ব্যাকস্পেসের গল্প

ব্যাকস্পেসের গল্প

তিন বছর পরে অনন্যার ম্যাসেজ। টুং করে ম্যাসেজ আসার শব্দটা এখনো পেন্ডুলামের মতো বুকে বাজছে। অনেক অনেকটা সময় ইনবক্সে ম্যাসেজটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। গাঢ় হয়ে থাকা কালো লিখাটা সীন করলেই হালকা হয়ে যাবে। একটা মাত্র কথা, “কেমন আছো?” যেন কত হাজার বছর পরে কেউ এসে জিজ্ঞাস করলো কথাটা। ম্যাসেজটা সীন করে রিপ্লাই দিলাম, “ভালো। তুমি?”
প্রায় সাথে সাথে অনন্যার রিপ্লাই দিলো। আজ কতদিন পরে ওরে নামের পাশে সবুজ বিন্দু জ্বলছে।
অনন্যা: আমিও। কি করছিলে? ব্যস্ত?
ফয়সাল: কিছু করছি না।
অনন্যা: রাতে খেয়েছো?
ফয়সাল: হুম।
অনন্যা: এতো রাতে ঘুমাইনি যে!
ফয়সাল: এমনি।
অনন্যা: বিরক্ত করলাম?
ফয়সাল: নাহ ঠিক আছে, বলো।
অনন্যা: তেমন কিছু না। এমনি নক দিলাম।
ফয়সাল: ওহ।
অনন্যা: আমি রাতে খেয়েছি কিনা জিজ্ঞাস করবে না?
ফয়সাল: (ব্যাকস্পেস: তুমি তো আর আমি খেয়েছি কিনা সেই ম্যাসেজের রিপ্লাইয়ের অপেক্ষা করো না। নতুন মানুষের খাওয়া দাওয়ার খোঁজ নাও। সে-ই নিশ্চয় তোমারও সবকিছুর খোঁজ নেয়। আমি আর জিজ্ঞাস করার কে?)
রাতে খেয়েছো?

অনন্যা: হ্যাঁ! এখনো কি রাত জেগে কবিতা লিখো?
ফয়সাল: (ব্যাকস্পেস: আমি তো কবি ছিলাম না কখনো অনন্যা। তোমায় নিয়ে অনুভূতি গুলো আমি লিখতাম পাতার পর পাতা। তুমি সেসবের নাম দিয়েছিলে কবিতা। আমি তো কবিতা লিখতাম না। আমি তোমাকে লিখতাম। তুমি চলে যাওয়ার পরে কিসের অধিকারে তোমায় লিখবো। তুমি নামক শব্দটার সাথে এখন কবিতা শব্দটাও মুছে গেছে অনন্যা।)
না লিখি না?
অনন্যা: কেন?
ফয়সাল: (ব্যাকস্পেস: অনন্যা… তুমি কি সত্যিই জানতে চাও কেন লিখি না? নাকি তোমার জন্যই যে কবিতা লিখতাম এটা আমার কাছ থেকে শুনতে চাইছো? তুমি নেই। কবিতা নেই। অনুভূতিকে তরতর করে বেয়ে উঠে যাওয়া কোন শব্দ নেই। বর্ণমালা নেই। তুমি তো শুধু একা আমার কাছ থেকে চলে যাওনি। সাথে করে নিয়ে গেছো আমার অনুভূতির আশ্রয়ও।)
কবিতা আসে না তাই লিখি না।
অনন্যা: ওহ। আমার কথা কি তোমার মনে পরে ফয়সাল?

ফয়সাল: (ব্যাকস্পেস: আমার এমন একটা দিন নাই এই তিন বছরে, যেদিন তোমার কথা মনে পরে নাই। হয়তো বাড়াবাড়ি মনে হবে কথাটা শুনে। কিন্তু এটাই সত্যি। আমার জীবনের সবকিছু তো তোমাকে নিয়েই ভাবা। আমার জীবনে তুমি আসার পরে তো তোমাকে ছাড়া কিছু ভাবিনি আমি। কি করে ভুলি বলো। তুমি হয়তো নাই। কিন্তু সেই স্বপ্ন গুলোতো আজো আছে। তুমি রয়ে গেছো সেখানে। ঠিক যেমন ছিলে।) মাঝেমাঝে মনে পরে। অনন্যা: ওহ। এতো দেড়ি করে রিপ্লাই দিচ্ছো যে? অন্য কারো সাথে চ্যাট করছো? ফয়সাল: (ব্যাকস্পেস: এখন আমার কারো সাথেই তেমন কথা হয় না। চাইলে বলাই যায়। কিন্তু জানো, আমার এখন কারো সাথে প্রয়োজনের বাইরে কথা বলতে ইচ্ছে করে না। তোমাকে ম্যাসেজ লিখে লিখে মুছে ফেলছি। এই জন্য দেড়ি করে রিপ্লাই পাচ্ছো। আর কেই বা আছে যার সাথে এতো রাতে চ্যাট করতে পারি!)

হ্যাঁ! একটা বান্ধবী আছে। ওর সাথেই চ্যাট হচ্ছে। ফাঁকেফাঁকে তোমাকেও ম্যাসেজ দিচ্ছি।
অনন্যা: আমি বিরক্ত করছি না তো? এই কারণেই তাহলে রাত জেগে আছো। তখন কেন বললে এমনি জেগে আছো। বান্ধবীর কথা বললেই পারতে। তোমার ভার্সিটির বান্ধবী নাকি নতুন পরিচিত?

ফয়সাল: (ব্যাকস্পেস: কি আর বলি তোমাকে বল। আসলে সত্যিই কিছু বলার নেই। বান্ধবীর সাথে রাত বিরাতে চ্যাট। আজ এই বান্ধবী কাল ঐ বান্ধবী। আমার সম্পর্কে তোমার সারা জীবন এমনই ধারণা ছিল। জানি এই ধারণা আর বদলাবে না। না বদলালেও ক্ষতিও কিছু নেই। অথচ আমি বললাম আর তুমি সেটাই ধরে নিলে। এখনো বুঝলে না আমায়। চিনলেও না। রাত আমি কেন জাগি, সে আমি নিজেও জানি না। ঘুম আসে না। তোমার জন্য যে কষ্ট পেয়ে রাত জাগি এমনটা আবার ভেবো না। তুমি আমার কষ্ট না। তুমি আমার হারিয়ে যাওয়া শান্তি।)

তা একটু বিরক্ত তো করছোই। ভার্সিটির না, নতুন পরিচয়। সপ্তাহ খানিক হয় কথা হচ্ছে। বেশ ভালো লাগে কথা বলতে। মনটা ফুরফুরে হয়ে যায়। অনেক গান শোনায়। কবিতা পড়ে শোনায়। রাত যে কি করে পার হয়ে যায় বুঝি না। আসলে ওর কথা বলতে ইচ্ছে করছিলো না তোমাকে। তাই বলছিলাম এমনি রাত জাগি।
অনন্যা: তাহলে আর বিরক্ত না করি। তোমাদের সময়টা নষ্ট করছি… আচ্ছা কি নাম মেয়েটার। অনেক সুন্দরী দেখতে?”

ফয়সাল: (ব্যাকস্পেস: অনন্যা… তুমি জানো না তুমি আমার কতবড় এক দীর্ঘশ্বাসের নাম। কতটা ভালবাসি তোমায় সেটা কখনো বুঝতে চাওনি। আজো না। কেবল নিজের মনগড়া সন্দেহ আর যা ইচ্ছে ভেবেছো। তুমি আজ যেভাবে ভাবতে চাও সেভাবেই ভাবাবো তোমায়। আমার এখনো মনে আছে তোমার জন্মদিনে একটা ড্রেস গিফট দিয়েছিলাম। কতটা ভালো লাগা কাজ করে জানো, ভালবাসার মানুষকে কিছু দিতে পারলে। তুমি ড্রেসটা হাতে নিয়ে বললে, “কোন মেয়েকে সাথে নিয়ে কিনেছো! তোমার কোন বান্ধবী পছন্দ করে দিয়েছে এটা। তুমি তো তোমার একটা শার্টই ভালো করে কিনতে পারো না। মেয়েদের ড্রেস কি করে কিনবে?” কতটা ভেঙ্গেছিল বুকটা সেদিন তোমায় বোঝাতে পারিনি। আজও পারবো না। তোমরা মেয়েরা সম্পর্কের দিক থেকে অনেক সুবিধাজনক জায়গায় থাকো। কোন ছেলে কোন মেয়েকে ছেড়ে চলে গেলে সেই ছেলে হয়ে যায় প্রতারক, লম্পট, বাজে ছেলে। আর মেয়েটা যদি চলে যায় তাহলে নিশ্চয় ছেলেটার অনেক দোষ ছিল। ছেলেটাকে ছেড়ে ভালোই করেছে। বাদ দাও এসব। কোন মেয়ের সাথেই কথা হয় না; কি করে বলবো নাম কি। আর যেই মেয়েদের সাথে কথা হয় টুকটাক তাদের সবার নামই তোমার জানা।) নাম লাবণী। অবশ্য আমি ডাকি বণী বলে। ও খুব খুশি হয়। দেখতেও বেশ সুন্দরী। আমাকে ওর পাশে মানায় না। কথা বলার পাঁচদিন পরেই আমরা দেখা করেছি। যাই হোক ওর গল্প শুরু হলে আর থামতে পারবো না। তোমার কথা বলো শুনি। অনন্যা: আমার কি কথা। আমার কোন কথা নাই। আচ্ছা শোন আমার মাথা ব্যথা করছে। আমি রাখি। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে।

ফয়সাল: (ব্যাকস্পেস: জানি তোমার মাথা করছে না। কি আজব তোমরা মেয়েরা। একজনকে ভালবেসে তাকে ছেড়ে চলে যাবে। অথচ তারপরেও চাও তার বুকে যেন তোমাকে জিইয়ে রাখে। যেন আমার আর অন্য কাউকে ভালবাসার অধিকার নাই। তুমি নিজেও এখন অন্য কারো। অথচ আমার কাছে অন্য কেউ এলেই তোমার আর সহ্য হয় না। যেন তোমার জন্য কষ্ট পেয়েই বাকি জীবন আমার মরা লাগবে। তোমার জন্য আমি কষ্ট পাই না অনন্যা। কষ্ট পাই আমি আমার মনের শান্তির জায়গায় রেখেছিলাম তোমাকে এই জন্য। তুমি সেই জায়গাটা বিচ্ছিরী ভাবে নোংরা করে চলে গেছো।)
আচ্ছা ঠিক আছে রাখো। শুভরাত্রি।
অনন্যা: শুভরাত্রি… ফয়সাল শোনো!
ফয়সাল: বলো।
অনন্যা: তুমি কি এই মেয়েটাকে বিয়ে করবে?
ফয়সাল: কেন জানতে চাইছো?
অনন্যা: না কিছু না… এমনি। একবার অন্বি বলে ডাকবে? কতদিন শুনি না তোমার কাছ থেকে।
ফয়সাল: (ব্যাকস্পেস: অন্বি… অন্বি… অন্বি… চিৎকার করে ডাকতে ইচ্ছে করছে। সারা শহরে প্রতিধ্বনি হোক অন্বি… অন্বি… অন্বি। কত কত দিন পরে আমার কাছে এই ডাকটা শুনতে চাইলে অন্বি। কত যে ভালবেসে এই নামে তোমায় ডাকতাম। একবার ফোন দিয়ে এই নাম ধরে ডাকিনি বলে সারা রাত আমার সাথে কথা না বলে মুখ ফুলিয়ে বসেছিলে ফোন বন্ধ করে। আজ কত কত দিন তোমায় ডাকি না। জানি এখন আর তোমার কোন অভিমান হয় না। নতুন মানুষ হয়তো আরো কতশত নতুন নতুন নামে ডাকে তোমায়। সেখানে এই অন্বি নামটা হয়তো চাপাই পরে গেছে।)
বুঝলাম না। কি ডাকবো। তোমার নাম তো অনন্যা।
অনন্যা: কেন তুমি আমায় যে অন্বি বলে ডাকতে ভুলে গেছো।
ফয়সাল: কি জানি আমার মনে পরছে না।
অনন্যা: তুমি সত্যি ভুলে গেছো ফয়সাল? অথচ এই নাম ধরে না ডাকলে আমি কেমন গাল ফুলাতাম। সব ভুলে গেছো তুমি?

ফয়সাল: দেখো কখন কোন সময় তোমায় কি না কি বলে ডাকতাম সেসব কি মনে থাকার কথা। বাদ দাও তো।
অনন্যা: কি না কি বলে ডাকতে মানে? এসব কি বলছো। আমাকে কি না কি বলে ডাকতে তুমি! ছিঃ এতোটা বদলে গেছো তুমি। নতুন নতুন বান্ধবী জুটচ্ছো। কাকে কি নামে ডাকো সেসব আর মনে থাকে না তাই না। আজ কতদিন পরে তোমার সাথে কথা হচ্ছে। এতটুকু উচ্ছ্বাস নেই তোমার মাঝে। তুমি এতোটা বদলে গেছো ফয়সাল?
ফয়সাল: (ব্যাকস্পেস: তোমার সাথে এতদিন কেন। আর কোনদিনই তো কথা বলার কথা ছিল না অন্বি। মনে আছে তুমি কি বলেছিলে? আমাকে দেখলেই তোমার মেজাজ খারাপ হয়। ঘেন্না করতেও তোমার ঘেন্না হয়। নিজে আজ আমায় অনব্লকড করে ম্যাসেজ দিয়ে এখন হিসাব করছো আমি বদলে গেছি। তোমার সাথে কথা বলতে আমি উচ্ছ্বাস পাবো কোথা থেকে। আমার সব উচ্ছ্বাস তো তুমি সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলে। তবুও তোমায় নিয়ে কাটানো সেই সময়েই তোমায় আমি বেঁধে রেখেছি। আমাকে ছেড়ে যাওয়া তুমি কিংবা এই তুমি কোথাও আমার মাঝে নাই। আমার বদলে যাওয়ায় তোমার আজ আমাকে ছিঃ ছিঃ বলতে বাঁধছে না। অথচ যাকে ছেড়ে চলে গেলে তাকে আবার এতকাল পরে তার মনে তোমার শূন্যতাটা খোঁচাতে ছিঃ ছিঃ মনে হচ্ছে না।)

বদলে তো সবাই যায় সময়ের সাথে সাথে। অতীত নিয়ে কে পড়ে থাকে বলো। একজন জীবনে এলে আগের জনের হিসাব কষে লাভ কি? কিসব ছাইপাঁশ নাম ধরে ডাকতাম সেসব কি আর মনে থাকে বলো!
অনন্যা: আমার আসলে নিজের উপরেই এখন বিরক্ত লাগছে। কেন তোমার মত একটা ছেলেকে ম্যাসেজ দিতে গেলাম। তোমাকে ছেড়ে চলে গিয়ে আমি যে ভুল করিনি সেটা আবারো প্রমাণ করলে। সুন্দরী বান্ধবী পেয়ে ভাবছো অনেক কিছু হয়ে গেছো। কেউ টিকবে না তোমার কাছে। কেউ না। অসহ্য লাগছে ভাবতেই যে তোমার মত একটা ছেলের সাথে আমার রিলেশন ছিল। ছিঃ! আর ম্যাসেজ দিবে না। বাই।

ফয়সাল: (ব্যাকস্পেস: আজ সত্যি আমি প্রমাণ করে দিলাম আমাকে ছেড়ে গিয়ে তুমি ভালো করেছো। সত্যি ভালো করেছো। আচ্ছা অন্বি, তুমি আমাকে ছেড়ে যে চলে গেছো এটাই কি মুখ্য নয়। এখানে আর কিছু প্রমাণ করার কোন প্রয়োজন আছে কি! আমি কিন্তু তোমায় ছাড়িনি। তোমার ভাঙ্গা চুলের ক্লিপ। কবিতার ডায়েরীতে তোমার ঠোঁটের লিপস্টিকের দাগ। সবই আছে। আমি তোমায় আজো সেই ভাবে ভালবাসি। সেই তোমাকে। যে আমার সাথে কথা না হলে রাতে ঘুমাতো না। কিন্তু আমি তোমাকে আর বেশিদিন আমার মাঝে রাখবো না। যে আমার না তাকে আমার করে ভাবতে চাওয়াও ভুল। এই কথাটা কিছুদিন আগেই মাত্র বুঝতে পারলাম। আজ তুমি নক দিলে বলেই তোমাকে ভুলে যেতে এখন আমার আরো সহজ হবে। এই জন্য একটা ধন্যবাদ তোমার প্রাপ্য। তোমাকে আর ভাববো না। আমার জীবনটা আমি তোমাকে নিয়ে সাজাতে গিয়ে অনেক পিছিয়ে গিয়েছি। তুমি থাকলে ঠিক সামনে এগোতে পারতাম। যেহেতু তুমি নাই। তোমার আর কোন কিছুই আমার কাছে আর থাকবে না। না তোমার কোন স্মৃতি। না তোমায় লিখা কবিতার ডায়েরী। না অন্বি নামটা। তুমি হারিয়ে যাওয়া একজনা অন্বি। তোমায় আর ভাববো না। ভালবাসবো না।)

ভালো থেকো অন্বি। শুভরাত্রি।
ম্যাসেজটা আর সেন্ট হলো না। অনন্যা ততক্ষণে ব্লকড করে দিয়েছে আমাকে। আমি আলতো করে হেসে পুরো কনভার্সেশন ডিলিট করে দিলাম। আমার পৃথিবী এখন অনন্যাহীন।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত