ক্রান্তিকাল

ক্রান্তিকাল
এসএমএসটা গত রাতেই এসেছিল । আমি খেয়াল ই করিনি । আজ অফিসে ঢুকতেই রিসিপশনের সালেহীন ভাই বললেন – রিয়াজ আপনি কোনো এসএমএস পাননি ? কিসের এসএমএস ? দেখেন দেখেন । ডেস্কে গিয়ে বসে মোবাইল চেক করে দেখেন এসএমএস গিয়েছে কি-না । ডেস্কে যেয়ে বসে মোবাইলে ম্যাসেজ চেক করলাম । বুকের ভেতর ধুকপুক করছে, স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছি কিন্তু কিছুতেই স্বাভাবিক থাকতে পারছি না, কান্না আসছে খুব । পাশের ডেস্কে বসা সহকর্মী তানিম ভাই জিজ্ঞেস করলেন – কী হলো, তোমার মুখটা এমন লাগছে কেন ? শরীর খারাপ লাগছে না-কি ? শরীর ঠিক আছে তানিম ভাই । তাহলে ? এসএমএসটা তানিম ভাইকে দেখালাম ।
এসএমএসটা পড়ে কপাল কুঁচকে গেল তানিম ভাইয়ের । জিজ্ঞেস করলেন – মানে কী ! তোমাকে আগে জানিয়েছিল কিছু ? না, গতকালও তো অফিস করলাম । এভাবে কী হয় না-কি ! বললেই হলো চাকরী থেকে ছাঁটাই ? এতো বছর ধরে এখানে কাজ করছি আমরা, সেটার কোনো মূল্যায়ন নেই ? তানিম ভাই এখন এভাবেই চাকরী চলে যাচ্ছে লোকজনের । আমাদের অফিসের কতোজনেরও তো গেল । কিন্তু আমরা একদম শুরু থেকে আছি এখানে । তাতে কী ? তানিম ভাই আমার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন – এখন তাহলে কী হবে রিয়াজ ? আমি জানি না তানিম ভাই । তানিম ভাই আমি দু’জনেই চাকরী করি একটা ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরস কোম্পানিতে । বেশ বড় কোম্পানি , সব মিলিয়ে চল্লিশজন স্টাফ আছে অফিসটায় । সারা বছর জমজমাট ব্যবসা চলে । তবে মার্চ মাস থেকে সবকিছু যখন থেমে গেল, আমাদের অফিস বন্ধ হয়ে গেল সবার আগে।
অফিস বন্ধ হলেও আরো কিছুদিন দারুণ ব্যস্ততায় সময় কেটেছে । বাড়িতে বসে বলতে গেলে চব্বিশ ঘণ্টাই অফিসের কাজে অনলাইনে এক্টিভ থাকতে হয়েছে । যাঁরা প্যাকেজের জন্য টাকা জমা দিয়েছিলেন, তাঁরা ক্রমাগত ফোন করে যাচ্ছেন টাকা ফেরত চেয়ে । এদিকে মালিকপক্ষ থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, কাস্টমারদের যেন বুঝিয়ে বলা হয়, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই আবার প্যাকেজ চালু হবে, তাই তাঁরা যেন আপাতত টাকাটা এখানেই জমা রাখেন। কাস্টমারদের সেই কথা বলতে যেয়ে বারবার নাস্তানাবুদ হতে হয়েছে আমাদের টিমের । গালাগালি থেকে শুরু করে কেউ কেউ ভয়াবহ সব হুমকি দিয়েছেন । শেষ পর্যন্ত টাকার কী ব্যবস্থা হয়েছে সেটা জানি না কারণ বিষয়টা পরে ওপরের লেভেল থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে ।
এরপর থেকে আমি একদম বাসায় বসা । অফিস থেকে প্রথমে বলা হয়েছিল, অর্ধেক বেতন দেয়া হবে সবাইকে কিন্তু তারপর আর কোনো সাড়াশব্দ নেই । ঢাকায় আমার সংসার আব্বা-মা, দোলা আর দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে । দোলা একটা কিন্ডারগার্টেন স্কুলের টিচার ছিল । স্কুল বন্ধ দেয়ার পর ওর স্কুল থেকেও জানিয়ে দেয়া হয়েছে, এ বছর তাঁদের আর শিক্ষক লাগবে না । দোলা যেন আগামী বছর যোগাযোগ করে । এদিকে ছেলেমেয়ের স্কুল বন্ধ থাকলেও বারবার এসএমএস আসায় স্কুলের বেতনটা নিয়মিত পরিশোধ করতে হচ্ছে ।
ভাড়া বাড়িতে থাকি । তিন মাস ধরে ভাড়া বাকি পড়েছে । বাড়িওয়ালা এর মাঝে তিনদিন ফোন দিয়েছেন । বারবার সময় চেয়ে নিচ্ছি । শেষ দিন তিনি একটু রাগারাগি করেছেন । তাঁরও দোষ নেই । ভাড়ার টাকা থেকেই তাঁকে হোম লোনের টাকা শোধ করতে হয়, সংসার চালাতে হয় । তার ওপর ভদ্রলোকের স্ত্রী অসুস্থ । সপ্তাহে দু’বার ডায়ালাইসিস করাতে হয় ওনার । ভাড়াটেরা ভাড়া আটকে দিলে উনি তো বিপদে পড়ে যাবেন ই । অফিস যে অর্ধেক বেতনও দিচ্ছে না এটা দোলা বা মা কাউকেই জানাইনি । খামোখা টেনশন করবে দু’জনেই । বাড়ি ভাড়া আটকে আছে এটাও বলতে পারছি না । হাতে যা টাকা ছিল তা দিয়েই চলছে সংসার খরচ । এতো সব টেনশনের মধ্যে গত সপ্তাহে যখন এসএমএস আসলো সবাইকে কাজে যোগ দেয়ার জন্য , দোলা দোনোমোনো করলেও আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলাম । দোলা বারবার বলেছে – এই সময়ে লোকজনের কাছাকাছি গেলে তুমি তো বিপদে পড়বেই, বাড়ি সুদ্ধ সবার মাঝে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়বে।
আমি সাবধানে অফিস করবো দোলা । তুমি টেনশন কোরো না । অফিসে না গেলে বাসায় বসিয়ে বসিয়ে কী তাঁরা বেতন দেবেন বলো ? বেঁচে থাকাটাই তো এখন সবচেয়ে বড় যুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে । দোলা আর কিছু বলেনি । বলার কিছু ছিলও না । টাকা না আসলে সংসার চলবে কেমন করে ? এমডি স্যারের ট্রাভেল বিজনেস ছাড়াও আরো ব্যবসা আছে । ঢাকায় দশটা আউটলেটসহ সারা দেশে মোট সতেরোটা ব্রাঞ্চ আছে গ্রোসারি শপের । ট্রাভেল এজেন্সির অর্ধেক কর্মী ছাঁটাই করে দিয়ে বাকিদের গ্রোসারি শপগুলোতে ডিউটি ভাগ করে দেয়া হয়েছিল । আমার আর তানিম ভাইয়ের ডিউটি পড়েছিল বনানীতে । গতকাল ডিউটি শেষে ফেরার সময় একাউন্টস থেকে ফোন দিয়ে বলেছে আজ সকালে যেন সবাই ট্রাভেল অফিসে উপস্থিত থাকি । অথচ এখানে আসার পর দেখছি আমার চাকরীটাই আর নেই । তানিম ভাই বললো – তুমি এমডি স্যারের সাথে সরাসরি কথা বলো ।
পাশ থেকে রাকিব বলল – কারো সাথে কথা বলে কোনো লাভ হবে না ভাই , উল্টো আরো ঝাড়ি খাবেন । এই যে এতোগুলো মানুষের চাকরী চলে গেল, কেউ কিছু করতে পেরেছে ? তানিম ভাই বলল – তবুও তুমি একবার চেষ্টা করে দেখো রিয়াজ । আমার মাথা কাজ করছে না তানিম ভাই । দোলার চাকরীটা চলে গেছে এখন আমারটা চলে গেলে তো সবাইকে নিয়ে না খেয়ে মরতে হবে । দু’জন মিলে চাকরী করেই এই ঢাকা শহরে টিকে থাকতে নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছিল আর এখন তো উহ, আর ভাবতেই পারছি না আমি । চাকরীটা শেষ পর্যন্ত চলেই গেল । এমডি স্যারের সাথে কথা বলার সুযোগ পাইনি আমি । অফিস থেকে জানিয়ে দেয়া হলো, অতিরিক্ত স্টাফ খরচ বহন করার মতো অবস্থা এখন কোম্পানির নেই । পরিস্থিতি ঠিক হলে আমাদের ডাকা হবে, তখন আমরা আবার কাজে যোগ দিতে পারবো ।
অফিস থেকে বেরিয়ে উদভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়ালাম কিছুক্ষণ । রাস্তায় লোক গিজগিজ করছে । দেখে মনেই হচ্ছে না পৃথিবীটা এতো ভয়াবহ সংকটকাল পার করছে । এলোমেলো হাঁটছি, হঠাৎ বৃষ্টি এসে শরীরটা ভিজিয়ে দিয়েই বিদায় নিলো । এই ভ্যাপসা গরমে এমন এক ছটাক বৃষ্টি হয়ে চারপাশে গরম ভাপ ছড়াতে লাগল যেন । বাস স্টপেজে এসে দাঁড়াতেই বাস চলে এলো । বাসটা ফাঁকাই ছিল । বসার কিছুক্ষণ পর কন্ডাক্টর এসে ভাড়া চাইলো । বাসের ভাড়াও প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে । ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে মনে মনে হিসেব করে নিলাম আমার হাতে আর কতো টাকা আছে । ব্যাংকে সাকুল্যে নয় হাজারের মতো টাকা আছে । যে বেতনের চাকরী করি, তাতে সঞ্চয় করতে পারিনি কখনো । দোলা’র বেতনের সাথে আরো কিছু যোগ করে বাড়ি ভাড়া দেয়া হতো আর বাকি টাকা দিয়ে সংসার খরচ, বাচ্চাদের লেখাপড়াসহ আনুষাঙ্গিক খরচ মেটানো হতো । এখন এসব খরচের টাকা কোথায় পাবো আমি ? ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে বারবার । এই মুহূর্তে সব জায়গা থেকে ছাঁটাই হচ্ছে । নতুন করে চাকরী পাওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না । আমি জানি না বাসায় যেয়ে আমি কীভাবে বলবো চাকরী চলে যাওয়ার কথাটা আর সামনের দিনগুলো চলবেই বা কীভাবে ?
বাড়িতে ফিরে কারো সাথেই কোনো কথা বললাম না । নিজের রুমে যেয়ে চুপচাপ শুয়ে আছি । দোলা এসে ডাকলো খাওয়ার জন্য , ছেলেমেয়ে দু’টো এসে কিছুক্ষণ শরীরের ওপর গড়াগড়ি খেলো কিন্তু আমি ঘুমের ভান করে পড়ে থাকলাম । আমার মাথা যেন কাজ করা ছেড়ে দিয়েছে । আমি কিচ্ছু ভাবতে পারছি না, কিচ্ছু না । নিজেকে এতোটা অসহায় এর আগে আর কখনো লাগেনি । এই যে এতোগুলো মানুষ আমার দিকে চেয়ে আছে, তাদের আমি কীভাবে বাঁচিয়ে রাখবো ? রাতের বেলায় সবাই বসে টিভি দেখছে । মা আমাকে ওনার রুম থেকেই ডাক দিলেন । আমি যেয়ে রুমে ঢুকতেই মা বললেন – এখানে এসে বস তো আমার কাছে ।
মা এশার নামাজ শেষ করে মাটিতেই বসে ছিলেন । মা’র পাশে যেয়ে বসতেই দোয়া পড়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন – কী হয়েছে রে বাবা, মনটা এতো খারাপ কেন ? মা’র ছোঁয়া পেয়ে আমার ভীষণ কান্না পেল কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম – কিছু হয়নি তো মা । তোর চেহারা দেখে মনে হচ্ছে কিছু একটা হয়েছে । একা একা কষ্ট পাচ্ছিস কেন ? আমাকে বল কী হয়েছে ? বললাম তো মা, কিছু হয়নি । যা গরম পড়েছে, গরমের কারণেই একটু অস্থির লাগছে । তোর চাকরীটা আছে তো বাবা ? মা সরাসরি চাকরীর কথা জিজ্ঞেস করায় চমকে উঠলাম আমি । বললাম – চাকরীর কথা জিজ্ঞেস করছো কেন মা ? হঠাৎ করে কেন জানি মনে হলো যে তোর চাকরীতে কোনো ঝামেলা হয়েছে । কোনো সমস্যা থাকলে আমাকে বল রিয়াজ ।
নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না । মা’র হাতটা ধরে কেঁদে ফেললাম । নিচু স্বরে বললাম – আমার চাকরীটা চলে গেছে মা । এতোদিন বেতন বন্ধ ছিল আর আজ চাকরীটাই চলে গেল । মা এখন কী হবে, কী করে সংসার চলবে ? দোলাকে বলেছিস ? কাউকেই বলিনি মা । তোমাকেই প্রথম বললাম । মা অনেকক্ষণ আমার হাতটা ধরে বসে থাকলেন । আমারও সারাদিন পরে মনটা শান্ত হলো মা’র হাতটা ধরে বসে থেকে । আমাকে বসতে বলে মা উঠে যেয়ে তাঁর আলমারির ড্রয়ার খুলে একটা ব্যাগ বের করে আনলেন । আমার সামনে বসে ব্যাগ থেকে টাকা বের করে দিয়ে বললেন – গুনে দেখ তো কতো আছে । এতো টাকা তুমি কোথায় পেয়েছো মা ? গুনে দেখ তারপর বলছি । আমি টাকা গুনলাম । সব মিলে সাতানব্বই হাজার ছয়শো পঞ্চাশ টাকা । মা’র দিকে বাড়িয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম – এতো টাকা কোত্থেকে এলো মা ? এটা তোর কাছে রাখ । এটা তোরই টাকা । আমার টাকা !
হুম । তুই যে প্রতিমাসে আমাকে আর তোর আব্বাকে হাত খরচ দিস, এটা সেই টাকা । তুমি খরচ করোনি মা ? করেছি তো । আমাদের আর কী খরচ বল ? সবই তো তোরা এনে দিস । এখান থেকে মাঝে মাঝে মন চাইলে নাতিদের জন্য কিছু কিনি, বাকিটা তো রয়েই যায় । টাকাটা তুই রাখ । এটা তোমার টাকা মা । এই টাকা দিয়ে আমি কী করবো বল তো ? এটা দিয়ে এখন সংসারের খরচ চালা । এই ক্রান্তিকাল কেটে গিয়ে, আঁধার সরে গিয়ে পৃথিবী আলোর মুখ দেখবেই । টাকা লাগলে আমাকে বলিস । আমার একাউন্টে আরো লাখ খানেক টাকা আছে । একদম চিন্তা করিস না বাবা । বিপদ কেটে যাবেই । আল্লাহ্ সবার জন্যই একটা না একটা ব্যবস্থা করে রাখেন। নে টাকাগুলো নিয়ে তুলে রাখ ।
টাকাগুলো হাতে নিয়ে মা’র দিকে তাকালাম । ছয় বছর হলো বেতনের পুরো টাকা দোলা’র হাতে দিয়ে দেই । মা’ই দিতে বলেছেন । তখন থেকেই মা’র হাত খরচের জন্য মাসে দু’হাজার করে টাকা দিতাম । মা প্রতিবারই না করেছেন কিন্তু আমার দিতে ভালো লাগে । আমি ভাবতেই পারিনি এমন চরম বিপদের মুহূর্তে এভাবে মা আমার পাশে এসে দাঁড়াতে পারবেন । টাকাটা হাতে পেয়ে অনেকটুকু নির্ভার লাগছে এখন । সন্তান বিপদে পড়লে বাবা-মা এভাবেই বোধহয় ঢাল হয়ে তাদের রক্ষা করেন সারাজীবন ।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত