বাবার কবর

বাবার কবর
হ্যালো..হ্যালো..হাবিব ভাই। প্লিজ শুনুন। দীঘির পাড়ের মাটি ভেঙে আপনার বাবার কবর থেকে লাশ বের হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো- সবকিছু একদম টাটকা তরতাজা আছে, একটুও পঁচেনি, মনে হচ্ছে তার আবার জানাযা দেওয়া হবে। দেখার জন্য অনেক মানুষ জড়ো হয়ে গেছে। আপনি দ্রুত চলে আসুন। খট করে ফোন রেখে দিলো হাবিবুর রহমান। এই নিয়ে ১৩ বার কল করা হয়েছে তাকে। সবার মুখে একই কথা, তার বাবার নাকি লাশ বের হয়েছে, তাও টাটকা!
আরে ভাই এসব গাঁজাখুরি কথাবার্তা শুনলে কার মেজাজ ঠিক থাকে! ৩০ বছর হলো বাবা মারা যাওয়ার, এতোদিনে হাড় হাড্ডি সব মাটির সাথে মিশে যাওয়ার কথা ৷ কার না কার কবরের লাশ বের হয়েছে সেটা নিয়ে এতো হৈচৈ। খবর ছড়িয়েছে আমার বাবার লাশ! গ্রামের এসব মূর্খ্য ধর্মান্ধ মুসলিমরা গুজব ছড়ানো ছাড়া আর কি-ই বা পারে! মনে মনে রাগ ঝাড়লেন হাবিবুর সাহেব।
পাশের রুম থেকে সেঁজুতি ছুটে এলো। সেঁজুতি হাবিবুর রহমানের স্ত্রী। হিন্দু মেয়ে। কলেজে একসাথে পড়েছেন তার সাথে, এরপর প্রেম করে বিয়ে। তিনি যে জাত-পাত, ধর্ম-টর্ম এসব মানেন না, এটারই নজির পেশ করতে হিন্দু মেয়েকে বিয়ে করেছেন। তিনি নিজে নাস্তিক। তবে নাস্তিক হলেও হিন্দু ধর্ম নিয়ে তার কোনো মাথা ব্যাথা নেই, তার মাথা ব্যাথা ইসলাম ধর্ম নিয়ে। ইসলাম ধর্মকে ভুয়া বানোয়াট প্রমাণ করতে বিভিন্ন অঙ্গ সংঘটনে কোমড় বেঁধে কাজে লেগে পড়েছেন। নিজেকে একজন সত্যিকারের ইসলাম বিদ্বেষী হিসেবে পেশ করতে হিন্দু মেয়ের সাথে প্রেমে জড়িয়ে, বিয়ে করা তার কাছে একটা প্লাস পয়েন্ট!
হাবিবুর সাহেব তথাকথিত জাত-পাত থেকে দূরে একটি ধর্মহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন “মুক্তজীবন” নামক সংগঠনে ৷ যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে তাকে সবাই শ্রদ্ধা করে, কিন্তু কিছু মুসলমান ইমানদার ছাত্র তার উপর মনে মনে অনেক রেগে আছে। কারণ ইদানীং তিনি নবী (সঃ) কে নিয়েও অনর্গল বাজে মন্তব্য করে বেড়াচ্ছেন। এদিকে ভার্সিটির অনেক নাস্তিক শিক্ষার্থীরা তার ভক্ত হয়ে গেছে। তাদের কাছে হাবিব স্যার মানেই সেরা স্যার। তিনি প্রতিটি লেকচারের শেষে ইসলাম ধর্মকে নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রুপের জন্য ১০ মিনিট বরাদ্দ করে রেখেছেন ।
এ সময় তার হাতে থাকে মোটা একটি ডায়েরি। এ ডায়েরিতে তার বানানো ১০০টি জোক্স রয়েছে। এতে তিনি নবী, রাসুল, ফেরেশতা, মেরাজ সহ ইসলামের অনেক বিষয় নিয়ে বানিয়ে লিখে রেখেছেন। ডায়েরির উপর গোটা গোটা অক্ষরে লেখা – “সেরা ১০০ মজার জোক্স”। ক্লাসে লেকচারের শেষে এসব পড়ে শোনান আর শিক্ষার্থীরা হাসতে হাসতে ফেটে পরে। তারা তখন চোখ ঘুরিয়ে আস্তিক মুসলিম ছাত্রদের দিকে বিদ্রুপের ভঙ্গিতে তাকায়। তবে সেঁজুতির এসব পছন্দ না। সেঁজুতি নাস্তিক হলেও তার ভাষ্য মতে, মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের উপর আঘাত দিয়ে জোক্স বলাটা মানবিকতা ক্ষুন্ন করার সামিল।
– ঘটনা শুনেছো? চোখে মুখে উত্তেজনা নিয়ে প্রশ্ন করলো সেঁজুতি।
– শুনেছি। ১৩ বার শুনেছি। কিছু বলবে?
– বলছি, হলে হতেও তো পারে! চলোনা দেখে আসি একটু।
– তোমার মাথা কি ঠিক আছে? এতো বছর আগের লাশ কখনো টাটকা থাকতে পারে? লাশ কতো দ্রুত পঁচে যায় সে সম্পর্কে কোনো ধারনা আছে তোমার ? মৃত্যুর পর অটোলাইসিস প্রক্রিয়ায় মৃতদেহের পচন প্রকৃয়া শুরু হয়। হৃৎস্পন্দন বন্ধ হবার ফলে কোষে অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয়। কোষের অম্লতা বেড়ে গিয়ে বিষাক্ত পদার্থের রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হয়। এরপর এনজাইম কোষ পর্দাকে হজম করে কোষের ভাঙ্গন শুরু করে।
রক্তকণিকাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত রক্তনালী ভেদ করে বের হয়ে আসে এবং অভিকর্ষের টানে কৈশিক নালিকা, ছোট শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে যায়। এতে করে মৃতদেহের চামড়া বিবর্ণরূপ ধারণ করতে থাকে। তাছাড়া আমাদের শরীরের অঙ্গ অসংখ্য ব্যাকটেরিয়ার পোষক হিসেবে থাকেই। মৃত্যুর কিছুক্ষনের মধ্যেই দেহের অনাক্রম্যতা বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়। এতে করে অণুজীবগুলো সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং পুরো দেহকে খেয়ে ফেলে। এবং তা কিছুদিনের ভেতরই শেষ হয়। লাশের গায়ে কোনো মাংশই অবশিষ্ট থাকে না। আর আমার বাবা মারা যাওয়ার ৩০ বছর হলো। মূর্খ্য ধর্মান্ধরা তো গুজব ছড়াবেই, তাই বলে তুমিও গুজবে কান দিবা?
– তা ঠিক আছে। এরপরও কেনো জানি যেতে ইচ্ছে করছে। জানোই তো এসব ব্যাপারে কতোটা কৌতুহলী আমি! আর তোমার বাবার বাসায়ও তো কখনো যাওয়া হয়নি৷ শুনেছি অনেক বড়ো একটা নদী আছে ওখানে। লাশ দেখার সাথে গ্রামটাও না-হয় একটু ঘুরে দেখলাম। আর ভার্সিটিও তো বন্ধ এখন। প্লিজ চলো না।
– হুম জানিই তো। তোমার কৌতুহল প্রবণতা বানর থেকেও বেশি। মানুষ যে বানর থেকেই এসেছে তোমাকে দেখলেই যে কেউ বলে দেবে। ডারউইনবাদ নিয়ে নেক্সট লেকচারে তোমাকে উদাহরণ স্বরুপ পেশ করে স্টুডেন্টদের কি বলবো জানো- ” ডারউইনবাদের চমৎকার উদাহরণ হিসেবে আজ তোমাদেরকে আমি আমার বউয়ের কথা বলবো। কিছুদিন আগে তার ৩০ বছর আগের লাশ দেখতে যাওয়ার ইচ্ছে হলো! তাও নাকি টাটকা লাশ! এতটাই সে কৌতুহল প্রবণ যে, বিজ্ঞানের ছাত্রী হয়েও ৩০ বছর আগের লাশ এখনো পঁচেনি, এটা দেখার জন্য যেতে চায়! মানুষের ভেতর যে বানরের মতো কৌতুহল প্রবণতা রয়েছে বুঝতে পারলে তো? ইদানীং তো আমার ওকে বানরই মনে হয় ।” হাহাহা..
– উঁহু, আবার শুরু করলে? তোমার এই ডারউইন তত্ত্বের নিকুচি করি আমি। তার তত্ত্বটা স্রেফ তত্ত্বই, তার এই তত্ত্বের কিছু ভুল তোমায় দেখিয়েছিলাম একবার। তার মধ্যে একটা ভুল হলো- ৬ মিলিয়ন বছর আগে এপ থেকে এসেছে শিম্পাঞ্জি, ওরাংওটাং, বানর এবং বানর/শিম্পাঞ্জি থেকে এসেছি আমরা! এখানে প্রশ্ন হলো- সবার অরিজিন একই রকম থাকার এরপরেও সবাই একই রুপে বির্বতন হল না কেন? কোনো এপ থেকে শিম্পাঞ্জি, ওরাংওটাং, বানর এরপর মানুষে বিভক্ত হলো? যাই হোক এ নিয়ে এখন কোনো কথা বলতে ইচ্ছে করছে না আমার। তুমি যাবে কিনা বলো। না যেতে চাইলে আমি আর শুভ্র রওনা দিলাম। শুভ্র তো যাওয়ার জন্য কান্নাকাটি জুড়ে দিয়েছে।
– শুভ্রকেও বলেছো! বাহ্ বাহ্। ও তো কাঁদবেই। তোমার ছেলে বলে কথা। নিশ্চয়ই নদীর কথা বলেছো ওকে!
– যাবে কিনা বলো?
– কখনো তোমার জেদের কাছে জিততে পেরেছি এ পর্যন্ত?
সেঁজুতি ফিক করে হেসে ওয়াশরুমের দিকে গেলো। বহুদিন পর গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছে তারা। শুভ্র আনন্দে লাফিয়ে উঠলো। দ্রুত গতিতে গাড়ি ছুটে চলছে । হাবিবুর রহমান জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছেন ৷ বহুদিন পর তার বাবার কথা মনে পরে গেলো। কতো কষ্ট করে তাকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন, কতো আদর করতেন তাকে। অথচ, অধ্যাপক হওয়ার পর আর গ্রামের বাড়ি যাননি দীর্ঘ ৬ বছর। এরপর বাবার মৃত্যুর খবর শুনে ছুটে এসেছিলেন তিনি । কিন্তু মুখটা পর্যন্ত দেখতে পারেননি। ভার্সিটির ফাস্ট বয় হওয়ার কারণে স্যারেরা মাঝে মাঝে জানতে চাইতো – তোমার বাবা কি করেন? হাবিবুর তখন মাথা নিচু করে থাকতো। কারণ তার বাবা মসজিদের ইমাম। তার কাছে মসজিদের ইমাম মানেই ফকির প্রকৃতির মানুষ। আর এই জিনিসটা তার কাছে ভীষণ খারাপ লাগতো।
সম্মান হারানোর ভয়ে কাউকে বলতেন না। তবে তার বাবার মতো ভালো মানুষ গোটা এলাকায় আর এক জনও ছিলো না। সবসময়ই মানুষের উপকার করতেন। দিনে রোজা রাখতেন, রাতের আঁধারে মাসজিদে কোরআন তেলাওয়াত করতেন। হাবিবুর রহমান তখন হারিকেনের আলোয় ফিজিক্স পড়তেন। তখন অবশ্য আস্তিক ছিলেন তিনি , নামাজও পড়তেন। এরপর ভার্সিটিতে ওঠার পর ধীরে ধীরে কিভাবে যেনো নাস্তিক হয়ে যান। ইচ্ছে করেই বহুদিন আর বাসা আসলেন না তিনি। ঢাকাতেই থেকে গেলেন। পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত ৮ টা বেজে গেলো। হাবিবুর রহমানের রুবি খালা এবং বাসার লোকজন তাদের নিতে আসলেন। হাবিবুর সাহেবের লাশ দেখার ব্যাপারে কোনো আগ্রহ ছিলো না। সেঁজুতির জন্যই আসতে বাদ্ধ হয়েছেন। তাই সিদ্ধান্ত নিলেন, আগে লাশের রহস্য উদ্ঘাটন করবেন।
– চলুন আগে লাশ দেখবো, এরপর বাসায় ঢুকবো। রুবি খালা চমকে উঠে বললেন –
– কাল সকালে দেখিস বাবা। রাতের বেলায় কেউ ওখানে যায় না। পুকুর ঘাটে ভূতপ্রেতের আস্তানা। মাঝে মাঝে আমের ডাল পর্যন্ত নড়ে ওঠে। কাল সকালে জানাযা পড়ানো হবে, তখন দেখিস। তোর বাবা অনেক ভালো লোক ছিলেন বলেই লাশ আজও পঁচে নাই। আমি দেখা মাত্র ২ রাকাআত নফল নামাজ পড়েছি।
– না এখুনিই দেখবো। আমি নিজের চোখে দেখতে চাই, ওটা আমার বাবা কিনা, আর কবরটাই বা কার! খালা তুমি শুভ্র আর সেঁজুতিকে নিয়ে বাসা যাও । আনারুলকে নিয়ে আমি ওখানে যাচ্ছি। ভুতপ্রেত নিয়ে চিন্তা করিও না। আমিই স্বয়ং ভূত।
– উঁহু, আমিও যাবো তোমার সাথে। কাল সকাল পর্যন্ত কৌতুহল ধরে রাখতে পারবো না। উৎসুক কন্ঠে বলে উঠলো সেঁজুতি।
– আচ্ছা চলো।
ঘুটঘুটে অন্ধকার। হাবিবুর সাহেবের খালাতো ভাই আনারুলের হাতে টর্চ লাইট। তারা কবরের সামনে চলে এলেন। আনারুল দরুদ শরীফ পড়তে লাগলো। কবরের একপাশে ভেঙে পুকুরে পড়ে আছে। কাফনের কাপড় সহ লাশটা কবরের পাশে রাখা হয়েছে। হাবিবুর রহমান খুব কাছে গেলেন। তার নাকে চমৎকার একটা ঘ্রাণ আসলে লাগলো। এরকম ঘ্রাণ তিনি কখনো পাননি। ঘ্রাণে মোহিত হয়ে গেলেন। স্যান্ডেল গুলো খুলে লাশের পাশে বসলেন। হাত কাঁপতে লাগলো তার। সেঁজুতিও খুব কাছে এসে পর্যবেক্ষন করতে লাগলো। তার নাকেও চমৎকার সুঘ্রাণটি ধরা পড়েছে। সে প্রশ্ন করতে গিয়ে করলো না।
হাবিবুর রহমান কাফনের কাপড় সরিয়ে লাশের মুখটা বের করলেন। মুহুর্তেই তিনি স্তব্ধ হয়ে গেলেন। স্পষ্ট তার বাবার মুখটা দেখা যাচ্ছে। সেই দাড়ি, সেই চুল, সেই ঠোঁট, ঠোঁটের বাম পাশে কাটা দাগ! মনে হচ্ছে শান্তির ঘুম ঘুমাচ্ছে। হাবিবুর রহমানের শিরদাঁড়া দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেলো। এক মুহুর্তে হাবিবুর রহমানে সমস্ত বিজ্ঞানীক ব্যাখা ধূলিসাৎ হয়ে গেলো, ডারউইনের তত্ত্ব, বিগ ব্যাং থিওরি, স্ট্রিং থিউরি, শূন্য থেকে মহাবিশ্ব, এতোদিনে যা পড়েছিলো সব কোথায় যেনো মিশে গেলো। মুগ্ধকরা ঘ্রাণ তাকে জান্নাতের কথা স্বরণ করিয়ে দিচ্ছে। তার বাবার লাশ তার সামনে স্রষ্টার অস্তিত্বের জলজ্যান্ত প্রমাণ হয়ে দাড়িয়েছে।
– এটা আমার বাবা। সেঁজুতি! এটা আমার বাবা। আমার বাবা।
হাবিবুর রহমান তার বাবাকে জড়িয়ে ভেউভেউ করে কাঁদতে লাগলেন। সেঁজুতি থ হয়ে তাকিয়ে আছে। তার গলা থেকে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। আনারুল বিরবির করে বলছে- আল্লাহ পাকের অলিরা কখনো মরেন না। আল্লাহ পাক চাইলে তাদের লাশকে সংরক্ষণ করেন পঁচতে দেন না। আমাদের সকলকে এই কবরে যেতে হবে, জানিনা কি অপেক্ষা করছে! এই সুঘ্রাণ, নাকি আজাব।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত