নূপুরের গল্প

নূপুরের গল্প

মন যে মানুষের সুখ আর দুঃখেরর অনুভূতি কে নিয়ন্ত্রণ করে তা আগে কখনো পরশের এতটা বিশ্বাস ছিলোনা! কিন্তু এখন সে এ কথা টার সত্যতা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। ছোট বেলা থেকে দিনের শেষ ভাগের অংশটুকু তার সব থেকে প্রিয় ছিলো। কারণ টাও সিম্পল সে খুব চটপটে,হৈহল্লা, খেলাধুলা আর আড্ডা পাগল ছিলো তাই বিকাল টা ছিলো এসকল কার্যক্রম করার শ্রেষ্ঠ সময়। তাই দিনের শেষ অংশটুকু অথ্যার্ৎ বিকাল টা এতো প্রিয় ছিলো। কিন্তু আজ বিকাল টা তার পুরাপুরি উল্টো এক্সপেরিয়েন্স নিয়ে হাজির হয়েছে। তার এখন মনে হচ্ছে আজ বিকাল টা জেনো তার জন্য কষ্টের কালো মেঘর ঢালা নিয়ে হাট বসায়ছে। ঐ মেঘ গুলা তার হৃদয়ের আকাশ অন্ধকার করে রাখছে। আস্তে আস্তে তার জেনো শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।

ভালো কথা পরশের পরিচয় টা দেওয়া হয় নাই। পরশের তিন ভাই এক বোন। পরশ সবার ছোট। এমবিএ শেষ করে জব করছে ৪ বছর। বিয়ে করেছে ৩ বছর আগে কিন্তু পরিবারে নতুন মুখের আসা হয় নাই এখনও। এতটুকুই পর্যন্ত থাকুক বাকি ডিটেইলস গল্পের মাঝেই পাবেন। বিকালে ফিরে আসি তাহলে…
আজ বিকাল টা জেনো যাচ্ছে না পরশের মনে হচ্ছে। এ দিকে তার মোবাইল বেজেই যাচ্ছে কিন্তু আজ জেনো তার কথা বলার কোনো ইন্টারেস্ট নাই। মোবাইল হাতে নিয়ে নাম্বার টা দেখেই মোবাইল পাসে রেখে দিচ্ছে। অলরেডি ৫০ টা মিস কল আসেছে একটা নাম্বার থেকে যে নাম্বার টা নূপুর নামে সেভ করা।

নূপুরের পরিচয় দেওয়া যাক,
নূপুর হচ্ছে পরশের স্ত্রীর নাম। গ্রামের মেয়ে। লেখা পড়া তেমন বেশি না।অনেকটাই ধার্মিক মেয়ে। বড়দের সম্মান করে।পরিবার কে খুব ভালোবাসে। এসকল গুণ দেখে পরশের মা তাকে তার আদরের ছেলের বউ করে ঘরে আনে। পরশের সাথে খুব অল্প বয়সে তার বিয়ে হয়।তখন সে দশম শ্রেণির ছাত্রী ছিলো। সে খুব স্বামী ভক্ত কিন্তু এখনও সে তার পুরোপুরি প্রাপ্য সম্মান পায় নাই। তারপর সে খুব খুশি তার স্বামী কে নিয়ে। তার কোনো অভিযোগ নেই স্বামীর প্রতি। পরশ মাঝে মাঝে তার সাথে খারাপ ব্যবহার করে। কথা কম বলে কিন্তু কখনো শারীরিক নির্যাতন করে না। পরশের এ খারাপ ব্যবহার করার পিছনে একটি কারণ আছে। সে ছেয়ে ছিলো তার পছন্দমত হাই এডুকেটেড ও আধুনিক ধারার শহরী মেয়েকে বিয়ে করবে। কিন্তু তার মা কি অদ্ভুত কারনে শহরী ট্রাইপের মেয়েকে পছন্দ করতো না। মাকে বুজাইবার অনেক চেস্টা করেও ব্যর্থ! কি আর কারার শেষ পর্যন্ত মায়ের পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করতে হয়ছে তার।

আবার বিকালে ফিরে আসা যাক,
হঠাৎ আবার পরশের মোবাইল ভেজে উঠলো। মোবাইলের দিকে তাকিয়ে দেখে পরশের মায়ের কল। পরশ কল রিসিভ করলো
মাঃ পরশ কি হইছে, তুই নূপুরের কল রিসিভ করছিলি না কেনো?
পরশঃ সরি মা! অফিসে অনেক কাজ তাই খেয়াল করি নাই।
মাঃ আমাকে সরি বলে লাভ নাই।তাড়াতাড়ি নূপুর কে কল দে। নূপুর অনেক টেনশন করছে আমি তো বাড়িতে ছিলাম না। তোর আপুর বাড়িতে আসছি দুপুরে। নূপুর আমাকে কল দিয়ে কান্না শুরু করে দিছে।
পরশঃ ওকে মা কল দিচ্ছি। তুমি আসবে কখন?

মাঃ আমি বাড়িতে আসার জন্য রওনা দিলাম এখন। ভাবছিলাম আজ থাকবো কিন্তু নূপুরের কান্নাকাটি সুনে চলে আসলাম। দেখিস তুই তাকে কিছু বলিস না। নূপুর আমাকে আসতে বলে নাই আমি চলে আসছি। আমি ছাড়া ওর কে আছে?? আমার জন্যে তো মেয়েটার জীবন শেষ।

পরশঃ মা, স্যার আসছে। এখন রাখি।

মাঃ এই শুন শুন, আজ না তোদের ডাক্তারি টেস্টের রিপোর্ট দেওয়ার কথা।

পরশঃ ভুলে গেছি মা। বাসায় যাওয়ার সময় হাসপাতাল থেকে নিয়ে যাবো।
এ কথা বলে মোবাইল রেখে দিলো পরশ।

মনে মনে ভাবলো মার সাথে মিথ্যা বলা ঠিক হয় নাই।হাসপাতালের রিপোর্ট টা তো আমার হাতে।
টেস্ট কারার পিছনের কারণ ছিলো পরশ আর নূপুরের পরিবারে নতুন সদস্য না আসার কারণ জানা।
পরশ তাই তাড়াহুড়ো করে অফিস থেকে হাসপাতাল গিয়েছিলো রিপোর্ট নেওয়ার জন্য। কিন্তু রিপোর্ট টা নেয়ে দেখার পর পরশের মাথায় উপর যেনো আকাশ ভেংগে পড়ে। রিপোর্টে আসছে তার শারীরিক সমস্যার কারনে সে আর কখনও বাবা হতে পারবে না। সে ভেবে দেখলো আসলেই তার মায়ের কথাই ঠিক সত্যি সত্যি মেয়েটার জীবন শেষ। আর সব কিছুর জন্য দায় সে নিজে।

বিয়ে হয়েছে গত ৩ বছর ধরে সে কত কষ্ট দিয়েছে নূপুর কে। তার পছন্দ মতে একটা কাজও সে করতো না। কখনো তার জন্য শখ করে কিছু কিনে নাই। শুধু অবহেলা করতো। এগুলো মনে করে তার চোখ দিয়ে পানি পড়তে শুরু করলো।
৩ বছরে একবার তার কাছ থেকে কাচের চুড়ি চাইছে কিন্তু গ্রামের বলদ বলে উপহাস করেছিলো পরশ। মুহূর্তের মধ্যে

৩ বছরের কতো শত স্মৃতি তার মনের আয়নায় ভাসতে লাগলো। এ শত শত স্মৃতির মাঝে একটা স্মৃতি ও তার স্মরণ হচ্ছে না সে নূপুরের স্বামী হিসাবে দায়িত্ব পালন করছে। বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সে আজ বিবেকের তাড়নায় ক্ষতবিক্ষত। হৃদয় জুড়ে তার রক্ত ক্ষরণ। হঠাৎ মোবাইলের শব্দে তার চিন্তা জগতের বিঘ্নিত ঘটায়। মোবাইলে পরশ তাকিয়ে দেখে নূপুরের নাম মোবাইলের স্কিনের দৃশ্যমান। আজ মোবাইলের স্কিনে নূপুরের নামের উপর আঙ্গুল নিতে তার সাহস হচ্ছে না। তার আঙ্গুল গুলো কাপছে। অনেক কষ্টে সে কল টা রিসিভ করতেছে। নূপুরের কন্ঠ মোবাইল থেকে ভেসে আসছে।

নূপুরঃ সালাম দেওয়ার পর। কাদাকাদা কন্ঠে জিজ্ঞাস করলো, আপনি কল রিসিভ করছেন না আমি অনেক টেনশন করছিলাম!

পরশঃ সরি! অফিসে অনেক কাজের চাপ তাই মোবাইলের প্রতি খেয়াল করি নাই।

নূপুরঃ আপনার কন্ঠ এমন লাগছে কেনো? শরীর খারাপ করছে? আমি আসতেছি আপনার অফিসে।আপনি ডাক্তারের কাছে এখন যাবেন। আমার কথা তো শুনেন না। কতদিন দরে বলতেছিলাম ডাক্তারের কাছে যেতে।

পরশঃ আরে না। আমি ঠিক আছি। তোমার আসার দরকার নাই। আচ্ছা রাখি বলে পরশ মোবাইল রেখে দিলো।

পরশ মনে মনে ভাবতেছে এই মেয়ে টা তাকে কতো পাগলের মতো ভালোই না বাসে। এতো দিন সে তার এই মেয়েটার ভালোবাসা কে বিরক্তিকর আর পাগলামি ভাবতো। আর এখন এমন সময় সে ঐ মেয়েটি ভালোবাসা টা বুঝতে পারলো যখন সে জানলো যে ঐ মেয়েটিকে কষ্ট ছাড়া আর কিছু দেওয়ার নাই। এসব কথা ভাবতে ভাবতে রাত ৮ টা বেজে যায়। আজ তার কেনো জানি বাসায় যেতে ইচ্ছা করছে না। না গেলে আবার সবাই টেনশন করবে। তবে আজ একটা বিষয় সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে মেয়েটি কে আর কষ্ট দিবে না। এর জন্য তাকে যা যা করতে হয় সে তা তাই করবে। তার কষ্ট আর কাউকে বলা যাবে না। তাই কষ্ট গুলো খুব গোপন করে বাড়িতে যাওয়ার জন্য রওনা দিছে। বাড়িতে এসে কলিংবেল টিপ দিলো। এদিক দিয়ে পরশের শরীর থেকে প্রচুর গাম বের হচ্ছে বাড়িতে এসব কিছু বলবে নাকি বলবে না! বললে তো আবার সবাই কষ্ট পাবে তাই সে মনে মনে ভাবলো আজ বলবে না। দরজা খুলে গেলে ভাবাটা শেষ হয়ে যায়। দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে নূপুর দরজায় খুলে দাড়িয়ে আছে। পরশের চোখ মেয়েটি কে সুন্দর লাগছে আজ তা ভাষায় প্রকাশ করার ভাষা তার কাছে নেই। এতো দিন সে এই লক্ষী মেয়েটির দিকে তাকিয়ে ভালো করে এক বারও দেখিনি। দেখলে হয়তো অনেক আগে মেয়েটির প্রেমে পড়ে যে তো অনেক আগে। নূপুরের কথায় পরশের ভাবনার রাজ্য থেকে বাস্তবে ফিরে আশে।

নূপুরঃ আপনার এ অবস্থা কেনো? এতো দেরি হলো যে আজ আপনার? (নূপুর এ কথা গুলো বলতে বলতে কাপড়ের আঁচল দিয়ে পরশের মুখ মুচতে লাগলো)

পরশঃ অফিসে অনেক কাজ ছিলো তাই লেট হয়ছে আসতে!

নূপুরঃ অফিসের বেটারা এতো খারাপ কেনো আপনাকে এতো কষ্ট দেয়।

পরশঃ(নূপুরের কথা শুনে পরশ হেসে দিলো) তুমি এসব বুঝবে না।

নূপুরঃ আমার বুঝর দরকার নাই।

পরশঃ আচ্ছা ঠিক আছে তোমার বুঝার দরকার নাই। আমি কি বাহিরে দাড়িয়ে থাকবো এখন।

নূপুরঃ ওহ, আমার ভুল হয়ে গেছে মাফ করে দেন!হুম, ভেতরে আসেন আসেন!!

পরদিন সকালে খুব ভোরে নূপুরের বাড়ি থেকে কল আসলো নূপুরের বাবা খুব অসুখ মরে যায় যায় অবস্থা। এখবর শুনে খুব ভোরে নূপুর বাবার বাড়িতে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়লো। পরশ ও তার সাথে গেলো। এক দিন থেকে অফিসের কাজে চলে আসলো। নূপুরকে আর রিপোর্টের কথা বলতে পারে নাই। এভাবে ১ সাপ্তাহ কেটে গেলো নূপুর নূপুরের বাবার বাড়িতে। নূপুরের বাবাও সুস্থ হয়ে উঠলেন। নূপুর আরও ২-৩ দিন থাকবে। এদিকে পরশ দিন দিন নূপুরের অভাব আস্তে আস্তে তীব্র ভাবে অনুভব করতে লাগলো আবার সিদ্ধান্ত নিলো নিজের স্বার্থের জন্য নূপুকে ঠকাবে না। পরশ চিন্তায় পড়ে গেলো ২-৩ পরে নূপুর আসবে, নূপুর আসলে সে আর কিছুই করতে পারবে না। যা করতে হবে ২-৩ দিনের ভিতরে করতে হবে। ভাবছিলো তালাক দিবে নূপুর কে কিন্তু নূপুর কথা বাদ সে নূপুর কে যে পরিমান ভালোবেসে ফেলেছে এ জীবনে তাকে তালাক দিয়ে থাকতে পারবে না সে বুঝে ফেলেছে। তার মাথা এখন আর আগের মত কাজ করছে না কোনো বুদ্ধি এখন তার মাথায় আসছে না। ভাবতে ভাবতে দুদিন শেষ। আগামী কাল নূপুর আসবে। পরশ কোনো বুদ্ধি না পেয়ে। নূপুরের জন্য একটা চিঠি লিখলো। চিঠি টা নূপুরের ভাইয়ের নামে রেজিস্ট্রেশন করে পোষ্ট অফিসে গিয়ে পোষ্ট করে অফিসে জন্য রওনা দিলো। বাস থেকে নেমে যখনই রাস্তা ক্রস করে অফিসে যাচ্ছিলো একটা বাস এসে তাকে ছাপা দিয়ে চলে গেলো। মুহূর্তের মধ্যে পরশ চোখে ঝাপসা দেকতে লাগলো। মুহূর্তের মাঝে পরশ মাটির উপরের বাসিন্দা মাটির নিচের বাসিন্দা হয়ে গেলো। এ খবর টা নূপুরের কাছে যাওয়ার পর নূপুর একটা চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গেলো। তার চিৎকারের সাথে সাথে আকাশ বাতাস তার শোকে কাতর হয়েগেলো। হাসপাতালে ভর্তি নূপুরের দুদিন হয়ে গেলো তার জ্ঞান ফিরে আসছে না। এদিকে নূপুরের ভাই পরশ কে মাটি দিয়ে আসার পর পরের দিন সকালে নূপুরের ভাইয়ের নামে পরশে লেখা ঐ চিঠি খানা আসে। চিঠি খানা খুলে নূপুরের ভাই পড়তে লাগলো। চিঠিতে যা লেখা ছিলো তা হচ্ছে।প্রিয় ভাই,পত্রের প্রথমে আমার সালাম নিবেন। আমার আর নূপুরের মেডিকেল রিপোর্টে আমার সমস্যা ধরা পড়ছে। আমি কখনো বাবা হতে পারবো না। বিয়ের পর থেকে আমি কখনো তাকে সুখে রাখতে পারি নাই। বাকিটা জীবনেও তাকে সুখে রাখতে পারবো না ভেবে আমি পৃথিবীকে বিদায় দিয়ে আসলাম। নূপুর যেনো না বুঝে তাই এমন করে আসা। জানি এটা খুব অন্যায় কাজ করেছি আমি। কি করবো আমার কাছে আর যে কোন অপশন ছিলো না। আমি বেচে থাকলে নূপুর কে তালাক দিতে পারবো না সেও আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবে না। এ কাথা টা আপনি কাউকে বলবেন না। আর একটা শেষ ইচ্ছা আমার, আপনার কাছে নূপুর কে একটা ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিয়ে দিয়েন।ইতি
পরশ
দুদিন পর নূপুরের জ্ঞান ফিরলো। কিন্তু ডাক্তার বললো নূপুর আর স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে ফিরতে পারবে না। অতিরিক্ত শোকে ব্রেইন স্টোক করছে। পরশ মারা গেছে আজ দুবছর নূপুরও পাগল দুবছর। সবাই নূপুর কে এখন জামাই পাগল বলে। কারণ সব সময় সে তার পরশকে খুজে ফিরে। পরশ যে জন্য নিজের জীবন সেক্রিফাইজ করলো সেই কারণ টাই এখনও নূপুরের অজানা। পরশ জীবন দিয়েও নূপুরের কাছে হেরে গেলো!!!আসলে ভালোবাসার পাওয়ার সম্পর্কে পরশে ধারণা সম্পূর্ণ ভুল ছিলো।
যাই হোক ২০ বছর পার হয়ে গেলো নূপুরের এখন চুল গুলো কালো থেকে সাদা হয়ে গেলো।
নূপুরের অপেক্ষাও শেষ হলে জামাই পাগলী আজ পরশের কাছে ছলে গেলো।
আশা রাখি নূপুর পরশ থেকে তার ২০ বছরের হিসাব টা নিয়ে নিবে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত