নীরা আপু

নীরা আপু
“জানিস,আমি ব্রাশ করার জন্য জন্য ব্রাশে টুথপেস্ট লাগাচ্ছিলাম।তখন টুথপেস্ট এর ক্যাপ টা হাত থেকে পড়ে গেসিলো, বুঝেছিস।আমি নিচু হয়ে যেই না ক্যাপ উঠাবো এক বড়সড় ধাক্কা খেলাম,এ দেখি মাকড়সা!আব্বু আম্মু বিকট এক আওয়াজ শুনেন।আওয়াজটা কিন্তু আমার আর মাকড়সার হঠাৎ ধাক্কায় সৃষ্টি হয়নি যেমন টা সিনেমায় নায়ক নায়িকাদের ক্ষেত্রে।এই বিকট আওয়াজ আমার চিৎকার এর ছিলো!”
একবার কোনো এক কারনে আমার মন খারাপ ছিলো।নীরা আপু আমাকে কিছু না বলেই এই জোক্সটা বললেন।মন খারাপ হলেই নীরা আপু ধরে ফেলেন।আপুর এই অসাধারণ ক্ষমতা আমার ভিষন ভালো লাগে।পাশেই স্মৃতি আপু বসে ছিলেন,আপুর ব্যাচমেট; বেশ সৌহার্দপূর্ণ ছিলেন দুজন ।তিনি টাস করে বলে উঠলেন “তুই মাকড়সা কে নায়ক বলেছিস?শরীরে একটা এনে ছেড়ে দেই?কিলবিল করে হাটবে” আপু তখন বাংলা সিনেমার মতো “নায়ায়ায়া” বলে উঠে। আপুর এই এক্টিং দেখেই আমি ফিক করে হেসে দেই। আপু তখন বলেছিলেন “শোন তুবা, কখনো মন খারাপ করবি না, মন খারাপ বাজে জিনিস।তুই মন খারাপকে লাই দিলেই বার বার এসে তোর দড়জায় দাঁড়াবে, তুই ফিরাতে পারবি না।কোনো কারনেও ভুলেও মন খারাপ করবি না।সব সময় ফুরফুরে মেজাজে থাকবি,মন খারাপ তোকে ছুঁতে পারবে না।যার জন্য তুই মন খারাপ করবি সে কি দেখে??বুঝে??তার গায়ে লাগে??তাহলে তো তোকে মন খারাপ করতে দিতো না বাবু।যত যাই হোক, মন খারাপ করবি না,বুঝেছিস!?”
আপুর এই কথা আমি মনে প্রানে মেনে চলার চেষ্টা করি, তবে মাঝে মাঝে ব্যর্থ হই! । হলের কয়েকটা সিনিয়র আপু বেশ জালাতন করতো, তার উপর হলের পরিবেশ আমার বেশ পছন্দ ছিলো না।এভাবে কেউ থাকে?কেমন বস্তি বস্তি।তার উপর সিনিয়র আপুদের জ্বালা।এ নিয়ে বেশ বিরক্ত হয়ে পড়েছিলাম একবার,ততদিনে অবশ্য হলের পরিবেশের সাথে কিছুটা মানিয়ে নিতে পেরেছিলাম নিজেকে।তবুও অস্বস্তি লাগতো মাঝে মাঝে।নীরা আপু একদিন হুট করেই এসে বলে বসলেন “বাসায় উঠবি বাবু?” আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম “কার বাসায় নীরাপু?”
“কার বাসায় আবার?আমি স্মৃতি আর তুই আমরা তিনজনে মিলে বাসায় উঠবো, চল হল ছেড়ে দেই!আংকেল আন্টি না মানলে আমি ম্যানেজ করে নিবো” আব্বু আম্মুকে একথা জানানোর পর তারা রাজি হয়েছিলেন, বেশ জোর করতে হয় নি।বাসা খোঁজার কষ্টও আমাকে করতে হয়নি।স্মৃতি আপু আর নীরা আপুই সব ম্যানেজ করেছিলেন। দুতলা একটা বাসা।নিছে বাসার মালিক,আর উপরের তলায় আমরা তিন জন।ভাড়াটাও সাধ্যমত ছিলো,খুব বেশি না।নীরা আপু যে এই কাজটা আমার জন্য করেছিলেন তা আমি বেশ বুঝতে পেরেছিলাম।উনার তো হলে থাকার অভ্যাস হয়েই গিয়েছিলো,সেহেতু বাসা নেওয়ার কোনো কারন ছিলো না। । ভার্সিটি পরে রিক্সা করে বাসায় আসতেছিলাম। দুর্ঘটনায় রিক্সা থেকে পরে বেশ খারাপ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিলো। হাতে পায়ে চোট লেগেছিলো। পা মচকে গেছিলো, হাত ছিলে গিয়ে বিন্দু বিন্দু রক্ত একটু একটু করে বের হয়ে আসছিলো। আব্বু আম্মুকে কিছুই জানাইনি, যদি টেনশন করে।নীরা আপুকে মানা করেছিলাম জানাতে। দুর্ঘটনায় বিধ্বস্ত এই আমির অনেক খেয়াল রেখেছিলেন নীরা আপু।একজন মা যেন তার অসুস্থ শিশুর খেয়াল রাখছেন। তখন থেকে নীরা আপুর জন্য আমার মনে আরেকটা জায়গা সৃষ্টি হয়।নীরা আপু যেনো আমার আরেকটা মা।
কখনো যদি জ্বর আসতো, আপু একটু পর পর চেক করতেন, জলপট্টি দিতেন, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন, খাইয়ে দিতেন; যেন আমি উনার পর কেউ না, নিজেরই রক্তের কেউ একজন।আমি প্রায়ই আপু কে বলতাম “নীরাপু, আমায় বোধহয় ছোট বেলা তোমরা মেলায় হাড়িয়ে ফেলছিলে,বুঝেছো!” আপু হাসতেন আবার কখনো বললতেন “এইতো বাবু, তোকে তো আবার পেয়ে গেছি!আর হাড়াবি না দেখিস!”। হলে উঠার পর থেকেই এই অজানা শহরে সব সময় নীরা আপুকেই আশ্রয় মনে করে এসেছি।কে কিরকম হবে,আমায় কেউ পছন্দ করবে কি না,আমি সবার সাথে মিশতে পারবো কি না,আমি খাইয়ে চলতে পারবো তো,নতুন বন্ধুরা কেমন হবে,সিনিয়র’রা কি খুব জ্বালাবে”…ইত্যাদি ইত্যাদি প্রশ্নের ঠেলাঠেলিতে বেশ নার্ভাস ছিলাম।হলে উঠার আগে আমার ধারণা ছিলো হোস্টেল বলো,ভার্সিটি বলো,হল বলো যেখানেই যাবে সিনিয়র’রা সুযোগ পেলেই জ্বালাবে।তবে নীরা আপুর সাথে পরিচয়ের পর এই ধারনা পরিবর্তন হয়েছে। সবাই কখনই এক রকম হয় না।
নীরা আপু ছিলেন সেই একরকমের মাঝে অন্যরকম একজন, সবার থেকে আলাদা।নীরা আপু আমার ছোট একটা আশ্রয় ছিলেন,যাকে সব বলা যায়,যার কাছে হাসি কান্না সব জমা রাখা যায়।আমার সব থেকে প্রিয় মানুষ! । নীরা আপুকে আমার ভিষন মনে পরে।দেখা করতে ইচ্ছে করে।দেখা করতে গেলেও উনি দেখা করেন না।উনার অনেক অভিমান জমেছে।উনার প্রথম বাবু হওয়ার সময় হাসপাতালে একটু দেরিতে গিয়েছিলাম বলে।উনি এতোটাই অভিমান করে বসেছিলেন যে একটা কথাও বলেননি,একবার তাকাননি আমার দিকে,একবারো বলেননি “তুবা,পিচ্চি বাবু,কেমন আছিস তুই?”
নীরা আপুর অভিমান এতোই বেড়ে গিয়েছিলো যে উনার বাবুকেও কোলে নেন নি।সবাইকে অবজ্ঞা করে চলে গেলেন।এখনো দেখা করতে গেলে দেখা করেন না,সেই একরাশ অভিমান নিয়ে সাড়ে তিন হাত মাটির নিছে ঘাপটি মেরে শুয়ে থাকেন।কোনো কথাই শুনেন না।নীতুর সাথেও কথা বলেন না।নীতু আমার মেয়ে, নীরা আপু গিফট করে দিয়ে গিয়েছে।নীতুকে নীরা আপু জন্ম দিয়েছেন ঠিকই,কিন্তু মায়ের দায়িত্ব আমার ঘাড়ে চাপিয়ে গিয়েছেন।দুলাভাইও আরেকটা বিয়ে করেছেন, সেই জন্যেই নীতুকে আমি পেয়েছি।নীতু আমার আর নীরা আপুর মেয়ে, তুবা আর নীরার মেয়ে! নীরা আপুর এই গিফট আমার কাছে সব থেকে অমূল্য একটি গিফট।তবে তার এই অভিমান আমার পছন্দ না। আপুর এই অভিমান আমার মন খারাপ করে দেয়,বিষিয়ে তুলে।এটা নীরাপু বুঝেও না বুঝার ভান করে, আগের মতো এসে বলে না “বাবু,মন খারাপ করিস না।মন খারাপ করতে নেই।দুনিয়ে উলটে গেলেও মন খারাপ করবি না।দুনিয়ার ইচ্ছা হয়েছে সে উলটে গেছে,তাতে আমাদের কি রে?মন খারাপ করবি না!একদম করবি না!খবরদার!”

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত