তদন্ত রিপোর্ট

‘আশ্চর্য, এইসব আচমকা মুহূর্ত দেখি আমাকে ছেড়েই যাচ্ছে না!’—মনে মনে কথাটি আওড়াতে আওড়াতে বারবার ঘড়ি দেখছে কমল। না, এখন আর তার কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই। তাই ঘড়ি দেখারও নেই কোনো বিশেষ কারণ। ‘বারবার আমার ক্ষেত্রেই কেন ঘটে আচমকা ঘটনা? কেন, কেন?’—কথাটি এবার বোধ হয় একটু জোরেই বলে ফেলেছে সে। বলেই তাকাচ্ছে চারপাশে। কেউ শুনে ফেলেনি তো। শুনলেই বা কী, এমন কঠিন, গোপন কিছু তো বলেনি। কে আর বুঝবে এসব ঠোঁট-বিড়বিড় করা কথাবার্তা! কমলের চোখ নিচে, মাটির দিকে। ছেঁড়া কাগজের কুচিগুলো বাতাস পেয়ে হালকা হালকা দুলছে। একটু আগে তদন্ত রিপোর্টটি ছিঁড়ে কুটি কুটি করে সে এখানেই ফেলেছে। কাগজের টুকরোগুলো এখনো চেয়ে আছে তার দিকে, বাতাসে কেঁপে কেঁপে জানান দিচ্ছে নিজেদের অস্তিত্ব। কমল ভাবে, কাগজের টুকরোর যদি বাক্‌শক্তি থাকত, তাহলে ওগুলো নিশ্চয় তাকে বলত, কাল সারা রাত জেগে আমাকে তৈরি করলে, আর এখন ছিঁড়ে ফেললে? এমন নির্দয়ের মতো, পাষাণ!

কমলের মুখে হাসি খেলে যায়। আসলেই তো, কেন সে ছিঁড়ে ফেলল রিপোর্টটি? ওর জীবনে কয়েকবারই এমন ঘটেছে। হয়তো অনেক দিন লাগিয়ে কোনো একটি কাজের প্রায় চূড়ান্তে পৌঁছেছে, হঠাৎ মন বলে উঠল, না, কাজটি কোরো না, বাদ দাও। ব্যস, ওখানেই সব শেষ। খেল খতম। বারবার কেন এমন ঘটে তা নিয়ে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে ও কথাও বলেছে দু-একবার। সুরাহা পায়নি। বরং বন্ধুরাই প্রশ্ন করেছে তাকে, ‘আসলেই তো, তোর জীবনে কেন ঘটে এমন?’ তাদের প্রশ্ন করার ভাবভঙ্গি এমন, এর উত্তর কমল ঠিকই জানে, রহস্য রাখতে চায় বলে বলছে না। ফলে প্রথমে রহস্য না করলেও পরিবেশ-পরিস্থিতির চাপে কমলকে এবার রহস্যময় ভঙ্গিটি নিজের মুখে ফোটাতেই হয়, ‘আই অ্যাম ওয়েটিং ফর আ মিরাকল’, সে বলে। কিন্তু এখন এই ফাঁকা বাসস্ট্যান্ডে এসে, বাসে ওঠার ঠিক আগ মুহূর্তে তদন্ত রিপোর্টটি যে ছিঁড়ে ফেলল, সে কি কেবল তার মন বলল বলে?

ওর গন্তব্য ছিল উত্তরা। বেগুনি শার্টের সঙ্গে ধূসর রঙের প্যান্ট। বাসা থেকে বেরোবার আগে প্রথমে বেগুনি-ধূসর মিলিয়ে কমল ইন করল, অফিসে যাওয়ার আগে প্রতিদিন যেভাবে করে, সেভাবেই। পরে খানিক তাড়াহুড়া নিয়েই তদন্ত রিপোর্ট খামে ভরে সেটি নিয়ে রওনা হয়েছিল উত্তরায়, অফিসের উদ্দেশে। বনানী থেকে উত্তরা তেমন দূরের পথ নয়, এক বাসেই যাওয়া যায়। চেয়ারম্যানবাড়ি পার হয়ে বনানী বাসস্টপেজে এসেও পড়েছিল। উত্তরা উত্তরা বলে ডাকছে যে বাস, কমল সেটিতে উঠবে এমন সময় আচমকা মনে হলো—মনের ভেতর থেকে ডাক দিয়ে নিঃশব্দে বলল কেউ, এই রিপোর্ট অফিসে জমা দেওয়া ঠিক হবে না। কোনোভাবেই না। তৎক্ষণাৎ পিছিয়ে এল কমল। বাসে উঠল না। এরপর বাদামি খামের ভেতরে থাকা পাক্কা দশ পৃষ্ঠার রিপোর্টটি বের করে ছিঁড়ল কুচি কুচি করে। অথচ এ রিপোর্ট জমা দিলে তার প্রমোশন আর ঠেকে থাকত না। তবে মেয়েটির ক্ষতি হতো। ভীষণ ক্ষতি হতো।

কমল এখন বেশ হালকা বোধ করছে। এর মধ্যে উত্তরাগামী কয়েকটি বাস ওর সামনে দিয়ে হেঁকে-ডেকে চলে গেছে। আর সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, আজ অফিসে যাবে না। সাড়ে দশটা বেজে একটু বাড়তি, সূর্য গরম হয়ে উঠছে। বাসস্টপেজে ঠা ঠা রোদের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক হচ্ছে না বুঝতে পেরেও হাঁটাহাঁটি করল আরও কিছুক্ষণ। হাঁটতে হাঁটতে চোখে বিঁধল চৌদ্দ রকম বিলবোর্ড। তার মধ্যে একটি বিলবোর্ডে হাসছে কয়েকজন মানুষ। এ জায়গায় প্রতিদিনই আসা হয় কিন্তু এভাবে খেয়াল করা হয়নি কখনো—নিচে, রাস্তায় নানা ধান্দায় মানুষের দঙ্গল এদিক থেকে ওদিকে ছুটছে—দৌড়াচ্ছে, হাঁটছে। আর ওপরে, বিলবোর্ডে বিচিত্র ভঙ্গিতে হাসছে মানুষেরা; সে হাসির পাশে লেখা: ‘এই হাসি প্রশান্তির, এদের মতো সুখী হতে চান?’ কমল রাস্তায় ছুটন্ত বাস্তব মানুষের দিকে একবার, একবার বিলবোর্ডের সুখী মানুষের দিকে তাকায়। পরে গিয়ে বসে একটি ফাস্টফুডের দোকানে। গলা শুকিয়ে কাঠ। সেভেন আপ অর্ডার করে একটা। দোকানে বসে আবারও রাস্তার লোকজনের চলাফেরা দেখে সে। লাল কোট পরা এক লোক কেমন নাচের ভঙ্গিতে রাস্তা পার হচ্ছে। দেখতে বেশ মজাই লাগছে।

খট করে একটা শব্দ। টেবিলে।

রাস্তার দিক থেকে চোখ ফেরাল কমল। ওয়েটার সেভেন আপের সবুজ বোতলটি এনে রেখেছে। বোতলের দিকে তাকিয়ে গোলাপি স্ট্র মুখে তুলে নিল সে।

: আর কিছু দিমু, স্যার?

দু-পাশে মাথা ঝাঁকাল কমল। ওর ভেতরের খচখচি ভাবটা কোনোভাবেই যাচ্ছে না, বরং কাঁটার মতো ফুটছে—মনের ভেতর থেকে কে বলে ওঠে কথা? কেন এমন হচ্ছে বারবার?

: শোনো মিয়া, তুমারে না কইছি বেশি বাইড়ো না, এখন বুঝলা তো?

: জি, স্যার। কিন্তু স্যার, এখন আমি কী করব?

কমলের পাশের টেবিলে যে দুজন কথা বলছে, তাদের একজনের বয়স হয়তো পঁয়তাল্লিশ বছর হবে; অন্যজন, যে স্যার স্যার করছে, তার বয়স বেশি নয়—বড়জোর পঁচিশ-ছাব্বিশ। পঁচিশ-ছাব্বিশের কপালে লাল ক্যাপ। হ্যাংলা-পাতলা শরীর। নাকের পাশে জড়ুলের দাগ। পরেছে ফুল হাতার গাঢ় নীল শার্ট। লাল ক্যাপ-নীল শার্ট মিলেমিশে বেশ অদ্ভুত ও বেপরোয়া অবস্থা। হাতে আবার আংটিও আছে। রুবি পাথরের। আর পঁয়তাল্লিশের পরনে সাদামাটা ধরনের কালো কোট। বারবার নাকের ভেতরে আঙুল চালানো নিশ্চয় লোকটির অভ্যাস।

: এইটা কিন্তু রেপ কেসের মামলা। মাইয়াডার সাথে বেশি কইরা ফেলছ।

: তখন তো বুঝি নাই স্যার, মামলা করবে ওরা। এখন কী করব, বলেন আপনি?

: কী আর করবা, ঢাকা দিবা। গা ঢাকা দাও কয় দিন। বাকিটা পরে দেখা যাইব। আর শোনো, আমারে ফোনটোন দিবা না। মোবাইল ট্র্যাক হয় আইজকাল। আর তোমার দুলাভাই বাকি টাকা য্যান সন্ধ্যার মইধ্যে দিয়া যায়। কেস-কাচারির খরচ কম না।

: আমি বাঁচব তো, স্যার?

ওদের ফিসফাস কথাবার্তাগুলো পাশের টেবিলে বসে স্পষ্টই শুনতে পাচ্ছে কমল। তবে তার কোনো প্রতিক্রিয়া হচ্ছে না। কী ভয়ানক, একেবারে পাশাপাশি বসে দুজন লোক ধর্ষণ নিয়ে কথা বলছে, যত দূর অনুমান, ওই দুজনের মধ্যে লাল ক্যাপ হলো ধর্ষক। তা-ও ওর কোনো প্রতিক্রিয়া নেই! স্বাভাবিকভাবেই শুনছে সব! বিষয়টি অবাক করার মতো না? নিজের আচরণে কমল নিজেই আশ্চর্য। চেষ্টা করেও নিজের ভেতর কোনো ক্রোধ বা টেনশন তৈরি করতে পারছে না সে। কমল এখন চিন্তিত এবং কিঞ্চিৎ আতঙ্কিতও তার জীবনে অহরহ ঘটতে থাকা নাটকীয় মুহূর্তগুলো নিয়ে—কেন ঘটে এমন? শেষবার স্ট্রতে মুখ লাগাতেই ভাবনা এল এবং কমলও ভাবনাকে দারুণ পাত্তা দিতে শুরু করল, খানিকটা তমিজের সঙ্গে।

বিজ্ঞাপনী সংস্থার মানবসম্পদ বিভাগের মাঝারি গোছের চেয়ে একটু বড় কর্মকর্তা কমল আবদুল লোদী। আদতে নাম ছিল আবদুল লোদী কমল। ওর সার্টিফিকেটেও জ্বলজ্বল করে এই নাম। তবে অনার্স পড়ার সময়েই নামের শেষ অংশ কেটে প্রথমে নিয়ে এল সে। হলে নিজের রুমের দরজায় বড় বড় করে লিখল নামটি। তখন অবশ্য থিয়েটার করত। নাটকের নেশায় একাকার ছিল রাত-দিন। তিন-চারটি মঞ্চনাটকে পাঠ গেয়েছিল। ইচ্ছা ছিল টিভি পর্দায় মুখ দেখাবে। কিন্তু ওই যে আচানক নাটকীয়তা—নাটকীয়তাই বাদ সাধল যেন। তাদের থিয়েটারের এক মেয়ে, যে তখন ছিল উঠতি মডেল, ঘনিষ্ঠতা হলো তার সঙ্গে। ঘনিষ্ঠতা মানে কখনো-সখনো রাতের বেলা মেয়েটির কণ্ঠ শোনার আশায় মোবাইলে কল করা আর প্রায় দিনই রিকশায় মেয়েটিকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার সময় একটু-আধটু গা ঘেঁষাঘেঁষি, হাত ধরা। এর নিচে কমল নামতে চেয়েছিল যদিও, তবে মেয়েকেও তো রাজি হতে হবে। অবশ্য এমনও হতে পারে কমল এর বেশি নামাতেই পারেনি। তো, একেই সে ভাবল প্রেম। স্বকৃত প্রেমের নাটকীয়তার ঘোরে আটকা পড়ে স্বেচ্ছায় মেয়েটির রিকশাসঙ্গী হলো সে অজস্রবার, কিন্তু টিভিতে তার আর মুখ দেখানো হলো না।

ঘোর কাটল কমলের, হলের সিটটি নেই হয়ে যাওয়ার পর। তত দিনে শুরু হয়ে গেছে রেস। জীবন লাফাচ্ছে। মেয়েটিকেও রিকশার বদলে গাড়িতে করে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছে এক্স, ওয়াই, জেড।

থিয়েটারের লোকজনের সঙ্গে জানাশোনার সূত্রে বিজ্ঞাপনী সংস্থায় চাকরি একটা জুটল কোনোমতে। প্রতিদিন সেখানে ক্লাইমেক্সের কমতি নেই।

এখন সে বিবাহিত। পাঁচ বছরের সংসার হলেও ছেলেপুলে হয়নি এখনো। আর তার বিয়েও তো একটা জমজমাট নাটকীয়তা। বিয়ের দুদিন আগেও সে জানত না ২৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় তার বিয়ে। শর্মীকে চিনত বিশ্ববিদ্যালয়ের সময় থেকে, ছোটখাটো এই মেয়ের জন্য খানিকটা মমতাও ছিল, ছিটেফোঁটা ভালোবাসার অনুভূতিও। বলা নেই কওয়া নেই এক সন্ধ্যায় শর্মী তার ফাঁকা মেসে এসে হাজির। গল্প হলো অনেক। গল্পে গল্পে ওরা অনেক নিচে নামল এবং অনেক ওপরে উঠল। কমলের জন্য ঘটনাটি প্রথমবার।

হঠাৎ কমলই আদুরে গলায় প্রস্তাব দিল প্রথমে, ‘বিয়ে করবে?’

সন্ধ্যা ভেঙে রাতের গভীরতার মধ্যে দাঁত বসায় ওদের কথা। শর্মীর গলায় প্রশ্ন ও হাসি একসঙ্গে ভেঙে পড়ে, ‘কাকে?’

: আমাকে।

: এসেছেন দেখি রাজার কুমার!

: আমি রাজপুত্তুর, রাজপুত্রই, কোটালপুত্র নই। বিয়ে করবে?

: করতে পারি। তবে ভালো না লাগলে কিন্তু ঠাস ঠাস ডিভোর্স।

কথাটি বলে খিলখিল করে হাসছে শর্মী। সে কি ভেবেচিন্তে বলছে সব? বিয়েটা পুতুলখেলা নাকি! শর্মীর আচরণের কূলকিনারা করতে ব্যর্থ কমল একটু দ্বিধাগ্রস্ত। তবে ওর মনের ভেতর তুফান উঠেছে, রাজি হও…রাজি হও! খান খান হয়ে যাচ্ছে সব।

বিয়ে হলো। তারপরের দৃশ্যগুলো অতটা রঙিন নয়, মাঝে মাঝেই সাদাকালোর ছোপ আছে সেখানে। চলছে, যাচ্ছে—এই শব্দগুলো এ ক্ষেত্রে বেশ মানানসই। ওদের ভাড়া করা তিন রুমের ফ্ল্যাটের জানালায় শর্মীর লাগানো মানিপ্ল্যান্ট গাছ যেভাবে দিনে দিনে বাড়ছে, সেভাবে কি বাড়ছে তাদের সম্পর্ক, সম্পর্কের রং? নিয়ম করে অফিসে যাওয়া, অফিস থেকে ফিরে রাতের বেলা দুজন একসঙ্গে খাওয়া। তখন হয়তো শর্মী কমলকে বলে, ‘আরেকটু দেব টেংরা মাছ?’ দিতেও পারো, আবার না–ও দিতে পারো—উত্তরে এভাবে মাথা নাড়ে কমল। তারপর নিয়মমতো খেয়ে নিয়মমাফিক শোয় দুজন মিলে। কখনো কমল শর্মীর শরীরে হাত রাখে, পা রাখে, মাথা রাখে। আচমকা ব্যাপার হলো তখনো মনে হয়, তার জীবনে নাটকীয় কায়কারবার কেন ঘটে? সে তো এমন করে চায়নি। এ জীবন চাইনি। শর্মীকে সে চেয়েছিল। এই শর্মীকেই কি?

কাল প্রায় সারা রাত জেগে তদন্ত রিপোর্ট তৈরি করেছে কমল। কথা বলেছে বাদী-বিবাদী—দুপক্ষের সঙ্গে। অভিযোগের পাল্লা জিনিয়ার দিকে ভারী। আর তদন্তেও দেখা যাচ্ছে দোষটা জিনিয়ারই বেশি। জিনিয়া ও আদনান। কেস মূলত এই দুজনের। ওরা দুজনই কপিরাইটার। আদনান কাজ করছে আড়াই বছর। আর জিনিয়া এসেছে বছরখানেক।

অভিযোগটি আদনানই করল। লিখিত অভিযোগ। সহকর্মী জিনিয়ার বিরুদ্ধে। অভিযোগ এই যে জিনিয়া তাকে নিয়ে খেলছে, তাকে বিয়ে করার আশ্বাস দিয়ে, তার সঙ্গে মেশামেশি করে এখন ঘোরাচ্ছে। প্রমাণস্বরূপ মানবসম্পদ বিভাগের হাতে সে তুলে দিল একটি ভিডিও ক্লিপ। কমল ভেবে পায় না, জিনিয়াকে যদি আদনান ভালোবাসে, তাহলে কেন এমন অভিযোগ, ক্লিপ কেন দাখিল করল?

ক্লিপ নিয়ে বেশ কয়েক দিন অবিরাম তোলপাড় হচ্ছে অফিসে। চলছে কানাঘুষাও। ‘মেয়েটা খারাপ, ছেলেনাচানি মেয়ে আছে না, এ-ও তেমন। ছেলেটা তো ভালোই বেসেছে ওকে অথচ ও করল কী…ছিঃ।’—এসব কথা কানে কানে ঘুরতে ঘুরতে সরব হয়ে ওঠে অফিসে। দ্রুতই।

আরশাদ জামান অফিসের প্রধান নির্বাহী। বেশ রাশভারী লোক। কমলকে ডেকে বললেন, ‘কী হলো, দ্রুত ব্যবস্থা নিন। আমি চাই না এখানে কাজের পরিবেশ নষ্ট হোক।’ এ কথার পর আমতা আমতা করে কমল তাঁকে যা বলতে চাইল তার সারমর্ম এই, এটা পারসোনাল ম্যাটার, অফিসের এখানে হস্তক্ষেপ করা ঠিক হবে না। এতেই শোনা গেল আরশাদ জামানের চিৎকার, সে চিৎকারের ভেতরে কেবল স্পষ্ট হলো একটি বাক্য, ‘এটা এখন আর পারসোনাল ম্যাটার নয়। অফিসে লিখিত অভিযোগ করার পর সেটা কী করে পারসোনাল থাকে?’

ভিডিও ক্লিপটি সাকল্যে চার মিনিট আটত্রিশ সেকেন্ডের। সেখানে পাত্রপাত্রী হিসেবে দেখা গেল আদনান ও জিনিয়াকেই। তাদের একান্ত মুহূর্ত। জিনিয়া ও আদনান—পরস্পরের মুখের ভেতরে মুখ। মুখে মুখে ভাব বিনিময় চলছে। আদনান একসময় জিনিয়াকে বলল, ‘চলো, বিয়ে করে ফেলি।’ এরপর উত্তর কী হবে? মানবসম্পদ বিভাগের মধ্যম-ঊর্ধ্ব কর্তা হিসেবে তদন্তকাজ করতে গিয়ে ভিডিও ক্লিপটি দেখতে দেখতে টেনশন বাড়ছিল কমলের। তার বুক ঢিপঢিপ করে। নাটকীয়তার চূড়ান্তে গিয়ে জিনিয়ার গলায় মিহি হাসির রেশ, ‘করতে পারি বিয়ে, কিন্তু বিয়ের পর না পোষালে ইয়োর ওয়ে ইজ ইয়োর, মাই ওয়ে ইজ মাইন।’ সবশেষে ওর কণ্ঠজুড়ে তুফান মেইলের মতো হাসি। সে হাসি চারপাশে ভেঙে ভেঙে পড়ে, নিক্বণ ছড়ায়। খান খান করে দেয় চরাচর। যদিও ক্লিপটিতে আরও অনেক কিছু ছিল, অথচ কমল আটকে গেল ওই হাসিতে—বিশ্বস্ত কিংবা অবিশ্বস্ত হাসিতেই। এই হাসি তার খুব চেনা। হাসিটি অবিকল শর্মীর। পাঁচ বছর আগের শর্মী।

ফাস্টফুডের দোকানে সেভেন আপের শূন্য বোতলের দিকে চেয়ে কেমন যেন শান্তি শান্তি লাগে। আজ সকালে কমল আচম্বিতে তদন্ত রিপোর্ট যে কুটি কুটি করল, তারপর যে ওর মনে হলো, নাটকীয় মুহূর্ত আমাকে ছেড়েই যাচ্ছে না!— এমন মনে হওয়ার পরও কেন জানি তার ভেতরে এখন আর অস্বস্তি নেই।

বেয়াড়া দুপুর দুনিয়ার ভেতরে প্রবল বেগে মেলে দিয়েছে নিজেকে।‘আশ্চর্য, এইসব আচমকা মুহূর্ত দেখি আমাকে ছেড়েই যাচ্ছে না!’—মনে মনে কথাটি আওড়াতে আওড়াতে বারবার ঘড়ি দেখছে কমল। না, এখন আর তার কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই। তাই ঘড়ি দেখারও নেই কোনো বিশেষ কারণ। ‘বারবার আমার ক্ষেত্রেই কেন ঘটে আচমকা ঘটনা? কেন, কেন?’—কথাটি এবার বোধ হয় একটু জোরেই বলে ফেলেছে সে। বলেই তাকাচ্ছে চারপাশে। কেউ শুনে ফেলেনি তো। শুনলেই বা কী, এমন কঠিন, গোপন কিছু তো বলেনি। কে আর বুঝবে এসব ঠোঁট-বিড়বিড় করা কথাবার্তা! কমলের চোখ নিচে, মাটির দিকে। ছেঁড়া কাগজের কুচিগুলো বাতাস পেয়ে হালকা হালকা দুলছে। একটু আগে তদন্ত রিপোর্টটি ছিঁড়ে কুটি কুটি করে সে এখানেই ফেলেছে। কাগজের টুকরোগুলো এখনো চেয়ে আছে তার দিকে, বাতাসে কেঁপে কেঁপে জানান দিচ্ছে নিজেদের অস্তিত্ব। কমল ভাবে, কাগজের টুকরোর যদি বাক্‌শক্তি থাকত, তাহলে ওগুলো নিশ্চয় তাকে বলত, কাল সারা রাত জেগে আমাকে তৈরি করলে, আর এখন ছিঁড়ে ফেললে? এমন নির্দয়ের মতো, পাষাণ!

কমলের মুখে হাসি খেলে যায়। আসলেই তো, কেন সে ছিঁড়ে ফেলল রিপোর্টটি? ওর জীবনে কয়েকবারই এমন ঘটেছে। হয়তো অনেক দিন লাগিয়ে কোনো একটি কাজের প্রায় চূড়ান্তে পৌঁছেছে, হঠাৎ মন বলে উঠল, না, কাজটি কোরো না, বাদ দাও। ব্যস, ওখানেই সব শেষ। খেল খতম। বারবার কেন এমন ঘটে তা নিয়ে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে ও কথাও বলেছে দু-একবার। সুরাহা পায়নি। বরং বন্ধুরাই প্রশ্ন করেছে তাকে, ‘আসলেই তো, তোর জীবনে কেন ঘটে এমন?’ তাদের প্রশ্ন করার ভাবভঙ্গি এমন, এর উত্তর কমল ঠিকই জানে, রহস্য রাখতে চায় বলে বলছে না। ফলে প্রথমে রহস্য না করলেও পরিবেশ-পরিস্থিতির চাপে কমলকে এবার রহস্যময় ভঙ্গিটি নিজের মুখে ফোটাতেই হয়, ‘আই অ্যাম ওয়েটিং ফর আ মিরাকল’, সে বলে। কিন্তু এখন এই ফাঁকা বাসস্ট্যান্ডে এসে, বাসে ওঠার ঠিক আগ মুহূর্তে তদন্ত রিপোর্টটি যে ছিঁড়ে ফেলল, সে কি কেবল তার মন বলল বলে?

ওর গন্তব্য ছিল উত্তরা। বেগুনি শার্টের সঙ্গে ধূসর রঙের প্যান্ট। বাসা থেকে বেরোবার আগে প্রথমে বেগুনি-ধূসর মিলিয়ে কমল ইন করল, অফিসে যাওয়ার আগে প্রতিদিন যেভাবে করে, সেভাবেই। পরে খানিক তাড়াহুড়া নিয়েই তদন্ত রিপোর্ট খামে ভরে সেটি নিয়ে রওনা হয়েছিল উত্তরায়, অফিসের উদ্দেশে। বনানী থেকে উত্তরা তেমন দূরের পথ নয়, এক বাসেই যাওয়া যায়। চেয়ারম্যানবাড়ি পার হয়ে বনানী বাসস্টপেজে এসেও পড়েছিল। উত্তরা উত্তরা বলে ডাকছে যে বাস, কমল সেটিতে উঠবে এমন সময় আচমকা মনে হলো—মনের ভেতর থেকে ডাক দিয়ে নিঃশব্দে বলল কেউ, এই রিপোর্ট অফিসে জমা দেওয়া ঠিক হবে না। কোনোভাবেই না। তৎক্ষণাৎ পিছিয়ে এল কমল। বাসে উঠল না। এরপর বাদামি খামের ভেতরে থাকা পাক্কা দশ পৃষ্ঠার রিপোর্টটি বের করে ছিঁড়ল কুচি কুচি করে। অথচ এ রিপোর্ট জমা দিলে তার প্রমোশন আর ঠেকে থাকত না। তবে মেয়েটির ক্ষতি হতো। ভীষণ ক্ষতি হতো।

কমল এখন বেশ হালকা বোধ করছে। এর মধ্যে উত্তরাগামী কয়েকটি বাস ওর সামনে দিয়ে হেঁকে-ডেকে চলে গেছে। আর সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, আজ অফিসে যাবে না। সাড়ে দশটা বেজে একটু বাড়তি, সূর্য গরম হয়ে উঠছে। বাসস্টপেজে ঠা ঠা রোদের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক হচ্ছে না বুঝতে পেরেও হাঁটাহাঁটি করল আরও কিছুক্ষণ। হাঁটতে হাঁটতে চোখে বিঁধল চৌদ্দ রকম বিলবোর্ড। তার মধ্যে একটি বিলবোর্ডে হাসছে কয়েকজন মানুষ। এ জায়গায় প্রতিদিনই আসা হয় কিন্তু এভাবে খেয়াল করা হয়নি কখনো—নিচে, রাস্তায় নানা ধান্দায় মানুষের দঙ্গল এদিক থেকে ওদিকে ছুটছে—দৌড়াচ্ছে, হাঁটছে। আর ওপরে, বিলবোর্ডে বিচিত্র ভঙ্গিতে হাসছে মানুষেরা; সে হাসির পাশে লেখা: ‘এই হাসি প্রশান্তির, এদের মতো সুখী হতে চান?’ কমল রাস্তায় ছুটন্ত বাস্তব মানুষের দিকে একবার, একবার বিলবোর্ডের সুখী মানুষের দিকে তাকায়। পরে গিয়ে বসে একটি ফাস্টফুডের দোকানে। গলা শুকিয়ে কাঠ। সেভেন আপ অর্ডার করে একটা। দোকানে বসে আবারও রাস্তার লোকজনের চলাফেরা দেখে সে। লাল কোট পরা এক লোক কেমন নাচের ভঙ্গিতে রাস্তা পার হচ্ছে। দেখতে বেশ মজাই লাগছে।

খট করে একটা শব্দ। টেবিলে।

রাস্তার দিক থেকে চোখ ফেরাল কমল। ওয়েটার সেভেন আপের সবুজ বোতলটি এনে রেখেছে। বোতলের দিকে তাকিয়ে গোলাপি স্ট্র মুখে তুলে নিল সে।

: আর কিছু দিমু, স্যার?

দু-পাশে মাথা ঝাঁকাল কমল। ওর ভেতরের খচখচি ভাবটা কোনোভাবেই যাচ্ছে না, বরং কাঁটার মতো ফুটছে—মনের ভেতর থেকে কে বলে ওঠে কথা? কেন এমন হচ্ছে বারবার?

: শোনো মিয়া, তুমারে না কইছি বেশি বাইড়ো না, এখন বুঝলা তো?

: জি, স্যার। কিন্তু স্যার, এখন আমি কী করব?

কমলের পাশের টেবিলে যে দুজন কথা বলছে, তাদের একজনের বয়স হয়তো পঁয়তাল্লিশ বছর হবে; অন্যজন, যে স্যার স্যার করছে, তার বয়স বেশি নয়—বড়জোর পঁচিশ-ছাব্বিশ। পঁচিশ-ছাব্বিশের কপালে লাল ক্যাপ। হ্যাংলা-পাতলা শরীর। নাকের পাশে জড়ুলের দাগ। পরেছে ফুল হাতার গাঢ় নীল শার্ট। লাল ক্যাপ-নীল শার্ট মিলেমিশে বেশ অদ্ভুত ও বেপরোয়া অবস্থা। হাতে আবার আংটিও আছে। রুবি পাথরের। আর পঁয়তাল্লিশের পরনে সাদামাটা ধরনের কালো কোট। বারবার নাকের ভেতরে আঙুল চালানো নিশ্চয় লোকটির অভ্যাস।

: এইটা কিন্তু রেপ কেসের মামলা। মাইয়াডার সাথে বেশি কইরা ফেলছ।

: তখন তো বুঝি নাই স্যার, মামলা করবে ওরা। এখন কী করব, বলেন আপনি?

: কী আর করবা, ঢাকা দিবা। গা ঢাকা দাও কয় দিন। বাকিটা পরে দেখা যাইব। আর শোনো, আমারে ফোনটোন দিবা না। মোবাইল ট্র্যাক হয় আইজকাল। আর তোমার দুলাভাই বাকি টাকা য্যান সন্ধ্যার মইধ্যে দিয়া যায়। কেস-কাচারির খরচ কম না।

: আমি বাঁচব তো, স্যার?

ওদের ফিসফাস কথাবার্তাগুলো পাশের টেবিলে বসে স্পষ্টই শুনতে পাচ্ছে কমল। তবে তার কোনো প্রতিক্রিয়া হচ্ছে না। কী ভয়ানক, একেবারে পাশাপাশি বসে দুজন লোক ধর্ষণ নিয়ে কথা বলছে, যত দূর অনুমান, ওই দুজনের মধ্যে লাল ক্যাপ হলো ধর্ষক। তা-ও ওর কোনো প্রতিক্রিয়া নেই! স্বাভাবিকভাবেই শুনছে সব! বিষয়টি অবাক করার মতো না? নিজের আচরণে কমল নিজেই আশ্চর্য। চেষ্টা করেও নিজের ভেতর কোনো ক্রোধ বা টেনশন তৈরি করতে পারছে না সে। কমল এখন চিন্তিত এবং কিঞ্চিৎ আতঙ্কিতও তার জীবনে অহরহ ঘটতে থাকা নাটকীয় মুহূর্তগুলো নিয়ে—কেন ঘটে এমন? শেষবার স্ট্রতে মুখ লাগাতেই ভাবনা এল এবং কমলও ভাবনাকে দারুণ পাত্তা দিতে শুরু করল, খানিকটা তমিজের সঙ্গে।

বিজ্ঞাপনী সংস্থার মানবসম্পদ বিভাগের মাঝারি গোছের চেয়ে একটু বড় কর্মকর্তা কমল আবদুল লোদী। আদতে নাম ছিল আবদুল লোদী কমল। ওর সার্টিফিকেটেও জ্বলজ্বল করে এই নাম। তবে অনার্স পড়ার সময়েই নামের শেষ অংশ কেটে প্রথমে নিয়ে এল সে। হলে নিজের রুমের দরজায় বড় বড় করে লিখল নামটি। তখন অবশ্য থিয়েটার করত। নাটকের নেশায় একাকার ছিল রাত-দিন। তিন-চারটি মঞ্চনাটকে পাঠ গেয়েছিল। ইচ্ছা ছিল টিভি পর্দায় মুখ দেখাবে। কিন্তু ওই যে আচানক নাটকীয়তা—নাটকীয়তাই বাদ সাধল যেন। তাদের থিয়েটারের এক মেয়ে, যে তখন ছিল উঠতি মডেল, ঘনিষ্ঠতা হলো তার সঙ্গে। ঘনিষ্ঠতা মানে কখনো-সখনো রাতের বেলা মেয়েটির কণ্ঠ শোনার আশায় মোবাইলে কল করা আর প্রায় দিনই রিকশায় মেয়েটিকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার সময় একটু-আধটু গা ঘেঁষাঘেঁষি, হাত ধরা। এর নিচে কমল নামতে চেয়েছিল যদিও, তবে মেয়েকেও তো রাজি হতে হবে। অবশ্য এমনও হতে পারে কমল এর বেশি নামাতেই পারেনি। তো, একেই সে ভাবল প্রেম। স্বকৃত প্রেমের নাটকীয়তার ঘোরে আটকা পড়ে স্বেচ্ছায় মেয়েটির রিকশাসঙ্গী হলো সে অজস্রবার, কিন্তু টিভিতে তার আর মুখ দেখানো হলো না।

ঘোর কাটল কমলের, হলের সিটটি নেই হয়ে যাওয়ার পর। তত দিনে শুরু হয়ে গেছে রেস। জীবন লাফাচ্ছে। মেয়েটিকেও রিকশার বদলে গাড়িতে করে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছে এক্স, ওয়াই, জেড।

থিয়েটারের লোকজনের সঙ্গে জানাশোনার সূত্রে বিজ্ঞাপনী সংস্থায় চাকরি একটা জুটল কোনোমতে। প্রতিদিন সেখানে ক্লাইমেক্সের কমতি নেই।

এখন সে বিবাহিত। পাঁচ বছরের সংসার হলেও ছেলেপুলে হয়নি এখনো। আর তার বিয়েও তো একটা জমজমাট নাটকীয়তা। বিয়ের দুদিন আগেও সে জানত না ২৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় তার বিয়ে। শর্মীকে চিনত বিশ্ববিদ্যালয়ের সময় থেকে, ছোটখাটো এই মেয়ের জন্য খানিকটা মমতাও ছিল, ছিটেফোঁটা ভালোবাসার অনুভূতিও। বলা নেই কওয়া নেই এক সন্ধ্যায় শর্মী তার ফাঁকা মেসে এসে হাজির। গল্প হলো অনেক। গল্পে গল্পে ওরা অনেক নিচে নামল এবং অনেক ওপরে উঠল। কমলের জন্য ঘটনাটি প্রথমবার।

হঠাৎ কমলই আদুরে গলায় প্রস্তাব দিল প্রথমে, ‘বিয়ে করবে?’

সন্ধ্যা ভেঙে রাতের গভীরতার মধ্যে দাঁত বসায় ওদের কথা। শর্মীর গলায় প্রশ্ন ও হাসি একসঙ্গে ভেঙে পড়ে, ‘কাকে?’

: আমাকে।

: এসেছেন দেখি রাজার কুমার!

: আমি রাজপুত্তুর, রাজপুত্রই, কোটালপুত্র নই। বিয়ে করবে?

: করতে পারি। তবে ভালো না লাগলে কিন্তু ঠাস ঠাস ডিভোর্স।

কথাটি বলে খিলখিল করে হাসছে শর্মী। সে কি ভেবেচিন্তে বলছে সব? বিয়েটা পুতুলখেলা নাকি! শর্মীর আচরণের কূলকিনারা করতে ব্যর্থ কমল একটু দ্বিধাগ্রস্ত। তবে ওর মনের ভেতর তুফান উঠেছে, রাজি হও…রাজি হও! খান খান হয়ে যাচ্ছে সব।

বিয়ে হলো। তারপরের দৃশ্যগুলো অতটা রঙিন নয়, মাঝে মাঝেই সাদাকালোর ছোপ আছে সেখানে। চলছে, যাচ্ছে—এই শব্দগুলো এ ক্ষেত্রে বেশ মানানসই। ওদের ভাড়া করা তিন রুমের ফ্ল্যাটের জানালায় শর্মীর লাগানো মানিপ্ল্যান্ট গাছ যেভাবে দিনে দিনে বাড়ছে, সেভাবে কি বাড়ছে তাদের সম্পর্ক, সম্পর্কের রং? নিয়ম করে অফিসে যাওয়া, অফিস থেকে ফিরে রাতের বেলা দুজন একসঙ্গে খাওয়া। তখন হয়তো শর্মী কমলকে বলে, ‘আরেকটু দেব টেংরা মাছ?’ দিতেও পারো, আবার না–ও দিতে পারো—উত্তরে এভাবে মাথা নাড়ে কমল। তারপর নিয়মমতো খেয়ে নিয়মমাফিক শোয় দুজন মিলে। কখনো কমল শর্মীর শরীরে হাত রাখে, পা রাখে, মাথা রাখে। আচমকা ব্যাপার হলো তখনো মনে হয়, তার জীবনে নাটকীয় কায়কারবার কেন ঘটে? সে তো এমন করে চায়নি। এ জীবন চাইনি। শর্মীকে সে চেয়েছিল। এই শর্মীকেই কি?

কাল প্রায় সারা রাত জেগে তদন্ত রিপোর্ট তৈরি করেছে কমল। কথা বলেছে বাদী-বিবাদী—দুপক্ষের সঙ্গে। অভিযোগের পাল্লা জিনিয়ার দিকে ভারী। আর তদন্তেও দেখা যাচ্ছে দোষটা জিনিয়ারই বেশি। জিনিয়া ও আদনান। কেস মূলত এই দুজনের। ওরা দুজনই কপিরাইটার। আদনান কাজ করছে আড়াই বছর। আর জিনিয়া এসেছে বছরখানেক।

অভিযোগটি আদনানই করল। লিখিত অভিযোগ। সহকর্মী জিনিয়ার বিরুদ্ধে। অভিযোগ এই যে জিনিয়া তাকে নিয়ে খেলছে, তাকে বিয়ে করার আশ্বাস দিয়ে, তার সঙ্গে মেশামেশি করে এখন ঘোরাচ্ছে। প্রমাণস্বরূপ মানবসম্পদ বিভাগের হাতে সে তুলে দিল একটি ভিডিও ক্লিপ। কমল ভেবে পায় না, জিনিয়াকে যদি আদনান ভালোবাসে, তাহলে কেন এমন অভিযোগ, ক্লিপ কেন দাখিল করল?

ক্লিপ নিয়ে বেশ কয়েক দিন অবিরাম তোলপাড় হচ্ছে অফিসে। চলছে কানাঘুষাও। ‘মেয়েটা খারাপ, ছেলেনাচানি মেয়ে আছে না, এ-ও তেমন। ছেলেটা তো ভালোই বেসেছে ওকে অথচ ও করল কী…ছিঃ।’—এসব কথা কানে কানে ঘুরতে ঘুরতে সরব হয়ে ওঠে অফিসে। দ্রুতই।

আরশাদ জামান অফিসের প্রধান নির্বাহী। বেশ রাশভারী লোক। কমলকে ডেকে বললেন, ‘কী হলো, দ্রুত ব্যবস্থা নিন। আমি চাই না এখানে কাজের পরিবেশ নষ্ট হোক।’ এ কথার পর আমতা আমতা করে কমল তাঁকে যা বলতে চাইল তার সারমর্ম এই, এটা পারসোনাল ম্যাটার, অফিসের এখানে হস্তক্ষেপ করা ঠিক হবে না। এতেই শোনা গেল আরশাদ জামানের চিৎকার, সে চিৎকারের ভেতরে কেবল স্পষ্ট হলো একটি বাক্য, ‘এটা এখন আর পারসোনাল ম্যাটার নয়। অফিসে লিখিত অভিযোগ করার পর সেটা কী করে পারসোনাল থাকে?’

ভিডিও ক্লিপটি সাকল্যে চার মিনিট আটত্রিশ সেকেন্ডের। সেখানে পাত্রপাত্রী হিসেবে দেখা গেল আদনান ও জিনিয়াকেই। তাদের একান্ত মুহূর্ত। জিনিয়া ও আদনান—পরস্পরের মুখের ভেতরে মুখ। মুখে মুখে ভাব বিনিময় চলছে। আদনান একসময় জিনিয়াকে বলল, ‘চলো, বিয়ে করে ফেলি।’ এরপর উত্তর কী হবে? মানবসম্পদ বিভাগের মধ্যম-ঊর্ধ্ব কর্তা হিসেবে তদন্তকাজ করতে গিয়ে ভিডিও ক্লিপটি দেখতে দেখতে টেনশন বাড়ছিল কমলের। তার বুক ঢিপঢিপ করে। নাটকীয়তার চূড়ান্তে গিয়ে জিনিয়ার গলায় মিহি হাসির রেশ, ‘করতে পারি বিয়ে, কিন্তু বিয়ের পর না পোষালে ইয়োর ওয়ে ইজ ইয়োর, মাই ওয়ে ইজ মাইন।’ সবশেষে ওর কণ্ঠজুড়ে তুফান মেইলের মতো হাসি। সে হাসি চারপাশে ভেঙে ভেঙে পড়ে, নিক্বণ ছড়ায়। খান খান করে দেয় চরাচর। যদিও ক্লিপটিতে আরও অনেক কিছু ছিল, অথচ কমল আটকে গেল ওই হাসিতে—বিশ্বস্ত কিংবা অবিশ্বস্ত হাসিতেই। এই হাসি তার খুব চেনা। হাসিটি অবিকল শর্মীর। পাঁচ বছর আগের শর্মী।

ফাস্টফুডের দোকানে সেভেন আপের শূন্য বোতলের দিকে চেয়ে কেমন যেন শান্তি শান্তি লাগে। আজ সকালে কমল আচম্বিতে তদন্ত রিপোর্ট যে কুটি কুটি করল, তারপর যে ওর মনে হলো, নাটকীয় মুহূর্ত আমাকে ছেড়েই যাচ্ছে না!— এমন মনে হওয়ার পরও কেন জানি তার ভেতরে এখন আর অস্বস্তি নেই।

বেয়াড়া দুপুর দুনিয়ার ভেতরে প্রবল বেগে মেলে দিয়েছে নিজেকে।‘আশ্চর্য, এইসব আচমকা মুহূর্ত দেখি আমাকে ছেড়েই যাচ্ছে না!’—মনে মনে কথাটি আওড়াতে আওড়াতে বারবার ঘড়ি দেখছে কমল। না, এখন আর তার কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই। তাই ঘড়ি দেখারও নেই কোনো বিশেষ কারণ। ‘বারবার আমার ক্ষেত্রেই কেন ঘটে আচমকা ঘটনা? কেন, কেন?’—কথাটি এবার বোধ হয় একটু জোরেই বলে ফেলেছে সে। বলেই তাকাচ্ছে চারপাশে। কেউ শুনে ফেলেনি তো। শুনলেই বা কী, এমন কঠিন, গোপন কিছু তো বলেনি। কে আর বুঝবে এসব ঠোঁট-বিড়বিড় করা কথাবার্তা! কমলের চোখ নিচে, মাটির দিকে। ছেঁড়া কাগজের কুচিগুলো বাতাস পেয়ে হালকা হালকা দুলছে। একটু আগে তদন্ত রিপোর্টটি ছিঁড়ে কুটি কুটি করে সে এখানেই ফেলেছে। কাগজের টুকরোগুলো এখনো চেয়ে আছে তার দিকে, বাতাসে কেঁপে কেঁপে জানান দিচ্ছে নিজেদের অস্তিত্ব। কমল ভাবে, কাগজের টুকরোর যদি বাক্‌শক্তি থাকত, তাহলে ওগুলো নিশ্চয় তাকে বলত, কাল সারা রাত জেগে আমাকে তৈরি করলে, আর এখন ছিঁড়ে ফেললে? এমন নির্দয়ের মতো, পাষাণ!

কমলের মুখে হাসি খেলে যায়। আসলেই তো, কেন সে ছিঁড়ে ফেলল রিপোর্টটি? ওর জীবনে কয়েকবারই এমন ঘটেছে। হয়তো অনেক দিন লাগিয়ে কোনো একটি কাজের প্রায় চূড়ান্তে পৌঁছেছে, হঠাৎ মন বলে উঠল, না, কাজটি কোরো না, বাদ দাও। ব্যস, ওখানেই সব শেষ। খেল খতম। বারবার কেন এমন ঘটে তা নিয়ে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে ও কথাও বলেছে দু-একবার। সুরাহা পায়নি। বরং বন্ধুরাই প্রশ্ন করেছে তাকে, ‘আসলেই তো, তোর জীবনে কেন ঘটে এমন?’ তাদের প্রশ্ন করার ভাবভঙ্গি এমন, এর উত্তর কমল ঠিকই জানে, রহস্য রাখতে চায় বলে বলছে না। ফলে প্রথমে রহস্য না করলেও পরিবেশ-পরিস্থিতির চাপে কমলকে এবার রহস্যময় ভঙ্গিটি নিজের মুখে ফোটাতেই হয়, ‘আই অ্যাম ওয়েটিং ফর আ মিরাকল’, সে বলে। কিন্তু এখন এই ফাঁকা বাসস্ট্যান্ডে এসে, বাসে ওঠার ঠিক আগ মুহূর্তে তদন্ত রিপোর্টটি যে ছিঁড়ে ফেলল, সে কি কেবল তার মন বলল বলে?

ওর গন্তব্য ছিল উত্তরা। বেগুনি শার্টের সঙ্গে ধূসর রঙের প্যান্ট। বাসা থেকে বেরোবার আগে প্রথমে বেগুনি-ধূসর মিলিয়ে কমল ইন করল, অফিসে যাওয়ার আগে প্রতিদিন যেভাবে করে, সেভাবেই। পরে খানিক তাড়াহুড়া নিয়েই তদন্ত রিপোর্ট খামে ভরে সেটি নিয়ে রওনা হয়েছিল উত্তরায়, অফিসের উদ্দেশে। বনানী থেকে উত্তরা তেমন দূরের পথ নয়, এক বাসেই যাওয়া যায়। চেয়ারম্যানবাড়ি পার হয়ে বনানী বাসস্টপেজে এসেও পড়েছিল। উত্তরা উত্তরা বলে ডাকছে যে বাস, কমল সেটিতে উঠবে এমন সময় আচমকা মনে হলো—মনের ভেতর থেকে ডাক দিয়ে নিঃশব্দে বলল কেউ, এই রিপোর্ট অফিসে জমা দেওয়া ঠিক হবে না। কোনোভাবেই না। তৎক্ষণাৎ পিছিয়ে এল কমল। বাসে উঠল না। এরপর বাদামি খামের ভেতরে থাকা পাক্কা দশ পৃষ্ঠার রিপোর্টটি বের করে ছিঁড়ল কুচি কুচি করে। অথচ এ রিপোর্ট জমা দিলে তার প্রমোশন আর ঠেকে থাকত না। তবে মেয়েটির ক্ষতি হতো। ভীষণ ক্ষতি হতো।

কমল এখন বেশ হালকা বোধ করছে। এর মধ্যে উত্তরাগামী কয়েকটি বাস ওর সামনে দিয়ে হেঁকে-ডেকে চলে গেছে। আর সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, আজ অফিসে যাবে না। সাড়ে দশটা বেজে একটু বাড়তি, সূর্য গরম হয়ে উঠছে। বাসস্টপেজে ঠা ঠা রোদের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক হচ্ছে না বুঝতে পেরেও হাঁটাহাঁটি করল আরও কিছুক্ষণ। হাঁটতে হাঁটতে চোখে বিঁধল চৌদ্দ রকম বিলবোর্ড। তার মধ্যে একটি বিলবোর্ডে হাসছে কয়েকজন মানুষ। এ জায়গায় প্রতিদিনই আসা হয় কিন্তু এভাবে খেয়াল করা হয়নি কখনো—নিচে, রাস্তায় নানা ধান্দায় মানুষের দঙ্গল এদিক থেকে ওদিকে ছুটছে—দৌড়াচ্ছে, হাঁটছে। আর ওপরে, বিলবোর্ডে বিচিত্র ভঙ্গিতে হাসছে মানুষেরা; সে হাসির পাশে লেখা: ‘এই হাসি প্রশান্তির, এদের মতো সুখী হতে চান?’ কমল রাস্তায় ছুটন্ত বাস্তব মানুষের দিকে একবার, একবার বিলবোর্ডের সুখী মানুষের দিকে তাকায়। পরে গিয়ে বসে একটি ফাস্টফুডের দোকানে। গলা শুকিয়ে কাঠ। সেভেন আপ অর্ডার করে একটা। দোকানে বসে আবারও রাস্তার লোকজনের চলাফেরা দেখে সে। লাল কোট পরা এক লোক কেমন নাচের ভঙ্গিতে রাস্তা পার হচ্ছে। দেখতে বেশ মজাই লাগছে।

খট করে একটা শব্দ। টেবিলে।

রাস্তার দিক থেকে চোখ ফেরাল কমল। ওয়েটার সেভেন আপের সবুজ বোতলটি এনে রেখেছে। বোতলের দিকে তাকিয়ে গোলাপি স্ট্র মুখে তুলে নিল সে।

: আর কিছু দিমু, স্যার?

দু-পাশে মাথা ঝাঁকাল কমল। ওর ভেতরের খচখচি ভাবটা কোনোভাবেই যাচ্ছে না, বরং কাঁটার মতো ফুটছে—মনের ভেতর থেকে কে বলে ওঠে কথা? কেন এমন হচ্ছে বারবার?

: শোনো মিয়া, তুমারে না কইছি বেশি বাইড়ো না, এখন বুঝলা তো?

: জি, স্যার। কিন্তু স্যার, এখন আমি কী করব?

কমলের পাশের টেবিলে যে দুজন কথা বলছে, তাদের একজনের বয়স হয়তো পঁয়তাল্লিশ বছর হবে; অন্যজন, যে স্যার স্যার করছে, তার বয়স বেশি নয়—বড়জোর পঁচিশ-ছাব্বিশ। পঁচিশ-ছাব্বিশের কপালে লাল ক্যাপ। হ্যাংলা-পাতলা শরীর। নাকের পাশে জড়ুলের দাগ। পরেছে ফুল হাতার গাঢ় নীল শার্ট। লাল ক্যাপ-নীল শার্ট মিলেমিশে বেশ অদ্ভুত ও বেপরোয়া অবস্থা। হাতে আবার আংটিও আছে। রুবি পাথরের। আর পঁয়তাল্লিশের পরনে সাদামাটা ধরনের কালো কোট। বারবার নাকের ভেতরে আঙুল চালানো নিশ্চয় লোকটির অভ্যাস।

: এইটা কিন্তু রেপ কেসের মামলা। মাইয়াডার সাথে বেশি কইরা ফেলছ।

: তখন তো বুঝি নাই স্যার, মামলা করবে ওরা। এখন কী করব, বলেন আপনি?

: কী আর করবা, ঢাকা দিবা। গা ঢাকা দাও কয় দিন। বাকিটা পরে দেখা যাইব। আর শোনো, আমারে ফোনটোন দিবা না। মোবাইল ট্র্যাক হয় আইজকাল। আর তোমার দুলাভাই বাকি টাকা য্যান সন্ধ্যার মইধ্যে দিয়া যায়। কেস-কাচারির খরচ কম না।

: আমি বাঁচব তো, স্যার?

ওদের ফিসফাস কথাবার্তাগুলো পাশের টেবিলে বসে স্পষ্টই শুনতে পাচ্ছে কমল। তবে তার কোনো প্রতিক্রিয়া হচ্ছে না। কী ভয়ানক, একেবারে পাশাপাশি বসে দুজন লোক ধর্ষণ নিয়ে কথা বলছে, যত দূর অনুমান, ওই দুজনের মধ্যে লাল ক্যাপ হলো ধর্ষক। তা-ও ওর কোনো প্রতিক্রিয়া নেই! স্বাভাবিকভাবেই শুনছে সব! বিষয়টি অবাক করার মতো না? নিজের আচরণে কমল নিজেই আশ্চর্য। চেষ্টা করেও নিজের ভেতর কোনো ক্রোধ বা টেনশন তৈরি করতে পারছে না সে। কমল এখন চিন্তিত এবং কিঞ্চিৎ আতঙ্কিতও তার জীবনে অহরহ ঘটতে থাকা নাটকীয় মুহূর্তগুলো নিয়ে—কেন ঘটে এমন? শেষবার স্ট্রতে মুখ লাগাতেই ভাবনা এল এবং কমলও ভাবনাকে দারুণ পাত্তা দিতে শুরু করল, খানিকটা তমিজের সঙ্গে।

বিজ্ঞাপনী সংস্থার মানবসম্পদ বিভাগের মাঝারি গোছের চেয়ে একটু বড় কর্মকর্তা কমল আবদুল লোদী। আদতে নাম ছিল আবদুল লোদী কমল। ওর সার্টিফিকেটেও জ্বলজ্বল করে এই নাম। তবে অনার্স পড়ার সময়েই নামের শেষ অংশ কেটে প্রথমে নিয়ে এল সে। হলে নিজের রুমের দরজায় বড় বড় করে লিখল নামটি। তখন অবশ্য থিয়েটার করত। নাটকের নেশায় একাকার ছিল রাত-দিন। তিন-চারটি মঞ্চনাটকে পাঠ গেয়েছিল। ইচ্ছা ছিল টিভি পর্দায় মুখ দেখাবে। কিন্তু ওই যে আচানক নাটকীয়তা—নাটকীয়তাই বাদ সাধল যেন। তাদের থিয়েটারের এক মেয়ে, যে তখন ছিল উঠতি মডেল, ঘনিষ্ঠতা হলো তার সঙ্গে। ঘনিষ্ঠতা মানে কখনো-সখনো রাতের বেলা মেয়েটির কণ্ঠ শোনার আশায় মোবাইলে কল করা আর প্রায় দিনই রিকশায় মেয়েটিকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার সময় একটু-আধটু গা ঘেঁষাঘেঁষি, হাত ধরা। এর নিচে কমল নামতে চেয়েছিল যদিও, তবে মেয়েকেও তো রাজি হতে হবে। অবশ্য এমনও হতে পারে কমল এর বেশি নামাতেই পারেনি। তো, একেই সে ভাবল প্রেম। স্বকৃত প্রেমের নাটকীয়তার ঘোরে আটকা পড়ে স্বেচ্ছায় মেয়েটির রিকশাসঙ্গী হলো সে অজস্রবার, কিন্তু টিভিতে তার আর মুখ দেখানো হলো না।

ঘোর কাটল কমলের, হলের সিটটি নেই হয়ে যাওয়ার পর। তত দিনে শুরু হয়ে গেছে রেস। জীবন লাফাচ্ছে। মেয়েটিকেও রিকশার বদলে গাড়িতে করে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছে এক্স, ওয়াই, জেড।

থিয়েটারের লোকজনের সঙ্গে জানাশোনার সূত্রে বিজ্ঞাপনী সংস্থায় চাকরি একটা জুটল কোনোমতে। প্রতিদিন সেখানে ক্লাইমেক্সের কমতি নেই।

এখন সে বিবাহিত। পাঁচ বছরের সংসার হলেও ছেলেপুলে হয়নি এখনো। আর তার বিয়েও তো একটা জমজমাট নাটকীয়তা। বিয়ের দুদিন আগেও সে জানত না ২৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় তার বিয়ে। শর্মীকে চিনত বিশ্ববিদ্যালয়ের সময় থেকে, ছোটখাটো এই মেয়ের জন্য খানিকটা মমতাও ছিল, ছিটেফোঁটা ভালোবাসার অনুভূতিও। বলা নেই কওয়া নেই এক সন্ধ্যায় শর্মী তার ফাঁকা মেসে এসে হাজির। গল্প হলো অনেক। গল্পে গল্পে ওরা অনেক নিচে নামল এবং অনেক ওপরে উঠল। কমলের জন্য ঘটনাটি প্রথমবার।

হঠাৎ কমলই আদুরে গলায় প্রস্তাব দিল প্রথমে, ‘বিয়ে করবে?’

সন্ধ্যা ভেঙে রাতের গভীরতার মধ্যে দাঁত বসায় ওদের কথা। শর্মীর গলায় প্রশ্ন ও হাসি একসঙ্গে ভেঙে পড়ে, ‘কাকে?’

: আমাকে।

: এসেছেন দেখি রাজার কুমার!

: আমি রাজপুত্তুর, রাজপুত্রই, কোটালপুত্র নই। বিয়ে করবে?

: করতে পারি। তবে ভালো না লাগলে কিন্তু ঠাস ঠাস ডিভোর্স।

কথাটি বলে খিলখিল করে হাসছে শর্মী। সে কি ভেবেচিন্তে বলছে সব? বিয়েটা পুতুলখেলা নাকি! শর্মীর আচরণের কূলকিনারা করতে ব্যর্থ কমল একটু দ্বিধাগ্রস্ত। তবে ওর মনের ভেতর তুফান উঠেছে, রাজি হও…রাজি হও! খান খান হয়ে যাচ্ছে সব।

বিয়ে হলো। তারপরের দৃশ্যগুলো অতটা রঙিন নয়, মাঝে মাঝেই সাদাকালোর ছোপ আছে সেখানে। চলছে, যাচ্ছে—এই শব্দগুলো এ ক্ষেত্রে বেশ মানানসই। ওদের ভাড়া করা তিন রুমের ফ্ল্যাটের জানালায় শর্মীর লাগানো মানিপ্ল্যান্ট গাছ যেভাবে দিনে দিনে বাড়ছে, সেভাবে কি বাড়ছে তাদের সম্পর্ক, সম্পর্কের রং? নিয়ম করে অফিসে যাওয়া, অফিস থেকে ফিরে রাতের বেলা দুজন একসঙ্গে খাওয়া। তখন হয়তো শর্মী কমলকে বলে, ‘আরেকটু দেব টেংরা মাছ?’ দিতেও পারো, আবার না–ও দিতে পারো—উত্তরে এভাবে মাথা নাড়ে কমল। তারপর নিয়মমতো খেয়ে নিয়মমাফিক শোয় দুজন মিলে। কখনো কমল শর্মীর শরীরে হাত রাখে, পা রাখে, মাথা রাখে। আচমকা ব্যাপার হলো তখনো মনে হয়, তার জীবনে নাটকীয় কায়কারবার কেন ঘটে? সে তো এমন করে চায়নি। এ জীবন চাইনি। শর্মীকে সে চেয়েছিল। এই শর্মীকেই কি?

কাল প্রায় সারা রাত জেগে তদন্ত রিপোর্ট তৈরি করেছে কমল। কথা বলেছে বাদী-বিবাদী—দুপক্ষের সঙ্গে। অভিযোগের পাল্লা জিনিয়ার দিকে ভারী। আর তদন্তেও দেখা যাচ্ছে দোষটা জিনিয়ারই বেশি। জিনিয়া ও আদনান। কেস মূলত এই দুজনের। ওরা দুজনই কপিরাইটার। আদনান কাজ করছে আড়াই বছর। আর জিনিয়া এসেছে বছরখানেক।

অভিযোগটি আদনানই করল। লিখিত অভিযোগ। সহকর্মী জিনিয়ার বিরুদ্ধে। অভিযোগ এই যে জিনিয়া তাকে নিয়ে খেলছে, তাকে বিয়ে করার আশ্বাস দিয়ে, তার সঙ্গে মেশামেশি করে এখন ঘোরাচ্ছে। প্রমাণস্বরূপ মানবসম্পদ বিভাগের হাতে সে তুলে দিল একটি ভিডিও ক্লিপ। কমল ভেবে পায় না, জিনিয়াকে যদি আদনান ভালোবাসে, তাহলে কেন এমন অভিযোগ, ক্লিপ কেন দাখিল করল?

ক্লিপ নিয়ে বেশ কয়েক দিন অবিরাম তোলপাড় হচ্ছে অফিসে। চলছে কানাঘুষাও। ‘মেয়েটা খারাপ, ছেলেনাচানি মেয়ে আছে না, এ-ও তেমন। ছেলেটা তো ভালোই বেসেছে ওকে অথচ ও করল কী…ছিঃ।’—এসব কথা কানে কানে ঘুরতে ঘুরতে সরব হয়ে ওঠে অফিসে। দ্রুতই।

আরশাদ জামান অফিসের প্রধান নির্বাহী। বেশ রাশভারী লোক। কমলকে ডেকে বললেন, ‘কী হলো, দ্রুত ব্যবস্থা নিন। আমি চাই না এখানে কাজের পরিবেশ নষ্ট হোক।’ এ কথার পর আমতা আমতা করে কমল তাঁকে যা বলতে চাইল তার সারমর্ম এই, এটা পারসোনাল ম্যাটার, অফিসের এখানে হস্তক্ষেপ করা ঠিক হবে না। এতেই শোনা গেল আরশাদ জামানের চিৎকার, সে চিৎকারের ভেতরে কেবল স্পষ্ট হলো একটি বাক্য, ‘এটা এখন আর পারসোনাল ম্যাটার নয়। অফিসে লিখিত অভিযোগ করার পর সেটা কী করে পারসোনাল থাকে?’

ভিডিও ক্লিপটি সাকল্যে চার মিনিট আটত্রিশ সেকেন্ডের। সেখানে পাত্রপাত্রী হিসেবে দেখা গেল আদনান ও জিনিয়াকেই। তাদের একান্ত মুহূর্ত। জিনিয়া ও আদনান—পরস্পরের মুখের ভেতরে মুখ। মুখে মুখে ভাব বিনিময় চলছে। আদনান একসময় জিনিয়াকে বলল, ‘চলো, বিয়ে করে ফেলি।’ এরপর উত্তর কী হবে? মানবসম্পদ বিভাগের মধ্যম-ঊর্ধ্ব কর্তা হিসেবে তদন্তকাজ করতে গিয়ে ভিডিও ক্লিপটি দেখতে দেখতে টেনশন বাড়ছিল কমলের। তার বুক ঢিপঢিপ করে। নাটকীয়তার চূড়ান্তে গিয়ে জিনিয়ার গলায় মিহি হাসির রেশ, ‘করতে পারি বিয়ে, কিন্তু বিয়ের পর না পোষালে ইয়োর ওয়ে ইজ ইয়োর, মাই ওয়ে ইজ মাইন।’ সবশেষে ওর কণ্ঠজুড়ে তুফান মেইলের মতো হাসি। সে হাসি চারপাশে ভেঙে ভেঙে পড়ে, নিক্বণ ছড়ায়। খান খান করে দেয় চরাচর। যদিও ক্লিপটিতে আরও অনেক কিছু ছিল, অথচ কমল আটকে গেল ওই হাসিতে—বিশ্বস্ত কিংবা অবিশ্বস্ত হাসিতেই। এই হাসি তার খুব চেনা। হাসিটি অবিকল শর্মীর। পাঁচ বছর আগের শর্মী।

ফাস্টফুডের দোকানে সেভেন আপের শূন্য বোতলের দিকে চেয়ে কেমন যেন শান্তি শান্তি লাগে। আজ সকালে কমল আচম্বিতে তদন্ত রিপোর্ট যে কুটি কুটি করল, তারপর যে ওর মনে হলো, নাটকীয় মুহূর্ত আমাকে ছেড়েই যাচ্ছে না!— এমন মনে হওয়ার পরও কেন জানি তার ভেতরে এখন আর অস্বস্তি নেই।

বেয়াড়া দুপুর দুনিয়ার ভেতরে প্রবল বেগে মেলে দিয়েছে নিজেকে।‘আশ্চর্য, এইসব আচমকা মুহূর্ত দেখি আমাকে ছেড়েই যাচ্ছে না!’—মনে মনে কথাটি আওড়াতে আওড়াতে বারবার ঘড়ি দেখছে কমল। না, এখন আর তার কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই। তাই ঘড়ি দেখারও নেই কোনো বিশেষ কারণ। ‘বারবার আমার ক্ষেত্রেই কেন ঘটে আচমকা ঘটনা? কেন, কেন?’—কথাটি এবার বোধ হয় একটু জোরেই বলে ফেলেছে সে। বলেই তাকাচ্ছে চারপাশে। কেউ শুনে ফেলেনি তো। শুনলেই বা কী, এমন কঠিন, গোপন কিছু তো বলেনি। কে আর বুঝবে এসব ঠোঁট-বিড়বিড় করা কথাবার্তা! কমলের চোখ নিচে, মাটির দিকে। ছেঁড়া কাগজের কুচিগুলো বাতাস পেয়ে হালকা হালকা দুলছে। একটু আগে তদন্ত রিপোর্টটি ছিঁড়ে কুটি কুটি করে সে এখানেই ফেলেছে। কাগজের টুকরোগুলো এখনো চেয়ে আছে তার দিকে, বাতাসে কেঁপে কেঁপে জানান দিচ্ছে নিজেদের অস্তিত্ব। কমল ভাবে, কাগজের টুকরোর যদি বাক্‌শক্তি থাকত, তাহলে ওগুলো নিশ্চয় তাকে বলত, কাল সারা রাত জেগে আমাকে তৈরি করলে, আর এখন ছিঁড়ে ফেললে? এমন নির্দয়ের মতো, পাষাণ!

কমলের মুখে হাসি খেলে যায়। আসলেই তো, কেন সে ছিঁড়ে ফেলল রিপোর্টটি? ওর জীবনে কয়েকবারই এমন ঘটেছে। হয়তো অনেক দিন লাগিয়ে কোনো একটি কাজের প্রায় চূড়ান্তে পৌঁছেছে, হঠাৎ মন বলে উঠল, না, কাজটি কোরো না, বাদ দাও। ব্যস, ওখানেই সব শেষ। খেল খতম। বারবার কেন এমন ঘটে তা নিয়ে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে ও কথাও বলেছে দু-একবার। সুরাহা পায়নি। বরং বন্ধুরাই প্রশ্ন করেছে তাকে, ‘আসলেই তো, তোর জীবনে কেন ঘটে এমন?’ তাদের প্রশ্ন করার ভাবভঙ্গি এমন, এর উত্তর কমল ঠিকই জানে, রহস্য রাখতে চায় বলে বলছে না। ফলে প্রথমে রহস্য না করলেও পরিবেশ-পরিস্থিতির চাপে কমলকে এবার রহস্যময় ভঙ্গিটি নিজের মুখে ফোটাতেই হয়, ‘আই অ্যাম ওয়েটিং ফর আ মিরাকল’, সে বলে। কিন্তু এখন এই ফাঁকা বাসস্ট্যান্ডে এসে, বাসে ওঠার ঠিক আগ মুহূর্তে তদন্ত রিপোর্টটি যে ছিঁড়ে ফেলল, সে কি কেবল তার মন বলল বলে?

ওর গন্তব্য ছিল উত্তরা। বেগুনি শার্টের সঙ্গে ধূসর রঙের প্যান্ট। বাসা থেকে বেরোবার আগে প্রথমে বেগুনি-ধূসর মিলিয়ে কমল ইন করল, অফিসে যাওয়ার আগে প্রতিদিন যেভাবে করে, সেভাবেই। পরে খানিক তাড়াহুড়া নিয়েই তদন্ত রিপোর্ট খামে ভরে সেটি নিয়ে রওনা হয়েছিল উত্তরায়, অফিসের উদ্দেশে। বনানী থেকে উত্তরা তেমন দূরের পথ নয়, এক বাসেই যাওয়া যায়। চেয়ারম্যানবাড়ি পার হয়ে বনানী বাসস্টপেজে এসেও পড়েছিল। উত্তরা উত্তরা বলে ডাকছে যে বাস, কমল সেটিতে উঠবে এমন সময় আচমকা মনে হলো—মনের ভেতর থেকে ডাক দিয়ে নিঃশব্দে বলল কেউ, এই রিপোর্ট অফিসে জমা দেওয়া ঠিক হবে না। কোনোভাবেই না। তৎক্ষণাৎ পিছিয়ে এল কমল। বাসে উঠল না। এরপর বাদামি খামের ভেতরে থাকা পাক্কা দশ পৃষ্ঠার রিপোর্টটি বের করে ছিঁড়ল কুচি কুচি করে। অথচ এ রিপোর্ট জমা দিলে তার প্রমোশন আর ঠেকে থাকত না। তবে মেয়েটির ক্ষতি হতো। ভীষণ ক্ষতি হতো।

কমল এখন বেশ হালকা বোধ করছে। এর মধ্যে উত্তরাগামী কয়েকটি বাস ওর সামনে দিয়ে হেঁকে-ডেকে চলে গেছে। আর সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, আজ অফিসে যাবে না। সাড়ে দশটা বেজে একটু বাড়তি, সূর্য গরম হয়ে উঠছে। বাসস্টপেজে ঠা ঠা রোদের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক হচ্ছে না বুঝতে পেরেও হাঁটাহাঁটি করল আরও কিছুক্ষণ। হাঁটতে হাঁটতে চোখে বিঁধল চৌদ্দ রকম বিলবোর্ড। তার মধ্যে একটি বিলবোর্ডে হাসছে কয়েকজন মানুষ। এ জায়গায় প্রতিদিনই আসা হয় কিন্তু এভাবে খেয়াল করা হয়নি কখনো—নিচে, রাস্তায় নানা ধান্দায় মানুষের দঙ্গল এদিক থেকে ওদিকে ছুটছে—দৌড়াচ্ছে, হাঁটছে। আর ওপরে, বিলবোর্ডে বিচিত্র ভঙ্গিতে হাসছে মানুষেরা; সে হাসির পাশে লেখা: ‘এই হাসি প্রশান্তির, এদের মতো সুখী হতে চান?’ কমল রাস্তায় ছুটন্ত বাস্তব মানুষের দিকে একবার, একবার বিলবোর্ডের সুখী মানুষের দিকে তাকায়। পরে গিয়ে বসে একটি ফাস্টফুডের দোকানে। গলা শুকিয়ে কাঠ। সেভেন আপ অর্ডার করে একটা। দোকানে বসে আবারও রাস্তার লোকজনের চলাফেরা দেখে সে। লাল কোট পরা এক লোক কেমন নাচের ভঙ্গিতে রাস্তা পার হচ্ছে। দেখতে বেশ মজাই লাগছে।

খট করে একটা শব্দ। টেবিলে।

রাস্তার দিক থেকে চোখ ফেরাল কমল। ওয়েটার সেভেন আপের সবুজ বোতলটি এনে রেখেছে। বোতলের দিকে তাকিয়ে গোলাপি স্ট্র মুখে তুলে নিল সে।

: আর কিছু দিমু, স্যার?

দু-পাশে মাথা ঝাঁকাল কমল। ওর ভেতরের খচখচি ভাবটা কোনোভাবেই যাচ্ছে না, বরং কাঁটার মতো ফুটছে—মনের ভেতর থেকে কে বলে ওঠে কথা? কেন এমন হচ্ছে বারবার?

: শোনো মিয়া, তুমারে না কইছি বেশি বাইড়ো না, এখন বুঝলা তো?

: জি, স্যার। কিন্তু স্যার, এখন আমি কী করব?

কমলের পাশের টেবিলে যে দুজন কথা বলছে, তাদের একজনের বয়স হয়তো পঁয়তাল্লিশ বছর হবে; অন্যজন, যে স্যার স্যার করছে, তার বয়স বেশি নয়—বড়জোর পঁচিশ-ছাব্বিশ। পঁচিশ-ছাব্বিশের কপালে লাল ক্যাপ। হ্যাংলা-পাতলা শরীর। নাকের পাশে জড়ুলের দাগ। পরেছে ফুল হাতার গাঢ় নীল শার্ট। লাল ক্যাপ-নীল শার্ট মিলেমিশে বেশ অদ্ভুত ও বেপরোয়া অবস্থা। হাতে আবার আংটিও আছে। রুবি পাথরের। আর পঁয়তাল্লিশের পরনে সাদামাটা ধরনের কালো কোট। বারবার নাকের ভেতরে আঙুল চালানো নিশ্চয় লোকটির অভ্যাস।

: এইটা কিন্তু রেপ কেসের মামলা। মাইয়াডার সাথে বেশি কইরা ফেলছ।

: তখন তো বুঝি নাই স্যার, মামলা করবে ওরা। এখন কী করব, বলেন আপনি?

: কী আর করবা, ঢাকা দিবা। গা ঢাকা দাও কয় দিন। বাকিটা পরে দেখা যাইব। আর শোনো, আমারে ফোনটোন দিবা না। মোবাইল ট্র্যাক হয় আইজকাল। আর তোমার দুলাভাই বাকি টাকা য্যান সন্ধ্যার মইধ্যে দিয়া যায়। কেস-কাচারির খরচ কম না।

: আমি বাঁচব তো, স্যার?

ওদের ফিসফাস কথাবার্তাগুলো পাশের টেবিলে বসে স্পষ্টই শুনতে পাচ্ছে কমল। তবে তার কোনো প্রতিক্রিয়া হচ্ছে না। কী ভয়ানক, একেবারে পাশাপাশি বসে দুজন লোক ধর্ষণ নিয়ে কথা বলছে, যত দূর অনুমান, ওই দুজনের মধ্যে লাল ক্যাপ হলো ধর্ষক। তা-ও ওর কোনো প্রতিক্রিয়া নেই! স্বাভাবিকভাবেই শুনছে সব! বিষয়টি অবাক করার মতো না? নিজের আচরণে কমল নিজেই আশ্চর্য। চেষ্টা করেও নিজের ভেতর কোনো ক্রোধ বা টেনশন তৈরি করতে পারছে না সে। কমল এখন চিন্তিত এবং কিঞ্চিৎ আতঙ্কিতও তার জীবনে অহরহ ঘটতে থাকা নাটকীয় মুহূর্তগুলো নিয়ে—কেন ঘটে এমন? শেষবার স্ট্রতে মুখ লাগাতেই ভাবনা এল এবং কমলও ভাবনাকে দারুণ পাত্তা দিতে শুরু করল, খানিকটা তমিজের সঙ্গে।

বিজ্ঞাপনী সংস্থার মানবসম্পদ বিভাগের মাঝারি গোছের চেয়ে একটু বড় কর্মকর্তা কমল আবদুল লোদী। আদতে নাম ছিল আবদুল লোদী কমল। ওর সার্টিফিকেটেও জ্বলজ্বল করে এই নাম। তবে অনার্স পড়ার সময়েই নামের শেষ অংশ কেটে প্রথমে নিয়ে এল সে। হলে নিজের রুমের দরজায় বড় বড় করে লিখল নামটি। তখন অবশ্য থিয়েটার করত। নাটকের নেশায় একাকার ছিল রাত-দিন। তিন-চারটি মঞ্চনাটকে পাঠ গেয়েছিল। ইচ্ছা ছিল টিভি পর্দায় মুখ দেখাবে। কিন্তু ওই যে আচানক নাটকীয়তা—নাটকীয়তাই বাদ সাধল যেন। তাদের থিয়েটারের এক মেয়ে, যে তখন ছিল উঠতি মডেল, ঘনিষ্ঠতা হলো তার সঙ্গে। ঘনিষ্ঠতা মানে কখনো-সখনো রাতের বেলা মেয়েটির কণ্ঠ শোনার আশায় মোবাইলে কল করা আর প্রায় দিনই রিকশায় মেয়েটিকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার সময় একটু-আধটু গা ঘেঁষাঘেঁষি, হাত ধরা। এর নিচে কমল নামতে চেয়েছিল যদিও, তবে মেয়েকেও তো রাজি হতে হবে। অবশ্য এমনও হতে পারে কমল এর বেশি নামাতেই পারেনি। তো, একেই সে ভাবল প্রেম। স্বকৃত প্রেমের নাটকীয়তার ঘোরে আটকা পড়ে স্বেচ্ছায় মেয়েটির রিকশাসঙ্গী হলো সে অজস্রবার, কিন্তু টিভিতে তার আর মুখ দেখানো হলো না।

ঘোর কাটল কমলের, হলের সিটটি নেই হয়ে যাওয়ার পর। তত দিনে শুরু হয়ে গেছে রেস। জীবন লাফাচ্ছে। মেয়েটিকেও রিকশার বদলে গাড়িতে করে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছে এক্স, ওয়াই, জেড।

থিয়েটারের লোকজনের সঙ্গে জানাশোনার সূত্রে বিজ্ঞাপনী সংস্থায় চাকরি একটা জুটল কোনোমতে। প্রতিদিন সেখানে ক্লাইমেক্সের কমতি নেই।

এখন সে বিবাহিত। পাঁচ বছরের সংসার হলেও ছেলেপুলে হয়নি এখনো। আর তার বিয়েও তো একটা জমজমাট নাটকীয়তা। বিয়ের দুদিন আগেও সে জানত না ২৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় তার বিয়ে। শর্মীকে চিনত বিশ্ববিদ্যালয়ের সময় থেকে, ছোটখাটো এই মেয়ের জন্য খানিকটা মমতাও ছিল, ছিটেফোঁটা ভালোবাসার অনুভূতিও। বলা নেই কওয়া নেই এক সন্ধ্যায় শর্মী তার ফাঁকা মেসে এসে হাজির। গল্প হলো অনেক। গল্পে গল্পে ওরা অনেক নিচে নামল এবং অনেক ওপরে উঠল। কমলের জন্য ঘটনাটি প্রথমবার।

হঠাৎ কমলই আদুরে গলায় প্রস্তাব দিল প্রথমে, ‘বিয়ে করবে?’

সন্ধ্যা ভেঙে রাতের গভীরতার মধ্যে দাঁত বসায় ওদের কথা। শর্মীর গলায় প্রশ্ন ও হাসি একসঙ্গে ভেঙে পড়ে, ‘কাকে?’

: আমাকে।

: এসেছেন দেখি রাজার কুমার!

: আমি রাজপুত্তুর, রাজপুত্রই, কোটালপুত্র নই। বিয়ে করবে?

: করতে পারি। তবে ভালো না লাগলে কিন্তু ঠাস ঠাস ডিভোর্স।

কথাটি বলে খিলখিল করে হাসছে শর্মী। সে কি ভেবেচিন্তে বলছে সব? বিয়েটা পুতুলখেলা নাকি! শর্মীর আচরণের কূলকিনারা করতে ব্যর্থ কমল একটু দ্বিধাগ্রস্ত। তবে ওর মনের ভেতর তুফান উঠেছে, রাজি হও…রাজি হও! খান খান হয়ে যাচ্ছে সব।

বিয়ে হলো। তারপরের দৃশ্যগুলো অতটা রঙিন নয়, মাঝে মাঝেই সাদাকালোর ছোপ আছে সেখানে। চলছে, যাচ্ছে—এই শব্দগুলো এ ক্ষেত্রে বেশ মানানসই। ওদের ভাড়া করা তিন রুমের ফ্ল্যাটের জানালায় শর্মীর লাগানো মানিপ্ল্যান্ট গাছ যেভাবে দিনে দিনে বাড়ছে, সেভাবে কি বাড়ছে তাদের সম্পর্ক, সম্পর্কের রং? নিয়ম করে অফিসে যাওয়া, অফিস থেকে ফিরে রাতের বেলা দুজন একসঙ্গে খাওয়া। তখন হয়তো শর্মী কমলকে বলে, ‘আরেকটু দেব টেংরা মাছ?’ দিতেও পারো, আবার না–ও দিতে পারো—উত্তরে এভাবে মাথা নাড়ে কমল। তারপর নিয়মমতো খেয়ে নিয়মমাফিক শোয় দুজন মিলে। কখনো কমল শর্মীর শরীরে হাত রাখে, পা রাখে, মাথা রাখে। আচমকা ব্যাপার হলো তখনো মনে হয়, তার জীবনে নাটকীয় কায়কারবার কেন ঘটে? সে তো এমন করে চায়নি। এ জীবন চাইনি। শর্মীকে সে চেয়েছিল। এই শর্মীকেই কি?

কাল প্রায় সারা রাত জেগে তদন্ত রিপোর্ট তৈরি করেছে কমল। কথা বলেছে বাদী-বিবাদী—দুপক্ষের সঙ্গে। অভিযোগের পাল্লা জিনিয়ার দিকে ভারী। আর তদন্তেও দেখা যাচ্ছে দোষটা জিনিয়ারই বেশি। জিনিয়া ও আদনান। কেস মূলত এই দুজনের। ওরা দুজনই কপিরাইটার। আদনান কাজ করছে আড়াই বছর। আর জিনিয়া এসেছে বছরখানেক।

অভিযোগটি আদনানই করল। লিখিত অভিযোগ। সহকর্মী জিনিয়ার বিরুদ্ধে। অভিযোগ এই যে জিনিয়া তাকে নিয়ে খেলছে, তাকে বিয়ে করার আশ্বাস দিয়ে, তার সঙ্গে মেশামেশি করে এখন ঘোরাচ্ছে। প্রমাণস্বরূপ মানবসম্পদ বিভাগের হাতে সে তুলে দিল একটি ভিডিও ক্লিপ। কমল ভেবে পায় না, জিনিয়াকে যদি আদনান ভালোবাসে, তাহলে কেন এমন অভিযোগ, ক্লিপ কেন দাখিল করল?

ক্লিপ নিয়ে বেশ কয়েক দিন অবিরাম তোলপাড় হচ্ছে অফিসে। চলছে কানাঘুষাও। ‘মেয়েটা খারাপ, ছেলেনাচানি মেয়ে আছে না, এ-ও তেমন। ছেলেটা তো ভালোই বেসেছে ওকে অথচ ও করল কী…ছিঃ।’—এসব কথা কানে কানে ঘুরতে ঘুরতে সরব হয়ে ওঠে অফিসে। দ্রুতই।

আরশাদ জামান অফিসের প্রধান নির্বাহী। বেশ রাশভারী লোক। কমলকে ডেকে বললেন, ‘কী হলো, দ্রুত ব্যবস্থা নিন। আমি চাই না এখানে কাজের পরিবেশ নষ্ট হোক।’ এ কথার পর আমতা আমতা করে কমল তাঁকে যা বলতে চাইল তার সারমর্ম এই, এটা পারসোনাল ম্যাটার, অফিসের এখানে হস্তক্ষেপ করা ঠিক হবে না। এতেই শোনা গেল আরশাদ জামানের চিৎকার, সে চিৎকারের ভেতরে কেবল স্পষ্ট হলো একটি বাক্য, ‘এটা এখন আর পারসোনাল ম্যাটার নয়। অফিসে লিখিত অভিযোগ করার পর সেটা কী করে পারসোনাল থাকে?’

ভিডিও ক্লিপটি সাকল্যে চার মিনিট আটত্রিশ সেকেন্ডের। সেখানে পাত্রপাত্রী হিসেবে দেখা গেল আদনান ও জিনিয়াকেই। তাদের একান্ত মুহূর্ত। জিনিয়া ও আদনান—পরস্পরের মুখের ভেতরে মুখ। মুখে মুখে ভাব বিনিময় চলছে। আদনান একসময় জিনিয়াকে বলল, ‘চলো, বিয়ে করে ফেলি।’ এরপর উত্তর কী হবে? মানবসম্পদ বিভাগের মধ্যম-ঊর্ধ্ব কর্তা হিসেবে তদন্তকাজ করতে গিয়ে ভিডিও ক্লিপটি দেখতে দেখতে টেনশন বাড়ছিল কমলের। তার বুক ঢিপঢিপ করে। নাটকীয়তার চূড়ান্তে গিয়ে জিনিয়ার গলায় মিহি হাসির রেশ, ‘করতে পারি বিয়ে, কিন্তু বিয়ের পর না পোষালে ইয়োর ওয়ে ইজ ইয়োর, মাই ওয়ে ইজ মাইন।’ সবশেষে ওর কণ্ঠজুড়ে তুফান মেইলের মতো হাসি। সে হাসি চারপাশে ভেঙে ভেঙে পড়ে, নিক্বণ ছড়ায়। খান খান করে দেয় চরাচর। যদিও ক্লিপটিতে আরও অনেক কিছু ছিল, অথচ কমল আটকে গেল ওই হাসিতে—বিশ্বস্ত কিংবা অবিশ্বস্ত হাসিতেই। এই হাসি তার খুব চেনা। হাসিটি অবিকল শর্মীর। পাঁচ বছর আগের শর্মী।

ফাস্টফুডের দোকানে সেভেন আপের শূন্য বোতলের দিকে চেয়ে কেমন যেন শান্তি শান্তি লাগে। আজ সকালে কমল আচম্বিতে তদন্ত রিপোর্ট যে কুটি কুটি করল, তারপর যে ওর মনে হলো, নাটকীয় মুহূর্ত আমাকে ছেড়েই যাচ্ছে না!— এমন মনে হওয়ার পরও কেন জানি তার ভেতরে এখন আর অস্বস্তি নেই।

বেয়াড়া দুপুর দুনিয়ার ভেতরে প্রবল বেগে মেলে দিয়েছে নিজেকে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত