গরু কেনা

গরু কেনা
কোরবানির গরু কিনতে যাবো,বাড়ির সব পিচ্চি সদস্য হাজির,ওরাও যাবে।আমি ভয়ে আঁতকে উঠলাম। একেকটা শয়তানের ডিপো। ওরা গেলে আর গরু কেনা হবে না। আমি রাজনীতিবিদদের মতো করে পিচ্চিদের উদ্দেশ্যে ছোটখাটো একটা বক্তৃতা দিয়ে বললাম,তোমরা গেলে আর ইহ জনমে গরু কেনা হবে না। কেননা গরুরা জানে না, তোমাদের মতো ভি আইপি,দের কীভাবে সম্মান জানাতে হয়।ওরা জানে শুধু হাগতে আর লাদাতে।এজন্যই তো ওদেরকে গরু বলা হয়।
মানসম্মান কিচ্ছু বুঝে না। দেখা গেল,তোমরা লেজ ধরে আদর করতে গেলে, ওরা মেরে বসলো লাথি, অথবা তোমাদের মুখ বরাবর গরম পানি ছেড়ে দিল। তোমাদের মান ইজ্জত থাকবে? ইজ্জতের ফালুদা হয়ে যাবে না! ছোট পিচ্চি বললো, গরম পানি কী চাচ্চু? পাঁচ বছরের ভাতিজা বিজ্ঞের মতো বললো, গাধা! গরম পানি কী বুঝিস না? গরুর মুত! আমি ছোট ভাতিজাকে কোলে নিয়ে বললাম, তোমরা বাসায় থাকো,আমরা গরু নিয়ে আসছি। ভাতিজা চিন্তিত মুখে বললো,তোমাকে একা একা গরুর হাটে ছেড়ে দেবো,এইটা একটা কথা? আমাদের একটা দায়িত্ব আছে না? আমি গরুর হাটে যেতে ভয় পাই। গরু একবার লেজ নাড়া দিলে আমি ভয়ে দশ হাত দুরে ছিটকে পড়ি। একবার গরুর লাথি খেয়েছিলাম,এখনও গরু দেখলে ভয়ে থাকি কখন আবার ফ্লাই কিক মেরে বসে।গরুরা বোধহয় মার্শাল আর্টস ভালো জানে!
হাট থেকে ফিরে, আমি ব্যাথায় কোঁকাচ্ছি, ভাতিজি বললো,চাচ্চু কোরবানীর গরুর লাথি খেলেও সওয়াব, পাপ মোচন হয়।জীবনে তো কোন ভালো কাজ কর নাই,এই একটা কাজ ভালো হয়েছে!! জীবনে যেহেতু কোন ভাল কাজ করতে পারিনি,ভাবলাম,যাই গরুর লাথি খেয়ে পাপ মোচন করে আসি।মোটামুটি একটা ফুটবল টিম নিয়ে হাজির হলাম গরুর হাটে। হাটের এ মাথা ও মাথা চষে বেড়ালাম, ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে গেলাম, গরু পছন্দ হয় না। আমি একটা পছন্দ করি তো এক ভাতিজা নাকচ করে দেয়, চাচ্চু দেখছ না এটার লেজ ছোট, এটা নেওয়া যাবে না। আমি কালো একটা গরু পছন্দ করলাম, সাত বছরের ভাতিজা বললো,কালো একটা রং হলো? এই তোমার রুচি? ছ্যা ছ্যা! আমি বললাম, সাদা একটা নেই তাহলে। ছোট ভাতিজা বললো,চাচ্চু সবুজ দেখে একটা কেন,সবুজ আমার প্রিয় রং!!
আরেক জন বললো,ধুর! সবুজ আবার রং হয় নাকি? নীল রঙের গরু সব,চে সুন্দর! আমরা নীল রঙের গরু কিনবো!! মহা সমস্যা! এদের যন্ত্রণায় গরু পছন্দ করতে পারছি না। আমি গরুর সামনে যেতে ভয় পাই,ওরা দেখি কেউ গরুর লেজ ধরে টানে, কেউ টানে কান।একজন বললো,চাচ্চু এই গরুটার কান ধরে টানলে কিচ্ছু বলে না,অমায়িক ভদ্র,এটাই কেন! আরেকজন বললো, দূর এই গরুর বয়স বেশি। দেখছিস না, দাঁত কেমন হলুদ! মনে হয় ব্যাটা দাঁত মাজে না!! আমি পড়লাম মহা বিপদে। এদিকে একজন দালাল আমার পিছনে পিছনে ঘুরছে, পাঁচ মনের একটা গরু দেখিয়ে দালাল বলছে, ভাই,কম করে হলেও সাত মন মাংস হইবো, এটাই কেনেন।গরুটার চেহারা দেখছেন, কেমন মায়া কাড়া চেহারা,বোম্বের নায়িকার লাহান!যখন মাংস খাইবেন, মনে হইবো মাখন খাইতাছেন!!
আমি বললাম,দাম কতো? দালাল একগাল হেসে বলল,ভাইজান কোরবানির গরু দরদাম করে কিনতে হয় না,দামাদামি করলে সওয়াব পাবেন না,তবে আপনাকে আমি একেবারে পানির দরে কিনে দিব। পানির দাম শুনে আমার গলা শুকিয়ে গেল,তাড়াতাড়ি এক বোতল পানি কিনে ঢকঢক করে পেটে চালান করে দিলাম।কোরবানির গরু কিনতে এসে নিজেই কোরবানি হয়ে যাব নাকি রে বাবা! কাঠ ফাঁটা রোদে হাটের এ মাথা থেকে ও মাথা ঘুরলাম। গরু পছন্দ করতে পারলাম না। গরমে নেয়ে ঘেমে একাকার হয়ে গেছি। কোথাও বিশ্রাম করা দরকার। আমরা একটা জুতার দোকানে ঢুকলাম। ফ্রীতে এসির বাতাস খাওয়া যাক। দোকানে ঢুকে পিচ্চিরা ছোটাছুটি শুরু করলো। আমি চুপচুপ দাঁড়িয়ে আছি। সামনেই একটা পত্রিকা পড়ে আছে। আমি পত্রিকা হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করলাম। একটা হেডিং দেখে মাথা খারাপ হয়ে গেল। তাতে লেখা,,,আগামী কাল জনপ্রিয় গায়িকা সালমার গোয়ায় কনসার্ট!
হেডিং দেখে আমার পাশে দাঁড়ানো একজন মন্তব্য করলেন, উনার ওখানে এতো বড় কনসার্ট কীভাবে হবে? ওখানে কী এতো জায়গা আছে? ফাজলামো পাইছে!! বিস্তারিত পড়ে জানতে পারলাম, সালমা এখন ইন্ডিয়া ট্যুর করছেন এবং আগামীকাল গোয়া নামক জায়গায় কনসার্ট করবেন!! পত্রিকা পড়ে রাখতে যাবো, পিছনে এক ছেলের কন্ঠ শুনতে পেলাম, আপা,পাদেন! লে হালুয়া! এই দিনেদুপুরে একটা ছেলে একটা মেয়েকে পাদতে বলছে! দেশটার হলো কী!! পিছনে ফিরে ভালো করে তাকিয়ে দেখি, একটা সুন্দরী মেয়ে সোফায় বসে আছে আর দোকানের সেলসম্যান ছেলেটা তার পায়ের সামনে নতুন জুতার মাপ ঠিক আছে কিনা চেক করার জন্য বলছে, আপা, পা দেন!! আর আমি কিনা শুনেছি, আপা, পাদেন! নাহ,কানের ডাক্তারের কাছে যেতে হবে দেখছি! অবশেষে দালাল ধরে আশি হাজার টাকা দিয়ে সাদা রঙের একটা সুন্দর গরু কেনা হলো।
এক ভাতিজা বেঁকে বসল, তার গরু পছন্দ হয়নি। তার প্রিয় রং সবুজ। সে বললো,চাচ্চু, তুমি শুধু ওর কথা শোন,আমাকে পাত্তা দেও না, তোমার সাথে আমি নাই!এই গরু কিনলে আমি ঈদ করবো না! তাকে ঘুসটুস দিয়ে বিরানী খাইয়ে তারপর শান্ত করলাম!! পিচ্চি সবাই মিটিং করে সিদ্ধান্ত নিল,গরু হাটিয়ে বাসায় নিয়ে যাওয়া হবে,মাত্র তো দুই ঘন্টার পথ! কোরবানির গরু হাটিয়ে নিতে হয়। এতে গরু কিনে ওয়ালার ইজ্জত বাড়ে।ভয়ে আমি আরেক বোতল পানি খেলাম!! আঁশলি করতে গেছি, এক ভাই জিজ্ঞেস করলেন, গরুর দাম কতো? দাম বলতেই বললেন,ধুর, আপনি মিথ্যে বলছেন, এ গরুর দাম এতো নয়।এই দামে তো হাতি কেনা যায়! লে হালুয়া! আমার পকেট থেকে আমিই চুরি করলাম নাকি রে বাবা! দালাল বলেছিল, কোরবানির গরু বেশী দামাদামি করতে হয় না,তার কথা শুনে কী বাঁশ খেলাম! কিছুদুর আসতে আরেক ভাই জানতে চাইলেন,দাম কতো? আমি বললাম, আশি হাজার।
যেতে যেতে বললেন,ফুটানি! কমদামে গরু কিনে বেশী দাম বলছে!দেশটার যে কি হবে! আজকাল লোকজন কোরবানিতেও মিথ্যা কথা বলে! দুই কদম সামনে এসেছি, একসাথে দুইজন দাম জানতে চাইলেন।দাম শুনে একজন বললেন,ঠিকই আছে।আরেক জন বললো,মোটেই ঠিক নাই, এই দামে আরও বড় গরু কেনা যেত। আপনি কচু বুঝেন,,,, আপনি ঘেচু বুঝেন,,,, জীবনে গরু কিনেছেন,,,, মিয়া আমাগো গরুর ফ্যাক্টরি আছে,,, আপনে মিয়া একটা আবাল,,,, আপনে বলদ,,,দূ,জনের মধ্যে তুমুল ঝগড়া বেধে গেল! এক ভাতিজা বললো,চাচ্চু এরা ঝগড়া করছে কেন? আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম, এরা ঝগড়া করছে, কারন এরা বাঙালি।বাংগালীর কাজ হচ্ছে অকারণে ঝগড়া করা।
ঝগড়া থেকে দশ কদম সামনে গিয়েছি,,ঐ মিয়া গরু কতো নিল?দাম বললাম, তিনি বললেন, সাদা গরু কিনলেন কেন? সাদা আমার দু, চোখের বিষ।লাল গরু বাজারে ছিল না? কোরবানির জন্য লাল গরু ভালো। এক বুড়ো লোক আসছিল,গরু দেখে বললো, ইন্জেকশন দেওয়া গরু, দেশী গরু কিনতে পারলেন না? এ গরুর মাংস খাওয়া আর বিষ খাওয়া সমান।মিয়া টাকা দিয়ে বিষ কিনে আনলেন? ছোট ভাতিজা ভয় পেয়ে যায়, সে বললো চাচা, এই লোক কি বলছে? আমি বললাম,কিছু না চাচ্চু,বাংগালীর কাজ হচ্ছে বেশি কথা বলা। এক পরিচিত বড় ভাইয়ের সাথে দেখা হলো, তিনি দাম শুনে বললেন,দাম যাই হোক, একটা ইন্ডিয়ান বলদ কিনলে ভাল করতে। বলদে মাংস বেশী হয়।
আমি বললাম, ঠিক আছে ভাই, আগামী বছর আপনার কথামতো ইন্ডিয়ান বলদ কিনবো! বাড়ির সামনে চলে এসেছি,এক সরকার দলীয় নেতার সাথে দেখা।আমাকে দেখেই বললেন,ভাইজান গরু কিনতে গেছেন,আমাকে বলবেন না! আমি সাথে থাকলে কম দামে গরু কিনতে পারতেন,কেউ আপনাকে ঠকাতে সাহস পেত না।বেশী দাম চাইলে টেংরি ভাইংগা দিতাম না!আঁশলি ফাসলি তো দেওয়াই লাগতো না!! ঠিক আছে ভাই, আগামী বছর গরু কিনলে আপনাকে সাথে রাখবো! গরু বাড়িতে এনে সবে বেঁধেছি, ভাতিজারা দৌড়াদৌড়ি শুরু করেছে,কেউ চায় পানি খাওয়াতে কেউ গেল ঘাস কেটে আনতে।
প্রতিবেশীরা দল বেধে এলো গরু দেখতে। দাম শুনে কেউ বললো,দাম বেশী হয়েছে,কেউ বললো,না ঠিকই আছে। আরেক দল বললো,গরু সস্তা হয়েছে। এর চেয়ে সস্তা কিনতে হলে তো মাগনা কিনতে হয়! এক প্রতিবেশী বললো,কম করে হলেও পাঁচ মন মাংস হবে।সাথে সাথে আরেকজন প্রতিবাদ করে বললো,মোটেও না, চার মনের বেশী মাংস হতেই পারে না। হলে সে হাতে চুড়ি পরবে। অপরজন বলল, পাঁচ মনের কম হলে সে শাড়ি পরবে। লেগে গেল তুমুল ঝগড়া। আমি আফসোস ছেড়ে বললাম, হায় রে বাঙালি!

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত