ফেসবুক ভীমরতি

ফেসবুক ভীমরতি
রাত দুটোর সময় ফোনের রিংটোনের শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো। স্ক্রিনে ভেসে উঠলো ‘প্যারা”। দেখেই বিরক্ত হলাম। না জানি এখন আমার ঘুম ভাঙিয়ে আবার কি প্যারা দেয়!
– হ্যালো
– তোমাকে না বলেছিলাম আমার ছবিতে কমেন্ট করবে? করো নি তো!
– ভুলে গিয়েছিলাম
– এভাবে রোজ রোজ ভুলে গেলে চলবে? তোমাকে তো তিন ঘণ্টা আগে একটিভ দেখলাম। তার মানে তুমি অনলাইনে ছিলে। তাহলে কমেন্টটা করো নি কেন?
– উফফ আমি মেসেঞ্জারে মেসেজের রিপ্লাই দিচ্ছিলাম। ফেসবুকে যাই নি
– তো গিয়ে একটা কমেন্ট করতে কতক্ষণই বা সময় লাগত!
– এত রাতে তুমি আমার ঘুম ভাঙিয়ে ফেসবুকে কমেন্ট করতে বলছ?
– এখনই করতে বলছি না। মনে করিয়ে দিলাম। সকালে অবশ্যই করবে কিন্তু।
– তো এটা সকালে বললেই পারতে!
– হ্যাঁ সকালে আবার মনে করিয়ে দিব। তুমি এখন ঘুমোও কেমন! শুভরাত্রি। ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দিয়ে ঘুমোতে বলা হচ্ছে? আজব! সকাল সাতটা ক্রিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম “প্যারা”। আমার জীবনটাই প্যারাময় করে তুললো!
– হ্যালো
– তুমি তো এখনও কমেন্ট করলে না
– আমি ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করতে বসলাম। এক্ষুণি অফিসের জন্য বের হব। সময় পাই নি।
– নাস্তা করতে করতে কমেন্টটা করে দাও। আমি অফিসে যাওয়ার আগেই করবে
– আচ্ছা, কি কমেন্ট করবো?
– লিখবে ওয়াও, ফ্যান্টাসটিক
– আচ্ছা করবো
– আর শোনো অবশ্যই ইংরেজিতে কমেন্ট করবে
– হুম, বাই।
এতক্ষণ যার সাথে কথা বলছিলাম উনি আমার বাবা। ফেসবুক ব্যবহার করার আগ পর্যন্ত উনি আমার বাবা ছিলেন। যখন থেকে ফেসবুক ব্যবহার করছেন আস্তে আস্তে আমার জন্য প্যারা হয়ে গিয়েছেন। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়ার সময় বাবা কয়েকদিন কল দিয়েছিলেন। যেহেতু ওরা পাশেই থাকে ফোনের স্ক্রিনে “বাবা” স্পষ্ট দেখতে পায়। কিন্তু বাবার সাথে অন্যান্য কথা বাদ দিয়ে যখন ফেসবুক নিয়ে আলাপ করতে হয় ওরা প্রচুর হাসে। একদিন সবাই চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছি। তখন বাবার কল।
– নেহাল, তুমি কোথায়?
– বাবা আমি বন্ধুদের সাথে চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছি
– তোমার অফিস তো শেষ তাই না?
– হ্যাঁ বাবা
– তার মানে তুমি এখন ফ্রি?
– হুম ফ্রি বলা যায়
– তাহলে একটা কাজ করো। আমার আইডিতে লগ ইন করো
– এখনই?
– হ্যাঁ এখনই
– কি হয়েছে বাবা? কোন সমস্যা?
– অনেক বড়ো সমস্যা
– কেন বাবা? কি হয়েছে?
– তুমি ফেসবুকে আমার জন্মসাল ১৯৬৫ দিয়েছো কেনো?
– যেটা সঠিক সেটাই তো দিয়েছি
– না সঠিক না
– মানে?
– আমার কলিগ ফারুক সাহেবের জন্মসাল ১৯৬৮ হওয়া সত্বেও উনি ফেসবুকে জন্মসাল ১৯৭৫ দিয়েছেন
– বলো কি? আচ্ছা বাদ দাও। ওনার যেটা ভালো লেগেছে উনি করেছেন।
– এটা আমার ভালো লাগে নি। সবাই তাদের বাবা-মাকে জোয়ান দেখতে চায়। আর তুমি আমাকে সবার সামনে বুড়ো বানাচ্ছো। খকখক করে কেশে উঠলাম। গরম চায়ে জিভ পুড়ে গেলো। নসিকার মাধ্যমে চা মস্তকে প্রবেশ করলো। বাবার তাতে ভ্রুক্ষেপ নেই। ওনার কি মনে হচ্ছে উনি এখনও যুবক আছেন?
– তুমি আমার জন্মসাল চেঞ্জ করে দাও
– কত দিব?
– ১৯৭২ দিবে
– আচ্ছা দিব
– এখনই দাও।
এই ঘটনার পর বাবাকে আর কখনও বলি নি যে আমি ফ্রি আছি। আরেকদিনের ঘটনা। এক বন্ধুর জন্মদিন। ওদের বাসায় দাওয়াতে গিয়েছি। বাবা কল দিলেন। অনুষ্ঠানে অনেক মানুষের জন্য ফোনে কথা বলতে সমস্যা হচ্ছিলো। সবাইকে চুপ করতে বললাম। ফোনে কথা বলছি দেখে সবাই চুপ হয়ে গেলো।
– হ্যাঁ বাবা বলো
– এটা তুমি কি করলে?
– কি করেছি?
– তোমাকে বলেছিলাম তোমার ফ্রেন্ডলিস্ট প্রাইভেসি “ফ্রেন্ডস” করে রাখতে। আমি তোমার ফ্রেন্ডদের সবাইকে রিকোয়েস্ট দিব। কিন্তু তুমি করো নি
– আসলে বাবা “ফ্রেন্ডস” প্রাইভেসি করলে তো তোমার সাথে সাথে অন্যরাও দেখতে পারবে। ফ্রেন্ডলিস্ট বাইরের কাউকে দেখানো ঠিক না
– তুমি চেঞ্জ করা মাত্রই আমাকে জানাবে। আমি ঝটপট সবাইকে রিকোয়েস্ট দিব। তারপর আবার হাইড করে দিও
– সে না হয় করব। কিন্তু আমার ফ্রেন্ডদের রিকোয়েস্ট দিয়ে তুমি কি করবে?
– ফারুক সাহেব আমার জুনিয়র হওয়া সত্বেও তার ছবিতে ৮০-৯০ টা লাইক আসে। আর আমার ছবিতে ৫০ টা লাইকও আসে না। কমেন্ট তো একদমই কম। আমার লিস্টে বন্ধু কম তাই এমন হয়। বাবার কথা শুনে আবার কাশি আসলো। আমার নিজের ছবিতেই ২৫-৩০ টা লাইক আসে। অপ্রোয়জনীয় কাউকে আমি লিস্টে রাখি না।
– নেহাল চুপ করে আছো কেন? তুমি কোথায়?
– বাবা আমি তো বন্ধুর জন্মদিনের পার্টিতে আছি
– ওহ তাহলে তো ফ্রি আছো
– না বাবা ফ্রি না। এখানে অনেক বন্ধুরা আছে
– তাতে কি! এখনই ফেসবুকে লগ ইন করো।
তোমার ফ্রেন্ডলিস্ট প্রাইভেসি চেঞ্জ করো। আমার কাজ হয়ে গেলে তোমাকে কল দিয়ে জানিয়ে দিব। কথা বাড়ানোটা সমীচীন মনে হলো না। “আচ্ছা” বলে রেখে দিলাম। এভাবে সময়ে অসময়ে বাবার সাথে ফেসবুক নিয়ে কথা হবার কারণে অনেকবার লজ্জায় পড়তে হয়েছে। তখন থেকে বাবার ফোন নম্বর “প্যারা” নামে সেভ করে রেখেছি। যাতে কেউ বুঝতে না পারে।
বাবার সাথে ফেসবুক নিয়ে এতটাই কথা হতো যে আমার গার্লফ্রেন্ড আমাকে সারাদিন ওয়েটিং দেখতো। যতই ওকে বোঝাতাম যে বাবার সাথে কথা বলছি ও বিশ্বাস করতো না। কেনোই বা করবে? মানুষ বাবা-মায়ের সাথে ফোনে অবশ্যই গল্প করে। কিন্তু সারাদিন এভাবে কেউ কথা বলে না। বিশেষ করে আমার মায়ের সাথে সখ্যতা বেশি। যতটুকু গল্প করি মায়ের সাথে করি। বাবার সাথে ফোনে দু-চারটা কথা বলেই রেখে দেই। এই বিষয়টা আমার গার্লফ্রেন্ড খুব ভালোভাবেই জানে। এখন যদি হঠাৎ শোনে যে আমি বাবার সাথে সারাদিন ফোনে কথা বলি বিশ্বাস না করাটাই স্বাভাবিক। অতঃপর, ব্রেকআপ হয়ে গেলো! অফিসে মিটিং এ আছি। বাবা কল দিয়েই যাচ্ছেন। বারবার কেটে দিচ্ছি তবুও কল দিচ্ছেন। অবশেষে রিসিভ করলাম।
– হ্যাঁ বাবা বলো
– তোমাকে আমি এগুলো শিখিয়েছি?
– কেন বাবা? আমি কি করেছি?
– তুমি যে আমার ছবিতে কমেন্ট করেছো বানান ভুল করেছো
– মানে?
– মানে Fantastic এর পরিবর্তে Fantastiv লিখেছো। আমারই ছেলে আমার ছবিতে ভুল কমেন্ট করেছে। এটা কতটা অপমানজনক তুমি জানো?
– বাবা আমি তাড়াহুড়োর মধ্যে ছিলাম তাই ভুল কমেন্ট করেছি
– ঠিক আছে। তুমি ফ্রি হয়ে কমেন্ট ইডিট করে দিবে। ভুলো না যেন আবার। রাখছি। ফোন রাখার পর দেখলাম পাশে বসা কলিগ মুচকি মুচকি হাসছেন। উনি বাবার এই ফেসবুক ভীমরতির ব্যাপারে জানেন। জানি না আর কতদিন এভাবে চলবে। হে খোদা, আমাকে রক্ষা করো!

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত