বিবেক

বিবেক
বিয়ের পর থেকেই আমার মা কেমন যেন খিটখিটে হয়ে গেছেন। অফিস থেকে বাসায় ফিরলেই একগাদা অভিযোগ নিয়ে বসবেন। এই রাশেদ তোর বউ আমাকে ঠিকমত খাবার দেয় না। আমার সেবা করেনা। আমার মুখে মুখে তর্ক করে। বিয়ের এত বছর হল তোর বউ এখনো তোকে বাবা ডাক শোনাতে পারল না। আরো অনেক অভিযোগ আছে যা বলে শেষ করতে পারব না।
আমার আর নিশার বিয়েটা পারিবারিকভাবেই হয়। মা পছন্দ করেই নিশাকে আমার বউ করে এনেছেন। এই পর্যন্ত নিশাকে আমার কাছে মুখ ফুটে কিছু চাইতে দেখিনি। আমি বাসায় এলেই হাসিমুখে কথা বলেছে। কোনদিন ওর মুখে রাগ বা বিষন্নতার ছাপ দেখিনি। বিয়ের বয়স চার বছর পার হতে চলল। এখনো নিশা মা হতে পারে নি। অনেক ডাক্তার দেখিয়েছি। ডাক্তারের একটাই কথা,, “আল্লাহকে ডাকুন। আল্লাহ নিশ্চয়ই মুখ তুলে তাকাবেন।” মা বার বার আমাকে বিয়ের কথা বলে যাচ্ছেন। আমি নিশাকে মন প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি। মা হতে পারছে না বলে ওকে ডিভোর্স দিয়ে বিয়ে করে নতুন বউ আনব?
এটা আমি কখনোই চাইনা। একদিকে নিশা আর একদিকে জন্মদাত্রী মা। কি করব মাথা কাজ করছে না। প্রতিদিন এমন প্যাঁচাল শুনতে কার ই ভালো লাগে? এর তো একটা বিহিত করা দরকার। প্রতিদিন এর মত আজ ও অফিস শেষে ক্লান্ত শরীরে বাসায় ফিরলাম। অফিসের ব্যাগটা সোফায় ফেলে দিয়ে গা এলিয়ে দিলাম। তখনই মায়ের আগমন। মা এবার কেঁদে কেঁদে চোখ ফুলিয়েছে। আমার কাছে এসে হাউমাউ করে কেঁদে বলছে,,” তোর বউ আজকে আমার সাথে ঝগড়া করছে। আমাকে দুপুরে খাবার দেয় নাই।” আমি যতদূর জানি নিশা এমন মেয়ে নয়। তবুও মায়ের এমন কান্না দেখে মনে হচ্ছে মা সত্যিই বলছে। রাগে আমার পায়ের রক্ত মাথায় উঠে গেছে। আর কিছু না ভেবেই নিশার রুমের দিকে গেলাম।
নিশার রুমের কাছে যেতেই শুনি,, “দেখ মা,, একটা সংসার ভাঙ্গা, একটা মসজিদ ভাঙ্গার সমান। তুমি অনেকবার ই আমাকে কুবুদ্ধি দিয়েছ। তুমি নিজে একটা মেয়ে হয়ে আর একটা মেয়ের তাও আবার নিজের মেয়ের সংসার ভাঙ্গতে চাইছ? আমার শ্বাশুরী তো খারাপ মানুষ নয়। তুমি যেমন আমাকে শাসন করো , তেমনি আমার শ্বাশুরীও আমাকে শাসন করেন। আর তুমি বলছ আমার শ্বাশুরীকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসতে? আজ যদি তোমার ছেলে আর ছেলের বউ তোমাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসে কি করবে তুমি?” “নিশা, এ কথা তুই বলতে পারলি?” “হ্যা মা বলতে পারলাম। আর কি বলছিলে তুমি?” আমার স্বামীর পকেট থেকে টাকা চুরি করতে? ” মা আমার টাকা চুরি করতে হয় না। তোমার জামাই আমাকে যথেষ্ট টাকা দেয়।
আশা করি আমার কথা বুঝতে পেরেছ। আজকের পর থেকে তুমি দয়া করে আমার শ্বশুরবাড়ি আসবে না।” নিশার কথা শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে গেছি। তার মানে সব মিথ্যে আমার মা এতদিন যা বলেছে সব মিথ্যে? নিশার রুম থেকে রাগে গজগজ করতে করতে আমার শ্বাশুরী বের হয়ে গেল। আমার আর বুঝতে বাকি রইল না কথাগুলো নিশা ওর মাকেই বলছিল। আমি কিনা এতদিন নিশাকে ভুল বুঝে আসছিলাম। নিজেই নিজেকে চাপড়াতে ইচ্ছে করছে। কিভাবে মুখ তুলে তাকাবো নিশার দিকে? আমি আর এক মিনিট ও দাঁড়ালাম না। সোজা মায়ের কাছে চলে গেলাম। মা ভেবেছে আমি নিশাকে কিছু বলেছি। মায়ের মুখ দেখে মনে হল মা খুব খুশিই হয়েছে। মায়ের মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠেছে। হাসিটাকে আড়াল করে বলতে লাগলেন,,”নিশাকে আচ্ছামত বকে দিয়েছিস তো? ওর অনেক সাহস বেড়েছে, কয়েকটা চড় থাপ্পড় ও দিতে পারিস। দিয়েছিস কি??”
আমি মায়ের কথা শুনে অবাক হলাম না। নিশাকে ডাকতে লাগলাম। নিশা শাড়ির আচঁলে ভেজা হাত মুছতে মুছতে আমার কাছে এল। আমি মা আর নিশা কে সোফায় বসতে বললাম। দু’জনেই আমার কথামত বসে পড়ল।
আমি মায়ের দিকে চেয়ে বললাম,,” আচ্ছা মা তোমাকে যদি আমি বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসি তোমার কেমন লাগবে?”
নিশা আমার কথা শুনে থরথর করে কাঁপছে। মা বিলাপ করে বলছেন,,”এই কি আমি তোকে পেটে ধরেছিলাম? তুই কি আমারই ছেলে? শেষ পর্যন্ত বউয়ের কথায় আমাকে বাড়ি থেকে বের করবি? ” নিশা কাঁপা স্বরে মৃদু কান্নারত কন্ঠে বলে উঠল,” এ কি করছেন আপনি? এমন কাজ করবেন না। দরকার হয় আমি এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাব। তবুও মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাবেন না।”
মা এবার বিলাপ থামিয়ে নিশার দিকে তেড়ে গেলেন, “এতক্ষণ স্বামীর কান পড়িয়ে এখন আসছে নাটক করতে।”
মা কে ধমক দিয়ে বললাম,,”চুপ কর মা। নাটক নিশা নয় তুমি করেছ এবং এখনো করে আসছ। কেন মা তুমিই তো পছন্দ করে নিশাকে এই বাড়ির বউ করে এনেছিলে তাহলে আজ কেন নিশাকে তোমার এত অপছন্দ? নিশা মা হতে পারছে না তাই? শুধু মা হওয়াতেই কি স্বার্থকতা??” গলা শুকিয়ে আসছে। এক গ্লাস পানি ঢকঢক করে খেয়ে আবারো বলা শুরু করলাম,,” জানো মা নিশা কোনদিন আমাকে তোমার বিরুদ্ধে একটা শব্দ পর্যন্ত বলেনি। আজ নিজের মাকে অপমান করেছে শুধুমাত্র তোমার জন্য আর তুমি কিনা??” মা হয়ত নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন। আমি নিশাকে বললাম,,”নিশা তুমি কাপড় গোছাও তোমাকে আমি তোমার বাবার বাড়ি দিয়ে আসব। আর হ্যা ডিভোর্স লেটার টাও কয়েকদিনের মধ্যে পেয়ে যাবে।”
নিশা কোন কথা না বলেই শুধু মাথা নাড়ালো। মা আর কোন কথা বললেন না। সেদিন রাতে আর খাওয়াও হল না। আমি ইচ্ছে করেই নিশার সাথে কথা বলিনি। আর নিশাও কথা বলেনি। পরদিন সকালে অফিস যাওয়ার পথে নিশাকে ওর বাড়ি পৌঁছে দিয়েছি। নিশা বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় শুধু বলেছে,, “আমি তো মা হতে পারলাম না। আপনি সুন্দরী মেয়ে দেখে বিয়ে করে নিবেন।” এটাই আমার সাথে ওর শেষ কথা ছিল। রাতে বাড়ি ফিরে দেখলাম মা মন মরা হয়ে বসে আছে। মায়ের মনমরা মুখ দেখে বললাম,,”কি হল মা? তুমি তো এটাই চেয়েছিলে। তোমার তো খুশি হওয়ার কথা। আর হ্যা খুব দ্রুত মেয়ে দেখ আমি বিয়ে করব।”
মাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই চলে এলাম নিজের রুমে। নিশাকে ছাড়া আজই আমার প্রথম রাত। কেমন যেন শূণ্য লাগছে সব কিছু। নিশার কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছি। প্রতিদিন সকালে আমি না খেয়েই বের হই যদিও মা কষ্ট করে নাস্তা তৈরী করেন। এভাবে এক সপ্তাহ আমার নিশার সাথে যোগাযোগ নেই। মা কিছু বলতে চান হয়ত তাই আজ সকালে আমার পথ আটকালেন। আমি বিরক্ত কন্ঠে বললাম,,” বল মা কি বলবে? আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু? মা ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললেন,,” রাশেদ আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি তুই নিশাকে ফিরিয়ে নিয়ে আয়।” আমি আর কথা বাড়ালাম না। আজ ভাবলাম অফিসে যাব না সোজা নিশাদের বাড়ি যাব। মুখে হাসির রেখা নিয়ে নিশাদের বাড়ি পৌঁছালাম। নিশা আমাকে দেখে অবাক হল। ভেবেছে হয়ত ডিভোর্স লেটার নিয়ে গেছি। হাসিমুখে নিশার হাত ধরে বললাম,”চল নিশা আমি নিতে এসেছি তোমাকে।”
নিশা ছলছল চোখে আমার দিকে চেয়ে রইল। চোখ থেকে এক ফোটা পানি টুপ করে মাটিতে পড়ল। আমি ওর চোখের পানি মুছে দিয়েই আবারো তাড়া দিয়ে বললাম,” কি হল? চল আমি তোমাকে নিতে এসেছি। মা নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে। ” নিশা এবার হেসে কুটিকুটি হয়ে আমার বুকে আছঁড়ে পড়ল। আমাকে টেনে নিজের ঘরে নিয়ে বসালো। তারপর দৌঁড়ে গিয়ে ওয়ারড্রোবের ড্রয়ার থেকে কি যেন বের করল। মুঠোয় চেপে আমার সামনে মেলে ধরল। ওর হাতে প্র্যাগন্যান্সি কিট। সেখানে দুই দাগ দেখা যাচ্ছে। শুনেছি মেয়েরা গর্ভবতী হলে দুইটা লাল দাগ দেখা যায়। আমি খুশিতে নিশাকে কোলে নিয়ে পুরো ঘর ঘুরেছি।
নিশা লজ্জায় আমার বুকে মুখ লুকিয়েছে। হঠাৎ আমার শ্বাশুরী রুমে প্রবেশ করল। আমি নিশাকে কোল থেকে নামিয়ে মাথা নিচু করে বললাম,,” মা আমি নিশাকে বাসায় নিয়ে যেতে চাই।” তারপর তিনি আর কিছু বললেন না। আমি নিশাকে নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। নিশা আমার কাঁধে মাথা রেখে বসে আছে। আমি ওর কপালে আলতো করে চুমু দিলাম। আজ মা অনেক খুশি হবে। কারণ সে দাদী আর আমি বাবা হতে চলেছি। মুচকি হেসে মনে মনে বলছি,,”যাক প্ল্যানটা কাজে দিল তাহলে। এই প্ল্যানটার জন্য আজ মা নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে আর আমি আমার স্ত্রীকেও ফিরে পেলাম সাথে বাবা হওয়ার স্বাদটাও অনুভব করতে পারলাম। “

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত