অভাব

অভাব
– সারাদিন খালি টাকা, টাকা। টাকা ছাড়া কি কিচ্ছু বুঝো না??
– আজিব, টাকা লাগলে চাবো না?? তুমি কামাই করো কার জন্য বুঝি না।
– আমি বাইরের থেকে আসছি, সব সময় টাকা টাকা করাটা কি খুব দরকার?? টায়ার্ড আমি, সারাদিন বসের গাল খেয়ে এসেছি। প্লিজ একটু শান্তি আমিও ডিজার্ভ করি। বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লাম। ভালো লাগছে না এই ঘরে থাকতে। সারাদিন কুত্তা খাটা দিয়ে বাসায় এসে সেই ঘ্যান ঘ্যান। উফফফ, টাকা টাকা, নন্দিনী টাকাবাদে কি কিছুই বুঝে না?? যেই বাড়িতে দু দন্ড শান্তি নেই সেই বাড়িতে কার থাকতে ইচ্ছে করে! ক্ষুধার্ত পেটে সোড়িয়ামের রাস্তায় হাটছি। এই রাতের বেলা সোডিয়ামের আলো অনেকটা হিপনোটিজমের কাজ করে। খুব সুন্দর অতীতকে সামনে তুলে ধরে। কলেজে থাকতে এক বড় ভাই বলেছিলো,
– প্রেম করছিস কর, বিয়ের পর দেখবি সব বদলে যাবে। ঠিক বলেছিলেন ভাই, আসলেই সব বদলে গেছে। নন্দিনী আর আমার বিয়েটা লাভ ম্যারেজ। দীর্ঘ সাত বছর চুটিয়ে প্রেম করার পর আমরা বিয়ে করেছি। পাশ করার পর প্রায় দুই বছর বেকার ছিলাম, অথচ এই বেকার ছেলেটার সাথে কোনো অভিযোগ ছাড়াই প্রেম করেছে নন্দিনী। এখনো মনে পড়ে একটা সময় এমন ছিলো যখন নন্দিনীর জন্মদিনে আমি ওকে শুধু দশ টাকার বাদাম দিয়েছি। আর মেয়েটা কোনো অভিযোগ ছাড়াই সেটা গ্রহণ করেছে। তখন ওকে যদি আমি কোনো বড় রেস্টুরেন্টে না নিয়ে রমনা পার্কের বেঞ্চিতে বসিয়ে একটা গোলাপ ফুল দিতাম তাতেও নন্দিনীর আক্ষেপ ছিলো না, হাসিমুখে ফুলটা নিতো। অন্য কোনো গার্লফ্রেন্ড হলে আমাকে কবে ছেড়ে দিতো। আমার জন্মদিনে আমার বন্ধুবান্ধবকে ট্রিট ও নন্দিনী ই দিতো। আমার বাসায় যেখানে দিনে ১০-১২ বার বেকারত্বের খোটা খেতে হতো, সেখানে নন্দিনী আমায় সাহস দিতো, মোটিভিশন দিতো,
– আরে আংকেল আন্টির বয়স হয়েছে তো, তোমাকে নিয়ে টেনশন করেন। তুমি একদম হার মানবে না, একটা না একটা চাকরি ঠিক হয়ে যাবে দেখো। ভরসা রাখো, আর আমি তো আছি। কি অদ্ভুত এই মেয়েটা আজ আমার সাথে কথাই বলে টাকা নিয়ে। আমি কি খাইলাম না খাইলাম তার কোনো ঠিক নেই, খোঁজ নেই শুধু একটাই কথা ওর মুখে,
– বেতন পাইছো? কবে পাবা? দুধ বিল বাকি, কাজের মেয়ের টাকা দিতে হবে। বিয়ের আজ সাড়ে আট বছর হবে, কিন্তু আজ যেন আফসোস হচ্ছে কেনো ওকে বিয়ে করলাম। এখনো মনে আছে যখন আমি প্রথম চাকরিটা পেয়েছিলাম, নন্দিনী খুব খুশি হয়েছিলো। আমার বেতন বেশি ছিলো না মাত্র বাইশ হাজার তাও কেন্টিন খরচ, ইন্সুরেন্স আরোও হাবিজাবি মিলে কেটেকুটে আঠারো হাজার পাঁচশ টাকা পেতাম, এই আঠারো হাজারের ছেলেকে বিয়ে করার জন্য কোনো নামি দামি স্ট্যাবলিশড ছেলের সম্বন্ধ ফেরত পাঠিয়েছিলো নন্দিনী। আমি যখন বলতাম,
– আমাকে বিয়ে করলে কিন্তু তোমাকে অনেক কষ্ট করতে হবে আমি অন্যদের মতো তোমাকে মাসে দুই তিন সেট কাপড় দিতে পারবো না, গহনা তো দূরের কথা। মেয়েটা মুচকি হাসি দিয়ে বলতো,
– কাজের থেকে আসার সময় আমার জন্য সপ্তাহের একবারবিশ টাকার বাদাম আর পাঁচ টাকার গোলাপ আনলেই হবে।
আমি হাসতাম আর ভাবতাম না জানি কোন পূন্যের ফসল ছিলো নন্দিনী, এতো ভালো ও মেয়ে হয় বুঝি। অথচ আজসে বদলে গেছে। বিয়ের দুই বছর আমাদের অনেক মেপে চলতে হতো, স্বাদ আহ্লাদ কোনকিছু করার সুযোগ ছিলো না বললেই হতো। মাঝে মাঝে নন্দিনীর জন্য বেলিফুলের মালা নিয়ে আসতাম, ও তখন ওর খোঁপায় পড়িয়ে দিতে বলতো। আমাদের টাকা পয়সা ছিলো না কিন্তু সুখের অভাব ছিলো না। ওর জন্মদিন কিংবা বিবাহ বার্ষিকীতে কিছু দিয়েছি কিনা সন্দেহ। ও অবশ্য দিতো টুকটাক টাকা জমিয়ে আমাকে দিতো, হয় একটা টাই নয় কাফলিংক্স। তখন ওর শাড়ি কিংবা গহনায় মোহ ছিলো না। আর এখন ওকে একটা শাড়ি দিলে ওর কোনো অভিযোগ থাকে না। আমার যখন বড় প্রমোশন হলো নন্দিনীর থেকে খুশি কেউ ছিলো না, ওর বাবাকে ফোন দিয়ে বলেছিলো ,
– দেখেছো বাবা, আমি বলেছিলাম না আমার জন্য ওর থেকে যোগ্য কোনো ছেলে নেই। ওর প্রমোশন হয়েছে। এখন ওর বেতন আটত্রিশ হাজার, সামনে দেখবে ইনশাল্লাহ আরোও প্রমোশন হবে দেখো। সেই সময় আমার থেকে সুখি আর কেউ ছিলো কিনা সন্দেহ। আমার বড় প্রমোশনটার পর আমার কাজের চাপ বাড়তে থাকে, প্রতিদিন বাড়ি আসতে দেরি হইতে থাকে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় আমাকে অফিস থেকে যেতে হতো। রাতে মাঝে মাঝে ক্লাইন্টদের সাথে খেয়ে আসতে হতো। নন্দিনী প্রথমে হালকা কমপ্লেইন করতো, কারণ বাসায় বেচারি একা থাকতো, বাবা-মা অন্য জেলায় থাকার জন্য আমরা দুইটা প্রানীই থাকতাম বাসায়। সারাদিন একা একা থাকতে থাকতে আমি বাসায় আসতে না আসতে ওর কথার বুলি ফুটতো। সারাদিন খেটে এসে ওর কথাগুলোও বিরক্ত লাগত। মাঝে মাঝে কথা কাটাকাটি হতো, আমি বাইরে থেকে খেয়ে আসতাম বলে নন্দিনীকে একা একা খেতে হতো।
আমার সেই দিনের কথা এখনো মনে আছে, আমাদের ষষ্ট বিবাহ বার্ষিকী ছিলো সেদিন। আমাদের প্লান ছিলো, নন্দিনী আমার সব পছন্দের খাবার বাড়িতে রান্না করবে আর আমি তাড়াতাড়ি অফিস থেকে এসে ওর সাথে একসাথে রাতের খাবার খাবো। তারপর আমরা একসাথে বসে ল্যাপটপে মুভি দেখবো। আমার প্লান ছিলো ওর জন্য একটা দামি গলার হার উপহার হিসেবে কিনবো, আমি কিনেও রেখেছিলাম। কোনোদিন ওকে কিছুই দিতে পারি নি বলে এটা হবে আমার দেয়া ওর শ্রেষ্ঠ গিফট। কিন্তু সব গোলমেলে হয়ে গেলো যখন বসের ফোন এলো। আমাকে সেদিন ইমার্জেন্সির জন্য গাজীপুর যেতে হয়। সারাদিন নন্দিনীর সাথে দু দন্ড কথা বলার সুযোগ পাই নি। বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত দু টা বেজে যায়। একে সারাদিনের খাটনি, কাজের প্রেসার উপর থেকে কেউ যদি খিটখিট করে কেমনটা লাগে। বাসায় এসে দেখি নন্দিনী খাবার টেবিলে খাবারের প্লেট সাজিয়ে বসে ছিলো। ওর মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছিলো না, চোখ মুখ ফুলে ছিলো। এক দুই কথায় আমাদের সেদিন খুব ঝগড়া হয়েছিলো, সরি নামক শব্দটা বললে হয়তো ঝগড়াতা থেমে যেতো, কিন্তু ওই যে রাগ। রাগের মাথায় বলেছিলাম,
– সময় মতো টাকা তো পাচ্ছো, বুঝবা কেমনে ? এতো কিছু একসাথে দিচ্ছি তাতে হচ্ছে না?? বিবাহ বার্ষিকীর এই যে গিফট দিচ্ছি, আর কিছু লাগবে বলে তো আমার মনে হয় না!! বলেই হারটা ছুড়ে বাথরুমে চলে যাই। সেদিন নন্দিনী খুব কেঁদেছিলো, হারটা ওকে কোনোদিন পরতে দেখিনি। যদিও এভাবে দেয়ার ইচ্ছে আমারো ছিলো না। পরে আর সরি বলবো বলবো করেও হয়ে উঠে নি। এরপর থেকে নন্দিনী কেমন যেন বদলে গিয়েছিলো, যে নন্দিনী বাচ্চা বাচ্চা করে আমার মাথা খেতো সেই নন্দিনী ভুলেও বাচ্চার কথা আমার সামনে বলতো না। ধীরে ধীরে সম্পর্কটা শুধু শারিরীক হতে লাগলো। আর কথা বললেই শুধু টাকা পয়সা, সম্পদ রিলেটেড। আমারো বিরক্ত লাগত যে নন্দিনী আমার সারাদিনের ঘতির ঘটনা পুঙ্খনুপুঙ্খভাব ে শুনতো সেই নন্দিনী শুধু হুম, হ্যা তে কথা বলতো।
আচ্ছা এতে কি আমাএ দোষ ছিলো? আমি তো ওকে সবদিক দিয়ে সুখি করতে চেয়েছি। তাই সারাদিন খেটেছি যাতে ওর কোনোকিছুতে অভাব না হয়। যখন যখন আমার সাথে ওর ঝগড়া হতো ওকে সরি বলেছি কিনা সন্দেহ। আচ্ছা তখন যদি সরি বলে জড়িয়ে ধরতাম তাহলে কি ওর সাথে ঝামেলা গুলো হতো না? নাকি কম হতো? আচ্ছা আজ যদি একটা গোলাপ হাতে বাড়ি ফিরি, আর ওকে দেই ওকি আমাকে আগের নন্দিনী ফেরত দিবে? করতে ক্ষতি কি? ঘড়িতে নজর পড়তেই দেখলাম এগারোটা বাজে, এতো রাত হয়ে গেছে আমার খবরই নেই। অনেক পথ এসেছি এখন ট্যাক্সি করে বাড়ি যেতে হবে। বাসার সামনে নামতেই দেখলাম, বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে নন্দিনী। আমাকে দেখেই ভেতরে চলে গেলো। সিড়িঘরের একটা টব থেকে একটা গোলাপ ছিড়ে ঘরে ঢুকলাম। নন্দিনী খাটে কাত হয়ে শুয়ে আছে। কাধে স্পর্শ করতেই উঠে বসলো,
– খাবার দিবো?
– তোমার জন্য (ফুলটা এগিয়ে দিয়ে), সরি।
রেগে ছিলাম তো, আজ অনেক কাজ ছিলো। সন্ধ্যা থেকে না খাওয়া ছিলাম। তুমি খেয়েছো? আমার দিকে ফ্যালফ্যাল নয়নে তাকিয়ে আছে নন্দিনী। না জানি কতোদিন পর এই আমিকে পেয়েছে, ওর চোখ চিকচিক করছে এখনি যেন নয়নজোড়া অশ্রুগুলোকে মুক্তি দিবে। আজ আমি বুঝতে পারলাম আসলে ওর বদল হয় নি, হয়েছে আমার বদল। টাকা পয়সা ইনকাম করতে করতে সুখ কুড়াতে ভুলে গিয়েছিলাম। আমি নন্দিনীকে কোনোকিছুর অভাব রাখি নি, রেখেছি শুধু সময়ের অভাব, আমার আমির অভাব।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত