চমকে যাওয়া ভালোবাসা

মেয়েটা কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ভাস্কর্যের সামনে দাড়িয়ে আপন মনে নখ কেটেই যাচ্ছে। ঘন ঘন পরছে চোখের পলক। কেমন যেন একটা অস্থির অস্থির ভাব। ভিড়ের একপাশে দাঁড়ানো মেয়েটাকে দেখলে মনে হবে অসহায় চোখে কান্না কান্না ভাব। ভাস্কর্যের বেদীতে দাড়িয়ে নেতাগোছের একটা ছেলে চিৎকার করে একাদশ শ্রেণীর ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্ট বলছে। ভিড়ের কোলাহলের মাঝে নিজের রেজাল্টটা শুনতে পেল না মেয়েটা। আস্তে আস্তে ভিড় কমে এলো। একটু দ্বিধা, একটু জড়তা কণ্ঠে মেয়েটা ছেলেটার কাছে রেজাল্ট জানতে চাইল। ছেলেটা তাচ্ছিল্যভরা কণ্ঠে জানালো সে চান্স পায়নি। কান্না লুকিয়ে মেয়েটা রিক্সায় উঠে গেল। বাসার সামনে রিক্সা থেকে নেমে দেখল সেই ছেলেটিও রিক্সা থেকে নামছে। রিক্সা থেকে নেমেই বলল, আপনি চান্স পেয়েছেন। মেয়েটিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে রিক্সায় উঠে চলে গেল। মেয়েটার মনে হল ছেলেটাকে একটা ঘুষি হাকায়। মাথায় সমস্যা না থাকলে কেউ এমন করে।

এতক্ষন যে পাগল ছেলের পাগলামির কথা বলছিলাম সে ভিক্টোরিয়াতেই পড়ে। বয়সে আমার এক ইয়ার সিনিয়র। প্রথম দিনে ওকে আমার পিছে পিছে বাসায় আসতে দেখে মনে হয়েছিল আর দশটা ছেলের মতই গায়েপরা স্বভাবের। ১৫দিন পর আমাদের ক্লাস শুরু হল। প্রথম দিনই দেখলাম ক্লাসের মধ্যে একদল ছেলে মিছিল নিয়ে হাজির। আর মিছিলের নেতা সে। এরপর প্রায়ই কলেজে দেখা হতো। কিন্তু এমন ভাব করতো যেন প্রথম দেখেছে। সিনিয়র ভাই বলে সালাম দিতে হতো। একদিন আমাকে ডেকে বলল কোন হেল্প লাগবে কিনা। আমাকে সব নোট, চোথা যোগাড় করা, ভাল টিচারের কাছে নিজে যাওয়া, সবই করে দিল। আমার ধারনা ছিল ও আমাকে পছন্দ করে। কিছুদিন পর দেখলাম সবাইকেই একইরকম হেল্প করছে। ক্যাম্পাসের সবাই ওকে পছন্দ করতো। সারাটা দিন মিটিং, মিছিল নিয়েই ব্যস্ত থাকতো। ফোন করলে ৫ মিনিটের বেশি কথা বলার সময় হতো না।

ওকে প্রথম দেখায় রাগী বলেই মনে হবে। কিন্তু মনটা একেবারে শিশুর মত। ওর কাছে কেউ সাহায্য চেয়ে কাউকে ফেরত যেতে দেখিনি। কাউকে কখনো না বলত না। ওর গুনটাকেই অনেকে দুর্বলতা ভেবে নিজের স্বার্থ হাসিল করে নিতো। মানুষটার একটাই দোষ, রাজনীতির জন্য তার জান-প্রান দিতে প্রস্তুত। অথচ রাজনৈতিক নেতারা তাকে ইউজ করতো সে সেটা বুঝতে পারতো না। ওয়ান ইলাভেনের কিছুদিন আগে পুলিশের লাঠি-চার্জে মাথায় আঘাত পেয়ে কুমিল্লার সিডিপ্যাথ হাসপাতালে ভর্তি হল। ক্লাস ফাকি দিয়ে ওকে দেখতে গেলাম। সেদিনই টের পেলাম মানুষটাকে আমি পাগলের মত ভালবাসি। কিন্তু এতো সুন্দরীর নয়নের মনি সে কি আমাকে পছন্দ করবে। ও হয়তো আমাকে পছন্দ করে কিন্তু ভালবাসে না, অন্তত ওর সাথে কথা বলে তাই মনে হয়। তাই ভালবাসাটা পাথরচাপা দিয়েই রাখলাম। তবুও মাঝে মাঝে মনে হয় ছুটে গিয়ে বলে দেই মনের কথাটা। ভালবাসা আমার নীরবে বালিশ ভেজানোতেই সীমাবদ্ধ ছিল।

ও সবসময় চমকে দিয়ে আনন্দ পেত। একবার ভ্যালেন্টাইন ডের সকালে ওকে দেখা করতে বললাম। ও ভীষণ রেগে প্রায় ৩০ মিনিট ধরে আমাকে বকলো। আমি পুরো স্তব্দ হয়ে গেলাম। মন খারাপ করে রানীর দীঘির পাড়ে পা ঝুলিয়ে বসে আছি। হঠাৎ দেখি আমার ডানপাশে একগুচ্ছ গোলাপ। কাউকে দেখলাম না আশেপাশে। কখন যে ও আমার বামপাশে এসে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে টের পেলাম না। আমাকে বলল বকা না দিলে নাকি এই মজাটা পেতাম না। আরেকটা ঘটনা বলি। ও তখন ঢাকা ভার্সিটির বোটানির ২য় বর্ষে আর আমি বগুড়া মেডিক্যালের ১ম বর্ষে। ওকে অনেক বলতাম বগুড়ায় আসার জন্য। তার দলের রাজনৈতিক কাজের জন্য আসতে পারতো না। হয়তো ইচ্ছে করেই আমার অবহেলা করতো। আরেকবার বার্থডেতে ১২ টার পর আমাকে ফোন উইশ করে বলল কাল সকাল ৮টায় সুন্দরবন কুরিয়ার থেকে যেন ওর গিফট টা রিসিভ করি এবং গিফটটা হবে স্পেশাল। রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম কি হতে পারে ওই গিফটটা। জগজিতের গজল, চাইনিজ হ্যাট নাকি সমরেশ সমগ্র? সকাল বেলা ওখানে গিয়ে যে গিফট পেলাম তা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। গিয়ে দেখি সে নিজেই কুরিয়ারের দোকানে বসে আছে। আপনারাই বলুন এর ভাল গিফট আর কি হতে পারে? ও মানুষের চমকে যাওয়া আনন্দিত মুখের সেই খুশির অশ্রুতে টলটল চোখটা দেখতে ভালবাসত।

সবকিছু ভালই চলছিল। হঠাৎ ভার্সিটিতে মারামারি লেগে একটা সন্ত্রাসী গ্রুপ ওকে বেধড়ক পিটাল। তার বেডিং সহ সব জিনিস রাস্তায় ফেলে দিল। পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তির পর জানা গেল তার পায়ের হাড় ভেঙ্গে গেছে। পায়ে অপারেশন করায় তাকে প্রায় ৩ মাস হাসপাতালে থাকতে হয়। প্রতিটা উইকেন্ডে ছুটে যেতাম ওকে দেখার জন্য। ক্লাসমেটরা জানতো আমি বাসায় যাই। আপনারা ইতিমধ্যে বুঝতে পেরেছেন আমি ওকে কতটা ভালবাসি। প্রতিদিন এত কথা বলি, তবুও কখনো ভালবাসার কথা বলতে সাহস করিনি। মাঝে মাঝে মনে হয় ও অনেক নিষ্ঠুর…সবকিছু বুঝেও না বুঝার ভান করে। একটা মেয়ে তার পিছনে তিন বছর আঠার লেগে আছে…অথচ তার কোন বিকার নেই। আমার প্রথম প্রফ পরীক্ষার পর বাসা থেকে বিয়ের তোরজোড় শুরু হয়ে গেল। প্রফের ১৫ দিনের ছুটিতে বিয়ে নিয়ে মায়ের অনেক প্যানপ্যানানি শুনতে হল। হঠাৎ একদিন মেজাজ খারাপ করে ঠিক করলাম ওকে সবকিছু খুলে বলব, যা আছে কপালে। ও আমার কথা শুনে নির্লিপ্তভাবে বলল সে এনগেজড। আর কিছু বলার রুচি হল না। রিক্সায় উঠে শেষবারের মত তাকালাম। একটু আশা ছিল যে সে হয়তো আমাকে চমকে দিয়ে কিছু একটা বলবে। কিন্তু আশায় গুড়ে বালি। বাসায় এসে চুপচাপ বালিশে মুখ লুকিয়ে কাদলাম। ৪-৫ দিন পর রাতের বেলা মা জোর করে উঠিয়ে ভাত খাওয়ালেন। খাওয়ার পর দেখি মা বায়োডাটা নিয়ে হাজির। নতুন বিয়ের সমন্ধ নিয়ে হাজির। মায়ের উপর প্রচণ্ড রাগ হল।অনেক কষ্টে রাগটা চাপলাম। বায়োডাটা খুলে যা দেখলাম তা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। ওর ছবি দেখে মাকে জড়িয়ে ধরে কেদে ফেললাম। সব ওর পূর্ব পরিকল্পনা। মানুষটা আসলে চমকে দিয়ে চরম আনন্দ পায়। রাতে ফোন দিলে বলল…তুমিতো এনগেজড শুনেই চলে আসলে…কার সাথে এনগেজড সেটাতো শুনলে না।

আমাদের বিয়ের ২ বছর হতে চলল। ও এখন সেনাবাহিনীতে এডুকেশন কোরে কর্মরত আছে। এখন ম্যারেজডেতে এমন ভাব করি যেন ম্যারেজডের কথা দিব্যি ভুলে গেছি। যেভাবেই হোক ও ছুটি ম্যানেজ করে ম্যারেজডেতে আসবেই। আমিও এমন ভাব করি যেন অনেক চমকে গেছি। মানুষটা যে আমার চমকে যাওয়া মুখটা দেখতে ভালবাসে। সেদিন সিএমএইচে গাইনি ডাক্তার একটা সুখবর দিলেন। সামনের সাপ্তাহে তার ছুটিতে আসার কথা। তখনি তাকে সুখবরটা দিবো। কেননা এবারতো আমার চমকে দেবার পালা…কি বলেন আপনারা?

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত