একটুকরো হাসি

একটুকরো হাসি

হাসান ভাইকে আমি পাগলের মতো ভালোবাসতাম
না,ভুল হইছে কথাটা হাসান ভাইকে ভালোবেসে আমি পাগল হই গেছিলাম।
হাসান ভাই ছিলো আমার ভাই সুজনের ছোট বেলার বন্ধু,সেই যখন এক সাথে তারা পাড়ার স্কুল মাঠে ক্রিকেট খেলতো,রাতে মানুষের বাড়ি থেকে ডাব,হাস,মুরগী,আম,জাম্বুরা সব চুরি করে স্কুল মাঠে পিকনিক করতো,রাতে তখন আর হাসান ভাই বাড়ি যেতে পারতো না।এতো রাতে কেউ নেই তার ঘরের দরজা খোলার জন্য,ছোটবেলায় ওনার মা মারা যায়,ঘরে ছিলো সৎ মা।

সৎ মায়ের সাথে হাসান ভাইয়ের খুব একটা ভালো সম্পর্ক ছিলো না।
আমার খুব মায়া হতো তাই হাসান ভাইয়ের জন্য ছোটবেলা থেকেই, সেই মায়া কবে ভালোবাসায় পরিণত হয়েছে নিজেও জানি না,কোনো এক বিষন্ন সন্ধ্যায় আমি উপলব্ধি করতে পারলাম যা হাসান ভাইকে ছাড়া আমার জীবন বৃথা।
হাসান ভাই আর আমার ভাই যখন গভীর রাতে বাসায় ফিরতো আড্ডা শেষ করে তখন মাঝ রাত পর্যন্ত আমি জেগে বসে থাকতাম মা কে শুতে পাঠিয়ে দিয়ে শুধু এক নজর হাসান ভাইকে দেখার আশায়.
হাসান ভাই হয়তো বুঝতো আমার মনের গহীনে তার নামে যে ফুল ফুটেছে।
ভাইয়া বিদেশে যাওয়ার জন্য পাসপোর্ট জমা দেয়,ভিসা এসে যায়,ভাইয়া চলে যায়।
হাসান ভাই তখন মাঝে মাঝে আসতো আমাদের খোঁজ নেয়ার জন্য।
আমার খুব কষ্ট হতো হাসান ভাইকে না দেখে থাকতে।
প্রচন্ড অভিমান হতো কেনো উনি প্রতিদিন আসে না।কিন্তু তাকে বলতে পারতাম না।দিন দিন হাসান ভাইয়ের প্রতি আমি দুর্বল হয়ে পড়ছিলাম।
হাসান ভাই ও আমাদের বাড়িতে আসা যাওয়া কমিয়ে দেয়।
সেদিন মা খুব অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় হাসান ভাই আসে আমাদের বাড়ি,মাকে নিয়ে হাসপাতালে যেতে হয় আমাদের।সারারাত রুমের বাহিরের বারান্দায় আমি বসে ছিলাম,হাসান ভাই আমার হাত ধরে রেখে আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলো।আমি বার বার আল্লহকে ডেকে বলেছিলাম,আজকের এই রাত যাতে শেষ না হয় আর,হাসান ভাই আজীবন আমার হাত ধরে রাখুক,আমি আজীবন কাঁদতে রাজী আছি তার জন্য।
বড় অদ্ভুত মানব জীবন।
আল্লাহ আমার প্রথম দোয়া কবুল না করলেও আমাকে আজীবন কাঁদানোর দোয়া ঠিকই কবুল করেছেন।
আমি অনার্স ৪র্থ ইয়ারে,হাসান ভাই হঠাৎ করেই বিয়ে করে ফেলে।
~আপনি তাকে বলেন নাই কেনো আপনি তাকে ভালোবাসেন?
~মেয়েদের বুক ফাটে,তবু মুখ ফাটে না।আমি না হয় বলতে পারি নি,হাসান ভাই তো বুঝতো আমার মনের কথাটা।সে তো জানতো তাকে আমি কি পরিমাণ ভালোবাসি।
মেয়েটা ছিলো হাসান ভাইয়ের সৎমায়ের বোনের মেয়ে।তার চাপা চাপিতে হাসান ভাই বিয়ে করে রাজী হয়ে যায়।

যেদিন হাসান ভাইয়ের বিয়ে সেদিন রাতে হাসান ভাই আমাদের বাড়িতে আসে।মা অসুস্থ,বিছানায় শুয়ে ছিলো,মায়ের পাশে বসে হাসান ভাই অঝোরে কান্না করে,মা তাকে ছেলের মতোই আদর করতো।
হাসান ভাই যখন বলে যে তার বিয়ে ঠিক করে ফেলছে,মা তখন বলে নতুন বৌ নিয়ে আসিস কিন্তু দোয়া নিতে।
আমার মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পড়ছিলো।অতিরিক্ত কষ্টে মানুষ পাথর হয়ে যায়,আমিও হয়ে গেছিলাম।

পুরো পৃথিবীকে আমার তখন স্বার্থপর মনে হতে লাগলো।এই দুনিয়ায় ভালোবাসার মূল্য কেউ বুঝে না।
হাসান ভাই যাওয়ার সময় আমি দরজা লাগাতে উঠে যাই,হাসান ভাই হঠাৎ করেই আমাকে জড়িয়ে ধরে। আমার বুকের ভিতর জমে থাকা ভালোবাসা দীর্ঘশ্বাস হয়ে বের হয়ে আসে।জীবনে প্রথম এবং শেষ বারের মতো আমি হাসান ভাইয়ের গভীর স্পর্শ পাই।পাপ জেনেও হাসান ভাইকে বাঁধা দিই নি সেদিন,প্রায় ১০ মিনিটের মতো হাসান ভাই আমাকে জড়িয়ে ধরে ছিলো,আমি ও আরো শক্ত করে ধরেছি,একবার ছেড়ে দিলেই তো আমি আজীবনের মতো হারাবো তাকে। এই মানুষটা আমার হতো,শুধুমাত্র আমার।বিশ্বসংসার তন্ন তন্ন করে ১০৮ টা নীলপদ্ম পাওয়া সহজ,কিন্তু আরেকটা হাসান ভাই??
আমি কোথায় পাবো??
হাসান ভাই গভীর চুমুর আবেশ আমার ঠোঁট জুড়ে রয়ে গেছে।
হাসান ভাই বিয়ে করে,মা ও মারা যায়,ভাইয়া বিদেশ থেকে চলে আসে,বিয়ে করে,আমাকে বিয়ে দেয়ার অনেক চেষ্টা করে কিন্তু আমি রাজী হই নি বিয়ে করতে।
হাসান ভাইয়ের আলিঙ্গনের স্পর্শ আমি মুছে ফেলতে চাই না।
আমি চাকরি পেয়ে যাই,তারপর অনেক জায়গায় বদলি হতে হতে আসি তোমাদের এখানে,তোমাদের কলেজের টিচার হই।
রুমা ম্যাডামের কথাগুলো আমার মন ছুয়ে যায়,কিন্তু তবু একটা প্রশ্ন থেকে যায়।ম্যাডামের তো বিয়ে হয় নি,কিন্তু ম্যাডামের যে একটা মেয়ে আছে,প্রায় ১৫_১৬ বছরের,ও তাহলে??
কিভাবে প্রশ্ন করবো বুঝতেছি না ম্যাডামের চরিত্র নিয়ে কথা বলা হয় তাহলে।
ম্যাডাম আমার প্রশ্নটা বুঝতে পারে হয়তো ।
ম্যাডাম~ তুমি ভাবছো হাসি তাহলে কার মেয়ে??
আমি~ না মানে ম্যাডাম,একটু খটকা লাগছিলো।
ম্যাডাম~ হাসি হাসান ভাইয়ের মেয়ে,আমার মেয়ে হাসি।
হাসিকে জন্ম দিতে গিয়ে হাসির মা মারা যায়,মেয়েটাও হাসান ভাইয়ের মতো মা হারা হয়ে যায়।হাসান ভাই তখন ২য় বিয়ে করতে রাজি হয় নি আর।হাসিকে আমি নিয়ে আসি,হাসান ভাই ভেবেছিলো আমাকে ২য় বিয়ে করলে আমি হয়তো হাসির সঠিক যত্ন করতে পারবো না,নিজের ছেলেমেয়ে হলে তখন আর হাসিকে সহ্য করতে পারবো না যেমনটা তার সাথে হয়েছিলো।
কিন্তু হাসান ভাই জানতো না,হাসান ভাইকে আমি কি পরিমাণ ভালোবাসি।হাসান ভাইয়ের পায়ে ধরে তাই সেদিন বলেছিলাম,আমি তোমাকে চাই না হাসান ভাই,আমি তোমাকে বিয়ে করতে ও চাই না,তোমাকে আমি যেটুকু পেয়েছি,সেই স্পর্শ নিয়ে আমি আজীবন কাটিয়ে দিতে পারবো।কিন্তু আমাকে হাসিকে দাও,ওর মা তো আমি হতাম,একটুকরো হাসির অধিকারী আমি হতাম,এই চাওয়া আমার পূর্ণ করো।

তারপর হাসান ভাই আমার হাতে হাসিকে তুলে দেয়।
আমার হাসি,আমার সব।
হাসির বয়স এখন ১৬ বছর,হাসি জানে আমি ওর মা,ওর বাবা নাই।
হাসিকে নিয়ে আসার পরে আমি আমার ভাইয়ের সাথে,হাসান ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেই,শুধু এই ভয়ে,হাসান ভাইকে তো হারালাম,কিন্তু আবার যদি আমার হাসিকে ও হারাতে হয়,আমি এবার হাসিকে হারিয়ে ফেললে আর বাঁঁচবো না।হাসির মাঝে আমি হাসান ভাইকে ফিরে পেয়েছি।
হাসান ভাই যদি কোনো দিন এসে বলে,এবার আমার হাসিকে আমাকে দিয়ে দে,আমি তখন কিভাবে নিজের কলিজা তার হাতে তুলে দিবো।একবার হাসান ভাইকে ছেড়ে আমি অর্ধমৃত হয়ে বেঁচে আছি,হাসিই আমার এখন বেঁচে থাকার কারন।
রুমা ম্যাডাম আমাদের ফিজিক্স টিচার,তার কাছে প্রাইভেট পড়ি আমি,আমাদের বাসাতেই ২ রুম নিয়ে ভাড়া থাকেন উনি।ক্লাসে আমাকে অনিকের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকতে দেখে আজ নিজের জীবনের কথা বললো।
ম্যাডামঃ প্রাপ্তিতেই ভালোবাসা আমি তা বিশ্বাস করি না কিছু ভালোবাসা অপ্রাপ্তিতে ও হয়।পেলে আমরা অবমূল্যায়ন করি,না পেলে তার সাধনা করে যাই।আমিও তাকে পেতে চাই না,তার সাধনা করে জীবন কাটাতে চাই।
আমি~ ম্যাডাম সন্ধ্যা হয়ে আসছে,আমি আসি আজ।
ম্যাডাম~ নিজের জমানো কথাগুলো আজ তোমাকে সব বল্লাম,আজ নিজেকে খুব হালকা মনে হচ্ছে।
বাসায় এসে শুধু এটুকুই ভাবতে লাগলাম,ভালোবাসা কতো বিচিত্র। একজনের জীবনে তা একরকম করে আসে। সবার ভালোবাসার ধরন আলাদা হয়,কিন্তু ভালোবাসা তো সবারই এক। আমরা সবাই তো ভালোবাসি কিন্তু এরকম ভালোবাসাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে কয় জন পারি??
নজরুল ঠিকই বলেছে,”তোমারে যে চাহিয়াছে ভুলে একদিন,সে জানে তোমারে ভোলা কি কঠিন”

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত