একটি এগিয়ে চলার গল্প

একটি এগিয়ে চলার গল্প
লকডাউনের ঠিক একদিন পর আমার স্টুডেন্ট সিফাতের আম্মু হন্তদন্ত ফোন দিয়ে বললো, বাবা সাদিক, তুমি এখন কই? কন্ঠে তার অপরিমিত মধু, আমি আগেভাগেই সাবধান হয়ে গেলাম। অভিভাবকদের কন্ঠে যখনই মধুর আধিক্য দেখবেন, সাথে সাথে সাবধান হয়ে যাবেন। জানবেন পেছনে বড়সড় কোন বাঁশ রেডি করা আছে। আমি কন্ঠে তারচেয়েও মধু ঢেলে বললাম, আন্টি আমি তো রাজশাহীতে চলে আসছি । লকডাউন চলে। বাইরে করোনা ভাইরাস। তাই ঘরে থাকুন, সুস্থ থাকুন। আন্টি দুঃখী দুঃখী গলায় বললেন, বাবা, কোনোভাবে রাজশাহী থেকে গাজীপুর এসে পড়াইয়া দিতে পারবা না?টাকা পাঁচশো বাড়িয়ে দিবনি, চিন্তা করো না।
আমি গলায় তারচেয়েও বেশি দুঃখ ঢেলে বললাম, দেখেন আন্টি, টাকা পয়সা নিয়ে তো কোনো কথা নাই। আমি টাকার হিসেবে পড়াই না। তারপরও ট্রেন চললে আমি সকালের ট্রেনে যাইয়া পড়াইয়া আবার বিকেলের ট্রেনে ব্যাক করতাম। কিন্তু সরকার তো ট্রেন অফ করে দিয়েছে। সরকারের উপর আর কথা আছে? আন্টির কন্ঠ থেকে মধু উধাও হলো। উনি খট করে ফোন নামিয়ে রাখলেন। এর সপ্তাহখানেক পর আবার উনার ফোন। বললেন বাবা, ইন্টারের ম্যাথ বই কোন রাইটারের ভালো হবে বলতে পারো?
আমি বললাম কেতাব উদ্দিন স্যারেরটা কিনেন। কঠিন হলেও ভালো। কিন্তু ইন্টারের বই দিয়ে কী করবেন? কার জন্য? উনি বললেন তোমার স্টুন্ডেন্ট সিফাতের জন্যই। ছুটি যখন পেয়েইছে, পড়াটা একটু আগাইয়া রাখুক।ক্লাস নাইনে পড়ছে তো কী হয়েছে? এইতো কিছুদিন পরেই ইন্টারে উঠবে, আগে থেকেই পড়ালেখা আগাইয়া রাখলে বেসিক ক্লিয়ার হবে। আন্টির বেসিক দেখে চমৎকৃত হলাম। মাসখানেক পর লকডাউন আর ছুটি বাড়ানো হলো। আবার আন্টির ফোন। আন্টি বললো, বাবা বুয়েটে অ্যাডমিশনের জন্য কোন বই কিনবো? ছুটি পাইছেই যখন পড়া আগাইয়া রাখুক। এইচএসসি তো আসল জিনিস না, এডমিশনটাই আসল।
আমি বললাম আমি নিজেই বুয়েটে চান্স পাই নাই, আপনাকে কেমনে বলবো? তবে জয়কলির এক সেট বই পড়লে শুনেছি হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড পর্যন্ত ক্লিয়ার করে ফেলা যাবে। ওটাই কিনে দেন। পরবর্তীতে তো এমআইটিতে পিএইচডি করতে হবে, পড়া আগাইয়া রাখুক। জয়কলির বই কেনার পর এবার আন্টি জানতে চাইলেন বুয়েটের টেক্সটবুকের নাম কী?আজকাল অনেকেই বুয়েটে চান্স পায়, চান্স পাইলেই হইলো নাকি? ক্লাসের পড়া শুরু করে দিক, কাজ আগাইয়া রাখি।
আমি ফিশারিজের স্টুডেন্ট, ফিশারিজেরই একটা টেক্সট বইয়ের নাম জানি না। পরীক্ষার আগের রাতে শিট ফটোকপি করে মুখস্থ করে পাশ করি। বুয়েটের ডিপার্টমেন্ট কয়টা তাও জানি না, টেক্সটবুকের নাম কেমনে জানবো? মনে পড়লো বুয়েটের মেকানিক্যালে পড়ুয়া বন্ধু শুয়াইবের কথা। গত দুই বছরে শুনেছি ও মেকানিক্যালে ভালোই সিজি তুলেছে, ওর ফোন নম্বর আন্টিকে দিলাম। যতখুশি টেক্সটবুক কিনুক এবার। শুয়াইবের নাম্বার দেওয়ার আধা ঘন্টা পর আন্টি হিসহিসিয়ে বললেন,হাউ ডেয়ার ইউ সাদিক, তুমি কি আমার ছেলেকে আন্ডার এস্টিমেট করো? ভয়ে আমার বুক ঢড়াস করে উঠলো। কোনো ভুল করে ফেললাম না তো? টিউশনটা গেলো নাকি এবার? মাবুদ গো, এই আট হাজার টাকায় আমার দুই গার্লফ্রেন্ড এর প্রেমের সংসার চলে। টিউশন চলে গেলে দেবদাস হওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।
আন্টি তখনও বলছেন, সিফাত যখন পেটে, তখন থেকেই ওর নানার স্বপ্ন ছিলো আমার ছেলে বুয়েটের সিএসইতে পড়ে গুগলে জব করবে আর তুমি ওকে মেকানিক্যালে ভর্তির চেষ্টা করছো? বুয়েটে যে মেকানিক্যাল নামে কোনো ডিপার্টমেন্ট আছে, সেটাই তো সিফাতকে বলিনি আমরা। টিউশনি টিকিয়ে রাখার প্রধান শর্ত হলো কোনোভাবেই তর্ক করা যাবে না। আমিও কোনো তর্কে গেলাম না। এবার বুয়েটের সিএসইর আরেক ফ্রেন্ড সাইফুলের নাম্বার দিলাম আন্টিকে। সাইফুলের জন্য কষ্টই হচ্ছিলো, কিন্তু কিছুই করার নাই।
ঘন্টা দুয়েক পর সাইফুলের গার্লফ্রেন্ড অবন্তি আমাকে ফোন করে তীব্র গালাগাল শুরু করলো। সাইফুল নাকি অজ্ঞান হয়ে রামেকে ভর্তি আছে ফোনে কথা বলার পর। রামেকের সতেরো নম্বর ওয়ার্ডে দৌড় দিলাম। কাহিনী হলো, আন্টি ওকে ফোন দিয়ে ওর সিজি, রিসার্স এরিয়া, রিসার্চ আর্টিকেল, আর প্রফেসরদের রিসার্চের ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর জানতে চেয়েছিলেন, সাইফুল ইসলাম, বুয়েটের থার্ড ইয়ারের ছাত্র, ক্লাস নাইনের ছাত্রের এরকম সিরিয়াসনেসের কথা শুনে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেছে। হাসপাতালের বেডে শুয়ে কাঁদতে কাঁদতে সাইফুল বলে, ভাই সাদিক, ক্লাস নাইনে থাকতে রিসার্চের নামও জানতাম না, সারাদিন ব্যাট বল খেলেছি, এই জীবনে আমার আর কিছু কী হবে বলো? সাইফুলকে ভুংভাং বলে সান্ত্বনা দিয়ে বাসায় এসেছি। আটত্রিশ বিসিএসের রেজাল্ট এর দিন আন্টি আবার ফোন দিলেন। বললেন, বাবা সাদিক বিসিএসের ফরেন ক্যাডারের জন্য কোন বই কিনবো বলো তো?বুঝতেই পারো, ছেলে আমার ইংলিশ ভার্সনে পড়ছে, হবু বুয়েটিয়ান, ফরেইন ছাড়া অন্যান্য ক্যাডারে গেলে মান ইজ্জত থাকে? এখন তো ছুটিই আছে, পড়ে ফেলুক, কাজ আগাইয়া রাখি।
সমস্যা হলো আমার পরিচিত কেউ ফরেইনে নাই। পরিচিত ক্যাডার ভাই বেরাদার প্রায় সবাইই কৃষিবিদ, কাজিন একটা আছে স্বাস্থ্য ক্যাডারে। কিন্তু ফরেইন ক্যাডার পাবো কই? টিউশনি টিকিয়ে রাখার মূল শর্ত হলো কোনো কিছুতেই না বলা যাবে না। আমি সুশান্ত পালের ওয়েবসাইট ঘাঁটি, ইউটিউব ভিডিও দেখে বইয়ের লিস্ট করে আন্টিকে দিই। আন্টি এর কিছুদিন পর বলে, বাবা সাদিক, ভালো কমপ্লিট ড্রেস কোথায় বানানো হয় জানো? তোমার ফরেইন ক্যাডার ভাইয়ের থেকে জেনে নিও তো।
যদিও হোম টিউটরদের কৌতূহল থাকা উচিত না, তারপরও মানুষ মাঝেমধ্যে অনুচিত কাজও করে ফেলে। আমিও করলাম। বলে বসলাম, কমপ্লিট ড্রেস দিয়ে কী করবেন আন্টি? আন্টি উপহাসের স্বরে বলে, আরে গাধা, ছেলে আমার ফরেইন ক্যাডার হলে তখন কি আর এই ভুংভাং হাফ প্যান্ট আর গেঞ্জি পরতে পারবে? সারাদিন তো কমপ্লিট ড্রেস পড়েই থাকতে হবে। তারচেয়ে এখন থেকেই কম্প্লিট ড্রেসে অভ্যাস করুক, কাজ আগাইয়া রাখি।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত