পিছুটান ভুলে

পিছুটান ভুলে

কাজী সাহেব যখন বললেন,”মা? তোমাদের বিয়েটা হয়ে গিয়েছে।” তখন হঠাৎ ভীষণভাবে চমকে উঠলাম। ভয়ে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। চোখ বড়ো-বড়ো করে পাশের চেয়ারে বসা আতিকের মুখের দিকে তাকালাম। ও তখন হেসে-হেসে ওর বন্ধুদের সাথে কথা বলছে। আমাদের বিয়ের সাক্ষী হিসেবে ওর কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবী এসেছে। আতিক ওদের নিয়েই ব্যস্ত। আমি চোখ ঘুরিয়ে একেক করে সকলের মুখের দিকে তাকালাম। সবাই হাসছে। অথচ আমার মুখটা শুকিয়ে গেছে। সর্বশেষ কাজী সাহেবের দিকে তাকালাম। উনি হঠাৎ মৃদু হেসে ফেললেন তারপর কোমল স্বরে বললেন, “বাবার কথা মনে পড়ছে বুঝি?”

কথাটা শুনে বুকের ভেতর ধক্ করে উঠলো। আমি জবাব না দিয়ে ফ্যালফ্যাল করে উনার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। উনি ম্লান মুখে আবার বললেন, “পালিয়ে বিয়ে করে এখন অনুশোচনাবোধ করছো মা? যদি তাই করো তবে তোমার ফোনটা অন করো বা অন থাকলে দেখো বাবা কতবার কল করেছে?” ছলছল চোখে ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম বাবা আমাকে ৬৭ বার কল দিয়েছে। এটা দেখার সাথে-সাথেই চোখ থেকে ফোনের স্ক্রিনের উপর টুপটুপ করে কয়েকফোটা পানি পড়ে গেল। ভাঙা গলায় বললাম, “আপনি বুঝলেন কীভাবে?”কাজী সাহেব একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আমার একমাত্র মেয়েটাও একদিন না বলে বাড়ি ছেড়ে চলে গেল। এক বাউণ্ডুলেকে বিয়ে করে নিলো। ও খুব অল্পবয়সী ছিল। তোমার চেয়েও ছোট।” আমি রুদ্ধশ্বাসে জানতে চাইলাম, “আমি এখন কী করবো?”
প্রশ্নটা করার পরই চোখ থেকে অঝরে পানি পড়তে থাকলো। হঠাৎ যেন অনুশোচনার ভারে চোখের পানি আর বাঁধা মানছে না। স্পষ্ট বুঝতে পারলাম ঝোঁকের মাথায় বড্ড ভুল করে ফেলেছি। কাজী সাহেব আরেকটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বললেন, “বাবার কাছে ফিরে যাও।” কথাটা শুনে আমি ঢুকরে কেঁদে ফেললাম। আতিক এতক্ষণে আমাকে কাঁদতে দেখতে পেলো। ও আমার চোখ মুছিয়ে দিয়ে বলল, “অত ভাবছো কেন? সব ম্যানেজ করে নিবো। আমি একটা ছোটখাটো জব করি তো! সংসার চলে যাবে। চিন্তা করো না। আমাকে কাঁদতে দেখে আতিকের বন্ধু-বান্ধবীরা একে অন্যকে ইশারা করে নানান ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বললো। তবে সবার মুখেই একটা সাধারণ কথা, “বিয়ের আগে হুশ ছিল না?” কাজী অফিসের দরজায় দাঁড়িয়ে হঠাৎ চোখ মুছে পেছন দিকে ফিরে কাজী সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনার মেয়েকে মেনে নিয়েছেন?”
কাজী সাহেব কোনো উত্তর দিলেন না। আমরা যখন কাজী অফিস ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছি, রিকশাতে উঠবো তখন কাজী সাহেব ছুটতে-ছুটতে এসে বললেন, “রক্তের সন্তানকে কোনো ভালো বাবা দূরে ঠেলতে পারে নাকি?” আমি উত্তরটা পেয়ে একটু স্থির হয়ে রিকশাতে বসলাম। সব মেয়ের কত স্বপ্ন থাকে যে সে লাল বেনারসি পরে টুকটুকে বই সাজবে, সেই সাজে সম্মানের সাথে শ্বশুরবাড়িতে যাবে। কিন্তু আমার কপালে তা নেই। বাবার কিনে দেওয়া একটা সস্তা থ্রি পিচ পরে শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছি। আমার মাথায় কোনো ঘোমটাও নেই। ১৯ বছর বয়স হলেও আমার ভেতরটা এখনও একজন কিশোরীর মতো। যে ডানা মেলে উড়তে চায়। অথচ এখন ডানার বদলে রিকশা চেপে মা-বাবার সব স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিয়ে নির্লজ্জের মতো শ্বশুরবাড়িতে যাচ্ছি।
আতিকের সাথে আমার সম্পর্কটা ক্লাস নাইনে থাকতে। আমি এখন অনার্স ফাস্ট ইয়ারে পড়ি আর ও পড়াশুনা শেষ করে একটা প্রাইভেট কোম্পান্নিতে জব করে। ওর বিয়ের বয়স হয়েছে তাই ওর মা-বাবা ওর জন্য পাত্রী খুঁজছিল। ও আমার কথা বহুবার বলার পরও ওর পরিবার রাজি হয়নি। ওর বাবা ব্যাংকের বড় একজন অফিসার, ও ওর বাবার একমাত্র সন্তান, অপরদিকে আমার বাবা একটা স্কুলের সামান্য কেরানি। আমরা তিনটা বোন। অভাবের সংসার। আমি শ্যামলা, সুন্দরীও না।
তাই আতিকের ধনী বাবা কিছুতেই আমাকে তার ছেলের বউ করতে চাননি। ওদিকে আতিক আমার বাবাকে বলেছিল যে ও আমাকে গোপনে বিয়ে করে রাখবে। পরে ওর মা-বাবাকে বুঝিয়ে বাসায় নিয়ে যাবে। এটা বাবার কাছে অসম্মানজনক লেগেছে। বাবাকে অনেক বুঝিয়েছি যে আতিককে আমি খুব ভালোবাসি, ও খুব ভালো ছেলে। বাবা বোঝেনি। আজ রাগ করে বেরিয়ে এসে বাবাকে কল করে জানিয়েছি যে আমি আতিকের সাথে বিয়েটা করে নিচ্ছি। আতিকও খুশি মনে বিয়েটা করে নিয়েছে। আতিকের বন্ধুরা সবাই চলে গিয়েছে। ওর বাসার সামনে রিকশা থামতেই খেয়াল করলাম ওর মুখটা আচমকা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ও কিছুটা ইতস্তত করে কলিংবেলে চাপ দিতেই ওর মা দরজা খুলে সামনে দাঁড়ালো। আতিককে এক টানে ঘরে ঢুকিয়ে নিয়ে আমার আপাদমস্তক দেখে নিয়ে ঘৃণাভরা দৃষ্টি ফেলে বললেন, “তা কেরানির মেয়ে, এই রূপ-চেহারা নিয়ে বড়লোকের ছেলে পটানোর ধান্দা করতে নেমেছো? ব্যবসায় লাভটাভ হয় তো? উপার্জন কেমন? তোমার বাবা কেরানিগিরি ছেড়ে এই কাজে কবে লাগলো?”
কথাটা শুনে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে আতিকের মায়ের মুখের দিকে তাকালাম। আতিক ওর মায়ের পেছন থেকে কিছু বলতে গেলেই ওর বাবা এসে ওকে টেনে সরিয়ে নিয়ে গেল। আমি মাথা নিচু করে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললাম। আতিকের মা চোখেমুখে নিষ্ঠুরতা ফুটিয়ে তুলে বললেন, “কেঁদে লাভ নেই গো মেয়ে। আমার মন গলানো অত সহজ না। আমার বোনের মেয়ের সাথে আজই আতিকের বিয়ে হবে। তোমার তালাকনামা পৌঁছে যাবে। বাড়ি ফিরে যাও। ছোটলোকের মেয়ে কোথাকার!” দুপুরের কাঠফাটা রোদে আধমরা হয়ে বাড়ির উঠানে এসে পৌঁছালাম। কোথা থেকে যেন মা ছুটে এসে আমাকে একটানা থাপ্পড় মারতে-মারতে বললেন, “মুখপুড়ী? সেই বড়লোকের ছেলেকেই বিয়ে করে বাপের মুখ পুড়িয়ে আসলি?”
আমি পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। মায়ের হাত আমার ঘর্মাক্ত মুখটাকে আঘাত করে লালচে করে ফেলছে তবু আমি নির্বিকার। পাথরের মতো চোখ মেলে সামনে তাকিয়ে আছি। বুক থেকে ওড়নাটা খসে পড়ে গেছে। এতটা পথ রোদে হেঁটে আসায় পুরো শরীর উত্তপ্ত। মাথা যেন ফেঁটে যাবে, বুকের ভেতরটাও তৃষ্ণায় শুকিয়ে এসেছে। হঠাৎ বাবার গলা শুনতে পেলাম। বাবা চিৎকার করে উঠে বলল, “আহা! মেয়েটাকে মারছো কেন? কী হয়েছে আগে শোনো। ওকে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না।” আমি মাটিতে ঢলে পড়ে গেলাম। বাবা ছুটে এসেও আমার পতন ঠেকাতে পারলো না। চোখ বন্ধ করার আগে বুঝতে পারলাম আমার মুখের উপর ঝুঁকে থাকা বাবার চোখ থেকে উত্তপ্ত পানির ফোটা টুপটুপ করে আমার মুখে পড়ছে। আমি চোখ বন্ধ করে বললাম, “ক্ষমা করো বাবা।” আমার খানিকটা দূরে তালাকনামা হাতে নিয়ে বাবা বসে আছে। আমি সেদিনের ঘটনার পর আর কারও সাথে কথা বলি না। ঠিকমতো খাইও না। ফিরে আসার পরদিনই জানতে পারলাম আতিক বিয়ে করেছে। শীঘ্রই ওরা হানিমুনে যাবে।
বাবা হঠাৎ সান্ত্বনা দেবার স্বরে বলল, “কী বলো রানুর মা? একদিকে কিন্তু ভালোই হলো। তালাক হয়ে গেল। আতিক আবার বিয়ে করেছে। ওরকম সতীনের সংসার রানুর দ্বারা হতো না। এখন আমার রানু স্বাধীন হয়ে গেল। ও মন দিয়ে পড়ুক। ওকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে তো! আল্লাহ যা করে ভালোর জন্যই করে। আমার মেয়ে কারও বোঝা না।” কথাগুলো শুনে আমি এতগুলো দিন পর বাবার কাছ ঘেঁসে বসলাম। তারপর হাত বাড়িয়ে তালাকনামাটা নিয়ে, পড়ে দেখে বাবার হাত ধরে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললাম। বাবা বলল,”কাঁদিস না তো!” আমি অপরাধীর মতো বললাম, “আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছো তো বাবা? আমি আর এমন অঘটন ঘটাবো না। আমি জীবনটাকে বুঝার মতো বড়ো হইনি বাবা। তাই ভুল করে ফেলেছি।” বাবা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, “ক্ষমা করতে পারি একটা শর্তে! তোমাকে মন দিয়ে পড়তে হবে, আর কষ্ট পাওয়া যাবে না। জীবনে বড়ো হতে হবে।” আমি হাসিমুখে চোখ মুছে নিলাম।
৮টা বছর পেরিয়ে গেল আমি আমাদের প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দিয়েছি। আমি এখন স্কুলের সেরা শিক্ষিকা, ছাত্রছাত্রীদের প্রিয় রানু ম্যাডাম, স্যারেদের প্রিয় সহকর্মী। ছোট বোনদুটো কলেজে পড়ে। ওরা জমজ তাই একসাথেই পড়ছে। আমার চেহারায় বয়স বাড়ার ছাঁপ পড়ছে, সেই ১৯ বছরের উচ্ছ্বলতাগুলোও কবে-কবে যেন সব উবে গিয়েছে। আমি এখন চিন্তাশীল, ভেবেচিন্তে প্রতি পদক্ষেপ নিই। আমাকে বিয়ে দেবার জন্য বাবা মাঝে-মাঝে পাত্র দেখে, কিন্তু আমি মানা করে দিই। বাবাও কারণটা বোঝে তাই আর জোরাজুরি করে না। তবে মা মাঝে-মাঝে রাগ করে। বলে যে বুড়ি হলে পাত্র পাবো না। তবে এই রাগে যে আমার প্রতি মায়ের ভালোবাসা এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তার চিন্তা লুকিয়ে আছে তা বুঝি। তাই নিরুত্তর থাকি।
প্রতিদিন সকালে শাড়ি পরে, মাথায় লম্বা একটা বেণী করে স্কুলে যাই। একগাদা পবিত্র মুখের কল্লোলে দিনটা মুখরিত করে তুলি। এখন এটাই যেন আমার একমাত্র জীবন বেলা তিনটা স্কুল শেষে বাড়ি ফিরতেই দেখি উঠানে আতিক দাঁড়িয়ে আছে। ভূত দেখার মতো করে চমকে উঠলাম কারণ গত ৮ বছরে আতিক একবার কলও করেনি, দেখতেও আসেনি। ঠোঁটে বিদ্রুপের হাসি ফুটিয়ে তুলে বললাম, “তা আতিক সাহেব কী মনে করে আসলেন? দান-খয়রাত করতে আসলেন? নাকি কাজের লোক খুঁজতে এ পাড়াতে আসলেন? আমি কিন্তু ছেলে পটানোর ব্যবসা বাদ দিয়েছি বরং ছেলে পড়ানোর কাজে লেগেছি।” আতিক আমার সামনে এসে আমার একটা হাত টেনে ধরে বলল, “সুমি আরেকজনের হাত ধরে পালিয়ে গিয়েছে, আমাকে একা করে দিয়ে গিয়েছে। মা অসুস্থ, বাবা তো মারা গেছে। আমি অসহায়। আমিও অন্যায় করেছি। আমার জীবনে ফিরে চলো।”
আমি এক ঝটকায় হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে চোখেমুখে সেই সেদিন ওর মা যেমন ঘৃণা ফুটিয়ে তুলেছিল সেদিনের মতো ঘৃণা ফুটিয়ে তুলে বললাম, “তোমার মাকে বলো টাকা দিয়ে টাকাওয়ালা বাপের মেয়ে দেখে বউমা কিনে আনতে। আমার বাবার টাকা নেই আর উনি মেয়ে বিক্রিও করেন না। তুমি এখন যেতে পারো।” ওর মুখে, “রানু, রানু, রানু…” ডাক সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে দিলাম। মা-বাবা স্তব্ধ হয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। কিছুসময় পর দরজায় টোকা পড়তেই দরজা খুলে দিলাম। বাবা ভেতরে ঢুকে বলল, তোর জীবনের এই সিদ্ধান্তটাও তোকেই নিতে দিলাম। ও আগেও এসেছিল। তোর মা বলেছে তুই যা চাইবি তাই হবে। আমি আজ সন্তুষ্ট। তুই ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছিস। যদিও এটাও জানি যে তুই এখনও ওকে ভালোবাসিস। তুই এখন কী চাইছিস মা?”
তখনই ফোনে একটা কল আসলো। ৮ বছর আগের সেই ভীষণ পরিচিত ফোন নাম্বারটা এতকাল পর স্ক্রিনে ভাসতে দেখে কলটা কেটে, ফোনটা অফ করে, বিছানার উপর ছুড়ে মারলাম। তারপর বাবার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললাম,
“হ্যাঁ, ওকে ভালোবাসি তবে ওকে আর জীবনে চাই না। তোমরা পাত্র খোঁজো। যে আমার অতীত জেনে আমাকে বিয়ে করবে আমি তার সাথেই সংসার করবো। আর হ্যাঁ বাবা, মনে করে পাত্রপক্ষকে শুরুতেই বলে দিও যে আমি এক ডিভোর্সী মেয়ে, তুমি আমার কেরানি বাবা, তোমার কিনে দেওয়া সস্তা পোশাক আর সামান্য ডালভাত খেয়ে তৈরি হয়েছে আজকের রানু ম্যাডাম। তারা যেন আমার পুরনো আমিটাকেও চিনে নেয়।” কথাগুলো শুনে সামনে দাঁড়ানো মানুষ দুটোর চোখে-মুখে স্বর্গীয় আভা ফুটে উঠলো।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত