লিলিথ

লিলিথ
মাহমুদ দাঁড়িয়ে রইলো সিঁড়ির গোড়ায়। ভদ্রমহিলা সিঁড়ি বেয়ে নামবেন কাটায় কাটায় সাতটা বেজে ত্রিশ মিনিটে। ভদ্রমহিলার বয়স ত্রিশ- একত্রিশ। চিকন স্বাস্থ্য, লম্বাটে মুখ। কপালের ডানপাশে একটা খাড়া কাটা দাগ। ডান ভ্রুঁ থেকে সোজা উপরে উঠে গিয়েছে দাগটা। এই নারীর দুই চোখে দলা দলা আত্মবিশ্বাস ঠেসে ভরে দিয়েছেন ঈশ্বর। মৃত শুষ্ক ডালে অঙ্কুর গজিয়ে দেওয়ার মতোন প্রস্ফুটিত শুদ্ধ দৃষ্টি। মাহমুদ শার্টের হাতা গুটিয়ে অপেক্ষা করলো। লিলি পছন্দ করে। এই সপ্তাহখানেক আগে সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে ভ্রুঁ কুঁচকে ব্যাগ হাতে জড়িয়ে বলেছিলো, ‘আজকে শার্টের হাতা গুটাওনি?’ ভদ্রমহিলার নাম লিলি।
মাহমুদ ঘড়ি দেখলো। সাতটা বেজে একত্রিশ মিনিট। ঠক করে দরজায় আওয়াজ পেল সে। চনমনে হয়ে উঠলো মুহূর্তেই। ভদ্রমহিলাকে বুঝতে দেয়া যাবেনা, রোজ ভোর সাড়ে সাতটার এলার্ম দিয়ে সিঁড়ির গোড়ায় কোনো এক ছুতো ধরে দাঁড়িয়ে থাকার একমাত্র কারণ তিনি নিজে। যে জানার জানে, অথচ কেউ জানায় না। লিলি সিঁড়ির গোড়ায় রোজ কোনো এক ছুতো ধরে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটিকে দেখে হাসলো মুখটিপে। ছেলেটির নাম, মাহমুদ। বয়স বাইশ- তেইশ হবে। বাড়িওয়ালার বড় ছেলে। ওদের নিচের ফ্ল্যাটে থাকে। সারাদিন ভুত প্রেতের ছবি আঁকে। এই তথ্য জেনেছে সে অর্ণিশার কাছে। অর্ণিশা লিলির একমাত্র মেয়ে। মাত্র ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হলো। অর্ণিশার সাথে বাড়িওয়ালার বেশ ভাব। অর্ণিশা তাকে ডাকে দাদাই। মাহমুদ অকারণে শার্টের হাতা ধরে টানাটানি করে বললো,
‘অফিস কেমন চলছে আপনার?’
‘বেশ ভালো। তোমার ক্লাস?’
‘জি ভালো।’ ‘শার্টের হাতা ছাড়ো, ছিঁড়ে যাবে তো।’ লিলির ঠোঁটে হাসি। মুখটিপে হাসলো সে। মাহমুদ প্রচণ্ড বিব্রতবোধ করলো। ওর বিব্রতবোধ কমাতেই বোধহয় লিলি পা বাড়ালো সামনে,
‘আসি?’
‘আচ্ছা’
লিলি নেমে গেল সিঁড়ি বেয়ে। মাহমুদ দাঁড়িয়ে রইলো যতক্ষণ অবধি দেখা যায় তার মেরুন রঙা শাড়ির আঁচল। এইটুকুনই কথা হয় রোজ তাদের। মাহমুদ বাসায় ফিরে এলো। রুমে ঢুকে কালার প্লেট হাতে নিয়ে দ্রুত ছুটে গেলো। একটা আঁচল চোখে ভাসছে। এটি তুলে ফেলতে হবে। দ্রুত তুলির প্রলেপ লাগাতে শুরু করলো শুভ্র কাগজে। শেষ হওয়ার পর মুগ্ধ চোখে তাকালো। এতটা স্পষ্ট হবে ভাবেনি। মাহমুদ বিছানায় শুয়ে চোখ বুজলো ক্লান্তিতে। এখন একটু ঘুমোনো দরকার। দরজায় চোখ পড়তেই টের পেলো একজোড়া বাচ্চা বাচ্চা চোখ তাকে দেখছে। লুকিয়ে। মাহমুদ হাসলো। অর্ণিশা। এই মেয়েটি সারাদিন খেলবে বাবার সাথে। দাদাই দাদাই করে বাসা মাথায় তুলবে। শুধু মাহমুদের সামনে চুপচাপ। কোনো এক অজানা কারণে লজ্জিতও। এই বাচ্চা মেয়ের লজ্জার কারণ সে ধরতে পারেনা।
‘ভেতরে আসো’ দরজার কাছ থেকে এক জোড়া চোখ সরে গেল দ্রুত। মাহমুদ অপেক্ষা করলো। একটু পর আবার উঁকি দেবে। তখন খপ করে ধরে ফেলতে হবে। অর্ণিশা আরেকবার উঁকি দিলো একটু পর। মাহমুদের চোখ বুজে এলো ঘুমে। ‘আম্মু, দাদাই বলছে বাবাই সারাদিন গাধার মতোন ঘুমায়।’ লিলি আঁতকে উঠলো। দাদাই নামটা আগে শুনেছে সে। মাহমুদের বাবা। বৃদ্ধ লোকটা যথেষ্ট কাঠখোট্টা আর মায়াদয়াহীন মানুষ। এমন একটা ধারণা তখন জন্মালো যখন লিলি এই বাসা ভাড়া নিতে এসেছিলো। বৃদ্ধ চোখ ছোট করে জিজ্ঞেস করলো,
‘হাসবেন্ড?’
‘ডিভোর্স হয়েছে।’
সমাজ কোনো নারীর মুখে ‘ডিভোর্স হয়েছে’ শুনে যে দৃষ্টিতে তাকায়, বৃদ্ধও ঠিক অবিকল ‘নিশ্চয় এই মেয়ের কোনো কিন্তু আছে’ টাইপের দৃষ্টিতে তাকালো লিলির দিকে। লিলি চোখে চোখ রেখে বললো, ‘আমার মেয়ের স্কুল এখান থেকে কাছে হবে। দূরেও বাসা নিতে পারবো। এই বাসা দেখছি মেয়ের জন্য। আপনি দয়া করে আপনার জাজমেন্টাল চোখ দুটো বুজুন। আমি আপনার বাসা ভাড়া নিতে এসেছি, শরণার্থী থাকতে নয়।’ এমন একটা কড়া কথা শুনিয়ে দেওয়ার পর বৃদ্ধের কাছ থেকে প্রত্যাশিত যে জবাবটা ছিলো, ‘আপনি এখন আসতে পারেন।’ অথচ লিলি শুনলো, ‘বাসায় কবে উঠছেন?’ বৃদ্ধের এখন সারাদিন কাটে অর্ণিশার সাথে। অর্ণিশা দাদাই ডাকে। কিন্তু বাবাই? লিলি মেয়ের দিকে সরু চোখে তাকিয়ে বললো, ‘অর্ণিশা, বাবাই কে?’ অর্ণিশা নরম ছোট্ট হাত দুটো নাড়িয়ে বললো, ‘দাদাইয়ের বাসায় থাকে যে। ভুত পেতের ছবি আঁকে যে।’ অর্ণিশা আঁতকে উঠলো। চোখ পাকিয়ে ধমক দিলো।
‘ছিঃ বাজে কথা বলেনা। যাকে তাকে বাবাই ডাকতে হয়না।’
‘ডাকবো’
‘ডাকবা না’
‘ডাকবো’
লিলি হতাশ হলো। এই মেয়ে জিদ পেয়েছে তার। তাও ভালো জিদ না। লিলির রাগ হলো। ‘কেউ শিখিয়ে দিয়েছে তোমায় বাবাই ডাকতে?’ ‘না’ ‘সত্যি করে বলো’ ‘বাবাই কি সুন্দর আঁকে ঠাস করে একটা চড় বসালো লিলি। অর্ণিশা বাবার রঙ পেয়েছে। ফর্সা। টুকটুকে লাল হয়ে এলো ক্ষণিকেই বাম গালটা। টু শব্দও করলোনা মেয়েটি। চড় খেয়ে বিছানায় গিয়ে কোলবালিশ বুকে নিয়ে শুয়ে পড়লো ওপাশ ফিরে। লিলির বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো।
অর্ণিশা একদম কারো সামনে কাঁদেনা। এইটুকুন একটা বাচ্চা। কি ভয়ংকর অভ্যাস পেয়েছে। লুকিয়ে কাঁদা। এখন কোলবালিশ ভেজাবে চুপিচুপি। কাঁদুক। লিলি বারান্দায় বসে রইলো চুপচাপ। একদম বিছানায় যাবেনা সে। বেশি বাড় বেড়েছে। রাত সাড়ে এগারোটায় অষ্পষ্ট কাতরানোর শব্দে ঘুম ভেঙে গেল লিলির। দ্রুত অর্ণিশার গায়ে হাত দিয়ে চমকে উঠলো সে। বুকের ভেতর ধড়াস ধড়াস হাতুড়ি পেটা শুরু হলো। অর্ণিশার গা পুড়ে যাচ্ছে। জ্বরের ঘোরে বিড়বিড় করছে কি যেন। লিলির সারা গায়ে ঘাম দিলো। দৌঁড়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পানিভর্তি বালতি নিয়ে এলো। কাপড় ভিজিয়ে জলপট্টি দিতে শুরু করলো। গালে হাত রেখে জাগানোর চেষ্টা করলো, ‘আম্মু অর্ণিশা জ্বরের ঘোরে হাত সরিয়ে দিলো তার। মোবারক সাহেব দৌঁড়ে গেইট পার হলেন।
স্যান্ডেল না পরেই ছুটলেন। সামনের মোড়েই একটা ডিসপেনসারি খোলা থাকে সারারাত। ডাক্তার পাওয়া যায় কি-না জানা নেই। একটা বাচ্চার এই রকম জ্বর এত বৎসর বয়সের দীর্ঘ জীবনেও তিনি কখনো দেখেন নি। মাহমুদের ফোন বন্ধ। আজ ওর কোনো এক বন্ধুর জন্মদিন। রাতে ওখানে থাকবে বলে বাসা থেকে বের হয়েছে। কিন্তু ফোন বন্ধ কেন?
মোবারক সাহেব অসহায়বোধ করলেন। রাত সাড়ে এগারোটায় এই শহরে একটা মানুষ এমন অসহায়বোধ করতে পারে, জানা ছিলোনা তার। মাহমুদ ফিরলো সকাল সকাল। বাসায় কেউ নেই। উপরের ফ্ল্যাট থেকে লোকজনের আওয়াজ আসছে। লিলির বাসা। মাহমুদের বুক কেঁপে উঠলো। সিঁড়ির রেলিং ধরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো সে। উপরে উঠার সাহস পেল না।
নিচের ফ্ল্যাটের বরকত আংকেলকে আসতে দেখা গেলো উপর থেকে। মাহমুদকে শুকনো মুখে সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি বললেন, ‘রাতে কোথায় ছিলে? উপরে যাও। তোমার বাবা ডাকছেন।’ ‘কি হয়েছে?’ ‘ওই যে তোমাদের উপরের ফ্ল্যাটের মেয়েটা, বাচ্চার জ্বর উঠেছিলো রাতে। সে কি জ্বর বাপরে।’ মাহমুদ দমে গেলো। সারা গায়ে ঠাণ্ডা একটা শিহরণ কাঁপিয়ে দিয়ে গেলো তাকে। কাঁপা কাঁপা স্বরে জিজ্ঞেস করলো, ‘জ্বর কমেছে?’ বরকত আংকেল মাথা দুলালেন। বুকে আটকে রাখা শ্বাসটা যেন প্রাণ ফিরে পেল। জ্বর কমেছে। উফফ। মাহমুদ জোরে জোরে কয়েকবার শ্বাস ফেললো। তারপর উপরে উঠে এলো। মোবারক সাহেব দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলো, মাহমুদ এগিয়ে যেতেই ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিলেন গালে।
মাহমুদের মাথা ঘুরে গেলো। কানে চিন চিনে একটা ব্যথা টের পেলো সে। ব্যথা ছাপিয়ে মোবারক সাহেবের গলার স্বর শুনতে পেলো, ‘দরকারের সময় ফোন বন্ধ থাকলে ওই ফোন তোমার ইউজ করা লাগবে কেন? এখুনি আছাড় দাও ওটা। দাও বলছি।’ মোবারক সাহেব বলে ক্ষান্ত হলেন না। পকেট হাতিয়ে মোবাইল বের করে কথার সত্যতা প্রমাণ করলেন। সিঁড়ির গোড়ায় ছুঁড়ে মারলেন। বাবাকে এতটা রেগে যেতে আর কখনো দেখেনি মাহমুদ। ভয়ে ভয়ে সে রুমে প্রবেশ করলো। বিছানায় অর্ণিশা শুয়ে আছে। চোখ পিটপিট করে তাকাচ্ছে চারোপাশে। বিছানা ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় জনা দশেক নারী পুরুষ। মোবারক সাহেব রুমে প্রবেশ করে দাঁড়িয়ে অর্ণিশার কপাল চেক করলেন আরেকবার। চেক করে সন্তুষ্ট মনে হলো তাকে। জনা দশেক নারী পুরুষ থেকে একটু দূরত্ব নিয়ে ঘরের কোনায় দাঁড়িয়ে আছে লিলি। চোখ দুটো ফোলা তার।
মোবারক সাহেব লিলির দিকে তাকাচ্ছেন না। ইতিমধ্যে কয়েকবার চড়া গলায় বলেছেন, ‘বাচ্চা একটা মেয়ে। কাকে কি ডাকবে কোনো চিন্তা ভাবনা আছে ওর? কিছু বুঝে এখনো? এইরকম দুধের বাচ্চাকে চড় দেয় কেউ এমন তুচ্ছ কারণে! আমি ছোটবেলায় ঠাণ্ডাকে গরম বলতাম, গরমকে ঠাণ্ডা। ইডিয়ট।’ মোবারক সাহেব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এইরকম ইডিয়ট হৃদয়হীন নারীর সাথে তিনি পুরো একমাস কথা বলবেন না। মাহমুদ গিয়ে অর্ণিশার পাশে বসলো। অর্ণিশা লজ্জা পেলো। মাহমুদ ভেবে পায়না এই ছোট বাচ্চা অকারণেই কেন তাকে এত লজ্জা পাবে। অর্ণিশা মুখ ঘুরাতেই বাম গালে চোখ গেলো তার। বুকটা ধক করে উঠলো। নরম টুকটুকে গালটা লাল হয়ে আছে। মাহমুদ একবার লিলির দিকে তাকালো। অর্ণিশা খিলখিল শব্দে হেসে উঠলো। মাহমুদের বাম গালও টুকটুকে লাল। সন্ধ্যের দিকে ছাদে এসে চমকালো মাহমুদ। রেলিং ধরে লিলি দাঁড়িয়ে। উদাস দৃষ্টি। মাহমুদ খুক খুক করে কেশে উঠতেই ফিরে তাকালো। ‘সন্ধ্যেবেলায় তুমি রোজ ছাদে আসো নাকি?’
মাহমুদ মাথা দুলালো। সন্ধ্যের দিকে ছাদে থাকার সুবিধে হচ্ছে, লিলি বাসায় ফিরছে কিনা স্পষ্ট দেখা যায়। মাহমুদ এখানে বই হাতে নিয়ে দাঁড়ায় রোজ সন্ধ্যায়। সিঁড়ির গোড়ায় সকাল সন্ধ্যা দাঁড়িয়ে থাকলে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় থাকবে। তাই এই ব্যবস্থা। কিন্তু আজ এখানে লিলিকে দেখতে পাবে ভাবেনি। জিজ্ঞেস করলো, ‘আপনার অফিস?’ ‘যাইনি। আজকে ছুটি নিয়েছি। অর্ণিশা পুরোপুরি সুস্থ হোক।’ মাহমুদ রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে রইলো। লিলি বিব্রতস্বরে বললো, ‘আমি আসলে দুঃখিত, তুমি কিছু মনে কোরোনা অর্ণিশার কথায়। ও এখনো বুঝেনা কিছু। ছোট তো।’ মাহমুদ হাত নাড়ালো,
‘না না। সে কি কথা। আমি কিছু মনে করিনি। আমার ভালো লাগে বরং। ডাকুক।’ লিলি তাকিয়ে রইলো। মাহমুদ ভ্রুঁ কুঁচকালো। আবেগের আতিশয্যে বেশিকিছু বলে ফেলেনি তো! লিলি জিজ্ঞেস করলো,
‘এটা কি বই?’
‘লিলিথ’
‘ওহ। আমার খুব প্রিয়। তুমি বিশ্বাস করো রুপকথায়?’
‘উহু’
‘তবে?’
‘লিলিথকে আঁকার চেষ্টা করছি গত তিন বৎসর ধরে। এখনো পর্যন্ত সন্তুষ্ট হতে পারিনি। একটা কাল্পনিক চরিত্র ঠিক যেন তুলিতে আসেনা। প্রচুর পড়ি। হয়তো একদিন এঁকে ফেলবো।’ ‘বিশ্বাস না করলে আঁকতে পারবানা। আঁকলেও প্রাণ থাকবেনা ওতে। তোমরা হচ্ছো গিয়ে আর্টিস্ট। প্রাণ কি ভালো করেই বুঝার কথা। নাকি?’ লিলি মিষ্টি হেসে তাকিয়ে থাকে মাহমুদের দিকে। এই ছেলেটি তাকে লজ্জা পায়। তবে এখন লাজুক ভাবটা কেটে যাচ্ছে দিন দিন। মাহমুদ বইটা হাতে নাড়িয়ে চাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো,
‘একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করার অনুমতি দিন..’
‘দিলাম।’
‘অর্ণিশার আব্বু.. কেন? আই মিন, ছেড়ে এলেন কেন?’
লিলি হাসলো। ছোট বাচ্চার পাকনামোসমেত প্রশ্নে বড়রা যেভাবে হাসে। ঠিক ওইভাবে হেসে ডানহাতের আঙুল কপালের ডানপাশে ইশারা করে বললো, ‘এটা উপহার দিয়েছিলো বলে।’ মাহমুদ কপালের ডানপাশে তাকিয়ে চুপ করে থাকে। একটা নিশ্চুপ সন্ধ্যা নামে ছাদের কোনায়। রেলিঙ-এ মেশে গাঢ় অন্ধকার। লিলির কন্ঠস্বর ভেসে আসে আঁধার ভেদ করে, ‘মাহমুদ। এখানে আসার কিছুদিনের ভেতর আমি বুঝতে পারি তুমি পছন্দ করো আমায়। এড়িয়ে গিয়েছি। লেগে থেকেছো। তারপরও এড়িয়ে গিয়েছি। স্বর্গে আমার লোভ নেই। রাতে অর্ণিশার জ্বর এলো। কিছুক্ষণের মধ্যে ডাক্তার এলো। পুরো ঘর লোকজনে ভর্তি। আংকেল আমার মাথায় হাত রাখলেন। বললেন, ঠিক হয়ে যাবে। অর্ণিশার লালচে গাল দেখে আমার দিকে ভয়ংকর রেগে তাকালেন।
আমার কাঁদতে ইচ্ছে হলো। এমন মমতার খোঁজ সবাই পায়না। আমি পাই। আমার ঘরের দরজায় এসে জমে ওইগুলো। আমার কুড়োতে ইচ্ছে করেনা। মাহমুদ, তুমি যে স্বর্গ দিতে চাচ্ছো আমায়- ওই স্বর্গ আমি ছেড়ে এসেছি বহু আগে। এই আমার জগত। হোক নরক, তবু আমার। এইখানে আমাকে ঝুঁকতে হয়না। পায়ে শৃঙ্খল নেই। কপালের ডানপাশে নতুন কোনো ক্ষত নেই। বুঝেছো?’ লিলি থামলো। মাহমুদ রেলিঙ দু’হাতে মুঠো করে ধরে তাকিয়ে রইলো। বোবা বিষাদ আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরলো যেন তাকে। গাঢ় অন্ধকারে লিলির চোখ দেখতে পেল না সে। মাহমুদ তুলি হাতে নিয়ে আড়চোখে দরজার দিকে তাকালো। অর্ণিশা উঁকি দিচ্ছে। সেই পুরনো পরিচিত এক জোড়া কৌতুহলী চোখ। মাহমুদ ডাকলো, ‘অর্ণিশা, আঁকতে পারো তুমি?’ অর্ণিশা আজ সরলোনা দরজা থেকে। দরজা ধরে শরীরের অর্ধেক আড়াল করে দাঁড়িয়ে রইলো। মাহমুদ ঠিক বুঝতে পারলো, অর্ণিশার আঁকাআঁকিতে বেশ আগ্রহ।
‘আসো, ভেতরে আসো পা টিপে টিপে ঢুকে অর্ণিশা হা করে চারোপাশ তাকালো। এই রুমের সমস্ত দেয়াল জুড়ে মাহমুদের হাতে আঁকা ছবি টাঙানো। বড় একটা ছবি বিছানার মাথার কাছেই। একটা কালো নারী। চার হাত। মানুষের বুঝি চার হাতও হয়! অর্ণিশা কৌতুহলী চোখে বললো, ‘বাবাই, ওটা ভুত? কামড়ায় মানুষকে?’ মাহমুদ ঢোক গিললো। মেয়েটি ‘বাবাই’ ডাক অব্যাহত রেখেছে। শুনতে ভারী মিষ্টি লাগলেও মাহমুদ ভয় পেলো লিলির জন্য। আবার কোন দিন না জানি চড় খাবে মেয়েটা। অর্ণিশা বসে পড়েছে বিছানায়। মুখ উঁচু করে তাকিয়ে আছে ছবিটির দিকে। মাহমুদ বললো,
‘ওটা ভুত না। দেবী।’
‘দেবীর হাতে কি?’
‘খঞ্জর। দুষ্টুলোককে ব্যথা দেওয়ার জন্য। ওই যে দেখো অন্যহাতে দুষ্টুলোকের মাথা।’ অর্ণিশা চোখ বড় বড় করে তাকায়।
‘দাদাই বলে ওগুলো ভুত পেত?’
‘দাদাই ভুত পেত চেনেনা। তুমি লিলিথের সাথে পরিচিত হবে? চলো, হাই হ্যালো করবে একটু..’
‘না। লিলিথের গপ্প শুনেছি আমি। লিলিথ কারো কথা শুনেনা। খুব খারাপ। ম্যাম বলেছে। রাতে না ঘুমালে লিলিথ এসে বাচ্চাদের পা ধরে টেনে নিয়ে যায়।’
মাহমুদ হাসলো। গতরাতে লিলিথের ছবিটা এঁকে শেষ করেছে সে। শীঘ্রই এটা বিছানার মাথার কাছে টাঙাবে। কালীর ছবিটা ডানপাশে সরানো হবে। মাহমুদ ছবিটা বের করলো। একটা রপবতী নারী বসে আছে কাঁটাখচিত অপরুপ কোনো এক সিংহাসনে। নারীর কনুইয়ে রক্তের দাগ। চোখ দুটো তার গাঢ় সৌন্দর্যে ভরপুর। পায়ের উপর পা তুলে বসে লিলিথ তাকিয়ে আছে সামনে। অদূরে কিছু নারী চুমু খাচ্ছে পুরুষের পায়ের তলায়। লিলিথের ঠোঁটে এক চিমটি হাসি। ‘অর্ণিশা, তোমার ম্যামের গল্প বিশ্বাস কোরোনা। তোমার দাদাইয়ের গল্পও না। ওরা তোমার জন্য গল্প বানায়। তোমার আম্মুকে জিজ্ঞেস কোরো। এই গল্প তোমার আম্মু জানেন।’ ‘সত্যি?’ মাহমুদ উঠে কালীর ছবিটা ডানপাশে সরিয়ে লিলিথকে মাথার কাছে টাঙিয়ে দিলো। অর্ণিশাও দাঁড়িয়েছে বিছানায়। দুই জন দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইলো ছবিটার দিকে। দরজায় নক করলো কেউ। নিশ্চয় বাবা। অর্ণিশা কিছুক্ষণ চোখের আড়াল হলে তার শ্বাসকষ্টের মতোন হয়। মাহমুদ ঘাড় না ঘুরিয়েই বললো, ‘অর্ণিশা আজ খেলবেনা বাবা। ছবি আঁকবে। তুমি যেতে পারো।’
ঘাড় ঘুরাতেই চমকালো। আজ সারাদিন চমকেছে সে। দরজায় লিলি দাঁড়িয়ে। এই প্রথমবার বাসায় এসেছে। তাও একদম মাহমুদের রুমে। মাহমুদ বিছানা থেকে চটজলদি নামতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লো। লিলি আঁতকে উঠে বললো, ‘ব্যস্ত হয়োনা রে বাপ.. আস্তে’ মাহমুদের পুরো ঘর এলোমেলো। ভারী লজ্জা পেল সে। একটা চেয়ার নেই এই রুমে। বিছানা চট করে কিছুটা গুছিয়ে বললো, ‘বসুন’ লিলি দাঁড়িয়ে রইলো। তার দৃষ্টি বিছানার মাথার দেয়ালে টাঙানো ছবিটার দিকে। লিলিথ। দাদাই ডাকতেই অর্ণিশা দ্রুত ছুটে বেরিয়ে গেল রুম ছেড়ে। মাহমুদ লাজুক মুখে দাঁড়িয়ে রইলো। লিলি ছবিটার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘রুপকথা বিশ্বাস করো?’
মাহমুদ হাতের আঙুলে তুলি নাড়িয়ে লাজুক মুখে তাকায়। লিলি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। এই ছেলেটির তুলির মাথায় ঈশ্বর। মাথার কাছে দেয়ালে টাঙানো ছবিটায় লিলিথ তাকিয়ে আছে অদূরে। দুই চোখ তার গাঢ় সৌন্দর্যে ভরপুর। লিলিথ বসে আছে কাঁটাখচিত একটা সিংহাসনে। কনুইয়ে রক্তের ছাপ আর কপালের ডানপাশে খাড়া কাটা একটা দাগ। বিছানায় বসে থাকা লিলিথ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো মাহমুদের দিকে একবার। নিশ্চুপ। মাহমুদ চোখ বুজলো। যা আছে চুপকথা- পৃথিবীতে রুপকথা বলে কিছু নেই।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত