মেহেরবান

মেহেরবান
আমার ভাইয়া যখন ভাবীকে আবার পড়াশোনা করতে বললেন তখন আমার মা আমার ভাবীকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করলেন। আমার মা’র ধারণা আমার ভাবী এই পুনরায় পড়াশোনা করার জন্য ভাইয়াকে কানাঘুষা করেছেন।মা মনে করেন এসবের পেছনে আয়েশা ভাবী দায়ি। কিন্তু আমার তা মনে হয় না। আমার ভাবী যথেষ্ট একজন ভালো ছাত্রী ছিলেন।
অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে থাকা অবস্থায় ভাইয়ার সাথে বিবাহ হয়। কিন্তু তিনি কখনো এমন কোনো কাজ করবেন না যার জন্য আমাদের সংসারের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। কিন্তু এইসব কথা আমার মা কিছুতেই বুঝতে চায় না। মামুন ভাই আমার মা’কে বুঝাতে চেষ্টা করেন কিন্তু মা কিছুতেই রাজি নন। মা মনে করেন বিয়ের পর পড়াশোনা করে কোনো লাভ নেই। সারাজীবন এই সংসারের ভেতর কাটাতে হবে। মেয়েরা পড়াশোনা করে ডিগ্রি অর্জন করলে সংসারের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। কিন্তু আমার ভাইয়া মা’কে নানান ভাবে বুঝান। একজন নারী শিক্ষা অর্জন করে প্রতিষ্ঠিত হওয়া কতোটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তিনি তবুও রাজী নন। তিনি ভাবীকে পরপুরুষদের সাথে মেলামেশা করার ব্যাপারে একদম ঘোর আপত্তি জানায়। কিন্তু আমার ভাইয়া হাল ছাড়ার পাত্র নন।নানা সংগ্রাম আর অধ্যবসায়ের ফলে অবশেষে মা’কে ভাবীর পড়াশোনা করার ক্ষেত্রে রাজী করান। কিন্তু মা মুখে স্বীকার করলেও মন থেকে হয়তো ব্যাপারটা মেনে নিতে পারেনি। মাঝে মাঝে ভাবীকে এই বিষয়ে নানান কথা শুনান।
ভাইয়া আর ভাবীর বিয়ের সবে দুমাস হবে। আমাদের পরিবারে আমরা দুভাই। বাবা কয়েকবছর আগে গত হয়েছেন।বাবা গত হবার পর ভাইয়া যতো দ্রুত সম্ভব পড়াশোনা শেষ করে একটি চাকরির জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েন। আমি সবে মাত্র ক্লাস টেনে পড়ি।আর তাই পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে ভাইয়ার উপর সংসারের সকল দায়িত্ব পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে প্রচেষ্টার পর ভাইয়া একটা ভালো চাকরি পায়। ভাইয়া চাকরি পাওয়ার কয়েকমাস পরেই মা ভাইয়ার বিয়ের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েন। তিনি যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব ভাইয়াকে বিয়ে দিয়ে ঘরে নতুন সদস্য আনতে চান। যেদিন মা আর মামুন ভাইয়া আয়েশা ভাবীকে দেখে আসলেন সেদিন আমি ভাইয়া আর মা’এর মুখে এক চিলতে প্রাপ্তির হাসি দেখেছি।মেয়ে নাকি দেখতে খুব সুন্দরী এবং চিন্তাশীল,বিনয়ী,শান্ত, জ্ঞানবুদ্ধি সবকিছুতেই নাকি তার ভেতর বিদ্যমান। ভাইয়া এতো খুশি হয়েছিলেন যে বাসায় এসে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য শুকরানা নামাজ আদায় করলেন। অদ্ভুত! আমি ভেবে পাচ্ছিলাম না যে একটা মেয়ে রূপবতী হলেই শুকরানা নামাজ আদায় করার কেন দরকার? কিন্তু আমি যখন ভাবীকে দেখি তখন ভাইয়ার এতো খুশি হওয়ার কারণটা উপলব্ধি করতে পারি। ভাবীর সম্পর্কে যা জেনেছিলাম তার থেকেও সুশীল এবং গুনবতী তিনি।
এরপর বেশ কিছুদিন পর আয়েশা ভাবী আমাদের ঘরে বউ হয়ে আসে। বিয়ের দিন ভাইয়ার মুখে রাজ্য জয়ের হাসি দেখেছিলাম। কিন্তু মা’র মুখে আমি সেই হাসিটা দেখেনি।এর কারণ ছিল মা চেয়েছিলেন মেয়ের বাড়ি থেকে মোটা অংকের যৌতুক নিতে। কিন্তু আমার ভাইয়া এসবের ঘোর বিরোধী ছিলেন। এজন্যই মা’এর মুখে সেই তৃপ্তির হাসিটা দেখতে পাইনি। কিন্তু এর রেশ পড়ে বিয়ের পর। বিয়ের পর আত্নীয় স্বজনরা যখন জানতে পারলো আয়েশা ভাবীর বাবা মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে কিছু দেয়নি তখন তারা ভাবীকে নিয়ে কানাঘুষা শুরু করলেন। আমার মনে আছে বিয়ের পরেরদিন ভাবীকে বধূবেশে বিছানার উপর বসিয়ে রেখে আমাদের আপনজনেরা ভাবীকে উক্ত বিষয়ে নানান কথা শোনাচ্ছিলেন।
বিয়েতে মেয়ের বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়িতে যৌতুক না দেওয়া যেন এক মস্ত বড় অপরাধ।আর আমার ভাবী হচ্ছে সেই অপরাধী।যা তারা ভাবীকে কথার মাধ্যমে বুঝাচ্ছিলেন।ভাবী লজ্জায় মাথা নিচু করে ছিলেন।কি বলবে ভেবে পাচ্ছিলেন না। আয়েশা ভাবীর পরিবার থেকে তার বাবা ভাইয়ার জন্য কিছু দিতে চাইলেও ভাইয়া তা অগ্রাহ্য করেন। আয়েশা ভাবীর পরিবার তেমন স্বচ্ছল ছিলেন না। তবুও তার মেয়ের সুখের জন্য যৌতুক হিসেবে কিছু দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভাইয়া কিছুতেই তা নেননি। কিন্তু এসব বিষয় আমাদের সমাজের উচ্চ শ্রেণীর নিম্ন বুদ্ধি সম্পন্ন লোকেরা কিছুতেই মানতে রাজি নন। রাহেলা খালা তো আয়েশা ভাবীর সামনে সোজাসুজি বলেই ফেললেন, “কেমন বাপ গো তোমার? মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে একটা ড্রেসিং টেবিল পর্যন্ত পাঠাইলো না। তোমার বাপ কি জানে না মেয়ের নতুন সংসারে এসব লাগে।নাকি তোমরা গরীব মানষের পোলাপান?”
ভাবী এই কথায় লজ্জায় মাথা তুলতে পারছিলেন না। মনে হচ্ছিলো একটু হলেই কেঁদে দিবে। কিন্তু হঠাৎ করে মামুন ভাইয়া এসে সবার সামনে বললেন, “বিয়ের জন্য মেয়ের বাপের বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়িতে মেয়ের সাথে টাকা পয়সা, ড্রেসিং টেবিল কি খুব দরকার?কেন? যৌতুক ছাড়া কি জীবন চলে না?একটা মেয়েকে সারাজীবন পালনের জন্য কি তার বাবার টাকা পয়সা এবং জিনিসপত্র খুব প্রয়োজন। তাহলে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে সারাজীবনের জন্য স্বামীর কাছে কেন পাঠানো হয়?তারাই তো পালতে পারতো। আমি ভেবে পাই না আপনাদের মতো উঁচু শ্রেণীর নিম্ন বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষদের মনে এই যৌতুক ব্যাপারটা সবসময় মাথায় কেন ঘুরে?আপনারা কি জানেন না যে যৌতুক দেওয়া নেওয়া ইসলামে হারাম। যৌতুক যে একপ্রকার জুলুম সেটা আমরা সবাই জানি এবং বুঝি তবুও আমাদের মাথার ভেতর একটা জিনিস ঘোরপাক খায় তা হলো মেয়ের বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়িতে যৌতুক দিতে হবেই।যদি তা না দেয় তবে মেয়েসহ মেয়ের পুরো পরিবার অপরাধী। স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা আল-কুরআনে জুলুমকারী দের উপর ঘৃণা পোষণ করেছেন।আর যৌতুক নেওয়া একটা বড় প্রকার জুলুম।
হাদিসেও এর ঘোর বিরোধী করা হয়েছে।আপনারা কি কখনো শুনেছেন যে মহানবী (সাঃ) তাঁর কণ্যাদের বিয়েতে এক পয়সা যৌতুক প্রদান করেছিলেন?যে কাজ কুরআন,হাদিস এবং শরিয়তে নিষিদ্ধ সে কাজ করে পাপ অর্জন করে কি লাভ? কিয়ামতের দিন এর হিসাব খুব ভয়াবহ। তবুও আমাদের মাথার একটা জিনিস ঘুরপাক খায় বিয়েতে যৌতুক লাগবেই। একজন পিতা তার সন্তানকে একটা অচেনা জায়গায় সারাজীবনের জন্য একটা অচেনা ছেলের হাতে তুলে দিয়ে যে ত্যাগ স্বীকার করে সেটার যে কষ্ট যে ক্ষত তা আমরা সবাই জানি কিন্তু আমরা কখনো সবাই সেটা ভাবি না। আমরা শুধু ভাবি বাবা মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন যৌতুক না দিলে মেয়ে সংসারে কোনো মর্যাদা পাবে না। ধিক্কার জানাই এসব মানুষের চিন্তা ভাবনার প্রতি। যৌতুক দিয়েই যদি সংসারে মেয়েকে সুখী করতে হবে তবে কোনো মেয়েকে বিয়ে করা উচিত নয় বরং তার বাবার টাকাকে করা উচিত।”
রাহেলা খালা ভাইয়ার এসব বাণী শুনে প্রচন্ড রেগে গেলেন। তিনি সোজাসুজি ভাইয়াকে বললেন, “তা না হয় তোর সব কথা শুনলাম, বুঝলাম। কিন্তু তাই বলে কি মেয়ের জামাইরে শ্বশুর কিছু দিব না? সারাজীবন মেয়েকে যার কাছে থাকবো আর পালবো তার জন্য কিছু দেওয়া কি উচিত না?” ভাইয়া রাহেলা খালার কথায় মুচকি হেসে বললেন, “অবশ্যই দিবে এবং দিয়েছেন ও।তার কলিজার টুকরো সন্তানকে একজন অচেনা ছেলের হাতে সারাজীবনের জন্য তুলে দিয়েছেন এটা কি আমার জন্য কম বড় পাওয়া নয়।আর সারাজীবন মেয়েকে সুখে রাখার জন্য হয়তো তিনি খুশিমনে কিছু দিবেন সেটা হয়তো বড় অথবা ছোট। কিন্তু সেটা হবে আমার জন্য এক অপ্রত্যাশিত উপহার।আর উপহার পাওয়াটা কোনো অন্যায় নয় বরং উপহার জোর করে চেয়ে নেওয়াটা হচ্ছে অন্যায়। আমি তাদের কাছ থেকে অপ্রত্যাশিত জিনিসটাই পেতে চাই কোনো ধরণের দয়া বা জুলুম জাতীয় কিছু নয়।”
রাহেলা খালা ভাইয়ার এইসব কথায় কি বলবে বুঝতে পারছিলেন না। কিন্তু বেশ রেগে গেছে তা বেশ বুঝতে পারছিলাম। তিনি আর কিছু না বলে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সেখান থেকে চলে গেলেন।তার সাথে অন্যান্য আত্নীয় স্বজনরাও ঐ স্থান ত্যাগ করলেন। আমি অবাক চোখে শুধু ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। সত্যি বলতে ভাইয়ার ভাবীর প্রতি এমন আন্তরিকতা দেখে আমি মুগ্ধ না হয়ে পারছিলাম না। পরক্ষণে আল্লাহর কাছে ভাইয়ার জন্য মন থেকে হাজার কোটি শুকরিয়া আদায় করলাম। একজন প্রকৃত শিক্ষিত ব্যাক্তির মনোভাব আমার মনের ভেতরে সত্যি সেদিন নাড়া দিয়েছিল। আয়েশা ভাবী ভাইয়াকে বিছানা থেকে উঠে দৌড়ে জড়িয়ে ধরলেন। ভাইয়া ভাবীর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে তাকে শান্তনা দিতে লাগলেন। প্রথমে ভাবী হয়তো ভয়ে ভয়ে ছিলেন আমাদের এই নতুন পরিবেশে। কিন্তু এরপর তার মনের ভেতর সে ভয়টা হয়তো বিলীন হয়ে ভাইয়ার জন্য শ্রদ্ধাবোধে পরিণত হয়েছিল।আর ভাইয়া ভাবীকে কখনো অসহায় ভাবতে দিবেন না। আঁকড়ে ধরে রাখবে সারাটি জীবন। কারণ ভাইয়া যে সত্যের পথে লড়াই করতে জানে।
বিয়ের পর আয়েশা ভাবীকে নতুন সংসারে নানান সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। নতুন সংসার, নতুন সদস্য, নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে খুব পরিশ্রম করতে হয়েছিল। কিন্তু সবকিছুর পেছনেই মামুন ভাই ভাবীর পাশে ছিলেন। আয়েশা ভাবীকে কখনো একা অসহায় ভাবতে দিতেন না। সবকিছু ঠিকঠাক ছিল কিন্তু ভাবীর এই পড়াশোনা বিষয়ে সংসারে সমস্যা সৃষ্টি হলো। আমার মা কিছুতেই ভাবীর পড়াশোনা ব্যাপারে মেনে নিতে পারেননি।আর তাই নানান বাহানায় ভাবীকে মা ঐ একই বিষয় নিয়ে কথা শুনাতেন। কিন্তু আমার ভাবী কিছু বলতেন না।
সবসময় চুপচাপ থাকার চেষ্টা করেন। আমি ভাবীর ধৈর্য্য ধারণ দেখে অবাক হই। আল্লাহ তায়ালা পুরুষদের শারীরিক সহ্য করার ক্ষমতা হয়তো বেশি দিয়েছেন কিন্তু নারীদের মানসিক সহ্য করার ক্ষমতা যে তার থেকেও বেশি তা আমি ভাবিকে দেখে বুঝেছি।ভাবী সবসময় মা’র মন জয় করার জন্য চেষ্টা করতেন।ভাবী আগে থেকেই নিয়মিত নামাজ, কুরআন শরীফ পড়তেন। ভার্সিটিতে পর্দা করে যেতেন। কিন্তু তবুও মা’র মন কিছুতেই জয় করতে পারেননি। ডিগ্রি অর্জন করা মেয়েরা কখনো ভালো হয় না।এরা সংসারের প্রতি উদাসীন। কিন্তু ভাবী সংসারের প্রতি আন্তরিক হওয়া সত্ত্বেও মা’র সেই এক কথা মেয়েদের পড়াশোনা করে কোনো লাভ নেই। সংসারের দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত।
এসব বিষয় মাঝে মাঝে ভাইয়ার চোখে ধরা পড়তো। তখন ভাইয়া ভাবীকে বলতেন, “মা’র কথায় তোমার খুব কষ্ট হয় তাই না?” ভাবি ভাইয়ার কথায় মুচকি হেসে বলতেন, “উহু!মোটেই না। একদম কষ্ট হয় না।যার জন্য এমন একজন স্বামীকে পেয়েছি যে আমাকে একজন স্ত্রীর মর্যাদা নয় বরং একজন পরিপূর্ণ নারী হতে উৎসাহ প্রদান করে তার মা’র কথায় কি কখনো মন্দ মনে হয়? হ্যাঁ, তিনি আমাকে তেমন সহ্য করতে পারেন না। নানান কথা শুনান। কিন্তু আমার আল্লাহর উপর পূর্ণ বিশ্বাস আছে একদিন মা আমাকে নিজের মেয়ে হিসেবে মেনে নিবেন। আমি সেইদিন পর্যন্ত ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করবো।কারণ আল্লাহ ধৈর্য্য ধারণকারীর জন্য সবসময় কল্যাণকর জিনিসটা রেখেছেন।” ভাইয়া ভাবীর এসব সুন্দর কথায় মুগ্ধ হয়ে কি বলবে ভেবে পেতেন না। মনে মনে শুধু এমন পূণ্যবতী এক নারীকে অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে পাওয়ার খুশিতে মহান আল্লাহর নিকট শুকরিয়া আদায় করতেন।
প্রায় দু’বছর পর ভাবী অনার্স কমপ্লিট করে তার পড়াশোনা শেষ করলেন। ভাইয়া চেয়েছিল ভাবী কিছু একটা করে নিজের পায়ে স্বাবলম্বী হতে। কিন্তু ভাবি নিজের জন্য আর না ভেবে সংসারের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিতে চাইলেন। আমি মেট্রিক পাশ করে ডিপ্লোমা শুরু করেছি। আল্লাহর রহমতে বেশ ভালোই চলছিল। কিন্তু মাস তিনেক পর হঠাৎ করে ভাইয়া মারাত্মক ভাবে বাইক এক্সিডেন্টে হয়। হাতে পায়ে প্রায় তেরো জায়গায় সার্জারি করতে হয়। ডাক্তার ভাইয়াকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে বলেছেন।ঠিক কবে ভাইয়া সম্পূর্ণ ভাবে সুস্থ হবেন এই বিষয়ে ডাক্তার কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারেনি।একটি দূর্ঘটনা আমাদের সবার জীবনে এক নতুন মোড় নিয়েছিল। এমতাবস্থায় আয়েশা ভাবী আমাদের সবার পাশে একনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ালেন। সংসার চালানোর জন্য একটা চাকরি নিলেন। একজন নারী হিসেবে চাকরি পাওয়া যে কতো সমস্যা তা ভাবী বেশ বুঝতে পারছিলেন। চাকরির ইন্টারভিউ দেওয়ার সময় সবাই শুধু বলতো, “আপনি একজন মেয়ে মানুষ, আপনি পারবেন তো?”ভাবী নিজেকে যথেষ্ট সংযোত রেখে বলতো, “আমি পারবো।”কিন্তু ভাবীর চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করতো, “তোকে জন্ম দেওয়ার সময় তোর মা যে কষ্ট পেয়েছিল তার কাছে এই কষ্ট কিছুই নয়।
একজন নারীর পেট থেকে জন্ম নিয়ে নারীর সামর্থ্য নিয়ে কথা বলতে তোর লজ্জা করে না?”কিন্তু সমাজের মানুষ রূপী জানোয়ার দের জন্য এই ধিক্কারজনক কথাগুলো শুধু অন্তরের ভেতর লুকায়িত থাকতো।মুখ ফুটে বলার মতো সাহস হতো না। আমাদের সমাজই এরকম। অন্যের দূর্বলতা নিয়ে খেলা করতে সবাই পছন্দ করে।আর সে যদি এক অসহায় নারী হয় তবে তো কোনো কথাই নেই।এরা নারীদের শুধু নিশিকণ্যা ভাবে নিশিজননী নয়। আয়েশা ভাবীকে এইসব নিয়ে কম কথা শুনতে হয়নি। সমাজের মানুষ নানান রকম কথা বলতেন। আয়েশা ভাবীর পরিবার থেকে ভাবীকে আবার নতুন বিয়ে করার জন্য বলেন। কিন্তু ভাবী নিজের পরিবারের মুখে এসব কথা সহ্য করতে না পেরে পরিবারের সাথে সবধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। কিন্তু সমাজের কথা থেমে থাকে না। বিয়ের বয়স কম বলে সবাই শুধু নতুন করে জীবন গড়তে বলে কিন্তু কেউ এদের দুজনের মনের ভেতর ভালোবাসার যে গাঢ়ত্ব সেটাকে উপলব্ধি করে না।
শুধু যে ভাবীকে এসব কথা শুনতে হতো তা নয়, আমার ভাইয়াও ছিল একজন ভুক্তভোগী।সবাই শুধু খোঁচা মারা কথা বলতো। আশেপাশের লোকজন বলতেন, “কপালে একটা বউ পেয়েছে। কতোজন আর নিজের বউ এর টাকায় চলতে পারে।”ভাবী এসব কথা সহ্য করতে পারলেও ভাইয়া পারতেন না। নিজের জীবনের অনিশ্চিয়তার সাথে ভাবীকে তিনি কিছুতেই জড়িত করতে চাননা। ভাবিকে ভাইয়া একদিন বলেছিল, “এভাবে আর কতো অনিশ্চিয়তার মাঝে নিজের জীবন নষ্ট করবে? নতুন করে জীবন শুরু করে নাও।” ভাবী সেদিন ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, “আমি নিশ্চিত অনিশ্চিত কিছু বুঝি না। আমি আমার এই মানুষটিকে ঘিরে যে ইহকাল পরকাল এক সাথে থাকার স্বপ্ন দেখেছি সেই স্বপ্নটাকেই বুঝি। আপনি আমার প্রাণপ্রিয় স্বামী। আল্লাহর কাছে এক অশেষ রহমত স্বরূপ।
আপনাকে ছেড়ে আমি নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন কেমন করে দেখি? আপনি কি জানেন না আইয়ূব নবীর আঠারো বছর এক কঠিন অসুখ হওয়া সত্ত্বেও রহিমা বিবি তাকে কখনো ছেড়ে যাননি। আল্লাহর কাছে ধৈর্য ধারণ করে স্বামীর পাশে থেকেছেন। তাহলে আমি কেন তা পারবো না? আমি আমার স্বামীকে কি কম ভালোবাসি? আপনি দেখবেন একদিন সব ঠিক হয়ে যাবো। আমি আল্লাহর কাছে আপনার জন্য প্রতিদিন কান্নাকাটি করবো। আল্লাহ যতোদিন চান ততোদিন আমি ওনার কাছে প্রার্থনা করবো। আপনার জন্য প্রয়োজনে সারাজীবন ধৈর্য্য ধারণ করবো। আমার বিশ্বাস আল্লাহ তায়ালা আমাদের নিরাশ করবেন না। আল্লাহ ধৈর্য্য ধারণকারীর জন্য সবসময় কল্যাণকর জিনিসটা রাখে। কিন্তু আমি আপনাকে ছাড়া বাঁচতে পারব না।”
সেইদিন ভাইয়া ভাবী দুজনের অনেক কান্নাকাটি করেছেন। অবশেষে তারা দুজনে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে তারা একে অপরকে কখনো ছেড়ে যাবে না। সত্যি যে নারী আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে সে নারী তার স্বামীকে জীবন উজাড় করে ভালোবাসতে পারে তা আমি আয়েশা ভাবিকে দেখে জেনেছি। একজন আল্লাহ প্রেমী নারী যে কতোটা স্বামীভক্ত হতে পারে যে জীবনে শত বাধার পরেও আল্লাহর উপর ভরসা রেখে স্বামীকে ছেড়ে যেতে চায় না তার পরোক্ষ উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে আমার আয়েশা ভাবীকে আমি উপলব্ধি করেছি।
বছরখানেক ধরে আয়েশা ভাবী নিজের মাঝে সংগ্রাম করে আমাদের সংসারের সকল দায়িত্ব পালন করছেন। আমাদের ভালো রাখার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করছেন। ভাইয়া এখন হুইলচেয়ার থেকে লাঠি দিয়ে হাঁটতে সক্ষম হয়েছে। মায়ের কাছে এখন ভাবীকে আর কুটু কথা শুনতে হয় না। বরং তিনি এখন ভাবীর জন্য সবসময় আল্লাহর কাছে দোয়া করেন।মা বুঝতে পেরেছে যে নারীরা শিক্ষিত হলে কতো উপকার। এখন একজন নারীর উপর আমাদের সংসার পরিচালিত হয়।এই নিয়ে মা মাঝে মাঝেই ভাবির কাছে অনুসূচনা করেন।ভাবী মা’কে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে নিজেও কেঁদে ফেলেন। আমি দূর থেকে এসব দেখে নিজের মাঝে উপলব্ধি করি এক মেহেরবানকে।আমি মনে করি ভাবী হচ্ছে আল্লাহর দেওয়া আমাদের সবার জন্য এক মেহেরবানস্বরূপ।যে নিজের হাসিটাকে লুকিয়ে রেখে অন্যের হাসির জন্য লড়াই করে।
হয়তো সমাজে নারীদের এখন সেই ধৈর্য সেই একনিষ্ঠতা হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যার দিলে আল্লাহর ভক্তি আছে সে আল্লাহর দেওয়া নিয়তির সবকিছু জয় করতে শিখে।দিলের ভেতর মহব্বত, সাহস, ভালোবাসা সব দেওয়ার মালিক তো মহান আল্লাহ তায়ালা। তিনি যার দিলে মহব্বত,সাহস, ভালোবাসা দান করেন সে কখনো নিরাশ হয় না। আল্লাহকে যে ভালোবাসে আল্লাহর দেওয়া নিয়তির সবকিছুতে সে সফল হয়। শুধু প্রয়োজন আল্লাহর উপর পূর্ণ ধৈর্য্য ধারণ করা।আর যা আমি আমার মহব্বতময় আয়েশা ভাবীকে দেখে উপলব্ধি করতে শিখেছি। আজ ভাইয়া ভাবীর বিবাহ বার্ষিকী। ভাইয়া ভাবীর জন্য একটি কুরআন শরীফ আর জায়নামাজ কিনার জন্য টাকা দিয়েছেন। কিন্তু আমি এই উপহারগুলো আমি নিজের টিউশনির টাকা থেকে দিতে চাই। আমাদের সংসারের সেই একনিষ্ঠ নারীর জন্য ।যার মহব্বতে দিনশেষে সবার মুখে সুখের এক চিলতে হাসি ফুটে উঠে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত