খেয়া

নোটিফিকেশনে নামটা দেখেই কৌতূহলী হয়ে উঠেছিল ইমরান।
মেঘলা আকাশ নামের একটি মেয়ে তাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে। বাস্তব জীবনে এমন কাব্যিক নামের কোনো মেয়ের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব তো দূরের কথা, পরিচয়ও নেই, রাস্তাঘাটে – অফিসে-আদালতে – বিপণিবিতানে, কোথাও এই নামের কারো সঙ্গে কখনো দেখা হয়েছিল বলেও তার মনে পড়ছে না। তবে ও জানে, উদাস দুপুর কিংবা রোদেলা বিকেল অথবা নিঃসঙ্গ পরি – এগুলো সবই বানানো নাম। এমনও হতে পারে, হয়তো এই অ্যাকাউন্টটাও ফেইক। সাহিত্যপ্রেমী কোনো পিতা-মাতা তাদের কন্যার নাম মেঘলা রাখলেও রাখতে পারেন, কিন্তু নামের সঙ্গে মিলিয়ে শেষে আকাশ জুড়ে দেবেন এরকম বোকা তারা নিশ্চয়ই নন। আবার এমনও হতে পারে, হয়তো এটা কোনো একজন নারীর অ্যাকাউন্ট, ঠিকই আছে; কিন্তু তিনি হয়তো তার পরিচয় গোপন করে এই ছদ্মনামটা নিয়েছেন। আবার এমনও তো হতে পারে, এটা কোনো মেয়েরই অ্যাকাউন্ট নয়, এর পেছনে যে বসে আছে সে আসলে গোঁফ-দাড়িওয়ালা কিংবা পুরোদস্তুর টাকমাথাওয়ালা এক পুরুষ!

অনেক দিন পড়ে আছে মেঘলা আকাশের রিকোয়েস্ট। যখনই ফেসবুকে ঢুঁ মারে, তখনই ওর মনের ভেতরে কৌতূহল জেগে ওঠে। তাই হাতে যখন একটু সময় পেল, মেয়েটির টাইমলাইন একটুখানি ঘুরে ঘুরে দেখল ইমরান। তারপরও পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া গেল না এটা কোনো পুরুষ নাকি নারী। তবে ওয়ালে যত কিছু পোস্ট করা হয়েছে, তাতে মেয়েলি একটা গন্ধই টের পেল সে – বিরিয়ানি রান্নার রেসিপি থেকে শুরু করে কবর জিয়ারতের দোয়া এবং হাতে মেহেদি লাগানোর ভিডিও থেকে অনলাইনে সালোয়ার-কামিজ কেনার লাইভ – সবই আছে সেখানে।

আরো অদ্ভুত হলো, নাম মেঘলা আকাশ কিন্তু প্রোফাইল পিকচারে দেওয়া আছে গোলাপের কুঁড়ির ছবি। জমাটবাঁধা রক্তের মতো কালচে লাল ওই গোলাপ। সঙ্গে আছে সবুজ পাতাও। দেখলে মনে হয়, সবুজ শাড়ির ঘোমটার আড়াল থেকে কৌতূহলী এক নারী অপার বিস্ময়ে উঁকি মেরে বাইরের পৃথিবীকে দেখার চেষ্টা করছে।

অফিসের একটা জরুরি ফাইল দেখছিল ইমরান। প্রজেক্টটা আজকেই শেষ করে বসের কাছে জমা দিতে হবে। সকাল থেকেই শুরু করেছে কাজটা। বসও তাড়া দিচ্ছেন খুব। কিন্তু খুব একটা এগোতে পারছে না। চেয়ারে হেলান দিয়ে, শরীরটা পেছনের দিকে ঠেলে, অনেকটাই শুয়ে পড়ল ইমরান, যেন যে আত্মসমর্পণ করেছে, তারপর পিয়ন ডেকে চাইল এক কাপ কফি।

মোবাইলটা হাতে নিয়ে ফেসবুক ব্রাউজ করছিল ইমরান। বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে মেঘলা আকাশের প্রোফাইল পিকচার বদলে বদলে দেখছিল আর ভাবছিল মেঘলা আকাশ আসলে কে!

একটা ছবিতে গিয়ে আঠার মতো আটকে গেল ইমরানের আঙুল। চেয়ারের ওপর থেকে উঠিয়ে নিল পিঠের ভর। চট করে শরীরটা ওপরের দিকে উঠে এলো, পানির নিচ থেকে একটা বেলুন ভেসে ওঠার মতো। তারপর সোজা হয়ে বসে, টেবিলের ওপর ঝুঁকে, মোবাইলটা ফাইলের ওপরে রেখে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার চেষ্টা করল ছবিটা। কে এই নারী? তাকে কি সে চেনে? এই ছবি কি আসলেই মেঘলা আকাশের? নাকি অন্য কোনো নারীর? এরকম কোনো অভিনেত্রীকে কি সে কখনো কোনো সিনেমায় দেখেছে? অথবা কোনো হিন্দি সিরিয়ালে? এরকম একগাদা প্রশ্ন এসে তার মনের ভেতরে জলীয়বাষ্পের বুদ্বুদের মতো জমতে শুরু করেছে।

মধ্যবয়সী নারী। চল্লিশ ছুঁইছুঁই। ভারী বুক। চকলেট কালারের একটা জমকালো শাড়ি পরেছে। সঙ্গে ব্রোকেডের রঙিন ব্ল­াউজ। ইউকাট গলা। বেশ বড় ও গভীর। কেটে বসে গেছে ত্বকের ভেতরে। হাতাটা কনুই অবধি। শুধু রবীন্দ্রনাথের নাটকেই সে এমন নারীকে দেখেছে। ঠিক রক্তকরবীর নন্দিনীর মতো। বুকের নিচে ব্ল­াউজটা যেখানে শেষ হয়েছে, কোমরের কিঞ্চিৎ ওপরে, চমৎকার লম্বা ভাঁজ। সামান্য মেদও আছে শরীরে, ব্ল­াউজের প্রান্তরেখা সেই মেদ ভেদ করে টুপ করে ঢুকে গেছে ত্বকের আরো একটু গভীরে।

প্রোফাইল ও কভার হিসেবে আপলোড করা মেঘলা আকাশের আরো কয়েকটা ছবি দেখল ইমরান। তারপর একসময় ও নিশ্চিত হলো, এই অ্যাকাউন্ট একজন নারীরই। হয়তো তার নাম মেঘলা আকাশ নয়, কিন্তু এই অ্যাকাউন্টটা যে ভুয়া নয়, সেটা সে মোটামুটি নিশ্চিত হলো। ফটোতে ক্লিক করে করে ইমরান আরো যেসব ছবি দেখল, সেগুলোতেও ছিল এই একই চোখ একই মুখ – কখনো বান্ধবীদের সঙ্গে, লাইন ধরে দাঁড়িয়ে, মেঘলা আকাশ ছাড়া মোটামুটি সবাই হিজাব পরেছে। কোনো ছবিতে বিয়েবাড়ির অনুষ্ঠানে, ঝলমলে আলোর নিচে, নুয়ে পড়েছে গহনার ভারে, আবার কোথাও একজন পুরুষের পাশে, তার বাহু আঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে।

একটা ছবিতে দেখা গেল মেঘলা আকাশ সমুদ্রসৈকতে একটা রঙিন গোল ছাতার নিচে, ভেজা শরীরে, ওই একই পুরুষের পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে শুয়ে আছেন ডেক চেয়ারে।

ইমরান নিশ্চিত হলো ঠিকই কিন্তু আজই তার রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করল না। ও আরেকটু সময় নিতে চায়। এতে বোঝা যাবে, এই রিকোয়েস্ট কি সে এমনি এমনি পাঠিয়েছে, নাকি বন্ধুত্বের ব্যাপারে আসলেই সে সিরিয়াস। অনেকেই আছে, বন্ধুতালিকা লম্বা করার জন্য একের পর এক রিকোয়েস্ট পাঠায়, অ্যাকসেপ্ট করলে ফ্রেন্ড হিসেবে রেখে দেয়, কিন্তু তাদের মধ্যে কখনো কথাবার্তাও হয় না। ইমরান ভাবলো, মেয়েটি, মেয়ে না বলে নারী বলাই ভালো, একসময় হয়তো ধৈর্য হারিয়ে রিকোয়েস্ট প্রত্যাহারও করে নিতে পারে, আবার অধৈর্য হলে পারে ইনবক্সে মেসেজও পাঠাতে। ইমরান তখন নিজেকে নিজে বলল, দেখা যাক না আরো কয়েকটা দিন, মাছ তো সবেমাত্র বড়শিতে ঠোকর মারতে শুরু করেছে, আরেকটু মুখে নিলেই না হয় ওপরে টান দেওয়া যাবে।

ইমরান ভাবল, সত্যি সত্যি বন্ধুত্ব করার ইচ্ছায় রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে থাকলে মেঘলা আকাশ অপেক্ষা করবে আরো কিছুদিন, আর যদি না করে তাহলে বুঝবে এটা তার নিছকই একটা খেলা ছিল। সুতরাং, তাড়াহুড়ো করার কিছু নেই, যে চলে যাবার তার আগেভাগে চলে যাওয়াই ভালো।

ইমরান জানে, এরকম মেয়েদের বেলায়, যারা চেনে না জানে না এমন ছেলেদের হুটহাট করে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দেয়, তাদের কীভাবে ধরে রাখতে হয়। যদি সে এখনই অ্যাকসেপ্ট করে নেয় তাহলে ভাববে, ও খুব সস্তা ছেলে, মেয়েদের জন্য মুখ হাঁ করে বসে থাকে, তারপর রিকোয়েস্ট পেলেই গপ করে গিলে ফেলে। সে-কারণে প্রথম কয়েকদিন সন্তর্পণে বসে থাকতে হবে, চুপচাপ, ও জানে মেয়েটা অপেক্ষা করছে, টোপ গিলবে গিলবে করছে, এর মধ্যে হয়তো সে কয়েকবার ওর প্রোফাইলেও ঘুরে গেছে, তারপর ভেতরে সাড়া পাওয়ার আকাক্সক্ষা যখন আরো তীব্র হবে, তীব্র হতে হতে ওই অপেক্ষা যখন রাগে রূপান্তরিত হওয়ার মুখে গিয়ে পৌঁছাবে, ঠিক তার আগ মুহূর্তে রিকোয়েস্টটা অ্যাকসেপ্ট করে নিতে হবে।

আর বড়শি তখন গলায় আটকাবেই।
অফিস শেষে সোহানার সঙ্গে দেখা করতে গেল ইমরান। একটা কফিশপে বসল ওরা। ধানমন্ডি ব্রিজের কাছে। একটা উঁচু ভবনের ছাদের ওপরে এই শপটা নতুন খুলেছে। খুব সুন্দর জায়গাটা। নিরিবিলি। ছাদের ওপর প্রচুর গাছ। মনে হয় ঝুলন্ত উদ্যান। গাছের ফাঁক-ফোকরে, সন্ধের নরম আলো গায়ে মেখে, একেকটা টেবিলে জোড়ায় জোড়ায় বসে আছে কপোতকপোতী।
ইমরান-সোহানা এই শহরের এরকমই এক যুগল।

ওরা ছাদের একপাশের একটা টেবিলে বসেছে। তারপরেই পাঁচিল। ওপর থেকে ধানমন্ডি লেকটা দেখা যায়। মজা পানি। অতটা স্বচ্ছ নয়। কিন্তু তারপরও রাতের আলোকসজ্জায় মোড়ানো ঝলমলে সুউচ্চ বিপণিবিতানের প্রতিবিম্ব দেখা যায় লেকের পানিতে।

ইমরান আর সোহানা বসেছে মুখোমুখি। মাঝখানে দূরত্ব শুধু একটা গোল টেবিল। তাছাড়া মনে ও শরীরে তারা এক হয়েছে বছরতিনেক আগেই। ইমরান যখন থার্ড ইয়ারে পড়ে, তখন থেকেই তাদের প্রেমপর্ব শুরু। সোহানা এখন ফাইনাল ইয়ারে, পড়ে স্ট্যাটিসটিক্সে। ইমরান ও সোহানা দুজনেই ঠিক করে রেখেছে, সোহানার মাস্টার্স হয়ে গেলে ওরা বিয়ের আনুষ্ঠানিকতাটুকুও সেরে ফেলবে।
সোহানার হাতদুটো টেবিলের ওপর। ওর হাতের নিচে ভেলভেটের কাপড়ে ফুলতোলা সাদা টেবিলক্লথ। তার ওপর একটা স্বচ্ছ প্ল­াস্টিক বিছানো। তার মাঝখানে ক্রিস্টালের সরু ফুলদানি। তার ভেতর থেকে উঁকি মেরে আছে রজনীগন্ধার লম্বা একটা ডাঁটি।

প্রথমে গোলাপ কুঁড়ি, তারপর মেঘলা আকাশের কথা মনে পড়ে গেল ইমরানের – কী অদ্ভুত তার গায়ের রং। একটু আগেও লেকের পশ্চিম পাশে আকাশের গায়ে লেপ্টে থাকা গোধূলির মতো ওই রং। মনে পড়ল একটা ছবিতে তার হাসিভরা মুখ। নাকটা মোরগের ঠোঁটের মতো। গালের দুপাশে টোল পড়েছে। ডান গালের টোলটা যেখানে তার এক কোনায় একটা বাচ্চা তিল। মনে হয় বলপেন দিয়ে কোনো শিল্পী ওর গালে এঁকে দিয়েছে একটা কালো বিন্দু।

ইমরান হাত বাড়িয়ে সোহানার হাতদুটো ধরল। নিল মুঠোর ভেতরে। ওর হাতদুটো খুব নরম এবং মসৃণ। ফুলের পাপড়ির মতো। ধরলেই মাখনের মতো পিছলে যায় ইমরানের হাত। আর সোহানার হৃদয়টাও তখন প্রেমের উত্তাপে গলে গিয়ে চোখদুটো ছলছল করে ওঠে।

‘আমি তোমাকে ভালোবাসি ইমরান, অনেক ভালোবাসি’, সোহানার চোখের কোণে চিকচিক করছে জল। রেস্তোরাঁর নিভুনিভু আলোতেও সেটা স্পষ্ট।

‘হঠাৎ এমন করে কেন বলছ, সোহা?’ নরম হয়ে এলো ইমরানের গলাও।
চুপ করে রইল সোহানা। তারপর কিছু একটা বলতে চাইছিল কিন্তু ওর গলাটা তখন কান্নায় ধরে আসছিল। নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করে বলল, ‘বা রে – বলতেও পারব না বুঝি!’
‘অবশ্যই পারবে, কেন পারবে না সোহা! কিন্তু তুমি এমন করে বলো যে, আমার বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। সহ্য করতে পারি না। তুমি সবসময় এমন করেই আমাকে চমকে দাও, বেবি।’
তখনই কথাটা পারল সোহানা। বুঝল এখনই শ্রেষ্ঠ সময়। অনেকদিন ধরেই বলবে বলবে করে বলা হয়ে ওঠেনি। কীভাবে বলবে সেটাও সে ভেবে পাচ্ছিল না। সোহানা লক্ষ করেছে, ইমরান ইদানীং ফেসবুকে অনেক মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। ওদের ছবিতে লাইক দেয়, ‘খুব কিউট লাগছে’ টাইপের মন্তব্য করে, হা হা রিঅ্যাকশন, এমনকি লাভ ইমোজিও দেয়, কিন্তু এদের কাউকেই সোহানা চেনে না।

‘তোমার তো দেখি অনেক সুন্দরী সুন্দরী নারী ফ্রেন্ড জুটেছে ফেসবুকে।’
‘তাই? তুমি কি তাদের মধ্যে সেরা নাকি, সোহা?’
‘ফাজলামো করো না ইমরান। আই অ্যাম সিরিয়াস।’
‘ফাইজলামি কোথায় দেখলা তুমি? আমি যা করি সব তো প্রকাশ্যেই করি। সবই তো তুমি নিউজ ফিডে দেখতে পাও। গোপনে তো আর কিছু করি না।’
‘তারপরও ইমরান। আমার এসব দেখতে ভালো লাগে না।’
‘কেন, আমি কী করেছি?’
‘তুমি জানো না? মেয়েদের ছবিতে তুমি যেসব কমেন্ট করো, সেসব দেখতে কি আমার ভালো লাগে?’
‘যেমন?’
‘তুমি একটা মেয়েকে কী কমেন্ট করেছ – লিপস্টিকটা ব্ল­াউজের সঙ্গে ম্যাচ করে দিলে তাকে নাকি আরো সুন্দর লাগত।’
‘তো?’
‘তো আবার কী, এটা কেমন কথা! তোমার প্রেমিকা আছে, আর কদিন পর তুমি তাকে বিয়ে করবে, আর তুমি আরেক মেয়েকে কীভাবে এ-ধরনের কমেন্ট করো!’
‘অসুবিধা কী সোহা!’ ইমরানের গলায় ধৈর্য হারানোর সুর।
‘আমাকে যদি কোনো ছেলে এমন কমেন্ট করত, তাহলে তোমার কেমন লাগত?’ ইমরানের চোখের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল সোহানা।
‘কিছুই লাগত না।’
‘বুকে হাত দিয়ে বলো, ইমরান।’

সেদিন সন্ধ্যায় ইমরান বুকে হাত রেখে ওরকম কিছু বলেনি। কিন্তু মুখে কপট হাসি ঝুলিয়ে বলেছিল, ‘আমি কিছুই মনে করতাম না সোহানা, ফেসবুক ইজ ফেসবুক, নাথিং সিরিয়াস, ডোন্ট বি সিলি!’
তারপর এ নিয়ে ওদের মধ্যে আর খুব বেশি কথাবার্তা হয়নি। যেটুকুও হয়েছে, তাতে খুব একটা উষ্ণতা ছিল না, যেমন ইমরান বলেছে, ‘তুমি ফোন দিও আমাকে,’ উত্তরে সোহানা বলেছে, ‘রাতে ঠিকমতো ঘুমিও।’ তারপর ওরা বিল দিয়ে রেস্তোরাঁ থেকে নেমে ফুটপাতে পাশাপাশি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল রিকশার জন্য। একসময় একটা রিকশা এসে ইমরানকে নিয়েও গেল। কিন্তু অন্যান্য দিন সোহানাকে আগে রিকশায় তুলে দিয়ে, হুড উঠিয়ে, সোহানাকে শক্ত করে ধরে বসতে বলে, রিকশাওয়ালাকে ভাড়া বুঝিয়ে দিয়ে, রিকশাটা যতক্ষণ না যানজটের ভেতরে হারিয়ে যায়, ততক্ষণ ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকত ইমরান। আর সোহানাও, পেছনদিকে ঘুরে, রিকশার পেছনে মাঝখানের চারকোনা কাটা জায়গায় ঝুলন্ত পর্দাটা বাঁ হাত দিয়ে সরিয়ে তাকিয়ে থাকত, যতক্ষণ না ইমরান অদৃশ্য হয়, ঠিক ততক্ষণ।

কিন্তু আজ সেরকম কিছু হলো না।
রাতের বেলা ইমরান যখন ঘুমাতে যাবে, ঠিক তখনই তার ইনবক্সে মেসেজ এলো সোহানার।
‘আই অ্যাম সরি।’
‘ইটস ওকে, মাই বেবি।’
‘আমি কি বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি?’
‘না, না সোহা। ঠিক আছে। তুমি এরকম করবে না তো কে করবে!’
‘আমি পরে ভেবে দেখলাম তোমাকে এত নিয়ন্ত্রণ করা ঠিক নয় আসলে।’
‘কী যে বলো! তুমিই তো আমার সব। কন্ট্রোল বলো, আর স্বাধীনতা বলো, যা দেওয়ার তুমিই তো আমাকে দেবে, তুমি ছাড়া আর কে আছে আমার?’
‘আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি ইমরান, আমার খুব ভয় হয়, যদি তোমাকে হারাই।’

‘কেন হারাবে সোহা? আমি কি তোমার মোবাইল ফোন নাকি পার্স যে হারাবে?’ পরিবেশটা হালকা করতে চাইল ইমরান। সোহানা যে ওর সঙ্গে ডেট করতে গিয়ে একবার একটা ফোন এবং আরেকবার একটা হাতব্যাগ হারিয়েছে, সেটাই মনে করিয়ে দিলো সে। কিন্তু এমন একটা সময়ে, যখন সোহানা সিরিয়াস কথা তুলেছে, আবেগেও আপ্লুুত হয়ে পড়েছে কিছুটা, তখন ইমরানের কি এমন রসিকতা করার দরকার ছিল! ইমরান সেটা বোঝে না, ও এরকমই, সোহানাও সেটা জানে, তাই সে কিছু বলেও না।

সোহানা ‘গুড নাইট’ বলে বিদায় নিল একসময়। সাইন অফ করার আগে ইমরান তাকে একটা গিফ ভিডিও পাঠাল। একটা টেডি বেয়ার আরেকটা ভল্লুক ছানাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাচ্ছে। ভালোবাসার লাভ সাইন তখন একটা-দুটো-তিনটা-চারটা করে বাড়তে বাড়তে সোহানার ইনবক্স ভরে লাল হয়ে গেল।তিনদিন পর মেঘলা আকাশের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করল ইমরান। আর পঞ্চম দিন ওর ইনবক্সে মেসেজ এলো – ‘হাই।’

‘হ্যালো,’ জবাব দিলো ইমরান। তারপর জানতে চাইল, ‘আপনাকে কি আমি চিনি?’ কোনো উত্তর এলো না। আরো কিছুক্ষণ ইনবক্সের দিকে তাকিয়ে রইল ইমরান। মেঘলা আকাশ ততক্ষণে অফলাইন হয়ে গেছে।

সেদিন রাতে, অফিস থেকে ফিরে, খাওয়া-দাওয়া শেষে, সোহানার সঙ্গে ‘আই লাভ ইউ, মিস ইউ সো মাচ’ বলে, বিছানায় গড়াগড়ি করতে করতে মেঘলা আকাশকে আবার মেসেজ করল ইমরান। সেই একই প্রশ্ন।

‘ডু আই নো ইউ?’ সেন্ড করার পর দেখল সকালে করা প্রশ্নটাও রয়ে গেছে।
আগেরবারের মতোই উত্তর এলো না। কিন্তু এলো পালটা প্রশ্ন। খুব দ্রুত। মনে হয় সারাদিন ধরে এ-জবাবটাই তৈরি করে রেখেছে।
‘আপনার কী মনে হয়?’
‘হেঁয়ালি রাখুন তো’, ইমরান বলল।
‘আচ্ছা ঠিক আছে। কতটুকু জানলে কাউকে চেনা বলা যায় আর কী কী না জানলে মানুষ অচেনা থাকে? চেনা মানুষ কি কখনো বন্ধু হয়? অচেনা মানুষই তো বন্ধু হয়। তারপর তাকে চেনা যায়। নাকি?’
‘আবারো হেঁয়ালি?’
এবার মেঘলা আকাশ লিখল – ‘হা হা হা।’
‘ঘুমাননি এখনো?’
‘ঘুমিয়েছি বাবা। আমি তো আপনার সঙ্গে ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই চ্যাট করছি’, ইমরানকে সে বোকা বানাতে চাইল।
‘ওহ সরি, আমি সেটা বোঝাতে চাইনি। বলছিলাম এখন তো বারোটার বেশি বাজে। কিন্তু আপনাকে এখনো অনলাইন দেখে জিজ্ঞেস করলাম।’
‘ঘড়ির বারোটা দেখলেন, পুরুষের বারোটা দেখেছেন কখনো? এখন আপনার বারোটা বাজাবো।’ তারপর আবার সেই হা হা হা হাসি।
ইমরান কী করবে, কী লিখবে বুঝতে পারছিল না। তাই সেও লিখলো ‘হা হা হা।’
‘না, আসলে কী জানেন, আমার হাজব্যান্ড এখনো বাড়িতে ফেরেনি। রোগী দেখা শেষ করে চেম্বার থেকে ফিরতে ফিরতে ওর অনেক রাত হয়ে যায়। আমি এখন ওর জন্য অপেক্ষা করছি। ওকে বেড়ে খাওয়াতে আমার খুব ভালো লাগে। ও সেটা খুব এনজয় করে।’
‘কখন ফেরেন?’

উত্তর না দিয়ে মেঘলা আকাশ বলতে লাগল, ‘ঘুমিয়ে গেলে ও খুব কষ্ট পাবে। তাই জেগে আছি। একবার এরকম হয়েছিল। এসে দেখল আমি ঘুমিয়ে পড়েছি। সকালে উঠে দেখি রাতের টেবিল যেমন ছিল তেমনই। ও তখন না খেয়েই ঘুমিয়ে গিয়েছিল। এরপর থেকে আমি আর কখনো এমন করিনি।’
একনাগাড়ে বলে গেল মেঘলা আকাশ। কিন্তু এসব কথা ওকে কেন বলছে বুঝতে পারল না ইমরান। শুধু তার কথায় ‘হ্যাঁ’ ‘হু’ করে ‘গুড নাইট’ বলে একসময় ফোনটা বালিশের নিচে রেখে ঘুমিয়েও পড়েছিল। সকালে উঠে দেখল মেঘলা আকাশের একটা মেসেজ।
‘কাল ওর কথা বলেছি বলে কি তুমি মাইন্ড করেছিলে?’

ইমরান ভাবল, কী অদ্ভুত কথা, মাইন্ড করবে কেন! অপরিচিত একজন পুরুষকে মেয়েটি যখন এরকম ব্যক্তিগত কথা এমন নিঃসঙ্কোচে বলে গেল, তখন ও বরং একটু অবাকই হয়েছিল। ইমরানের মনে হলো, মেয়েটি হয় একেবারে সাদাসিধে, সহজ সরল বোকা, অথবা প্রগলভ, কিংবা খুবই চতুর, ওকে হয়তো বাজিয়ে দেখছে।

ইমরান কিছুতেই ভেবে পাচ্ছে না কে এই মহিলা। এখন তো তাকে তুমি করেও বলতে শুরু করেছে, কিন্তু এ নিয়ে তাকে কিছু জিজ্ঞেসও করেনি, অনুমতিও নেয়নি। তাহলে কি সে তাকে চেনে? তাদের কখনো কোথাও পরিচয় হয়েছিল? ও ভুলে গেছে? নাকি সোহানার পরিচিত কেউ?

ইমরানের একবার মনে হয়েছিল মেঘলা আকাশ একজন বিমানবালা। কোনো একসময় সেটা তাকে সে বলেও ছিল। কিন্তু ইমরানের এই ধারণাটা সে ভেঙে দেয়নি, ইচ্ছে করেই ভাঙেনি, বরং ভেবেছে, সে যদি তাকে সেরকম কিছু মনে করে থাকে অসুবিধা কী, ভাবুক না। সেদিন নিজেকে বিমানবালা ভেবে অচেনা এক শিহরণে কেঁপেও উঠেছিল মেঘলা আকাশের শরীর।
ইমরানেরও।

তারপর যা হওয়ার তাই। ফেসবুকে অপরিচিত নর-নারী রাতের পর রাত কথা বললে যা হয় ওদের বেলাতেও তাই হয়েছে। এরপরের চিত্রনাট্য রচনা করেছে স্বয়ং ফেসবুকই। পরিচয়ের পর ওদের কথাবার্তা ইনবক্সের চ্যাট থেকে গড়িয়েছে ফোনালাপে। ততদিনে ইমরান জেনে গেছে মেঘলা আকাশের আসল নাম নুসরাত শারমিন। ডাকনাম খেয়া। ওর এক সাবেক কলিগের বড় বোন। একবার অফিসে এসেছিল কী একটা জরুরি কাজে। সম্ভবত ভাইকে কোনো একটা মৃত্যুর খবর দিতে। তখনই সামান্য পরিচয় হয়েছিল। দেখা হয়েছিল ক্যান্টিনে। দুঃসংবাদ দিতে এসেছিল বলেই বেশিক্ষণ থাকা হয়নি। ভাইকে নিয়ে অফিস থেকে বের হয়ে গিয়েছিল দ্রুত। সে-কারণে নামও জানা হয়নি কারো। এখন শুধু নাম না, পরিচয় না, ওরা এখন জানে ওদের অনেক গোপন কথাও।
কথার পর্ব শেষ। এখন দেখা করার পালা।

খেয়া খুব সুন্দর করে সেজে এসেছে। ইমরান ছবিতে ওকে যেরকম দেখেছে বাস্তবে তারচেয়েও অনেক বেশি সুন্দর খেয়া। চোখজোড়া চমৎকার। একেই বুঝি বলে পটোলচেরা চোখ। বুকের মতো নিচের দিকটাও ভারী। এমন কায়দা করে শাড়ি পরেছে খেয়া যে, ওর মসৃণ তলপেট দেখা যায় – আবার দেখাও যায় না – এরকম। শুধু হিন্দি সিরিয়ালের নায়িকাদেরকেই ও এমন করে শাড়ি পরতে দেখেছে।
দুটো কফি অর্ডার করল ইমরান। সঙ্গে হালকা এগ স্যান্ডউইচ।

‘কী ব্যাপার, এমন এক ডাকেই চলে এলে যে, তোমার ভয় করল না?’ ইমরান জানতে চাইল।
‘বা রে, ছোটভাইয়ের কলিগের সঙ্গে দেখা করতে ভয় কিসের! আর আমার হাজব্যান্ডকে বলেছি। ও জানে আমি এখানে আসব। এখন তুমি যদি আমাকে নিয়ে পালিয়ে যেতে চাও ও তোমাকে পাকড়াও করবে।’

হা হা হা করে হেসে উঠল খেয়া। আশেপাশের লোকজন ওদের দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকাল।
‘তোমার হাজব্যান্ড বুঝি তোমাকে সবসময় পাহারা দেয়?’
‘ভয় পাচ্ছো বুঝি?’ হাসতে হাসতে মজা করলো খেয়া।
‘খুব ভালোবাসে তোমাকে?’ ইমরান জানতে চায়। নুসরাত শারমিনের সঙ্গে ওর স্বামীর ভালোবাসা আসলেই কতখানি গভীর জানার পরই অগ্রসর হবে সে, যদি হয়, আর যতটুকু হওয়া যায় ততটুকুই হবে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এসব জানা তার জন্য খুবই জরুরি।
‘ওরে বোকা ছেলে, এটা আবার কেমন কথা, হাজব্যান্ড আমাকে ভালোবাসবে না তো কি অন্য কোনো মেয়েকে বাসবে?’
‘আর তুমি?’
‘আমিও। কোনো মেয়ে যদি ওকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে চেষ্টা করে আমি ঘুষি মেরে ওর নাক ফাটিয়ে দেবো।’
আবারো হা-হা করে হেসে উঠল খেয়া। এবার আর তেমন করে কেউ তাকাল না। ওরা হয়তো বুঝে গেছে এই দুজন যতক্ষণ এখানে থাকবে, ততক্ষণই হয়তো এই হাসির শব্দ শোনা যাবে।
ইমরান মনে মনে ভাবছিল, হাজব্যান্ডের প্রতি তোমার ভালোবাসা যদি এতই তীব্র হবে, একবার শুধু ক্যান্টিনে, তাও মৃত্যুসংবাদ বহন করে তুমি যখন শোকে কাতর, তখন ক্ষণিক দেখা হওয়ার পরেই ছোটভাইয়ের বন্ধুকে ফেসবুকে ঠিকই খুঁজে বের করে তাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দিলে খেয়া! তাও অন্য একটা নামের আড়ালে নিজেকে গোপন করে! তারপর এমন এক বসন্ত-সন্ধ্যায়, স্বামী যখন চেম্বারে রোগীকে প্রেসক্রিপশন লিখে দিতে ব্যস্ত, তখন তুমি সেজেগুজে আমার সঙ্গে দেখা করতে ছুটে এলে!

খেয়ার কথার জবাবে কিছু বলল না ইমরান। বরং তাকে ভালো করে পরখ করে নিল। ও চায় খেয়াই কথা বলুক। এতে তার বুঝতে সুবিধা হবে যে, স্বামীর সঙ্গে তার সম্পর্কটা আসলেই কত গভীর, তার টোপ সে কতখানি গিলেছে এবং বড়শিটা ঠিক কখন টানতে হবে।
‘ইমরান, তুমি বেশ হ্যান্ডসাম। কতজনের সঙ্গে প্রেম করো বলো দেখি?’
‘আমাকে কেউ কখনো নিবেদনও করেনি খেয়া’, পাকা শিকারির চোখে খেয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল ইমরান।
‘কী বলো, তাহলে আর এত হ্যান্ডসাম হয়ে লাভ হলো কী?’
‘কেন, এই যে তুমি দেখা করতে এলে!’ এবার ইমরান হাসল। নিঃশব্দে। কিন্তু হা-হা করে আবারো হেসে উঠল খেয়া।
‘আমার হাজব্যান্ড কিন্তু তোমার চেয়েও হ্যান্ডসাম। ফেসবুকে দেখনি? আমার বান্ধবীরা সবাই ওর পেছনে ছোক ছোক করে।’
‘আগলে রাখো কীভাবে?’
‘আরে না না, ও এরকম পুরুষ না। দুটো জিনিসই বোঝে – চেম্বার আর বাসা। আর কোত্থাও যায় না। রোগী আর আমি – আর কারো দিকে তাকায়ও না।’
‘বাহ্, তোমার তো দেখি কপাল, আদর্শ স্বামী পেয়েছ একখান!’
‘তা ঠিক। আমাকে সে কোনো কাজ করতে দেয় না। বাড়িতে কাজের লোক রেখেছে তিনটা। ঘর থেকেও বের হতে দেয় না। ও ভয় পায়, আমি যদি রিকশা থেকে পড়ে যাই। ড্রাইভার ছাড়া কোত্থাও যেতে দেয় না, যদি হারিয়ে যাই।’
‘হারিয়ে যাও, নাকি কেউ তোমাকে চুরি করে নিয়ে যায় – কোনটা?’
‘একই তো কথা, কেউ যদি চুরি না করে এই বয়সে, কেউ কি হারাবে বোকা!’
‘কিন্তু তুমি তো বললে যে, তোমার হাজব্যান্ড জানেন তুমি আমার সঙ্গে এখানে দেখা করতে এসেছ!’
‘তুমি আসলেই একটা বোকার হদ্দ, ইমরান। এটা হয় নাকি! শুনেছ কখনো! আমার হাজব্যান্ড যদি দেখে আমি আরেকজন পুরুষের সঙ্গে একা একটা রেস্তোরাঁয় বসে কথা বলছি ও তোমাকে খুন করে ফেলবে। হি লাভস মি সো মাচ। অ্যান্ড হি ইজ ব্লাইন্ড অ্যাবাউট মি। ইউ জাস্ট ডোন্ট নো।’
এটুকু বলে তাড়াহুড়ো করে উঠে গেল খেয়া। স্যান্ডউইচ খাওয়া তো দূরের কথা, র‌্যাপিংটা খোলা হয়নি। খেয়া বলল, ওর হাজব্যান্ড নাকি যে-কোনো সময় বাড়ি চলে আসতে পারে। ফিরে যদি দেখে ও বাড়িতে নেই তাহলে তার সব বান্ধবীকে ফোন দিয়ে তুলকালাম কা- ঘটাবে।

ইমরান তখন একটা উবার ডেকে খেয়াকে উঠিয়ে দিলো গাড়িতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওকে নিয়ে রাতের অন্ধকারে মিরপুর রোডের শত শত গাড়ির ভেতরে হারিয়ে গেল গাড়িটা। কিন্তু ইমরান তখনো খেয়ার সঙ্গে তার স্বামীর ভালোবাসার অঙ্ক খুব বেশি দূর মেলাতে পারল না।এক সপ্তাহ পর স্বামী মাহফুজের সঙ্গে কয়েকটা ছবি পোস্ট করেছে খেয়া। লিখেছে, ‘হ্যাপি বার্থডে টু মাই হাবি।’ একটা ছবিতে বেতের চেয়ারে আসীন মাহফুজ সাহেবের পেছনে খেয়া দাঁড়ানো। আরেকটা ছবিতে টাই-স্যুট পরিহিত মাহফুজ সাহেব খুব বড় একটা হাঁ করে মুখটা ওপরের দিকে তুলে আছেন, আর খেয়া যতটা সম্ভব সামনের দিকে ঝুঁকে স্বামীর মুখের ভেতরে এক টুকরো কেক ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
দুপুরের আগে, ইমরান তখন অফিসে, খেয়া মেসেজ পাঠাল – ‘এমন কেউ আছে তোমার জীবনে যার জন্মদিন তুমি মনে রাখো?’
‘না, নেই।’
‘এখন থেকে আমারটা মনে রাখবা। বুঝলা?’
‘মাহফুজ সাহেব তোমার জন্মদিন মনে রাখেন খেয়া?’
‘কী বলো তুমি! শুধু জন্মদিন নয়, জন্মদিনের এক সপ্তাহ আগে থেকেই ও আমাকে নানাভাবে সারপ্রাইজ দেওয়ার চেষ্টা করে। কত কী গিফট দেয়। মাহফুজ আসলেই একটা ছেলেমানুষ। হি লাভস মি লাইক আ বেবি।’
‘তুমিও সারপ্রাইজ দাও?’
‘কেন ইমরান, আজকে আমার পোস্ট দেখনি তুমি? কত মানুষ লাইক দিলো, তুমি তো একটা উইশ করলেও পারতে। কি, হিংসা করো বুঝি?’
‘তা বলতে পারো কিছুটা’, ইমরান উত্তর দিলো।

এটুকু লিখেই সোহানার কথা মনে পড়ে গেল ইমরানের। খেয়া ওর স্বামীকে কেমন ‘বেবি বেবি’ বলে ডাকছে। সোহানাকেও তো ‘বেবি’ ডাকে ইমরান। আজ তিনদিন হলো ওর বেবির সঙ্গে দেখা হয় না। কারণ ফাইনাল পরীক্ষা এসে গেছে সোহানার। প্রিপারেশন নিয়ে খুব ব্যস্ত সে। ফোনেও খুব একটা কথা হয় না। এখন ফেসবুকও ডিঅ্যাকটিভ করে রেখেছে সোহানা। তারা দুজনে শলাপরামর্শ করেই এটা করেছে।

সোহানা যখন তার স্টাডি নিয়ে ব্যস্ত তখনই ইমরানকে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার প্রস্তাব দিলো খেয়া। এর পরের সপ্তাহে, বুধবার সকালে, ওরা ময়মনসিংহ রওনা দিলো কমলাপুর স্টেশন থেকে। খেয়া একটা সুতির শাড়ি পরে এসেছে। কালো চুল খোলা। মেলে দিয়েছে পিঠের ওপরে। দেখলে মনে হয় প্ল­্যাটফর্মে নেমে এসেছে একখ- কালো মেঘ। খেয়া যখন তার ওই লম্বা ঘন কেশ মাথা নেড়ে কাঁধের এক পাশ থেকে আরেক পাশে নিয়ে যায়, এক ঝটকায়, তখন ইমরানের বুকের ভেতরে কেমন গুড়গুড় করে ওঠে।

ইমরান অফিস থেকে একদিনের ছুটি নিয়েছে। বসকে বলেছে, জরুরি একটা ব্যক্তিগত কাজে সে যাবে গ্রামের বাড়িতে। সোহানাকে বলেছে, সারাদিন ও ব্যস্ত থাকবে অফিসের জরুরি মিটিং নিয়ে। আর খেয়ার কাউকে কিছু বলতে হয়নি। কারণ মাহফুজ সাহেব দুদিনের একটা আই ক্যাম্পে গেছেন সিলেটে। শুধু কাজের বুয়াদের কাছে বাচ্চাকে বুঝিয়ে দিয়ে ও বলেছে, ‘স্যার ফোন করলে কইবি আমি এইমাত্র দোকানে গেছি। আইসা পরমু এখনই।’

জানালার পাশে ইমরান আর খেয়াকে মুখোমুখি নিয়ে ট্রেন ছাড়ল সকাল নটায়। ময়মনসিংহ গিয়ে যখন পৌঁছল তখনো দুপুর হয়নি। ছোট্ট একটা পালতোলা নৌকা নিয়ে ওরা ব্রহ্মপুত্র নদের পানিতে কিছুক্ষণ ভেসে বেড়াল। তারপর মাঝিকে বলল মাঝখানের চরে নৌকা ভেড়াতে। ঘন কাশবনে ছেয়ে গেছে গোটা চর। ওই বনের ভেতরে নতুন বালুর ওপর খালি পায়ে ছোটাছুটি করল খেয়া। ওর মতো মধ্যবয়সী এক নারী প্রকৃতির কোলে এসে শিশুর মতো এরকম চঞ্চল হয়ে উঠবে সেটা কল্পনাও করেনি ইমরান। ওকে মনে হচ্ছিল একটা প্রজাপতি।

একসময় ওরা কাশবনের একটা ঝোপের ভেতরে বসে পড়ল। খেয়া বসেছে পা দুটো ছড়িয়ে। আঙুল দিয়ে বালুতে কিছু একটা আঁকছিল। খেয়ার ডাক শুনে ওর দিকে মুখ তুলে তাকাল।
‘তুমি কখনো কাউকে ভালোবাসোনি ইমরান?’
‘এই প্রশ্নের উত্তর কি তোমার খুব জরুরি? কতবার করলে এ-প্রশ্নটা।’
‘তাহলে উত্তর দাও না কেন, নাকি লুকাও?’
‘আচ্ছা, এখন বলো তো দেখি খেয়া, তোমার এ-প্রশ্নের উত্তরে যদি আমি হ্যাঁ বলি তাহলে কী হবে, আর উত্তর যদি না হয় তখন?’
‘আমি চাই উত্তরটা না হোক। কারণ বেশি ভালোবাসা ভালো নয়।’
‘কেন? ভালো নয় কেন?’
‘ভালোবাসা হলো একটা জেলখানার মতো। ওই কারাগার অদৃশ্য। এর ভেতরে সে এমনভাবে বন্দি হয়ে যায়, সেটা সে বুঝতে পারে না। আর যখন বুঝতে পারে ততক্ষণে তার হাত-পা-মাথা সবকিছু একটা জালের মধ্যে এমনভাবে পেঁচিয়ে যায় যে, ওসব ছিঁড়ে আর বের হতে পারে না।’

‘তারপরও তো মানুষ কারাবন্দি হতে চায়। যেমন চাইছি আমি। আমাকে গ্রেফতার করো খেয়া, যাবজ্জীবন দিয়ে দাও। আমার আপত্তি নেই’, হাসতে হাসতে বলল ইমরান, পরিবেশটাকে ও একটু হালকা করতে চেষ্টা করল। ‘আমি ফান করছি না ইমরান। যেমন ধরো আমার কথা। মাহফুজ আমাকে
খু-উ-ব ভালোবাসে। কিন্তু ওর ভালোবাসায় আমার দম বন্ধ হয়ে গেছে। আমি মরে যাচ্ছি।’
খেয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। ইমরানও কিছু বলল না। অপেক্ষা করতে লাগল খেয়া যদি আরো কিছু বলে তার জন্য। ওর কণ্ঠেই বোঝা যাচ্ছিল যে, কথা এখনো শেষ হয়নি, সবে শুরু হয়েছে।
‘মাহফুজ আমাকে কোথাও যেতে দেয় না। আমার বাপের বাড়িতেও না। বিয়ের পর আমি বাচ্চাকে নিয়ে একটা রাতও মায়ের সঙ্গে কাটিয়েছি কিনা বলতে পারব না। কিন্তু সবসময় আমাকে ওর বাপের বাড়িতে গিয়ে থাকতে হয়। আমারও তো ইচ্ছে হয় যে বাচ্চাদের নিয়ে আমার স্বামী আমাদের বাড়িতে দু-একটা রাত থাকুক। ইচ্ছে করে কিনা বলো?’
ইমরান এবারো চুপ করে রইল।
‘একা একা যে কোনোদিন কোথাও যাব সেটাও পারি না। আমাকে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে দেয় না। চাকরি করতেও দিলো না। ঘর থেকে বের হলেই সন্দেহ করে। বিশ্বাস করবে কিনা জানি না বাচ্চাকে নিয়ে সে আমাকে কোথাও যেতে দেয় না। মাহফুজ মনে করে আমি সামলাতে পারব না। আমাকে ভয় দেখায়, বলে, যেতে পারো, কিন্তু যদি আমার বাচ্চার কিছু হয় তাহলে আমি তোমাকে ছাড়ব না। এরপর কি আর বাইরে যাওয়া যায় বলো? ও কি আমার সন্তান না ইমরান?’

কিছু একটা বলতে যাওয়ার আগেই ইমরান একটা কান্নার শব্দ শুনতে পেল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে সেই কান্না। খেয়ার হাঁটুদুটো তখন ভাঁজ করে ওর বুকের কাছে গোটানো। মুখ গুঁজে দিয়েছে তার মাঝখানে। ওর ভারী পিঠ উঠছে-নামছে। ইমরান যখন হাত দিয়ে খেয়ার মুখ ধরতে যাবে, দেখল, কয়েক ফোঁটা অশ্রু বৃষ্টির বিন্দুর মতো টুপ করে ঝরে পড়ল। মুহূর্তেই সেই নোনা জল হারিয়ে গেল চরের বালুতে।
ইমরান খেয়ার কাঁধ ধরে ওকে সামলাতে চেষ্টা করল। কিন্তু একবিন্দুও নড়ল না খেয়া। ইমরান তখন উঠে গিয়ে হাঁটু মুড়ে বসল খেয়ার মুখোমুখি। হাত রাখল ওর হাঁটুর ওপর। দুহাত দিয়ে খেয়ার মুখটা ধরে ওপরের দিকে তুলে দেখল গালদুটো ভিজে গেছে।

ইমরান হঠাৎই খেয়ার দুই চোখে দুটো চুমু দিলো। কেঁপে উঠল খেয়া। ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো ওকে। আরেকটু হলেই ইমরান উলটো হয়ে পড়ে যেত বালুর ওপর। কোনো রকমে সে সামলে নিল নিজেকে।
খুব দ্রুত উঠে দাঁড়াল খেয়া। পায়ের দিকে শাড়িটা গুছাল। বালু ঝেড়ে স্যান্ডেল গলালো দুই পায়ে। তারপর হনহন করে হেঁটে এগিয়ে গেল নৌকা নিয়ে মাঝি যেখানে অপেক্ষা করছিল সেদিকে। একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল ইমরান। বুঝতে পারছিল না তার এরকমটা করা ঠিক হলো কিনা। খেয়া কি তাহলে এরকম কিছু চায়নি? যদি না-ই চাইবে তাহলে তার সঙ্গে এত দূরে কেন এসেছে? তাও নির্জন বালুচরের কাশবনের ভেতরে? ওকেই বা কেন বলতে গেছে সংসারের দ্ঃুখ-কষ্টের কথা? ওই মুহূর্তে ইমরান এরকম করা ছাড়া আর কিইবা করতে পারত। ও কি তাহলে খুব বড় একটা ভুল করে ফেলেছে? টোপ গেলার আগেই টান দিয়ে ফেলেছে বড়শিতে?

ইমরান পেছনে পেছনে খেয়াকে অনুসরণ করল। দুজনেই উঠে বসল নৌকায়। ওদের পরিকল্পনা ছিল ওরা জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালায় যাবে, তারপর শহরের একটা রেস্তোরাঁয় দুপুরের ভাত খেয়ে যাবে রাজবাড়ীতেও। কিন্তু ওদের আর কোথাও যাওয়া হলো না। বরং ওরা রেলস্টেশনে গিয়ে বসে রইল কমলাপুরগামী ট্রেনের জন্য।

পুরোটা পথে ওরা কেউ কোনো কথা বলল না। ঢাকায় পৌঁছে একটা ইয়েলো ক্যাব নিয়ে খেয়াকে বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে ইমরান যখন বাসায় ফিরে এলো তখন সন্ধ্যাও নামেনি। রাতের দিকে ইমরান মেসেজ পাঠাল খেয়াকে।
‘আমি কি ভুল করেছি খেয়া?’
ওপাশে মেসেজটা সিন হলো। কিন্তু কোনো উত্তর এলো না।
‘কিছু একটা তো বলবে।’
এটাও সিন হলো।
‘আই অ্যাম সরি খেয়া, ইফ ইট হ্যাজ ব্রোকেন দ্য লিমিট। বাট আই শুড নো।’
পরপর পাঠানো তৃতীয় এই মেসেজটাও দেখল খেয়া। উত্তর দিলো না। ইমরান ওই রাতে ঘুমাতে পারল না।

সকালে উঠে নুসরাত শারমিন নামে কোনো অ্যাকাউন্ট খুঁজে পেল না ইমরান। মেঘলা আকাশ নাম দিয়েও খুঁজল। দেখল এই নামে আরো কয়েকটা অ্যাকাউন্ট আছে কিন্তু সেগুলোর একটাও খেয়ার নয়। ইমরান তখন ইনবক্সে মেসেজ পাঠাতে গেল। কিন্তু দেখল মেসেজ পাঠানো যাচ্ছে না। হয়তো ওপাশ থেকে তাকে ব্ল­ক করে দেওয়া হয়েছে কিংবা অ্যাকাউন্টটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। খেয়ার অ্যাকাউন্ট এখন আর অ্যাকটিভও দেখাচ্ছে না। কল করল তিনবার; কিন্তু তিনবারই ফোনটা বন্ধ পাওয়া গেল।
কী করবে বুঝতে পারল না ইমরান। বাড়িতে গিয়ে কি একবার খোঁজ নেবে? কিন্তু খেয়ার কাছে মাহফুজ সাহেবের কথা যা শুনেছে তাতে সে ভরসা পেল না। কিন্তু ইমরান কিছুতেই মেনে নিতে পারল না যে, খেয়ার সঙ্গে সে কোনো অন্যায় আচরণ করেছে। বরং অন্যায় যা করেছে সেটা সে করেছে সোহানার সঙ্গে।

সবকিছু ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করল ইমরান। ভাবল, যা হওয়ার হয়েছে, ওর ভালোর জন্যেই হয়তো হয়েছে। ইমরান নিজেকে নিজে বলল, ‘আমি তো কাউকে রিকোয়েস্ট পাঠাইনি। টোপ খেয়াই ফেলেছে, আমি ফেলিনি। কেউ ধোয়া তুলসীপাতা নয়। আমিও না, খেয়াও না।’
দেড় মাস পর, ইমরান অফিস থেকে ফিরছিল, রিকশায়, তখনই একটা ফোন এলো। অপরিচিত একটা নম্বর থেকে। ওপাশে খেয়ার কণ্ঠ।
‘তোমার একটু সময় হবে ইমরান?’
নিজের বিস্ময় চাপা দিয়ে রাখতে চেষ্টা করে ইমরান বলল, ‘তোমার খবর কী? এতদিন কোথায় ছিলে?’
‘কিছু ঝামেলা ছিল ইমরান।’
‘কী ঝামেলা?’
‘সেটা না হয় দেখা হলেই বলব।’
‘কিন্তু তোমার অ্যাকাউন্টের কী হয়েছে?’
‘ওটা ডিঅ্যাক্টিভ করে রেখেছি।’
‘কেন?’
‘মাহফুজ চায় না। ও মনে করে, আমি ওকে আগের মতো সময় দিই না। তাই আমরা দুজনেই আমাদের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে শুধু দুজনে দুজনকে সময় দিচ্ছি।’
‘তাহলে ফোন করলে কেন?’
‘না, ভাবলাম তুমি হয়তো আমার ওপর অভিমান করে আছ?’
‘আমি কেন অভিমান করব? আমার মনে হয়েছিল, সেদিন তুমি হয়তো আমার ওপর রাগ করেছ। হয়তো আমার ওরকম করা ঠিক হয়নি।’
‘তা ঠিক, রাগ আমি করেছিলাম। সেদিন ওরকম কিছু আশা করিনি। কারো সঙ্গে কোথাও যাওয়ার মানে এটা নয় যে, আমি সবকিছুতে অনুমোদন দিয়েছি। আমি তো মাহফুজকে ঠকাতে পারি না।’
‘তাহলে তুমি আমার সঙ্গে কেন গিয়েছিলে?’
‘যাওয়া কি অপরাধ ছিল ইমরান?’
‘তোমার অপরাধ ছিল না খেয়া, অপরাধ ছিল না আমারও। যা কিছু হচ্ছিল, শুরু থেকে, আমার ধারণা হয়েছিল যে সম্পর্কটা বুঝি ওরকমই। তুমি যে এভাবে রিঅ্যাক্ট করবে সেটা বুঝতে পারিনি। এজন্য আমি তোমাকে পরে সরিও বলেছি।’

এরপর কিছু কথাকাটাকাটি হলো তাদের। ধীরে ধীরে গলার স্বর উঁচুতে উঠল এবং একসময় খেয়া হুট করে ফোন লাইনটা কেটেও দিলো। ইমরান আর পালটা ফোন করেনি। দুদিন পর মেসেজ পাঠাল খেয়া। সেদিনের ঝগড়া ও ফোন কেটে দেওয়ার জন্য ক্ষমা চাইল প্রথমে। পরে বলল সে একটু দেখা করতে চায় কোথাও। নিরিবিলি। ইমরানও রাজি হয়ে গেল কোনো প্রশ্ন না করেই। ও চেয়েছে সে আসুক। তাদের খোলামেলা কথা হওয়ার দরকার। সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাওয়াই ভালো। ইমরান ভাবল, এই সুযোগে সোহানার কথাও খেয়াকে বলা যাবে।

খেয়া এসেছে ইমরানের ফ্ল্যাটে। আত্মীয়স্বজনের বাইরে খেয়া দ্বিতীয় নারী যে এই ফ্ল্যাটে একা এসেছে। এর আগে এসেছিল সোহানা। সকালে এসে সারাদিন থেকে চলে গেছে মাগরিবের আজানের আগেই। আজ এলো খেয়া। দুপুরের পর। ইমরান অপেক্ষা করছিল ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে। কিন্তু আজ খেয়াকে চেনা যাচ্ছে না। ছবিতে কিংবা রেস্তোরাঁয় এবং ব্রহ্মপুত্রে যে-খেয়াকে দেখেছিল তার সঙ্গে এই খেয়াকে সে কিছুতেই মেলাতে পারছে না। চোখ বসে গেছে। মুখের রংটাও ফ্যাকাশে। খেয়া যেন ফুলদানিতে রাখা মরা ফুল। সেই চপল-চঞ্চল উজ্জ্বলতাও মান। ডান গালের টোলের পাশে যেখানে একটা বাচ্চা তিল, সেখানে একটা লম্বা কাটা দাগ।
‘তোমার কী হয়েছে খেয়া?’
‘না তো, কিছু হয়নি ইমরান।’
‘তাহলে তোমাকে এমন বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে কেন?’
‘তেমন কিছু নয়।’

শুরুতে এরকম বললেও পরে খেয়া যা বলল সেটা ইমরান ভাবতেও পারেনি, বিশ্বাস করা তো দূরের কথা। কিন্তু সত্যকে সে অবিশ্বাস করবে কীভাবে। কারণ কথাগুলো তো খেয়াই ওকে বলেছে : সপ্তাহখানেক আগে মাহফুজ সাহেব ওকে প্রচ- মারধর করেছে। রাতে বাড়িতে ফিরে, প্রথমে খেয়ার চুল ধরে টানতে টানতে ওকে শোয়ার ঘরে নিয়ে গেছে, তারপর দেয়ালে ওর মাথা ঠুকেছে। পরে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গেছে ডাইনিং স্পেসে। ফ্রিজটা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে মেঝেতে। উলটে দিয়েছে খাওয়ার টেবিল। এক পাশের কেবিনেটের ওপর থেকে চীনামাটির ফুলদানি তুলে খেয়ার দিকে ছুড়েও মেরেছে। তখনই ফ্লাওয়ার ভাসটা ভেঙে চুরমার হয়ে তার একটা টুকরো গিয়ে লেগেছে ডান গালে।
বিয়ের এক বছর পর থেকেই ওর গায়ে এ-কথা ও-কথায় টুকটাক হাত তুলত মাহফুজ। কিন্তু এখন সেটা চড়-থাপ্পড় ছাড়িয়ে কিল-ঘুষি-লাথিতে গিয়ে ঠেকেছে। একদিন তো গলা টিপেও ধরেছিল। মাহফুজ সাহেব সেদিন কেবিনে রোগী দেখার নাম করে বন্ধুদের সঙ্গে তাস খেলে অনেক রাতে বাড়ি ফিরেছিল। মুখ থেকে ভকভক করে বের হয়ে আসছিল মদের গন্ধ। কিছু জিজ্ঞেস করার সঙ্গে সঙ্গেই খেয়াকে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বললেন তিনি। এতদিন ওকে বেশ্যা মাগি বলে গালমন্দ করত মাহফুজ সাহেব কিন্তু ওই রাতে তিনি খেয়ার মায়ের নামেও মুখ খারাপ করে বলেছিলেন, ‘বেশ্যার ঘরে তো বেশ্যাই হবে। বরইগাছে তো আর আপেল হবে না!’

‘জানো ইমরান, আমি কতবার পুলিশের কাছে যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পারিনি। কেন পারিনি জানো? পারিনি কারণ আমি তো আমার বাচ্চাকে ছাড়া বাঁচব না। মাহফুজও তার বাচ্চাকে ছাড়া থাকতে পারবে না। তো ভালোবাসার এই শেকল আমি ভাঙব কী করে!’
আর বলতে পারল না খেয়া, হয়তো আরো কিছু বলতে চেয়েছিল, কিন্তু একদলা কান্না বুকের ভেতর থেকে গলার কাছে উগড়ে এসে ওকে থামিয়ে দিলো। ইমরানও আজ এই সুযোগে খেয়াকে সোহানার কথা বলতে চেয়েছিল, অথচ এরকম একটা পরিবেশে সেটাও বলা হলো না। কিন্তু এই খালি ফ্ল্যাটে ওরা সেদিন খুবই ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল, চার দেয়ালের ভেতরে, গভীর গোপনে, এর আগে যতটা ঘনিষ্ঠ হয়েছিল ইমরান ও সোহানা।এরপর ইমরানের ফ্ল্যাটে আরো কয়েকবার এসেছিল খেয়া। এর মধ্যে সোহানার পরীক্ষাও শেষ হলো। গ্রামের বাড়ি থেকে ইমরানের বাবা-মা ঢাকায় এসে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গেল সোহানার বাড়িতে। কথা পাকাপাকি হলো। ঠিক হলো বিয়ের দিন-তারিখ। এই ফ্ল্যাট ছেড়ে দিয়ে ইমরান উঠল দুই বেডরুমের আরো একটু বড় ফ্ল্যাটে।

বিয়ের ঠিক এক সপ্তাহ আগে খেয়ার সঙ্গে দেখা করল ইমরান। প্রথমবার তাদের যেখানে দেখা হয়েছিল ওই একই রেস্তোরাঁয়। কারণ ওখানে আসা সহজ ছিল খেয়ার জন্য। এবারো সেই একই কফি আর স্যান্ডউইচ নিয়েছিল ওরা। কিন্তু খেয়া আগেরবারের মতো হা হা হা করে হাসেনি।
‘একটা খবর দিতে চাই তোমাকে।’
‘কী খবর ইমরান?’
‘আমি বিয়ে করছি। আগামী সপ্তাহে।’
কথাটা শুনে প্রথমে কেঁপে উঠেছিল খেয়া। এমন করে ইমরানের দিকে তাকিয়েছিল যেন তার সামনে একটা সাপ বসে আছে। ওর চোখে-মুখে ফুটে উঠেছিল অবিশ্বাসের ছায়া। কিন্তু সামলে নিল নিজেকে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই স্বাভাবিক হওয়ার অভিনয় করে ‘ও-ও-ও-মা-আ-আ, তাই নাকি!’ বলে চিৎকার করে উঠল খেয়া। আশপাশের লোকেরা ওদের দিকে ঘুরে তাকাল।
‘কাকে বিয়ে করছ তুমি?’
‘ওর নাম সোহানা। ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স করেছে।’
‘তুমি চিনতে ওকে? ভালোবেসে বিয়ে করছ, নাকি কেউ ঠিক করে দিয়েছে?’
‘সেটেল ম্যারেজ।’
‘ছবি দেখাও। তাড়াতাড়ি।’
‘আমার কাছে ওর কোনো ছবি নেই খেয়া।’
‘কী বলো? নিশ্চয়ই ফেসবুকে আছে। ওখান থেকে দেখাও।’
ইমরান ফেসবুকে গিয়ে সোহানার প্রোফাইল থেকে কয়েকটা ছবি দেখাল খেয়াকে। খেয়া ফোনটা হাতে নিয়ে সোহানাকে ভালো করে দেখল। আর ইমরান দেখল অন্যমনস্ক খেয়ার মুখ।
‘খুব মিষ্টি দেখতে তো মেয়েটা।’
‘তুমি আসবে বিয়েতে? একটা কার্ড পাঠাব?’
‘পাগল হয়েছ ইমরান? যাব কীভাবে বলো? মাহফুজ যদি জানে, তোমার মতো হ্যান্ডসাম গোপন একটা ছেলেবন্ধু আছে আমার, তাহলে ও তোমাকে খুন করে ফেলবে। তোমার তো আর বিয়ে করা হবে না ইমরান।’

এবার খেয়া হা-হা-হা করে হেসে উঠল। কিন্তু এই হাসি সেই প্রথম দিনের মতো ছিল না, ইমরানও সেটা টের পেল।

বেশিক্ষণ বসতে চাইল না খেয়া। বলল ওর নাকি বাড়িতে কী একটা জরুরি কাজ আছে, ভুলে গিয়েছিল, এখনই হঠাৎ মনে পড়েছে। কিন্তু ইমরান বুঝতে পারল এসবই খেয়ার অভিনয়, আসলে সে তার সামনে থেকে পালাতে চাইছে।

এবারো খেয়াকে উবারে তুলে দিলো ইমরান। মনে হলো ওর বুকের ভেতর থেকে গড়িয়ে নেমে গেছে একটা ভারী পাথর। আজ অনেক হালকা লাগছে নিজেকে। বিছানায় শুয়ে সোহানাকে ফোন দিলো ইমরান। প্রতিরাতের মতো ‘আই লাভ ইউ বেবি’ বলে কথা শেষ করল। ঘুমাতে যাওয়ার আগে ওর নোটিফিকেশনে দেখল কভার আর প্রোফাইল পিক বদলেছে খেয়া।

নুসরাত শারমিন ওরফে মেঘলা আকাশ ওরফে খেয়া আর মাহফুজ সাহেবের বিয়ের ছবি। পাশাপাশি বসেছে দুজনে। সবুজ বেনারসি শাড়িতে লম্বা একটা ঘোমটা দিয়ে ঢাকা খেয়ার মুখ। মাহফুজ সাহেবের মুখে আকর্ণবিস্তৃত সলাজ হাসি। খেয়ার আঙুলে তিনি আংটি পরিয়ে দিচ্ছেন।
ছবির ওপরে খেয়া ছোট্ট করে তিনটা শব্দ লিখেছে : ‘আমার জানের টুকরা!’
‘হ্যাপি অ্যানিভার্সারি’, নিচে কমেন্ট করল ইমরান।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত