দায়িত্ব ও মূল্যবোধ

দায়িত্ব ও মূল্যবোধ
সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই রান্নাবান্না শুরু করে দিলাম। অন্যান্য দিন আমি ঘুমে থাকতে থাকতেই এসবকিছু করে ফেলে আমার বউ। সে এমনিতেই গর্ভবতী, দিন ঘনিয়ে এসেছে। তারউপর আজকে সে একটু অসুস্থ। অসুস্থতার কারণে সারারাত ঠিকমত ঘুমাতে পারেনি সে। শেষ রাত্রের দিকে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেছে। কাজেই তাকে আর ডাকাডাকি না করে আজকে নিজেই একটু তারাতারি উঠে রান্নাবান্না শুরু করে দিয়েছি। রান্না ঘরের শব্দেই হোক বা অভ্যাসবশতই হোক সে জেগে উঠেছে। এগিয়ে এসে রান্না ঘরে উকি দিয়ে বলল…, -তুমি রান্না ঘরে কি করছ?  তাকে দেখে আমি ব্যতিব্যস্ত হয়ে বললাম.,
-তুমি আবার উঠতে গেলে কেন? সে কপট রাগ দেখিয়ে বলল…
-তুমি আমাকে ডাকলে না কেন?
-প্রতিদিন তো তুমিই রান্না কর, আজকে নাহয় আমিই করলাম। করলে কোন সমস্যা? নাকি আমার হাতের রান্না খাওয়া যাবে না?
কথাটা শুনেই সে হেসে ফেলল। এই মেয়েটার হাসিতে যাদু আছে। অসুস্থতাইও সেই হাসি ম্লান করতে পারেনি। আমি রান্না বাদ দিয়ে ওকে ধরে আবার বিছানায় নিয়ে শুইয়ে দিলাম। তারপরে বললাম, একদম উঠবে না। পারলে আবার ঘুমিয়ে পড়। সে শুয়ে পড়ল। কিন্তু ঘুমাল না। রান্না ঘরের দিকে তাকিয়ে থাকল। আমি রান্না শেষ করে প্লেটে খাবার নিয়ে ওর কাছে গেলাম। তারপরে ওকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে নিজে খেলাম আর ওকে খাইয়ে দিতে হাত বারালাম। সে বলল আমি ব্রাশ করিনি..
-একদিন ব্রাশ না করলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে না! সে আবারো হাসল। তারপরে খেতে শুরু করল। ওকে খাইয়ে শেষ করেই অফিসের দিকে ছুটলাম। ওকে বলে গেলাম, সারাদিনে কিছু করতে হবে না। দেখি আমি একটু আগে ছুটি নিয়ে আসতে পারি কিনা বলেই বের হয়ে পরলাম। বের হবার পরে মনে পড়ল ওর জন্য কিছু ঔষধ আর প্রয়োজনীয় কিছু খাবার কিনে দিয়ে গেলে ভালো হবে। যেই ভাবা ওমনি সেই কাজ করলাম। আবার ফিরে গেলাম বাসায়। বউ বলল, -এসবের কি দরকার? আমি এমনিতেই সুস্থ হয়ে যাবো। তুমি একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করছ..
-দশটা না পাচটা না, একটামাত্র বউ। তারজন্য একটু বেশি বাড়াবাড়ি করলে তেমন ক্ষতি নেই! সে আবারো হাসল। মেয়েটার হাসি রোগ আছে। আর এই হাসিটাই আমার সারাজীবনের পাওনা! সেদিন অফিসে যেতে একটু লেট হল। শুরু হল বসের ঝাড়ি। এমন একটা জায়গায় কাজ করি যে, একটু এদিক সেদিক হলেই বকাবকি শুরু হয়ে যায়। তারপরেও এই কাজটা আমাকে করতে হয়। কেননা একটু কথা শুনতে হলেও এখানে বেতনটা একটু বেশি। কাজেই বেশিতে বেশিতে কাটাকাটি! আমার এখন টাকার দরকার। সামনে আমার ঘরে সন্তান আসছে।
অনেক বলে কয়েও ছুটির ব্যবস্থা করতে পারলাম না। তাই লাঞ্চের সময়ে বের হয়ে সোজা বাসায় চলে আসলাম। এতে চাকরি যাবার ভয় আছে। গেলে যাবে, বাসায় মেয়েটা একা পড়ে রয়েছে। নাজানি কখন কি হয়? এসেই দেখি প্রসব বেদনায় মেয়েটা কাতরাচ্ছে। কিন্তু চিৎকার করছে না। ও খুব কষ্ট সইতে পারে। আসলে আমাদের মত মধ্যোবিত্তদেরকে কষ্ট সহ্য করা শিখতে হয় না। ছোটবেলা থেকে কষ্টের সাথে থাকতে থাকতে এমনিতেই অভ্যাস হয়ে যায়। আমি দ্রুত একটা সি,এন,জি’র ব্যবস্থা করলাম। ওকে নিয়ে ছুটলাম হসপিটালের দিকে। পকেটে বেশি টাকা নেই। তবে সেটা নিয়ে ভাবনা নেই। একটা ব্যবস্থা হয়েই যাবে। আগে তো মানুষ বাচাতে হবে ডাক্তার দেখেই রেগে গিয়ে বলল, -এত দেরি করেছেন কেন?
আমি কিছু বললাম না, অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম। ডাক্তার কি বুঝল জানিনা। সে বলল, -আপনারা সবসময় একটা ঝামেলা পাকাবেন, শেষ মূহুর্তে রুগিকে এনে বলবেন দয়া করে একে বাচান ওকে নিয়ে যাওয়া হল। আমি হসপিটাল থেকে ছুটে বেরিয়ে পড়লাম। আমাকে টাকার জোগার করতে হবে। অনেকদিন হল আমার শখের মোটরবাইকটা বেচব বেচব করছিলাম। বিয়ের আগে টাকা জমিয়ে শখ করে কিনেছিলাম। কিন্তু এখন টাকার সমস্যা টাকার কারণে অনেদিন হল বিক্রি করতে চাচ্ছিলাম। আমার বউই বিক্রি করতে দিচ্ছিল না। বলছিল…, তুমি এত শখ করে কিনেছ! বিক্রি করবে কেন? মোটামুটি একটা কাষ্টমার ঠিকও করা ছিল। তার কাছে ছুটে গেলাম। সে আমার অবস্থা বুঝে বলল, -ভাই, আমার তো দরকার নেই! আমি কিনে ফেলেছি আমি বুঝতে পারলাম। সে সুযোগের ব্যবহার করছে। কিন্তু আমি নিরুপায়। পূর্বের বলা দামের থেকেও অনেক কম দামে বিক্রি করে টাকা নিয়ে ছুটলাম হসপিটালে।
ডাক্তার বলল, -আল্লাহ রহম করছে, মা ও মেয়ে দুজনাই সুস্থ আছে।
আমি বললাম, -আলহামদুলিল্লাহ বউয়ের কাছে যেতেই সে বলল, -তুমি এতক্ষণ কই ছিলে?
-এইতো পাশেই!
-এখানের বিল পরিশোধ করেছ?
-হুম…
-টাকা পেলে কই?
-বাইকটা বেচে দিয়েছি। ওটা দিয়ে আমি কি করব? তেল কিনতে কিনতেই জীবন শেষ! মেয়েকে কোলে নিতে নিতে বললাম,…
-মেয়ে তো মাশআল্লাহ রাজকন্যার মত হয়েছে, তোমার মত বুচি হয়নি। দেখ নাকটা কেমন আমার নাকের মত উচা!
বউয়ের দিকে তাকিয়ে দেখলাম তার চোখ বেয়ে পানি পড়ছে কিন্তু মুখে সেই চিরপরিচিত হাসি। যেই হাসির কাছে আমি চির ঋণি!

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত