দাদুর বিয়ে

দাদুর বিয়ে

আবহাওয়াবিদদের ভাষায় বলতে গেলে, বাসার পরিস্থিতি মেঘাচ্ছন্ন। হালকা থেকে ভারী ঝড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ার তুমুল অশংকা। সবার অভিব্যক্তিতে বিপদ সংকেত। কতো নাম্বার সংকেত তা আন্দাজ করতে পারছিলাম না। ভয়ে ভয়ে আপুর ঘরে ঢুকলাম।

:- কি ব্যাপার রে আপু?
:- [নাক কুচকে বিস্মিত স্বরে] তুই জানিস না!
যেকোনো ব্যাপারে বিস্মিত হওয়া আপুর স্বভাব। তাই বিস্ময়কে পাত্তা না দিয়ে জিজ্ঞাসা করি,,
:- না। কি হয়েছে?
:- [ফিশফিশ করে] কি হয়নি তাই বল।
যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সেটা যতো সামান্যই হোক না কেন, আপু ফিশফিশ ছাড়া বলতে পারেন না।
:- [কান খাড়া করে] বলে ফেল!
:- আজ দাদুর চিঠি এসেছে।
:- তো?
:- দাদু লিখেছেন, তিনি নাকি আবার বিয়ে করবেন।
বাহাত্তর বছর বয়স্ক ব্যক্তি চৌত্রিশ বছর বিপত্নীক থাকার পর হঠাৎ বিয়ে করতে চাইলে যতোখানি চমকানো দরকার, আমি ঠিক ততোখানি চমকে বলি,,
:- বলিস কি আপু!
:- জটিল ব্যাপার, না?
:- শুধু জটিল নয়। জটিলের সঙ্গে একটা জ যুক্ত হয়ে রীতিমতো জ-জটিল ব্যাপার।
:- [বিরক্ত দৃষ্টিতে] সব ব্যাপারে ঠাট্টা করবি না।
:- ঠাট্টা করলাম কই?
:- [ফিসফিস করে] আমার মনে হয় এর পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র আছে।

আপু কিছুদিন ধরে শার্লক হোমস সমগ্র পড়তে শুরু করেছে আর সব বিষয়ে ষড়যন্ত্র খুজে পাচ্ছে। আমি তার তত্ত্বে বিশেষ গুরুত্ব না দিয়ে দাদুর কথা ভাবতে লাগলাম।

দাদু অনেকটা রাগী ও জেদি মানুষ। কড়া কথা আর শাসন করার ব্যাপারে ওস্তাদ লোক। তাকে কখনো হাসতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। সবাই তাকে ভয় পাই। কোনো এক দুর্বোধ্য কারণে শ্রদ্ধাও করি। তবে ভালোবাসি কি না কে জানে! বর্তমানে দাদু শারীরিক ভাবে অনেক দুর্বল। বাইপাস সার্জারি, ডায়াবেটিস, পায়ের ব্যথা তাকে অনেকটাই পরজীবী করে তুলেছে। অবশ্য দাদির বাড়িতে আব্বাদের অনেক দূরের সম্পর্কে ফুপু ছাড়া আর কেউ নেই দাদাকে দেখার। আমরাও বহুদিন যাইনি। কেন যেন যাবো যাবো করেও যাওয়া হয় না। নাগরিক ব্যস্ততা আমাদের কতোটা যান্ত্রিক করে দিয়েছে তা ভেবে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। কিন্তু দাদুর হঠাৎ এই গুরুতর সিদ্ধান্তের কারণ বুঝতে পারলাম না।
অতঃপর ফুপুর আগমন…….

ব্যাপার যে সত্যিই গুরুতর সেটা বুঝলাম বিকেলে যখন বাসায় ফুপু এলেন। আমার বাবা ছাত্র জীবনে কিছুদিন রাজনীতি করেছেন। দাদুর বকা খেয়ে রাজনীতি ছাড়লেও রাজনৈতিক কিছু স্বভাব আজ পর্যন্ত ধরে রেখেছেন। তিনি যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মিটিং ডাকেন। সবার বক্তব্য শোনেন। সবশেষে একটি বক্তৃতার মাধ্যমে তার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। তবে ওনার পদ্ধতি গণতান্ত্রিক হলেও সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তিনি একনায়কতান্ত্রিক। আমি বুঝলাম ফুপুর আগমন আব্বার মিটিং ডাকার উপলক্ষেই। কারণ ফুপু আমাদের বাসায় তেমন আসেন না। আম্মার সঙ্গে ওনার সম্পর্ক ভালো নয়। আমার জ্ঞান হওয়ার পর থেকে তাদের কথা বলতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। আপু ইউনিভার্সিটিতে। তাই ফুপু সরাসরি আমার ঘরে ঢুকে পড়লেন এবং আমাদের এখন কি হবে রে বলে কাদতে শুরু করলেন। যে কোনো বিষয়ে কান্নাকাটি করার আশ্চর্য ক্ষমতা আছে ওনার। তাই ওনার কান্নাকে তেমন গুরুত্ব দিলাম না। ফুপু খানিক পর স্থির হয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন,
:- আমাদের কি হবে রে?
:- কি আর হবে? তোমরা একজন মা পাবে। তিনি যদি সৎ মা টাইপ মা হন তাহলে তোমাদের নতুন দরজা খুলে যাবে।
:- [সরু চোখে তাকিয়ে] তুই কি আমার সঙ্গে ইয়ার্কি মারছিস?🤨🤨
আমি তেলতেলে একটা হাসি দিলাম।😜😜
:- [রেগে গিয়ে] আমার সঙ্গে ইয়ার্কি মারিস। তোর সঙ্গে কি আমার ইয়ার্কি মারার সম্পর্ক।
বুঝলাম, ঝামেলা হয়ে গেছে। ফুপুর মেয়ের প্রতি আমার ঈষৎ দুর্বলতা আছে। তাই ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা ভেবে দ্রুত বললাম,,
:- না ফুপু, আমি তোমার মুড ভালো করার চেষ্টা করছিলাম।
:- সত্যি?
:- সত্যি। শশুরাল গেন্দা ফুলের কসম।
মুহূর্তে ফুপুর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। জানিস, শশুরাল গেন্দা ফুলে কি হয়েছে?
আমি হতাশ ভাবে মাথা নেড়ে বললাম, না তো!
ফুপু কাহিনীর বর্ণনা শুরু করলেন।
এবং ছোটচাচা……..
ছোটচাচার আমাদের বাসায় আসা মানেই আনন্দের ঢেউ বয়ে যাওয়া। আব্বুর ঠিক বিপরীত চাচা। তার মতো প্রাণখোলা ও হাসি-খুশি মানুষ আমি খুব একটা দেখিনি। চাচার কিছু বিচিত্র স্বভাব আছে। যেমন, বাড়িতে এসেই কিছুক্ষণ আপুর গাল টিপবেন।

আপু তখন বিরক্ত হওয়ার অভিনয় করেন বটে কিন্তু অভিনয়টা ভালো হয় না বলাই বাহুল্য। আর আমার জন্য সব সময় আনবেন দুটা ললিপপ। খুব ছোটবেলায় নাকি আমি চাচার কাছে একদিন ললিপপ খেতে চেয়েছিলাম। ওনার কাছে টাকা ছিল না বলে কিনে দিতে পারেননি। কিন্তু ওই মুহূর্তেই তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, যখন ওনার টাকা হবে তখন সারা জীবন আমাকে ললিপপ কিনে দেবেন, এমনকি আমার ছেলেমেয়ে হয়ে গেলেও ললিপপ থেকে আমার মুক্তি নেই!

ছোটচাচা বাসায় ঢুকেই আম্মুকে বললেন,
:- ভাবী, এইবার পাইছি।
:- কি পায়ছ?
:- বুইড়ারে ছ্যাচানি দেয়ার সুযোগ।
:- [আম্মা চাপা হাসিতে], ছিঃ, এসব কি বলো!
:- আরে ভাবী, সারা জীবন বুইড়া আমাগো হাড় চাটনি কইরা খাইছে। এইবার বুড়ারে চাটনি করার টাইম।
আমরা সবাই ফিক করে হেসে ফেললাম। ফুপু বিরক্ত স্বরে বললেন, আব্বাকে নিয়ে ফাজলামো করবি না।
ফুপুর কথায় কান দিলেন না চাচা। তিনি আমার আর আপুর দিকে তাকিয়ে হালকা চোখ মেরে দিলেন।আমরাও পাল্টা উত্তর দিলাম। ছোটচাচাকে আম্মু জিজ্ঞাসা করলেন,,
:- উর্মি (চাচি), গোধূলিকে (চাচার মেয়ে) নিয়ে এলে না কেন?
:- গোধূলির জ্বর। তাই নিয়ে আসিনি।
:- আমি গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি, ওরা আসুক। রাতে সবাই আজ এখানেই থাকুক।
:- [মুচকি হেসে] একটা রাতও শান্তিতে থাকতে দেবে না ভাবী? ঠিক আছে, তুমি যদি গুহা কেটে বাঘিনী আর বাঘিনী শাবক আনতে চাও তো আমি বাধা দেয়ার কে?
আমরা সবাই হেসে উঠলাম আবার।

সর্বশেষ আব্বু……..
আব্বু ঘরে ঢুকলেন এবং ঘরের আবহাওয়ায় আবারও বিপদ সংকেতযুক্ত আবহাওয়ায় পরিণত হলো। জরুরি সভায় বসতে ডাকলেন। আধা ঘণ্টার উপরে জরুরি সভা বসেছে। এটুকু সময়ে দাদুর বিয়ের পেছনের কারণ নিয়ে সম্ভবত আধা শতাধিক তত্ত্ব হাজির করা হয়েছে।

আব্বু, ফুপু ও ছোটচাচার বিস্ময়কর উদ্ভাবনী ক্ষমতায় আমি বিরক্ত। কিন্তু উঠে যেতে পারছিলাম না আব্বুর কড়া নির্দেশের কারণে। বাঙালি যে কাজের চেয়ে কথা বেশি বলে সেটা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছিলাম। যখন সমগ্র বাঙালি জাতির বাচালতাকে মনে মনে গালি দেয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছি, এমন সময় ছোটচাচি বললেন, আব্বা কেন এই সিদ্ধান্ত নিলেন এটা নিয়ে এতো না ভেবে আমাদের আসলে ওনার সঙ্গে সরাসরি কথা বলা উচিত। এই কথার পর সভা আর এগোলো না। কিছুক্ষণ পর আব্বা ঘোষণা দিলেন, সামনের মাসে আমরা দাদাবাড়িতে যাব।

শেষ দৃশ্য…….
অতঃপর সবাই দাদাবাড়ী। আমরা সবাই দাদার বাড়ির বসার ঘরে। দাদার সঙ্গে খানিক পরই শুরু হবে মহা গুরুত্বপূর্ণ সভা। তিনি আসার আগেই ঘরের অবস্থার বর্ণনা দিই।
ঘরের এক প্রান্তের সোফায় বসে ছিলেন আব্বু আর ছোটচাচা। ছোটচাচাকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি নার্ভাস বোধ করছেন। আব্বু যথানিয়মে গম্ভীর। তার বিপরীত দিকে বসে ছিলেন ফুপা-ফুপু। ফুপার কানে ফিশফিশ করে ফুপু কিছু বলছিলেন। ফুপা বিরক্ত চোখে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিলেন। আর মাঝের বড় সোফাটা দখল করে ছিলেন আপু, ছোটচাচি ও তৃণা, আমার ফুপাতো বোন যার প্রতি আমার মনে ঈষৎ দুর্বলতা আছে। তারাও ফিশফিশ করে কথা বলছিল এবং ফিক ফিক করে হাসছিল। আমারও ইচ্ছা করছিল ওদের সঙ্গে যোগ দিতে। কিন্তু আমি ছেলে মানুষ এই অভিযোগে ওরা আমাকে বের করে দিয়েছে। গোধূলি মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও ওর বয়স মাত্র পাঁচ, এই অভিযোগে ওকেও বের করে দেয়া হয়েছে। আমরা দুজন বসে ছিলাম ঘরের এক কোণার চেয়ারে। গোধূলি কখনোই চুপ থাকতে পারে না। সে আমার কানে জিজ্ঞাসা করে,,
:- ভাইয়া, আব্বুরা কেন দাদুকে বিয়ে দিতে চাইছেন না?
:- সৎ মা ভয়ংকর জিনিস, তাই।
:- সৎ মা-রা কি দুধ না খেলে মারে?
:- অবশ্যই মারে।
:- আব্বু, আম্মু দুধ না খেলে কি তাদেরও মারবে?
:- অবশ্যই মারবে।
:- তাহলে আমি দাদুর পক্ষে।

গোধূলি রায় ঘোষণা করলো। আমি ওর সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করবো কি না ভাবছিলাম, এমন সময় দাদু ঘরে ঢুকলেন। বিকেলে দেখেছিলাম, এখনো দেখছি। আসলে সারা জীবনই দেখছি সেই রুক্ষ-শুষ্ক চেহারা। হুইলচেয়ারে বসা শরীরটা ঋজু হয়ে আছে। তিনি ঘরে ঢোকার পর ঘরে একটা নীরবতা নেমে এলো। আব্বা অস্বস্তিকর নীরবতাটা ভেঙে দাদুকে বললেন,,
:- আপনাকে আমরা কিছু বলতে চাই আব্বা।
:- আগে আমি কিছু বলবো। [আব্বার দিকে তাকিয়ে] আমজাদ, তুই আমাকে শেষ কতো দিন আগে দেখে গেছিস বলতে পারবি?
:- না।
:- এক বছর চার মাস। [ছোটচাচার দিকে তাকিয়ে] আহসান, তুই বলতে পারবি কতো দিন আমাকে দেখিসনি?
:- [মাথা নিচু করে] না।
:- এক বছর তিন মাস। [ফুপুর উদ্দেশ্য] আর তুই এগারো মাস। এবার তোরা বল, তোরা কি এতো দিন নিজের ছেলেমেয়েকে না দেখে থাকতি পারবি?

কেউ কোনো উত্তর দিলেন না।দাদু আবার বলতে শুরু করলেন, রোজার ঈদে তোদের আসতে বললাম, তোরা কেউ রাজি হলি না। কোরবানির ঈদে আসতে বলছি, তাও কেউ রাজি হলি না। জানি, তোরা ব্যস্ত মানুষ। কিন্তু আমিই বা আর কয়দিন বাচবো? আমার কি ইচ্ছা হয় না নাতি-নাতনিদের কাছে পেতে, তাদের সাথে, তুদের সাথে সময় কাটাতে? শেষে উপায় না দেখে আমাকে এই বিয়ের নাটক সাজাতে হলো।

কেউই কিছু বলছিল না। সবার মাথা নিচু হয়ে আছে।
দাদুর কথা তখনো শেষ হয়নি। তিনি বলে চললেন,, আমি হয়তো তোদের সেভাবে আদর দিতে পারিনি। সব সময় শুধু শাসনই করেছি। তাই বোধহয় তোরা আমাকে পছন্দ করিস না, আমার কাছেও আসতে চাস না। বিশ্বাস কর, আমিও তোদের তেমনই ভালোবাসি যেমন তোরা তোদের সন্তানকে ভালোবাসিস। আমি তো তোদের জন্যই সব কিছু করেছি। তবুও কি তোরা আমাকে ক্ষমা করতে পারবি না? এই বৃদ্ধ মানুষটিকে একবার ভালোবাসতে পারবি না?
আশ্চর্য! দাদুর চোখের কোণায় জল। আজীবনের রুক্ষ-শুষ্ক মানুষটিকে কতো কোমলই না লাগছিল! দাদুর সাথে সাথে দেখি সবার চোখে অশ্রু কণা।।।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত