স্বপ্নভাঙন

স্বপ্নভাঙন
আব্বার মুখে বড় আপুর বিয়ের কথা শুনে আমি বেশ অবাক হলাম। কিছুতেই যেন কথাটা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আমার আলো আপু মাত্র ক্লাস নাইনে পড়ে। অনেক ভালো ছাত্রী।গ্রামে নাম করা ছাত্রী। কিন্তু তারই বিয়ে তাও এতো অল্প বয়সে সেটা সত্যি অবিশ্বাস্য ব্যাপার। সকালে খাবার শেষে বাবা কাজে যাবেন। কিন্তু হঠাৎ করে এই কথা বলাতে সবাই যেন আকাশ থেকে পড়লো।
আমি আমার মা আর আমার বুবু সবাই বাবার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি।বাবা আবার বললেন, “কাল পাত্রপক্ষ দেখবার আইবো।তারা আলো’কে আগে থেকে দেখছে আর পছন্দ করেছে।এখন শুধু বিয়ের তারিখ ফেলবার আইবো।“ আব্বা এই কথা বলে কাজে চলে গেলেন।আমরা আব্বার পথের দিকে তাকিয়ে রয়েছি। আমার আব্বা খুব রাগী একজন মানুষ।শিরায় শিরায় তার রাগ বিদ্যমান।আমরা পরিবারের কমবেশি সবাই ভয় পাই ওনাকে।তাই বাবার মুখের উপর কথা বলার সাহস আমাদের কারো নাই। আমি আমার বুবুর চোখে জল দেখি।
এতক্ষণ তিনি ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে সব শুনছিলেন। কান্না করতে করতে ঘরে চলে গেল।আমি আমার মাকে বললাম, “আম্মা বুবুর কি সত্যি বিয়ে হয়ে যাবে?” আমার মা প্রত্যুত্তরে কিছু বললেন না। শুধু দরজার পানে চেয়ে রইলেন। আমি আবার মা’এর হাত ধরে বললাম, “ও আম্মা বলো?বুবুর কি সত্যি বিয়ে হয়ে যাবে? আমার বুবু না ডাক্তার হবার চাইছিলো? বিয়ের হলে ডাক্তার হবে কেমনে?” আমার কথা শুনে আম্মা কিছু বলে না।চুপ করে চেয়ে রইলো আমার দিকে। চোখে বিরক্তির আভা নিয়ে এসে বললো, “ছাড়তো?জ্বালাস না?মেয়ে বড় হলে বিয়ে দিতে হয়,এটা নিয়ম। মেয়েদের এতো পড়ালেখা কইরা কোনো লাভ নাই।“ এই বলে আম্মা আমার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে গোয়াল ঘরে চলে যায়। আমি কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না। দৌড়ে ঘরে ঢুকে দেখি বুবু বিছানায় বালিশে মুখবুজে কাঁদছে।
আমার কেন যেন এই কান্নাটা সহ্য হচ্ছিলো না। একদম বুকে গিয়ে বাঁধছে। আমি ধীরে ধীরে বুবুর কাছে গেলাম।বুবুর পিঠে হাত দিয়ে বললাম, “বুবু তুমি কি সত্যি সত্যি আমাদের ছেড়ে চলে যাবে?” বুবু কিছু বললো না।আরো জোরে কাঁদতে থাকে।আমার কেন যেনো এই কান্নাটা খুব খারাপ লাগছে। আমি আবার বললাম, “কি হলো বুবু? এভাবে কাঁদছো কেন?বলো না আমাদের ছেড়ে তুমি কি চলে যাবে?” বুবু আমার কথায় বেশ রেগে যায়। বলে, “তুই যা তো এখানে থেকে। আমাকে একলা থাকতে দে।“ আমি কি বলবো বুঝতে পারছি না। শুধু চুপ করে বুবুর দিকে তাকিয়ে রয়েছি। আমার চুপ থাকা দেখে বুবু আবার বললো, “কি হলো?যেতে বলছিনা তোকে?” আমি এবার কাঁদতে কাঁদতে বলি, “না,আমি যাবো না। তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না।“বুবু আমার কথায় থেকে উঠে বসলো। আমার গালে ঠাস করে একটা চড় মারে।আমি বাকরুদ্ধ হয়ে যাই। কিছু বলতে পারিনা। খুব কষ্ট হয়।আমি কান্না করতে করতে গালে হাত দিয়ে ঘর থেকে দৌড়ে বাইরে চলে আসি।
আমার যখন খুব মন খারাপ হয় তখন আমি আমাদের বাড়ির পাশে এই কদম গাছতলায় বসে থাকি।বসে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে এই কদম গাছকে দেখি।আর গাছের দিকে তাকালে আমার বুবুর কথা মনে পড়ে।এই কদম গাছটা আমার বুবু লাগিয়েছিল।কদম গাছে কদম ফুল হয় আর আমি সেগুলো গাছ থেকে পেরে বুবুকে দিতাম। মাঝে মাঝে যখন বুবু আমার সাথে রাগ করতো তখন আমি প্রায় বুবুকে এই কদম গাছের ফুল দিতাম। আমার বুবুর কদম ফুল খুব পছন্দের। যখন আমি গাছে কাঠবিড়ালীর মতো শাই নাই করে উঠে কষ্ট করে বুবুর জন্য ফুল পেরে বুবুকে দিতাম বুবু কি যে খুশি হতো। কিন্তু আজ বুবু আমার সাথে কেন ওভাবে কথা বললো আমি ভেবে পাচ্ছি না। খুব কষ্ট লাগছে।আর চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।
আলো আপু আমার থেকে সাত বছরে বড়।আলো আপু ক্লাস নাইনে আর আমি ফোরে। আমার বুবু পড়ালেখায় খুব ভালো। প্রত্যেকবার আমাদের গ্রামের হাইস্কুলের মাঝে ভালো রেজাল্ট করে।রাত জেগে পড়ে।আগে তো ঘরে বিদ্যুৎ ছিল না তখন কুপি বা হারিকেন জ্বালিয়ে পড়তো। কিন্তু যখন থেকে ঘরে বিদ্যুৎ এলো তখন থেকে বুবুর পড়া আরো বেড়ে গেল।আগে তো কুপিবাতি বা হারিকেনের তেল শেষ হয়ে যাবে বলে রাত দশটার আগে পড়া শেষ করতো। কিন্তু এরপর থেকে রাত জেগে পড়া শুরু করলো।বুবু আর আমি এক সাথে থাকি।বুবু যখন জোরে জোরে পড়তো তখন আমার রাগ হতো।
এমনিতেই টিনের চৌচালা ঘর।দুটো রুম। আমাকে বুবুর সাথে রাতে ঘুমাতে হয়। কিন্তু তার এতো জোরে মাইকের মতো পড়ার জন্য আমার ঘুম হতো না। আমি মাঝে মাঝে বুবুকে রাগ দেখিয়ে বলতাম, “এতো পড়ো কেন তুমি?তোমার জ্বালায় রাতে ঘুমাতে পারি না। চিৎকার না পরে আস্তে করে পড়া যায় না?”বুবু আমার কথায় হাসতো। দাঁত বের করে হাসতো।চিকন দাঁতের সেই হাসিটা আমার খুব ভালো লাগে।আর তাই আমার যখন রাগ হয় তখন বুবু সে হাঁসি দিয়ে আমার সব রাগ মুছে দিত।কারণ বুবু জানতো তার এই হাসির প্রতি আমার এক দুর্বলতা। আমি বুবুকে বলতাম, “সত্যি বুবু তুমি এতো পড়ো কেমন করে? আমি তো পড়তে বসলেই মাথা ঘুরায়। মাঝে মাঝে মনে হয় এই পড়ালেখা যে আবিষ্কার করছে তাকে কাছে পাইলে আমাদের গাঙের জলে ডুবাইতাম!”বুবু আমার কথায় হেসে আমার নাক দুটো ছুঁয়ে দেয়।আর বলে,”এতো না পড়লে ডাক্তার হবো কি করে?তুই না বলিস আমি বড় হয়ে ডাক্তার হবো আর তুই ডাক্তারের ভাই হবি?”আমি বুবুর কথায় লজ্জা পায়। মনে মনে সেই দিনগুলো কল্পনা করি।
আমার বুবু এক বড় ডাক্তার হয়েছে।সবাই আমাকে ডাক্তারের ভাই বলে চিনবে। আমাকে দেখলে সম্মান করবে। খুব ভালো লাগতো।আর তাই আমি নিজেকে বুবুর সামনে ডাক্তারের ভাই বলে পরিচিত দিতাম। বুবু এসব শুনে হাসতো।আর আমার কপালে তার ভালোবাসার ঠোঁট দুটো ছুঁয়ে দিতে। সত্যি আমার বুবুর স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়া।আমাকে বুবু প্রায় বলতো তিনি ডাক্তার হতে চায়।আর তাই এই স্বপ্ন পূরণ করার জন্য দিনরাত বাসায় বসে বসে পড়তো। আমি বুবুর মতো পড়াশোনায় ওতো ভালো না। পড়তে বসলে মাথা ব্যথা করে। কিন্তু মাঝে মাঝে বুবু আমাকে জোর করে পড়তে বসাতো। আমি পড়া বসা থেকে উঠে যেতে চাইলে তার খাতায় দাগ দেওয়া কাঠের স্কেল দিয়ে পেটাতো। আমি মার খাবার ভয়ে জোর করে পড়তাম।
মাঝে মাঝে যখন বুবুকে দেখতাম তার বইকে বুকে নিয়ে তার গন্ধ শুঁকতে,তখন আমার কাছে ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত লাগতো। আমি বুঝে উঠতে পারতাম না বই এর ভেতরে কি এমন সুগন্ধি আছে যার জন্য একে বুকে নিয়ে গন্ধ শুঁকতে হবে। আমি বুবুকে বলতাম, “বুবু বই এর ভেতরে তুমি কি এমন গন্ধ পাও যার জন্য তুমি মাঝে মাঝে এর গন্ধ শুকো?” বুবু আমার কথায় মুচকি হাসে। আমার চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে বলে, “এই বইগুলোতে যে আমার স্বপ্ন লুকিয়ে আছে।তাই এই বই কে যখন বুকে নিয়ে এর গন্ধ শুকি তখন জানস আমি যেন আমার স্বপ্নগুলোকে চোখে সামনে দেখতে পাই। তখন আমার মনটা খুব ভালো হয়ে উঠে।এই বইগুলো যে আমার স্বপ্ন, আমার স্বপ্ন পূরণের কারিগর। “আমি বুবুর কথায় কি বলবো বুঝতে পারতাম না। শুধু তার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকতাম। মাঝে মাঝে আমি বুবুর মতো বই এর গন্ধ শুকতাম কিন্তু আমার কাছে গোবর পচা গন্ধ ছাড়া আর কিছুই বুঝতে মনে হতো না। কিন্তু আমি অনুধাবন করতাম আমার বুবুকে।তার ভেতরের লালন করা স্বপ্নকে।
ছোট বেলা থেকেই এই বুবু আমার সব। আমার খেলার সাথি।আমাকে বকা দেওয়ার সাথী।বকা থেকে বাঁচানোর সাথী।আর মাছের কাঁটা বেছে দেওয়ার সাথী। আমি ছোটবেলা থেকেই মাছের কাঁটা বেছে খেতে পারিনা। সবসময় এই বুবু আমাকে তা বেছে দিত।মা কখনো এই কাজ করতো না। মূলত আমি মাকে তা করতে দিতাম না। আমি বুবুকে মাঝে মাঝে ‘আলু আপু’ বলে খেপাতাম।মাছ দিয়ে ভাত খাওয়ার সময় বলতাম, “আলু আপু কাঁটা বেছে দাও।“ বুবু আমার কান ধরে বলতো, “তোকে এই নাম ধরে ডাকতে মানা করেছি না?”আমি শুধু চিৎকার করতাম আর বলতাম, “আর বলবো না।“কিন্তু তারপরেও বলতাম। কিন্তু তবুও বুবু কিছু বলতো না। আমাকে মাছের কাঁটা বেছে সুন্দর করে খাইয়ে দিত। আমার খুব ভালো লাগতো। আমার এই বুবুকে আমি খুব ভালোবাসি। আমার সার্বক্ষণিক একা থাকার সঙ্গী যে সে। পাড়ার ছেলেদের সাথে যখন মারামারি করে মার খেয়ে বাসায় ফিরতাম তখন মা আমাকে প্রথমে অনেক বকতো। কখনো ঝাটা দিয়ে দৌড়ানি দিতো।
আমার বুবু তা থেকে আমাকে রক্ষা করতো। আমি মায়ের দৌড়ানি দেখে মাঝে মাঝে বুবুর কাছে চলে যেতাম। গিয়ে তার পিছনে লুকাতাম। আমার মা তবুও বকা দিতেই থাকতো। আমার খুব খারাপ লাগতো। কিন্তু একটু পর যখন বুবু আমার কান হালকা করে ধরে মাকে বলতো, “মা তুমি যাও। আমি দেখছি ও’কে।আজ ও’কে মেরে তক্তা বানাবো।“দেখছি বলে কিছুই দেখতো না। শুধু বলতো, “বকা খাওয়ার মতো এসব কেন করিস বল তো?“আমি শুধু দাঁত বের করে হাসতাম।বুবু আমার হাসি দেখে নিজেও হেসে দিতো। মাথার চুল এলোমেলো করে দিয়ে বলতো, “পাগল একটা।“আমি যখন পরীক্ষার খাতায় খারাপ রেজাল্ট করতাম তখন বাবা-মা থেকে এই বুবু বেশি বকা দিতো। কখনো তো কেঁদে ফেলতো। আমার বুবুর চোখের জল সহ্য হতো না। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হতো।তাই পরেরবার থেকে ভালো করে পড়ার চেষ্টা করতাম কিন্তু অবশেষে সেই ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছু পারতাম না।
একদিন আমার এই বুবুকে ঘরে মন খারাপ করে বসে থাকতে দেখি। আমি কাছে গেলে আমার সাথে ঠিকমতো কথা বলতো না। চুপচাপ ঘরে বসে ছিল। আমার সাথে ঠিকমতো কথা বলে না। কিছু বুঝতে না পেরে মাকে বললে মা উত্তর দিলো, “এই বয়সে মেয়েরা এমন হয়। চুপচাপ এমনি এমনি বসে থাকে।“আমি মায়ের কথায় কিছু বুঝতে পারিনা। আমি বুবুর সামনে গিয়ে দাঁড়াই।বুবুর দিকে কঠিন স্বরে বলি, “তোমার কি হয়েছে রে বুবু?তুমি আমার সাথে কথা ঠিকমতো কথা বলো না কেন?”আমার বুবু কিছু বললো না।চুপ করে থাকলো। আমি আবার বললাম, “কি হলো?তুমি জানো না তোমার মন খারাপ হলে আমার কান্না পায়।“বুবু আমার এই কথায় আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকায়। হঠাৎ আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে, “সিয়াম বদমাইশটা প্রতিদিন স্কুলে আসা যাওয়ার সময় আমাকে নিয়ে খারাপ কথা বলে।
খুব জ্বালাতন করে।আজ আমার ওড়না টেনে ধরেছিল। আমার ভালো লাগে না রে।“বুবুর কথা শুনে আমার ভেতরটা কেঁপে উঠে। আমি কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না। সেদিন ঘর থেকে রান্না করা বটি’দা নিয়ে ঐ শুয়োরের বাচ্চা সিয়ামকে পুরো গ্রাম দৌড়েছি। আমি তখন নিজেকে কি ভাবছিলাম জানি না।আব্বা আমাকে এ নিয়ে খুব মারলো।বললো, “আমি কি মরে গেছিরে?তুই কেন এমন করলি?”আমি কিছু বলিনি।চুপ করে ছিলাম।কিন্তু যখন বুবু আমার গালে একটা চড় দিয়ে বললো, “খুব শেয়ানা হয়েছিস?বয়স কতো তোর? মাত্র ক্লাস ফোরে পড়িস।“তখন আমি কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলাম, “আমার ডাক্তার আপুকে ঐ শুয়োরের বাচ্চা সিয়াম হাত দিয়েছে?কতো বড় সাহস তার।আজ কেউ না আটকালে মেরে ফেলতাম জানোয়ারটাকে।“ সেদিন আমাকে বুবু জড়িয়ে ধরে অনেক কেঁদেছিল।
সন্ধার দিকে আমি বাসায় পা রাখলাম। সারাদিন বাসায় ছিলাম না।দেখি ঘরের দরজার সামনে আলো আপু দাড়িয়ে আছে। আমাকে দেখে তিনি দৌড়ে আসলেন।এসেই আমাকে জড়িয়ে ধরলো।আর কাঁদতে লাগলো। খুব জোরে কাঁদতে লাগলো।বললো, “খুব অভিমান তো্র?রাগ করে আছিস আমার উপর?” আমি কি বলবো বুঝতে পারছি না।চুপ করে শুধু বুবুর মায়াময় মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছি।বুবু আমার গালে হাত দিয়ে বলে, “তোর খুব লেগেছিল তাই না? আমি খুব পচা, খুব খুব পচা। আমার লক্ষী ভাইকে কত জোরে মেরেছি?”আমি বুবুর এই কথায় কি বলবো ভেবে পাই না।বুবু আমাকে জড়িয়ে ধরে। আমি বললাম, “না তুমি খুব ভালো। আমার ডাক্তার আপু তুমি। তুমি কখনো আমাকে ছেড়ে চলে যেও না।
“বুবু আমার কপালে চুমু খেয়ে বলে, “আরে বোকা!এতো ভয়ের কি আছে?বাবা বলেছে,কাল শুধু দেখতে আসবে?বিয়ে তো হবে না। দেখতে আসলে কি বিয়ে হয়?তোর মনে নেই মতি’কে কতো ছেলে দেখতে আসতো? কিন্তু দেখ এখনো বিয়ে হয়নি। আমারও হবে না,বুঝলি গাধা।“ হঠাৎ করে মনে খুব ভালোলাগা ছুঁয়ে গেল।মন থেকে ভয়টা যেন নিমিষেই চলে গেল।আসলেই তো মতি আপু তো আমার বুবু থেকে তিনবছরের বড়।কতো ছেলে দেখতে আসলো কিন্তু বিয়ে হয়নি। আমার বুবুরও হবে না তাহলে। আমার মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।বুবু আমার গালে টেনে দিয়ে বললো, “চল,ঘরে চল।তোর জন্য আজ বাজার থেকে কাতলা মাছ আনিয়েছি।তুই তো আবার কাঁটা বেছে খেতে পারিস না।চল খাইয়ে দিবো।“আমি খুশিতে বুবুর গালে চুমু দিয়ে বললাম, “সত্যি আলু আপু!” আপু আমার গালে টেনে বললো, “হ্যাঁ রে পাগল।“
আজ বুবুকে দেখতে এসেছে। ছেলেকে আমার মোটেও পছন্দ হয়নি।কালো চেহারা।দেখতে কেমন যেন গুন্ডা গুন্ডা ভাব। ছেলে কি না কি একটা দোকান করে। অনেক টাকা-পয়সা।কিন্তু এতো কিছু পরেও আমার ছেলেটাকে পছন্দ হলো না।ছেলেটা বুবু থেকে বয়সে বেশ বড় মনে হলো।তারা বিয়ের দিনক্ষণ সব ঠিক করে চলে গেল।সামনে শুক্রবারে বিয়ে। আমার মন খারাপ হলো। খুব খারাপ হলো। আমি কিছুতেই আমার বুবুর সাথে লোকটাকে মেনে নিতে পারছি না।বাবা তাদের চলে যাওয়ার পর যখন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন তখন আমি আমার বাবাকে সোজাসুজি বললাম, “বাবা বুবুকে এই গুন্ডা ছেলের সাথে বিয়ে দিয়ো না।ছেলেটাকে আমার একদম পছন্দ হয়নি।“ বাবা চুপ করে রইলেন। আমার কথায় বাবা কিছু বললো না দেখে আমি বাবার হাত ধরে বুঝাতে লাগলাম ছেলেটা বুবুর জন্য বেমানান।বাবা বেশ কয়েকবার ধমক দিলে যখন আমি থামলাম না তখন তিনি আমার গালে একটা কষে চড় মারলেন। আমি চড় খেয়ে মাটিতে পড়ে গেলাম।আমাকে চড় মারার শব্দে মা ঘর থেকে ছুটে আসলো।বুবু আমাকে এসে জড়িয়ে ধরলো।
আমি শুধু কান্না করছিলাম।মা কিছু বলছে না। শুধু আমাদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।বাবা রাগী কন্ঠে বললেন, “আর একবার যদি এসব কথা বলছোস তোর কি অবস্থা করি দেখবি।“বাবা আর কিছু না বলে বাড়ি থেকে কোথায় জানি চলে গেল।বুবু আমাকে জড়িয়ে ধরে শান্তনা দিচ্ছে। আমার চোখ দিয়ে জল পড়া কিছুতেই থামছে না। আমার মন কিছুতেই এই বিয়ে মানতে চাইছে না।বড্ড পাষাণ মনে হচ্ছে আমার বাবাকে। নিজের জেদের জন্য আমার বুবুর স্বপ্নকে তিনি আগুনে পুড়িয়ে দিচ্ছে।একটু ও কি মায়া হচ্ছে না তার? আমার বুবুর স্বপ্ন,আকাঙ্ক্ষা,ইচ্ছা কে কি তার মনে একটু প্রভাব ফেলছে না। আমার মনে বাবার প্রতি ঘৃণা জন্ম নিচ্ছে।এক অসম্ভব ঘৃণা।একটা মানুষের স্বপ্নকে নিজ হাতে গলা টিপে হত্যা করার ঘৃণা। খুব রাগ হয় আমার।খুব রাগ।
দুদিন পর বুবুর বিয়ে।এই দুইদিন আমি দেখেছি আমার বুবুর মাঝে লুকায়িত কষ্ট।বিয়ে উপলক্ষে বাড়ির সবাই কতো খুশি।বুবুর মুখেও আমি হাসি দেখেছি। কিন্তু এটা ছিল মিথ্যা হাসি।অন্যকে খুশি করার জন্য নিজের হাসিটাকে বিলীন করে এক মিথ্যা হাসি।এই মিথ্যা হাসির ভেতরে যে কতো কষ্ট জমা তা আমি বুবুর চোখে তাকালে বুঝতে পারতাম। সারাদিন সবার সামনে হাসির অভিনয় করলেও মাঝরাতে বালিশে মুখ গুজে কাঁদাটা যে শুধু আমি দেখেছি। নিজেকে বড় অসহায় মনে হয়।বুবুর সামনে যেতে মন চায় না।তার থেকে মিথ্যে হাসিটা দেখতে ইচ্ছে করে না। আমার শুধু সেই হাসিটা দেখতে ইচ্ছে করে যে হাসি আমার মনে এক রাশ মনোমুগ্ধকর প্রাণ সঞ্চার করতো। আমার এগুলোর সবকিছুর মূলে শুধু আমার বাবার কথা মনে পড়ে।
বড্ড ঘৃণা জাগে তার উপর।কাল একবার মা বলেছিল এই বিয়েতে বুবুর মত নেই,বাবা মাকে এক ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দিল। এরপর আস্তে আস্তে তার প্রতি আমার ঘৃনা আরো বেড়ে যায়। মনে হয় এই লোকটার ভেতরে হৃদয় নাই।যা ছিল তা কয়লা হয়ে গেছে।মায়া,মমতা, ভালোবাসা নেই।আছে শুধু কুত্তার মতো রাগ আর জেদ।কাল মাঝরাতে বুবুর কান্নাটা আমার সহ্য হলো না।এই কান্না আমাকে শুধু একটা কথা জানান দিচ্ছিল এক অসহায় নারীর আর্তনাদ। আমার খুব কষ্ট হয়। খুব খারাপ লাগে।আর তাই আজ সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই আমি করিম স্যারের বাড়ির দিকে ছুটে যাই।করিম স্যার বড্ড ভালো মানুষ। গ্রামের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে তিনি গ্রামের সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করে। এছাড়া নারীদের জন্য কাজ করেন। আমি তাকে জোর করে আমার বাসায় নিয়ে আসি।
আমার বিশ্বাস ছিলো তিনি কিছু না কিছু করতে পারবেন।করিম স্যারকে আমি বাড়ির ভেতর রেখে আমি রাস্তায় তার জন্য অপেক্ষা করতে থাকি।বেশ কিছুক্ষণ পরে ‌করিম স্যার রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসেন। আমি ছুটে যাই তার কাছে।দেখি তার মুখ শুকনো।আমার মনে ভয় জমা হয়। আমি তার দিকে তাকিয়ে থাকি কিছু আশাপূর্ণ উত্তরের আশায়। তিনি বলেন, “তোর আলো আপু খুব ভালো ছাত্রী ছিলো রে, জেএসসিতে গোল্ডেন পেল। এতো তাড়াতাড়ি লেখাপড়া যে বাদ দিতে হবে তা কখনো ভাবতে পারিনি।“ আমি কি বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। আমার মনের ভেতর অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। নিজেকে কেমন যেনো পাগল পাগল লাগে। আমি কান্নাভেজা গলায় বলি, “আর কি কোন উপায় নেই?”করিম স্যার বলেন, “আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু তোর বাবা বললো,যদি গরিবের পেটে লাথি মেরে আপনার ভাত হজম হয় তবে করবেন।এই কথায় আমার কি বলা উচিত তুই বল?”আমি কান্না করতে থাকি।
হাউমাউ করে কান্না করতে থাকি।করিম স্যার আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, “আরে পাগল, এমন ভাবে কেউ কাঁদে? পুরুষদের কখনো কাঁদতে নেই।“আমি এসবের কথার অর্থ বুঝি না। মেয়েদের বেশি পড়ালেখা করে লাভ নেই। পুরুষদের কাঁদতে নেই।এসব কথা মানুষ কেন বলে?কেন নারী-পুরুষ ভেদাভেদ সৃষ্টি করে।নারীরা কেন তাদের জীবন নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পারবে না। তাদের কি কোন ইচ্ছা নেই।পুরুষরা কেন কাঁদতে পারবে না তাদের কি মন নেই। আমি কিছু ভেবে পাইনা।এই ছোট মাথায় আমার কিছু ঢুকে না।করিম স্যার তখনো আমায় জড়িয়ে ধরে আছেন। তিনি আবার বলেন, “তোর আলো আপু হয়তো তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারলো না। কিন্তু তুই পারবি।কারণ আমি জানি তোর ভেতরে সে ক্ষমতা আছে।“আমি করিম স্যারের দিকে তাকাই।
নিজেকে অনুধাবন করি পড়ালেখায় আমি কখনো ভালো না। তাহলে আমি কেমন করে বুবুর মতো বড় স্বপ্ন দেখবো? আমার কি সেই অধিকার সাহস আছে।করিম স্যার আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে, “কি ভাবছিস তুই পারবি না বড় স্বপ্ন দেখতে? অবশ্যই পারবি। আমি জানি তুই পারবি।তোর মনে আছে তুই একবার সিয়ামকে দা দিয়ে কি ভয়টা না দেখিয়েছিলি! সেটা কি কখনো স্বপ্নে দেখেছিলি? মানুষ চাইলে সব পারে শুধু লাগে সাহস আর সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাস।তোর বোনের স্বপ্নকে নিজের ভেতর স্থাপন কর তাহলে দেখবি তোর বোন যে স্বপ্ন পূরণে ব্যর্থ হয়েছে তুই সে স্বপ্ন পূরণ করে তার কাছে একজন স্বপ্ন পূরণের কারিগর হিসেবে থাকবি।তোর বোন তখন খুব খুশি হবে।“ আমি কি বলবো বুঝতে পারিনা। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি করিম স্যারের দিকে। মনে একটা জেদ কাজ করে। আমি কি পারবো?
আজ আলো আপুর বিয়ে হয়ে গেল।চোখের। সামনে দেখলাম একজন অসহায় মেয়ের প্রিয়জনদের ছেড়ে চলে যাবার কষ্ট। যাবার সময় আমাকে বুবু জড়িয়ে ধরে অনেক কেঁদেছে। কিছুতেই আমাকে ছাড়তে চাইছিল না। আমিও খুব শক্ত করে ধরে কেঁদেছি।আপু যাবার সময় আমাকে শুধু একটা কথা বলেছে, “স্বপ্নভাঙন অনেক কষ্টের রে।তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বপ্নগুলোকে যখন কেউ ভেঙে দেয় তখন নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়।মরে যেতে ইচ্ছা করে।তাই কখনো নিজের স্বপ্ন ভাঙতে দিবি না। আঁকড়ে ধরে রাখবি।আমরা তো মেয়েমানুষ আমাদের হাতে হয়তো সবকিছু নেই। কিন্তু তুই তো ছেলেমানুষ নিশ্চয়ই পারবি।“ আমি বুবুর এই কথার মানে কিছু বুঝতে পারিনা। শুধু তাকিয়ে ছিলাম।বুবু যখন চলে গেল তখন আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল। কিছুতেই নিজেকে শান্তনা দিতে পারছি না।
রাতে না খেয়ে শুয়ে পড়েছি।পাশের ঘরে মা আর বাবা বসে আছেন।বাবা হঠাৎ মা’কে বললেন, “আরিফ,না খেয়ে ঘুমায় পড়েছে তাই না, আমেনা?”আমার মা কিছু বলে না।চুপ করে আছে। আমার বাবা আবার বললো, “জানি পোলাডার আমার প্রতি অনেক রাগ।রাগ করবো না ক্যান? আমি তার বুবুর ডাক্তার হবার স্বপ্ন নিজ হাতে গলা টিপে মেরে ফেললাম। কতো করে আমায় বুঝালো তবুও আমি মানলাম না।
শেষে করিম স্যারকে পর্যন্ত ডেকে আনলো তবুও আমি আমার সিদ্ধান্ত থেকে নড়লাম না।জানো যখন পোলাডা আমাকে বলতো,আব্বা আমার বুবু ডাক্তার হব আর আমি ডাক্তারের ভাই হমু, তুমি হবা ডাক্তারের বাবা,আর মা হইবো ডাক্তারের মা।কতো মজা হইবো তাই না। তখন আমার বুকটা ভরে উঠতো। মনে খুব ইচ্ছে হতো সেই দিনের জন্য।আলো পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করলো তবুও দেখো আমি তাকে তার স্বপ্ন পূরণ করতে না দিয়ে স্বার্থপরের মতো মাটি চাপা দিয়ে দিলাম।“বাবার কন্ঠ আস্তে আস্তে ধরে আসছে। কান্নাভেজা কন্ঠে আবার বললেন, “মাইয়াটা বড় হইতাছে আর পাড়ার লোকের নজর পড়তাছে। আশেপাশের মানুষ নানান কথা কয়। সেইদিন সিয়াম আমাকে হুমকি দেয় আমার মেয়েকে নিয়ে। কিছু কইবার পারিনা।
এক কাঠমিস্ত্রীর দোকানে কাম করি, দিনে যা আয় করি তা দিয়ে সংসার চালানো যায় না। ছেলেমেয়ে বড় হয়তাছে আর তাদের চাহিদাও দিনদিন বাড়তাছে।আর সামনে তো গাঙের পানি উঠবো। তখন আবার কই না কই গিয়ে থাহন লাগে কোনো নিশ্চয়তা নাই।তাই একটা ভালো সমন্ধ পাইয়া আর ফেলতে পারলাম না।শুনছি পোলা খুব ভালো। গ্রামেগঞ্জে বেশ সুনাম আছে।আর তাছাড়া তারা আমাদের কাছে তেমন কিছু চাই নাই।এমন একটা সুযোগ আমি কেমনে ছাড়ি কও তুমি? নিজের সন্তানের ভালো হওয়ার জন্য আর তোমাদের ভালোর জন্য স্বার্থপর হয়ে কি আমি ভুল করছি?মাইয়াটা বড় হইছে এখন না হয় একটু নিজ থেকে ভাবতে শিখুক। আমি জানি আমাকে সে ক্ষমা করবে না। কিন্তু তোমরা দেইখো মাইয়াডা সুখে থাকবো।“ বাবা এই বলে কাঁদতে থাকে।বাবার এইসব কথায় আমার বুকের ভেতর কেঁপে উঠে। আমার চোখে আপনা আপনি পানি জমা হয়। বাবার প্রতি যতো রাগ ঘৃণা এগুলো কেমন করে যেন মন থেকে হারিয়ে গেল।
এখন আমার বাবাকে খুব অসহায় মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে এই মানুষটার মনেও হৃদয় বলে কিছু আছে।এক বড় হৃদয়।যে হৃদয়ে শুধু নিজের জন্য না সবার জন্য ভালোবাসা আছে।সবার ভালো রাখার চিন্তা মাথায় রাখে সবসময়। একজন বাবার অসহায়ত্ব আমার মনকে ভেঙে দেয়। ভেঙ্গে দেয় তার প্রতি সব অভিমান। আমি উঠে বসি। এগিয়ে যাই বুবুর পড়ার টেবিলে। বইগুলোকে উপর হাত বুলায়।বুবুর হাতের স্পর্শ অনুভব করতে থাকি।একটা বইকে বুকে নিই।এর গন্ধ শুকি।আজ কেন যেন এই গন্ধটার প্রতি খারাপ লাগা জন্মাচ্ছে না।কেন যেন এক সুগন্ধি পাচ্ছি।আর চোখ বন্ধ করলেই বুবুর সেই্ কথা শুনতে পাচ্ছি, “এই বইগুলো যে আমার স্বপ্ন, আমার স্বপ্ন পূরণের কারিগর।“

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত