হৃত সংগ্রামের গল্প

এক.

এই সামনে বসে তাঁকে স্পষ্ট দেখা যাবে না। চেহারায় নানা বর্ণ আছে; বয়স নানা রং দেয়, এখন সেই পোড়া তামাটে রং বিদ্যুতের আলোয় প্রায় বিলীন। একটু পরে পাদপ্রদীপের আলোয়, চাই কি ছুঁড়ে দেয়া আলোয়, সেই রং-ও অদৃশ্য হয়ে যাবে।

এ-রকম পোশাকেও নয়। সময়, কর্ম শরীরে অনেক কথা লিখে দেয়, পোশাক সব ঢেকে রাখে।

এই পাশ থেকে তাঁকে দেখা যাচ্ছে। সাদা দেয়ালের গায়ে তাঁর মুখের রেখায় তবুও অন্ধকারের ছাপ। সামান্য ঘাড় ফেরালে কিছু আলোর কণা তাঁর অবশিষ্ট শ্বেত কেশ বড় স্পষ্ট করে, তাই এইভাবে সম্পূর্ণ অন্ধকারে মুখ, চোখ, চুল, পোশাক ছাড়া কেবল অস্তিত্বহীন কেউ থাকে না।

বরং তাঁকে পেছন থেকে দেখা যাক। পাদপ্রদীপের আলো তাঁর মুখে, এখান থেকে দেখলেই নিরাবয়ব তিনি স্পষ্ট।

 

দুই.

আমি তাঁর সঙ্গে সর্বদাই থাকি তবুও যে তিনি আমায় সব সময় দেখতে পান, এমন নয়। নিদ্রাকালে তো নয়ই।

 

তিন.

টেলিফোন হাতে তুলে নেন তিনি। প্রথম কথাটি বলবার সময়ে তাঁর গলা স্থির ছিল। পরমুহূর্তে সেটি অস্থির হলে, বোঝা যায়। টেলিফোনের অপরপ্রামেত্ম যে আছে তার সঙ্গে তাঁর পরিচয় খুব দৃঢ় নয়, বোঝা যায়। নাহলে স্বচ্ছন্দেই তিনি বলে দিতেন কোন হোটেলে ওই দল উঠেছে। সব খবরই তাঁর জানা। খবর যারা তৈরি করে তাদেরই একজন হয়ে তিনি সেখানে বসে আছেন। যদিও ওই মুহূর্তে সব সংবাদই যে তাঁর কাছে আসে এমন নয়। এতে তাঁর অস্বস্তি, উদ্বেগ আরো বাড়ে। নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টায় তিনি সফল নন, বোঝা যায়।

কী দরকার তাদের ওই ঠিকানায়? নিম্নণস্বরেই বলেন তিনি। এবং পরমুহূর্তেই কিছু না-ভেবেই বুঝি মোটা দাগে হোটেলের নামটি বলেন। ভাবনা বুঝি এই ছিল যে, সঠিক হদিস না দিলে কেউ সেখানে পৌঁছুতে পারবে না। তাঁর মুখে আলোছায়ার খেলা, উদ্বেগ কি অস্বস্তির আসা-যাওয়া দেখবার মতো সেখানে আর কেউ নেই, এই বুঝি ভাবেন তিনি। আমি সেটি বুঝি।

আসন ছেড়ে উঠে আসেন। দেয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়ালেও চোখ খুলে কিছু দেখেন না। তবুও কিছু দেখার ইচ্ছে না-থাকলেও চোখ তো তাঁকে খুলতেই হবে – চেয়ারে ফিরে যাবার জন্যেও। আর মুহূর্তে যদি ডাক পড়ে মহা-আধিকারিকের ঘরে তাহলে দরজার নিশানা খোঁজবার জন্যও তো তাঁকে চোখ খুলতেই হবে।

এবং এই চোখ খোলা, বন্ধ করা, দেয়ালের দিক থেকে সরে চেয়ারে বসা অথবা দরজার দিকে উঠে যাওয়ার জন্যে যে শক্তির প্রয়োজন তা তাঁর আছে – এই বুঝি ভাবেন।

 

বড় রাস্তার ওপরেই প্রসিদ্ধ পান্থনিবাস। নানা বর্ণের নানা পোশাকের নিবাসীদের সর্বদা যাওয়া-আসা। সকলের মুখের দিকেই যে কেউ তাকিয়ে থাকে এমন নয়, তবুও যারা জানে তারা নিজেকে স্পষ্ট করতে না-চাইলে আড়ালেই থাকে। তিনিও বুঝি অমন। না-হলে আট-দশজনের ছোট দলটি যখন দরজা খুলে ধরে অন্যদের সঙ্গে তাঁরও তো ভেতরে ঢুকে যাওয়া উচিত ছিল। তবুও আড়ালেই রয়ে যান তিনি।

কিন্তু অমন করে অনেক সময় কাটানো যায় না। তিনি দরজার সামনেই চলে আসেন। এবং যারা গেছিল ভেতরে বুঝি বাইরে এলে তাদের জিজ্ঞাসা করবেন তাঁর কথা কি কোনোমতে কোনো প্রসঙ্গে আলোচনায় এসেছিল?

 

চার.

তাঁর সাজানো ঘরে ঢুকেই মনে হয়েছিল কাজটা ঠিক হয়নি। না-এলেই বুঝি ভালো হতো।

ঘরে ঢোকা সকলের দিকে তাকিয়ে ভারিমুখে বসে ছিলেন তিনি। সকলেই যে তাঁর অমন মুখ দেখতে পায় আমার দিকে তাকালেই বুঝতে পারতেন তিনি। কিন্তু অমন করে দেখা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয় তখন। সমাগত কয়েকজনের হাতে কিছু প্রচারপত্র কিছু পুস্তিকা তাঁকে ভাবায়। কেউ তাঁর হাতে দু-একটি প্রচারপত্র তুলেও দেয়। সেইসব দেখে তাঁর মুখ আরো গম্ভীর হয়।

‘আমার অসুবিধে আছে’ সংক্ষেপে মন্তব্য করেন তিনি। ‘তাছাড়া আমাকে চলে যেতে হচ্ছে। সবই চলে গেছে।’ তাঁর চাকরির ধরনই এমন। এক বন্দরে নৌকা বেঁধে থাকা হয় না দীর্ঘকাল কোনো কালেই। সামান্য ঝড় এলেই সেটি টালমাটাল, এটিই বোঝানোর চেষ্টা ছিল বুঝি।

ঘরে ঢুকেই সকলে যে যেমন পারে বসেছিল। কিছু আশা, কিছু স্বস্তি, কিছু ভরসার কথাই ভেবেছিল তারা। এখন তাঁর মুখের কথা শুনে তারা ভাবতে শুরু করে। কেউ কেউ বলেও বুঝি, ‘কোনো পথ যে আর নেই, সে কি বোঝা যায় না? তাছাড়া অন্য কোনো পথের কথাও তো আমরা জানি না।’

‘আপনি আমাদের সঙ্গে এলে ভালো হতো’, বলে অনেকক্ষণ বসে থাকে তারা। তবুও নিঃশব্দ তাঁকে দেখে উঠে পড়ে সকলে। একই কথা আবার বলে, ‘এই একই পথের কথা জানি আমরা।’ বলে দরজা খুলে বেরিয়ে যায় সকলে।

একলা ঘরে বসে থাকেন তিনি। ভিন্ন মত ভিন্ন পথের চিন্তা  তাঁকে পীড়িত করে কি? তাঁর মুখ দেখে সেটি বোঝা যায়। সকলের চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে দরজা বন্ধ করতে উঠে যান তিনি। যদিও আমার দিকে চোখ পড়ে না তাঁর।

 

ঘরেই বসে আছেন আজ কদিন। নানা কথা কানে আসে। কর্মস্থলে  নানাজনের চোখের ভাষা পড়তে অসুবিধা হয় না তাঁর। সন্দেহ কি, অপছন্দ কি নিন্দা কোনো কিছুরই মুখোমুখি হবার ক্ষমতা নেই ভেবে ঘরেই বসে আছেন তিনি।

আর এমনই এক দিনে ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে যাওয়া সকলে ফিরে আসে। সকলেই সাহসী নয়। সকলেই নিশ্চিন্ত নয় তবুও তারা আবার আসে। ঘরে বসে থেকে কোনো লাভ নেই। ভেঙে যাওয়া ঘরে আর ঢোকা যাবে না। কিসের চিন্তা তাঁর। নিশ্চিত ভবিষ্যৎ কেউ দেখে না, কেউ জানে না, কিছু অজানা তো থাকবেই। তবুও স্থির সংকল্পের কোনো বিকল্প নেই।

সকলে চলে গেলে ঘরের এ-মাথা ও-মাথায় আবার সেই অস্থির পদচারণা।

মাঝে মাঝে ঘরের বাইরেও যান তিনি। শহরের রাস্তায় ঘোরার জন্যে নয়। লক্ষ্য রাখেন পরিচিত চেহারার কোনো মিছিল কি জমায়েত চোখে পড়ে কিনা। এমন নয় যে, কোনো সভা বা শোভাযাত্রা দেখলেই তাতে তিনি শামিল হবেন। বরং তিনি যেন কারো চোখে না-পড়েন সেটিই চেষ্টা। ঘরে বসে থাকাই তাই
ভালো; কিন্তু কোনোমতে পারা যায় না। কাছে, দূরে, আরো দূরে কী ঘটে চলেছে জানা না-গেলে চলবে না – এটিও বোঝেন।
তবুও এমন।

দু-একবার দূর-শহরেও গেছেন তিনি। দূর-শহরের নিজ চেহারার মানুষের অঞ্চলে বড় রাস্তায় কি পস্নাজায় চেনা চেহারার মানুষের জমায়েত কি মিছিল হয় কি-না দেখবার জন্যেই সম্ভবত। এতো বড় শহরের চওড়া রাস্তায় এপার থেকে ওপারের মানুষই চেনা শক্ত। তাই তাঁকে চিনবে কে? ওই সব কথাই আমার জানা।

 

আবারো তারা তাঁর ঘরে আসে – সকলে নয় দু-চারজনই মাত্র। বলে, ‘বেরিয়ে আসুন। আর মাত্র কিছুদিনই তো।’

সাহসের বড় অভাব তাঁর চিরকালই।

 

পাঁচ

আজ রৌদ্রের দিন। বাতাসেরও। স্বচ্ছন্দে বাইরে হেঁটে বেড়ানো যায়। হোটেলের লবিতে তাঁর জন্য যারা প্রতীক্ষারত – সকলকে তিনি চেনেন না। ভিন্ন সময়, ভিন্ন মানুষের যাতায়াত। পরিচিত বলয়ও কত সহজে পালটে যায়। যারা তাঁর ঘরে বারবার এসেও ফিরে গেছে শূন্যমনে তাদের কেউ সামনে কি পেছনে নেই। থাকবার কথাও নয়। যারা আছে তারা এই সংগ্রামী পুরুষের সান্নিধ্যে গর্বিত। শত বাধা-বিপদ পায়ে ঠেলে শত্র‍ুপুরী থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন তিনি, জানে স্বাধীন দেশের সরকারি মহল। তারাও তাকে ঘিরে থাকে সর্বদাই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নায়ক তিনি, তাঁর চারপাশে প্রসাদপ্রার্থী থাকবেই বা না কেন?

অনুষ্ঠানস্থল খুব দূরে নয়। সতেজ রৌদ্র আর খোলা বাতাসের দিনে এই পথ সহজেই হেঁটে পার হওয়া যায় ভেবে সকলে তাঁর সামনে-পেছনে নানা স্বস্তিবচনের শব্দ তুলে এগোতে থাকে। কিন্তু তাঁর চোখে সে পড়ে না। অথবা তাকে তিনি চিনতে পারেন না  – সে রাস্তার অপরপারে দাঁড়িয়ে ছিল। তিনি দেখেননি – অথবা চিনতে পারেননি; কিন্তু আমি তাকে দেখামাত্রই চিনেছি। বিদেশি কৃতবিদ্য ছাত্র – শিক্ষাশেষে সফল পেশায় কতজনই থেকে যায়, অমনি একজন কেউ।

ছয়

উজ্জ্বল মঞ্চে পরপর বসে আছেন তাঁরা। সম্মানিত অতিথি, সরকারের প্রতিনিধি, পৌরসভার কর্মকর্তা – সকলেই। দুই শহরের মেলবন্ধন ঘোষণা করা হবে। সাতসমুদ্রের এপার-ওপারের দুই শহর, দুই দেশ কঠিন সময়ে পরস্পরের মুখের দিকে না-তাকালেও এখন উভয়ের দৃষ্টিতেই সৌহার্দ্য জন্ম নিতেই পারে।

‘আমরা একই পথ দিয়ে একই লক্ষ্যে পৌঁছেছি’, মেয়রের গলা শোনা যায়। ইতিহাসে সময়ের ব্যবধান বড় কথা নয়। লক্ষ্য ও অভিন্ন গন্তব্যই প্রধান। ক্ষমতাসীন বিদেশি প্রতিনিধির দিকে তাকিয়ে মেয়র বলেন, ‘আপনার দেশকে এই সম্মান দেখাতে পেরে আমরা গর্বিত।’ মেয়র তার আসনে ফিরে এলেন। করতালির প্রবল শব্দ শোনা যাচ্ছে।

বৃত্তে এবারে এসে দাঁড়ালেন অতিথি। অত্যুজ্জ্বল আলোর বৃত্তে। পনেরো কোটি মানুষ এখন কথা বলে। দীর্ঘকালের ঘটনা নয়। তবুও পার হওয়া সময়ের কথা ভেবে, পক্ষ-বিপক্ষ না-ভেবে, সংগ্রামের কথা বলবেন তিনি। সেইসব কথা। সেইসব অমর মানুষ। তিনি তাদের প্রতিনিধি। ‘যোজন বিসত্মৃত রক্তের স্রোত পার হয়ে আমরা আজ এসে দাঁড়িয়েছি, মুক্ত মানুষ। আপনাদেরই মতো।’ তাঁর আবেগমথিত স্বর শোনা যায়।

 

বয়স্ক অধ্যাপক এখন তিনি। অফিসঘরটি অনেক বড়। ঘরের জানালাটিও অনেক বড়। ক্লাসের শেষে পরদিনের প্রস্ত্ততি নিতে নিতে প্রায়ই সেই জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকেন তিনি। জানালার পাশে একটি হেলানো চেয়ারও আছে। সেখানে বসে দূর-সবুজ পাহাড়ের সীমানা ছাড়িয়ে আরো দূর-বিশাল জলরাশির ওপারে, আরেক সবুজের কথা মনে পড়লে চোখ বন্ধ করে বসে থাকেন।

গতকালই টেলিফোন এসেছিল পুরাতন সতীর্থের। সেই সদলে ঘরে ঢোকার কয়েকজনের একজন বয়সের ভারে এখনো পীড়িত নন, তাই নানা উপলক্ষে নানা স্থানে যাতায়াত তাঁর। ‘কী যাবেন না? মন্ত্রী নিজে এসেছেন, এই প্রথম, এত বড় সম্মান!’

‘কার্ড পাইনি।’ হেসে বলেছিলেন অধ্যাপক। স্মৃতি ও মেধার জন্য সর্ববিদিত এ-কথা মনে এলে আবারো হেসে বলেন অধ্যাপক, ‘আর অনেক দূরও তো।’

টেলিফোনের অন্য প্রামেত্মর বান্ধব হিসাবে ভুল করেন না। তিনিও তাই হেসেই বলেন, ‘ঝকঝকে শেষ মার্চের দুপুরে আশি মাইল পথ – অনেক দূর নিশ্চয়ই।’

 

সাত

অনেক পেছনে দাঁড়িয়েছিল সে। কারো চোখে পড়েনি। কেউ তাকে চেনে না তাই। কিন্তু আমি তাকে ঠিকই দেখতে পাই।

এতোদূর থেকে কেউ কাউকে দেখতে পাবে না, চিনবে না ভেবে সে আরো সামনে আসে। একেবারে সামনে। ঠিক মঞ্চের নিচে। এত মানুষ বসে আছে। হেঁটে হেঁটে তাঁর সামনে এলে তার ওপরে চোখ পড়বেই – ভাবে বুঝি সে। মনে পড়বেই সেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসা দিনের কথা।

কিন্তু সাতচলিস্নশ বছর বড় কম সময় নয়। জন্মান্তরের কথাই প্রায়। শ্বেত কেশরাশিতে দু-কানের পাশ ঢাকা। বাতাসে উড়ছিল তারা। হাত দিয়ে বসিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে সে। এই সাদা যেন চোখে না পড়ে। সময় সব ভুলিয়ে দেয় এজন্যেই বুঝি। তবুও তিনি তাকে চিনবেন না, সে ভাবে।

আমি জানি তিনি তাকে ঠিকই চিনবেন – যে-মুহূর্তে আমি তাঁর সামনে এসে দাঁড়াব। নিজেকে কে না চেনে!

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত