ফোটে ফুল আপন সুখে

আকাশের নিচে আজ আর কোনো হীমের স্তর নেই। কদিন আগের ব্লিজার্ড মুক্ত লন্ডন আজ দূরের ঐসব টেরেস্ড বাড়ি গুলোর মাথার ওপর দিয়ে একটা কমলা রঙ্গের সূর্যটাকে উগড়ে দিয়েছে। মনে হচ্ছে যেন সেই সুগন্ধে ভরে গেছে ঘর।

হাসপাতালের জন্য মাঝে মাঝে মিনুকে এত কাগজ পত্র এক সঙ্গে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কাজ করতে হয় যে তার ছোট্ট পড়ার টেবিলে জায়গা হয়না। নিচের তলার ডাইনিং টেবিলে করতে হয়। বড় ওভ্যাল শেপের ওক কাঠের টেবিল। চেয়ারগুলোতে খয়েরী কুশন। টেবিলের ওপর সব সময় একটি ফলের পাত্র থাকে । আজ নেই। কাজের চাপে এসপ্তাহ আর সেইন্সব্যারীতে বাজার করা হয়নি। একটি ছেলে নিয়েই তার সংসার। বেশি কিছু যদিও লাগেনা। অনিক ফলের মধ্যে কেবল আঙ্গুর আর আপেল খায়। তিনি খান কলা। কলা খান কলা ব্যাগে বহন করতে কোনো বাড়তি কাগজ বা কন্টেইনার লাগে না বলে। নিজের খোসাই তার মোড়ক। এমনকি এক কামড় খেয়ে বাকিটা পেঁচিয়ে রেখে দেয়া যায় নিদানের জন্য, যেমন টেনিস প্লেয়াররা করে। সব সময় তাই তার ব্যাগে থাকে কলা।

শেষ কলাটা খেয়ে খেয়েই আগামী সপ্তাহের প্ল্যানিং গ্রিড্স এ নানান ভাবনা টাইপ করছিলেন মিনু। আজকে মনটা কেমন করছে। ন্যাশনাল হেল্থ সার্ভিস যত খারাপ হচ্ছে নার্সরা সব চাকুরী নিয়ে নিয়ে আমেরিকা চলে যাচ্ছে। এমনকি ফিলিপিনো নার্সরা পর্যন্ত। তাতে মাঝে মাঝে তাকেও আজকাল রোগীদেও জন্য এটা সেটা ধরতে হচ্ছে- যা আগে কখনো লাগেনি। নার্সিং নিয়ে কথা না কথা হল মানুষের অসহায়ত্ব। করেনতো কেবল লন্ডন হাসপাতালে ইন্টারপ্রেটার কাজ কিন্তু তার কাজের যেন শেষ নেই। তার কমপ্লেইন নেই। কিন্তু কাজ করতে করতে যেন সেঁটে গেছেন হাসপাতালের ভিক্টোরিয়ান পিলারের গোড়ায় গোড়ায়। কে জানে কি করে কি হচ্ছে! ভাবেন না। তবে বোঝেন, হয়তো একারনেই তার এত ডাক ও আদর।

এমনকি হাসপাতালের টাচ্ ফোন ও লিফ্টএও তার ভয়েস। লিফট্ এর কাছে, সিঁড়ির কাছে এটি আবার দিনরাত অনবরত বাজতে থাকে। যেসব মানুষ পড়তে পারেনা তাদেরকে অত্যাবশ্যকীয় নির্দশাবলী বলতে থাকে ঐ ভয়েস- যা কিনা তারই। নিজ কানে নিজ গলা শোনাটা কেমন ভূতের মত লাগে। বিশেষ করে কোরিডোরে যদি কেউ না থাকে। আর হাসপাতালতো- মেটারনিটি ওর্য়াড ছাড়া সব জায়গায়ই মৃত্যর মলিন ছায়া লেপ্টে আছে। কিন্তু আমার কাছে তা না। ওর গলা শুনলেই বড়ং জীবনের শব্দ শুনি।

এইতো ঠিক ক্রিসমাসের আগে, এটাই তাকে বলেছিলাম। আসন্ন উৎসবের কারণে হাসপাতালকে তখন আর হাসপাতাল মনে হচ্ছেনা। লাগছে যেন সবাই মনে মনে ” জিংগেল বেল জিংগেল জিংগেল অল দা ওয়ে” গেয়ে গেয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে । সবার জুতোর তলায় ¯িপ্রং লাগানো । এমনি আনন্দে মাতোয়ারা। এমনকি গ্লাস্টিক ক্রিসমাস ট্রির ঘন সবুজের মাথায় বসা পরীটিও হাসছে।

দেখি গম্ভীর মুখে মিনু ছুটে যাচ্ছেন। আমার সঙ্গে লিফটের কাছে দেখা। তারসঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিলো যখন রেসিডেন্ট কবি হিসেবে একটা ছোট্ট কাজ করতে রয়্যাল লন্ডন হাসপাতালে এসেছিলাম। রোগীদের নিয়ে ওয়ার্কশপ করার সময় দুবাঙ্গালী বয়জেষ্ঠ রোগীর সঙ্গে ইন্টারপ্রেটার হিসেবে তখনই মিনুর সঙ্গে পরিচয়। তো আমার প্রথম ভাষাই বাংলা বলে তাকে আর অনুবাদকের কাজ করতে হয়নি। আমি এমন একজন চমৎকার বাংলাদেশী গুনবতী মহিলা পেয়ে তাকে আর ছাড়িনি। তাকে রাইটিং গ্রুপে ঢুকয়ে নিয়েছিলাম। তারপরতো ওর পড়াশোনার পরীধির খোঁজ পেয়ে এখন আমরা প্রায় বন্ধুই হয়ে গেছি। দেখা না হলে ফোনে কথা বলি।

তার ছোটা থামিয়ে উত্তেজিতভাবে বলি, এই শুনেছেন আপনার স্বর? এমন সুন্দর যেন কবিতা শুনছি । অন্যমনষ্ক মিনু আমার হাত ছাড়িয়ে চলে যেতে চাইলে বলি, আর কোথায় ছুটছেন?
-ধন্যবাদ। তোমার কথামত তাহলে বলতে হয়, যাচ্ছি এক মৃত্যু পথ যাত্রীকে তার মৃত্যু সম্ভাবণা নিয়ে কবিতা শোনাতে। বলে মুখটা মলিন করে ফেলেন। আমার মুখ মলিন হয়না। হয়না কারণ তারমততো আমি সেই রোগীটির সম্বন্ধে অত কিছু জানিনা। দু:খ নিয়ে জানলেই তবেতো দূ:খ বাড়বে।
– আপনার অমন অমৃত পেলে আমি সেই মৃত্যুী পথযাত্রী হলেতো বিছানা ছেড়ে খাড়া হয়ে উঠতাম।
দেখি খাড়া না হলেও বসাতে পারি কিনা। বলে দ্রুত বিদায় জানিয়ে প্রায় দৌড়ে প্রি সাজার্িির ওয়েটিং এলাকার দিকে চলে যান মিনু।

ভাষান্তরের কাজ তাকে নতুন নতুন বেশ কিছু ধারণা দিয়েছে যা তিনি কোনো বইতে আগে পাননি। তার প্রথম ধারনা প্রায়ই এই- মাতৃভাষার মাহাত্মযে কী তা ভিন্ন আরেকটা ভাষা নিয়ে কষ্ট না করা পর্যন্ত বোঝা যায়না। যাবেনা। অথবা অন্য একটা ভাষা বাধ্যতামূলকভাবে অধিকাংশ সময় না শুনলে বা না বল্লে­ জানা যায়না। আবার কাজে ভিন্ন ভাষা বলে ঘরে নিজের ভাষা একা একা বল্লেও সে কষ্ট থাকেই। এমনকি অন্যে বলা কথাটি বুঝলেও শান্তি আসেনা- যতক্ষণ না, বোঝার পর মাতৃভাষায় তার উত্তর পাওয়া যাচ্ছে। কেমন অদ্ভুত!

আপনাদের কাছে এটা মনে হতে পারে যে, মিনু করেনতো শুধু ভাষাতরের কাজ এবং সাধারণত তা তাৎক্ষণিক ভিত্তিতেই করতে হয় সুতরাং তার আবার প্ল্যানফ্যান কী ? মিনু বলেছেন এর উত্তর তার জানা নেই। তবে তার মতে তার ক্লায়েন্টের হাসপাতাল ওর্য়াড নম্বর, তার ডাক্তার ও রেজিস্টার , তার পারিবারিক অবস্থানও তাদের সময়সূচি , রোগীর রোগের পর্যায়, তার মানসিক অবস্থান এবং সবশেষে টারমিনালি অস্বুস্থ্য রোগীদের সংক্ষিপ্ত হিস্ট্রি সবই নিয়ে তার প্ল্যানিং সিট। এমন কি সেই মৃত্যুমুখীর নিকট আত্মীয়ের নাম ও যোগাযোগের ঠিকানা তার সব জানা চাই। শুধু জানা না সব না লিখতে পারলে তার শাত হয়না। তারমত আর যারা একাজ যারা করে খায় তাদের কারো এমন হওয়া উচিত কিনা কে জানে। কিন্তু এর সব পূর্ণ না করলে মিনুর মনে হবে যেনো কিছু অস¤পূর্ণ রয়ে গেছে।এর পরও তার দ্বিতীয় আরেকটি ফোল্ডারে থাকে যাতে তার রোগীদের পূর্ব অবস্থার ও সম্ভাব্য পরের অবস্থার মোটামুটি একটি ক্লু থাকে। তাতে তার নিজের তাছে জবাবদিহিতার পথ থাকে খোলা। কেন? তার কেবলি মনে হয় কোথাওনা কোথাও তাকে তার কৃতকর্মের জন্য কৈফিয়ত চাওয়া হবে একদিন।
অসুখ ও অস্বাস্থ্যে বিপন্ন যে মানুষটির নিজ জীবণের সব চেয়ে গুরুত্ব পূর্ণ ও ভয়াবহ কথাটি একজন বিশারদের কাছ থেকে শোনার বা বোঝার কথা, সেখানে কিনা তিনি শুনছেন একজন চিকিৎসাবিজ্ঞান অনভিজ্ঞ একজন সাধারণ নারীর কাছ থেকে। কনসালট্যান্টের সঙ্গে পাল্লা না কিন্তু এভাবে তৈরী থাকলে তিনি দেখেছেন নিজেরই আত্ম বিশ্বাস ঠান্ডার মধ্যে কোটের মত গায়ে বেশ সুন্দর বসে থাকে। কি কি সব পরিস্থিতিতে যে তিনি তার কাজ করেন! যাস্ট ভয়াবহ। হয়তো রোগীর ঘরে সে সময় চলছে হার্ট রেগুলেটর, অক্সিজেনের ছোট্ট নল রোগীর নাকের ফুটোয় নোলক হয়ে লেগে আছে, ইনট্রাভেনাসের নল হাতের শিরা ফুটো করে দাঁিড়য়ে আছে, কিডনী থেকে পাইপে ঝুলছে শরীরের র্বজ হলুদ তরলের ট্রান্সপারেন্ট থলে। ভয়ের কথা। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার , এসময় কাজ করতে গিয়ে তার নিজেকে কখনো অশক্ত মনে হয়নি। ভয়ও লাগেনা। আর সে মানুষটি তারদিকে এমনভাবে তাকায় যেন ফেরেস্তা দেখছে। আহারে!

ইংরাজী ছাড়াও প্রমিতবাংলা ,হিন্দি ,র্উদু এবং বাংলা ভাষার বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক সংলাপ বলতে পারার কারণে তার যে গ্রহন যোগ্যতা এ হাসপাতালে। এটা ঠিক যে সেরকম খুব কম মানুষের আছে । আর এই সবগুলো ভাষাই তিনি শিখেছেন তার নিজের বাংলা ভাষার মাধ্যমে। তার কাছে এসবতো শুধু ভাষা না এ তার একেকটা শক্তি। এক একটা জানালা। জীবণযুদ্ধের এক একটি অত্রর। যে কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে কয়েকটি যন্ত্র একসাথে একই ক্ষমতায় চালানো যে কী ভীষণ জরুরী। হাসপাতালে ভাষাšতরের সময় মড়ো মড়ো একেকটি মানুষ এমন ভাবে তার হাত আকড়ে ধরেন যেন তিনি এক দেবী বিশেষ! অনেক মুমূর্ষুর পিড়াপীড়িতে কোনো কোনো সার্জন তাকে অপরেশন থিয়েটারে পর্যšত প্রবেশের অধিকার দিতে বাধ্য হন। সেরকম সময় নীল গাউন ও মুখে মাস্ক লাগিয়ে মিনু কথা বলেন। এনেস্থেসিয়ার ক্রিয়া চলাকালীন সময়ে যখন কথাবলেন তার মনে হয়না তিনি ডাক্তারের কথা বা নার্সের কথার অনুবাদ করছেন। তার মনে হয় তিনি দোয়া পড়ছেন। মানুষকে স্বুস্থ্য করার অমৃত বানী শোনাচেছন। পবিত্র কোনো দোয়া শোনাচ্ছেন। তখন তিনি অনেক সময় সুরার অনুবাদও শোনান। ভাষা-ক্ষমতার অলৌকিক বিভাময় সিরাপে তার গলা ভিজে যায়। তার কণ্ঠ শক্তিময়ী অশরীরি করে তোলে। তিনি দৈবী শক্তির পাখায় ভর করেন। যখন আপারেশন থিয়েটার থেকে বেরোন তখন ঘামে ভিজে গেছেন। দেহ ছেড়ে গেছে কয়েক মন ওজন। আর মনে হয় নিজেই অপারেশনটা কওে এলেন। তার নিজ-জীবণ জীবিকার জন্য তিনি বড় কৃতজ্ঞ তার ভাষার প্রতি। এমন যে এই বাংলা ভাষা তার এত দাম কি নীলফামারি থাকতে বুঝেছিলেন কখনো?

তিন বছরের অনিককে নিয়ে যেদিন তার বাবা মারা যাবার পর ম্যানচেষ্টারের হাইডে এসে উঠেছিলেন- তখন তার অনুমাত্র আশাও ছিলো না যে ইংলিশদের দেশে একদিন নিজের বাংলা ভাষাই তার জীবণ ও জীবিকার উৎস হয়ে উঠবে। কত বদলে গেছে বিলেত।

মিনুর এদেশে আসার ঘটনা শুনি আমাদের কাজেরই এক্সিবিশনের ফঁকে। প্রদর্শনি হচ্ছিল গ্রাউন্ড ফ্লোরে। রোগীদের নিয়ে যে কবিতাগুলো লিখেছিলাম তারই মহরত বলা যায়। প্রতিটি কবিতার ছিল একটি করে পেইন্টিং ভার্সন। মিনুর কবিতার ছবি ছিলো জলরঙ্গে করা মরিস এ্যাগিসের। ঘরভরা সাংবাদিক, রোগীদের আত্মীয় স্বজন হেঁটে হেঁটে ছবি ও কবিতা দেখে যাচ্ছে- পড়ছে। লঞ্চ উৎসবে এসেছেন রোগীরা – মানে কবিরা । মানে যারা ওয়ার্কশপের মাধ্যমে লিখেছেন- কবি হয়েছেন। কেউ হুইল চেয়াওে, কেউ অক্সিজেন স্ট্যান্ড সঙ্গে নিয়ে আর কেউবা আজকে ওয়াইন খাবার অনুমতি পাবার জন্য নিজের ডাক্তারের কাছে ঘুর ঘুর করছেন। হঠাৎ মিনু আমাকে তার নিজের কাব্য-চিত্রের কাছে টেনে নিয়ে বল্লেন,
– আমার কবিতাতেতো এই রঙ ছিলো না!
– সে জন্যেইতো দ’ুটো দু’মাধ্যম। ছবি ও কবিতা। সেই সমানই। ম নিজের মতো করে বলছে।
– না আমার কাছে মনে হচ্ছে কবিতার অনুবাদ ছবিতে হয়নি। ভাষাই সব চেয়ে বড়।
– সবসময় না!
– সবসময়। তা নিজ ভাষা হলে..
-মানে?
– প্রথম-ভাষায় সবাই সব পারে কিন্তু! প্রত্যেকে মনের মত করে সাজিয়ে নিয়ে তারপর তাদিয়ে যা ইচ্ছে দেখতে পারে আর না পারলে ক্রমশ কথা জুড়ে দিয়ে সে ইমেজ দেখতে পারে। আরো কথায় আরো বর্ননায়। আরো ছবি …
মিনু আপনার সঙ্গে আমার কথা আছে। অবাক হয়ে বলেছিলাম।

মিনুর কাছে ফেব্রুয়ারীর আর দশটা বৈচিত্র্যহীন দিনের মতই ছিল আজকের দিনটি, যতক্ষণনা প্ল্যানিং শিটে তারিখ বসিয়েছেন। একুশ ফেব্রুয়ারী লিখতেই তার কলম কেঁপে উঠলো। আবার আরো একটি একুশ চলে এসেছে? কথাটা ভাবামাত্রই তার শরীরও মনে কিছু একটা ঘটে গেল। খুব চেষ্টা করলেন নিজেকে স্থির রাখার জন্য। পারা গেলনা। আগামী সপ্তাহেই সেই অবিস্মরণীয় ভাষা দিবস।
তারপর এই একটি সাদামাটা দিনে এই বিশেষ তারিখটি লেখার ফলে একটি অদ্ভূত কান্ড ঘটলো। অত্যন্ত ক্ষিপ্রভাবে একটি অসম্ভব ঘটনা হলো। একুশ লেখামাত্রই সে রেখা হয়ে গেল এক অদৃশ্য বাহন। তা তাকে তার বিলেতের শহরতলীর র্জজিয়ান টেরেসড্ বাড়ির এলাকা ছাড়িয়ে উড়িয়ে নিয়ে চল্লো। আলাদিনের সেই উড়šত চাদরে বসে ওড়ার মত উড়তে উড়তে মিনু পেরিয়ে গেলেন আধা বিশ্ব। তবে উর্ধ মুখী। কোনো মানুষ দেখলেন না। কোনো পরীও না। একেবারেই বাজে একটা স্বপ্নের মত তিনি তার ডাইনিং টেবিলের খয়েরী কুশনের চেয়ার থেকে সোজা উঠে এলেন একটি কাঠগড়ায়। হাত ছুঁতেই বুঝতে পারলেন আর্শ্চয এটাও ওক কাঠে তৈরী। সেখান থেকে তার হাত উঠিয়ে একটি কোরান শরীফের গিলাফের ওপর স্থাপন করা হ’ল। তিনি প্রতীজ্ঞা করলেন, “যাহা বলিব সত্য বলিব।” মনে মনে অবাক হয়ে ভাবলেন, বিলেতের কোর্টরুমে কোরান থাকে?

আচ্ছা কোরান যদি কোর্টরুমে থাকে তাহলেতো নিশ্চয়ই জেলে ফাঁসির আসামীর জন্য মোল্লা মৌলভীও আছে। মৃত্যুর আগে তওবা করানোর জন্য। কিন্তু কেন তারইবা দ›ড হবে কেন? কি করেছেন তিনি? ঘুরে ঘুরে বাবার কথা মনে হতে থাকে। বাবা, এখন বাবাই এসে তাকে বাঁচাতে পারেন। কিন্তু কিছু বলতে পারলেন না। আশ্চর্য ! মানুষ যে কিভাবে নতজানু হবার জন্য ব্যকূল থাকে তার প্রমাণ দিয়ে তিনি নতজানু হয়ে ঘাড় মাথা গুঁেজে দিলেন!

কিন্তু কে তাকে প্রশ্ন করছেন , কোথায় সেই গম্ভীর বিচারক তার কিছুই মিনু চোখে দেখতে পেলেন না। এরকম সময় মানুষ নিজের পাপ পূন্য, নাকি সুর্কম দূর্ষ্কম নিয়ে এমন ভাবিত হতেই পারে। তিনিও হয়েছেন। আতি পাতি করে কী অপরাধ তিনি করেছেন তা খুঁজতে লাগলেন। এবং কোথায় করেছেন। দেশে ? আজ থেকে একুশ বাইশ বছর আগে? নাকি এখানে, এই উনিশ বছরে। এদেশে তার ছেলে ছাড়া আর কিইবা আছে? তাহলে, তাহলেকি তার ছেলের জন্য এখানে ডেকে আনা হয়েছে? রাইট! নিশ্চয়ই তাই। তিনি তার ভাষার উত্তরাধিকার কতটুকু দিয়ে যেতে পেরেছেন সেজন্য।

একথা ভাবামাত্র সেই অদৃশ্য বিচারক তাকে তার আশংকা যে সঠিক সে স¤পর্কে নিশ্চিত করলেন। তার মাথা ঘুরে গেল। কতবার হতভাগাকে বাংলায় এ লেভেল দেবার জন্য যে চেষ্টা করেছেন তার ইয়ত্তা নেই। জিসিএসই’টা কোনোমতে দিয়েছিল। ঐপর্যšতই। তার সঙ্গে কিছুতেই তর্কে জিতে উঠতে পারেননি ।
-মা একটা পরীক্ষা পাশ করলেই আমি বাঙালী হয়ে যাবো ?
-বাংলা জানার জন্য তা করা দরকার।
– সে তো জানি মা।
-তুই লিখলে বানান শুদ্ধ হয়না। বাংলাদেশ নিয়ে লিখতে বল্লে একপৃষ্ঠাও লিখতে পারবিনা।
-কোন ভাষায়? ইংরাজীতে হাতে আমি চার পৃষ্ঠা পরবো। আর ক¤িপউটাওে এবং ইংরাজীতে বাংলাদেশের যেকোন বিষয় নিয়ে কমপক্ষে সাড়ে পাঁচ হাজার শব্দ লিখতে পারবো। আর স্যরি, বাংলায় বলতে দিলে বিষয় বুঝে কম পক্ষে পনর মিনিট নন স্টপ পারবো।কথায় না পেরে মিনু অভিমান নিয়ে আসেন।
– কিন্তু লোকে যে বলবে তোর নানুর কথা। তার নাতি হয়ে তুই বাংলা পারিস না।
– সেটাতো আরেকটা ইস্যূ মা। নানা তোমার মত বলতো না। বুঝতো।
-না , তুই বাংলা এ লেভেল করতে চাস্না।
-না’তো, চাইনা নয় পারিনা। তোমার তো ঢাকা ইউনিভারসিটির বাংলার পড়া তাই বোঝোনা। থাকতো আমার মতো ইংল্যান্ডের জিসিএস সি’র বাংলা পাশ করা বুদ্ধি বুঝতে এ লেভেল কত কঠিন। এবার মিনু কিছু বলতে পারেননা। ছেলে বলে বকে যায়,

– তোমরা আগে ঠিক করো আমাদের দিয়ে কি চাও! বাংলা বলা কওয়া বাঙালী বানানো যখন কঠিন, তখন তার স্থানে কী করা যায়? তুমিকি দেখোনা বাংলা জানা কতগুলো বাজে লোক, রাজনীতির নামে এদেশে কী করছে? এরাতো আবার নেতা কাউন্সেলারও। বলে সে বেশ ক্ষেপে যায়। আর রাগলে ওর দীর্ঘ শরীর চেহারা ছাপিয়ে চোখদুটো জ্বলতে থাকে। তা দেখে মিনুরও রাগ ওঠে। আর তার রাগ হলে তিনি ঘরের যত টবের গাছ আছে তাতে পানি ঢালতে ব্যস্ত হয়ে যান। দেখা গেল বাথরুমে ঢুকে পানি না ভরেই হাতের শূন্য প্লাস্টিকের জগ উঠিয়ে ধরে আছেন,

– ভালো কাউন্সেলার বা ভালো বাংলা জানা বাংলাদেশীওতো ছিলেন। জানিস না তসাদ্দুক ভাইর কথা, তছলিম হাজীর কথা আর.. এখন আব্দুল গাফফার চৌধুরী আর…। তুই খালি খারাপ কথা ভাবিস।
– ওরাতো নানাভাইর মত মহাপুরুষ মা। আমিতো অনেক ভীতু! বলে হেসে দেয় অনিক। আর মা তোমার মগে পানি নেই। হা হা হা।

– চুপ কর। অপ্রতিভ মিনু হাতের মগ রেখে সোজা নিজের তলা থেকে উঠে এসেছিলেন শোবার ঘরে। এদিকে এপর্যন্ত ভাবতেই বিচারক বল্লেন, মিনুকে আপাতত ছেড়ে দেয়া পারে। তবে আবার তলব করার সম্ভাবণা রইল।

ছাড়া পেতেই মনে হল আমার অনিক এখন ডাবলিনে কী করছে? অফিসের কাজে প্রতি সপ্তাহে তাকে দু’দিন করে আয়ারল্যান্ড যেতে হচ্ছে। ছেলেটার হাইট ফোবিয়া বলে প্লেনে ভয় পায়। প্লেনের দরোজা বন্ধ করলেই তার নাকি তার দম বন্ধ হয়ে আসে। প্লেনে উঠলেই সে একহাতে জুস, চা, কফি যা পারে খেতে থাকে আর অন্য হাতে তার স্কেচ বুকে আঁকতে থাকে। নন স্টপ মাথা মুন্ডু যা আসে মনে তাই। তাতে যতি যাত্রার সময় খাটো হয়ে আসে। এনিয়ে কথা বলতে গেলে বলে- মানে আফসোস করে কেন সে নানুর সাহসটা পেলনা। মিনু বলেন, প্রানের ভয় আর মনের ভয় আলাদা। দুটো এক হলে মানুষের মনে আর কোনো ’কি’ থাকেনা। সমাধান হয়ে যায়।

তারপরের টুকু মিনুর কাছ থেকে আমার টেলিফোনে শোনা।
অনিকের ঘর। তার অর্বতমানেই তাতে এসে ঢোকেন তিনি- দেখতেই হবে সে কোথায় দাঁড়িয়ে। যথারীতি যথেষ্ট অগোছালো। অদ্ভূত একটা গন্ধও । যা এ বাড়ির অন্য কোনো ঘরে নেই। একদিকে ক¤িপউটার,অন্যদিকে ছোট্ট টিভি। কোনায় সিংক। তাতে মাঝরাতে ব্যবহৃত চা’র মগ, অরেঞ্জ ড্রিঙ্ক এর তলানী সহ ফ্রস্টেড গ্লাস এবং একটি ওয়াটার গান। ডাস্টবিনে দুমড়ানো কাগজ পত্রের সঙ্গে আধা খাওয়া ড্যানিশ পেস্ট্রি। ফ্লোরে গিটার। চার দেয়াল শুধু না ছাদে পর্যšত পোস্টার। তাতে এ্যান্টি নাৎসী লীগ থেকে শুরু করে জামাত বিরোধী পোস্টার ”এঘরে কুকুর ও রাজাকারদের প্রবেশ নিষেধ”, শিল্পী ভ্যান গগের “ক্রোউস ইন টি উইট ফিল্ড” ও সাহাবুদ্দিনের গতিময় একটি পোস্টারও । আয়নার পাশে বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের ছবি। তার হাত পা সব গলে যায়। কবে সে এমন হল? এভাবে ও না থাকলে তিনি তার ঘরে ঢোকেন না। কিন্তু আজকের জেরার পর তার মনে হল আরো জানা চাই। সুখের হোক দূ:খের হোক। কোথায় যাচ্ছে তার উত্তরাধিকার।

ঘরের ঠিক মাঝখানে একটা উইন্ড চাইমার। তাতে পাখির একটি পালক, বেগুনী কাঁচের লহড়া আর রূপালী ধাতব বলয়। হাত ছোঁয়াতেই টুং টাং করে বেজে উঠলো। এবং তা দুলতে থাকলো। নীল পর্দা ঢাকা ঘরে এতটুকু ফাঁক। বাইরে ঝির ঝির করে বরফ বৃষ্টি হচ্ছে। না প্রাণে তবুও অস্থিরতা। সাউন্ড সিস্টেমে হাত দিতে সাহস হয়না কী না জানি বেজে ওঠে। মনে হয় অনিকের কথা, আচ্ছা মা মায়েরা কেবল খারাপটা ভাবে কেন? আর ভাবলে সেটার পরিষ্কার কোনো কারণ দিতে পারেনা কেন? আর কেন বোঝেনা চাইলেই কিন্তু হুবহু সব হয় না। হয়তো হয় তবে একটু অন্যভাবে।

কথাটা মনে হতেই তার হাতটা ধীওে ওপরে উঠে যায় – তিনি আঙ্গুল গিয়ে চাপ দেন প্লেয়ারের সুইচে। অমনি বেজে ওঠে সিন্থেসাইজার ও সেতার এক সঙ্গে। অসম্ভব সুন্দর এক পুরুষ কন্ঠ গেয়ে ওঠে “ফোটে ফুল আপন সুখে কার ইশারায়..গন্ধ ছড়ায়”। মিনুর পা গেঁথে যায় কার্পেটে। যেন কার্পেট তো না সুরমা পাড়ের ঘাস। ট্য্রাক বদলে দেন। এবার বেজে ওঠে দিলি মিয়ার ‘নাইট ইন বেঙ্গল।‘ রাগ মালকোষ এর সঙ্গে র্কনিশ পল শেনরের ফ্লুট। অপূর্ব এক ফিউশন। ক’মুহূর্তের জন্য হা হয়ে বোকার মত দেয়ালের’পোস্টার উইট ফিল্ডের দিকে তাকিয়ে থাকেন। ক্ষেতের সোনা কানে উঠে আসে। বাজতে থাকে ঐশ্বরিক শব্দ মালার মত তবলার অশ্রতপূর্ব লহড়া। একটা সম্মোহনে পেয়ে বসে তাকে। তারপর ধীরে ধীরে বেরিয়ে এসে স্টাডিতে ঢুকে বই ঠাসা র‌্যাকগুলোর দিকে চেয়ে থাকেন। সমস্ত সাউথ এশিয়ান রাইটারদের ইংরাজীতে লেখা বই তার দিকে গথিক গির্জার মত, সাত মসজিদের মিনারের মত, ঢাকেশ্বরীর মন্দিরের চূড়োরমত উঠে দাঁড়ায়।

মনে ভেসে ওঠে বিশ্বের প্রবহমানতায় গ্লোাবাল ছেলেমেয়েদের চেহারা। নিজের তিন প্রজন্মের খতিয়ান। বাবা অধিকার এনেছিলেন। নিজে সেতু হয়েছেন বর্হিবিশ্বে আর অনিক? সে কি তা ভিন্ন বিশ্বে পৌছে দেবার জন্য রাস্তা খুঁজছে?

– আমি সব শুনে বল্লাম,মিনু আপনার সঙ্গে সত্যি কথা আছে। চলুন এক সঙ্গে চা খাই।
– কোথায়?
– গ্লোব টাউনের নতুন ক্যাফে, ইভল্যূশনে।

প্রিয় পাঠক আপনাদের কাছে জানতে চাইছি কি বলবো বলুনতো?

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত