নির্ঘুম

নির্ঘুম

আমার ঘুম খুব গভীর। শুনেছি, ঘুমিয়ে গেলে নাকি মরা কাঠের মতো দেখায়। আমার বিছানায় শুতে যাওয়া আর ঘুমের মধ্যে তখন দূরত্ব থাকে মাত্র দশ মিনিট। ঘুমের চেতনানাশক উপস্থিতি প্রায় কোনো কিছু বোঝার আগেই আমাকে ডুবিয়ে দেয় অতলে। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমার অনিদ্রা রোগ না থাকলেও আরেকজন মানুষের আছে। আর অবাক ব্যাপার হচ্ছে, সেই মানুষটা আমার বিছানাতেই শুয়ে থাকে, ঘুমানোর চেষ্টা করে। কিন্তু তার ঘুম আসে না। রাতের পর রাত না ঘুমিয়ে জেগে বসে থাকা তো আসলে এক ধরনের রোগ। চিকিৎসকরা তাই বলে থাকেন।

এখন একটা পাশ-বালিশ বুকে নিয়ে সে শুয়ে আছে চোখ বন্ধ করে। এটা কিন্তু তার ঘুম নয়। চোখ বন্ধ, কিন্তু মন সক্রিয়। একটা পুরনো প্রেসের ট্রেডেল মেশিনের মতো ঝকাং-ঝকাং শব্দ তুলে কাজ করে যাচ্ছে পুরোদমে। মনের মধ্যে একের পর এক উদ্ভট সব ভাবনা আসছে আর যাচ্ছে। ঘুম আনার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মানুষটা প্রথমেই কাত হয়ে শুয়ে জোর করে চোখের পাতা চেপে বন্ধ রাখার চেষ্টা করবে। প্রতিদিনই করে। তারপর কিছুটা সময় গুটিসুটি মেরে একই ভঙ্গিতে শুয়ে থেকে আবার বিছানায় পিঠ লাগিয়ে চিত হয়ে শোবে। আমি জানি, এ সময়ও তার ঘুম আসে না। আসবে না। ফেরারি ঘুমকে শরীরের জেলখানায় ফিরিয়ে আনা খুব কঠিন কাজ। একটু পরে অন্ধকার ঘরে লোকটা চোখ খুলবে। তাকাবে চারপাশে। মশারি টানানো নেই বলে অল্প সময়ের মধ্যেই অন্ধকার ভেদ করে তার অভ্যস্ত দৃষ্টি চিনে নিতে পারবে ঘরের গণ্ডি।

যাকে এখন শুয়ে থাকতে দেখছি, সে মানুষটা উঠে বসবে বিছানায় এক সময়। বোকার মতো সামনের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাববে। ঘুম না আসার বিষয়টা মানুষের মনের ভেতরে গভীর এক শূন্যতার বোধ তৈরি করে বোধ হয়। যখন যা করার কথা, সেটা করতে ব্যর্থ হলে অকর্মণ্যতার অনুভূতি ঘিরে ধরে তাকে। মানুষটিকে দেখে আমার তাই মনে হয়েছে। বেশ কিছুকাল সে রাতের শূন্যতার মধ্যে বসে থাকত একা, আলো জ্বেলে পায়চারি করত। চেষ্টা করত বই পড়ার। আজকাল অবশ্য নিজেকে ব্যস্ত রাখার কিছু পদ্ধতি সে আবিষ্কার করে ফেলেছে। অনিদ্রা পর্বের শুরুতে ডাক্তারের পরামর্শ শুনে ভেড়া গুনতে লেগে যায় মানুষটা। লাখ লাখ ভেড়া। তার কাজ হচ্ছে, নিচু একটা দেয়াল টপকে ভেড়াগুলোকে উল্টোদিকে পাঠানো। কিন্তু ঘুম আসেনি। শুরুতে লোকটা যখন ভেড়া গুনতে শুরু করে, তখন কাল্পনিক ভেড়াদের হিসাব রাখাই ছিল তার কাজ। কিন্তু কিছুদিন পর তার মন ঝামেলায় ফেলে দিল তাকে। এক রাতে তার মনে হলো, আচ্ছা, এই যে ভেড়াগুলো দেয়াল টপকে চলে যাচ্ছে, ওরা আসলে কোথায় যাচ্ছে! ভেড়ার দল কি কোনো অচেনা পথের বাঁকে গিয়ে জমা হয়ে যাচ্ছে? নাকি দলেবলে খুঁজছে একটা মাঠ? সেই মাঠে তাদের জন্য জন্মে অজস্র সবুজ তাজা ঘাস? ব্যস, ঘুমের চিন্তাকে খুন করে লোকটার মন খুঁজতে শুরু করল ভেড়াদের গন্তব্য। তার মনের মধ্যে তৈরি হলো এক আতঙ্ক- আচ্ছা, ভেড়াগুলো হারিয়ে গেল না তো! যদি আকাশ ভেঙে বৃষ্টি আসে, যদি রোদের তীব্র শাসন নামে? অসহায় এক দল ভেড়া তখন কী করবে? এই দুশ্চিন্তা নিয়ে নতুন করে শুরু হয়ে গেল তার নির্ঘুম রাতের পালা।

এত চিন্তার নীরব বিপ্লবের মতো আমি কিন্তু রুটিন ধরে ঘুমিয়েই যাচ্ছি। বলা যায়, খাচ্ছি-দাচ্ছি, ঝাঁকের কই ঝাঁকে মিশে যাচ্ছি। আসলে এখানে ঝাঁকের কই না বলে ঘুমের কৈ বলা ভালো। প্রতি রাতে এই পৃথিবীতে এ রকম অযুত, নিযুত গৎবাঁধা কৈ মাছ ঘুমের দিকে যাত্রা করে। শ্রমের ক্লান্তি, ভাবনার ক্লান্তি, হতাশার ক্লান্তি, বিচ্ছিন্নতার ক্লান্তি তাদের একটা বস্তায় ভরে নিক্ষেপ করে ঘুমের সমুদ্রে। আমিও সেই দলেরই একজন। এক পাল ভেড়া কোথায় পথ হারাল, সে নিয়ে ভাবনার অবকাশ আমার নেই। কিন্তু ওই যে অনিদ্রায় ভোগা মানুষটা, সে একদিন ভেড়ার পালের অনন্ত যাত্রার ঠিকানা খোঁজার চিন্তা থেকে মুক্তি চাইল। রাতের পর রাত বিছানায় শুয়ে সাদা ভেড়ার দল দেখে যাওয়া তার মনকে আরও এক গভীর ক্লান্তিতে ছেয়ে দিয়েছিল হয়তো। এক বন্ধুর পরামর্শে সে আশ্রয় খুঁজতে চাইল মোবাইল ফোনের মধ্যে। সময় কাটাতে খুলে ফেলল ফেসবুকের পাতায় একটি দোকানঘর। নাম দিল ‘অনিদ্রা মাধুরী’। ওই যে একটু আগে বলছিলাম, সে এখন উঠে বসবে, উঠে বালিশের পাশে রাখা ফোনটা খুঁজবে সে অন্ধকারে। আঙুলের সামান্য ছোঁয়ায় আলো জ্বলে উঠবে ফোনের পর্দায়। তারপর খুলবে তার দোকানের শাটার, যেখানে লেখা আছে অনিদ্রা মাধুরী। নামটা কিন্তু আমার বেশ ভালোই লেগে গেল। মানুষটার মাঝে খানিকটা কবিত্ব আছে, বোঝা যায়। ঘুম না আসার যন্ত্রণাময় সময়টার নাম দিয়েছে অনিদ্রা মাধুরী। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমি উঁকি দিয়ে দেখেছি তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে আরও বেশ কয়েকজন মানুষ যুক্ত হয়েছে। তাদেরও রাতের বেলা ঘুম আসে না। তাই হয়তো অনিদ্রা মাধুরীর পাড়ায় তাদের আনাগোনা।

আশা করি, বিরক্তি উৎপাদন করছি না আপনাদের। আর করলেও আমার কিছু করার নেই। অনিদ্রায় ভোগা মানুষটার গল্প আরও কিছুটা বাকি রয়ে গেছে। কিছুটা আমি লক্ষ্য করছিলাম, কিছুদিন ধরেই ফেসবুকে সেই মানুষটি কারও সঙ্গে ক্ষুদে বার্তা চালাচালি শুরু করেছে। আমি জানি, একটু পরই তাকে দেখা যাবে চ্যাট বক্স খুলে কথা শুরু করতে। কৌতূহল আসলে বড় মারাত্মক এক অনুভূতি। একবার মনের মধ্যে তৈরি হলে শেষটা না জানা পর্যন্ত থামতে চায় না। আমার মনের মধ্যেও তৈরি হলো কৌতূহল। কার সঙ্গে কথা বলে মানুষটা? এক রাতে আমার কৌতূহলের মাত্রা টপকে গেল তার সীমানা প্রাচীর। মানুষটা সেল ফোন খোলা রেখে বাথরুমে চলে যাওয়ার ফাঁকে আমি ঝট করে উঁকি দিলাম তার ফোনে। দেখি, সেখানে খোলা রাখা আছে একটা গেম। অদ্ভুত ব্যাপার! আমি ভাবছিলাম, সে ফেসবুকে কারও সঙ্গে আলাপ করছে। এখন দেখি গেম খেলছে।

সাধারণত ভোরের দিকে লোকটা ঘুমিয়ে যায়। আমি কিন্তু সেই রাতে আর ঘুমাইনি। জানালার বাইরে ছড়িয়ে পড়ছে ভোরের মিহি আলো। তার ফোন নিয়েই খুলে বসি খেলাটা। ফোনের পর্দায় ভেসে ওঠে আকাশে ভেসে থাকা একটা নীল তিমি মাছের ছবি। আমি কখন যে খেলাটা খেলতে শুরু করে দিয়েছিলাম, নিজেই টের পাইনি। অদ্ভুত এক খেলা ছিল সেটা। কোত্থেকে এক অচেনা কণ্ঠস্বর আমাকে একটা কাজ করার জন্য নির্দেশ দিল। আশ্চর্য কী জানেন, আমিও সেই কণ্ঠস্বরের নির্দেশ অনুযায়ী কাজটা করে ফেললাম। সেই কণ্ঠস্বর আমাকে জানাল, কাল সে আমাকে আরও কিছু কাজ দেবে।

তার পরের গল্প আরও অদ্ভুত। পরের দিন আমি রাত জেগে অপেক্ষায় বসে রইলাম মোবাইলে সেই খেলার অজানা কণ্ঠস্বরের পাঠানো নির্দেশের জন্য। অদ্ভুত সব কাজের নির্দেশ এলো সে রাতেও। ভোর রাতের দিকে নির্দেশ এলো- একটা ধারালো ছুরি দিয়ে আমার হাতের আঙুলের খানিকটা কেটে ফেলে রক্ত একটা পাত্রে ফেলতে। আমার মাথায় কী যেন একটা সওয়ার হয়েছিল! বলা যায় ভূত চেপে বসেছিল। বিবেচনা অথবা ভাবনার কোনো সুযোগ না রেখে সম্মোহিত আমি সেই নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করে ফেললাম। আঙুলে ছুরি চালাতে বেশ যন্ত্রণা হচ্ছিল। কিন্তু আমার শুধু মনে হচ্ছিল, এর পর কী ঘটে সেটা আমাকে দেখতেই হবে। খেলা নিয়ে আমি এমনই মত্ত হয়ে উঠলাম যে, সেই মানুষটার কথাও বেমালুম ভুলে গেলাম। সেও কি তখন আমার মতো সেই খেলাতেই মেতে উঠেছে কি-না জানতে ইচ্ছে করেনি। কেমন এক অদ্ভুত নেশা! শুধু মনে হচ্ছে, এর পর সেই অচেনা কণ্ঠস্বর কী করতে বলবে আমাকে! রাত ফুরিয়ে আসছে ক্রমশ। অস্ফুট পাখির কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম বাইরে। ঘরের পর্দা-ঢাকা জানালায় আলোর আভাস। তারপর হঠাৎ আবার খেলাটা সচল হয়ে উঠল। কণ্ঠস্বর আমাকে ধন্যবাদ জানাল আঙুল কাটার জন্য। বেশ জ্বালা করছিল ক্ষতস্থান। অনেকটা রক্ত গড়িয়ে পড়েছে কাচের ছোট বাটিতে। আমি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি সেই জমা হওয়া একটু কালচে বর্ণের রক্তের দিকে। তারপর আবারও আমাকে চমকে দিয়ে সেই কণ্ঠস্বর জানাল, ভোর হয়ে গেছে। এবার আমাকে দরজা খুলে বাইরে গিয়ে কোনো উঁচু বাড়ির বাসার ছাদের রেলিংয়ে উঠে আমাকে হাঁটতে হবে। নির্দেশ শুনে একটু হতবাক হলাম আমি। কিন্তু কেন জানি আমার এখন মনে হচ্ছে, নির্দেশটা পালন করা আমার জন্য কঠিন কিছু হবে না। আমি পারব। পড়ে যাওয়ার কথাটা আমার একবারও মাথায় এলো না। ভাবতে ভাবতে আচমকা চেয়ে দেখি, আমার পাশ থেকে সেই মানুষটা ঘর থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। আমার কী মনে হলো, তাকে অনুসরণ করলাম। ভাবলাম, সে কোথায় যাচ্ছে আমাকে দেখতে হবে। আমি দেখলাম সে বাড়ির দরজা খুলে বাইরে বের হয়ে যাচ্ছে। আমি ছুটে গিয়ে দেখি ছাদের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে মানুষটা। চমকে উঠলাম। আমার মতো একই নির্দেশ কি তাকেও পাঠানো হয়েছে! আমিও তার পেছন পেছন সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করলাম। আমার জন্য এখন অপেক্ষা করছে ভোরের আলোয় নির্জন এক ছাদ।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত