আমি তারে পারি না এড়াতে

রাতে অফিস থেকে ফিরে দরজার তালাটা খুলে বাসায় ঢুকতে গিয়ে মনে হলো, একটা কালো কবরের গহ্বরে ঢুকলাম। ঘর জুড়ে মাটির তলার মতো অন্ধ স্তব্ধ নীরব অন্ধকার। সন্ধ্যা বাতিটি জ্বালাবার পর্যন্ত কেউ নেই। সুইচ বোর্ডে আঙুল দেই, আলো জ্বলে, ‘আলো যদি নিভে যায় সময়ের ফুঁয়ে, তাহলে কাহার ক্ষতি, কাহার ক্ষতি হবে?’ জীবনানন্দ দাসের মতো করে নিজেকে প্রশ্ন করি। আবার নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর দিই, ‘হবে নাকো কাহারো সামান্য ক্ষতি ।’

আলোর উচ্ছ্বাসে ঘরখানা কই ভরে উঠবে, তা-না বরং কেমন শূন্য মনে হয়, তুচ্ছ মনে হয়, মনে হয় যেন কোনো অচেনা পৃথিবীতে পা রাখলাম। আজকাল প্রায়ই কেন এমন মনে হচ্ছে? বয়স বাড়ছে, সেই কারণে? কিন্তু আমি তো নিজেই এই হিরন্ময় একাকীত্বকে বেছে নিয়েছি। সিদ্ধান্ত নিয়েছি, একা হব। হয়েছি। বেশ আছি, চমৎকার আছি। বৃষ্টি ভেজা কুকুরের মতো গা ঝাড়া দেই। যাতে বৃষ্টি কণার মতো বিষণ্ণতার গুড়োগুলো মন থেকে ঝরে যায়। মন ভালো করতে হলে আমি সবসময় রান্নাঘরে যাই। প্রাণ খুলে, হাত খুলে রান্না করি। ফ্রিজে বড়ো সাইজের গলদা চিংড়ি আছে। আজকে সুন্দর করে নারকেল দিয়ে চিংড়ির মালাইকারি রাধব। তার আগে একটা গান ছেড়ে দেই। ‘দেখাতে পারি না কেন প্রাণ, বুঝাতে পারি না কেন বেদনা…’

গায়কের সাথে গলা মিলিয়ে গুনগুন করি, নারকেল কুড়াই, চুলা জ্বালাই, রান্না শেষ হতে হতে মধ্যরাত। তারপর টেবিল সাজিয়ে খাওয়া-দাওয়া। নিজেই নিজের রান্নার তারিফ করি। ‘দারুণ হয়েছে চিংড়িটা!’

এবার আমি বসতে পারি আমার প্রিয় ছোট্ট বারান্দায়, হাতে এক গ্লাস বরফ মেশানো হুইস্কি নিয়ে, আরাম কেদারায় গা এলিয়ে। আশেপাশের সব ফ্ল্যাটের আলো নিভে গেছে। কার্তিকের ঠান্ডা বাতাস, শীত শীত অনুভব দিয়ে যাচ্ছে। ভালো লাগছে। রাত উপভোগ্য হয়ে উঠছে। অনতিদূরে হেলেদুলে রেলগাড়ি যাচ্ছে, তার ছন্দময় ঝিক্ ঝিক্ শুনতে পাচ্ছি। হুইস্কির আমেজ ছড়িয়ে পড়ছে শরীর জুড়ে। যে পরিমাণ টাকা খরচ করে বোতলটা কিনেছিলাম, তা উশুল হয়ে যাচ্ছে। গান বাজছে, ‘তুমি এবার আমায় লহ হে নাথ লহ, এবার তুমি ফিরো না হে, হৃদয় কেড়ে নিয়ে রহো..’

এরই মধ্যে আবার দরজায় সুরেলা বেল বাজছে, যাহ্, বারান্দাতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম নাকি? এখন তো দেখি সকাল হয়ে গেছে, নাকি দুপুর, রোদ চক চক করছে চারিদিকে। আবার অস্থির বেল। কে? পত্রিকার হকার? দারোয়ান? ফেরীওয়ালা? কোনো সাহায্যপ্রার্থী? এরা ছাড়া কেউ তো কখনো আসে না আমার কাছে।

আলসেমি কাটিয়ে উঠে দরজা খুলি। কি আশ্চর্য, নীল বোরখা পরিহিত একজন নারী দাঁড়িয়ে। শুধু তার চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে। ভিক্ষা চায় নাকি?

‘পাশের বাসার ওরা কোথায় গেছে, বলতে পারেন? জানেন, ওরা কখন আসবে?’

‘না, জানি না, বলতে পারি না।’

বিরক্তি চাপা দিয়ে অসহিষ্ণু কণ্ঠে বলি। ‘দারোয়ানদের জিজ্ঞেস করেন।’

‘দারোয়ানরাও বলতে পারছে না। আমি রাজশাহী থেকে আসছি, এইটা আমার চাচার বাসা, এখন উনারা বাসায় নাই। আমি কি করি, বলেন তো।’

‘ফোন করেন।’ আমি সহজ বুদ্ধি দেই।

‘দেখেন, আমার ফোনটাও আজকে সকালে হারিয়ে গেছে। ওইটাতে সব নাম্বার ছিল।’

তার দৃশ্যমান চোখ দুটো ছল্ ছল্ করে। আমি আর ধৈর্য্য রাখতে পারি না। বলি, ‘আমার তো কিছু করার নাই, আপনি অপেক্ষা করতে পারেন বা চলে যেতে পারেন।’

আমি দরজা বন্ধ করে দেই। ঘুমটা গেছে, মনটাও বিগড়েছে। ছুটির দিনে কই একটু আরাম করে ঘুমাবো, তা না, কি সব উটকো উৎপাত। এক মগ ব্ল্যাক কফি বানাই। আয়েশ করে চুমুক দেই। কফি শেষ করে বের হব সপ্তাহের বাজার করতে। কাঁচা বাজারে সবুজ সতেজ সবজি দেখলেও মন ভালো হয়ে যায় আমার। বাইরে বেরিয়ে আর অবগুণ্ঠিতাকে দেখতে পাই না। আপদ বিদেয় হয়েছে তবে। বাজারে গিয়ে মন, পকেট ও ব্যাগ উজাড় করে বাজার করি। মনে এক ধরনের প্রফুল্লতা কাজ করে। বাজার করাটাও আনন্দের কাজ, অবশ্য যদি কেনাকাটার জন্য পকেটে প্রয়োজনীয় রসদ থাকে। আমি একা মানুষ, প্রতি মাসে দুই বোতল পানীয় কেনার পর যে পরিমাণ টাকা হাতে থাকে তাতে আমার স্বাচ্ছন্দ্যেই চলে যায়। কিছু টাকা সঞ্চয়ও করি, যখন বুড়ো হব, চাকরি থেকে অবসর নিয়ে একটা বৃদ্ধাশ্রমে চলে যাব, সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছি। বাজার নিয়ে ঘরে ফেরার পথে দেখি, সিঁড়ির ধাপে সেই নারী গুটিশুটি মেরে বসে আছে। আমি তাকে পাশ কাটিয়ে উপরে উঠে আসি। পেছন পেছন সে’ও আসে।

‘জানেন, ওরা এখনো আসে নাই।’

‘ও, আচ্ছা।’

আমি তাকে এড়িয়ে গিয়ে দরজার তালা খুলি। মনে মনে ভাবি, এইবার বিদায় হও না বাপু।

‘খুব তেষ্টা পেয়েছে। এক গ্লাস পানি খাওয়াতে পারবেন?’

অবগুণ্ঠিতা পেছন থেকে বলে। ভালোই বুদ্ধি করেছে, পানি খাওয়ার ছলে এবার বাসায় ঢুকে পড়বে। আমি একটু দ্বিধায় পড়ে যাই। ছোটোবেলা থেকে শুনেছি, তৃষ্ণার্ত মানুষ শুধু না কুকুর-বিড়ালকেও নাকি পানি দিতে নয় নইলে মরার সময় পানি পাওয়া যায় না। ঘরের ভেতর বাজারটা রেখে, হাত ধুয়ে এক গ্লাস পানি এনে দেই। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নেকাবটা খুলে ঢক্ ঢক্ করে পানি খায় সে। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আমার বুকটা ধ্বক করে উঠে। কোথায় যেন ওর চেহারার সাথে সুরাইয়ার চেহারার মিল খুঁজে পাই। আবার তাকাই। দেখি, কচি একটা মেয়ে। বয়স বিশ একুশের বেশি হবে না। লম্বাটে সরল মলিন একটা মুখ। গ্লাসটা ফিরিয়ে দিতে দিতে মেয়েটা বলে, ‘আচ্ছা, আপনি আমাকে একটা চাকরি দিতে পারেন?’

আমি হাসবো, কাঁদবো নাকি রেগে যাব বুঝতে পারি না। ‘আমার একটা চাকরি খুব দরকার।’ মেয়েটি খুবই নির্দোষ ভঙ্গীতে আবার বলে। ‘আমি আসলে চাকরি খুঁজতেই ঢাকায় আসছি।’

‘না, না, আমার কাছে কোনো চাকরি নাই’।

একটু রুঢ় ভাবেই হয়ত বলি, আর গ্লাসটা নিয়ে ওর মুখের উপর ঠাশ করে দরজা বন্ধ করে দেই। যত্তসব। মানুষের কি কমন সেন্সও নেই নাকি? আমি দ্রুত বাজার থেকে আনা মাছ-মাংশ ফ্রিজে গুছিয়ে রাখি, সবজিগুলো জায়গা মতো প্যাকেট করে রাখি। একা মানুষের কাজ কি কম? সারা সপ্তাহ ধরে জমিয়ে রাখা একগাদা কাপড় ধুতে হবে। নিজের এই এক রুমের বাসাটা ঝাড়পোছ করতে হবে। চুলে কলপ দিতে হবে, গোড়ার দিকের সাদা চুলগুলো এখন ভালো মতোই উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। দুপুরের খাবার রান্না করতে হবে। কোনো উটকো মেয়ের সাথে কথা বলে নষ্ট করার মতো সময় আমার নেই। একটা স্যান্ডো গেঞ্জি আর হাফপ্যান্ট পরে দ্রুত কাজে নেমে পড়ি। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির কথা মনেই থাকে না আর।

দুপুরের খাওয়া শেষ করে যেই না বিছানায় একটু গা এলিয়ে দিয়েছি, চোখে একটা ঘুম ঘুম ভাব এসেছে, তখনই আবার দরজায় বেল। ওই মেয়েটাই নাকি? মহা বিরক্তি নিয়ে দরজা খুলি। হু, উনিই।

‘ওরা ফিরে এসেছে।’ সে নিচু গলায় বলে।

‘বেশ, ভালোই তো। ঠিক আছে। যান ওই বাসায়। আমাকে বলার কি আছে?’

‘না। বলছি কি, আসলে, আমি ওদের কাছে আসিনি। ওরা আমার আত্মীয় না …’

‘মানে কি?’ আমি তার কথার কোনো অর্থ খুঁজে পাই না।

‘মানে, এরা নতুন ভাড়া এসেছে , আগে এই বাসায় যিনি ছিলেন, উনি আমার চাচা। আচ্ছা, আগে যারা এই বাসায় ছিলেন তারা এখন কোথায় গেছে আপনি জানেন?’

আমার এবার সত্যি মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। ঢাকা শহরে কে কার খবর রাখে? তার উপর আমার মতো একজন সমাজ-সংসার ছাড়া মানুষ এসব খবর পাবেই বা কোথায়? রাগ লুকিয়ে দুই পাশে মাথা নাড়ি। জানি না।

‘ঢাকায় আর কোনো আত্মীয় নেই আমার। কোথায় যে থাকব, কোথায় যাব, তাও বুঝতে পারছি না।’

মেয়েটি একঘেয়ে সুরে বলতে থাকে, আমি উদাস ভঙ্গীতে যেন তার কোনো কথাই কানে যাচ্ছে না এমন ভাব করে দাঁড়িয়ে থাকি।

‘আচ্ছা, কিছু মনে করবেন না, আমি কি আপনার বাথরুমটা একটু ব্যবহার করতে পারি?’

মেয়েটি সামান্য ইতস্তত করে মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করে। এবার আমার মাথায় সত্যি আকাশ ভেঙে পড়ে। সত্যি বলতে কি, বাথরুমটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত জায়গা। আমার একমাত্র বিলাসিতা। নিজের পকেটের টাকা খরচ করে আমি খুব সৌখিন ভাবে,যত্ন করে সাজিয়েছি বাথরুমটা। আকাশ রংয়ের দেয়াল জুড়ে গোটা চারেক নিরাভরণ বিদেশি নারীর আবেদনময়ী ফটোগ্রাফ লাগিয়েছি, শুধু নিজের চোখের, মনের, গোপন গভীর নিষিদ্ধ আনন্দের জন্য। সেই গুপ্ত বাগিচায় এই মেয়েকে কিভাবে যেতে দেই?

‘দেখুন, আমি ব্যাচেলর মানুষ, আপনি বরং পাশে ফ্যামিলি বাসা আছে, সেখানে যান।’

আমি মেয়েটিকে বলি। এবার সে চোখ তুলে তাকায়। একদম সুরাইয়ার মতো চোখ মেয়েটার। সেই বিমর্ষ ম্লান চোখের দিকে তাকিয়ে আমার বুকে কেমন একটা ধাক্কা লাগে।

‘আপনার বাসায় কাজের লোক লাগবে না? আমাকে রাখুন না, আমি তো এখন আর রাজশাহী ফিরতে পারব না। খুব বিপদে পড়েছি আমি।’

মেয়েটা কেমন আকুতি করে বলে।

তার কথায় আমার মনে সহানুভূতি নয় বরং হঠাৎ লোভ জাগে। বুকের মধ্যে লক্ লক্ করে বেড়ে উঠে লালসার কুৎসিত লতা-পাতা। নীল বোরখার আড়ালে লুকিয়ে রাখা ওর পাতলা ছিপছিপে শরীরের ছবি চোখে ভেসে উঠে। আমার ভেতরে লুকিয়ে থাকা রোমশ প্রাণীটার জিহ্বা দিয়ে অবিরাম লালা ঝরে। তারপর আমাকে বোবা বানিয়ে সেই লোভী ক্ষুধার্ত প্রাণীটা কথা কয়ে উঠে, ‘এক রাতের জন্য থাকতে পারো। তোমার রেট কত? কত নেবে?’

মেয়েটি অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে, তার চোখে আহত ভীরু হরিণীর দৃষ্টি, তার চোখে ভয় আর অবিশ্বাসের ছায়া, যেন সে বুঝতে পারছে না আমি কি বলছি, যেন সে বুঝতে পারছে না আমার মুখের ভাষা। আমার ভেতরের হিংস্র প্রাণীটা তখন আরো নৃশংস, আরো নির্মম হয়। বলে,

‘কি হইছে? সোজা কথা, বুঝো নাই?’

মেয়েটি এবার অস্ফুট চিৎকার করে উঠে। তারপর ভীত সত্রস্ত্র খরগোশের মতো লাফ দিয়ে দৌড়ে সিঁড়ি টপকে নেমে যায়।

একদিন সুরাইয়া’ও এভাবে চলে গিয়েছিল আমাকে উপেক্ষা করে, ঘৃণা করে, অবহেলা করে, হিম-শূন্যতায় একা ফেলে রেখে। নারীরা কখনো আমার কাছে থাকে না, আমাকে গ্রহণ করে না, আমাকে ভালোবাসে না আর সেজন্যই বিছানা জুড়ে নগ্ন নারীদের ছবি বিছিয়ে তার উপর উপুড় হয়ে শুয়ে থাকি আমি। তারপর সুরাইয়ার কথা, আমাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে, প্রত্যাখ্যান করে তার সেই নির্দয় চলে যাওয়ার কথা ভাবতে ভাবতেই হয়ত অপরিতৃপ্তির কষ্টে একটু কাঁদি, হয়ত না পাওয়ার ব্যথায় কাতর হই, হয়ত স্বপ্নভঙ্গের দুঃখে বেদনার্ত হই, হয়ত একসময় ঘুমিয়েই পড়ি।

সকালে অফিসে যাওয়ার সময় গেটের কাছে দারোয়ান উত্তেজিত কণ্ঠে বলে,

‘স্যার খবর শুনছেন? কালকে যে মেয়েটা আসছিল, ওই যে আপনের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকল সারাদিন..’

‘হ্যাঁ, কি হয়েছে? সে তো চলেই গেছে। নাকি?’

‘হ্যাঁ স্যার, দুনিয়া ছেড়েই চলে গেছে। কাল রাতে রেল লাইনে ট্রেনের নিচে কাটা পড়েছে। পুলিশ সকালে লাশ নিয়ে গেছে। কার মেয়ে কে জানে?’

মাঝবয়সী দারোয়ান করুণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

‘এই মৃত্যুর জন্য নিশ্চয়ই আমি দায়ী নই।’ মনে মনে ভাবি। ‘আমি তো আর তাকে মরতে বলি নাই। হয়ত মুখ ফসকে একটা অমর্যাদাকর প্রস্তাব দিয়ে ফেলেছি, আর তো কিছু করি নি। জোর করি নি, ভয় দেখাইনি। এখন যা খুশি তাই হোক, তাতে আমার কি? আমার কোনো দায় নেই।’

দারোয়ানদের সামনে কোনো মন্তব্য না করে অফিসে চলে আসি। ফাইলে মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করি। হিসাব নিকাশ মেলাই। তারপরও শুধু ঘুরে ফিরে মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগতে থাকে, মেয়েটা কি তবে আত্মহত্যা করল? অভিমানে, অসম্মানে, নাকি এটা নিছক দুর্ঘটনা? নাকি, নাকি এটা কোনো হত্যাকা-?

পাশের টেবিল থেকে, অফিসের সহকর্মী হঠাৎ পত্রিকার পাতা উলটে বলেন, ‘খবরটা দেখছেন নাকি?’

‘কোনোটা, বলেন তো?’

‘এই যে, খালি বাসে গণধর্ষণ করে একটা অল্পবয়সী মেয়েকে মেরে ফেলা হয়েছে। মেয়েটা নাকি কাল রাতে একা একা রাজশাহি যেতে চাচ্ছিল।’

কোন মেয়ের কথা বলছে সহকর্মী? আমি ঠিক বুঝতে পারি না। এ কি সেই, যে কাল সারাদিন আমার ঘরের দরজায় সিঁড়ির উপর একটু আশ্রয় পাওয়ার আশায় বসেছিল। রাজশাহী যাওয়ার কথা বলছিল না মেয়েটি? কেমন যেন একটু অস্বস্তি লাগে আমার। না, না ওই মেয়ে কেন হবে, সে তো রেলের নিচে কাটা পড়ে কখন চলে গেছে শূন্যে অজানায়। তাহলে এই মেয়েটি কে, কাল রাতে যে রাজশাহী যেতে চেয়েছিলো, ঢাকায় যার থাকার জায়গা নেই। আর তারপর যে বীভৎসভাবে অপমানিত হলো, দংশিত হলো, রক্তাক্ত হলো আর খুন হয়ে গেল।

মাথার ভেতরে একটু পর পর কাঁটার মতো কি যেন বিঁধছে। চোখ জ্বলছে। মনটা খুঁত খুঁত করছে। বেশিক্ষণ অফিসে বসে থাকতে পারি না, বসকে বলে বেরিয়ে আসি। বিকেলের হাল্কা আলোয় লেকের পাশে খোলা হাওয়ায় যাই। স্বাস্থ্য সচেতন ভ্রমণকারীদের পাশে হাঁটাহাঁটি করি, যদি এই মুক্ত বাতাস মনের ভার উড়িয়ে নিয়ে যায়, যদি একটু ভালো লাগে। একটু আরাম যদি পাই। হাঁটছিলাম নিজের মতোই একাকী, অন্যমনস্ক, হঠাৎ একজন ভ্রমণকারী, যাকে ঠিক চিনি না, হঠাৎ আঙুল উঁচিয়ে সামনে একটা জটলা দেখায়,

‘কি দিনকাল যে পড়ল, ওখানে, ওই যে মানুষের ভীড় যেখানে, ওখানে একটা মেয়ের মৃতদেহ পড়ে আছে, নীল বোরখা পড়া, কেউ হয়ত শ্বাসরুদ্ধ করে মেরে ফেলে গেছে। যাবেন দেখতে? যান না, আমিও এইমাত্র দেখে এলাম।’

আমার হঠাৎ কেমন উদ্ভ্রান্ত লাগে, যেন পিপাসায় গলা শুকিয়ে যায়। কালকের ওই মেয়েটির গায়েও তো নীল বোরখা ছিল। কিন্তু আমি তো কাউকে খুন করি নাই, তাহলে ঘাসের উপর পড়ে থাকা ওই বিবর্ণ মৃতদেহ কার? ওর মুখ না দেখলেও আমি ঠিক জানি ওই করুণ মৃতদেহ সেই মেয়েটির, যার চেহারা খানিকটা সুরাইয়ার মতো, যে কাল সারাদিন ম্লান মুখে বসেছিল আমাদের প্রাচীন সিঁড়িতে, নিজের গ্রাম ছেড়ে যে হয়ত নগরে বাঁচতে এসেছিল।

লেকের পানিতে ডুবে যেতে যেতে হয়ত অন্ধকারকেই আমন্ত্রণ জানাচ্ছে মুমূর্ষ সূর্য । চারদিকে ধোঁয়ার মতো, ধূলির মতো আবছায়া নামছে। মাথাটা মনে হচ্ছে শূন্য হয়ে গেছে। আমি আর কিছুই ভাবতে পারছি না। শুধু বুঝতে পারছি, আমাকে বাড়ি ফিরতে হবে। ফিরতে হবে আমার সন্ধ্যবাতিবিহীন কালো কবরের মতো অন্ধকার গহ্বরে। আমি দ্রুত হাঁটতে থাকি।

আমার পাশে ছায়ার মতো সেই মেয়েটিও হাঁটে, নীল বোরখার ভেতর শুকনো ছিপছিপে শরীর নিয়ে। আমি তারে পারি না এড়াতে, আমি তারে পারি না তাড়াতে।

সূত্র: মাসিক উত্তরাধিকার

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত