়ামী লীগ ঠিকপথে নাই। সোহরাওয়ার্দী ঠিকপথে আওয়ামী লীগরে রাখতে দিবো না। ক্ষমতা মানুষরে অন্ধ বানায়া ফেলে। সোহরাওয়ার্দী অন্ধ হইয়া গেছে।

আপনাকে সোহরাওয়ার্দী সাহেব করাচিতে দাওয়াত দিয়েছেন। আপনি করাচি যান। তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। কথা বলে যদি মনে হয় পদত্যাগপত্র উইথড্র করবেন না। করবেন না। আর যদি মনে হয় করবেন, তাহলে করবেন।

তাজউদ্দীন, তুমি দুপুরে কী খাইছো? ভাত খাও। জববার, সাহেবরে ভাত দাও।

ভাত খাবো না। আপনার জন্য মুজিব ভাই ফল পাঠিয়েছেন।

মজিবররে বইলো সে য্যানো গোস্বা না করে। আলাদা দল করা ছাড়া আমার আর উপায় নাই। অলি আহাদ কী বলে?

অলি আহাদ বলে, আমরা কেন দল ছাড়ব। আমরা দলে থাকব। যারা নীতি বিসর্জন দিয়েছে তাদের বহিষ্কার করব।

ও আর সেটা কেমন করে করবে। ওকেই তো বহিষ্কার করেছে আওয়ামী লীগ।

আপনি থাকলে সেটা নাও হতে পারতো।

আমি তো নারায়ণগঞ্জে জনসভা আহবান করছিলাম।

সেইটা তো গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পদক্ষেপ হলো না।

তুমি কী করতে বলো?

আমি বলি, আপনি আমার সঙ্গে ঢাকা চলেন। আপনি এখানে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকলে তো পরিস্থিতি পালটাবে না। আপনাকে বাস্তবতার মোকাবেলা বাস্তবতা দিয়ে করতে হবে।

ভাসানী বললেন, দাও দেখি। দুইটা লিচু দাও। আম তো মনে হইতাছে টক।

জি টক। আপনি কী করে বুঝলেন।

বয়স হইছে না। বয়স দিয়া বুঝলাম। অসময়ের আম। চেহারা ভালো। মিষ্টি আম কখনো রঙিন হয় না। তোমার আম টকটকা হলুদ। এই অসময়ের সুন্দর আম কোনো কামের হওনের কথা না। তাজউদ্দীন, তুমি আমার প্রিয় মানুষ। তোমারে বলি। আমি ঢাকা যামু না। পরিস্থিতি তোমরা যত সহজ ভাবতাছো তত সহজ না। অনেক জটিল। ইত্তেফাকে আমাকে ইন্ডিয়ার চর বলতাছে। ইন্ডিয়ার কবি-লেখকদের আনা হইছে, এইটাকে খারাপ চোখে দেখা হইতাছে। মানুষ যে এত বড় মিথ্যা কথা রটাইতে পারে, শুইনা মনটা খুব দইমা গেছে। আমি ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা আছিলাম। ইয়ার মোহাম্মদ আছিল প্রিন্টার পাবলিশার। অহন সেই ইত্তেফাক আমার বিরুদ্ধে এইসব লেখতাছে। সেই মানিক মিয়া।

আপনি কী করবেন তাইলে?

দেখি। নয়া দল করতে হইব। সারা পাকিস্তানের প্রগ্রেসিভ ডেমোক্রেটিক ফোর্সরে একত্রিত কইরা একটা বড় পস্ন্যাটফরম বানাইতে চাই। তুমি কী করবা?

আমি আওয়ামী লীগেই থেকে যাব। কারণ, পার্টি ফোরামে আপনার পররাষ্ট্রনীতি প্রশ্নে কেউ তো আপনার পক্ষে দাঁড়ায় নাই। গণতন্ত্র হলে মেজরিটির মত মেনে নিতে হবে। আর…

আর?

আর মুজিব ভাইরে আমি না করতে পারব না।

 

একটা মাছরাঙা পাখি ঝোঁ মেরে একটা মাছ তুলে নিয়ে আবার আকাশে উড়ে গেল।

যমুনার বক্ষে কী অপরূপ শোভা খেলা করছে। নদীজল কলকল করে বয়ে যাচ্ছে। একটু একটু বাতাস বইছে। ছোট ছোট ঢেউয়ে দূরে কতগুলো ডিঙি নৌকা দোল খাচ্ছে। আকাশ মেঘমুক্ত। রোদেলা চারপাশ। দূরে চরে গরু চরছে। এই চরের মধ্যে গরুগুলো কোত্থেকে এলো? তাজউদ্দীন ভাবতে থাকেন।

মাঝি ভাত বেড়েছে।

তাজউদ্দীন বললেন, ভাত খাবো না। আমাকে ঢাকায় ফিরে যেতে হবে।

না। খাও। আমি তো আর যাইতাছি না। তাড়াহুড়া কইরা লাভ কী। আমি গেলে না করাচির পেস্নন রেডি করতে হইতো!

তাজউদ্দীন নৌকায় বসে ভাত খাচ্ছেন। এক হাতে থালা ধরে আরেক হাতে খেতে হচ্ছে। মাছের ঝোল রাঁধা হয়েছে। আইড় মাছ।

আইড় মাছ তাজউদ্দীনের পছন্দের মাছ নয়; কিন্তু রান্নায় এত স্বাদ হয়েছে যে, তাজউদ্দীন বুভুক্ষুর মতো খেতে লাগলেন। খেতে গিয়ে হলুদ ঝোল পড়ল তার সাদা শার্টে। তিনি কী করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না।

ভাসানী খৈনি ডলছেন। খৈনি টানতে টানতে তিনি বললেন, জামাটা খুইলা নদীর পানিতে ধুইয়া নেও। তারপর তোমার ওই পেস্ননে যাইতে যাইতে গায়েই শার্ট শুকাইয়া যাইব।

তাজউদ্দীন মওলানা সাহেবের এই কথা শুনলেন না। মওলানার সব কথা যে শোনা যাবে না, এটা তিনি ভালো করেই বোঝেন।

তাজউদ্দীনের খাওয়া হয়ে গেছে। নদীর জলে তিনি হাত ধুলেন। এবার ফিরতে হবে।

বিদায়ের পালা। তাজউদ্দীনের মনে হলো, এই বিদায় একটা বড় বিদায়ের সূচনা মাত্র। তিনি যখনই এই ছইয়ে-ঢাকা নৌকা ছেড়ে তার বোটে উঠবেন, তখনই তিনি একটা যুগ থেকে বেরিয়ে যাবেন। আওয়ামী লীগের ভাসানী যুগ।

অবশ্য ভাসানী যে খুব স্থিরমতি মানুষ তাও নন। ঠিকভাবে আদরযত্ন করলে তিনি তাঁর মত পালটাতেও পারেন।

তাজউদ্দীনের মনে পড়ে গেল ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের দিনগুলো। মওলানা ভাসানী হাতিতে চড়ে তাঁর হয়ে নির্বাচনী প্রচারণা করতে গিয়েছিলেন। বনের মধ্যে কারা যেন আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। হাতি অস্থির হয়ে উঠেছিল। তাঁরা দুজন, ভাসানী আর তাজউদ্দীন, হাতির পিঠ থেকে পড়েও গিয়েছিলেন।

তাজউদ্দীনের বোটের সেইলরম্যানও ভাত খেয়ে নিলেন। তার খাওয়া হলে তাজউদ্দীন ভাসানীর সঙ্গে মোলাকাত সেরে বোটে উঠলেন।

তাজউদ্দীনের চোখ কি খানিকটা ভিজে উঠল?

না। তিনি আবেগপ্রবণ মানুষ নন। তাঁর চোখের জল তিনি কাউকে দেখাবেন না। মওলানা সাহেবের ফতুয়া থেকে খৈনির গন্ধ ভেসে আসছে। আশ্চর্য যে, তাজউদ্দীনের তা জীবনে প্রথমবারের মতো ভালো লাগল।

রেণু বললেন, তাইলে অলি আহাদ ভাইরে বহিষ্কার কইরে দিতেই হইলো?

তাঁর কোলে পানের বাটা। তিনি পান সাজাচ্ছেন।

মুজিব বললেন, হ্যাঁ। তাই তো।

অলি আহাদ ভাই কিন্তু মানুষটা ভালোই ছিল। কিন্তু একটু রগচটা টাইপের।

হ্যাঁ। বেশি থিয়োরিটিক্যাল। আবার একগুঁয়ে। এই রকম মানুষ দিয়া পলিটিক্স চলে না।

মওলানা সাহেবও পার্টি ছাড়লেন?

তুমি তো তাঁরে চিনোই। তাঁর কথার কোনো ঠিকঠিকানা আছে। সারাটা ক্ষণ তিনি আমাদের সরকারের সমালোচনা করেন। মতলবটা বুঝতে পারছ? ইস্কান্দার মির্জা করাচ্ছে এইসব।

তুমি কেমনে জানলা?

লিডারের কাছ থেকে জানলাম। কাগমারী সম্মেলনে লিডার দিছেন ৫০ হাজার। আবার ইস্কান্দার মির্জা দিছেন ২৫ হাজার। মওলানা সাহেব সবই নিয়েছেন।

এখন কী করবা?

দেখি, মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ তো আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হয়েছেন। আমরা তো দলে নিয়ম করছি, একই লোক পার্টি আর সরকারে থাকতে পারবে না। আতাউর রহমান সাহেব, আবুল মনসুর আহমদ কেউ থাকতে পারবে না। তাঁরা পার্টির পদ ছেড়ে দিয়েছেন।

তাহলে তুমি কী করবা?

তাই তো ভাবতেছি।

ভাবাভাবির কিছু নাই। অবশ্যই তুমি মন্ত্রীর পদ ছাড়বা। পার্টিই তোমার আসল। পার্টির এই অবস্থায় তোমারেই হাল ধরতে হইব। একটা পানের খিলি মুখে পুরে রেণু বললেন।

তাহলে এই বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে।

দিবো।

কোথায় বাড়ি নেবো?

তাই তো।

শোনো। আমি চা বোর্ডের চেয়ারম্যান হচ্ছি। সেগুনবাগিচায় ওদের চেয়ারম্যানের জন্য বাড়ি আছে।

তাইলে তো আর কোনো চিমত্মাই নাই। তুমি অবশ্যই মন্ত্রিত্ব ছাড়বা।

একটা টিকটিকি টিকটিক করে ডেকে উঠলো। দেয়ালে বকের গ্রীবার মতো বাঁকা ইলেকট্রিক বাতি ঝুলছে। তারই কাছে একটা টিকটিকি। লাইট ঘিরে উড়ছে নাম-না-জানা পোকা।

বড় বিছানার একপাশে জামাল ঘুমুচ্ছে। তার নিচে একটা লাল রঙের অয়েল পেপার পাতা। ঘরে ভেজা কাঁথার সোঁদা গন্ধ।

কবে ছাড়তেছো মন্ত্রিত্ব? বললেন রেণু।

মুজিব বললেন, লিডার আমাকে চীনে পাঠাচ্ছেন। যে-পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে এত কথা, সেটা আসলে লিডার ঠিকঠাকই পরিচালনা করতে চান। কমিউনিস্ট চীনের সঙ্গে তিনি ভালো সম্পর্ক রাখতে চান। আমি চীনে যাব। মন্ত্রী হিসেবে গেলে আমাদের লাভ বেশি। শিল্প আর বাণিজ্য ক্ষেত্রে চীনের সহায়তা আমাদের দরকার হবে। আমি গেলে বাংলার লাভ।

তাইলে এক কাজ করো। আগে পদত্যাগপত্র জমা দাও। প্রধানমন্ত্রী সেইটা গ্রহণ করে বলে দিক যে, তুমি চীন থেকে আসার পরে এটা কার্যকর করা হবে।

ভালো বলেছো তো।

না, কী ভালো বলবো। আমি গিন্নি মানুষ। পলিটিক্সের আমি কী বুঝি।

তোমার একটা সিক্সথ সেন্স কাজ করে। অনেক কিছু তুমি ভালো আঁচ করতে পারো। আর সবচেয়ে বড় কথা নিজের স্বার্থ পরিবারের স্বার্থ তুমি দেখো না। তুমি দেখো কিসে মানুষের ভালো হবে। কিসে আমার ভালো হবে।

আমি সেইটাই দেখি। আমি জানি, তুমি মানুষের ভালো চাও। আওয়ামী লীগের ভালো চাও। তাতেই তোমার সুখ। তোমার সুখের জন্যই আমিও পার্টির ভালো চাই। দেশের মানুষের ভালো চাই।

জামাল নড়ে ওঠে। মনে হয় হিসু করবে। বিছানা ভেজানোর আগেই তাকে তুলে ফেলা ভালো।

রেণু জামালকে কোলে নিলেন। তাকে বাথরুমে নিয়ে গিয়ে গেলেন কোলে করেই।

মুজিবের হাতে একটা ইত্তেফাক। তিনি মুসাফিরের কলাম পড়তে লাগলেন।

হঠাৎ করে তিনি বিড়বিড় করে উঠলেন, পারলাম না। মওলানা সাহেবকে রাখতে পারলাম না। আমি তো চেষ্টা করেছিলাম। আমি তো তাঁর কাছে বারবার করে ছুটে গিয়েছিলাম। আমি তো তাঁর কাছে ফতুল্লাহর নৌকায় গিয়ে দেখা করেছি। কথা বলেছি। আমি তাঁকে মিনতি করে অনুরোধ করেছি যেন তিনি আওয়ামী লীগ না ছাড়েন।

মুজিবের কেন যেন শামসুল হক সাহেবের কথা মনে পড়ল। আহা, বেচারির মাথাটা এলোমেলো হয়ে গেল। শামসুল হক সাহেব ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রথম সাধারণ সম্পাদক। ভাসানী ছিলেন প্রথম সভাপতি। শামসুল হক সাহেব এখন অসুস্থ। জালিম মুসলিম লীগ সরকারের কারাগারের নির্যাতন তিনি সহ্য করতে পারেননি। এই মুহূর্তে তিনি লাহোরের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি যেন সুস্থ হয়ে ওঠেন। আল্লাহ, তুমি শামসুল হক সাহেবকে সুস্থতা দান করো।

রেণু বাথরুম থেকে বেরুলেন জামালকে কাঁধে তুলে নিয়ে। তিনি জামালের পিঠে আসেত্ম আসেত্ম চাপড় দিচ্ছেন।

ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি মোদের বাড়ি এসো

খাট নাই পালং নাই চোখ পেতে বসো…

ঘুমপাড়ানিয়া গানের একটা মাদকতা আছে। মুজিবও আচ্ছন্ন হয়ে গেলেন।

জামালকে আবার শুইয়ে দিলেন রেণু।

তারপর বসলেন।

হঠাৎ নীরবতা নেমে এলো ঘরজুড়ে। চরাচরজুড়ে।

রেণু বললেন, অলি আহাদ ভাই এই রকম করতে পারলো আওয়ামী লীগের সঙ্গে?

মুজিব দাঁড়ালেন। রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে পড়তে লাগলেন :

যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে।

 

এবার তিনি বেরিয়ে এলেন বারান্দায়। ১৫ নম্বর আবদুল গণি রোডের বারান্দায়। বাগানে কী একটা ফুল ফুটেছে। গন্ধরাজ নাকি। গন্ধরাজ ফুলে নাকি সাপ আসে!  ভারি মিষ্টি একটা গন্ধ এসে তাঁর মনটাকে আরো উতলা করে দিচ্ছে। কতদিনের সম্পর্ক তাঁদের দুজনের – মওলানা ভাসানীর আর মুজিবের! কী হলো মওলানা সাহেবের! কে তাঁকে এরকম উচাটন করল? ইস্কান্দার মির্জা? নাকি গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা? চীন? রাশিয়া? ভারত? নাকি পুরোটাই মওলানার নীতিনিষ্ঠতার ব্যাপার? নাকি সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব?

নাকি তিনি চান যে, অলি আহাদ হোক সাধারণ সম্পাদক?

মুজিব রবীন্দ্রনাথ থেকে আবৃত্তি করতে লাগলেন :

মনেরে আজ কহ যে,

ভালো মন্দ যাহাই আসুক

সত্যেরে লও সহজে।

কেউ বা তোমায় ভালোবাসে

কেউ বা বাসতে পারে না যে,

কেউ বিকিয়ে আছে, কেউ বা

সিকি পয়সা ধারে না যে,

কতকটা যে স্বভাব তাদের

কতকটা বা তোমারও ভাই,

কতকটা এ-ভবের গতিকত

সবার তরে নহে সবাই।

তোমায় কতক ফাঁকি দেবে

তুমিও কতক দেবে ফাঁকি,

তোমার ভোগে কতক পড়বে

পরের ভোগে থাকবে বাকি,

মান্ধাতারই আমল থেকে

চলে আসছে এমনি রকম

তোমারি কি এমন ভাগ্য

বাঁচিয়ে যাবে সকল জখম!

মনেরে আজ কহ যে,

ভালো-মন্দ যাহাই আসুক

সত্যেরে লও সহজে।

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত