সুখের বৃষ্টি

সুখের বৃষ্টি
নীলাকে প্রোপজ করেছিলাম,জবাবে সে বলেছিলো ভেবে দেখবে ৷ ১৫দিন পার হলেও সে কোনো জবাব দেয়নি ৷ অথচ, আজ সে অন্য একজনের সঙ্গে ক্যাম্পাসে বসে বাদাম চিবোচ্ছে ৷ ভালোবাসলেই যে তাকে পাওয়া যাবে এটা সত্য নয়, এই কথাকে আঁকড়ে ধরে মনকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম ৷ ৪ বছর ধরে নীলাকে একতরফা ভালোবেসে গেছি ৷ তাকে মনের কথাটা বলবো বলবো করেও বলিনি ৷ ৪বছর পর তাকে ভালোবাসি বলেও কোনো লাভ হলোনা ৷ শুধু শুধু মরীচিকার পিছু ছুটে সময় নষ্ট করলাম ৷ তাকে হারিয়ে ফেলেছি মনে হতেই কষ্টে জর্জরিত হয়ে যাই ৷ বিষাদের অনলে পুড়ে ছাই হই বারংবার ৷ ভালোবাসার মানুষকে না পাবার কষ্টটা খুবই হ্নদয়বিদারগ হয় ৷ একতরফা ভালোবাসা মানুষকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মারে ৷ হতাশায় কাটাতে হয় প্রতিটা দিন ৷ আমাকে প্রতিটা দিন বিষন্নতায় কাটাতে হচ্ছে ৷ বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারিনা ৷ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবি যে যদি তার প্রেমে না পরতাম তাহলে কতই না ভালো হতো এবং এভাবে অভিশপ্ত জীবন কাটাতে হতোনা!
আমার অনার্সের রেজাল্ট দিবে ২দিন পর ৷ রেজাল্ট নিয়ে প্রচন্ড চিন্তা হচ্ছে, না জানি কি হবে! ফার্স্টক্লাস না আসলে সব স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে ৷ নীলার বিষয়টা নিয়ে ঘোর ডিপ্রেশনে চাপা পরে আছি, রেজাল্ট আশানুরুপ না হলে শেষ হয়ে যাবো ৷ অবশেষে রেজাল্ট হাতে পেলাম ৷ কিন্তু, আমি আবারো হতাশ হলাম ৷ এক আকাশ কষ্ট আমাকে পিশিয়ে মারতে লাগলো ৷ বুক ফাঁটা কষ্টে দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছিলাম ৷ আমার সিজিপিএ ২.৫৮ ৷ এতটা খারাপ হবে ভাবিনি ৷ ভেবেছিলাম যদি ফার্স্টক্লাস যদি নাও আসে অন্তত ৩এর কাছাকাছি হবে আমার রেজাল্ট ৷ রেজাল্ট পেয়ে ঘরবন্দি হয়ে রইলাম ৷ কেঁদেকেটে বালিশ ভিজিয়ে ফেললাম ৷ নিজেকে নানাভাবে বুঝানোর চেষ্টা করছিলাম যে যারা লেখাপড়া করেনা তারা তো দিব্যি সুখে শান্তিতে দিন যাপন করছে ৷ তাহলে আমি কেন পারবোনা? রেজাল্ট খারাপ হলে যে আমি জীবনে উন্নতি করতে পারবোনা তা তো নয় ৷ ভালে চাকরি না পেতে পারি, ব্যবসা তো করতে পারবো ৷ এসব ভেবে ভেবে অবশেষে নিজেকে বুঝাতে সমর্থ হলাম যে ভালো রেজাল্ট না হলেও আমার জীবন চলবে!
মাস্টার্সে ভর্তি হয়ে গেলাম ৷ চাকরির সন্ধানেও ছুটলাম ৷ আর কতদিৱ বাবার হোটেলে খাবো? একটা ছাত্রকে লুকিয়ে লুকিয়ে টিউশনি করিয়ে মাত্র ২হাজার টাকা পাই ৷ ১জনের বেশি টিউশনি করানোর সুযোগ নেই ৷ কারণ টিউশনি নিয়ে একটা বাজে অভিজ্ঞতা আছে আমার ৷ অনার্স ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র ছিলাম তখন ৷ ক্লাস ৯ এর সাদিয়া নামের একটি মেয়েকে টিউশনি করাতাম ৷ প্রায় ৬ মাস পড়ানোর পর একদিন মেয়েটি আমাকে প্রোপজ করে বসলো ৷ সেদিন তার প্রোপজ পেয়ে কিছুই বলতে পারিনি ৷ প্রচন্ড ভয় পেয়েছিলাম তার প্রস্তাব পেয়ে ৷ পরেরদিন তাকে পড়াতে এলাম ৷ সাদিয়া দরজা বন্ধ করে দিয়ে আমাকে বললো আজকে আমাকে ভালোবাসি বলে তারপর যাবেন, নইলে দরজা খুলবোনা ৷ বাধ্য হয়ে তাকে ভালোবাসি বলতে হয়েছিলো ৷ তিনদিন পর ঘটলো বাজে এক ঘটনা ৷ আমার ছাত্রী সাদিয়া তার সিট থেকে উঠে আমাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে বললো স্যার, আপনি আজ রেস্টুরেন্টে আমার জন্য অপেক্ষা করবেন, আমি সময়মত আপনার কাছে গিয়ে হাজির হবো!
সাদিয়াকে কিছু বলার আগেই থাপ্পরের শব্দ শুনতে পাই ৷ পিছন ফিরে দেখি সাদিয়ার মা রুমে এসে তাকে থাপ্পর মেরেছে ৷ তার মা আমার দিকে ভয়ানক চোখে তাকিয়ে রইলো ৷ আমি ভয়ে এতোটুকু হয়ে গেলাম ৷ সাদিয়ার মা আমাকে নানান কথা বলে ইচ্ছামত অপমানিত করলো এবং বাসা থেকে তাড়িয়ে দিলো ৷ ঐদিন থেকে আর টিউশনি করার সাহস হয়নি ৷ বাবা, মা বিষয়টা জেনে গিয়েছিলো বিধায় তারাও টিউশনি করাতে দিতোনা ৷ কিন্তু ঘটনার ১ বছর পর সালমান নামের একটিাছেলেকে টিউশনি করাতে হয় কারণ ছেলেটার মা আমাকে হাতজোর করে পড়াতে অনুরোধ করেছিলো ৷ ৪ হাজার টাকার টিউশন অথচ মাত্র ২হাজার টাকায় পড়াতে রাজি হই ৷ মাস শেষে এই ২হাজার টাকা পেয়ে আমার হাত খরচের কাজে লাগাতাম ৷ লেখাপড়ার খরচ বাবা মা দিতো ৷ কিন্তু আর কত খরচ দিবে তারা?
একের পর এক চাকরির ইন্টারভিউ দিলাম ৷ কিন্তু চাকরি আমার ভাগ্যে জুটলোনা ৷ যদিও একটা চাকরিতে আমাকে সিলেক্ট করা হয়েছিল কিন্তু ঘুষ চাওয়া হয়েছিলো বিধায় চাকরি করার সৌভাগ্য হয়নি ৷ ৪ লক্ষ টাকা ঘুষ দিয়ে চাকরি করার সামর্থ আমার নেই ৷ বেকারই থেকে গেলাম ৷ বেকার বসে আছি দেখে বাবা, মা কথা শুনাতে লাগলো ৷ তারা আমাকে অনেক টেনেছে আর পারবেনা ৷ চাকরি খোঁজার উপরেই রইলাম ৷ কিন্তু সোনার হরিণটা আমাকে বরাবরের মতই এড়িয়ে চলতে লাগলো ৷ না পারছি বাসায় থাকতে না পারছি বাইরে বেরোতে ৷ বাসাতে থাকলে বাবা, মায়ের কথা শুনতে হয়, বাইরে বের হলে প্রতিবেশীদের মুখ থেকে শুনতে হয় কিরে চাকরি বাকরি করছিস না কেন? কিছু একটা কর, আর কত বসে বসে খাবি? বি,এ পাস করে তো গার্মেন্টসে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে পারিনা ৷ অন্য কোনো কোম্পানিতে কিংবা সরকারী চাকরির ইন্টারভিউ দিলে অন্যরা সুযোগ পেয়ে যায়, অথচ আমার কপালে চাকরি জোটেনা! ব্যবসা করবো কিন্তু সেটারও সুযোগ নেই ৷ মূলধন দরকার, যা আমার নিকট নেই ৷ ঋণ নিয়ে ব্যবসা করার সাহস আমার নেই ৷ বেকারই রয়ে গেলাম! আর প্রতিদিনই বাবা, মায়ের বকুনি ও ভাতের খোটা হজম করতে লাগলাম!
জগতের আমিই বোধহয় একমাত্র অকৃতজ্ঞ সন্তান, যে ২৪টা বছর ধরে বাবা মায়ের ঘাড়ে বসে খাচ্ছি ৷ লেখাপড়া করেও এখনো নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ পেলাম না! দুর্বিষহ জীবন নিয়ে বেঁচে আছি ৷ আশা বুকে বেঁধে রেখেছি যে একদিন সফল হবোই হবো! তিনদিন পর ভার্সিটিতে এলাম ৷ ক্যাম্পাসে বসে আছি মুখটা ভাড় করে ৷ মাথা নিচু করে বসে ছিলাম ৷ আচমকা, চেহারাটা তুলতেই চমকে উঠলাম ৷ চোখদ্বয় চড়ক বানিয়ে তাকিয়ে রইলাম ৷ আমার সেই টিউশনির ছাত্রী সাদিয়াকে দেখতে পাচ্ছি ৷ সে আমার দিকে এগিয়ে আসছে উচ্ছ্বসিত নয়নে ৷ তার চেহারা জ্বলজ্বল করছে ৷ ঠোঁটের কোণে হাসি দেখতে পাচ্ছি ৷ সে আমার দিকে এগিয়ে আসছিলো আর আমি ক্রমেই বিচলিত হয়ে যাচ্ছিলাম ৷ সাদিয়া আমার নিকটে এসে উল্লসিত কন্ঠস্বরে বললো,
-স্যার আপনি? কেমন আছেন? অনেক দিন পর আপনাকে দেখলাম ৷ প্রায় ৪ বছর হবে ৷ জানেন আপনাকে কত খুঁজেছি? সাদিয়া থামলো ৷ আমার দিকে তাকিয়ে রইলো গালভর্তি হাসি নিয়ে ৷ মেয়েটা কত মায়াবী! আগের চেয়ে সুন্দরী হয়েছে ৷ আসলেই সে আশ্চর্য সুন্দর! প্রশ্ন জাগছে মনে সাদিয়া এই ভার্সিটিতে পড়ে কিনা! সাদিয়াকে সহজভঙ্গিতে জবাব দিলাম,
-হ্যাঁ, আমি ভালো আছি ৷ তুমি কেমন আছো?
-আমিও ভালোই আছি ৷ আপনাকে দেখে আরো ভালোলাগছে ৷ আপনি নিশ্চয় এই ভার্সিটিতে স্টাডি করেন? আমি এবার অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েছি, অর্থনীতিতে!
-বাহ! শুনে খুব ভালোলাগলো!
-আপনাকে একটা কথা বলার ছিলো ৷ তবে এখানে বলতে চাইনা ৷ ঐদিকটাই যাবেন?
-কি এমন কথা যে এখানে বলা যাবেনা?
-কি কথা সেটা ঐদিকে গেলে জানতে পারবেন, চলুন! সাদিয়ার কথামত ক্যাম্পাসের দক্ষিণ পার্শ্বে গিয়ে অবস্থান করলাম ৷ অতঃপর সাদিয়াকে বললাম,
-কি বলবে বলো? সাদিয়া আমার দিকে কাতর চোখে তাকিয়ে নিচুস্বরে বললো,
-আমি অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে নেই আর ৷ এখন আপনি আর আমার শিক্ষকও নন ৷ আমরা এখন শুধুই দুটা আলাদা সত্তা- নারী ও পুরুষ ৷ যে কথাটা বলতে চাইছি, সেই কথাটা শুনলে হয়তো ভাববেন আমি খুবই নির্লজ্জ মেয়ে ৷ আসলে আমি আপনার কাছে আরো নির্লজ্জ হতে চাই, তবুও আপনার নিকট কথাগুলো বলতেই হবে ৷ অনেক খুঁজেছি আপনাকে ৷ অবশেষে পেয়েছি, আবারো আপনি হারিয়ে যেতে পারেন ৷ তাই নির্লজ্জ হয়েই বলছি, আমি আজও আপনাকে ভালোবাসি ৷ আপনি তো আমাকে একবারের জন্য হলেও ভালোবাসি বলেছিলেন, সেটা মিথ্যা হোক বা সত্য- আমার নিকট সেটা সত্যই মনে হয়েছিলো ৷ সেই কথাটির জোরে আমি আপনার মুখ থেকে আবারো ভালোবাসি শব্দটি শুনতে চাই ৷ এবং আজকে আপনি মিথ্যা নয়, আমাকে মন থেকে বলবেন আপনি আমাকে ভালোবাসেন!
তখনই টের পেয়েছিলাম যে সাদিয়া আমাকে ঠিক এমন কিছুই বলবে! আমার ধারণাটা সত্য হলো ৷ অবাক হতেই হলো ৷ সে এতো বছর ধরে আমাকে মনে রেখেছে এটা আসলেই অবাক করার মত বিষয় ৷ মানুষ কত বিচিত্র, আমি একটা মেয়ের জন্য ৪ বছর ধরে অপেক্ষা করলাম অথচ আমাকে সে পাত্তা দিলোনা, অথচ আমাকে অন্য একটা মেয়ে ৪ বছর ধরে খুঁজছে! ভালোবাসা আসলেই বিচিত্রময় ৷ আর ভালোবাসার মানুষগুলোও কত বিচিত্র ৷ সাদিয়াকে কি জবাব দিবো ভেবে পাচ্ছিনা ৷ আমি জানি তাকে ফিরিয়ে দেওয়া ঠিক হবেনা ৷ কারণ খুব ভালো করে জানি ভালোবাসার মানুষটাকে না পাবার কষ্ট কতটুকু ৷ কিন্তু আমার সঙ্গে সাদিয়া প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পরলে সে ঠকবে ৷ তাকে বিয়ে করার ভাগ্য হবেনা আমার ৷ বেকার ছেলের সঙ্গে কোনো বাবা, মা তার মেয়েকে বিয়ে দিতে চাইনা ৷ এই বিষয়টা মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নিলাম সাদিয়াকে হ্যাঁ, না কিছুই বলবোনা ৷ তার থেকে কয়টা দিন সময় নেবো! সাদিয়াকে হাসিমুখে বললাম,
-ভালোলাগছে যে তুমি এখনো আমাকে ভুলে যাওনি ৷ আমি তোমার বিষয়টা ভেবে দেখবো ৷ কয়টা দিন সময় দাও, তোমাকে উত্তর জানিয়ে দিবো! এমন জবাব শুনে সাদিয়ার হাস্যজ্জ্বল চেহারাটা মলিন হয়ে গেলো ৷ তার বিষাদময় চেহারাটা আমাকে মর্মাহত করলো ৷ সাদিয়া কাঁপা কন্ঠস্বরে বললো,
-আচ্ছা, আমি আপনার উত্তরের অপেক্ষায় থাকবো ৷ তার আগে যদি আপনি আপনার সেলনম্বরটা দিতেন ৷ তাহলে খুশি হতাম! কৃত্তিম হাসি হেসে বললাম,
-না, ফোনে আমরা কথা বলবো না ৷ তুমি তোমার জবাব কয়দিন পর ঠিক এই জায়গাতেই পাবে ৷ আমি তোমাকে জানাবো ৷ আর হ্যাঁ, লেখাপড়ায় মন দিও ৷ আমি আসি, ক্লাস করবোনা আজ ৷ বাসায় যাবো!
সাদিয়ার কাছ থেকে যাবার সময় তার চেহারার দিকে তাকিয়ে লক্ষ্য করলাম কষ্টে তার পুরো মুখটা বিষাদের অনলে পুড়ে অগ্নিদগ্ধের মত কালো কুটকুটে হয়ে গেছে ৷ তার চোখের কোণে পানি জমে ছলছল করছে ৷ আমি চলে যাবার পরই সে কেঁদে দিবে এটা নিশ্চিত ৷ সাদিয়ার পুরো শরীরও কাঁপছিলো ৷ সে হয়তো বুঝে গেছে আমি তাকে গ্রহণ করবোনা ৷ যে কারণে এতোটা কষ্ট পাচ্ছে, যা তার অভিব্যক্তিতে টের পাচ্ছি ৷ আমার নিজেরও কষ্ট হচ্ছে সাদিয়াকে উপেক্ষা করতে, কিন্তু আমার কিছু করার নেই ৷ যার পায়ের নিচে মাটি নেই, সেই আমি অন্যজনকে কি করে নিজের সঙ্গে জরাতে পারি? ভেবেছিলাম বেকারত্বের অবসান ঘটবে, তাইতো নীলাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলাম ৷ কিন্তু আমার জীবনটা এতোটা অর্থহীন ও ছন্নছাড়া হবে ভাবিনি!
১৫ দিন পার হয়ে গেলো তবুও সাদিয়ার সঙ্গে দেখা করলাম না ৷ দেখা করতেও চাইনা ৷ আমি চাকরি খোঁজায় ব্যস্ত ৷ আজকে নতুন আরেকটা ইন্টারভিউ দিয়ে এলাম ৷ এই সপ্তাহে যে কয়টা ইন্টারভিউ দিয়েছি সবই ছিলো সাধারণ চাকরির ৷ মাসে ১৫ হাজার টাকা বেতন ৷ একটার বেতন শুধু ২০ হাজার ৷ তবুও আমার নিকট এসবই সোনার হরিণ ৷ দেখা যাক কি হয়! শেষপর্যন্ত সুখবর পেলাম ৷ একটা কোম্পানিতে চাকরির জন্য আমাকে নিযুক্ত করা হয়েছে ৷ ১তারিখ থেকে অফিসে যেতে হবে ৷ এটার বেতন ২০ হাজার টাকা ৷ তাই আমার জন্য এটা অনেক ভালো একটি জব ৷ তাই সাদরে গ্রহণ করলাম! অফিসে যাওয়া শুরু করলাম ৷ দেখতে দেখতে ১টা মাস চলে গেলো ৷ প্রথম মাসের স্যালারি পেয়ে বাবার জন্য শার্ট মায়ের জন্য শাড়ি কিনলাম ৷ আমার চাকরি হবার পর থেকে তাদের চোখে,মুখে আনন্দের ঝিলিক দেখছি ৷ আজকে তারা কাপড় পেয়ে আনন্দে কান্না করে দিলো ৷ আসলে বাবা, মা চাই তাদের সন্তান কর্মজীবনে ঢুকে পরুক, এতে সন্তানের জন্যই মঙ্গল ৷ তারা সন্তানের ভালোর জন্যই বকাবকি করে!
চাকরি পাবার পর থেকে আমি বাইরে বের হলে প্রতিবেশী কেউ আর আমার সঙ্গে বিদ্রুপ করে কথা বলতে আসেনা ৷ বরং তারা আমাকে দেখে চেহারা ঘুরিয়ে নেয়, নাহয় হিংসাত্মক চোখে তাকিয়ে আমাকে এড়িয়ে যায় ৷ আমার বন্ধু ও ক্লাসমেট অমিত আমার চাকরি পেয়ে খুব খুশি ৷ সে আমাকে টাকা ধার দেবার সময় যদিও কিছু কথা তাচ্ছিল্য করে বলতো তবে সেটা বন্ধুত্বের খাতিরেই ছিলো ৷ চাকরি পাওয়ায় সে এতোটাই খুশি যা বলার মত নয়! অফিসের লাঞ্চটাইম চলছিলো ৷ লাঞ্চ করা শেষ হলে বসের রুমে যাবার অর্ডার এলো ৷ তার রুমে যেতেই স্তব্ধ হয়ে গেলাম আমি ৷ রুমে সাদিয়া বসে আছে ৷ সে এখানে কিসের জন্য বসে আছে বুঝতে পারছিনা ৷ অবাক হয়ে গেলাম ৷
বস আমাকে একটা ফাইল ধরিয়ে দিলে আমি রুম থেকে বের হয়ে গেলাম ৷ আমার পিছু পিছু সাদিয়াও এলো ৷ আমাকে থামিয়ে দিয়ে সে তীক্ষ্ণকন্ঠে বললো,
-এতো ভাব কেন আপনার? অহংকারে দেখি আপনার পা মাটিতে নেই, আকাশে উড়ছেন ৷ আপনাকে শেষ কয়টা কথা বলেই চলে যাবো ৷ হ্যাঁ, আপনি একজন মিথ্যাবাদী ৷ আমাকে মিথ্যা বলে অপেক্ষায় রেখেছিলেন ৷ আমার প্রস্তাব পেয়ে আপনার অহংকার বেড়ে গিয়েছিলো ৷ যে কারণে আমার প্রস্তাব পেয়েও কোনো জবাব দেননি ৷ অথচ বলেছিলেন আমাকে উত্তর দিবেন ৷ শুনুন, ঐদিনই আমি বুঝেছিলাম আপনি আমাকে পছন্দ করেন না ৷ তাই আপনাকে ভোলার চেষ্টা করেছিলাম ৷ এবং ভুলেও গেছি ৷ এজন্য লেখাপড়াটা নষ্ট হয়েছে ৷ আপনাকে ভুলতে বাবা, মাকে বলেছিলাম আমি বিয়ে করবো ৷ তারা আমার বিয়ের ব্যবস্থা করেছে ৷ পাত্র অন্য কেউ নয়, যার অফিসে কাজ করছেন সেই আমার হবু বর! কেন যেনো সাদিয়ার কথাগুলো তীরের মত বিঁধলো আমার বুকে ৷ তার বিয়ে হতে যাচ্ছে কথাটা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে ৷ বুকের ভেতরে ভোঁতা কষ্ট অনুভব করছি ৷ ক্ষণিক পর ভাবলাম সে তো ঠিক কাজই করেছে ৷ আমার জন্য কেন আর অপেক্ষা করবে সে? আমি তো তাকে ফিরিয়ে দিয়েছি ৷ সে প্রতিষ্ঠিত একজনকেই ডিজার্ভ করে ৷ আমার মত মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান তার সাথে যায়না ৷ কৃত্তিম হাসি হেসে সাদিয়াকে বললাম,
-আচ্ছা, শুনে খুশি হলাম ৷ আর হ্যাঁ, আমাকে ভুলে গেছো শুনে ভালোলাগছে ৷ তোমার জীবনটা সুখে কাটুক এই আশা করি! আমার কথা শুনে সাদিয়ার চেহারাটা ফ্যাকাশে হয়ে গেলো ৷ থম মেরে রইলো ৷ আমি আর তাকে কিছু না বলে আমার কেবিনের দিকে চললাম! তিনদিন পর, বস তার বাসায় ডেকেছে আমাকে ৷ কি কারণে ডাকলো সেটা আমার জানা নেই ৷ আগ্রহ ও উৎকন্ঠা নিয়ে তার বাসায় গিয়ে উপস্থিত হলাম ৷ বস আমাকে দেখে খুশিই হলো ৷ অতঃপর, আমাকে বললো,
-সাদিয়া আমার কে হয় জানো? নিচুস্বরে বললাম,
-জানি, আপনার বাগদত্তা ৷ বস ফিক করে হেসে বললো,
-ভুল জানো ৷ সে আমার মামাতো বোন হয় ৷ আমার ১২ বছরের জুনিয়র সে ৷ তাছাড়া আমি তো বিবাহিত ৷ কিভাবে সে আমার বাগদত্তা হতে পারে? সাদিয়া হয়তো তোমাকে পরীক্ষা নিয়েছিলো ওটা বলে ৷ যাহোক, যে কথা বলতে এখানে ডেকেছি ৷ তুমি আসলেই ভাগ্যবান পুরুষ ৷ সাদিয়ার মত এতো ভালো একটা মেয়ে তোমার অপেক্ষায় পথ চেয়ে আছে এটা আসলেই তোমার জন্য গর্বের বিষয় ৷ জানো, তোমার চাকরিটা কার সুপারিশে হয়েছে? জানোনা ৷ সাদিয়ার সুপারিশে চাকরিটা হয়েছিলো ৷ সে তোমার ক্লাসমেট অমিতের থেকে তোমার সম্পর্কে অনেক তথ্য জেনে নিয়েছিলো ৷ সে জানতে পারে যে তুমি এখনো বেকার ৷ এটা জেনে অমিতকে বলেছিলো যে তুমি যেনো আমার অফিসে চাকরির আবেদন করো ৷
অমিত তোমাকে আমার অফিসে চাকরির জন্য আবেদন করতে বললে তুমি আবেদন করো ৷ আবেদন করা হলে সাদিয়া আমাকে জানায় আমি যেনো অর্ণবকে নিযুক্ত করি ৷ মূলত সাদিয়ার কারণে তুমি চাকরিটা পেয়েছো ৷ যদিও তোমার স্কিল অনেক ভালো ৷ সব মিলিয়ে তুমি আমাদের অফিসের জন্য যোগ্যই ছিলে ৷ তবে, এতোকিছুর জন্য সাদিয়াই আসল হিরো ৷ সে তোমার থেকে ধন্যবাদ কামনা করে ৷ আমি আজকে তোমার থেকে এতোটুকু জানতে চাই যে সাদিয়াকে তুমি কি সত্যিই ভালোবাসোনা? সে তোমাকে এতো ভালোবাসে, অথচ তার প্রতি তোমার মনে এতোটুকু অনুভূতি নেই? বসের মুখ থেকে সাদিয়া সম্পর্কে এতোকিছু শুনে দু চোখে জল এসে গেলো ৷ সাদিয়া যে আমাকে অনেক ভালোবাসে সেটা আমি জানি, কিন্তু এতোটা ভালোবাসে জানা ছিলোনা ৷ বসকে ছলছল চোখ নিয়ে কাঁপা কন্ঠস্বরে বললাম,
-একটা মেয়ে আমাকে পাবার জন্য ৪টা বছর ধরে অপেক্ষা করছে তাকে ভালো না বেসে থাকা সম্ভব? সে যখন ৪ বছর পর আমাকে দেখতে পেয়ে মনের কথা পুনরায় প্রকাশ করলো সেদিনই তাকে ভালোবেসে ফেলি ৷ কিন্তু তাকে গ্রহণ করতে পারিনি বেকারত্বের কারণে ৷ নিজের অনিশ্চয়তার জীবনে তাকে জড়াতে চাইনি ৷ যখন চাকরি পেয়ে গেলাম তখন ভেবেছিলাম সাদিয়াকে আমি আপন করে নেবো ৷ কিন্তু তখন কেন যেনো মনে হলো যে মানুষটাকে এতদিন উপেক্ষা করে চলেছি সে কি আদৌ আমাকে গ্রহণ করবে? এটা ভেবে আর সাদিয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় নি ৷ কিন্তু এখন আর তাকে দূরে ঠেলে দিবোনা ৷ তাকে হাতজোর করে বলবো সে যেন আমাকে আপন করে নেয়! আচমকা রুমের ভেতরে সাদিয়া প্রবেশ করলো এবং চেঁচানো গলায় বললো,
-কিন্তু আমি তো আপনাকে আর চাইনা ৷ আপনি কখনই আর আমার সামনে আসবেন না ৷ আমি একা ছিলাম একাই থাকবো ৷ কারো দরকার নেই আমার! কথাটি বলেই সাদিয়া রুম থেকে বের হয়ে গেলো!
বসের বাসা থেকে বিষন্ন মন নিয়ে চলে আসলাম ৷ ঐদিন পর থেকে সাদিয়ার দেখা মেলেনি আর ৷ তার অপেক্ষায় পথ চেয়েছিলাম, কিন্তু তার দেখা পাইনি ৷ এখনো তার অপেক্ষায় প্রহর গুণছি ৷ জানিনা তার দেখা পাবো কিনা ৷ আমরা আসলে কারো কারো ভালোবাসা পেয়েও নিজেদের ভুলের কারণে সেই ভালোবাসার মানুষটাকে হারিয়ে ফেলি ৷ অনেক সময় ভালোবাসার সঠিক মূল্যায়ন করিনা ৷ সাদিয়ার ভালোবাসাকে আমি উপেক্ষা করেছি ৷ আজ তার ভালোবাসা পাবার জন্য কাঙ্গাল হয়ে আছি ৷ অথচ সে আসছেনা আমার জীবনে ৷ যদি তাকে আগে থেকে গ্রহণ করতাম তার ভালোবাসাকে মূল্যায়ন করতাম তাহলে হয়তো আমাকে এতোটা কষ্টে দিন যাপন করতে হতোনা ৷ সাদিয়া আমাকে দূরে ঠেলে দেবার পর কোনো কিছুতে মন বসাতে পারিনি ৷ অফিসে মন বসেনি, মাস্টার্স পরীক্ষাও দিতে পারিনি ৷ আমার অবস্থান এখন রাস্তাঘাট ৷ বাউন্ডলে জীবন আমার সঙ্গী! জরাজীর্ণ, উসকোখুশকো চুল নিয়ে ছেঁড়া কাপড় গায়ে দিয়ে ঘুরিফিরি আমি ৷ লোকে বলে আমি নাকি পাগল! আমার পাগল হবার পিছনে মূল কারণ সাদিয়া ৷ তার অপেক্ষায় ছিলাম আমি, কিন্তু সে আসেনি ৷ আজ এক বছর হলো তার দেখা নেই ৷ জানিনা সে ফিরবে কিনা!
আজ আকাশ ভর্তি কালো মেঘ ৷ বৃষ্টি নামবে নামবে ভাব ৷ পরিবেশটা গম্ভীর হয়ে রয়েছে ৷ আমি আজকে চুল কেটেছি, গায়ে নতুন পোশাক জরানো ৷ আমার বন্ধু অমিত এসব করেছে ৷ আজকে নিজেকে পাগল মনে হচ্ছেনা ৷ অমিতের ছোট ভাইয়ের চায়ের দোকানের বসে আছি ৷ আজকে কেন যেন একটু বেশিই সাদিয়াকে মনে পরছে ৷ একটা বছর ধরে ছন্নছাড়া জীবন নিয়ে আছি ৷ এতে বাবা, মা বেশি কষ্টে আছে ৷ তারা আমার জন্য প্রতিনিয়ত কান্না করে ৷ অথচ আমার কিছু করার জো নেই ৷ মনে হয় আমি শেষ হয়ে গেছি ৷ আচমকা ঝুম বেগে বৃষ্টি নামা শুরু হলো ৷ চা স্টলে বসে না থেকে দৌঁড়ানো শুরু করলাম ৷ দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে আচমকা থেমে গেলাম আমি ৷ কেউ একজন আমার সামনে বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো ৷ তার জন্য দৌঁড়ানো বন্ধ করেছি ৷ এদিকে মুহূর্তের মধ্যে ভিজে গেলাম ৷ আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে নীল শা়ড়ি পরা একটি মেয়ে, তার চেহারার দিকে তাকাইনি ৷ ধীরেধীরে চেহারা উঁচু করতেই দেখি ছাতা দিয়ে চেহারা ঢাকা একটি মেয়ে দাঁড়ানো ৷ চেহারা না দেখেও কেন যেন তাকে খুব চেনাচেনা মনে হলো ৷ আমি তাকে উপেক্ষা করে হাঁটতে লাগলাম ৷ ওমনি মেয়েটি আমার হাত ধরে কাতরকন্ঠে বললো,
-আজকেও আমাকে এড়িয়ে যাবে? এতোটা নিষ্ঠুর তুমি? আমাকে প্রায় ৫টা বছর ধরে দূরে ঠেলে দিয়েছো বলে রাগে অভিমানে তোমার জীবন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলাম ৷ আজকে সব রাগ অভিমান ভুলে তোমার কাছে চলে এলাম, অথচ তুমি সেই আগের মত ব্যবহার করছো?
পিছন ফিরে তাকাতেই নিস্তব্ধ হয়ে গেলাম ৷ পরক্ষণে খুশির আতিশয্যে নিজেকে শামলাতে না পেরে সাদিয়াকে জড়িয়ে নিলাম ৷ সে কাঁদছে ৷ ফুঁপিয়ে কাঁদছে ৷ কাঁদতে কাঁদতে তার হাতের ছাতা মাটিতে পরে গেলো ৷ সে ভিজতে লাগলো, তবুও কান্না থামলোনা ৷ অঝোর ধারায় তার চোখের জল বিয়োগ হচ্ছে ৷ বৃষ্টির পানিও ঝরছে অবিরাম ধারায় ৷ আমিও ঝরাতে লাগলাম বারিধারা, তবে আনন্দে, প্রিয়জনকে কাছে পাবার আনন্দ আমাকে কাঁদতে বাধ্য করলো ৷ বৃষ্টি, আমি ও সাদিয়া প্রতিযোগিতা করছি জলবর্ষণে ৷ সাদিয়াকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে ভিজতে অসম্ভব ভালোলাগছে ৷ অশ্রু ঝরাতেও ভালোলাগছে ৷ বৃষ্টিবিলাসে দুজনে অশ্রু ঝরিয়ে দুঃখগুলোকে ধুয়ে মুছে ফেলছি!

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত