কাদম্বিনী বেঁচে আছে

কাদম্বিনী ঘুরে বেড়াচ্ছে এঘর-ওঘরে। দৃষ্টি উদ্ভ্রান্ত। চলন এলোমেলো; বুঝতেই পারছে না, হঠাৎ এমন কী ঘটল যে ঘরজুড়ে গিজগিজ করছে এত মানুষ। কোথাও ঠাঁই নেই দাঁড়াবার। চারপাশজুড়ে থমথমে পরিবেশ, কারো মুখে ছিটেফোঁটা হাসি পর্যন্ত নেই। পুরুষদের চোখ ছলছল, নারীরা আঁচলচাপা দিয়ে কান্না লুকাচ্ছে। সর্বত্রই একটা বিষণ সুর, ইনিয়ে-বিনিয়ে ভারি করে তুলছে পরিবেশ। প্রাথমিক বিস্ময় কাটিয়ে কাদম্বিনীর অন্তরেও সে-সুর সংক্রমিত হচ্ছে, ধীর লয়ে।

গত রাতে না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। এখন ঘুম ভাঙার পর চোখের সামনে যা কিছু দেখছে সব উলটোপালটা। চোখ থেকে ঘুমের রেশটুকু এখনো কাটেনি। বারবার হাই তুলতে হচ্ছে। একবার যে প্রাণ খুলে গা-ঝাড়া দিয়ে আড়মোড়া ভাঙবে শরীরের – সে-উপায় নেই। এত মানুষের সামনে কি গা-ঝাড়া দেওয়া যায়? লাজলজ্জা বলে কি কিছু নেই কাদম্বিনীর?

চারপাশে তাকিয়ে ওর বড় অভিমান হচ্ছে; বারবার গালগলা ফুলে উঠছে অব্যক্ত এক কষ্টে। এক রাতেই পরিবেশ এত বদলে যেতে পারে, তা ওর জানা ছিল না।

ওর মনিবের যারা অন্তরঙ্গ, যারা এ-বাড়ির বাসিন্দা, সবার কাছে দুদিন আগেও সে অত্যন্ত প্রিয়ভাজন ছিল। ওকে আদর দিলে মনিব খুশি হবে ভেবে অনেকেই যখন-তখন অযাচিতভাবে ওর মাথায়-গলায় হাত বুলিয়ে দিয়েছে। লোক-দেখানো অনাহূত এসব আদিখ্যেতা ওর সহ্য হয় না; মুখ ভেংচে এড়িয়ে গেছে এই সেদিনও। অথচ একবারের জন্যও ওরা আজ ভ্রুক্ষেপ করছে না ওর দিকে তাকিয়ে। অসহায়ের মতো সে ফ্যালফ্যাল করে এদিক-ওদিকে তাকাচ্ছে। চোখে তৃষ্ণার্ত দৃষ্টি; বারবার খুঁজে বেড়াচ্ছে ওর মনিবকে। যিনি রোজ রাতে ওকে নিয়ে বিছানায় শুতে যায়, যিনি আদুরে আঙুলে বিলি কেটে দেয় ওর রোমশ শরীরে, নিজ হাতে যিনি ওকে দুধ খাইয়ে ‘আরেকটু খাবি, মা? তোর তো পেট ভরেনি। খা, আরেকটু খা, বেটি।’ বলে নিয়মিত আদর করেন, চোখের সামনে সেই আপন মানুষটাই নেই। কোথাও তাকে দেখতে পাচ্ছে না কাদম্বিনী। যে-পালঙ্কে তিনি ওকে কোলে নিয়ে প্রতি রাতে শুতে যেতেন, সেটি এখন মানুষের ভিড়ে চাপা পড়ে রয়েছে। নিচ থেকে কিছুই চোখে পড়ছে না ওর।
গত সন্ধ্যা থেকে কাদম্বিনীর পেটে কোনো খাবার পড়েনি। বড় দুর্বল লাগছে শরীর। ইচ্ছেই হচ্ছে না নড়াচড়া করার, ঘরের এক কোণে মটকা মেরে পড়ে থাকতে চাইছে মন; কিন্তু তীব্রক্ষুধা ওকে স্থির হতে দিচ্ছে না কোথাও। একটু আগে কোনো খাবার না পেয়ে সবার অগোচরে রান্নাঘরের বালতি থেকে সন্তর্পণে চুকচুক করে দুবার জলপান করে এসেছে। সে-সময় নিজের প্রতিবিম্বটি চোখে পড়ায় আঁতকে উঠেছে সে। সত্যি বলতে কী, নিজের প্রতি নিজেরই করুণা হচ্ছে। সদা পরিপাটি কাদম্বিনীর এ কী হাল হয়েছে এক রাতের ব্যবধানে? চোখের ক্ষিপ্র কাচস্বচ্ছ-দৃষ্টিটা পর্যন্ত কেমন ন্যাতানো; যে-মানুষটি ক্ষণে ক্ষণে ওর তত্ত্ব-তালাশ করতেন, লেপের তলায় যে কিনা গভীর আশ্লেষে ওকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করতেন ঘন ঘন, সেই মানুষটিকে কাল রাত থেকে কেউ কাছে ঘেঁষতে দিচ্ছে না। নিরিবিলিতে যে দু-একটা অভিযোগ-অনুযোগ জানাবে ওর ন্যাকা ভাষায়, তাও হচ্ছে না। কারণ যে-বিছানায় তিনি শুয়ে রয়েছেন, সেখানে অগুনতি মানুষজন। ওকে রাস্তাই দিচ্ছে না কাছে ঘেঁষার, সে কী করবে?

নিশ্চিন্ত নির্ভাবনাময় একচিলতে জায়গা পর্যন্ত নেই চুপচাপ বসে থাকার। মানুষের ভিড় ক্রমে বাড়ছে। সামান্য তন্দ্রা পেলেই মানুষের জুতোর মচমচ শব্দে ভয় পেয়ে হুড়মুড় করে জেগে উঠতে হচ্ছে ওকে।
অগত্যা বেশ কিছুক্ষণ বারান্দার এক কোণে বসে থেকে ক্লান্ত শরীরে বাইরে পা বাড়ায় সে। চোখ জ্বলছে প্রচ- দুর্বলতায়, আরেকটু পর হয়তো হাত-পা কাঁপতে শুরু করবে। এ অবস্থায় চারপাশের কাউকেই আপনজন বলে মনে হচ্ছে না আর। তাই আর কোনো উপায় না পেয়ে খাবারের খোঁজে গুটি গুটি পায়ে হেঁটে একসময় সে পুকুরপাড়ে চলে আসে। এখানে অনেক সময় ইঁচড়েপাকা ইঁদুর কিংবা অসহায় পাখির ছানা-টানা পাওয়া যায় বিনা চেষ্টায়। মনিবের মতো অসম্ভব ভদ্র, অমায়িক, আদর্শবাদী ও বিনয়ী মানুষটির সঙ্গে থেকে থেকে সে এসব খাওয়া-খাদ্যের স্বাদ কবেই ভুলে বসে আছে। সারাক্ষণ দুধ-ভাত আর পোনামাছ খেয়ে খেয়ে সে হয়ে পড়েছে সাধু-সন্ত কিসিমের এক সংযমী প্রাণী, অনেকেটা নলিনী স্যারের মতো। গোস্বা তো নেই বললেই হয়; চোখের সামনে দিয়ে গেছো ইঁদুর ছুটে পালালেও সে আগের মতো আর ফুঁসে ওঠে না; পারলে খাওয়ার আগে বামুনদের মতো সে কিছু খাবার পোকামাকড়দের জন্য ফেলে রাখে, এমনি তার শিক্ষা।

কিন্তু পেটে এখন দাউ দাউ করে জ্বলছে ক্ষুধার আগুন। খুব বুঝতে পারছে, আপন স্বভাবে ফিরে না গেলে শেষ পর্যন্ত জানটাই হয়তো খোয়াতে হবে ওকে। নিজের করুণ পরিণতি সম্পর্কে ভাবতেই শরীরে কাঁটা দিচ্ছে। আসন্ন মৃত্যুভয়ে শিউরে উঠছে অন্তর।

নিজের ভেতরকার লুকানো শিকারি স্বভাবটা এখন সে তীব্রভাবে ফিরে পেতে চাইছে। ধীরপায়ে এগোলেও তীক্ষè দৃষ্টি ওর আশপাশের ঝোপে-ঝাড়ে। একটা কিছু পেলেই হয়, সঙ্গে সঙ্গে এর ওপর প্রবল বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়বে সে। কোনো ব্যত্যয় হবে না, এমনি তার আত্মবিশ্বাস।
ঠিক এ-সময় চোখে পড়ে গেল ধ্রুবকে। তার পাশে দাঁড়ানো সুস্মিতা। ওরা পুকুরপাড়ের অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করছে বলে মনে হলো কাদম্বিনীর।

ওদের দেখামাত্র মনটাই খারাপ হয়ে গেল বেচারার। দুর্বল শরীর নিয়ে লুকিয়ে এসেছে শিকার ধরতে এখানে। অথচ সবখানেই দুর্ভাগ্যের জাল পাতা। ওদের সামনে কি সে নিজের আদি স্বভাব মেলে ধরতে পারবে? লজ্জা হবে না? কিন্তু লজ্জা পেলে পেটের জ্বালা মিটবে কী দিয়ে? ভেবে ভেবে কাদম্বিনী আনমনা হয়ে যায়।

তবে কিছুতেই ওদের সামনে নিজের স্বভাবজাত দুর্বলতাটুকু প্রকাশ করা যাবে না; না খেতে পেরে সে মরে যাবে, তবু নয়। সেজন্য নিজের প্রবৃত্তিকে বারবার মাটিচাপা দিতে চাইছে কাদম্বিনী, প্রবোধবাণী শুনিয়ে থামাতে চাইছে ক্ষুধার্ত সেই রসনাকে। সে যে এখানে শিকার ধরতে এসেছে, ওরা যেন কিছুতেই টের না পায়। ভাববে, কাদম্বিনী আর দশটা বিড়ালের মতোই, নলিনী স্যারের সঙ্গে থেকে এতটুকু বদলায়নি। মানসম্মান বলে কিছুই আর থাকবে না। তাই বাধ্য সন্তানের মতো নিরীহ চেহারা নিয়ে কাদম্বিনী ওদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। মাঝে মাঝে লোভী চোখে যাযাবর পাখিগুলোকে পরখ করে দেখছে। বারবার মনে হচ্ছে এক থাবায় ডানা-ঝাপটানো একটিকে মাটিতে ফেলে নিজের ক্ষুধা মেটাতে; কিন্তু এখানে সে বিড়াল-তপস্বী সেজে রয়েছে। রাগ হচ্ছে প্রচ- অথচ ওদের সঙ্গে তাল মেলানো ছাড়া কিছু করার নেই ওর। ওর প্রকৃত স্বভাব ধরা পড়ে গেলে যদি ওকে বাড়িছাড়া করে দেয় সবাই মিলে? এত সুখণ্ডআহ্লাদ ছেড়ে কোথায় গিয়ে ঠাঁই নেবে এ-সময়ে?

চোখের সামনে দাঁড়ানো এরা সব মনিবের বিশ্বস্ত অনুচর। অকারণে এদের খেপানো যাবে না। বিপদ হবে অনিবার্য। তাই পাশে থেকে সে ওদেরই মতো ভান করছে। মনে হচ্ছে, কতকিছু সে বোঝে, জানে। আসলে মনে মনে শিকার ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারছে না এখন।

ধ্রুব ওকে দেখতে পেয়ে কোলে তুলে নিল। আদর দিয়ে সুস্মিতাকে বলল, ‘স্যারের বড় প্রিয় পোষ্য। দ্যাখো, সেও কেমন কষ্ট পাচ্ছে। বারবার চোখ বুজছে আর খুলছে। এ অবোধ প্রাণীটিও ভেতরে কাঁদছে স্যারের জন্য, তাই না?’

‘একদম ঠিক, দাদাভাই। একদম।’ কথার শেষে গলা ধরে আসে সুস্মিতার। স্যার না থাকলে মাতা-পিতাহীন এ-মেয়েটি হয়তো আজ খালপাড়ে বসে ভিক্ষা করত কিংবা বিক্রি হয়ে যেত কোনো নটিবাড়ির মাসির কাছে।

ওর এই সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন তো নলিনী স্যারেরই দান। কলাপাতায় মোড়ানো সদ্যোজাত এক শিশুকে দেখে তিনি একবারও জিজ্ঞাসা করেননি, এ কার পাপ। ওর জাত-ধর্ম কিছুই জানা নেই মানুষটির; অথচ পরম মমতায় নবজাতককে মাটি থেকে তুলে এনে সুধা মাসির কোলে দিয়ে বলেছেন, ‘মানুষ করো’।

পুরনো কথা যত ভাবছে, তত বুকের ভেতরটা হু-হু করছে সুস্মিতার। ডুকরে কেঁদে উঠতে চাইছে মন।
ভেজা চোখে একবার আকাশের দিকে তাকায় সুস্মিতা। চেনা শহরটা গত সন্ধ্যা থেকেই বেশ থমথমে, অকারণে কেন যেন বিষণ লাগছে।

কোনো ভূমিকা ছাড়াই কোত্থেকে ঘন কুয়াশা এসে আকাশে জমা হচ্ছে। প্রথমে বোঝা যায়নি অথচ ক্ষণে ক্ষণে গাঢ় হচ্ছে এর আস্তরণ।

সারাক্ষণ মলিন মুখ আকাশের, সূর্য এ-পর্যন্ত একবারো হাসেনি। বৃক্ষগুলো আগে থেকেই মু-িতমস্তক। সব ছেড়েছুড়ে মোহমুক্ত ভিক্ষু সব। সকাল-সাঁঝে যে-পাখিকুল তারস্বরে ডেকে ডেকে অস্থির করে তুলত শহরবাসীদের – এরা পর্যন্ত এখন রা-হীন – ঠাহর করতে পারছে না এ সত্যিকার সকাল-সন্ধ্যা, নাকি রাতের মায়া।

অবিরাম-অনর্গল কিচিরমিচির আর শিসের শব্দে যারা বৃক্ষকুঞ্জে নিজেদের ভাব-ভালোবাসা আর আনন্দ প্রকাশ করত, এরা এখন ম্রিয়মাণ। শীত ও কুয়াশার দাপটে রীতিমতো জবুথবু। এমনকি, ভোরবেলাকার বখাটে চঞ্চল উদ্ধত দাঁড়কাকগুলো পর্যন্ত দু-চারটা কা-কা করেই নিশ্চুপ-নিস্পৃহ হয়ে বসে রয়েছে। কোনো শব্দ নেই ধারালো ঠোঁটের ডগায়। এদিক-ওদিক ঘুরপাক খাওয়া চোখে কেবল সন্দেহ আর অবিশ্বাস; জমাট অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে হয়তো ভাবছে, সত্যি কোনটা?

ধ্রুব সারারাত ঘুমায়নি। বেচারার নির্ঘুম চোখ চটচট করছে ক্লান্তিতে। গত সন্ধ্যা থেকে সে পড়ে রয়েছে নলিনী স্যারের কাছে; ইদানীং নানাভাবে ওকে আগলে বাঁচতে চাইত অকৃতদার এ-মানুষটা। একরকম নির্ভরতা তৈরি হয়ে গেছে ওর ওপর।

ধ্রুবর চোখে ভাসছে নলিনী স্যার। সাদা চুল ঘাড় অবধি ঝুরিবটের মতো ঝুলছে। খ্যাংরাকাঠি শরীর-স্বাস্থ্য। পরনে ময়লা ধুতি আর খদ্দরের পাঞ্জাবি। চোখে গোল চশমা। পায়ে চটি। কিন্তু কথা বলার সময় তার ক্ষীণ তনু অসম্ভব ঋজু আর বলিষ্ঠ দেখায়। তার মুষ্টিবদ্ধ হাত যুবককেও হার মানায়। দেহকা-ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে ভরাট ও উদাত্ত কণ্ঠস্বর। কোত্থেকে তিনি এ-শক্তি পান ধ্রুবর মাথায় ঢোকে না। অপরিচিত মানুষকে মুঠোর ভেতর নিমেষে নিয়ে আসার এক জন্মগত ক্ষমতা রয়েছে তার। অদ্ভুত, অভূতপূর্ব – ভাবলেই শিহরণ জাগে মনে।

এই পুকুরটা স্যারের বড় প্রিয়। কখনো তিনি এটি ব্যবহার করতেন না। তোলা জলে স্নান সেরেছেন সারাজীবন। এ পুকুরটা নাকি কেবল পাখিদের, কীটপতঙ্গ আর নানারকম ফুল-ফলের – এখানে দাঁড়িয়ে তিনি এ-কথাটাই বোঝাতে চাইতেন ওকে। জোরে জোরে নিশ্বাস নিতেন, প্রশ্বাস ফেলতেন ধীরে আর ওকে কাছে পেলে ফিসফিস করে বলতেন, ‘কান পেতে রাখো, ধ্রুব। বছরের পর বছর মনের সব দরজা খুলে কান পেতে রাখলে টের পাবি, তুই কত নিঃসঙ্গ। আর এই নিঃসঙ্গতা বোধ থেকেই তুই শক্তি পাবি পথ চলার।’

সে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের ছাত্র। কোলরিজের অ্যালবাট্রস পাখিটি দেখতে কেমন তা কল্পনা করতেই সময় কেটে যায়। সাদা বকের সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে অ্যালবাট্রসকে আঁকার চেষ্টা করে মনে মনে। ওয়েস্ট মিনস্টার অ্যাবে কী তা কল্পনায় আনা তো আরো দুরূহ এক কাজ। তবু সে ইংরেজি পড়তে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। কারণ নলিনী স্যারের প্রিয় বিষয় এটি। জীবনানন্দ, বুদ্ধদেব বসুদেরও পঠিত বিষয় ছিল ইংরেজি – এজন্য তাকেও পড়তে হবে। স্যারেরও ইচ্ছা ছিল, হয়নি যৌবনের কোনো এক দুরন্তপনার কারণে। সেটাই সাকার করতে চায় ওর ভেতর দিয়ে। কারণ?

কারণটা সে কোনোদিন জানতে পারেনি। ওর বাবা নেই। অসবর্ণে বিয়ে করায় ত্যাজ্যপুত্র ছিলেন তিনি। মৃত্যুর পর পুরো পরিবারটি নিঃসঙ্গ, অসহায় তখন। স্যার স্থানীয় এক বিদ্যালয়ে পাঠদান করেন। বাপ-দাদা জমিদার হলেও অতি সাধারণ তার চলাফেরা। এজন্য অল্পবয়সেই শহরের সবার দৃষ্টি কেড়ে নেন তিনি। সেই আদর্শবাদী মানুষটি দাঁড়ান ওদের পাশে। কাউকে পরোয়া না করে অসহায় পরিবারটিকে তুলে নিয়ে এলেন নিজের ভাঙাচোরা জমিদারবাড়ির আঙিনায়।

বামপন্থা অনুসারী নলিনী স্যারের এদেশে আপন বলতে কেউ ছিল না। সবাই ওকে ছেড়ে ভারতে ছোটভাইয়ের কাছে চলে গেছে। কেবল তিনিই একা পড়ে রয়েছেন এ-বাড়ি আগলে। খ্যাপাটে স্বভাব, যা ইচ্ছে হয় তাই করে বেড়ান। একবার মনে হলো, পুরো সম্পত্তি কোনো মানুষকে নয়, কাদম্বিনী নামে এক বিড়ালকে দান করে যাবেন। কদিন এ-উকিল ও-উকিল করেছেন। কিন্তু তার প্রস্তাবে কেউ সায় না দেওয়ায় কদিন পর সেটি আপনাআপনি মাথা থেকে উবে গেছে। তার ধারণা, অত্যাচারী সামন্তপ্রভুদের একজন উত্তরসূরি তিনি; পূর্বপুরুষদের করা সেসব অপকর্মের তিনি প্রায়শ্চিত্ত করছেন – এ-কথাটাই বারবার করে সবাইকে বলে থাকেন তিনি। ধ্রুবকে তেঁতুলগাছটা দেখিয়ে একদিন স্যার বললেন, ‘এ-গাছটার নিচে ছিল একটা অন্ধকূপ। অবাধ্য প্রজাকে মারধর করে এখানে ফেলে দিত। আমি তেঁতুলগাছ বুনেছি সেই জায়গায়।’

আরেক দিন পুকুরটার সামনে দাঁড়িয়ে আচমকা বলে উঠলেন, ‘এখানে ছিল আমার পূর্বপুরুষদের অবৈধ অনৈতিক কামচর্চার কেন্দ্র। নামটা খুব গালভরা, শ্বেতপাথরে খোদাই করা, দুদিকে দুই উড়ন্ত পরি, আনন্দ নিকেতন। বড় বড় সাহেব-সুবো আর তাদের কর্মচারীদের অবৈধ রতিক্রীড়ার স্থান। মদ-জুয়া-ব্যভিচার সব চলত এখানে। এলাকার অসহায় মেয়েরা এর বলি হতো। আমি সেই ইট-সুড়কির বিল্ডিংটা ভেঙে দিয়ে এ-পুকুরটা খুঁড়েছি। বলো, খারাপ কিছু করলাম? বলো?’

স্যারের মুখে এসব কথা শুনলে কেমন এক শুদ্ধ অনুভবের জন্ম হতো ভেতরে। জীবনের সব চাওয়া-পাওয়াগুলোকে মিথ্যা বলে মনে হতো তখন।

পুকুরটি খনন করার সময় থেকে এই সেদিন পর্যন্ত স্যার অদ্ভুত সব কথা বলতেন এই টলটলে পুকুরটি নিয়ে। ছোটবেলায় আজগুবি ঠেকত এসব। এখন গা-সওয়া, অভিজ্ঞতা ওর কানে কানে বলে দিয়েছে, তোর স্যারের জগৎ এই পুকুরটা। একে মহিমা দান করে পরোক্ষে নিজেকেই মহান করে তুলতে চাইছেন অসহায় রিক্ত একা এ-মানুষটা।

তবে আশৈশব ধ্রুব দেখে এসেছে, নলিনী স্যার ওদের পরিবারের একমাত্র অভিভাবক। তিনি যা বলেন তা-ই হয়। মা তাকে গুরুজি বলে সম্বোধন করেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা নলিনী স্যার ধ্রুবর মায়ের মাথায় হাত রেখে নিমীলিত নেত্রে বসে থাকেন। আর ওর মা তার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে ক্রমাগত অশ্রু ফেলেন। কেন, কী দুঃখ মায়ের অন্তরে – ওর জানা নেই। স্যার শুধু বিড়বিড় করে বলেন, ‘নিজের ভেতর নিঃসঙ্গতাকে জাগিয়ে তোলো, শেফালি। তুমি একা, বড় একা – ভাবো বারবার করে।’
ধ্রুব অবাক চোখে তাকিয়ে থাকত সেদিকে। কিছুই বুঝতে পারত না।

ওর দু-বোনের বিয়ে হয়েছে স্যারের পরামর্শে। ওর লেখাপড়া চলেছে তারই বদান্যতায়। ওদের প্রাত্যহিক খরচও তিনি জুগিয়েছেন দিনের পর দিন। এমনকি যে-বাড়িতে থাকে ওরা, সেটিও নাকি শেষ পর্যন্ত ওদেরই হবে। বাড়িটার সীমানা-পাঁচিল নেই, হয়তো ছিল কোনোকালে, এখন ধসে গিয়ে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। চারদিকে যা রয়েছে তা কেবল বড় বড় ফলবান আম-কাঁঠাল-নারিকেল-পেয়ারা -আমলকী-জামরুল গাছ। দিনের বেলায়ও চারদিক অন্ধকার। ঘন অরণ্যের ভেতর সবার বসবাস।
মা বলেন, ‘তিনি মহাপুরুষ। তিনি সিদ্ধপুরুষ। তাকে নমস্কার করো।’

ওরা ভাইবোন সবাই সেভাবেই তাকে দেখে। পরম শ্রদ্ধায় তার পায়ের ধুলা নিয়ে মাথায় দিয়ে ভেবেছে, তিনি এক আদর্শবান পুরুষ। এ যুগে এরকম পরমহংস হয় না।

ধ্রুবর দৃষ্টি এখন নিরিবিলি নিমগ্ন জলাশয়ের জলে। জলের বুকে লাল-সাদা শাপলা-পদ্ম। চারপাশে ঝোপঝাড়ের নিবিড় আলিঙ্গন; অগুনতি প্রজাপতি আর ফড়িং উড়ছে টলমল সেই রঙিন জলাশয়ে। মাঝে মাঝে আকাশ লক্ষ করে লাফ দিচ্ছে উদ্দীপিত দুষ্টু সব মীনের দল। ধ্রুব কান পেতে রাখে নিবিড় এ-পরিবেশে, চোখের পাতা বন্ধ। ওর মাথার ওপর বিশাল এক তেঁতুলবৃক্ষ। চিরল পাতার আড়ালে সবুজ-বাদামি তেঁতুল চুঁইয়ে পড়ছে ভোরের শিশিরকণা।

সে তার প্রিয় স্যারকে স্মরণ করতে চায়। সেই মুখ, সেই চোখ, সেই অনতিক্রম্য নির্দেশনা – সব স্পষ্ট ভাসছে চোখে। স্যার ওর পাশে দাঁড়িয়ে বলছে, ‘মানুষ কিছুই রেখে যেতে পারে না, শুধু একখানা নিবিড় আকুতি ছাড়া – আমায় মনে রাখিস। রাখবি আমারে মনে?’ ঘাড়ে সস্নেহ হাত। চোখে টলমল কাতরতা।
‘রাখব, স্যার।’ ধ্রুবর উত্তর।
পরক্ষণে মানুষটা ধ্রুবকে চমকে দিয়ে উদ্ধত ভঙ্গিতে উত্তর দেন, ‘না রাখলে রাখবি না? ফেলে দিবি এই পদ্মপুকুরে? কী যায় আসে? আমি তো রবীন্দ্রনাথ নই, জীবনানন্দ নই, শেক্সপিয়র-মিল্টন নই যে বাধ্য করব তোদের আমায় মনে রাখতে!’

ধ্রুব সুস্মিতার দিকে তাকায়। ওর মতো সুস্মিতাও হয়তো স্যারের কথাই ভাবছে। স্যারের পালিতা কন্যা। খুব আদর করতেন ওকে। ধ্রুবর চাইতে ক-বছরের ছোটই হবে। খুবই উচ্ছল প্রকৃতির। সারাক্ষণ হাসে। বিএ পাশ করে একটা এনজিওতে চাকরি নিয়েছে সম্প্রতি। চোখভরা স্বপ্ন।

‘জানিস, এ-পুকুরটার সামনে দাঁড়ালেই মনে পড়ে আমি খুব একা। নিজেকে একা ভেবে কষ্ট পাওয়ার শিক্ষাটা স্যারই শিখিয়েছেন।’ স্বগতোক্তির মতো সুস্মিতা মন্তব্য করল। নলিনী রায়কে ধ্রুবর মতো সে-ও স্যার সম্বোধন করে।

দুজনার চোখেই এক ভাবালুতা; চোখের সামনে পরিযায়ী পাখিরা ডুবছে, সাঁতার কাটছে আবার আকাশে পাক দিয়ে ধুপ করে ঝাঁপ দিচ্ছে জলে। এখানটায় দাঁড়ালে কথা বন্ধ হয়ে যায়। কোনো কোলাহল নেই, গা-ছমছম করে অশরীরী এক আবেশে। শীতের হাওয়া উষ্ণ নিবিড় নিঃশ্বাসের মতো ফুল-ফড়িং ছুঁয়ে ওদের স্পর্শ করে যায়।

কাদম্বিনী ধ্রুবর কোলে; ক্লান্ত স্বরে মাঝে মাঝে মিউমিউ করে উঠছে। হয়তো স্যারকে খুঁজে না পেয়ে এখানে চলে এসেছে।

সুস্মিতা ওকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে সহসা হো-হো করে কেঁদে ওঠে। মনে হলো, স্যারের আঙুলের উষ্ণতা এখনো ছুঁয়ে রয়েছে কাদম্বিনীকে।

ধ্রুবর চোখ ভেজা। বারবার চোখ মুছছে। সুস্মিতা যেন ওর বুকের ভেতর জমে থাকা মেঘের দলে খোঁচা দিচ্ছে।

নলিনী স্যার হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন, তিনি আর বেশিদিন নেই এ জগৎ-সংসারে। তাই নিজের দেহটি দিয়ে গেলেন স্থানীয় এক বেসরকারি মেডিকেল কলেজে। এর কদিন আগে নিজের বাপ-দাদার জমিদার বাড়িটা দু-ভাগ করে অর্ধেকটা দিলেন ধ্রুবদের আর বাকিটা রইল সুস্মিতার জন্য। একান্ত নিজের বলে রেখে দিলেন এ-পুকুরটা। এটা নাকি তার নিজের। এটি তিনি নিজের মাস্টারির টাকায় খনন করিয়েছেন। বছরের পর বছর পরিশ্রম করে তিনি এটিকে ফুল-পাখি-গাছ-লতাপাতার এক শুচিঘর বানিয়েছেন। তাই এ-পুকুরে তার একচ্ছত্র আধিপত্য ও মায়া। তিনি এটি ছাড়তে রাজি নন।
‘জানিস, এখানে এলেই বুঝতে পারি আপন সৃষ্টির কী অপার আনন্দ। এ আনন্দ চিরপুরনো, তবু চিরনতুন। এ পুকুরটার মতন। তাকিয়ে দ্যাখ।’
‘স্যার, এ-পুকুরটাই রেখে দিলেন? থাকবেন কোথায়?’
স্যার হাসলেন। উত্তর দিলেন না। রহস্যময় সবুজ ক্যানোপির ভেতর নিজেকে আটকে রাখলেন।
ধ্রুব এখন অনেক কিছু বুঝতে পারে; অনেক ঘটনাই নিজের মতো করে ভেবে নিতে পারে। বিসিএস দেওয়া সরকারি চাকুরে সে। মফস্বলে পোস্টিং পেয়ে কাজ নিয়ে মেতে রয়েছে। মাঝে মাঝে স্যারের চিঠি পান। বেশিরভাগ উপদেশ কিংবা দেশাত্মবোধে উদ্দীপিত হওয়ার আহ্বান। ওর হাসি পায়। ধ্রুবর চারপাশের মানুষগুলোর সঙ্গে ঠিক যায় না। এরা কামিনী-কাঞ্চনে আকণ্ঠ নিমজ্জিত অথচ স্যার প্রতি চিঠিতে লেখেন, যেখানেই যাবে এরকম একটা পুকুর রেখো, আর কেউ না হোক পুকুরটাই তোমায় বাঁচিয়ে রাখবে।

শীতের সময় স্যার এই তেঁতুলগাছটার নিচে একটা চেয়ার পেতে রোদ পোহাতেন। কখনো ওকে একা পেলে হাজার কথা বলতেন। ধ্রুব দাঁড়িয়ে থেকে হু-হা করত – মন থেকে কিছুই নিতে পারত না। মাঝে মাঝে বিরক্ত হতো। কিন্তু স্যারের সঙ্গে এমন আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা ওদের অস্তিত্ব যে কিছুই বলতে পারত না। এককালে অভিভাবকহীন এ-পরিবারটিকে বাঁচিয়েছেন তিনি; কিন্তু এখন ওরা স্বাবলম্বী। এ-বাড়িতে না থাকলেও ওদের কিছু যায় আসবে না। চাইলেই ওরা অন্য জায়গায় চলে যেতে পারে। শুধু ওর মায়ের কারণে তা হয় না। ওরকম ইঙ্গিত করলেই মা বলে ওঠেন, ‘এক সময় আমাদের কেউ ছিল না। তিনি ছিলেন। আজ তুই হয়েছিস। ছেড়ে যাবি?’
এর কোনো সদুত্তর ধ্রুবর জানা নেই। সে গুম হয়ে থাকে নিজের ভেতর।
সুস্মিতা পাশ থেকে বলে ওঠে, ‘স্যার কেন বিয়ে-থা করেনি, জানিস দাদাভাই?’
জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় সে। সে মাথা নাড়ে। কোনোদিন এ-কথাটি স্যারকে সে জিজ্ঞাসা করেনি।
‘তুই জানিস?’ সুস্মিতা ওর বোন। ছোটবেলা থেকে একই উঠানে বেড়ে উঠেছে। দুজনই একই কারণে দগদাচ্ছে। স্যারকে খুব মনে পড়ছে। থেকে থেকে কেবল কান্না পাচ্ছে।
‘না রে। আমিও জানি না।’ বলেই কেঁদে উঠল।
ধ্রুব তখন নীলগঞ্জে। একটি চিঠি পেল সে। মন থেকে অনেক কথা লিখলেন স্যার। সচরাচর যা বলেন, সেগুলোই। কিন্তু এই প্রথম চিঠির শেষে একটা প্রশ্ন রেখে দিলেন, ‘নিজে একটা পুকুর করতে পারলি, বাবা?’ সে-সময় ভালো লাগেনি এরকম জিজ্ঞাসার উত্তর দিতে। পেশার কারণে এখন অনেক রূঢ় বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয় ওর। স্বভাবতই এসব ভাবালুতা ধ্রুবকে স্পর্শ করতে চায় না আজকাল। কিন্তু স্যার হচ্ছেন সেই মানুষ, যিনি অসহায় পরিবারটিকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হওয়া থেকে বাঁচিয়েছেন। সেই মানুষকে অস্বীকার করা সম্ভব নয়।

নলিনী স্যর একই কথা সুস্মিতাকেও বলেছেন, ‘একটা এরকম পুকুর রেখে যা। যেখানে জল আছে। মাছ আছে। শাপলা-শালুক, পদ্ম, ঘাসফড়িং সব। যেখান থেকে আকাশ চেনা যায়। রেখে যা, মা। রেখে যা।’

সুস্মিতা এইমাত্র সেকথা ধ্রুবকে জানাল। কান্নাভেজা গলায় বলল, ‘আমি কীভাবে পুকুর কাটব, বলো দাদাভাই? আমার কি সেই শক্তি আছে?’ বলেই ওড়না দিয়ে মুখ ঢাকে।

সহসা নিস্তরঙ্গ এ-পরিবেশ চিরে একদল পাখি শূন্য থেকে ঝপাং করে জলে লাফিয়ে পড়ে। অনর্গল কিচিরমিচির আর টুই-টাই শব্দে আকুল-ব্যাকুল এই পুকুরপাড়। ইদানীং ওরাও সুদূর রাজ্য থেকে উষ্ণ সুখের খোঁজে এখানে আসছে। আচ্ছা, এরা কীভাবে টের পায়, নলিনী স্যারের এ-পুকুরপাড়টা তাদের জন্য অভয়ারণ্য? কীভাবে?

পাখিরা মাথার ওপর ছোটাছুটি করছে। তা দেখে কাদম্বিনী প্রথমে চুপচাপ ছিল সুস্মিতার কোলে। সহসা ওদের দুজনকে চমকে দিয়ে প্রচ- এক লাফে একটি নিরীহ প্রবাসী পাখির ঘাড় কামড়ে ধরে মাটিতে গিয়ে পড়ল। তারপর পলকের ভেতর পাখিটি ছিঁড়ে-খুঁড়ে সে খেতে লাগল। এ সময় কাদম্বিনীর মুখ থেকে এক অদ্ভুত হুমহুম শব্দ বেরোতে থাকে। সম্ভবত এগুলো তৃপ্তিদায়ক শব্দ।

ধ্রুব আর সুস্মিতার চোখ বিস্ফারিত। কাদম্বিনীকে কখনো এরকম হিংস্র শিকারি প্রাণী বলে মনে হয়নি। প্রথমবার ওর এই রুদ্ররূপ দেখে ওরা যুগপৎ বিস্মিত, হতবাক।

বেশ কিছুক্ষণ পর কাদম্বিনী শান্ত হলো। সতর্ক পায়ে পুকুরে নেমে সুড়–ৎ সুড়–ৎ করে জল পান করল। তারপর ঘাড়-শরীর ঘুরিয়ে নির্লজ্জভাবে আড়মোড়া ভাঙার মতন একটা আয়েশি ভঙ্গি করে ফিরে এলো ওদের কাছে।

সুস্মিতা চোখ ঘুরিয়ে নিল তীব্র অনীহায়। ধ্রুব রীতিমতো বিরক্ত। নলিনী স্যারের মতো মানুষের সঙ্গে থেকেও পশুটার স্বভাব এতটুকু বদলায়নি বলে সে ক্ষুব্ধ, মর্মাহত। এমন বেয়াদব উদ্ধত স্বভাবের বিড়াল কীভাবে জায়গা পায় এ-বাড়িতে – সে ভেবে পায় না। অথচ স্যার তার সমস্ত সম্পত্তির ভাগিদার করতে চেয়েচিল এ হিংস্র প্রাণীটিকে?

এ-সময় এ-বাড়ির কাজের লোক সুধা মাসি ছুটে এলো। হাতে ধরা একটা চিরকুট। কাপড়চাপা মুখে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, ‘মরণের আগমুহূর্তে দিছে।’ বলে মহিলা ছুটে বাড়ির ভেতর ঢুকে গেল। আজ থেকে সে-ও একা, কাদম্বিনীর মতো কি সে-ও স্বার্থপর হয়ে উঠবে? ভাবতে ভাবতে ওরা পুকুরপাড় থেকে বাড়ির ভেতর চলে এলো।

এইমাত্র ঘর থেকে বের করা হলো স্যারকে। কপালে চন্দনের টিপ। গলায় গাঁদা ফুলের মালা। চোখ বুজে রয়েছেন প্রাণহীন নলিনী স্যার। মা কিছুতেই স্যারকে ছাড়তে চাইছেন না; স্যারের পদযুগলে বারবার মাথা ঠুকছেন আর বিলাপ করছেন, ‘আমারে ছাইড়া কই যান গুরুঠাকুর? আমি কী নিয়া বাঁচুম!’

উঠোনভরতি লোকজন। তিনি জীবদ্দশায় অজাতশত্রু ছিলেন। ছোট্ট মফস্বল শহর, খবরটি চাউর হওয়ার পর হিন্দু-মুসলমান সবাই জড়ো হচ্ছে জমিদারবাড়ির আঙিনায়। শেষ দেখা দেখবেন বলে সবাই আসছে। মা তখন চিৎকার করছেন গুরুঠাকুর-গুরুঠাকুর বলে।

ধ্রুব নলিনী স্যারের চিরকুটটা মেলে ধরল চোখের সামনে। সেখানে লেখা শুধু কখানা শব্দ – ধ্রুব, এ-পুকুরটা তোরেই দিলাম। আমি জানি, তোর জীবনে এরকম পুকুর আর হবে না। তোর সেই শক্তি নেই। শুধু খেয়াল রাখিস, পাখিরা যেন প্রতিবছর এখানে নাইয়র আসতে পারে। তাইলেই চলবে।
এ সময় ধ্রুবকে চমকে দিয়ে কোত্থেকে কাদম্বিনী মিউমিউ করে ছুটতে ছুটতে খাটিয়ার ওপর শোয়ানো স্যারের নিষ্প্রাণ বুকের ওপর গুটিশুটি মেরে বসে পড়ল। এ দৃশ্যে শবযাত্রায় অংশগ্রহণকারী কারো কারো চোখ সজল; শহরের কোনো এক সম্ভ্রান্ত ভদ্রলোক নিজেকে চাপতে না পেরে বলেই ফেললেন, ‘এই অবলা-অবোধ প্রাণীটিও বোঝে রে, কার কত মূল্য। কানতেছে, বেচারা শেষ কান্দন কানতেছে মনিবের লাইগ্যা।’

কিন্তু ধ্রুব স্পষ্ট দেখতে পেল, কাদম্বিনীর মুখে লেগে রয়েছে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ।
ধ্রুব তীব্র দৃষ্টিতে কাদম্বিনীর দিকে তাকিয়ে আগুন ঝরায়। কিন্তু কাদম্বিনী গোঁফ নাড়িয়ে মুচকি মুচকি হাসে শুধু। একটু পর কোমল ও স্বস্তিদায়ক কণ্ঠে ডেকে ওঠে, ‘মিঁউ’।
ধ্রুব সে-কথা বুঝতে পারে না।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত