অন্তরঙ্গ দূরত্ব

অনেকক্ষণ বসে আছি। বাইরে বৃষ্টি, সঙ্গে বাতাস। উঠে যে পড়ব, উপায় নেই। অসময়ে নভেম্বরের মাঝামাঝি হঠাৎ বৃষ্টি কেন এ নিয়ে হাবিজাবি ভেবে সময় যখন আর কাটে না, ঘড়িতে দেখি বেলা দুটো। অচেনা মানুষের বাড়িতে ভরদুপুরে এভাবে বসে থাকা নিজের কাছে যেমন অস্বস্তির, বাড়ির লোকজনের জন্যও বিরক্তিকর। এদের সম্ভবত এখনো খাওয়া হয়নি, হতে পারে আমার কারণেই। এদিকে একটু পরপর জানালার ওপারে চোখ ফেলে আকাশ দেখা না গেলেও বৃষ্টি-বাতাসের দিকে তাকিয়ে আমি যেন একটা অজুহাত দাঁড় করাচ্ছি। আসলে তো অজুহাত নয়। বৃষ্টি না হলে কি এতক্ষণ বসে থাকি? বাড়ির লোকজনও হয়তো তা-ই ভাবছে, ভাববারই কথা। তারপরও আমি যে বারবার জানালার দিকে চোখ ফিরিয়ে অজুহাতটাকে পাকাপোক্ত করতে চাচ্ছি, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

তমালের জন্য এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকবো আজ সকালেও কি ভেবেছি? আর এখন যখন তা-ই করছি, ভিতরে ভিতরে একধরনের হতাশা জমছে। তমালের অপেক্ষায় বসে আছি বলে, না বাড়ির লোকজন আমার কারণে খেতে পারছে না এ দুশ্চিন্তায়, ঠিক ধরতে পারছি না। হতে পারে দুটোর কোনোটাই নয়, কারণ পাগলাটে বৃষ্টি।

দেবেন্দ্রনাথ দাশ লেনের এই বাড়ির হোল্ডিং নম্বর ৫-৪-এ পেরেক দিয়ে মাথায় গাঁথা থাকলেও সহজে খুঁজে পাব আশা করিনি। ভয় ছিল, বাড়িটা চিনতে পারব না। এত বছরে সিটি করপোরেশন হয়তো বাড়ির নম্বর বদলে ফেলেছে, বা বাড়িটাই নেই, ডেভেলপার ভেঙে মাল্টিস্টোরিড করেছে। তবে ভরসা একটা ছিল। যে ঘিঞ্জি এলাকায় বাড়ি – তাও কুড়ি-একুশ বছর আগে যেমন দেখেছি – ডেভেলপার ঢুকবে কী করে! এছাড়া বাড়িটা বড়ও ছিল না, গা ঘেঁষাঘেঁষি অনেক বাড়িঘরের মধ্যে ছোটখাটো দোতলা। গাঢ় সবুজ রঙের পুরু কাঠের দুই পাল্লা দরজা রাস্তার কিনারে, এ দিয়ে ভেতরে ঢোকার পথ, কয়েক পা এগোলে ডানপাশে সিঁড়ি, সিঁড়ির মুখে আবার দরজা, দুই পাল্লারই, রং হয়তো সবুজই ছিল। এতদূর পর্যন্ত ভালোই মনে ছিল। পরেরটুকু কিছুটা ঝাপসা। ঢোকার পর ছোট বাড়ির তুলনায় মোটামুটি বড়সড়ো বসার ঘর, হ্যাঁ, শুধু বসার-ই, খাট বা পড়ার টেবিল এরকম কিছুর স্মৃতি মাথায় ছিল না। পাশে সম্ভবত পরপর দুটো ঘর। কখনো ওদিকে যাওয়া পড়েনি। এর পরেরটুকু আবার মাথায় গোছগাছ করে সাজানো। রং-মরা রেড অক্সাইডের সরু খাড়া সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই সিঁড়ির মুখে তমালের ঘর। আশপাশে আর কটা ঘর, এসব কি আর এত বছরে মাথায় থাকে!

সকালে একটা কাজে এসেছিলাম সূত্রাপুর। অকাজ বলাই ভালো। এক আত্মীয় টরন্টো থেকে একজনের হাতে একটা প্যাকেট পাঠিয়েছে। বাঙালিদের যা স্বভাব, কেউ দেশে যাচ্ছে শুনলেই কিছু না কিছু গছানো চাই। খুব প্রয়োজনের কিছু হলে বা যে আসছে সে চেনাজানা কেউ হলে আপত্তির কারণ থাকে না, কিন্তু যাকে-তাকে দিয়ে এটা-ওটা পাঠানো, আবার সেই জিনিস আনতে নিজে যাও বা লোক পাঠাও – গোটা ব্যাপারটাই ঝঞ্ঝাটের। এতে একধরনের গ্রাম্যতা থাকলেও থাকতে পারে। আমি জানি, রুবির কাজিন যে প্যাকেটটা তসলিম নামের টরন্টো ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্সপড়া ছেলেটার হাতে পাঠিয়েছে ওতে হয়তো একটা মেয়েদের মিনি পার্টি ব্যাগ বা অ্যান্টি রিনকেল ক্রিম বা ওভার দ্য কাউন্টার কেনা যায় এমন কোনো গাঁজাখুরি ওষুধ-টষুদ রয়েছে। রুবি হয়তো নেড়েচেড়ে সেটা কাউকে দিয়ে দেবে, আবার এই তসলিম ছেলেটা ফিরে যাওয়ার সময় বদলা কিছু আড়ং বা পিংক সিটি থেকে কিনে গছাবে। যা-ই হোক, তসলিমের সঙ্গে কথা বলে ভালো লেগেছে। মায়ের অসুখের খবর পেয়ে এসেছে, আসার পর তার ধারণা তাকে দেখেই মায়ের অসুখ ভালো হয়ে গেছে। বাসায় যেতে বলায় মাথা নেড়ে জানাল যাবে।

প্যাকেটটা নিয়ে বেরিয়েছি, রাস্তায় ভিড়-ভাট্টা, গাড়ি আনিনি ইচ্ছা করেই। হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম কতকাল পর এলাম! পুরান ঢাকা খুব একটা বদলায়নি, আর রাস্তায় আগে যেমন একটা পাঁচমিশেলি গন্ধ পেতাম, সে-গন্ধটা পাচ্ছিলাম। এই গন্ধটা সম্ভবত আর কোথাও পাওয়া যাবে না। হরেকরকম দোকানপাটে হরেকরকম জিনিসের মাদকতাময় গন্ধ। আশ্চর্য লাগছিল গন্ধটা সেরকমই আছে। আবার এও ভাবছিলাম, সত্যি কি গন্ধটা একই রয়ে গেছে, না কল্পনা করে নিচ্ছি।

সত্যি হোক বা কল্পনা, মাদকতা যে একটা আছে পরিষ্কার টের পাচ্ছিলাম, আর তখনই মনে পড়েছিল তমালের কথা। হেঁটে রাস্তা খুঁজে পাওয়া অসম্ভব, একটা রিকশা ডেকে উঠে পড়েছিলাম। আশ্চর্য হচ্ছিলাম ভেবে দেবেন্দ্রনাথ দাশ লেনে যাচ্ছি এত বছর পর। খুব যে খোঁজাখুঁজি করতে হয়েছে তা নয়। ভেবে রেখেছিলাম খুঁজে যদি না পাই, মহল্লার লোকজনকে জিজ্ঞেস করলে তমালের খবর অন্তত পাওয়া যাবে, এমনকি তমাল বা তার পরিবার যদি দেশে ছেড়ে চলে গিয়েও থাকে।

তেমন কিছুর দরকার পড়ল না। বাড়িটা শুধু পেলামই না, অবাক হলাম এত বছরেও সিটি করপোরেশন আগের নম্বরটা বদলায়নি। তবে সবুজ রঙের দুই পাল্লা কাঠের দরজা-টরজা কিছু নেই, সে-জায়গায় ইটের উঁচু দেয়াল। বাড়িতে ঢোকার পথ বলতে এখন সরাসরি রাস্তা থেকে দুটো খাড়া সিঁড়ি। অনেকক্ষণ ধাক্কাধাক্কির পর দরজা খুলতে তমাল কি আছে জিজ্ঞেস না করে যা করা উচিত তা-ই করলাম। দরজা খুলেছিলেন এক বৃদ্ধ, জানতে চাইলাম তমালদের বাড়ি কি না। বৃদ্ধ মাথা নাড়তে আমি তমালের বন্ধু বলে ভেতরে ঢোকার ভঙ্গি করতে তিনি পথ করে দিয়ে বললেন, নাই।

ঢুকতে গিয়েও দাঁড়িয়ে থেকে নাই-এর প্রতিক্রিয়ায় কী বলব ভেবে পেলাম না। আবার এ নিয়ে সোজাসাপটা কিছু জিজ্ঞেস করব কি না ভাবছি, তিনি বললেন, ‘আপনের নাম?’ জবাবে আমার মুখ ছিটকে তার আগের কথাটাই অন্যভাবে, হয়তো কোলাহল তুলে বেরোল, ‘নাই?’

বয়স হলেও ভদ্রলোকের রিফ্লেক্স ভালো, নাই-এর মানে চট করে পরিষ্কার করে বললেন, ‘আমি তো কইতে পারি না কই গ্যাছে, ভিত্রে গিয়া জিগাই, আপনে বহেন। নামটা কন নাই।’

নাম সাজ্জাদ শুনে তিনি একঝলক চোখ তুলে ডানপাশের দরজা ঠেলে সরে গেলেন। ফিরলেন পরপরই। অনেকটা নিজের মনে গজগজ করে বললেন, ‘মোবাইল ফালাইয়া যে ক্যান যায়, অহন হেরে কই বিছরাই!’

ভাবলাম এসেছি যখন, পাঁচ মিনিট বসি বা একটা চিরকুট রেখে যাই, কার্ডও রেখে যেতে পারি। তখনই এই বৃষ্টিটা।

এ তবে সেই বসার ঘর – ছোট বাড়ির তুলনায় বড়সড়ো! কী করে বলি, এ-ঘরে আগে কোনোদিন এসেছি। গাদাগাদি জিনিসপত্র চারদিকে। দুপাশে দুটো খাট, একটা তো একাই ঘরের প্রায় অর্ধেকটা  জুড়ে আছে। খাটের ওপরে রাজ্যের বালিশ, গোটানো তোশক, ভাঁজ করা কাঁথা-চাদর, রংজ্বলা ওয়াড়ের পাশবালিশ। মনে হলো রাতে মেঝেতেও বিছানা পাতা হয়। এছাড়া এক পাশের দেয়ালে পেরেকে ঝোলানো অন্তত ডজনখানেক হ্যাংগার। তাতে শার্ট, পাজামা-পাঞ্জাবি বাদেও কীসব জামাকাপড়। মাঝখানে একটা সেন্টার টেবিলের ওপর এ-ঘরের জন্য বেমানান কারুকাজময় মুরাদাবাদি ফুলদানিতে একতোড়া কাগজের ফ্যাকাশে গোলাপ। আর ধুলো। দুটোমাত্র বেতের চেয়ারের একটায় আমি, অন্যটায় বৃদ্ধ। এদিকে ঘরে একটু পরপর লোকজন ঢুকছে, কোনো দিকে না তাকিয়ে হ্যাংগার থেকে জামা টেনে পরছে, লুঙ্গির তলায় পাজামা টেনে ওঠাচ্ছে, খালি গায়ে শার্ট বা পাঞ্জাবি চড়াচ্ছে। এসবের ফাঁকে চোখে পড়ল বাঁপাশের দেয়ালে মরা গাঁদা ফুলের মালা ঝোলানো ছবিটা। তমালের বড়দা। একনজর তাকিয়ে ধরতে অসুবিধা হলো না। কী যেন নাম, বয়সে তমালের অন্তত দশ বছরের বড়, তমালের অনুপস্থিতিতে আমি এলে সমাদর করে এ-ঘরেই বসাতেন। ঢাকাইয়া না বলে শুদ্ধ বাংলায় জানতে চাইতেন, ‘কী খাবে বলো।’ মনে পড়ছে, নাম ছিল হিজল, তমাল সমাদ্দারের বড়দা হিজল সমাদ্দার। কাঠের ওই দুই পাট দরজার গায়ে নামটা কত দেখেছি।

বসে আছি তো আছিই। কথা নেই। বলতে ইচ্ছা করছে না। কেন জানি মনে হচ্ছে বৃদ্ধ আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে চান। আমি মুখে খিল এঁটে রয়েছি দেখে নিজে থেকে উদ্যোগী হতে পারছেন না। শুধু এক ফাঁকে জানিয়েছেন তিনি তমালের জ্যাঠা, পরিবার নিয়ে এখন এখানে থাকেন। জবাবে কিছু না বলে আমি ঘাড় ফিরিয়ে বৃষ্টি দেখেছি, থামছে না বলে মনে মনে গালাগাল দিয়েছি।

দুটো পঁচিশ। আর বসা যায় না। বৃষ্টি ধরার লক্ষণ নেই। ঠিক করলাম রাস্তা পার হয়ে ওপারে গিয়ে কোনো দোকানের ছাউনিতে দাঁড়াব। সিএনজি অটোরিকশা যদি পাই ভালো, না হলে রিকশা করে যতটা যাওয়া যায়। ‘আসি তাহলে’ বলে উঠে দাঁড়াতে তমালের জ্যাঠাও ওঠার ভঙ্গি করলেন, উঠলেন না, বসে বসেই বললেন, ‘তমালরে কিছু কওয়া লাগব?’ আগে ভেবেছিলাম একটা চিরকুট বা কার্ড রেখে যাব, কিন্তু হঠাৎ উঠে পড়তে গিয়ে ইচ্ছাটা বাতিল করে বললাম, ‘নাহ্।’

বাইরের দরজাটা নিজে নিজেই খুললাম, তখনই ডানপাশের দরজা ঠেলে, ‘আপনি যাবেন না’ বলে বছর তিরিশ-পঁয়ত্রিশের যে মেয়ে বা মহিলা হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকল তাকে আগে দেখেছি বলে মনে পড়ল না।

এতক্ষণ ঠায় বসে থাকার বিপরীত চিত্র। এত সময়ে এক কাপ চা পর্যন্ত এলো না, আর এখন এ কোথা থেকে উড়ে এসে যেতে মানা করছে? তাকিয়ে আছি, মেয়ে বা মহিলাটা আমাকে অবাক করে বলল, ‘সাজুদা না? বদলাননি একটুও। আশ্চর্য, এত বছরে একটুও বদলাননি। আমি বাইরে ছিলাম, এসে শুনি কে একজন মেজদার জন্য বসে আছে, নাম বলল সাজ্জাদ, আপনার এ-নাম তা তো জানতাম না। আমি খুকি, খুকি। আপনি  বসেন, আমি কাপড় চেঞ্জ করে আসছি, একদম ভিজে গেছি।’

তমালের বোনের নাম ছিল খুকি। তাই তো। বছর দশ-বারোর খুকিকে এ-বাড়িতে এলে প্রায়ই দেখতাম সাড়া নেই শব্দ নেই, মাথা ঝুঁকিয়ে বসে কারো না কারো সঙ্গে দাবা খেলছে। সে-সময় এক ইন্টার স্কুল টুর্নামেন্টে নাকি ফার্স্ট হয়েছিল। সেই খুকি এত বড় হবে এ-ই স্বাভাবিক – বিশ-একুশ বছর কম করে হলেও। চিনতে পারব না, এও খুব স্বাভাবিক, তবে ও যে এখন কথাবার্তায় চটপটে তা হয়তো বয়স বাড়ার কারণে।

খুকির কথায় খোলা দরজা বন্ধ করব কি না ভাবছি, এদিকে বৃষ্টির ছাঁটও লাগছে গায়ে, এমন সময় রিকশা থেকে যে নামল তাকে তমাল বলে চেনা বেশ কঠিন। ওর বাড়িতে ওর জন্য অপেক্ষা করছি বলেই হয়তো পারলাম। রিকশাওয়ালাকে ভাড়া মিটিয়ে ও অযথাই কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে বৃষ্টিতে ভিজল, জামাকাপড়ের যেটুকু শুকনো ছিল তাও ভিজিয়ে একশেষ করে বলল, ‘সাজু!’

আবার সেই চেয়ারে। তমালের জ্যাঠা উঠে গেছেন। একটু পর তমাল জামাকাপড় বদলে মাথায় তোয়ালে ঘষতে ঘষতে ফিরে এলো, পেছন পেছন খুকি। খুকির হাতে রেকাবিতে ম্যালা খাবারদাবার। ঘরের খাবারের বদলে খুকিই নিশ্চয় এসব আনিয়েছে – নানরুটি, খাসির চাপ, কাবাব, দই। খুকি রেকাবিটা কাগজের গোলাপওয়ালা সেন্টার টেবিলে রাখল।

প্রচ- খিদা পেয়েছিল। ‘নে শুরু কর’ বলে তমাল পেস্নট এগিয়ে দিতে গোগ্রাসে শুরু করলাম। খেতে খেতে কতক্ষণ এসেছি, বাড়ি চিনলাম কী করে, এত বছরেও একই রকম কী করে আছি এসব নানা ফালতু প্রশ্ন করল তমাল, যেসবের জবাব দেওয়ার দরকার পড়ে না। রিকশা থেকে নামার সময়ই খেয়াল করেছিলাম তমালের বেশ একটা উপচানো ভুঁড়ি হয়েছে। খেতে খেতে দেখলাম, গায়ের রং আগে যেমন ফর্সার দিকে ছিল, তেমনি আছে, মাথাভরতি কোঁকড়ানো চুল ছিল, খুব একটা কমেনি; পাক ধরেছে কান ঘিরে। তবে আগে যা ছিল না, তা দুই চোয়াল ঘিরে ঘোর কালো মেচেতার দাগ, চোখের নিচটাও কালচে।

খেয়ে উঠে আবার সেই প্রশ্নগুলোই। বিশেষ করে বাড়ি খুঁজে পেলাম কী করে? এ যেন প্রশ্ন না, একটা ধাঁধা। বুঝলাম ও কথা খুঁজে পাচ্ছে না। তবে মনে হলো যে-কথাটা সরাসরি বলতে পারছে না তা এই – কেন এসেছি? বা নরম করে বললে, এতো বছর পর কী মনে করে? যেভাবেই করুক, ও হয়তো ভাবছে প্রশ্নটা অভব্য। আর তাই অপেক্ষা করছে আমিই যেন মুখ খুলি। নিজে থেকে বলে কি ওর দুশ্চিন্তা দূর করব, না অপেক্ষা করব ও কীভাবে শুরু করে?

এত বড় ভুঁড়ি বানালি কী করে? – আমি বলি।

আর বলিস না, একশ একটা অসুখবিসুখ।

অসুখবিসুখে শরীর রোগা হয়, তোর তো উলটো, ভালো হয়েছে।

এর নাম ভালো? থাইরয়েডের গোলমালে শরীর ফুলে গেছে।

অসুখবিসুখ বাদ দে, অন্য খবর বল। বিয়ে তো করেছিস, ছেলেমেয়ে কী? তোর বউকে ডাক।

তমাল হাসল। বলল, এত বছর বাদে তোর সঙ্গে দেখা, আর আমরা কার কী নাম এও যেন ভুলে গেছি। কেউ কারো কোনো খোঁজ রাখিনি। তুই দেশে থাকলে বিয়ের সময় অন্তত খবর দিতাম। ছেলেমেয়ে দুইজন, মেয়ে ছোট, ক্লাস সিক্সে; ছেলে সামনে মাধ্যমিক মানে এখানকার এসএসসি দেবে।

এখানকার মানে?

ওরা তো ইন্ডিয়ায়।

বউ?

ওখানেই।

কলকাতায়?

শিলিগুড়ি। বউয়ের মামা-কাকারা ওখানে।

বউ-ছেলেমেয়ে কাছে নেই, তোর তো স্বাধীন জীবন।

মজা করার জন্য বললাম, তমাল মজায় যোগ দিলো না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘তোর খবর কিছু কিছু জানি। জার্মানি থেকে ফিরে বড় ফ্যাক্টরি দিয়েছিস, মহাবড়লোক। একসময় ভেবেছি দেখা করতে যাই, হয়ে ওঠেনি রে। কিসের ফ্যাক্টরি?’

স্পিনিং।

তুই না লেদার টেকনোলজি পড়তে জার্মানি গেলি!

তোর মনে আছে?

ফ্যাক্টরি কোথায়, আশুলিয়ায়?

সাভার ইপিজেডে। খবরাখবর কিছু যখন জানতি খোঁজ করলে পারতি। আমি অবশ্য তোর কোনো খবর না জেনেই এলাম। বন্ধুবান্ধবও তোর ব্যাপারে কিছু জানে না। কার কাছে যেন শুনেছিলাম তোরা ইন্ডিয়ায় চলে গেছিস। আজ এখানে এসে তোর দেখা পাবো  ভাবিনি, আর বাড়িটা পেলেও এটা যে এখনো তোদেরই এ নিয়ে সন্দেহ ছিল।

কথা শেষ না করতেই তমাল বলল, ‘সন্দেহ কেন বলছিস, বল অনুমান, তোর অনুমান ঠিক। এটা শরিকি বাড়ি, আমার জ্যাঠা থাকেন পরিবার নিয়ে, এক কাকা ছিলেন, মারা গেছেন, তার ছেলেরা থাকে। আর আমি আর খুকি।’

খুকি কি এখনো দাবা খেলে? ওর তো এতদিনে গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার কথা।

ওকে দেখে তোর কী মনে হলো? ও নিজেই মনে করতে পারবে না একসময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাবা নিয়ে পড়ে থাকত। বিয়েটা ভালোই হয়েছিল, ওর নিজের পছন্দে, টিকল না। একটা আট বছরের মেয়ে আছে, খুব সুন্দর, ওর বর মেয়েকে নিয়ে চলে গেছে, শুনেছি ব্যাঙ্গালোরে থাকে। খুকি এখানে একটা চাকরি করে, মন্দ না, ব্যাংকে, আজ মনে হয় ছুটি নিয়েছে।

কতক্ষণ চুপচাপ কাটে। বাইরে বৃষ্টি ধরে এসেছে। তমাল হঠাৎ বলে, ‘সিগারেট খাচ্ছিস না এতক্ষণ হয়ে গেল?’

খাই না। খাওয়ার পরিবেশ নাই।

কলেজে থাকতেই তো চেইন স্মোকার ছিলি।

তোকে কি ঘনঘন শিলিগুড়ি যেতে হয়? ওরা আসে না?

আমিই যাই। কী করব, প্রথমদিকে ভাবতাম এক পা এখানে, আরেক পা ওখানে, আর এখন ভাবি পা এখানে, মু-ুটা ওখানে।

এ নিয়ে আর কথা তুলি না। নতুন করে কিছু জানতেও ইচ্ছা করে না।

তবে তমাল হয়তো ভাবে কিছু তথ্য দেওয়া দরকার। বলে, ‘বড়দাকে তো মনে আছে? ইন্ডেন্টিংয়ের ব্যবসা করত, অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলের সোল ডিস্ট্রিবিউটার ছিল, এছাড়া নবাবগঞ্জে মেশিন-টুলসের দোকান। পনেরো বছর আগে বড়দা মারা গেল, আর আমরাও ডুবলাম। ইন্ডেন্টিংয়ের ব্যবসাটা পার্টনার দখল করল। মেশিন-টুলসের দোকান আমিই অল্প দামে ছেড়ে দিলাম। এরপর এটা-ওটা অনেক কিছু করলাম। বড়দার ছিল বিজনেস ব্রেন, আমি এ-জায়গায় ফাঁকা, তাও বড়দার দেখাদেখি কিছু যা শিখেছিলাম কোনো কাজে লাগল না। বড়দা মারা গেল একচলিস্নশ বছর বয়সে। এটা একটা বয়স মরার! বড়দা যদি থাকত এ-অবস্থা হতো না। ঘরের হাল তো দেখছিস, ওই যে সিঙ্গেল খাট, কোণের দিকে একটা পায়ার বদলে ইট, ওতে আমি রাতে ঘুমাই, খুকি ওপরতলায় বারান্দা ঘের দেওয়া হাতচারেক জায়গায় জেঠির মেয়ের সঙ্গে শোয়। এইটুকু বাড়ি, মানুষ কতজন ভাবতে পারবি না। বড়দা থাকলে …’

এতক্ষণে একটা জরুরি কথা জানতে ইচ্ছা জাগে। বলি, ‘বউদি এখন এখানে থাকে না, আর ছেলেমেয়েরা?’

‘নাই রে। সবাই একটা পথই চেনে। বউদি ছেলেমেয়ে নিয়ে ভাইদের কাছে কলকাতায়। একটা মানুষ মরে যাওয়ায় কী অবস্থা চিন্তা কর। বড়দা যদি থাকত, এসব কিছু হতো না, হতে দিত না। বড়দার ব্রেনটা যদি আমার থাকত, আমিও হতে দিতাম না। কত কিছু করলাম, দাঁড়াতেই পারলাম না। কিছু করতে গেলে শক্তি তো দরকার, আমার শক্তি দ্যাখ’, বলে নাটুকে ভঙ্গিতে ঘাড়-মাথা পিছিয়ে কাঁধ ঝাঁকাল।

খুকি চা নিয়ে ঢুকল। ভাবলাম পরিস্থিতি হালকা করতে ওর দাবা খেলার কথা তুলি। কিন্তু চায়ের কাপ নিতে গিয়ে ওর মুখের দিকে তাকাতে পারলাম না। খুকি পারল। ‘কেন আসেননি এতদিন?’ বলে যেন জেদ ধরল, কারণ জানা চাই। নিজের কাপ নিয়ে সে বড় খাটের এক কোণে সাবধানে বসল। পরিষ্কার বুঝতে পারছি ও আমাকে দেখছে, খুঁটিয়েই যেন। ওর নিজের ব্যাপারে যে কিছু জানতে চাচ্ছি না, এও হয়তো খুঁটিয়ে দেখার কারণ। হঠাৎ খুকি বলে উঠল, ‘মেজদাকে আজ আপনি নিয়ে যান। আপনার সঙ্গে থাকবে, অনেক রাত পর্যন্ত দুজন গল্প করবেন। নেবেন না?’

‘যাবি, চল।’ খুকির কথায় তমালের দিকে তাকিয়ে কথাটা না বলে পারি না। তবে বলার পরপরই টের পাই গা শিরশির করছে, ভালো লাগছে। সেই দুপুর বারোটা থেকে এখানে – এই বদ্ধ, দম-আটকানো চারকোনা গুদামের মতো ঘরের বাসি গন্ধে এই প্রথম একটা টাটকা ঘ্রাণ আমাকে চমকে দিলো।

চল, আজ আমরা একসঙ্গে থাকব।

তমাল সেদিকে গেল না। মেচেতা-ছিটানো চোয়াল আর কালি লেপ্টানো মরা, সাদা চোখে আমার দিকে তাকাল। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়েই থাকল। তারপর মেঝেতে বারকয়েক স্যান্ডেল ঘষে অনেকটা যেন নিজেকে চাঙ্গা করে বলল, ‘বলছিলাম না বড়দা বেঁচে থাকলে আমাদের এ দশা হতো না। বড়দা ছিল সিংহ রাশির, বল তো এ আমার দেশ, যুদ্ধ করেছি দেশের জন্য, কোন শালা আমাকে কী বলে দেখি। জান দিয়ে দেবো, তবু আমার দাবি আমি ছাড়ব না। কোন সুখে বিদেশে থাকতে যাব, জাতভাইদের সঙ্গে উঠবস করলেই জনম ধন্য! কে কার জাতভাই?’

চল আমার সঙ্গে। খুকি ঠিক বলেছে আজ অনেক রাত পর্যন্ত তোর সঙ্গে আড্ডা দেবো।

বড়দার এক ফোঁটা জোর যদি আমার থাকত! একবার এরশাদ আমলে একটা রায়ট সাজানো হয়েছিল না? সরকারের স্পন্সার্ড রায়ট, ওই যে কালাচান্দ আর মরণচান্দের মিষ্টির দোকান লুট হলো, বড়দা একা একা গিয়ে চিৎকার করে বলল, তোরা মিষ্টিই খাবি তো খালি হিন্দুর দোকান লুট করে খাবি কেন, আলাউদ্দিনের দোকানও লুট কর, মুসলমান ময়রাও আজকাল মিষ্টি ভালো বানায়। কার বুকের পাটায় এমন শক্তি যে সামনে দাঁড়ায়।

খালি চায়ের কাপ ট্রেতে নিতে নিতে খুকি চোখেমুখে বিরক্তি ঝরিয়ে বলল, ‘বেশি বড়দা বড়দা করো না। সাহসে সব হয় না।’

কিসে হয়?

তুমি জানো না, আমাকে জিজ্ঞেস করো? কিসে হয়! আদিখ্যেতা। সাজুদা, আরেক কাপ চা?

মাথা নেড়ে মানা করে ওর দিকে তাকিয়ে বোকার মতো, গাধার মতো বলি, ‘তুমি কেমন আছ খুকি?’

একবার বলে ফেলে কথাটাকে ঠেকা দিতে অন্য কথাও বলতে হয়, ‘ব্যাংকের কাজ কেমন লাগে? এখান থেকে কত দূরে?’

এতটুকুতে থেমে গেলেও হতো। কিন্তু কী এক পাগলামিতে বলি, ‘তোমার মেয়ে নাকি খুব সুন্দর?’

মেজদা বলেছে? ভাগ্যিস, মেয়ে আমার মতো হয়নি, চোখমুখ অবিকল আমাদের মায়ের, গায়ের রংও। আপনি তো মাকে দেখেননি, না দেখেছেন?

মাথা নেড়ে জানাই দেখেছি। মুখে বলি, ‘চেহারা ঠিক মনে নাই।’  ‘দেখাই’, বলে সে চট করে তার মোবাইল ফোন খুলে আমার দিকে বাড়িয়ে ধরতে ভাবি ওর মায়ের ছবি, না দেখি পাঁচ-ছয় বছরের হাসিখুশি মেয়ের ছবি। সুন্দরই না, অপরূপা বললে মানায়। ছবিটার দিকে তাকিয়ে থেকে ভাবি, ভুলচুক যা করে ফেলেছি, আর নয়।

আমার মেয়ের নাম রূপকথা। কার রাখা জানেন? মেজদার। মেজদা যে এমন একটা নাম দিতে পারে ভাবা যায়?

খা না আরেক কাপ চা? তমাল জোরের ওপর বলে।

হ্যাঁ-না কিছু না বলে ভাইবোন দুজনকে দেখি। দুজন দুই জায়গায় বসা, একসঙ্গে এক ফ্রেমে দুজনকে ধরা যায় না। একবার একে, একবার ওকে দেখি। আবার শিরশির টের পাই, আবার একটা টাটকা সুবাস।

খুকি উঠে যায়। বুঝতে পারি চা আনতে।

বাইরে বৃষ্টি শুকিয়ে জানালায় কাঠের পাল্লায় আঠার মতো শেষ বিকেলের পাতলা আলো।

নরেন্দ্র মোদি কি এবারো জিতবে?

তমালের আচমকা প্রশ্নে ধাক্কা খাই। সে বলে চলে, ‘ইউপিতে কংগ্রেসই যাবে, মধ্যপ্রদেশেও মনে হয়, তাহলে কিন্তু বিজেপির কেস খারাপ। পশ্চিম বাংলায় তৃণমূল যত নষ্টামিই করুক, এক মমতার জোরেই বিজেপি-কংগ্রেস টিকতে পারবে না। ত্রিপুরার গতবারের ঘটনাটা আশ্চর্যের না? মানিক সরকার তো জানতাম ভালোই পপুলার, অনেস্টও।’

মনে হয় কথাগুলো সে হয়ত আনমনে বলছে। এমনও হতে পারে … কী হতে পারে ভাবতে গিয়ে মনে হয় তমাল হয়তো সবসময় ঠিক বুঝতে পারে না সে কোথায়?

দ্বিতীয় কাপ চা খেয়ে উঠি। খুকির দিকে তাকিয়ে ‘আসি’ বলে দরজামুখো হই। দরজা খোলে তমাল। সিঁড়িদুটো ভেঙে রাস্তায় নামতে দেখি সে আমার পাশাপাশি হাঁটছে। ওকে কি আবার বলব আমার সঙ্গে যেতে? মনে হয় না রাজি হবে। তারপরও কি বলব, যদি রাজি হয়?

একটা মোড় পেরোতে তমাল তড়বড় করে বলে ওঠে, ‘এই যে-গলিটা, সামনে ডানদিকে চলে গেছে এটা না আমাকে বিপদে ফেলে, শিলিগুড়িতে মালারা যেখানে থাকে সেখানে ঠিক এরকম একটা গলি, না দেখলে বিশ্বাস করবি না।’

বউয়ের নাম মালা? কোন মালা?

তমাল পা চালিয়ে পাশের ঘুপচি দোকান থেকে একটা সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে এসে বলে, ‘খাই না, আজ ইচ্ছা হলো, মনে কর তোর কারণে। কী সিগারেট না খেতি রে! মালাকে তোর মনে আছে? সেই মালা-ই, মালা আবার কয়টা, অভয় দাশ লেনের মালা, ওর দাদা বিমল পড়ত আমাদের এক ক্লাস নিচে।’

মালার কথা এতক্ষণে বললি!

আরে এ-মালা কি আর সে-মালা আছে! ওকে তোর মনে আছে ভাবিনি।

তমাল হঠাৎ থেমে পড়ে। সিগারেট-ধরা হাত মুখের কাছে এনেও নামিয়ে ফেলে। বলে, ‘একটা কথা বলি, মনে কিছু করবি না তো?’

মনে করব মানে?

তুই কি এমনি এমনি, মানে আমার খোঁজ করতেই …

মিথ্যা বলতে ইচ্ছা করে না। বলি, ‘এসেছিলাম সূত্রাপুরে, এই প্যাকেটটা আমার বউয়ের কাজিন কানাডা থেকে একজনের হাতে পাঠিয়েছে, এটা কালেক্ট করতেই এদিকে আসা। তো ভাবলাম, দেখি দেবেন্দ্রনাথ দাশ লেনের ৫/৪/এ বাড়িটা খুঁজে পাই কি না।’

স্যান্ডেলের তলায় জোরে জোরে আধখাওয়া সিগারেট ঘষে তমাল মুখ তুলে অপ্রস্ত্তত হাসে। দিনশেষের বিলীয়মান আলোয় তার মুখ বীভৎস দেখায়। কয়েক পা এগিয়ে বলে, ‘কত হাঁটবি, এখান থেকেই একটা কিছু ধর, আমি এই ডানপাশের গলিতে একটু ঘুরব। বলেছিলাম না গলিটা আমাকে বিপদে ফেলে? প্রায় দিনই এক পাক ঘুরি।’

এর নাম কি ফর্কিং পাথ্স? তমাল ডানদিকে এগোয়, আমি এদিকে-ওদিকে চোখ ফেলে রিকশা বা সিএনজিচালিত অটোরিকশা খুঁজি। যাব সোজা, কিছুদূর গিয়ে গলিটা বাঁয়ে ঘুরে গেছে।

মিথ্যা যদি বলতাম, যদি বলতাম ওর খোঁজ করতেই, ওকে দেখতেই এত বছর বাদে …

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত