ভোজনপ্রেমা

ভোজনপ্রেমা
বিয়েতে এসে আমার স্ত্রী খাসির গোশত খেয়ে গোরুর গোশত দিয়ে খেয়েছে। তারপর মুরগীর মাংস দিয়ে আরেক প্লেট ভাত খেয়েছে! মুরগীর মাংস খাওয়ার পরে আর কোনো গোশত বা মাংস জাতীয় কিছু এল না। সে বলল— খুব বাজে বিয়ে হচ্ছে! সামান্য হাঁসের মাংস থাকলে কী হতো? আমি মাথা ঝুঁকিয়ে বললাম— বিয়েতে হাঁসের মাংস থাকে না। সে আমার কথা মানল না। অনেক বিয়েতে নাকি সে হাঁসের মাংসও খেয়েছে। খাওয়াদাওয়ার পরে সে হাত ধুয়ে ফেলল। মুখ মুছল টিস্যু দিয়ে। আমার ঘুম পাচ্ছে কেন জানি। মানুষের গিজগিজের মাঝে আমার ঘুম পায়! ছোটোবেলার অভ্যাস।
‘ পান নাই? পান ছাড়া বিয়ে বাড়ির দাওয়াত খেয়েছি তা মনে হয় না। ‘
‘ পান তো থাকার কথা। কিন্তু আমার চোখে পড়ছে না। ‘
‘ বাবুকে আমার কোলে দিয়ে তুমি পান নিয়ে এস তো। ‘
বাবুকে তাঁর কোলে দিয়ে আমি পান নিয়ে আসলাম। হালকা জর্দা আর লাল রকম কী দিল বুঝলাম না। দুটো পান সে মুখে দিয়ে বলল— খাওয়ার আর কিছু বাকি আছে? আমি মাথা নাড়ালাম।
‘ বাকি থাকার কথা না। সবই খেয়েছ। ‘
‘ কী যে খেলাম! পেটের এক কোনাও ভরে নাই! ‘
‘ এখনো এক কোনাও ভরে নাই? ‘
‘ না তো! ‘
‘ আবার খাবে? ‘
‘ চলো খাই, খাসির গোশতের তরকারিটা অসম্ভব মজার হয়েছে। ‘
সে আবার গিয়ে টেবিলে বসল! আমি বাবুকে কোলে নিয়ে বসে থাকলাম। ঘুমে চোখ লেগে এলে বাবু নাকমুখ খামছি দিয়ে ধরছে। সে বুঝতে পারছে এই বিয়েতে তাঁর মা আর কোলে নেবে না! আমি ঘুমিয়ে গেলে বিপদ। দুবার খেয়ে সে খ্যান্ত দেয়নি। তিনবার বসেছে!
বিয়ের সময় শ্বশুর বলেছিল— নিজের মেয়ে বলে বলছি না। সেতু যেমন খাটে তেমন খায়। একটু মানিয়ে নিয়ো।
শ্বশুরের কথা শতভাগ ঠিক। সে যেমন খাটে তেমন খায়। বাবুর জন্য দুধ, হরলিক্স, জুস এই জাতীয় কিছু আনলে নিজেই খেয়ে সাবাড় করে দেয়! পরদিন আবার বলে— বাবু তো সারাক্ষণ খাই খাই করে! কী করি বলো তো?
কদিন আগে বাসায় মামা এসেছে। সাথে করে মিষ্টি, রসগোল্লা, দই, বিস্কিট, চানাচুর ইত্যাদি এনেছে। উনি ভাবলেন দুবছরের বাচ্চা বুঝি এসব খেতে পারবে! মামা দুদিন ছিলেন বাসায়। মাশাল্লাহ দুদিনের ভেতরে একটা বিস্কুটের টুকরাও বাকি থাকেনি। সব শেষ। মামা চলে যাবার পরদনই সেতু বলল— মানিক মামাকে আবার আসতে বলো না। উনি খুব ভালো মানুষ। উনার সেবা যত্ন করতে ভালো লাগে। মামাকে না বলে পারলাম না। তিনি কিছুদিনের মধ্যে আসবে বলেছেন। বাবুর যেদিন ডেলিভারি হবে। হাসপাতালের বেডে শুয়ে সেতু আমাকে বলল— মা হওয়া কি পাপ? আমি আশ্চর্য হয়ে বললাম— মা হওয়া পাপ হবে কেন?
‘ ডাক্তার কচুরা দুদিন ধরে তাহলে রুটি-ফুটি দিচ্ছে কেন? রুটি ডিম ছাড়া দেশে কি খাওয়ার আর কিছু নাই? ‘
‘ আছে, কিন্তু এ সময় বেশি খেলে পেটের বাচ্চার অসুবিধা হয়! ‘
‘ তুমি ডাক্তারদের মতো কথা বলো না। তুমি ডাক্তার না। হিসাবে আমার এখন দুইজনের খাবার খাওয়া দরকার! ‘
‘ চা এনে দেব? চা খেতে দেয় কি না তাও জানি না। ‘
‘ চা না। তুমি শিঙাড়া আনো। ঝাল কিছু না খেলে আমার শান্তি লাগে না। শরীর গরম হয়ে আসে। ‘ ডাক্তার এলেন কিছুক্ষণ পর। সেতুকে শিঙাড়া খাওয়া অবস্থায় দেখে তিনি মাথায় হাত দিয়ে বললেন— তোমার ডরভয় নাই?
‘ কীসের ডরভয়? ‘
‘ এইযে সমানে খেয়ে যাচ্ছ! তোমার তো পেট খারাপ হয়ে যাবে। ‘
‘ পেট খারাপ হোক, বাচ্চা তো আর খারাপ হচ্ছে না! ‘
‘ হতেও তো পারে! ‘
‘ আপনার কাজ আপনি করুন তো। আমার কাজে বাধা দেবেন না! ‘
ডাক্তার সাহেবকে এর পরে আর দেখতে পেলাম না। রাতের দিকে একজন মহিলা ডাক্তার এসে ডেলিভারি সম্পূর্ণ করলেন। সেতুকে নিয়ে যখন চলে আসব। তখন আবার সেই ডাক্তার উপস্থিত। উনি বিস্মিত হলেন। সেতুর চোখে পানি। এক হাত দিয়ে বাবুকে বুকে চেপে ধরে আছে। আরেক হাত দিয়ে চাটনি খাচ্ছে। আমাকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন— আপনি বিরক্ত হোন না এতে? আপনার স্ত্রী যে সারাক্ষণ খাওয়ায় ব্যস্ত থাকে।
‘ মাঝে মাঝে বিরক্ত হই। ‘
‘ তখন কী করেন? ‘
‘ বিরক্তি প্রকাশ করি না। বিরক্তি প্রকাশ করলে আরেক ঝামেলা। তখন রাগ করে বসে থাকবে। সেই রাগ ভাঙাতে নিয়ে যেতে হবে কোনো বড়ো রেস্টুরেন্টে! ‘
বয়স্ক লোকটা হেসে দিলেন। ডাক্তারদের মুখে হাসি থাকে না। সেবা দেয়ার জন্যই হোক আর সেবার নামে ডাকাতির জন্যই হোক। তবে উনি হাসলেন। এবং একটা বড়ো গিফট বাক্স সেতুকে দিয়ে বললেন— আমার মেয়ের নাম সুবর্ণা। সে এখন অক্সফোর্ডে আছে। সেও সারাক্ষণ খাই খাই করত। তাঁর মা বলত, এত খাই খাই করলে জীবনে কিছুই হবে না। ও এখন অক্সফোর্ডে চান্স পেয়েছে। কিন্তু মা দেখতে পারল না! মা মারা যাবার পরে ওর খাই খাই স্বভাবটাও চলে গেছে। আগের থেকে ওজন কমেছে তের কেজি। তোমাকে দেখে মেয়ের কথা খুব মনে পড়ে গেল। ভালো থেকো।
বাসায় এসে দেখি সেই বাক্সে উনার নিজের মেয়ের ছবি দেয়া। স্কুলের পোশাক পরে একটা মেয়ে মায়ের সাথে দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর চুলগুলো ছোটো ছোটো। সঙ্গে উনার মেয়ের প্রিয় কিছু খাবার। এখানে চকোলেটই বেশি। দুপুরের দিকে হাতে ব্যাগ নিয়ে বাজারের দিকে রওনা হয়েছি। বাজারের অপর পাশে কিন্ডারগার্ডেন স্কুল। সেই রাস্তায় টিয়ার মার সাথে দেখা হয়ে গেল। টিয়া তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। সেতুর প্রাক্তন ছাত্রী। আমাকে দেখে টিয়ার মা লজ্জিত হলেন। বললেন— টিয়া আর কিন্ডারগার্ডেনে যাবে না!
‘ সেকী! কেন? ‘
‘ টিয়ার টিফিন না কি সেতু খেয়ে নেয়! ‘টিয়া গলা বাড়িয়ে বলল— শুধু টিফিন না। আমার ব্যাগের চকোলেট বিস্কিটও খেয়ে ফেলে ম্যাডাম! আমি কী বলব বুঝতে পারলাম না! বাজার থেকে এসে সেতুকে বললাম— টিয়া আর স্কুলে যাবে না!
‘ কেন? ‘
‘ কে জানি তাঁর টিফিন, চকোলেট সব খেয়ে ফেলে! সেতু কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল— ব্যাপারটা অন্য কিছু। টিয়ার মা ডাঁটাশাক দিয়ে যে তরকারিটা রান্না করেন না। না খেয়ে পারা যায় না। আমি টিয়াকে আমার টিফিন দিয়ে ওরটা খাই! আর তো কিছু না!
‘ তোমার টিফিন তুমি খেলেই পারো। ‘
‘ নিজের রান্না নিজের কাছে ভালো লাগে না। অন্যেরটা ভালো লাগে জানো না? ‘
‘ টিয়ার বাবা পুলিশে আছে জানো? ওর বাড়িতে গিয়ে বুঝিয়ে এসো একবার। ‘
‘ আমি কি পুলিশ ভয় পাই? ‘
‘ না পেলে তো আরো ভালো। ‘
‘ আচ্ছা, বিকেলে যাব। এখন এসো কোয়েলের ডিমের নুডলস খাই। তিন তলার ভাবীর কাছ থেকে কোয়েলের ডিম এনেছি। উনার চারটা কোয়েল। ‘
নুডুলসের মাঝে কোয়েলের ডিম দিয়েছে। হাঁস বা মুরগীর ডিম না দিয়ে। কিন্তু আমি চিন্তা করছি কোয়েল ডিম পাড়ে? ডিম পাড়ে কোয়েলা। আজকাল কত কিছুই দেখছি উল্টো হয়ে যাচ্ছে। কোয়েল ডিম পাড়া অসম্ভব কিছুই না। কিছুদিন আগে একজন ছেলে মানুষ গর্ভবতী হলো! সন্তান জন্ম দিল! ছেলে মানুষ পারলে ছেলে কোয়েল কেন পারবে না? আমি আমার বাসনের অর্ধেকও খেতে পারলাম না। আর সে তিন বাসন খেয়ে আরেক বাসন নিতে গিয়ে দেখে নুডুলস শেষ। বাবু ঘুমিয়ে আছে। বাবু জাগলে ওকেও একটু কোয়েলের ডিমের নুডুলস খাওয়াবে ভেবেছিল! মাথায় হাত দিয়ে বলল— এতগুলো রান্না করেছি, গেল কই সব?
‘ পেটে গেছে আর কই যাবে? ‘
‘ বাবুর জন্য তো কিছুই থাকল না! ‘
‘ থাক বাবুর খেতে হবে না। নুডুলস স্বাস্থ্যকর কোনো খাবার না। ‘
‘ চিপস চকোলেটও স্বাস্থ্যকর না। ওসব বাবু খায় না? দাঁড়াও ভাবীর কাছ থেকে আরো কয়েকটা ডিম নিয়ে আসি। ‘
‘ আবার ডিম আনতে যাওয়া ঠিক হবে? ‘
‘ তখন এনেছিলাম তোমার কথা বলে। এবার আনব বাবুর কথা বলে। কালকে আনব আমার কথা বলে। আমি কি গাধি যে একবারে সবার কথা বলে আনব? ‘ আমি মানা করলাম না। মানা করলে শুনবেও না। কিছুক্ষণের মধ্যে সে হাতে আরো কয়েকটা কোয়েলের ডিম নিয়ে হাজির! চোখমুখ দেখে মনে হচ্ছে বাবুর জন্য সে একটা আকাশ নিয়ে এসেছে!
‘ দেখেছ, উনি বাবুর কথা বলতেই কতগুলো ডিম দিয়ে দিলেন? ভালো মহিলা। নিচে যে কয়েকটা মহিলা থাকে। একটাও ভালো না। পোলাও মাংস রান্না করে কোনোদিন একটুও পাঠায় না! ‘
‘ তুমি কি পোলাং মাংস রান্না করে ওঁদের বাসায় পাঠাও? ‘
‘ আমি যতটুকু রান্না করি। ততটুকু তুমি আমি আর বাবু মিলে খেয়ে ফেলি না? ‘
‘ তাও কথা। আমি তুমি আর বাবু মিলে খেয়ে ফেলি। কীভাবে দেবে? ‘
‘ হুম, যাহোক। রাতে নয়ন স্যারের বিয়েতে যাব। ‘
‘ নয়ন স্যার আবার কে? ‘
‘ আমিও চিনি না। দুই বাসা পরেই একটা বিয়ে হবে। পাত্রের নাম নয়ন। শিক্ষকতা করেন। তাই উনি আমার স্যার হয়ে গেছেন! ছাত্রী হিসেবে উনার বিয়ে খেতেই পারি। আবার তুমি নিমন্ত্রণের আশায় বসে থাকবে না। নয়ন স্যার আমাদের কেউই হোন না। নিমন্ত্রণও দেবেন না। ‘
আমি মাথা নাড়ালাম। নিমন্ত্রণের আশা করব না। চারপাশে কার কখন বিয়ে হচ্ছে তা সেতু কীভাবে জেনে যায় কে জানে? না কি বিয়ের খবর নিজেই হনহন করে সেতুর কাছে চলে আসে? সন্ধ্যার সময় বাবুকে ঘুম পাড়াতে গিয়ে নিজেই ঘুমিয়ে গেছি! হঠাৎ বাবু নাকমুখ ধরে খামছি দিচ্ছে! কী একটা পৌরূষহীন স্বভাব! দুবছরের ছেলে মেয়ে একটু একটু কথা বলার চেষ্টা করে। তা না করে সে জিদ উঠলেই খামছি দিয়ে ধরে। জেগে দেখি সেতু বাসায় নেই! বাবু ঘুম থেকে উঠেই মায়ের বুকের দুধ খাবে। নাহলে তাঁর কান্না আর থামায় কে? কী ঝামেলায় পড়লাম। বেচারাকে কত করে বলছি— বাপরে একটু ধৈর্য ধর। তোর মা বিয়ে খেতে গেছে। পেট ভরে না খেয়ে কি চলে আসবে তোর জন্য?
সে আমার কথা কী হিসেবে নিল কে জানে? কান্নার গতিবিধি আরো বেড়ে গেল! কিছুক্ষণ পর সেতু এসেছে। বাসায় ঢুকে প্রথমেই বলল— তোমার তো লজ্জাশরম বেশি! দাওয়াত ছাড়া খেতে যাও না। আর বাবুকে নিয়ে বিয়েতে গেলে খেতে পারি না! ঘন মানুষ দেখলেই কান্না শুরু করে দেয়। তোমরা দুজনেই ঘুমিয়ে ছিলে। এই ফাঁকে খেয়ে আসলাম! ভালো হয়েছে না? ‘ ভালো হয়েছে। এবার এই ব্যাটাকে সামলাও। সেতু শুধু খেয়েই আসেনি। সঙ্গে করে নিয়েও এসেছে। প্যাকেটে করে বিরিয়ানি। অবাক হলাম। বিয়ে বাড়িতে প্যাকেট করা হয়? এ কথা জিজ্ঞেস করার আগেই সেতু বলল— যাবার সময় ফজলু কাকার দোকান থেকে প্যাকেট নিয়ে গিয়েছিলাম। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায় ক্ষুধায়! তখন বিরিয়ানি খেলে ভালো লাগবে।
‘ কার কথা বলে নিয়ে এসেছ? ‘
‘ তোমার কথা বলে! তোমার কথা ছাড়া আমি কিছু করি? ‘
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মনে মনে বললাম, ভাগ্য ভালো ওঁরা আমাকে চেনে না! না কি চেনে? চিনলে তো মুশকিল! রাতে ঘুমুতে যাবার আগে সেতু বলল— একটা কথা বলি? কথাটার মাঝে রোমান্টিকতার ঝাল বেশি ছিল। ভাবলাম বাবুকে এখানে রেখে পাশের রুমে বুঝি যেতে বলবে।
‘ বলো। ‘
‘ তুমি জাহাজের চাকরি ছেড়ে দাও। নিচের তলা একটা খালি আছে না? ওখানে দোকান দাও। আশেপাশে স্কুল কলেজ আছে। চলবে ভালো। ‘
‘ জাহাজের চাকরি খারাপ কী? ‘
‘ খারাপ তো কিছু না। আমার ভয় করে বেশি। তাছাড়া বাবুও তোমাকে সারাক্ষণ কাছে পেতে চায়। বাসার নিচে দোকান দিলে বাবুও তোমাকে কাছে পাবে। বাবুর বিস্কিট, দুধ, চকোলেট এসন নিয়েও আর বারবার বাজারে যেতে হবে না! ‘
‘ দেখি। ‘
‘ দেখাদেখির কিছু নাই। বলো দিচ্ছি। ‘
‘ বললেই কি সব হয়ে যায়? টাকা পাওনা আছে চাচার কাছে। দেখি দেয় কি না। ‘
‘ তাহলে কালকেই পাওনা টাকা উনার কাছে চাইবে। আবার লজ্জারাজ হয়ে বসে থেকো না। ছেলেদের অত লজ্জা মানায় না! ‘
‘ আচ্ছা চাইব। ‘
‘ ঠিক আছে, ঘুমাও। আর তুমি চাইলে এখন এক কাপ চা করে দিতে পারি। ‘
‘ তুমি নিজে খাও। আমি বরং ঘুমাই। ‘
‘ আচ্ছা, আমি নিজেই খাই। কী আর করব। ‘
বাবু খুব নরম করে আমার গালে হাত রাখল। চোখমুখ দেখে মনে হচ্ছে আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে! বাপের দুঃখটা ছেলে বুঝল। বাপের দুঃখ ছেলে বুঝবে এটাই তো কথা। আমি বাবুকে বুকে টেনে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। আমার টাকাতেই সংসার খুব ভালোভাবে চলে যায়।
সে বাচ্চাদের স্কুল থেকে যে কটা টাকা পায়। তার সিংহভাগই চলে যায় খাবার কেনায়। বাকি যে টাকা থাকে। সে টাকা দিয়ে হাঁস মুরগী কেনে। বলে লালনপালন করে বড়ো করবে। দেখা যায় দুদিন পরেই রুটির সাথে হাঁস মুরগী আমাদের পেটে চলে যাচ্ছে! টিয়ার বাবা এসেছেন বাসায়। গায়ে পুলিশের পোশাক নেই। তবু সেতু ভয়ে কাঁপছে! উনার মেয়ের টিফিন খেয়ে ফেলার অপরাধে গ্রেফতার না করে বসেন! বাস্তবে মনিরুল সাহেব বললেন অন্য কথা— সেতু। আমার ছোটো শ্যালিকার বিয়ে। টিয়াকে বললাম তোমার একজন বান্ধবীকে দাওয়াত করো। টিয়া তোমার কথা বলল। রাউন্ড মলে বিয়ে হবে। তোমরা কালকে চলে আসবে। এই কথা শুনে সেতুর যেন দম ফিরে এল। সে বলল— বসেন। আপনার জন্য চা নিয়ে আসি। ‘ চা আমি খাই না। কফি খাই। ‘ কফি? কফির জন্য নিচে যেতে হবে। বেশি দেরি হবে না। যাব আর আসব।
মনিরুল সাহেব বসলেন না, সময় নেই। পরদিন আমরা রাউন্ড মলে এসে বিয়েতে শরিক হলাম। বর আসা মাত্র পাত্রী বরকে নিয়ে যে একটা নাচুনি দিল! আমি বুঝতে পারলাম না এই মেয়ে পাত্রী না ডিস্কো থেকে বউয়ের সাজগোজ করিয়ে আনা হয়েছে নাচবার জন্য! ‘ এত নাচানাচি করার কী আছে বুঝলাম না! সেতু বিরক্তিমাখা স্বরে বলল। আমি উত্তর দিলাম— আজকাল সব বিয়েতেই এমন নাচুনি হয়। ‘ কই আমি তো বিয়ের সময় তোমাকে নিয়ে নাচুনি দেইনি। আমাদের কি বিয়ে হয়নি? ‘ প্রেমের বিয়ে মনে হচ্ছে। মনের মানুষটাকে মেয়েটা স্বামী হিসেবে পেয়েছে। এই খুশিতে নাচুনি দিচ্ছে। তুমি এত বিরক্ত হচ্ছ কেন? ‘ নাচানাচি করবি কর। আগে তো খাবার দে! সবাই উপহার নিয়ে এসে তোমাদের নাচুনি দেখতে আসেনি। কেউ কেউ খেতেও এসেছে। আর কতক্ষণ নাচুনি পর্ব চলবে কে জানে? ‘
পাত্রকে নিয়ে পাত্রীর নাচানাচি শেষ হবার পরে। পাত্রীর বান্ধবীরা পাত্রকে নিয়ে নাচল। পরপর পাত্রের বন্ধুবান্ধবরা পাত্রীকে নিয়ে নাচল। পাত্রের বন্ধুরা পাত্রীর বান্ধবীদের নিয়ে নাচল। তারপর পাত্র পাত্রীর মা বাবারা যোগ দিলেন। তাঁরা স্টেজে আসার পরে সবাই করতালি দিয়ে উৎসাহিত করেছে! এরপরেও একজন স্টেজে মাইক নিয়ে এসে বললেন— এবার স্টেজে আসবেন পাত্রের দাদি এবং পাত্রীর দাদা। তাঁদের জন্য হয়ে যাক করতালি! এই কথা শুনে সেতু আমার হাত ধরল। ‘ হাত ধরলে কেন? ‘ চলো আমরাও বাবুকে নিয়ে স্টেজে নাচুনি দিয়ে আসি। উপহারটাই জলে গেছে। খাওয়া যে আজকে হবে না, তা বুঝতেই পারছি। একটু নাচুনি দিয়ে উপহারের টাকা উসুল করলে মন্দ কী? আমি কোনোরকম সেতুকে থামালাম। ‘ দাদা দাদির পরে তো আর কেউ নাই। এঁদের নাচুনির পরেই খাবার দেবে। শান্ত হয়ে বসো আরেকটু। নিতান্তই রাগ নিয়ে সেতু বসে থাকল প্লেটের দিকে চেয়ে। বুড়া বুড়ি স্টেজে উঠে দুমিনিট নেচেই স্টেজ থেকে উত্তেজনাবশত মেঝেতে পড়ে গেলেন! একজনের দাঁত পড়ে গেল! আরেকজনের পা মচকে গেছে! একটা হৈচৈ বেধে গেল। বিয়ে না হওয়ার উপক্রম!
সেতু মাথায় হাত দিয়ে বলল— মেজাজটা কেমন লাগে দেখো! গায়ে নাই শক্তি তোমাদের নাচতে হবে কেন? এখন তো উপহার ফেরত নিতে গেলে মনে মনে বলবে, ছোটোলোক! ‘ উপহার ফেরত নেওয়া যায় না সেতু। ‘ যায়, তুমি বাবুকে নিয়ে বের হও। আমি উপহার ফেরত নিয়ে আসছি। শাড়ি ঘরে থাকলে পচে যাবে না। এই শাড়ি দিয়ে আরেকটা বিয়ে খেতে পারব। সুন্দর করে উপহারের বাক্সে নাম লেখা আছে। উপহারটা চিনতেও অসুবিধা হবে না। ‘ আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে সেতু উপহার ফেরত নিতে চলে গেল রিসিপশনের দিকে! কী একটা অবস্থা!

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত