পড়ন্ত বিকেল

পড়ন্ত বিকেল

শেষবেলার দিকে হুড়মুড় করে ঠান্ডাটা নেমে এল। বাতাসে কদিন ধরেই শীতের টান ছিল। টানের পাশাপাশি কনকনে হাওয়া। হাওয়ায় হাওয়ায় এখন হিমগুড়ি নামল। তখন মাথায় টুপি, হাতে দস্তানা আর গায়ে সোয়েটার। পারলে সোয়েটারের উপরে একটা উইন চিটার চাপাতে পারলেও যেন ভালো হয়। বেশ আরামই লাগে।
কিন্তু উইনচিটার নেই। আরামের জন্য শাল একটা টেনে নিলেন ঋতব্রত। কিন্তু গায়ে জড়াতে গিয়েই থমকে তাকালেন। গত শীতে, না না শীতের আগেই হবে বোধহয়, হরিদ্বার থেকে এই শালটা এনে দিয়েছিল না পুপাই। পরা আর হয়নি। পরবে কী, কলকাতায় আর তেমন ঠান্ডা কোথায়। তা বাদে এমন সুন্দর শাল। এসব কি আর ঘরে পরে থাকার জন্য। তাই পরব পরব করেও পরা হয়ে ওঠেনি। অথচ আজ কদিন ধরে সেই শালটাই তার শরীরকে জড়িয়ে যেন উত্তাপ ছড়াচ্ছে।
ঋতব্রত তাকিয়েই রইলেন। কী ভাবতে ভাবতে একসময় সেটা তার নিজের গায়েই জড়িয়ে নিলেন। আর ওই তখনই মনে হল পুপাই। ঘরের ভেতরে এসে নিঃশব্দেই কখন ঝপ করে তার পাশে বসে পড়েছে। বসেই তাকে জড়িয়ে ধরেছে। অনেকটা সেই ছেলেবেলার মতো। বুক নিংড়ে কান্না একটা উঠে আসতে চাইল ঋতব্রতর। কিন্তু কাঁদতে আর পারলেন কই? কান্নাটা যেন জলভরা একটা মেঘের মতো গলার কাছাকাছি এসে কোথাও ঝুলে রইল। এই তো হচ্ছে আজ ক’মাস ধরে এই ঘরটায় বসলেই। তবুও ঘর ছেড়ে কি বেরোতে পারলেন।

ঠান্ডা ঢুকছিল। উঠে জানালাটা বন্ধ করে দিল। একটা ট্রে, তাতে চায়ের কাপ ও একটা প্লেটে বিস্কুট খানিকটা ছোট ছোট। ট্রে-টা নামিয়ে অদিতিকে দেখল। তার তখন চোখে কী পড়েছে। এবং পড়তেই বলে উঠল:
শুধু জানলা কেন, পারলে দরজাটাও বন্ধ করে দাও না–
হাতের ট্রে-টা একপাশে রেখে অদিতি বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে। ফিরে এল আবার হাতে এক গেলাস জল নিয়ে। সকালে ও বিকেলে চা খাওয়ার আগে ঋতব্রত জল না খেয়ে কাপ টেনে নেবে না।
শোক যেন একা তোমার। পুপাই যেন আর আমার ছেলে নয়…
জলটা খেয়ে নিয়েছিলেন। ট্রে থেকে চায়ের কাপটা তুলে নিয়ে ঋতব্রতর দিকে বাড়িয়ে ধরল অদিতি। খেয়াল আছে প্রায় ছয়মাস এই ঘরটায় বসে। বাইরের আলো নেই হাওয়া নেই … এতবার করে বলছি বেরোও… তা শুনলে না তো আমার কথা।
কী শুনব বল। ঋতব্রতর মুখখানা যেন আরও খাকিটা থমথমে। খানিকটা পরেই জানাল, আমি তো এখনও ভাবতেই পারছি না… কিছুতেই ব্যাপারটা মেনে নিতে পারছি না যে পুপাই আর আমাদের মধ্যে নেই। ও যে এভাবে আমাদের ছেড়ে চলে যাবে…

ঠোঁট নামিয়ে চায়ে চুমুক দিতে গিয়েও ঋতব্রত কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন। যেন ছয়মাস নয়, মাত্র ছয়দিন। এই তো এক দুপুরের কথা। পুপাই যাবে। নতুন চাকরি। জিনিসপত্র তাই একটু বেশিই হয়ে গিয়েছিল, ঋতব্রত তাই সঙ্গে গেলেন। হাওড়ায় গিয়ে ছেলেকে তুলেও দিয়ে এলেন। কিন্তু এসে রাতটুকুও পেরোল না। ভোর না হতেই কানে এল সেই দুঃসংবাদ। যে ট্রেনে গিয়েছে পুপাই সেই ট্রেনটাই আকসিডেন্টে পড়েছে। শুনেই স্তম্ভিত ঋতব্রত। যেন নির্বিকারও প্রায়। এই তো গেল ছেলেটা, কাল বিকেলেই তো ট্রেনে উঠল। কিন্তু উঠে বোধহয় ঠিকঠাক গুছিয়ে বসতেও পারেনি। তার আগেই এই আকসিডেন্ট! ধানবাদের কাছাকাছি কোথাও নাকি ফিসপ্লেট সরানো ছিল। শাসক দলের বিরুদ্ধ বিক্ষোভ। আর তারই জেরে তিন-তিনটে বগি ছিটকে গিয়ে একদম দুমড়ে মুচড়ে উলটে পড়েছে।

বুক কেঁপে উঠেছে ততক্ষণে ঋতব্রতর। মাথার ভেতরে অন্ধকার। শুনে পর্যন্ত কী যে করবেন কিছুই যেন ঠিক করতে পারছিলেন না। তারপর শোক ও শনাক্তকরণ, দুটোরই পাশাপাশি, ধানবাদ থেকে ফিরে এসে সেই যে ঘরে ঢুকে পড়েছেন আর বেরোননি। অদিতি তবু কেঁদেছে। কেঁদে নিজের ভেতরের শোকের পাথরটাকে ভাঙতে ভাঙতে একসময় যেন গালিয়েও ফেলেছিল। এবং ফেলে বেরোতেও শুরু করেছিল। অথচ চেষ্টা করেও পারেননি ঋতব্রত। শোক যেন জমে জমে পাথর হতে হতে একসময় শিলা হয়ে উঠেছে তার বুকের ভেতরে।

সেই শিলা কি সহজে ভাঙা যায়। ঋতব্রত তাই নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন। নিতে নিতে ছায়া ছায়া আলো ও অন্ধকারে ঘেরা এই ঘরের ভেতরেই কখন আশ্রয় নিয়ে ফেলেছেন জানেন না। জানল কেবল ওই অদিতি। আর জেনে প্রায়ই তাঁকে বোঝাতে শুরু করল। কিন্তু বোঝালেও যেন নির্বিকারই এক রকম ঋতব্রত। নিঃশব্দে শুধু শোককেই লালন করেছেন তিনি। চা শেষ হয়ে গিয়েছিল। কাপটা রেখে উঠতে গিয়েই অদিতি ফের তাকাল। বললও। বিশ্বাস তো আমারও করতে ইচ্ছে হয় না। মাঝেমধ্যে আমারও তো মনে হয়, এই বুঝি ফিরে এল পুপাই। কিন্তু যা সত্য তাকে তো স্বীকার করে নিতেই হয়। মানতে তো হবেই যে সে আর আমাদের মধ্যে নেই।

কিন্তু আমি আর পারছি না অদিতি–
আস্তে আস্তে আবারও মাথা নাড়তে নাড়তে নিশ্চুপ রইলেন ঋতব্রত।
অদিতি বোঝাল, পারছি না বললে হবে! না পারলে চলবে কেন?
আর আমাদের চলা! গলায় খানিকটা হতাশা ছড়িয়েই ঋতব্রত যেন আত্মগত হলেন। খানিক অন্যমনস্ক হয়েই জানালেন, চলার আমাদের এখানেই ইতি–

বাহ, কী সব কথা। অদিতির গলায় আক্ষেপ, একটু খোঁচাও বুঝি ছিল। কিন্তু খোঁচাটা দিয়েই নিজেও বুঝি কখন আহত হল। গলা ধরে এল অদিতির।
কী একটা বলতে যাচ্ছিল সেই সময়েই কাজের মেয়ে রত্না। দরজার সামনে এসেই দাঁড়াল নিঃশব্দে।
মা-
কী রে? অদিতি চোখ তুলতেই রত্না জানায়।
একটা চিঠি এসেছে?
কোথায়?
লেটার বক্সে। নিয়ে আসব–
হাঁ। নিয়ে আয়।
রত্না চলে গিয়েছিল। ফিরে এল হাতে চিঠিটা নিয়ে। অদিতি চিঠিটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখেই ঋতব্রতর হাতে তুলে দিল, তোমার চিঠি–
আমার! ঋতব্রত চিঠিটা দেখেও যেন দেখলেন না। তারপরেই খানিকটা অন্যমনস্ক হয়েই ফের জানালেন, ও তুমিই খোলো। সেই তো এক কথা। এক শব্দ। লাইনের পর লাইন জুড়ে শুধু সান্ত্বনার ফুলজুরি। এসব আর শুনতে ভালো লাগে না।
তাহলে থাক।

থাকবে কেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও খামের মুখটা ছিঁড়লেন ঋতব্রত। কিন্তু চিঠিটা খুলে কে লিখেছে নামটা দেখতে গিয়েই অবাক।
অদ্ভুত তো! আশ্চর্য শান্তস্বরে কথাগুলো বললেন ঋতব্রত। হঠাৎ এতদিন বাদে আমাকে মনে পড়ল–
কে। অদিতি ঘাড় ফেরাল, কার চিঠি?
রচনা। রচনা হোম চৌধুরী। আগে অবশ্য দত্ত ছিল। বিয়ের পরেও দু-একটা চিঠি দিয়েছিল। তারপর আর পাইনি।
দাঁড়াও দাঁড়াও, নামটা যেন পরিচিত মনে হচ্ছে….. কোথায় যেন শুনেছি–
কোথায় আবার শুনবে! আমিই তো তোমাকে বলেছি।
ধরা গলায় বলতে বলতে ঋতব্রত আচমকা থেমে গেলেন। একটু পরেই ফের শুরু করেলেন, সেই যে আমার পেন-ফেন্ড্র।
ও, হ্যাঁ হ্যাঁ। অদিতির তখন হঠাৎই সব মনে পড়েছে যেন। বলল, তোমার পত্রবন্ধু। তা আমি কি দেখেছি?
তুমি দেখবে কী! মাথা নাড়েন ঋতব্রত, আমিই দেখলাম না এ পর্যন্ত কোনোদিন….
সে কী! তাহলে বন্ধুত্ব ছিল কী করে?
কেন, চিঠিতে–
শুধুই চিঠি?
তাই তো ছিল! স্মৃতির ঝাঁপিটা বুঝি নড়ে উঠল একটু ঋতব্রতর। বললেনও থেমে থেমে, ও লিখত আমি জবাব দিতাম। আবার আমি লিখলেও… এভাবেই চিঠির পর চিঠি। চিঠির পাহাড়। তবে আমার থেকে ও লিখত অনেক বেশি বেশি করে। কিন্তু একদিনই শুধু লিখল একটা লাইন: একবার কি দেখা করা যায়?
করেছিলে? অদিতির চোখ ঘোরে ঋতব্রতর মুখের আশপাশে। ঋতব্রতর কি কিছু মনে পড়ছে! অদিতি জানাল, অবশ্য দেখোনি যখন প্রশ্নটা করাই বোধহয় ভুল–
ঋতব্রত চুপ।
অদিতি তখন আবার তার নিরবতা ভেঙেছে। জিজ্ঞেস করল, তা কী লিখেছে? পুপাইয়ের কথাটা কি জানে?
কী করে জানবে! জানার কি কথা ওর? প্রায় চল্লিশ বছর পরে হঠাৎ এই যোগাযোগ…
না ভাবলাম, কারও কাছে যদি শুনে থাকে! গলা তুলে চায়ের ট্রে-টা নিয়ে যেতে বলল সে রত্নাকে। তারপর সে উঠে দাঁড়াল। কিন্তু কী ভেবে আবার বসেও পড়ল। জিজ্ঞেস করল ফের, তাহলে! হঠাৎ খোঁজ পেয়ে লিখেছে বলছ?
মনে হয়। নিচের সেন্টার টেবলে ফেলে রাখা চিঠিটার দিকে চোখ রেখে জানাল ঋতব্রত, লিখেছে শুধু… একবার দেখা করতেও চেয়েছে–
তা বেশ তো আসুক না একদিন…
ঋতব্রতর মুখ ভারী, না অদিতি এসবে আর জড়িও না। আমার আর কিছুই ভালো লাগে না আজকাল।
বড় বেশি করে একা থাকতে ইচ্ছে হয়–
হলেও-বা তোমাকে থাকতে দিচ্ছে কে! আমার কথাটা ভেবে দেখেছ একবারও? ভেবে দেখেছ তুমি একা থাকলে আমিও নিঃসঙ্গ হয়ে যাব। তাছাড়া…
কী বলতে গিয়েই চুপ করে রইল অদিতি।
অবাক হয়েছিলেন ঋতব্রত। খানিকটা তাকিয়েই তিনি অদিতির দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিলেন। অদিতি বলল, এতদিন পরে একজন দেখা করতে চায় তাকে না বলাটা অন্যায় শুধু নয়… দৃষ্টিকটুও বটে… তুমি ওকে আসতে লিখে দাও।
কিন্তু!
কিন্তুর কী আছে। এ বয়সে তো আমাকে ফেলে তার সঙ্গে আর নতুন করে সম্পর্ক জুড়তে পারবে না… তাছাড়া সে তো বোধহয় ষাট পেরিয়ে গেছে। তুমি বলেছিলে না প্রায় সমবয়সী।
হ্যাঁ। তাই তো বলেছিল যেন…
তবে! আসতে লিখে দাও।
না না, এলে আমি আর নিজেকে সামলাতে পারব না অদিতি। এ বাড়ির সর্বত্রই পুপাইয়ের স্মৃতি ছড়িয়ে আছে। ওই দেখ না… আলমারিটার গায়ে কেমন এ বি সি ডি লিখে রেখেছে। প্রথম অক্ষর চিনে লিখেছিল না ওইটা?
হবে বোধহয়। দুই ভাইবোন মিলে তো তখন এসবই করত। দেওয়াল ভরে যেত না বুঝি?
নেহাতই দেওয়াল রং করায় সেসব আর কিছুই নেই। ওই আলমারিটার গায়েই যা…
বুবি এবারে এসে দেখেছিল এটা?
হ্যাঁ। সেসবই দেখে খুব কাঁদছিল মেয়েটা।
কাঁদবেই। ভাইবোন যে খুব মিল ছিল। তবু যদি মেয়েটা কাছে থাকত! বুক থেকে চাপা একটা শ্বাস পড়ল ঋতব্রতর। অদিতি তখনও চোখ রেখেছিল ঘরের আলমারিটার গায়ে। তাকাতে গিয়েই বুকটা হুহু করে উঠল। একটুক্ষণ চুপ। পরে নিজেই সে জানাল, তাহলে লিখেই দাও–
কী লিখব?
লিখবে তুমি যাবে…
আমি যাব!
হ্যাঁ।
কিন্তু কোনোদিন দেখিনি।
তাতে কী হয়েছে! সেও তো দেখেনি। অদিতি জানায়।
ঋতব্রতর মনে তবুও দ্বিধা, তাছাড়া তারও তো সংসার-টংসার….
বলতে বলতে কথাটা আর শেষ করেন না ঋতব্রত। অদিতি ওঠে, আচ্ছা লেখ না… লিখেই দেখ না একবার–
তা লিখলেন ঋতব্রত। লিখে অদিতিকে দেখালেন। এবং দেখিয়ে পোস্টও করতে দিলেন অদিতির হাতে। অদিতি তা পোস্ট করে দিয়ে এল।
আর এর কদিন বাদেই সে চিঠির উত্তর। রচনা সবিস্তারে জানিয়েছে তাঁকে। লিখেছে, যদিও শরীর খুব একটা ভালো যাচ্ছে না তার। থাইরয়েডের পেশেন্ট। তার উপরে হাই-প্রেসার। হাই সুগার। তবুও সে উজ্জীবিত। এতকাল পর তার বন্ধুকে একবার দেখার জন্য সে মুখিয়েই আছে। কবে আসতে চায় ঋতব্রত? তবে জায়গাটা বাইরে কোথাও হলে ভালো হয়! সে যেন জানায়।
ডেট জানিয়ে জায়গা উল্লেখ করে আর একটা চিঠি দিলেন ঋতব্রত। এবং অদিতিকে দেখিয়ে তার হাতেই তুলে দিলেন। অদিতি ফের পোস্ট করে দিলে সেটা।
বলাবাহুল্য, সে চিঠিরও জবাব এল আবার। রচনা জানিয়েছে, তার তর সইছে না। জীবনে বুঝি এমন ঘটনার মুখোমুখি হয়নি সে।
পড়তে পড়তে যেমন অবাক হয়েছিলেন তেমনি আবার হোঁচটও খেয়েছিলেন এক জায়গায় এসে। রচনা জানিয়েছে, জীবনের এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে সে। স্বামী গত হয়েছেন। ছেলেমেয়েরা যে যার মতো বিদেশে। একা এখন এ সংসারে সে প্রহরীর মতো জেগে আছে। তবু যাই হোক, ঋতব্রতর পছন্দ করা জায়গাতেই সে নির্দিষ্ট দিনে পৌঁছে যাবে। যেহেতু কেউ কাউকে চেনে না তারা সে জন্য রচনা তার চিঠিতে তার শাড়ির বর্ণনাও দিয়েছে একটু। যে শাড়ি সে পরে আসবে।
নির্দিষ্ট দিনে ঋতব্রত নিজের ঘরে বসে আছেন অদিতি ঢুকে তাকে তাগাদা দিল। এ কী, এখনও রেডি হওনি!
এখন কী! সবে তো বেলা দুটো। সে তো আসবে বলেছে ঠিক চারটেয়।
আহা শীতের বেলা, ফস করে কখন ফুরিয়ে যায় ঠিক কী? অতিদি বলল এদিক-ওদিক তাকিয়ে, তাছাড়া ছয়মাস ঘরে বসে আছ। হাঁটাচলাও নেই তেমন। আমি বলি কি, একটু আগেভাগেই না হয় বেরিয়ে পড়…
ঋতব্রত চোখ তুললেন, তাই বলে এখনই? এখনও দুঘণ্টা বাকি। এখান থেকে হাঁটতে হাঁটতে সুভাষ সরোবরে পৌঁছুতে আর কতক্ষণ?
সামান্য ইতস্তত করে ঋতব্রত আবারও মুখ তুললেন, বলছিলাম তুমিও না হয় চল–
অদিতি মাথা নাড়ে, এটা কি হয় বল! তোমার পত্রবান্ধবী… এতদিন পর দেখা করতে চাইছে… সেখানে আমার যাওয়াটা কি ঠিক?
এ বয়সে আবার ঠিক-বেঠিক! জীবন তো শেষ হয়েই এসেছে অদিতি। এখন আর কী কথা থাকবে?
কথা তো এখনই শুরু হয়। অদিতি জানায়, জীবনের হিসেব-নিকেশ তো এই বয়সেই মুখে মুখে ঘোরে। তুমি যাও, এসে না হয় সব গুছিয়ে বলো। বলবে একদিন আমাদের বাড়িতে আসতে…
সময় নিয়েই ঋতব্রত রেরিয়ে পড়লেন।

আজ আকাশটা ঝকঝকে। চারপাশে ঝলমলে রোদ। তরল সোনার মতো রোদটা যেন শহরের উপরে তার আলগা একটা উত্তাপ ছড়িয়ে রেখেছে। কিন্তু সেই সঙ্গে কনকনে হাওয়া একটা। তীব্র হয়ে এসে নাকমুখে বিঁধে যেন শীতের আমেজটা আরও প্রসারিত করেছে।

ভালো লাগছিল ঋতব্রতর। আজ কতদিন পর তিনি বেরোলেন। আস্তে আস্তেই এগোতে লাগলেন তিনি। কিন্তু একটু গিয়েই চমকে উঠলেন। সামনে একজোড়া ছেলেমেয়ে। ছেলেটা দেখতে ঠিক পুপাইয়ের মতো। ঠিক অবিকল যেন পুপাই। বান্ধবীর কাঁধে হাত দিয়ে গল্প করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছে। হয়ত পুপাইও এমন হাঁটত। আর দুদিন পরে তিনি নিজেই হয়ত একসময় জিজ্ঞেস করতেন পুপাইয়ের মতো। এখনকার ছেলেছেয়ে। তাদের পরস্পর মতামত না নিয়ে বিয়ের ব্যাপারে অন্তত এগিয়ে যাওয়া ঠিক নয়… তাছাড়া ঠিক করেছিলেন চাকরিতে কয়েকটা বছর হলেই তিনি বিয়ের প্রসঙ্গটা তুলবেন। নিজে বেশি বয়সে বিয়ে করেছেন। কিন্তু ছেলের ক্ষেত্রে সেই বিলম্ব আর মানবেন না।
হাঁটতে হাঁটতে লেকের ভেতরেই গিয়ে ঢুকলেন ঋতব্রত।
এখন কটা বাজে? হাত তুলে কব্জি ঘুরিয়ে ঘড়িটা একবার দেখলেন তিনি। ঠিক পাঁচমিনিট বাকি। তিনি বেরিয়েছেন প্রায় তিনটে। এতক্ষণ ঘুরতে ঘুরতে সময়টা তাহলে বেশ কাটিয়েই দিলেন ঋতব্রত।
ভালো লাগছিল। অনেকদিন পর বুকভরে তিনি নিশ্বাস নিলেন।
ওই তো দেখা যাচ্ছে জায়গাটা। জলের প্রায় ধার ঘেঁষে ওখানে পরপর কয়েকটা বেঞ্চি রয়েছে। আগে মর্নিং ওয়াক করতে এসে ওখানে মাঝেমধ্যে বসতেন ঋতব্রত। রচনা জায়গার কথা বলায় ওই জায়গাটাই তাই মনে পড়েছে প্রথমে।
এগিয়ে কালো রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে এরপর সবুজ ঘাসের ভেতরে নেমে পড়লেন ঋতব্রত। আর নামতেই এ বয়সেও তাঁর বুকের ভেতরটা কেমন দুরুদুরু কেঁপে উঠল। ওই তো বসে আছে একজন। অবিকল রচনা যে শাড়ির কথা বলেছিল ঠিক সে রকমই। জলের ধার ঘেঁষে ফাঁকা একটা বেঞ্চি পেয়েই বসে পড়েছে। তাহলে ওই কি রচনা? কিন্তু মুখ দেখা যাচ্ছে না। মাথায় সামান্য হলেও একটা ঘোমটা আছে। কেন? এখন তো ওসব মাথায় তোলার কথা নয়। তবু তুলেছে বুঝি রচনা।
আস্তে আস্তে বেঞ্চির একপাশে গিয়েই বসলেন ঋতব্রত। হ্যাঁ, শাড়ির বর্ণনা অনুযায়ী মিলে যাচ্ছে। এই তাহলে রচনা। ঋতব্রত সামান্য গলাখাকারি দিলেন। এবং দিয়েই কিছু বলতে গেলেন। কিন্তু বলতে গিয়ে বলার মুখেই আচমকা এক বিস্ফোরণ! প্রায় উড়েই যেন যাচ্ছিলেন তিনি। কোনো রকমে নিজেকে সামলে নিলেন।
এ কী তুমি! কথা আর খুঁজে পাচ্ছিলেন না যেন ঋতব্রত।
হ্যাঁ, আমি–
তুমি তাহলে….
না, রচনা নই। অদিতি তাকিয়েছে ততক্ষণে তার ঘোমটাটি সরিয়ে। রচনা আসবে কী করে? কবে কোন অতীতের ব্যাপার। তাছাড়া তারপরে কতবার তোমার ঠিকানা বদলেছে বল তো? জানবে সে কী করে–
ঋতব্রত চুপ। এদিকটা সে অত তলিয়ে দেখেনি। আসলে পুপাই তাকে এমন নিঃস্ব করে দিয়ে গিয়েছে। খানিকটা ফ্যালফ্যাল করেই তাকিয়ে রইলেন ঋতব্রত। অদিতি জিজ্ঞেস করল একসময়, কই কিছু বলছ না?
কী বলব! এই এতক্ষণে ঋতব্রতর গলায় সামান্য কথা। দৃষ্টি বিষণ্ন।
ইতস্তত করেও বুঝি অদিতি বলল একসময়, বল কিছু কথা… অন্তত ক্ষোভ তো দেখাতেই পার আমার উপরে… যেভাবে মিথ্যে একটা গল্প বানিয়ে তোমাকে…
ভয়ে আর কথাটা শেষ করে না অদিতি।
ঋতব্রত কী ভাবে মনে মনে। বোধহয় এ রকমই কিছু: হোক গল্প, তবু তো বছর চল্লিশ আগের এক জীবন হঠাৎই উঠে এসেছিল… আর তা না হলে ওই অন্ধকার ঘরটা ছেড়ে বুঝি আর বেরোনোই হত না তাঁর!
মাথা নেড়ে জানাল ঋতব্রত, না না তবুও তো তুমি আমাকে বের করতে পারলে। না হলে সাহস পাচ্ছিলাম না। মনে হচ্ছিল সবই তো শেষ হয়ে গেছে। আর কী হবে বাইরে বেরিয়ে… ওই গল্পটা শুনে সাহস নিয়েই বেরোতে পারলাম…
গল্প কেন বলছ ওটাও তো বাস্তব!
কিন্তু এখন আর আমার জীবনে সে বাস্তবের কোনো…
আছে। এখনও আছে… আছে বলেই তো তুমি ওই অন্ধকার খোপটা থেকে বেরোতে পারলে…
তা ঠিক। তবে তুমি লেগে ছিলে বলে। ঋতব্রত উঠে দাঁড়ালেন।
কী হল, উঠলে কেন? বসো না আর একটু? অদিতির গলা বুজে আসে।
কী ভেবে সে বসে পড়ে। বসেই সামনে তাকায়। কিন্তু কথা আর বলে না।
একসময় এভাবেই পেরোয়। সূর্য ডোবে। সন্ধে নামে। পাখিরা ফেরে। কিন্তু ঋতব্রত তখনও বসে। কোনো কথা বলে না।
একসময় অদিতিই বলে ওকে, কী হল কথা বলছ না?
কী বলব–
আমার উপর বোধহয় খুবই রাগ করেছ?
রাগ! না না। রাগ কী বরং তুমি আমার চোখ খুলে দিয়েছ অদিতি। ভাবছি, কাল থেকেই আবার বেরোব… এদিকটায় আসব…
ওদিকটায় যেয়ো। অদিতি মাথা নাড়ে আস্তে আস্তে, আমি গিয়ে দেখেছি! বাইপাসের ওদিকে এক নতুন দিগন্ত। ধুধু মাঠ। সবুজ বনানী।
সে আর কদিন থাকবে অদিতি।
তবুও যতদিন থাকে…
তাকিয়ে ছিলেন ঋতব্রত। একসময় অদিতিই ফের বলল, চল এবারে যাই। সন্ধে হয়ে এসেছে।
হিমগুড়িও পড়তে শুরু করেছে। তোমার তো আবার ঠাণ্ডার ধাত–
কিন্তু আমার যে আরও বসে থাকতে ভালো লাগছে–
কাল এসো আবার।
তাহলে চল। উঠে দাঁড়ালেন ঋতব্রত। পাশাপাশি অদিতিও।
কিন্তু এগোতে গিয়েও খচ করে কোথাও বুঝি একটা কাঁটা ফুটল অদিতির! কোথায় ফুটল! দেখতে গিয়েও আর খুঁজে পায় না অদিতি। না পেলেও ততক্ষণে ভাবতে শুরু করেছে সে, ঘর থেকে তো বার করে আনতে পেরেছে। কিন্তু যৌবনের উসকে দেওয়া সেই স্মৃতিটি? নতুন বিয়ের পর ঋতব্রত তো বলেছিল ওকে। এমনকি রচনার লেখা দু-একটা চিঠিপত্রও দেখিয়েছিল। রাখতেও দিয়েছিল ওর কাছে। কিন্তু তা বুঝি আর মনে নেই ওর! এখন সেই হাতের লেখা নকল করেই না ওই গল্পটি বানিয়েছে সে। কিন্তু ওই বানানো গল্পই আবার এখন সত্যি না হয়ে ওঠে?

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত