চন্দ্রবিন্দু

চন্দ্রবিন্দু
বাবা নিশ্চয়ই তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে সুখী ছিলেন তাই আমাদের খোঁজ-খবর নেবার প্রয়োজনটুকু বোধ করেন নিড়। আমরা কিন্তু বাবার অনুপস্থিতি সহজেই মেনে নিতে পারছিলাম না। বাবা মদ খেত, মায়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করত, সন্তানদের কড়া শাসনে রাখত তবু বাবা তো বাবাই। বুকের ভেতর একটা অংশ আশ্চর্যরকমের ফাঁকা ফাঁকা লাগত। আমি,মা,তপন তবু কোথাও কেউ নেই। ছুটে গিয়ে জানতে ইচ্ছা হত,
-বাবা তোমারও কি এমন হয়? আমাদের কথা মনে পরে? কত অনু্ভূতি শূন্যতা ছুঁয়ে বিলীন হয়। আমার দুঃখ হত,তপনের রাগ আর মায়ের মুখ ভাবলেশহীন।কাকডারা ভোরে উঠে লাইনের কল থেকে দুইটা রঙের ড্রাম ভরে নিজের গোসল,কাপড় ধোয়া সেরে ফিরে আসেন। সকালের নাস্তায় লাল আটার রুটি আর একটুখানি গুড় দিয়ে দিয়ে মা লজ্জায় আমাদের চেহারার দিকে তাকাতে পারেন না।বরাবরই মা রান্না করতে ভালোবাসে। গোশত-পরোটা থাকলেও মা ডিম পোচ করে এনে অনুনয়ের স্বরে বলতেন,
-আরেকটা পরোটা খা৷ ছেলেরা ভোজনবিলাসী হলেও মায়েরা ভাবে ওর কি এত কম খেয়ে পেট ভরে! আমার মাও সেই একই স্বভাবের। বাবার কোর্য়াটার ছেড়ে এসেছি ছয় মাস।একটা শুক্রবারেও ভাড়া বাসায় এক টুকরো মাংস খাওয়া হয় নাই। তপনটা জুম্মার নামাজ পড়ে পা চালিয়ে বাড়ি ফিরত শুধু গরুর গোশতের ঝোল মেখে ভাত খাবার লোভে। ইদানীং মা ঝালঝাল করে ডিম ভুনা করলেও খুশিতে আত্মহারা হই। বুঝতেই পারছেন আমাদের আর্থিক দৈন্যতা। মায়ের জমানো গহনা একে একে বিক্রি হতে লাগল। কিন্তু তিনি তার ভাইদের একটা চিঠি লিখেও জানালেন না। বছরখানেক ছোটমামা খোঁজ-খবর না পেয়ে বাবার কোর্য়াটার থেকে সরাসরি আমাদের খুপচিতে হতবাক হলেন।
-আপা, তুই আমাদের কিছু জানাস নাই কেন? এতটা পর করে দিলি। তুই কোন বংশের মেয়ে ভুলে গেছিস? ব্যাটাকে জেলের ভাত খাইয়ে ছাড়ব। মা কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে মামার জন্যে ডিম ভাজেন, বেগুন পুড়িয়ে ভর্তা করেন। তপনকে বাজারে পাঠান মামার প্রিয় রুপচাঁদা মাছের শুটকি আনার জন্যে। মা এমন কেন! লোকজনকে খাইয়ে উদরপূর্তি করা ছাড়া মায়ের জীবনে আর কোনোই ইচ্ছা-আকাঙ্খা নাই।মামা খেয়েদেয়ে বিকেলে বিদায় নিলেন। যাবার সময় কিছু টাকা মায়ের হাতে ধরিয়ে দিতেই মা অন্ধকারমুখে টাকাগুলো আঁচলে বেঁধে ফেললেন।মামা বললেন,
-আমি প্রতিমাসে এসে তোদের দেখে যাব।
-দরকার হলে আমি চিঠি লিখব। তোদের কষ্ট করে আসতে হবে না। তপন খুব রাগ করল।
-মা টাকাগুলো না নিলেই কি হত না? আমরা তো আছি। মা কিছু না বলে চালের ড্রাম ঢাকনা খুলে দেখাল। কয়েকটা মুঠো চাল এক বেলার খাবার হবে না। আমি কিছু বললাম না। তপন খুব কাঁদল।
-মা,চলো আমরা ফিরে যাই। মা মৃদু হেসে উত্তর দিল,
-আমার জীবন থাকতে তো নয়ই।
আমরা দেখছিলাম আমাদের মা শুকিয়ে যাচ্ছে। হাতের এক গাছি সোনার চুড়ি, কানের দুল একে একে বিক্রি করতে করতে মায়ের নিজেরও যেন অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাচ্ছিল।সেকেলে বাঙালি গৃহিনীদের পরিচয় মিসেস তিনি এবং অমুকের আম্মা ছাড়া তো আর বিশেষ কিছু নয়। তাই লক-আপের গহনা আর আলমারির রঙবেরঙের শাড়ি ছাড়া যাকে বলে সহায়সম্বলহীন। দেখছিলাম দিনকে দিন দেয়ালে আমাদের পিঠ ঠেকে আসছে। কোনোরকমে সেকেন্ড ইয়ারের পরীক্ষা শেষ হল তপনের এসএসসি দুই বছর মা শুকিয়ে কাঠ। রঙজ্বলা পুরানো কাপড় আর নাক,কানের গহনা ছাড়া মায়ের গায়ের রঙ আরো বেশি ফ্যাকাসে দেখায়। আমি ততদিনে দুটোর বদলে চারটে টিউশনি করাই উন্নতি বলতে এই এতটুকুই। তপন ঘর ছেড়ে বেরোয় না। চেয়ারে উবু হয়ে বসে পড়ার টেবিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেয়। একদিন ডেকে জিজ্ঞেস করলাম,
-পরীক্ষা তো শেষ। এত রাত জেগে কি পড়িস।
-ফিজিক্স ফার্স্ট পেপারে চোখ বুলিয়ে যাচ্ছি৷ ভাইয়া ক্যালকুলাস কি খুব কঠিন?
-না, সমস্যা হলে আমি তো আছিই।
তার কয়েকদিন পর শুক্রবার মাদুর পেতে দুই ভাই খেতে বসেছি। ভাতের প্লেটে মুরগীর রান আর ঝোলসমেত দুই টুকরো আলু দেখে মায়ের দিকে তাকালাম। আমি বাজাে থেকে মাংস কিনে আনি নাই আর শাক,ডাল খেতে খেতে বেমালুম ভুলে গেছি আমিষ কি জিনিস! মা ফিক করে হাসলেন,
-তুই ভুলেই গেছিস আজ তোর জন্মদিন। খাওয়া শেষ করে মায়ের পা ধরে সালাম করলাম।মা দুইভাইকে জড়িয়ে ধরে প্রাণ ভরে দোয়া করলেন। তারপর দুজনের হাতে চকচকে একশ টাকার নোট গুঁজে দিলেন। অন্য সময় অনেক প্রশ্ন করতাম মা টাকা আর বাজার খরচ কোথায় পেলেন! হয়ত স্যাকরার দোকানে আরেকটা চুড়ি বিক্রি করে এসেছেন কিন্তু ভাঙনের গল্প শুনতে ইচ্ছা হচ্ছিল। সারারাত রিমঝিম বৃষ্টি হল।মা খাটে উপর কাঁথা গায়ে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে।ঘুমন্ত মায়ের মুখটা কেমন মলিন লাগছিল। আমি আর পতনের পাশাপাশি বসে কিন্তু দৃষ্টি মায়ের দিকে। আমি বললাম,
-তপন, তোর মনে আছে আমরা কোর্য়াটারে থাকতে মা বৃষ্টি নামলেই বাচ্চা মেয়েদের মত ভিজতে ছাদে চলে যেত। আমার অনেক টাকা হলে মাকে লম্বা বারান্দার বাড়ি বানিয়ে দেব। মা বারান্দায় বসে বৃষ্টির শব্দ শুনবে।
তপন বলল,
-আর আমি মাকে নিয়ে সুইজারল্যান্ড যাব তারপর মরিশাস, নরওয়ে..
-বউকে সাথে নিবি না? ফোঁড়ন কাটলাম।
-দুর। আমি কখনও বিয়েই করব না।
তপন লজ্জা পেল। আমরা দুইভাই ঘুমাতে গেছিলাম মাকে নিয়ে একটা রঙিন ভবিষ্যতের নিয়ে কিন্তু পরদিন আবিষ্কার করলাম পৃথিবীর কোনো শক্তি এসে মাকে আর জাগাতে পারবে না। মা মারা গেছেন। এত বছর পরে এসে কত নিঃসঙ্কোচে শব্দ তিনটি উচ্চারণ করতে পারলাম। সেদিন মুখ ফুটে মা বলে ডাকার শব্দটুকুও ছিল না।কত অপরিচিত মুখ আমাদের সাহায্যের জন্যে এগিয়ে এসেছে। কেউ মাথায়-পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। তপন মেঝেতে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদছে। মামারা খবর পেয়ে এসেছেন। এক কোণায় বাবা নামক জন্তুটিকেও দেখলাম। গম্ভীরমুখে আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন। বললেন,
-ডাক্তার বলল, হার্ট অ্যাটাক। ঘুমের ঘোরে মাঝরাতেও চলে গেছে।তোরা কিছু টের পাস নাই? আফসোস! আমি কেন তপনের মত সাহসী হলাম না নয়ত সেদিন কলার চেপে ধরে চিৎকার করতে পারতাম,
-মায়ের মৃত্যুর জন্যে দায়ী শুধু আপনি! নরকের কীট! ছোট্ট ঘরখানা গিজগিজ করছিল লোকজনে। তবু আমাদের নিজেদের বড্ড অসহায় লাগছিল।মা নেই পায়ের তলা থেকে জমিন সরে গেছে। তপন চোখ মুছতে মুছতে আমার কাছে এল।
-ভাইয়া দেখে যাও।
দেখলাম, ভাতের আলমারিতে ঢাকনা চাপা কালকের খানিকটা মুরগির মাংসের তরকারি।আজকে আমাদের পাতে তুলে দেবেন তাই এক টুকরোও মুখে দেন নি। আর হরলিক্সের কৌটায় বেশ কিছু একশ টাকার নোট আর মায়ের দুগাছি সোনার চুড়ি। লুকিয়ে রাখা শেষ সম্বল। এই এখানেও মায়ের স্পর্শ লেগে আছে। বালিশের কুশানে সুঁই-সুতোর কাজ করা পদ্ম ফুলে, হাড়ির পান্তা ভাতে,পতনের শার্টের ছেঁড়া বোতামের ডগায়। বড় মামা এসে ডাকলেন,
-তোরা আয়। তোর মাকে গোসল করাতে হবে। আমি শার্টের হাতায় চোখ মুছে এগিয়ে যেতে লাগলাম। তপন আমায় কাঁধ ধরে থামাল।
-ভাইয়া,তুই আর কিছুক্ষণ পরে যা। মা তাহলে আরো কিছুটা সময় আমাদের কাছে থাকবে।
যতদূর জানি শাহজাহান সিদ্দিকী নামের একজন সাবেক পুলিশ অফিসারের সাক্ষাৎকার দেশের জনপ্রিয় পত্রিকায় ফলাও করে প্রচার হয়েছে।তার এক ছেলে সুইজারল্যান্ডের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার আরেক ছেলে এফসিপিএস ডাক্তার। অথচ ভদ্রলোকের জায়গা হয়েছে বৃদ্ধাশ্রমে। তার প্রথমা স্ত্রীর মানসিক সমস্যায় ছিল বিধায় তিনি সন্তানদের লালন-পালনের জন্যে দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন। সেই মা পক্ষাঘাতে পাঁচ বছর ভুগে মারা গেছেন। জলের মত টাকা খরচ হয়েছে। দুই সন্তান কৃতজ্ঞতাস্বরুপ আর্থিক সাহায্য করা তো দূরের কথা তাদের ছোট মায়ের মৃত্যুতে একটা ফোনকলও করে দেখে নি। এপর্যায়ে শাহজাহান সিদ্দিকীর চোখ গড়িয়ে কয়েক ফোঁটা জল গড়ায়। আর চতুর সাংবাদিক সেই মুহূর্তটাকেই ক্যামেরায় ধারণ করে নেয়। তপন আমায় রোজ ফোন করে রাত বারোটা নাগাদ। আজ সন্ধ্যা নাগাদ ফোন করে খুশি খুশি গলায় বলল,
-ভাইয়া, সোশ্যাল মিডিয়ায় পাবলিক তো আমাদের দুই ভাইকে তো ধুয়ে ফেলছে। আমরা কুলাঙ্গার, মানুষের বাচ্চা না।
-মিথ্যা বলে নাই। আমাদের জন্ম মানুষের ঔরসে হয় নাই। তপন কিছুক্ষণ হো হো করে হাসল।
-ভাইয়া, তুই কি জানিস কারো কথাতেই আমার কিছু আসে যায় না।
-কেন?
-মায়ের মৃত্যুর পর আমার সব সার্টিফিকেটে মায়ের নামের পাশাপাশি বাবার নামেও লেখা মরহুম শাহজাহান সিদ্দিকী। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে উত্তর দিলাম,
-আমিও তাই মনে করি।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত