মৃগয়া

মৃগয়া
আজিজ বিয়ের কিছুদিন পর খেয়াল করলো তার বৌ ঘুমায় না। না দিনে, না রাতে। চোখে সামান্য ঘুম ঘুম ভাবও নেই। ফকফকা সবসময়। একদম চনমনে। চব্বিশঘন্টা জেগে থাকে কি করে একটা মানুষ ভেবে কুল পায়না আজিজ। বিয়ে হয়েছে প্রায় দেড়মাস হলো। প্রথম প্রথম আজিজ খেয়ালই করেনি বিষয়টা। খেয়াল করার কথাও না। নব্য বিবাহিতরা কম ঘুমায়। কিছুদিন পর চোখে পড়লো। একদিন জিজ্ঞেসও করে বসলো, ‘সায়রা বানু, ঘুমোওনা কেন তুমি?’
সায়রা ফিক করে হেসে উঠে। হাসিটা ছলছলিয়ে ছিটকে কয়েক টুকরো আজিজের ঠোঁটে গিয়েও পরে। আজিজ বড্ড ভালোবাসে বৌকে। ভালোবেসে নামের পাশে বানু লাগিয়েছে। যদিও খানিক হীনম্মন্যতা কাজ করে। সায়রার লকলকে চিকন শরীর, গ্রামের আঙিনায় মাচা বেয়ে তরতর করে বেয়ে উঠা লাউয়ের ডগার মতোন। রুপবতী। কমবয়েসী। আর অপরদিকে সে সমাজের অতি সাধারণ বিশেষত্বহীন চল্লিশোর্ধ্ব পেটমোটা ভদ্রলোকদের একজন।
দুইজন একসাথে রাস্তায় বের হলে আজিজ ইতস্ততবোধ করে। পথচারী উৎসুক চোখে তাকায়। পরিচিত অনেকেই মজা করে আড়ালে আবড়ালে মন্দ কথা বলে। চোরা চোখে তাকিয়ে হাসে। সায়রা বড়ই আশ্চর্য একটা মেয়ে। এইসব সে থোড়াই কেয়ার করে। মাথা উঁচু করে বের হয় সে আজিজের হাত ধরে। আজিজ আড়চোখে সায়রার দিকে তাকায়। সে কি পরিচ্ছন্ন চোখ মেয়েটির। গর্বমিশ্রিত আনন্দে আজিজের চোখে জল আসে। কিন্তু কথা হচ্ছে সায়রা জেগে থাকে। চোখ বুজেনা একটা সেকেন্ডও। ঘন মায়া মাখা আদর আহ্লাদের পর মধ্যরাত করে যখন আজিজ ঘুমাতে যায়, তখনও সায়রা জেগে থাকে। হুট করে ঘুম ভেঙে গেলেও দেখে সায়রা বসে আছে বই হাতে। এই অন্ধকারে একটা মানুষ বই পড়ে কি করে? জিজ্ঞেস করলেই সায়রা অপ্রস্তুত হয়ে বলে, ‘পড়ছিলাম না তো, এমনি নিয়ে বসে আছি। আপনি ঘুমান।’
আজিজের ঘুম হয়না আর। চোখ লেগে থাকে। আবছা চোখ খুলে সে মাঝে মাঝে আড়চোখে তাকায় সায়রার দিকে। আবছা অন্ধকারে সে স্পষ্ট দেখতে পায় সায়রা পাতা উল্টাচ্ছে বইয়ের। ভয়ে আজিজের গা কেঁপে উঠে। সারা শরীরে ঠাণ্ডা একটা শিহরণ কাঁপিয়ে দিয়ে যায় পুরোপুরি তাকে। পুরো দুই মাস পার হওয়ার পর আজিজ বুঝতে পারলো, সায়রা স্বাভাবিক কোনো মেয়ে নয়। হয়তো মানুষই নয় কোনো। সায়রার গায়ে রক্ত বলতে কিছু নেই। বিষয়টা টের পেল রান্নাঘরে। আপেল কাটার জন্য ধারালো ছুরিটা পাস করতে গিয়ে হাতের আঙুলে লাগিয়ে দিয়েছিলো অজান্তে। টের পাওয়ামাত্র আঁতকে উঠে হাত চেপে ধরলো আজিজ। কাটা জায়গা চেপে ধরে অপরাধী কন্ঠে বললো,
‘ইশশ, কতখানি কেটে গেলো রে। স্যরি। তুমি হাত চেপে ধরো, আমি কাপড় নিয়ে আসছি।’ সায়রা ব্যথায় ভ্রুঁ কুঁচকে কাটা জায়গা চেপে ধরতেই আজিজ নিজের হাতের দিকে তাকালো। ভিজে আছে। রক্তের চিহ্নও নেই। জলে ভেজা একটা হাত। শিরদাঁড়া বেয়ে ঠাণ্ডা একটা অবশ অনুভূতি ছড়িয়ে গেলো পুরো শরীরে তার। সায়রা ব্যথায় ভ্রুঁ কুঁচকে বললো,
‘হা করে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? কাপড় নিয়ে আসেন। বাঁধতে হবে।’
‘হাত সরাও’ সায়রা অবাক হলো। এই প্রথমবার আজিজ তার দিকে অপরিচিত চোখে তাকিয়েছে। গলার স্বরটাও অপরিচিত। সে ভয়ে ভয়ে বললো,
‘কি হয়েছে আপনার?’
‘হাত সরাও’
সায়রা হাত শক্ত করে চেপে ধরে রাখলো। সরাবেনা সে। কাতর চোখে তাকিয়ে রইলো। ভয় পাচ্ছে। ওর ভয়মিশ্রিত অসহায় চোখ দু’টো আজিজকে নরম করলোনা একটুও। সে হাতটা জোর করে সরালো। একদৃষ্টিতে কাটা জায়গার দিকে তাকিয়ে ঢোক গিললো। চামড়া দুইদিকে সরে আছে, কাটা জায়গা দিয়ে রক্ত না বের হয়ে, বের হচ্ছে জল। আজিজ দুই পা পিছিয়ে ভীত চোখে তাকিয়ে বললো, ‘তুমি কে?’  সায়রার চোখও জলে ভরে গেলো। সে উত্তর না দিয়ে ধীরপায়ে হেঁটে সামনের রুম থেকে একটা কাপড় দিয়ে আঙুলে বেঁধে ফেললো চটপট। আজিজ হাঁটুগেড়ে বসে রইলো রান্নাঘরের এক কোনায়। টের পেলো জ্বর আসছে তার। গভীর রাতে তুমুল জ্বর উঠলো আজিজের। সে কাতর স্বরে বিড়বিড় করলো,
‘সায়রা বানু, ও সায়রা বানু..’ সায়রা কপালে জলপট্টি দিতে দিতে মাথার এলোমেলো চুলে হাত বুলিয়ে ভেজা স্বরে বললো,
‘এই তো আমি আছি, আপনার পাশে আছি। কখনো যাবোনা ছেড়ে আবার। আপনি যেতে দিলেও না।’
‘সায়রা বানু, ও সায়রা বানু..’
সায়রা ডাক্তার ডেকে আনলো। আজিজের জ্বর ভোরের দিকে কমে আসলো তারপর। সকাল এগারোটা পর্যন্ত সে আরামসে নাক ডাকিয়ে ঘুমিয়ে দুপুরে উঠলো। ভাতের প্লেট হাতে নিয়ে এসে বিছানায় বসে সায়রা বললো,
‘আমি খাইয়ে দিই?’ আজিজ বাচ্চা ছেলের মতোন হা করে। সায়রা অল্প একদলা ভাত মুখে তুলে দিয়ে আদুরে চোখে তাকায়। আজিজ বলে,
‘তুমি কে?’
‘সায়রা, আপনার সায়রা বানু’
‘তুমি মানুষ নও’
‘হ্যাঁ’
‘তো কি তুমি? ভুত?’
‘হ্যাঁ ভুত। আপনি আর কোনো প্রশ্ন করলে ঘাড় মটকাবো।’
আজিজ চুপচাপ ভাত চিবোতে থাকে। সায়রা মমতাভরা চোখে তাকিয়ে ভাত তুলে দেয় মুখে। আজিজ ভাত খেয়ে ঘুমায় আবার। সায়রা ঘুমন্ত আজিজের ডানহাতের অনামিকা আঙুল মুখে পুরে চোখ বুজে চুষতে থাকে। লালচে ঠোঁট বেয়ে ছলকে রক্ত বের হয়ে গড়িয়ে পড়ে কিছুটা বিছানায়। সায়রার চোখে পরম তৃপ্তি খেলা করে।
তিনমাসের হানিমুন ট্রাভেলের বাকি পনের দিন। আজিজ ইতিমধ্যেই বেশ শুকিয়ে গিয়েছে। আয়নায় নিজেকে দেখে চমকে উঠে প্রায়শই। খুশি হবে নাকি দুঃখ পাবে ঠিক বুঝে উঠতে পারেনা। সেই আগেকার ভরাট স্বাস্থ্য নেই। চুপসে যাচ্ছে। চোখ দুটোও নেই যেন। চোখের জায়গায় দুইটা বড় বড় গর্ত। দুর্বল লাগে খুব। কিছুক্ষণ কোথাও বসে উঠার পর কয়েকমিনিট চোখে অন্ধকার দেখে। কান ভোঁ ভোঁ করে। সায়রার সাথে আজিজের এখন বেশী কথা হয়না। শেষ আদর করে জড়িয়ে ধরেছিলো পনের দিন আগে। আজিজ টের পায়, তার এই শারীরিক পরিবর্তনের পেছনে সায়রার হাত আছে। সায়রা মানুষ নয়। হয়তোবা কোনো ডাইনী। কিন্তু এই ভয়ংকর আজগুবি তথ্য, এই ভীনদেশের অচেনা জায়গায় কে বিশ্বাস করবে তাকে?
সায়রা কোথাও বের হয়না। সারাক্ষণ রুমের ভেতর থাকে। জানালার পর্দা সরাতে দেয়না। রোদ ঢুকতে দেয়না ঘরে।
আজিজ রোজ তার হাতের আঙুলগুলোয় ছোট্ট দুটো দাগ পায়। সুক্ষ্ণ দাগ। চিকন একটা সুঁচ দিয়ে যেন দুটো ফুঁটো করা হয়েছে। প্রথম প্রথম আঙুলে পেত। এখন নানান জায়গায় পাচ্ছে। গতকাল পেয়েছে কানের ঠিক নিচে।
কথা না বললেও সায়রা সারাদিন তাকিয়ে থাকে আজিজের দিকে। এই দৃষ্টি মায়ামাখা হলেও আজিজের বড়ই অসহ্য লাগে। মাঝে মাঝে একা ঘুরতে বের হয় সে। পাশেই সমুদ্র। বালিতে বসে থাকে হাত পা ছড়িয়ে। ঢেউ এসে ভিজিয়ে দেয় পুরো শরীর। গায়ে পানির ছিঁটে পড়লেই আজিজের চোখে একটা কাটা দাগ ভাসে। একটা কাটা আঙুল। ভয়ে শিউরে উঠে। সন্ধ্যার দিকে বাসায় ফিরে আজিজ দেখলো সায়রা জানালার পাশে বসে উদাস হয়ে তাকিয়ে আছে দূরে কোথাও। সাধারণত সায়রা জানালার পর্দাও সরায়না। আজ কি হলো কে জানে। আজিজ বাইরে উঁকি দিলো। ঝুম বৃষ্টি নেমেছে মাত্র। সায়রার বৃষ্টি পছন্দ। বেশ পছন্দ। আজিজ ভয়ে ভয়ে সায়রার দিকে তাকালো। আজকাল সে মেয়েটিকে ভয়ও পাচ্ছে।
অথচ প্রথমবার সে যখন সায়রাকে দেখতে গেলো গ্রামে। একটা লাজুক লম্বা ঘোমটা টানা অল্পবয়েসী মেয়ে। সোফায় বসে ঘোমটা একটা টেনে উঠিয়ে আজিজের দিকে তাকালো। ওই একবারই। আজিজ হা করে চেয়ে রইলো। এই মেয়েকে কোথাও দেখেছে সে। বহু আগে। কোথাও যেন। এই মেয়ে হীরা কিংবা মুক্তো, আর সে বানর। এই মুক্তোর মালা গলায় পরার সৌভাগ্য বানরের হবে, আদৌ ভাবেনি। আজিজের একমাত্র অভিভাবক বড় মামা মুখে পান নিয়ে বললেন, ‘মা, একটু হেঁটে দেখাও তো।’ বাইরে কড়কড়ে রোদ। আজিজ বড় মামার দিকে বিরক্তভরা দৃষ্টিতে তাকালো। প্রায় পাঁচ ছয়টা বিয়ে ভেঙেছে আজিজের। সবকিছু ঠিকঠাক থাকে, হুট করে বিয়ের কিছুদিন আগে ফোন আসে মেয়েপক্ষের। তারা কোনো এক অজ্ঞাত কারণে মেয়ে বিয়ে দেবেনা আজিজের নিকট। এত ঝুট ঝামেলার পর এই মেয়েটিকে দেখতে এসেছে আজিজ। ঝামেলার প্রয়োজন নেই। মামা আজিজের বাঁকানো ভ্রুঁ’ দুটোকে পাত্তাও দিলেন না। মেয়েটি একবার বাইরে তাকালো। তারপর উঠে ঘোমটা ফেলে মামার দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বললো, ‘পারবোনা। আপনার ইচ্ছা হইলে আপনি বাইরে গিয়ে ঢ্যাং ঢ্যাং করে হাঁটেন।’
মেয়েটির লাল হয়ে আসা গালের দিকে তাকিয়ে থেকে আজিজ সিদ্ধান্ত নিলো যে কোনো মূল্যেই এই মেয়েটিকে সে বিয়ে করবে। প্রয়োজনে মামার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করে হলেও। মেয়ের পরিবার হতদরিদ্র। তাছাড়াও শোনা গেলো মেয়ের বাবা মা নেই। কুড়িয়ে পেয়েছে কেউ। অনাথ, হতদরিদ্র, অসহায় বলেই হয়তোবা ছেলের বয়স তেমন পাত্তা দিলোনা কেউ। আজিজ পেলো সায়রাকে। অথচ এখন নেই মেয়েটি। থেকেও নেই। আজিজ বিছানায় শুয়ে চোখ বুজলো। ঘুমের মধ্যেই টের পেলো কেউ তার হাতের আঙুল নিয়ে খেলছে। সে জানে এটা তার স্বপ্ন। অবচেতন মন আঙুলের সুক্ষ্ণ দাগগুলো দিয়ে মনমতোন কোনো একটা দৃশ্য তৈরী করার চেষ্টা করছে। আজিজ অতিকষ্টে চোখ মেললো। ডানপাশে তাকিয়ে দেখলো সায়রা হাতের কব্জির উপর দাঁত বসিয়ে চোখ বুজে আছে। নরম সুক্ষ্ণ একটা ব্যথা টের পেলো আজিজ।
হকচকিয়ে উঠে হাত টেনে নিতেই সায়রা চোখ খুলে ভয়ে আধমরা হয়ে গেলো প্রায়। কি করবে ভেবে পেলনা যেন একমুহূর্তে। আজিজ কব্জি দেখলো, দুইটা সুঁচের দাগ গেঁথে আছে আর দুই ফোঁটা রক্ত। সায়রার ঠোঁটের এক কোন বেয়ে চিকন একটা রক্তের ধারা জমাট বেঁধে শক্ত হয়ে সেঁটে আছে। আজিজ চিৎকার করলো, ‘কি করছো তুমি?’ সায়রা জলভরা চোখে তাকিয়ে বললো, ‘আজকে শেষ করতে হবে।’ ‘কি শেষ করতে হবে?’ ‘এই যে বৃষ্টি নামলো।’ সায়রা জানালার পর্দা সরিয়ে দিলো। কাঁচ খুলে হাত বাড়িয়ে দিলো বাইরে। বৃষ্টি নেই। বিদ্যুত চমকাচ্ছে অনবরত। আজিজের চোখমুখ ভয়ে শুকিয়ে গেলো। জানালা গলে বাইরে থেকে আসা বিদ্যুত চমকানোর আলো যেন সায়রাকে অন্য কোনো এক মানবীতে রুপান্তরিত করেছে আজ। যে মানবীকে আজিজ চিনেনা একরত্তিও।
সায়রার চুলের খোঁপা খুলে গিয়েছে। চুল উড়ছে বাতাসে। জানালার বাইরে থেকে শুষ্ক হাত টেনে সে আজিজের কাছে ছুটে এলো। বললো, ‘চোখ বুজুন আপনি, ব্যথা লাগবে যে নয়তো’ আজিজ বিছানা থেকে লাফ দিয়ে নেমে রুমের এক কোনায় গিয়ে ধড়াম করে পড়লো। মাথা টলছে ওর। ঝাপসা দৃষ্টি। উঠে দাঁড়াতে পারছেনা। সায়রা দৌঁড়ে এলো। ওর শাড়ি খুলে গিয়েছে। চোখে উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি। থরথর করে ঠোঁট কাঁপছে। আজকেই শেষ করতে হবে। কী শেষ করতে হবে আজিজের জানা নেই। আজিজের কেন জানি মনে হলো মেয়েটি আজকেই তাকে মেরে ফেলবে। সে আর কখনো ভোর দেখতে পাবেনা। ভীষণ কান্না পেলো। হাতের মুঠোয় কাঁচের বোতল টাইপ কিছু একটা পেয়ে মুঠো করে ধরলো সে।
চোখ বুজলো। হুট করে দরজা খোলার আওয়াজ পেলো আজিজ। তারপর ঠং করে শব্দ। কিছু জলের ফোটা ছিঁটকে আজিজের মুখে এসে পড়লো। ঠাণ্ডা একটা স্পর্শ যেন পরম আদরে ছুঁয়ে দিয়ে গেলো গাল তার। এই স্পর্শে বড্ড কান্না পায়। সায়রা মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলো পাশে ঘুমন্ত আজিজের দিকে। তাদের বিয়ে হয়েছে প্রায় পনের দিন হলো। আজিজের গায়ের রং কালো। মোটাসোটা মানুষ। বয়সও খানিকটা বেশী। সায়রা অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখে মানুষ ঘুমায় কি করে। এত বুদ্ধিমান একটা প্রাণী.. এত সময় ধরে ঘুমিয়ে থেকে সময় নষ্ট করে কেন?
আজিজ চব্বিশঘন্টার মধ্যে প্রায় বারোঘন্টাই ঘুমিয়ে কাটায়। যখন ঘুমিয়ে থাকে, সায়রা অপলক তাকিয়ে থাকে।
আজিজ ঘুমায় দুই হাঁটু মুড়ে ডান কাত হয়ে। একটা বাচ্চা যেমন করে মায়ের পেটে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকে। সায়রার বড্ড ইচ্ছে করে মানুষ হতে। এইভাবে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে একটু ঘুমোতে পারা যেত যদি। অনেকবার চেষ্টাও করেছে আজিজের পাশে শুয়ে ঘুমাতে। জোর করে চোখের পাতা বুজেও রেখেছে। ঘুম আসেনি। সায়রা জানে ঘুম কখনোই আসবেনা তার। আজিজ সায়রাকে আদর করে নাম দিয়েছে সায়রা বানু। এই নামের সাথে পুরাতন দূর্লভ দূর্লভ একটা ভাব আছে। সায়রার খুব মায়া হয় মানুষটার জন্য। এই মানুষটিকে সে বাঁচিয়ে রাখবে যতদিন পারা যায়।
সায়রার এই জায়গাটা বড্ড প্রিয়। আজিজ যখন জিজ্ঞেস করলো হানিমুনের জন্য কোন জায়গাটা পছন্দ তার। সায়রা এই জায়গাটার নাম বলেছিলো। এই জায়গাটার সাথে মায়াং এর একটা মিল হলো এইখানেও সারাদিনে রোদ উঠেনা। বর্ষা বর্ষা একটা ভাব। বাতাসও ভেজা। শুষ্ক আবহাওয়ায় সায়রার দমবন্ধ হয়ে আসে। রোদ গায়ে পড়লে মরে যাবে সে। সেদিন রাত তিনটায় যখন আজিজ বেঘোরে ঘুমোচ্ছিলো, সায়রা বইয়ের পাতা উল্টে ডানহাতের তর্জনীর উপর বামহাতের কনিষ্ঠাঙ্গুল প্যাচিয়ে বিড়বিড় করলো কোনো একটা অস্পষ্ট মন্ত্র। তারপর হাত সরাতেই বইয়ের পাতায় কিছু জল ভেসে রইলো গোল হয়ে। যেন একটা টলটলে জলের বল। জলের গোলক হতে একটা মুখ উঁকি দিলো,
‘পৃ, কবে ফিরছো তুমি?’
‘এইতো, আর মাস দেড়েক।’
‘আজিজ কেমন আছে?’
‘এখনো ভালো। তবে শীঘ্রই মারা যাবে।’
‘ওদের নাকি অত্যাধুনিক তথ্য প্রযুক্তি, টের পাচ্ছেনা কেন?’ ‘এই অসুখ টের পেতে দেরী হয়ে যায় বাবা।’ সায়রার সারা শরীর ভয়ে হিমশীতল হয়ে এলো। আজিজ ঘুমঘোর চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সায়রা চট করে ছোট্ট জলের গোলকটা হাতের তালু দিয়ে মিশিয়ে দিলো পাতায়। আবছা অন্ধকারে আজিজের পুরো মুখ স্পষ্ট না হলেও সায়রা ঠিক বুঝতে পারলো আজিজ ভ্রুঁ কুঁচকে আছে। ইদানিং সন্দেহও করেছে ঘুমের বিষয়টা নিয়ে। জিজ্ঞেস করলো, ‘সায়রা বানু, বই পড়ছো তুমি?’ সায়রা আজিজের পাশে শুয়ে পড়ে তারপর। মুখোমুখি। একটা বাচ্চা বাচ্চা চেহারা মানুষটার। ইচ্ছে করে চুমু চুমুতে ভরিয়ে ফেলতে। জলে আবদ্ধ করে চেপে চুষে নিতে সমস্ত শরীর। অথচ এটা সম্ভব না। আজিজ মানুষ। সায়রা ঘুমন্ত আজিজের চুলে বিলি কাটে।
শত চেষ্টার পরও সায়রা গোপনীয়তা ধরে রাখতে পারলোনা। দুইমাস পর ঠিক টের পেয়ে গেলো আজিজ। সায়রা স্বাভাবিক কোনো মেয়ে নয়। সায়রার শরীরে একফোঁটা রক্ত নেই। রক্তের বদলে জলে ভর্তি। আজিজ সেদিন কড়া চোখে তাকিয়ে বললো, ‘হাত সরাও’ সায়রার কান্না পেলো। আজিজকে সে দেখাতে চায়না তার কাটা আঙুলের ক্ষত বেয়ে কোন রঙা রক্ত ঝরছে। জলরঙা! আজিজ জোর করে হাত সরিয়ে দেখলো, তারপর বোবা হয়ে রইলো। সায়রা কখনোই ভুলবেনা আজিজের এই ভীত মুখশ্রী। চেহারার রঙ পানসে হয়ে গিয়েছিলো তার। সায়রা দৌঁড়ে পালিয়ে এলো রান্নাঘর থেকে। কাপড় বাঁধলো আঙুলে। বৃষ্টি আসলে ক্ষত শুকিয়ে যাবে। বৃষ্টিতে ভিজতে হবে একটু। ক্ষত শুকোবেই। কিন্তু আজিজের ক্ষত কোন বৃষ্টিতে শুকিয়ে নেবে সায়রা ভেবে পেলোনা। এতটা অসহায় আর কখনো লাগেনি ওর। আজিজ দম ধরে বসে রইলো সারাদিন।
রাতে প্রচণ্ড জ্বর এলো তার। জ্বরের ঘোরে বিড়বিড় করলো, ‘সায়রা বানু, ও সায়রা বানু সায়রা কাতর চোখে তাকিয়ে উষ্ণ কপালে চুমু এঁকে দিয়ে বললো, ‘এই তো আমি। আর কখনো যাবোনা ছেড়ে আবার। আপনি যেতে দিলেও না।’ আজিজ জ্বরের ঘোরে মাথা নাড়ায়। হাত চেপে ধরে রাখে সায়রার। সায়রার বুক ভেঙে আসে কষ্টে। আরেকবার নিচু হয়ে আরেকটা চুমু নাকের ডগায় লেপ্টে দিয়ে বলে, ‘প্রিয়, আমার জগত বৃষ্টির জগত। ওখানে রোদের জায়গা নেই। আপনি আগে জল হয়ে উঠুন। আপনাকে মিশিয়ে নেব আমার ভেতর আমি তারপর। কখনোই আলাদা হবোনা আর।’ আজিজ মাথা নাড়ায়। অস্পষ্ট স্বরে বিড়বিড় করে কি যেন।
সময় ঘনিয়ে আসছে। সায়রা ওই রাত থেকেই শুরু করে কাজটা। আঙুলে দুটো ফুঁটো করে রক্ত চুষে নেওয়া। একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ পর্যন্ত। বেশী হলেও সমস্যা, কম হলেও। আজিজ রান্নাঘরের ঘটনাটার পর ভয়ে চুপসে গিয়েছে একদম। একটা বোবা কষ্ট কুরে খায় সায়রাকে, যখনই আজিজের চুপসে যাওয়া মুখটা সে দেখে। আজকাল কেমন যেন ভয়ও পেতে শুরু করেছে আজিজ তাকে। এরচেয়ে কষ্টের কিছু হতে পারে কি-না জানা নেই সায়রার। অথচ সময় যেন ফুরোচ্ছেই না। তিনমাস শেষ হতে আরো পনের দিন বাকি। সায়রা খেয়াল করলো রক্তের প্রভাব পড়েছে আজিজের উপর। শুকিয়ে আসছে ক্রমশ। চনমনে ভাবটা নেই। ক্লান্তি খেলা করে পানসে মুখটায়। সায়রার মনে কষ্টমিশ্রিত আনন্দ অনুভব হয়। আর মাত্র ক’টা দিন বাকি। কে জানে, আজকেই রক্ত চোষার পর হয়তো সবকিছুর অবসান হয়ে যাবে। আজিজ আজকাল কথা বলেনা সায়রার সাথে।
আগে সায়রাকে নিয়ে ঘুরতে বের হতো। যদিও খানিক হীনম্মন্যতা নিয়ে। সায়রা ‘তাকালেই চোখ জ্বলসে যাওয়া’ টাইপের সুন্দরী। আজিজের চেহারায় একগাদা মায়া থাকলেও এই ছেলেটি হীনম্মন্যতায় ভুগেছে ছোটবেলা থেকে।
সায়রাকে নিয়ে যতবার বাইরে বের হয়েছে, আজিজের মুখটা এতটুকুন হয়ে ছিলো। পাশ কেটে যাওয়া প্রতিটা পথচারীর দিকে তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করতো কেউ তাদেরকে আড়চোখে দেখে বিদ্রুপের হাসি হাসছে কি-না। সায়রা শক্ত করে হাত ধরে আজিজের কাঁধে মাথা প্রায় হেলে দিয়ে ওকে ওর অস্বস্তিবোধ থেকে খানিকটা মুক্তি দেয়ার চেষ্টা করেছে সবসময়। আজিজ অনুভব করুক, সে সুন্দর। সে সত্যিকার অর্থেই সুন্দর। একটা বৃষ্টি ফোটার মতোন বিশুদ্ধ। আজকে আজিজ একা বের হয়েছে। হানিমুনে এসে হাসবেন্ড যখন একা ঘুরতে বের হয়, তখন বুঝতে হবে কোথাও গন্ডগোল আছে। গন্ডগোল সত্যিই আছে। আজিজ তাকে ভয় পাচ্ছে। ইদানিং হাতের আঙুলের দিকে তাকিয়ে ভয়ে চোখমুখ শুকিয়ে আসে ওর। আঙুল ফুটিয়ে রক্ত চুষে নিচ্ছে কেউ, এটাও টের পেয়ে গিয়েছে।
‘ও’ টা কে, আবছা ধারণা করে নিয়েছে আজিজ। সায়রা বড্ড অস্থিরবোধ করে। কয়েকরাতে সে তাই আঙুল বাদ দিয়ে ঘাড়ে, কানের নিচে নানান জায়গায় ফুঁটো করে রক্ত চুষেছে। সেটাও খুঁজে নিয়েছে আজিজ। সায়রা জানালার শিক ধরে পর্দার পাশে গুটিশুটি মেরে বসে রইলো। আজকে হয়তো সব সমস্যার সমাধান হবে। আজকে রাতেই শরীরটা চুপসে নিতে হবে ওর। সায়রা অপেক্ষা করে আজিজের ঘরে ফেরার। আজিজ ফেরে সন্ধ্যার পর। এসে চুপ করে বিছানায় শুয়ে বই পড়ে। কিছুক্ষণ মুভি দেখে। তারপর খেতে বসে। সায়রার স্বাভাবিক কোনো প্রশ্নেরও জবাব দেয়না। আজিজ ঘুমিয়ে পড়ে দশটার দিকে। সায়রা অপলক তাকিয়ে থাকে ঘুমন্ত আজিজের দিকে। কখনো ভেবেছে এই মানুষটি, কি প্রলয় ঘটে গিয়েছে তার অন্দরমহলে? ঘুমিয়ে থাক মানুষটা। শান্তির ঘুম।
সায়রা উঠে বসলো বিছানার পাশে। আজিজের হাত কাছে টেনে কব্জি বরাবর উপরের মাড়ির লুকোনো দাঁত দুইটি ফুটিয়ে দিলো ধীরে। একটু নড়েচড়ে উঠলো আজিজ। সায়রার ঠোঁটের কোন বেয়ে কয়েক ফোঁটা রক্ত গড়িয়ে পড়লো নিচে। এই দাঁত দুটি বসানোর সময় সায়রার ভয়ানক কষ্ট হয়। এই মানুষটিকে সামান্য সুঁচ ফোঁটার কষ্টও দিতে চায়না সে। রক্ত প্রায় চোষা শেষ। আর কয়েক ফোঁটা। শেষ ফোঁটা টানার পরও বিশেষ সতর্কতায় আরো কিছু রক্ত চোষা প্রয়োজন। সায়রা দাঁত লাগিয়ে বসে থাকে। আজিজের চোখের পাতা নড়ে উঠে। সায়রার বুকের বাঁপাশে কে যেন করাত দিয়ে টানছে ঘ্যাঁচর ঘ্যাঁচর। সায়রা কামড়ে ধরে রাখে আঙুল। আজিজ চোখ খুলে জিজ্ঞেস করে,
‘কি করছো তুমি?’
আজিজ একলাফে বিছানা থেকে নেমে রুমের এককোনায় গিয়ে ধুম করে পড়লো মাথা ঘুরিয়ে। ওর এখন হাঁটার শক্তিও নেই। সায়রা কাতর চোখে তাকালো ওইদিকে। আর একটু রক্ত চোষা প্রয়োজন। রিস্ক না থাকুক। আজিজ রুমের এক কোনায় সেঁধিয়ে আছে। মানুষটা ভয় পাচ্ছে এত তাকে। সায়রার সে কি কান্না পেল। ইচ্ছা করলো কেঁদে ভাসিয়ে নিতে সমস্ত শহর। সময় শেষের দিকে প্রায়। বাইরে বিদ্যুত চমকানোর আওয়াজ। বৃষ্টি আসবে যেকোনো সময়। আজিজকে ভিজতে হবে এরপর। বিশুদ্ধ হয়ে উঠবে ওর শরীর। ত্রুটিমুক্ত। জানালার পর্দা উড়ছে দমকা বাতাসে। আলো আঁধারি খেয়ে নিচ্ছে আস্ত রুমটা। সায়রা দৌঁড়ে গেলো আজিজের নিকট। আজিজ একহাত পেছনে নিয়েছে। সায়রা স্পষ্ট দেখতে পেলো একটা কাঁচের বোতল। ছলছলে চোখ দুটোয় এক সমুদ্র মায়া নিয়ে সায়রা এগোলো আজিজের কব্জি উদ্দেশ্য করে। সায়রা জানে, এই কাঁচের বোতল কখনোই আজিজ ছুঁড়ে মারবেনা তাকে। এক পা এগোতেই ঠং করে শব্দ হলো।
সায়রা লুটিয়ে পড়লো মেঝেতে। মাথার পেছনের অংশ জলের মতোন ছিটকে পড়লো চারোপাশে। সায়রা কাঁদার চেষ্টা করলো। গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলোনা ওর। কি কষ্ট! কি কষ্ট! রিয়া কটেজ। মনসুর প্যান্টের ভেতর থেকে ডান হাত বের করে চোখ বুজে চেয়ারে গা এলিয়ে দিলো। ওর সামনের টেবিলে ল্যাপটপে চারটা ভিডিও কোলাজ হয়ে চলছে। গোপন সিসিটিভি ফুটেজ। মনসুর কিছুক্ষণ চোখ বুজে ক্লান্ত শরীর চেয়ারে এলিয়ে বিশ্রাম করে উঠে দরজা চেক করে আসলো রুমের। অবশ্য বারবার এই রুমের দরজা চেক করার দরকার নেই। এই রুমটা রিয়া কটেজের সবচেয়ে দক্ষিণের পরিত্যক্ত বিল্ডিং এর ভেতরকার গোপন একটা রুম। এই রুমের অস্তিত্ব সম্বন্ধে জানে দুইটা লোক। একটা সে নিজে, আরেকটা রাফায়েত করিম। কটেজের মালিক যিনি। মনসুর রাফায়েত করিমের অতি বিশ্বস্ত একজন।
এই কটেজে যে কয়টা রুম আছে, সবগুলোয় কাপল আছে। আর কাপলরা জানেনা, সব রুমেই দশ থেকে বিশটা করে গোপন ক্যামেরা আছে। আয়নায়। আলমিরার ফাঁক ফোকরে। ফুলদানিতে রাখা প্লাস্টিকের সূর্যমুখী ফুলের মাথায়। লাইটের ভেতর। মনসুর এই রুমে বসেই সদ্য সদ্য বিবাহিত কাপলদের শ্বাস প্রশ্বাসও গুনতে পারে।
দুনিয়ায় পর্ণ ব্যবসার মতোন লাভজনক ব্যবসা আর একটি আছে কি-না সন্দেহ মনসুরের। কটেজের প্রতিটা রুম থেকে রোজ পঞ্চাশ- ষাট’টা ভিডিও পাওয়া যায়। প্রতিটা ভিডিও এডিট করা হয়, ব্যাকগ্রাউন্ড এডিট। যাতে কটেজের রুমের ছায়াটুকুনও না পড়ে কোথাও। একেকটা ভিডিওর বাজার মূল্য মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতোন। মনসুর ইদানিং একটা রুমের দিকে বিশেষ নজর দিয়েছে।
একটা নব বিবাহিত কাপল। এরা কটেজের একটা রুম ভাড়া নিয়েছে তিন মাসের জন্য। এই জায়গাটায় রোজ এত মানুষ আসে সমুদ্র দেখতে, এসে দেখে চলে যায়। এতদিন কেউ থাকেনা। এরা থাকছে। হাসবেন্ডের বয়স প্রায় চল্লিশ। বৌয়ের বয়স বাইশ তেইশ হবে। বৌটা নজরকাড়া সুন্দরী। মনসুর প্রথমদিন দেখেই পুরোপুরি চুপসে গিয়েছিলো।
এগার নাম্বার রুমটায় সেই থেকে মনসুর বিশেষ নজর রেখেছে। রোজ রাতে আদর মাখামাখি দেখে মনসুরের রক্ত মাথায় চড়ে যায়। প্যান্টের ভেতর হাত ঢুকিয়ে অনবরত উঠানামা করাতে করাতে তীব্র একটা আফসোস ওর বুকে শরীরে চোখে মুখে লেপ্টে যায়। অসাড় হয়ে আসে শরীর। এই অনলময়ীর শরীরের সমস্ত অংশে যদি হাত বুলানো যেত। চোখ বুজে মনসুর কল্পনা করে। নরম শরীরটার প্রতি ইঞ্চি ইঞ্চিতে কল্পনায় বিকৃত আত্মতৃপ্তি গেঁথে গেঁথে নিখুঁত আনন্দ নিয়ে চোখ খুলে সে। বৌ’টার নাম সায়রা। মোটা বদখত হাসবেন্ডের নাম আজিজ।
কয়েকদিন পার হওয়ার পর মনসুর একটা অদ্ভুত বিষয় লক্ষ্য করলো। সায়রা কখনো ঘুমায় না। অন্ধকারে একা একা হাঁটে। বিড়বিড় করে। যদিও রুমে শুধু ভিডিওর’ই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সাউন্ড বিষয়ে কোনো কাজ করা হয়নি। মনসুর টের পেলো সায়রার মধ্যে কোনো ‘কিন্তু’ আছে। এমনিতেও মনসুরের ধারণা পৃথিবীর সব সুন্দরী মেয়েদের মধ্যেই অল্প আধটু ‘কিন্তু’ থাকে। মাসখানেক পর প্রায় চল্লিশটা ভিডিও সংগ্রহ করতে পারলো মনসুর। সায়রা এবং আজিজের। সবগুলো ভিডিও জোশ। মনসুর দিনে দুইবার করে দেখে একটা ভিডিও। তবে দেড়মাস পর কোনো একটা ঝামেলা টের পেলো। সায়রা এবং আজিজের মধ্যে মনোমালিন্য হচ্ছে। আঁতকে উঠলো সে। আরো ভিডিওর দরকার ছিলো ওর। ঝামেলা না বাঁধলেই হয়। মনসুর মনিটরের দিকে তাকিয়ে থাকে। সায়রার হাত কেটেছে। আজিজ কাটা হাত দেখে ছিটকে রুমের এক কোনায় গিয়ে বসে পড়লো। মনসুর ভ্রুঁ কুঁচকে তাকালো। ঘটনা কি?
জুম করে কাটা আঙুল দেখে মনসুর ঢোক গিললো। ভিডিওগুলো রঙিন। সাদা কালো হলেও সে বিশ্বাস করতো না। সাদা কালোতে রক্তের রঙ কালো দেখায়। রঙিন স্ক্রীনে সায়রার কাটা আঙুল বেয়ে রক্তের বদলে গলগল করে জল বের হতে দেখে মনসুর চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে রইলো। দুই পায়ের হাঁটু কাঁপতে লাগলো তার। সায়রা মানুষ নয়। মনসুর দুইদিন আর গোপন রুমে ঢুকলোনা। রাফায়েত করিম বারবার ফোন দিয়ে কারণ জিজ্ঞেস করার পরও তাকে বলতে পারলোনা কিছু। তিনি বিশ্বাস করবেন না, পাগল বলবেন মনসুরকে। ভিডিও দেখার পর বলবেন, এটা বাদ দিয়ে সেক্সুয়াল ভিডিওগুলো পাঠাও। যা প্রফেশনাল তিনি। কটেজে কোনো ঝামেলা চান না। মনসুরের স্বাভাবিক হতে পাক্কা এক সপ্তাহ লাগলো। এক সপ্তাহ পর মনসুর গোপন রুমে ঢুকে মনিটর অন করার পর ভয়ে ভয়ে এগার নাম্বার রুম দেখলো। এখনো ঝামেলা চলছে দুইজনের। চলার কথাও। আজিজ নামের মানুষটার মাথায় খানিক সমস্যা আছে। এই ভুত প্রেতের সাথে সংসার করার কোনো মানে হয় না।
মনসুর গতরাতের ভিডিওটা দেখে ভ্যাবাচেকা খেলো। সায়রা রাত গভীর হলেই আজিজের ডানহাত কিংবা বামহাতের আঙুল মুখে পুরে চুষতে থাকে। বিষয়টা যথেষ্ট উদ্ভট হলেও মনসুর বিষয়টা সেক্সুয়াল ক্যাটাগরীতে রাখলো।
আড়াই মাসে সেক্সুয়াল কোনো ভিডিও না পেলেও আঙুল চোষার ভিডিওগুলো ওই অভাব পূর্ণ করলো মনসুরের। যখন আঙুল চুষে সায়রা, মনসুর প্যান্টের ভেতর হাত ঢুকিয়ে একটা চরম আত্মতৃপ্তিতে চোখ বুজে। দেড় দুই মাসে একটা নাদুস নুদুস মানুষের শুকিয়ে চুপসে যাওয়ার দ্বিতীয় প্রত্যক্ষদর্শী স্বাক্ষী মনসুর। ভারী অবাক হয় সে। মানুষ ডায়েট কন্ট্রোল না করে স্ত্রীর সাথে ঝামেলা বাঁধিয়ে দিলেই তো পারে। টেনশনে শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাবে।
আজ মনসুর হা করে রইলো কিছুক্ষণ স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে। মুখের ফোকাসটা ভালো করে আসার জন্য জুম করেছিলো সায়রার মুখে। ঠোঁটের কোনে লালচে একটা দাগ চোখে পড়লো তার। মনসুরের গলা শুকিয়ে আসলো। সায়রা ভুত প্রেত নয়। ডাইনী কিংবা ড্রাকুলা। রক্ত চুষে খাচ্ছে মানুষটার এতদিন ধরে। উত্তেজনায় পিছু হটতে গিয়ে চেয়ার উল্টে পড়ে গেলো সে। ভয়ে সারা শরীর কাঁপছে। মনিটরে চোখ রাখলো আবার।
আজিজ জেগে উঠেছে ততক্ষণে। সেও মনসুরের মতোন ভয় পেয়েছে। একলাফে উঠে রুমের কোনায় গিয়ে ধুম করে ঢলে পড়েছে নিচে। মনসুর আঁতকে উঠলো। কটেজে খুনোখুনি চলবেনা। বদনাম হবে। পুলিশ কেইস টেইস হলে গোপন ক্যামেরা নিয়ে ধরা টরা পড়লে মনসুরও ফেঁসে যাবে। কি করবে প্রথমে ভেবে পেলনা। আজিজ রুমের এক কোনায় ভয়ে সেঁটিয়ে আছে। ডাইনীটা জানালায় হাত বাড়িয়ে আছে। যেকোনো মুহূর্তে এসে আজিজের ঘাড় মটকে দেবে। মনসুর রুমের এক কোনায় তাকালো। একটা পুরাতন বাঁকানো জং ধরা লোহার রড। হাতে নিয়ে ছুটলো সে। ভুত প্রেত লোহা ভয় পায়। এগার নাম্বার রুম। দরজা খুলতেই দেখলো ডাইনীটা একদম আজিজের কাছাকাছি।
লোহার রড উপরে তুলে বিদ্যুতগতিতে ছুটলো মনসুর। মেয়েটির খোলা চুল উদ্দেশ্য করে ডানদিক থেকে তেঁরছা করে সজোরে আঘাত করলো। জলের ফোঁটা ছিটকে পড়লো চারোপাশে। মেয়েটি লুটিয়ে পড়লো মাটিতে। কয়েকবার নাড়াচাড়া করলো। হাত বাড়িয়ে রইলো সামনে হাঁটু মুড়ে বসে থাকা ভীত ক্লান্ত আজিজের দিকে। ওই কাঁপা কাঁপা হাতে এক জন্মের আকুতি। একত্রিশ বৎসর আগে। পৃ দাঁড়িয়ে রইলো একটা আমগাছের নিচে। এখানে তুমুল ছায়া। ভাগ্যিস। চারোপাশে প্রচণ্ড রোদ। পৃ রোদে দাঁড়াতে পারবেনা। তাদের জগত বৃষ্টির, জলের। পৃ এখানে অপরিচিত। পৃথিবীতে পানির খোঁজে এসেছে ও। পেয়েছেও। কিন্তু বড্ড রোদ। পৃথিবীতে বাস করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে আশার কথা হলো পৃথিবীর কিছু কিছু জায়গা আছে যা ছায়া ঢাকা, অথবা সবসময় মেঘলা। অথচ পৃ আটকে আছে এই বিরানভূমিতে।
পুরো ধু ধু করা মাঠের মাঝখানে একটাই গাছ। একটাই ছায়া। আবার মরার উপর খরার ঘা। রোদ উঠেছে তুমুল। এই রোদ গায়ে লাগলেই পৃ’র শরীর গলে যেতে শুরু করবে। বাষ্প হয়ে মিলিয়ে যাবে সে বাতাসে। এত সহজ মৃত্যু। অথচ পৃ’দের জীবন কতই না দীর্ঘ। একেকজন পৃ প্রায় দুইশত তিনশত বৎসর বেঁচে থাকে। পৃ দাঁড়িয়ে রইলো। রোদ কমার নাম নেই। ভারী তৃষ্ণা পেয়েছে তার। বিপদ। পানি না পেলেও শরীর খসে পড়তে শুরু করবে। পৃ ভয়ানক আতংকিত হয়ে পড়লো। ঠিক ওই মুহূর্তে কিছু লোককে কুড়াল হাতে আসতে দেখে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো। ওদের নিকট নিশ্চয় পানি পাবে। সিম্পাথি পাওয়ার মাত্রা বাড়ানোর জন্যই একটা বাচ্চা মেয়ের বেশ ধরলো পৃ। মাথায় ঝুঁটি। তুলতুলে গাল। টলটলে চোখ। নিশ্চয় ওরা আদর করে পানি দেবে পৃ’কে। লোকগুলো বাচ্চা একটা মেয়েকে আমগাছের গোড়ায় একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলো,
‘তোমার বাড়ি কই?’
‘একটু পানি খাবো’
লোকগুলো ভারী আফসোস করে বললো, ‘পানি তো নাই আম্মা। তুমি এই দিকে হাঁইটে যাও। কাছেত নদী আছে। নদী ধইরে হাঁইটে গেলে বাড়ি ঘর পাবা। ওইখানে গেলে পানি দেবে।’ পৃ দাঁড়িয়ে রইলো। সে জানে এখান থেকে কোনদিকে কতদূর হাঁটলে নদী পাবে। মায়াংদের কাছে নদী হচ্ছে দেবী। যিনি এই জগতের সবার সমস্ত ভবিষ্যত জানেন। মায়াংরা দেবীকে ডাকে ‘নদী মা।’ কিন্তু নদী মা’র কাছে কি করে পৌঁছাবে সে। যা কড়া রোদ। দশ কদম এগোলেই গলে যাবে সে। এই লোকগুলোকে কি করে বুঝাবে সেটা। পৃ দাঁড়িয়ে রইলো। লোকগুলো কুড়াল মারতে লাগলো আমগাছের গোড়ায়। পৃ আঁতকে উঠে বললো,
‘করছেন কি?’
‘গাছ কাঁটি আম্মা। তুমি ইট্টু দূরে সইরে খাড়াও। শরীলে কুড়াইল পরবে নে ছুঁইটে।’
দুইটা লোক পৃ’কে ধরে গাছ থেকে দূরত্ব নিয়ে ছায়ার বাইরে রেখে আসলো। পৃ ঢোক গিললো। কাঠফাটা রোদে সমস্ত শরীর পুড়তে শুরু করেছে তার। সে কাতর স্বরে অনুরোধ জানালো, ‘গাছটা কাটবেন না প্লিজ।’ লোকগুলো কানও দিলোনা পৃ’র কথায়। পৃ পায়ের দিকে তাকালো নিজের। আঙুলের মাথা গলতে শুরু করেছে ধীরে। হালকা বাষ্প বের হচ্ছে। চোখ বুজলো। আর কখনো বোধহয় সূর্যোদয় দেখবেনা সে। মাথায় ঠাণ্ডা একটা স্পর্শ পেয়ে চেপে রাখা নিঃশ্বাস ছাড়লো শব্দ করে। একটা ছাতা। ধরে রেখেছে নয়- দশ বৎসর বয়েসী একটা বালক। গায়ের রঙ কালো। বেশ নাদুস নুদুস। ঠোঁটে হাসি। বললো,
‘যা গরম। ছাতার তলায় আসো।’ পৃ কাতর চোখে তাকিয়ে বললো,
‘আমায় একটু জলের কাছে নিয়ে যাবে?’
‘নদী? চলো। আমিও যাচ্ছি ওইদিকে। আচ্ছা, তুমি টের পাচ্ছো ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা একটা ভাব। কেন জানো?’
‘কেন?’
‘পানিতে ভিজিয়েছি ছাতাটা। একটু ওজন হয়ে যায় ভেজানোর পর। তবু গরম কম লাগে। নদীর কাছে গেলে আবার ভেজাবো।’
পৃ তাকিয়ে থাকে ছেলেটির দিকে। হড়বড় করে কথা বলে ছেলেটি হাঁটতে হাঁটতে। কথা বলার মানুষ খুঁজে পায়না। কোথাও তার কোনো বন্ধু নেই। না গ্রামে, না স্কুলে। বন্ধু হতে চায়না কেউ কার। ছেলেরাও না। মেয়েরাও না। পৃ হাত বাড়িয়ে বললো, ‘বন্ধু?’ ছেলেটি অবাক চোখে তাকিয়ে থেকে হাত বাড়ায়। এত সুন্দর একটা বন্ধু তার কখনো হবে সে স্বপ্নেও ভাবেনি। বালক বালিকা একটা ছাতা মাথায় হাঁটতে হাঁটতে নদীর কাছে পৌঁছায়। পৃ নদীর জলে পা ভিজিয়ে লম্বা একটা নিঃশ্বাস নিয়ে বললো,‘ঠিক আছে। এখন তুমি যাও। কাল আবার দেখা হবে এখানে।’ বালক মুচকি হেসে ছাতা ভিজিয়ে নিয়ে নদীর পাশ ধরে হাঁটতে থাকে। পৃ নেমে পড়ে জলে। পায়ে জল পেলে গায়ে রোদ মাখানো যায়। বুক অবধি ডুবিয়ে তাকিয়ে থাকে বালকের হেঁটে যাওয়ার দিকে। নদী মা ওইদিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে। পৃ ভ্রুঁ কুঁচকে বলে, ‘দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললে কেন ছেলেটার দিকে তাকিয়ে তুমি?’ নদী মা মুচকি হেসে বলে, ‘তোমার জানার অধিকার নেই।’ ‘আছে। মায়াং গ্রহের বাসিন্দা হিসেবে আমি একটা উইশ প্রাপ্য। যে কারোর ভবিষ্যত জানার।’ ‘পৃ, উইশ একটাই। এটা মায়াংরা ব্যবহার করে শুধুমাত্র নিজের জন্য।’
‘জানি। এই একটা উইশ দিয়ে নিজের মৃত্যু কখন হবে জেনে নেয় তোমার কাছ থেকে ওরা। একবার। তারপর ওই ভবিষ্যত পাল্টে নেয় মায়াংরা। মৃত্যুকে একবারের জন্য ফাঁকি দেয়। আমার বাবা মাও নিয়েছে উইশটা। সব মায়াংরাই নেয় একটা বয়স পর। এজন্যই মায়াংদের বয়স দুইশ কিংবা তিনশত হয়। কারণ একবার তারা মৃত্যু টপকাতে সক্ষম হয়।’ নদী মা চুপ করে থাকে। পৃ কঠিন স্বরে বললো, ‘আমার উইশটা আমি চাচ্ছি।’ ‘ভেবে নাও। তুমি কিন্তু একই সাথে তোমার ভবিষ্যত হারাতে যাচ্ছো।’ ‘ভেবে নিয়েছি। আপনি আমায় বলুন এই ছেলেটির ভবিষ্যত কী?’ নদী মা একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললো, ‘এই ছেলেটি মারা যাবে পঁয়তাল্লিশ বৎসর বয়সে। ভয়ানক একটা অসুখ রক্তে গিয়ে বাসা বুনবে।’ পৃ’র অশ্রুসজল চোখের দিকে তাকিয়ে নদী মা বললো, ‘আমি জানি ছেলেটিকে তুমি বাঁচিয়ে তুলবে হয়তো, যে কোনো মূল্যেই। আমি জানিনা কেন। তুমি বড্ড মানবী হয়ে উঠছো দিন দিন। এই গ্রহে মানবীদের বুঝা কঠিন।’
পৃ কোনো জবাব দিলোনা। বালক হাঁটতে হাঁটতে ততক্ষণে উধাও হয়েছে। রেখে গিয়েছে পায়ের ছাপ। কয়েক দলা শুভ্র মেঘের পুঁটলি এসে সূর্য ঢেকে ফেলেছে পুরোপুরি ততক্ষণে। পৃ ভেজা গায়ে নদী থেকে উঠে পায়ের ছাপে হাত বুলালো। অস্পষ্ট স্বরে বললো, ‘মৃত্যু তোমায় ছুঁবেনা। আমি আছি তোমার সাথে। কখনোই ছেড়ে যাবনা। যেতে দিলেও না।’ বর্তমান সময়। আজিজ ঝাপসা চোখে সামনে তাকিয়ে রইলো। তার থেকে দুই- তিন হাত দূরে সায়রা উপুড় হয়ে এই দিকে মাথা কাত করে তাকিয়ে আছে। দুই হাঁটু মুড়ে, কুণ্ডলী পাকিয়ে। যেভাবে মায়ের পেটে একটা বাচ্চা ঘুমিয়ে থাকে পরম নিশ্চিন্তে। আজিজের কান্না পেলো। মনসুর লোহার রড হাতে দাঁড়িয়ে রইলো। এইরকম একটা ঘটনা হবে কল্পনাও করেনি সে। সায়রার মাথার পেছনের অংশ হতে গলগল করে জল বের হচ্ছে। বাইরে বিদ্যুত চমকাচ্ছে এখনো। বৃষ্টি আসার নাম নেই। সায়রা হাত বাড়িয়ে চোখ হালকা খুলে কাতর স্বরে বললো, ‘আমায় একটু জলের কাছে নিয়ে যাবে?’
আজিজ ক্লান্ত চোখ দুটো প্রচণ্ড কষ্টে খোলা রাখলো। বুজতে দেয়া যাবেনা। ঠিক একত্রিশ বৎসর আগে এক বালিকা হাত বাড়িয়েছিলো পরম মমতায়। এইভাবে। আজিজ বহু খুঁজেও যে বালিকার দেখা পায়নি আর। সায়রা নড়ে উঠলো বেশ কয়বার। ব্যথায় গুঙিয়ে উঠলো। হতভম্ব মনসুর বাঁকানো লোহার রড হাতে দাঁড়িয়ে একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখলো। আজিজ ক্লান্ত বিধ্বস্ত শরীরে সায়রার নেতিয়ে পড়া শরীর কোলে তুলে নিয়ে দরজার দিকে ছুটেছে। বাইরে আরেকবার বিদ্যুত চমকালো। সায়রা প্রায় অবশ হয়ে আসা বাম হাত বাড়িয়ে আজিজের গালে একবার ছুঁয়ে দিয়ে চোখ বুজলো।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত