লুকানো গল্প

লুকানো গল্প
আমার আর মিলির আজ তৃতীয় বিবাহবার্ষিকী।অনেকদিন আগে থেকেই আমাদের মধ্যে একটা প্রতিজ্ঞা ছিলো যে,এই বিশেষ দিনটিতে আমরা দুজনেই নিজেদের এমন একটা গোপন ব্যাপার শেয়ার করবো যেটা এখন অব্দি কোনোদিনও শেয়ার করা হয়নি। কথা অনুযায়ী গত রাতেই মিলি বলে ফেললো ওর মাধ্যমিকে পড়ার সময় একটা প্রেম হয়েছিল ছ’মাসের। কিন্তু ওর বাবা জানতে পারায় ওর স্কুল বদলে দেয়,ওদের সম্পর্কটাও এর পরে আর টিকেনি। কথাটা বলে মিলি সামান্য ভয়ে ছিলো,আমি কি না কি বলি আবার। নাহ,তেমন কিছুই বলিনি।আর বলার প্রয়োজনও মনে করিনি কারণ এতো বছর আগেকার ঘটনা। এরপরই মিলি আমাকে জোর করে বসলো,আমার এমন একটা গোপন ঘটনা ওর কাছে বলতেই হবে। ওর কাছে আমি সামান্য সময় চাইলাম মানে পরদিন দুপুর পর্যন্ত। ও তো একদম মানতেই নারাজ।তাও আমার উপর বিশ্বাস রাখলো। রাতে ও বারবার জানতে চাইলেও আমি বলিনি।
কারণ আমি ওর কাছে এমন একটা কথা বলতে যাচ্ছি যেটা শুনলে ওর ভীষণ মন খারাপ যেমন হবে, তেমনই এর প্রতিক্রিয়াটাও ঠিক কি হবে সেটা বুঝে উঠতে পারছিলাম না,তাই এই সময়টুকু চাওয়া। এই ঘটনাটা আসলে আমাকে অনেক বছর থেকেই পোড়াচ্ছিল, ওকে বিয়ে করার কিছু দিন পর আমার সেই অনুশোচনাটা আরো কয়েকগুন বেড়ে যায়। মিলি সকাল থেকেই বারবার আমার দিকে তাকাচ্ছিলো,জানি না ও কি ভাবছে। ঠিক দুপুর ১২ টা,দুপুরের খাবার ততক্ষণে তৈরি। চিংড়ি আর পাবদা মাছ রান্না করেছে আজ, বিশেষ দিন বলেই আমার এ প্রিয় খাবারগুলো ও তৈরী করে রেখেছে। আমি ভাবলাম আগে খেয়ে নেই তারপর বলি। ও বললো একদমই না। আগে শুনবো তারপর খাবে। আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা মিলি,বিয়ের আগে তোমায় কে সবথেকে বেশি ভালোবাসতো ? ‘দিদি’ কথাটি বলে ও একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। এরপর আবার বললো,দিদি মারা যাওয়ার পর মা,তবে দিদির মতো এতোটা বেশি আমাকে কেউ আর কখনোই ভালোবাসেনি।
– আমিও না ?
– না।
– আচ্ছা। মুহূর্তেই ওর মন খারাপ হয়ে গেলো।
– তো দিদি কিভাবে মারা গেলো ?
– চাকরির ইন্টারভিউ দিয়ে বাড়ি ফিরছিলো একটা অটোরিকশায় করে, ফেরার পথে একটা ট্রাক এসে ওর অটোরিকশা চাপা দিয়ে চলে যায়।
– তোমরা ব্যাপারটা কখন জানতে পারলে ?
– তিন ঘন্টা পর। (প্লিজ এসব নিয়ে এখন কথা না বলি,আমার ভালো লাগছে না এগুলো বলতে বা মনে করতে) তোমার গল্পটা বলবে,না আমি চলে যাবো এখান থেকে।
– বলছি শোনা।
ছ’বছর আগেকার কথা,তখন আমার বয়সও কম, সবে এই কোম্পানিটায় জয়েন করেছি। মার্চের মাঝামাঝি সময়ে একদিন হঠাৎ অফিস থেকে আমাকে একটা কাজের জন্য সিলেটে পাঠানো হয়েছিলো। ড্রাইভার বাবু ওইদিন কি একটা অজুহাতে কাজে আসে নি। তাই আমি নিজেই ড্রাইভ করে গিয়েছিলাম অফিস পর্যন্ত। এরপরে তো আবার সোজা অফিস থেকে সিলেট। পুরোটা পথ আমি নিজেই ড্রাইভ করে গেলাম আর ওইদিন আমার সাথে অন্য কেউ ছিলোওনা। ঘন্টা তিনেক পরে,ঢাকা-সিলেট হাইওয়ে থেকে আমি একটা বাইপাস রোড ধরি কম সময়ে পৌঁছানোর জন্য। নবীগঞ্জের নিরিবিলি একটা রাস্তা,দুপাশে বড় বড় কতগুলো গাছ। কিছুদূর যাওয়ার পরই সামনে একটা ব্রিজ দেখতে পাই। ব্রিজের ওপার থেকে একটা অটোরিকশা আসছিলো। আমার গাড়ির পেছনে ছিলো একটা পাইপবোঝাই ট্রাক। একটু পর পরই হর্ণ দিচ্ছিলো। অগত্যা ব্রিজে ওঠার আগে আগেই আমি ট্রাকটিকে সাইড দেই। আর এর কয়েক সেকেন্ডের মাথাতেই একটা বিকট শব্দ। সামান্য চিৎকার।
আমি বুঝতে পারছিলাম সামনে কিছু একটা ঘটেছে। গাড়িটা দাঁড় করালাম। সামনে ট্রাক থাকায় স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছিলাম না যে কি হয়েছে। ট্রাকটা মিনিট দেড়েক দাঁড়ালো তারপর খুব দ্রুতগতিতে চলে গেলো। ট্রাক টা সরার পরপরই দেখতে পাই,সেই অটোরিকশাটা। ট্রাকের সামনের চাকার নিচে পড়ে একটা দিক একদম পিশে গেছে। আর অটোরিকশা ড্রাইভারের মাথাও মিশে গেছে রাস্তার কালো পিচের সাথে। রক্তে চারদিকটা একদম লেপ্টে গেছে। আর ওই অটোরিকশার মধ্যে যে একজন মধ্যবয়সের যাত্রী মহিলা ছিলেন তার শরীরের অর্ধেকটাও ট্রাকের নিচে পড়ে পিষে গেছে। মাথায়ও আঘাত পেয়েছেন তবে কোমর থেকে বাকি অংশের দিকে আর তাকানো যাচ্ছিলো না। মহিলাটা খুব জোরে জোরে কয়েকবার নিশ্বাস নিলেন তারপর একটু থেমে মাথাটা সামান্য নাড়ানোর চেষ্টা করলেন। আমি বেশ ভয় পেয়ে যাই।
ট্রাকের নম্বরটাও লিখে রাখতে পারিনি যে পুলিশকে জানাবো। একবার ভাবলাম মহিলাকে নিয়ে গাড়িতে করে হাসপাতালে যাই,পৌঁছাতেও যে সর্বনিম্ন আধাঘন্টা লাগবে সেটাও বুঝতে পেরেছি। আর তার অবস্থা এতটাই খারাপ ছিলো যে,মনে হলো গাড়িতে তোলার আগেই মারা যাবে। আশেপাশে কোনো মানুষজনও নেই আর দোকানপাটও নেই। তার উপরে জায়গাটাও সম্পূর্ণ অপরিচিত আমার কাছে। আমি যদি তাকে গাড়িতে তুলি,আর দু এক মিনিটের মাথায় যদি সে মারা যায়,তাহলে আমি তাকে নিয়ে কি করবো কই যাবো। উল্টো পুলিশ আমায় ধরবে। আমি ওখানটায় তিন চার মিনিট ছিলাম। তারপরে আবারও গাড়ি স্টার্ট করে চলে আসি। ওইদিন রাত্রিবেলা খাবার টেবিলে বসে টিভি অন করতেই আমি বেশ বড়সড় একটা ধাক্কা খাই। খবরে দেখাচ্ছিলো আজ নবীগঞ্জে সড়ক দূর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই একজন পুরুষ ও একজন মহিলা মারা গেছেন। যদিও পুলিশ এ ব্যাপারে এখনো বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
বুঝতে পারলাম আমি চলে আসার কয়েক মিনিটের মাথাতেই হয়তোবা ভদ্রমহিলা মারা গেছেন। জানিনা কেনো,এর পর থেকে আমি এ ব্যাপারটা নিয়ে রোজ অনুশোচনায় ভুগতাম। একজন সাইকোলজিস্ট দেখিয়েছিলাম,তারপর থেকে একটু কম। কিন্তু আমাদের বিয়ের মাসখানেক পর যখন তুমি তোমার বোনের ছবিটা আমাকে দেখালে, আমার তাকে চিনতে একমুহূর্তও দেরি হয়নি। আমার চোখে কেবলই তার ওই অ্যাকসিডেন্ট এর পরের মুখটা ভেসে উঠছিলো। এরপর থেকে অনুশোচনাটা আরও বাড়ে, তবে আমি আর সাইকোলজিস্ট এর কাছে যাইনি। তোমার সাথে থাকছি অথচ একদম মুখবুজে,তোমাকে একটাবারও বলিনি। বারবার মনে হতো,যদি তোমাকে বলি তাহলে হয়তোবা তুমি আমায় ছেড়ে চলে যাবে। মিলি এরপরে আমার সাথে আর একটা কথাও বলেনি।
ওইদিন বিকেলেই চুপচাপ ওর বাবার বাড়িতে চলে গেছিলো। আমি সামান্য ভয়ে ছিলাম,যদি আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দেয়। মনে হচ্ছিলো যেন এটাই আমার সেই কৃতকর্মের শাস্তি। এর ২১ দিন পর একদিন বিকেলে,মিলি বাড়িতে ফিরে আসে। এরপরের দু মাসের মতো ও একদম চুপচাপ ছিলো। প্রয়োজন ছাড়া আমার সাথে আর একটা কথাও বলেনি। যদিওবা সময়ের সাথে সাথে আমাদের মধ্যকার এ দূরত্বটা অনেকাংশেই কমে গেছে। তবে এরপর আর কোনো বিবাহবার্ষিকীতেই ও আমার কাছে আর গোপন কিছু জানতে চায় নি। চতুর্থ বিবাহবার্ষিকীতে ওকে জিজ্ঞেস করছিলাম, এবার আর শুনবেনা আমার লুকানো কথাগুলো ? ও উত্তর দিলো, নাহ,লুকানো কথা লুকানোই থাক।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত