বউয়ের মন

বউয়ের মন
কয়েকদিন আগে বউয়ের সাথে ঝগড়া হলো। রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলাম। রাস্তা দিয়ে হাঁটছি। কিসের সাথে যেন একটা উষ্ঠা খাইলাম। উমা! এ দেখি একটা প্রদীপ। আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপ। ধুরররর! আলাদীনের প্রদীপ হতে যাবে ক্যান! আমি পাইছি, আমার প্রদীপ। আমি আর দেরি করলাম না। আমার আবার এক্সাইটমেন্ট সহ্য হয় না। তাড়াতাড়ি একটু আড়ালে গিয়ে প্রদীপ ঘঁষতে শুরু করলাম। সাথে সাথে ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে এক দৈত্য বেরিয়ে এসে বলল, ‘হুকুম করুন মালিক। আমি আপনার ৩টা ইচ্ছা পূরণ করব।’ আমি খুশিতে বগল বাজাতে শুরু করলাম। তারপর বললাম, ‘আমার প্রথম ইচ্ছা হলো, তুমি আমার সবগুলা ইচ্ছা পূরণ করবা।’ আমার কথা শুনে দৈত্য তার টাক মাথা চুলকাতে শুরু করল। তারপর বলল, ‘আপনি একটু বেশী চালাক, মালিক।’ দৈত্যের কথা শুনে আমি একটা ক্লোজআপ হাসি দিয়ে বললাম, ‘এখন আমাকে তাড়াতাড়ি একটা সোনার আংটি দাও।’
পাশের বাসায় স্বপ্না ভাবিকে তার হাসবেন্ড একটা স্বর্ণের আংটি কিনে দিয়েছে। আমি না-কি আমার বউকে স্বর্ণের আংটি দূর থাক জীবনে একটা ইমিটিশনের আংটিও কিনে দেই নাই। এইগুলা নিয়েই এক কথা দুই কথায় আজকের ঝগড়ার সূত্রপাত। আমি দৈত্যের কাছ থেকে তাড়াতাড়ি সোনার আংটিটা নিয়ে বউকে দিলাম। ভাবলাম বউ খুশি হয়ে যাবে। খুশির  চোটে চোখ টিপ দিয়ে বলবে, রাতে রেডি থেকো আজ। কই কী! বউ আংটি নিয়ে কতক্ষণ নাড়াচাড়া করে মুখ বাঁকিয়ে বলল, ‘হুহ্..সোনার আংটি! পাশের বাসার রেদোয়ান ভাই উনার ওয়াইফকে গত সপ্তাহে একটা ডায়মন্ডের আংটি কিনে দিছে। আর এসব বলেই-বা কী লাভ! আমার কী আর এসবের কপাল আছে।’ আমি মনে মনে বললাম, ‘এসব এখন আমার কাছে ওয়ান-টু-থ্রি ব্যাপার।’ আমি তাড়াতাড়ি ছাদে গেলাম। প্রদীপ ঘঁষা দিয়ে একটা ডায়মন্ডের আংটি নিয়ে এসে বউকে দিলাম। বউকে অতিরিক্ত খুশি করার জন্য একটা দামী গাদোয়াল শাড়িও নিয়ে আসলাম।
বউ আংটিটা কতক্ষণ নেড়েচেড়ে রাখল। তারপর শাড়ীটা আমাকে দেখিয়ে বলল, ‘এই তোমার পছন্দ! তুমি তো দিন দিন একটা ক্ষ্যাত হয়ে যাচ্ছ, অনি। আমাদের বাসার কাজের মহিলারও এমন একটা শাড়ি আছে।’ ঘটনার আকস্মিকতায় আমি হারিয়ে গেলাম। মনে মনে কক্সবাজারের নির্মল বাতাসে হারিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু বউ বারবার আমায় একটা উত্তপ্ত লাভায় নিয়ে ফেলে দিচ্ছে। আমি চোখ বন্ধ করে ছিলাম। বউ গলা খেঁকারি দিয়ে বলল, ‘শাড়ি-গহনা অনেক হইছে! ঘরে বাজার নাই, বাজার নিয়ে আসো।’ আমি আর দেরি করলাম না। সাথে সাথেই আবার ওয়ান-টু-থ্রি বলে ছাদে গিয়ে সব নিয়ে আসলাম। শাকসবজি, মাছ, মাংস, ফলমূল কিছু আর বাদ রাখলাম না।বউ আমার দিকে চোখ বড় বড় করে চেয়ে আছে। বললাম, ‘অনলাইনে অর্ডার দিয়েছি।’ বউ মুখ ভেঙচিয়ে বলল, ‘চিনো তো খালি খাওয়াটাই।’
আমি আমার ভুঁড়িটার দিকে তাকিয়ে কিঞ্চিৎ লজ্জা পেলাম। যাইহোক এসব ব্যাপার না। একটা ভুঁড়ি না থাকলে সে আবার কিসের পুরুষ মানুষ! রান্নার সুঘ্রাণে ঘর ভরে যাচ্ছে। খিদের চোটে পেটে হাতি দৌড়াচ্ছে, জিভ লকলক করছে। অবশেষে দুপুরবেলা রাজকীয় ভঙ্গিতে খেতে বসলাম। তবে খেতে বসে একটা ব্যাপার মাথায় আসল। একটু কম করে খাই। বউ খুশি হবে। আমার ভুঁড়িটা একটু কমুক। উমা! কিন্তু একটু পরেই বউ চামচটা প্লেটে আছাড় দিয়ে রাগে ঝনঝন করতে করতে বলল, ‘কী ব্যাপার খাচ্ছো না ক্যান! আমার রান্না মজা হয় না, না? আমার রান্না মজা লাগবে ক্যান! তোমার তো লোভ অন্যের বউয়ের দিকে। তানিয়া ভাবি শুটকি ভর্তা করে দিলেও হাত চেটে চেটে খেয়ে ফেলো।’ আমি আর কিছু বললাম না। শুধু হাবলার মতো কতক্ষণ চেয়ে রইলাম। দুপুরে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিলাম। বউ কনুই দিয়ে একটা গুঁতা দিয়ে বলল, ‘শুনো আমি একটু বাবার বাড়ি যেতে চাই।’ অমি বললাম, ‘অবশ্যই যাবা।’
কথাটা বলেই আমি বউকে খুশি করতে দৈত্যকে একটা ট্যাক্সি আনতে বললাম। বউ তো আমার কান্ড দেখে তুমুল ঝগড়া শুরু করে দিল। আমার নাকি তার প্রতি কোনো মায়া নাই। তাকে বাপের বাড়ি পাঠাতে পারলেই আমি বাঁচি। বউ সন্দেহ করছে- আমার হয়তো কারো সাথে কিছু আছে। সেজন্যই তাকে বাপের বাড়ি পাঠাতে উঠে পড়ে লেগেছি। অবশেষে অনেক কষ্টে বুঝালাম এমন কিছু নেই, আমি জীবনেও আর তাকে বাপের বাড়ি যেতে বলব না। সেটা বলার পরেও প্রবলেম! আমি না-কি পাষণ্ড..নিজে ঠিকই দুইদিন পর পর গ্রামের বাড়ি যাই। অথচ বউটা যে কতদিন তার বাপ-মাকে দেখে না সেদিকে কোনো খেয়াল নাই। বুঝলাম, আমার কথা বলাই ঠিক না। কথা বললেই কিছু না কিছু একটা হবে। তাই সন্ধ্যা থেকে চুপচাপ আছি। বউ একা একাই প্যানপ্যান করে যাচ্ছে।
একটু পর বউ এসে আমার সামনে ফুলের টবটা আছাড় দিয়ে জানতে চাইল আমি কথা বলছি না কীজন্য! তারপর অভিযোগ করল, আমি নাকি তাকে পাত্তাই দিচ্ছি না। আমার কাছে না-কি তার কথার কোনো ভ্যালুই নাই। আমারও একটু পর মনে হলো ব্যাপারটা আসলেই ঠিক হয় নাই। এভাবে কথা না বলা ঠিক না। আমি গিয়ে বউয়ের সাথে কথা বলা শুরু করলাম। একটু পর পর এটা ওটা জিজ্ঞেস করছি। কিন্তু একটু পরেই বউ কান চেপে ধরে বলল, আমি নাকি দিন দিন বাঁচাল হয়ে যাচ্ছি। আমার না-কি কোনো পার্সোনালিটিই নাই। বউ আমার উপর বিরক্ত হয়ে অনেকক্ষণ কোনো কথা বলছে না। আমিও তেমন কিছু বললাম না। রাতে ঘুমানোর পর ভাবলাম বউয়ের রাগটা একটু ভাঙানো দরকার। হাতটা নিয়ে আদর করতে গেলাম। বউ আমার হাতটা ঝাড়া দিয়ে ফেলে দিয়ে বলল, ‘ঢং! আসছে এখন ঢং করতে।’
আমি ভাবলাম বউটা রাগ করে আছে। থাক আজকে, ডিস্টার্ব না করি। একটু পরেই শুনি বউ মিনমিনে সুরে কাঁদো কাঁদো ভাবে বলছে, ‘আমার কপাল! কী একটা মানুষের সাথে বিয়ে হইল। একটা মানুষ রাগ করে শুয়ে আছে, একটা বার তার রাগটা ভাঙাতে আসল না।’ আমি আবার বউয়ের পিঠে হাত রাখলাম। আবার বউ ঝাড়া দিয়ে হাতটা ফেলে দিল। এবার আমারও বেশ রাগ হলো। বিরক্ত লাগল। কী মানুষ রে বাবা! নিজেই বলে রাগ ভাঙাতে। আবার ভাঙাতে গেলে নিজেই ঝাড়ি মারে। আমি ড্রয়িং রুমে গেলাম। প্রদীপ ঘঁষে দৈত্যকে বের করলাম। তারপর কাঁদো কাঁদো সুরে বললাম, ‘দৈত্য ভাই, দৈত্য ভাই..আমাকে হেল্প করো।’ দৈত্য হুংকার দিয়ে বলল, ‘কী হয়েছে মালিক! কী চাই আপনার, সুইস ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট? ডুপ্লেক্স বাড়ি? মার্সেডিজ গাড়ি?
-না না, ওসব কিছু না।
-তবে কী, কী চাই আপনার? আরো বেশী কিছু? আপনি কী দুনিয়ার সবচেয়ে বড় আমির হতে চান?
-না না, ওসব না।
-তবে কী? হুকুম করুন মালিক…
-আমি আমার বউয়ের মন পাই না। বউয়ের মন বুঝি না। প্লিজ..বউয়ের মন বুঝার মতো কোনো একটা পাওয়ার আমাকে দাও।
আমার কথা শুনে দৈত্য রাগে আরো জোরে হুংকার দিয়ে চোখ লাল করে হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে যেতে বলল, ‘ওরে মগা রে! তোর মতো বলদ আমি জীবনেও দেখি নাই। তোরে বাড়ি-গাড়ি কতকিছুই না সাধলাম। আর তুই কী চাইলি, বউয়ের মন? আরে বলদ বউয়ের মন বুঝতে পারলে আমি কী আর আজকে প্রদীপে বন্দী থাকি! বউয়ের মন না বুঝার অভিশাপেই তো আমি আজ প্রদীপ বন্দী জ্বীন।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত