অচেনা সুজন

অচেনা সুজন

মেয়েটির সাথে প্রথম দেখা বিশ্ববিদ্দ্যালয়ের বাসে । এক দুপুরে ক্লাশ শেষে বাসায় ফিরছিলাম ।বরাবরের মত বাসে উঠতে দেরি হওয়ায় দাঁড়িয়ে যাচ্ছি । আমি ছেলেদের জন্য বেঁধে দেয়া জায়গার সীমান্তে আর সে মেয়েদের সীমান্তে ।দু’জনার মধ্যে দূরত্বটা ভদ্রতা সূলভ ।দু’জনই দাঁড়িয়ে যাচ্ছি । পাশে তরল পারদের মত রূপসী মেয়ে,না তাকিয়ে কি থাকা যায় ! বরফ গলা পানির মত স্বচ্ছ আর ঠান্ডা দুটি চোখ,চেহারায় নির্লিপ্ত একটা ভাব ।দৃষ্টি সামনে প্রসারিত অথচ কিছুই যেন দেখছেনা তার চোখ ।দৃষ্টি তার দিগন্তের সীমারেখা ছাড়িয়ে আরো দূরে কোথাও যেন কিছু একটা খুঁজছে । চৈত্রের রোদ জ্বলা দুপুরে গরমের মাত্রাটা হঠাৎ করেই বেড়ে গেল । এক মুহূর্তে যেন বুকের জমিন ফেটে চৌচির হয়ে যাওয়ার পালা । তার বরফ শীতল চাহনীতে আমার অস্থির চাহনী ধরা পড়ে গেল । দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিয়ে আমিও এবার আকাশ দেখতে লাগলাম ।আচমকা গাড়ি ব্রেক করাতে আমি টাল সামলাতে পারলেও সে পারেনি,অনেকটা আমার গায়ের উপর এসে পড়ল সে । সরি বলে নিজেকে সামলে নিতে যাওয়ার আগে দমকা হাওয়ায় তার ঘন কালো চুলের অবাধ্য একটা গোছা আমার মুখের উপর এসে পড়ল । মিষ্টি একটা ঘ্রাণ নাকে যেতেই মস্তিষ্কের সব নিউরণ এক সাথে লাফিয়ে উঠল । কেঁপে উঠলো আমার বাইশ বসন্ত। এক মুহূর্তে সব স্বাভাবিক হয়ে গেলেও এলোমেলো হয়ে গেলো আমার মনের বিষন্ন বালুচর । মৌচাকে নেমে গেল সে,আর আমাকে রেখে গেলো মধ্যরাতের নিস্তব্ধ রেল ষ্টেশনের ওয়েটিং রূমে । ভাবনার রাজপথে তখন সবুজ সিগনাল জ্বলছে । পরদিন ও একই সময়ে বাসে উঠলাম,কিন্তু তার আর দেখা নেই । অনেক মানুষের ভীড়ে আমি একা দাঁড়িয়ে রইলাম । নিজের ছুড়ে মারা তীরে নিজেই বিদ্ধ হয়ে যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছিলাম । এ যন্ত্রনার কোন নাম হতে পারেনা । সময় আমার থমকে গেছে দুপুরের বাসে । আজ বিধি সুপ্রসন্ন,দেখা মিলল তার । কোলের উপর দুটি বই ডান হাতে ধরে জানালার পাশের সিটে বসে দৃষ্টি মেলে দিয়েছে মেঘের ভাজে,আকাশের নীলে ।এক সীট পিছনে বসলাম আমি ।চুল ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছেনা । শুধু নেমে যাওয়ার সময় এক পলকের জন্য ঘুরে তাকাল ।অনেকটা অঞ্জনের গানের মত- “শুধু এক পলকের জন্য একটু দেখা,ছুটি হয়ে গেলে দু’জনার ইস্কুল”। কখন দেখা হয় কখনো হয়না এই ভাবে চলল দুই সপ্তাহ।
আস্থিরতায় রাতে ভাল ঘুম হয়না,সকালের আশায় চোখ মেলে জ়েগে রই । সারা দিনের সঞ্চয় শুধু ঐ একটুখানি দেখা । রবী বাবুর স্বরনাপন্ন হলাম এবার । তার একটা গান কাগজে লিখে তার নিচে আমার সরল স্বীকারোক্তি দিলাম-
“যা হবার তা হবে
যে আমাকে কাঁদায় সে কি অমনি ছেড়ে রবে।।
পথ হতে যে ভুলিয়ে আনে
পথ-যে কোথায় সে তা জানে
ঘর যে ছাড়ায় হাত সে বাড়ায় সেই তো ঘরে লবে।।”
পথ হারিয়ে আমি আজ দিশেহার তোমার চুলের গহীন অরণ্যে । পথ চিনিয়ে ঘরে না নিলে হারিয়ে যাব চিরদিনের জন্য । ইতি
পথ হারা এক পথিক

চিঠিটা পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়ালাম আরো এক সপ্তাহ । তার মাত্রাতিরিক্ত নির্লিপ্ততার বিশাল বিশাল ঢেউ আমার সাহসের ছোট্র নৌকাকে তার হ্রদয়ের বন্দরে জায়গা দিতে নারাজ ।ভেবে কুল পাচ্ছিনা কি করব ? এর মধ্যে একদিন শুধু জিজ্ঞাসা করলাম কেমন আছেন ? মুখে মৃদু একটা হাসি টেনে বলল ভাল । আমি কেমন আছি এটা জানার কোন প্রয়োজনই সে মনে করল না । আহত মন নিয়ে ঘরে ফিরে এলাম । পরদিন কলা ভবনের সামনে তার সাথে আমার বিপরীত মুখি সংঘর্ষ হল । আমাকে অবাক করে দিয়ে সে ই প্রথম জিজ্ঞাসা করল ভাল আছেন ? মুখে সেই সংযত হাসি ধরে রেখে বিদায় নিল এক মুহূর্ত পর । এক মাস দু’চোখের তারায় বন্দি হয়ে তার সব কিছু আমার মুখস্ত । একদিন বাসে উঠে দেখি তার বই জানালার পাশের সেই সিটে রাখা আছে কিন্তু সে নেই । সুযোগ হাত ছাড়া করলাম না । চিঠিটি গোপনে তার বইয়ের ভিতর ঢুকিয়ে দিয়ে আমি সেদিনের মত হাওয়া । তারপর চারদিন তার কোন খোঁজ নেই । আমার আস্থিরতার কথা,ব্যাকুলতার কথা জানলে সে এভাবে নিরূদ্দেশ হতে পারতনা । পাঁচদিন পর তার সাথে দেখা হল মল চত্ত্বরে । একা দাঁড়িয়ে ছিল সে,দুপুরের সব ব্যাস্ততাকে ছাপিয়ে যেটা ফুটে উঠছিল সেটা তার উদাসী চোখের ছলছলে চাহনী । কাছাকাছি গিয়ে দাড়ালাম । কিছু বলার আগেই আমার হাতে একটা সাদা রংযের খাম দিয়ে সে চলে গেল । খামের উপর নীল গাঢ় কালিতে লেখা “অচেনা সুজন”।

বাসায় ফিরেই খামটা খুললাম । ভিতরে এক টুকরা কাগজ়ে উঁকি দিল । তার দেয়া চিঠিটা শুরূ হয়েছিল এভাবে-
“পথে যেতে যেতে ডেকেছিলে মোরে
পিছিয়ে পড়েছি আমি যাব যে কী করে।।
ভয় হয় পাছে ঘুরে ঘুরে
যত কাছে আমি যাই তত যাই চলে দূরে ।
মনে করি আছ কাছে
তবু ভয় হয় পাছে
তুমি আছ আমি নাই কাল নিশি ভোরে ।।
মিছে মায়ার জাল বুনে কষ্ট পেয়োনা । আমার বিয়ে ঠিক গেছে । তোমার স্বচ্ছ চোখের ভিতর যে সত্য আমি দেখতে পেয়েছি তা বুকে ধারণ করার শক্তি বা সাহস কোনটাই আমার নেই। ক্ষমা করো আমায় । ইতি
তোমার পথ হারানো পথের দিশা ।
চিঠিটা হাতে নিয়ে বসে রইলাম । দুপুর গড়িয়ে কখন যে বিকেল ও শেষের পথে টের ও পাইনি । শেষ বিকেলের আলো জানালার ফাঁক গলে আমার মুখে এসে পড়ছে । চোখের জলের সাথে মিলে সে আলো হয়ত আমার গালে আলপনা এঁকে চলেছে । আমি তাকিয়ে আছি দিগন্তের উপারে অস্তগামী সূরযটার দিকে । হয়ত বা তার থেকে ও দূরে কোন শূণ্য মায়ালোকে ।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত