শাড়ি

শাড়ি
আজ তের বছর আমি শাড়ি পরি না। মাঝে মাঝে রাতের বেলা আলমারি খুলে একটা শাড়ি বের করি। বেগুনি রঙের তাঁতের শাড়ি। নীল পাড়। সেটা বুকে চেপে ধরি । সেটার ভাঁজ খুলি। উলটে পালটে দেখি। আবার ভাঁজ করি। কোন কোন দিন এসব করতে করতে কেঁদে ফেলি। তখন ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যায়। রাত ভোর হয়ে এলে ঘুমিয়ে পড়ি। শাড়ীটা বুকের উপর পড়ে থাকে। তের বছর আগে জুলাই মাসের ছয় তারিখে জীবনে প্রথম শাড়ি পরেছিলাম। সেদিন আমাদের আছিয়া স্মৃতি গার্লস স্কুলে কবি আল মাহমুদ এসেছিলেন। এস এস সি তে কৃতী মেয়েদের পুরষ্কার তুলে দিতে । আর সেই সাথে যারা ক্লাস এইটে বৃত্তি পেয়েছে তাদেরও। তালিকায় আমিও ছিলাম, এইটে বৃত্তিওয়ালিদের দলে।
আমাদের মফস্বলের বর্ণগন্ধহীন ম্যাড়ম্যাড়ে স্কুলে হঠাৎ করে যৌবন ঝলমল করে উঠেছিল।। আমরা ক্লাস নাইন-টেনের সব মেয়েরা শাড়ি পরেছিলাম। আমার শাড়িটা ছিল আমার মায়ের। বাইরে যাবার মত মার একটাই শাড়ি ছিল। সেই শাড়ি যে আমার বাবা কবে কিনেছিলেন তা আমরা ঠিক জানি না। মে মাসে জানানো হল এস এস সি রেজাল্টের পরে আমাদের স্কুলে একটা বড় প্রোগ্রাম হবে। দেশ বরেণ্য কবি আসবেন। আমাদের তখন সেকি উত্তেজনা শুরু হল! আমরা নাইন-টেনের মেয়েরা সিদ্ধান্ত নিলাম, আমরা শাড়ি পরে আসব। আমি তখনো শাড়ি পরতে জানতাম না। আলমারি খুলে মায়ের শাড়িটা বের করলাম। মায়ের সামনে গিয়ে পরার চেষ্টা করতাম। মা শুয়ে শুয়ে আমাকে দেখিয়ে দিতেন। শাড়িতে কুচি দেওয়া আমার হয়েই উঠত না। মা তার শীর্ণ দু হাত দিয়ে ঠিক করতেন। মার দেখাদেখি আমি নিজে চেষ্টা করতাম। আবার চেষ্টা করতাম। এভাবে প্রতিদিন করতাম।
মা সারাদিন শুয়ে থাকতেন। আমরা ছোট বেলা থেকেই দেখতাম মা বেশির ভাগ শুয়ে থাকেন। তাই মার শুয়ে থাকা আমাদের কাছে ছিল স্বাভাবিক। সে সময় আরো বেশি শুয়ে থাকতেছিলেন। সেটা আমি ছাড়া বাসার সবাই টের পেয়েছিল। আমি ছাড়া মানে বাবা আর ভাইয়া। ভাইয়া তখন কলেজে পড়ত। বাবা তহশিল অফিসে ছোটখাট একটা চাকরি করত। মা শুয়ে থাকত। কারণ মার ছিল হাঁপানি। হাঁটুতে ব্যাথা। ব্যথায় মা হাঁটতে পারত না। মাঝে মাঝে একেবারে দম বন্ধ হয়ে এলে তখন মাকে ইনহেলার দিতে হত। এই জন্য বেশির ভাগ সময়ে মা শুয়ে থাকত আর শুয়ে শুয়ে কামারের দোকানের হাঁপরের মত করে নিঃশ্বাস নিত। আমরা ভাইবোন মাত্র দুজন। কেরানির সংসারেও আমরা সম্ভবত এক সময় খুব হাসিখুশি জীবন যাপন করতাম। আমাদের ঘরে একটা ছবির এলবাম ছিল। একবার বাবা আমাদেরকে নিয়ে কক্সেস বাজার ঘুরতে গিয়েছিলেনে।
(আমার একটুও মনে নাই।) এলবামে সেই ছবি দেখতাম। সাগরের তীরে ছুটাছুটি করছি আমি আর ভাইয়া, পিছু পিছু ছুটছে বাবা-মা। আরেকটা ছবিতে বাবার কোলে আমি। এই সব ছবি দেখতাম আর আমার খুব কক্সেস বাজারে যাওয়ার ইচ্ছে করত। ইচ্ছে হত আমি আর ভাইয়া ছুটাছুটি করি। কেউ সেই ছবি তুলুক। আমাদের যাওয়ার মত অবস্থা আর ছিল না। কেরানি বাবা আমার অসুস্থ মার চিকিৎসা করাতে পারছিলেন না। মার জন্য মাসে হাজার হাজার টাকার ঔষধ লাগত। ডাক্তার দেখাতে হত। আমরা ভাই বোন পড়া লেখা করতাম। আর স্কুল কলেজ থেকে ফিরে এসে মায়ের পাশে বসে বসে কষ্ট দেখতাম। বাবা অফিস থেকে ফিরে মন-মেজাজ খারাপ করে থাকতেন সব সময়। মাকে ঢাকা নিয়ে গিয়ে ভাল চিকিৎসা করানো ছিল জরুরী।
সে ক্ষেত্রে অনেক টাকা প্রয়োজন হত। চিকিৎসার অনেক দিন ঢাকা থাকতে হত। সেই সময়ে থাকা খাওয়ারও জোগাড় করা লাগত। সেখানে আমাদের থাকার মত তেমন কোন আত্মীয় স্বজন ছিল না। ঢাকায় এক মাস থাকতে গেলেও নাকি অনেক টাকা দরকার পড়ে। কত টাকা – সে সম্পর্কে আমার কোন ধারনাও ছিল না। বাবা দিনকে দিন কেমন যেন হয়ে যাচ্ছিল। একটু থেকে একটু কমবেশি হলেই চিৎকার চেঁচামেচি। মা তখন কোঁকাতে কোঁকাতে ভাইয়াকে ডেকে বলবে, রবি, তোর বাবার কি লাগে একটু দেখ। ভাইয়াকে দেখলে বাবার মেজাজ আরো খারাপ হত। আমি বাবার কাছে গেলে কি কারনে যেন বাবা চুপ হয়ে যেত।
কিন্তু বাবাকে ঠাণ্ডা করার জন্য মা কখনোই আমাকে ডাকত না। ভাইয়াকে ডাকত। ভাইয়া বেশির ভাগ সময় বাসায় থাকত না। টিউশনি করে বেড়াত। কোচিং করাত। একটা টাকা খরচ করত না। পুরা কলেজ লাইফ কাটিয়ে দিয়েছিল একটা জামা গায়ে দিয়ে। লুবনা একদিন আমাকে বলেছিল, “তোর ভাইয়ার মত কিপটুস আমি আমার জীবনে দেখিনি। ব্যাচের পর ব্যাচ পড়ায় একটা টাকা খরচ করে না। আজীবন লর্ড ক্লাইভের আমলের একটা জামা পরে ঘুরে বেড়ায়। কিপটুস জীবনে বহুত দেখেছি। এমন কিপটুস দেখিনি।” এই রকম অনেক কথা আমাকে শুনতে হত। প্রথম প্রথম কষ্ট হত। পরের দিকে সয়ে গেছে। স্কুল থেকে মেয়েদেরকে নিয়ে প্রতি বছর পিকনিকে যেত। আমি কখনো যেতাম না। যে ঘরে মা রোগে শুয়ে থাকে, বাবা যার কেরানি তাকে পিকনিকে যেতে হয় না। এই সব কথা আমাদেরকে কেউ শেখায়নি। কিন্তু আমরা শিখে গিয়েছিলাম। একবার আমি ভাইয়াকে বললাম, “ভাইয়া আমাকে কিছু টাকা দাও। স্কুলের পিকনিকে যাব।” ভাইয়া বলল, “একটা থাপ্পড় দিয়ে দাঁত ফেলে দেব। পিকনিক! এইসব ঢং কে শিখাইছে?”
আমাকে বকে টকে ঘরের পেছনে গিয়ে সে ফ্যাঁস ফ্যাঁস করে কান্না শুরু করল। সেই কান্না আমি আমার জানালার ফাঁক দিয়ে দেখেছিলাম। আমি কাঁদিনি। কারণ আমি জানতাম আমরা দুজনেই চরম অভিনয়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলাম। ভাইয়া টিউশনির একটা পয়সা খরচ করত না। টাকা জমাত। সে টিউশনির টাকা জমিয়ে জমিয়ে মার চিকিৎসা করবে। মাকে ঢাকা নিয়ে যাবে। বড় ডাক্তার দেখাবে। এই ছিল তার ধ্যান জ্ঞান। আর আমিও পিকনিকে যাওয়ার জন্য তার কাছে টাকা চাই নি। ভেবেছিলাম সে টাকা দিলে পিকনিকে না গিয়ে, সেটা দিয়ে তার জন্য একটা জামা কিনব।
এই দূর্দশা দূর্দিনের মধ্যেও একটা বিষয় ছিল প্রশংসনীয়। আমরা ভাইবোন দুজনেই ছাত্র হিসেবে ছিলাম বেশ উঁচু মানের। আমরা ক্লাসের শুরুর দিকেই থাকতাম। ভাইয়া সারাদিন টিউশনি করাত আর নিজের পড়ালেখা করত, আর অকারনে বাবার বকা সহ্য করত। আমি ঘুম থেকে উঠে নাস্তা তৈরি করতাম। রান্না বান্না করতাম। এইসব করতে করতে কোন কোন দিন আর স্কুলে যেতে ইচ্ছে করত না। সেদিন যেতাম না। কোন দিন বাবা এসে এসব কাজে আমাকে সাহায্য করত। আর জিজ্ঞেস করত, “তোর মায়ের আজকে কি অবস্থা?” আমি বলতাম, “ভাল”। আমরা দুজনেই জানি মায়ের আসল কন্ডিশন কি। তবুও বাবা আমার কথায় যেন আশ্বস্থ হতে চাইত। যখন বলতাম ভাল, তখন তিনি যেন বিশ্বাস করতেন আসলেই ভাল।
তারপর রঙচটা কুঁচকানো জামাকাপড় গায়ে দিয়ে অফিসে চলে যেতেন। বাবার জুতা জোড়াতে কয়টা তালি আছে সেটা গুনে শেষ করা সম্ভব ছিল না। সেই জুতা সেলাইয়ের কাজও বাবা নিজেই করতেন। অথচ তহশিল অফিসে কত টাকার ছড়াছড়ি। তহশিল অফিসে কেন তার আশেপাশে একটা ঘুরান দিয়ে আসলেই মাসের রুজি হয়ে যায়। আর আমার বাবার পরিবার বিনা চিকিৎসায় শুয়ে শুয়ে কাতরায়। লুবনার বাবা আর আমার বাবা একই চাকরি করতেন। অথচ লুবনাদের কত সুখ! লুবনার জামা কাপড়ের শেষ ছিল না। বাসায় কত সৌখিন জিনিস পত্র। একটা বাঘের মূর্তি ছিল লুবনার ঘরে, দেখে মনে হত এক্ষুনি লাফিয়ে পড়ে ঘাড় মটকাবে। লুবনার একটা ছোট ভাই ছিল, তার যত খেলনা ছিল, আমরা অত বিস্কিটও মনে হয় খাই নাই। লুবনা গান শিখত, বাসায় গানের মাস্টার এসে তালিম দিত। ভাইয়ার কাছে অংক শিখত। ভাইয়া বলে, তার মাথায় কিছুই নাই। আমিও জানি কিছুই নাই। গানের গলাও নাই। তবুও স্কুলের বার্ষিক ফাংশানে একটা হারমোনিয়াম নিয়ে এসে ফ্যাঁ-ফোঁ করবেই।
একদিন বাবা একটা নতুন জামা নিয়ে এসে চুপি চুপি আমাকে বলল, তোর ভাইয়াকে দিস। আমি বললাম, ভাইয়ার জন্য জামা কিনেছ শুনলে ভাইয়া রাগ করবে। বলবে, টাকা নষ্ট করেছ। বাবা বলল, “আরে না, আমার বহু দিনের পুরনো এক বন্ধু, কামরুল, লিবিয়া থেকে পাঠিয়েছে।” “তোমার জন্য পাঠিয়েছে তুমি গায়ে দাও। ভাইয়াকে দিচ্ছ কেন? তোমার জামা দরকার বেশি। যে বিশ্রী রকমের কাপড় পরে অফিসে যাও!” “আমার অফিসে সবাই এরকমই পরে। ছেলেটার কোন জামা কাপড় নাইরে। ওর বয়সি ছেলেরা কত রঙ-বেরঙের জামা কাপড় পরে। কত ফূর্তি করে।”
ভাইয়াকে যখন জামাটা দিলাম তার চোখে পানি চলে এসেছিল। হয়ত তার আদরের দিনগুলো মনে পড়ে গিয়েছিল। আমাকে বলল, “জানিস, একবার নাজমুলের গায়ে একটা জামা দেখে ঈদের আগে সেটা কেনার জন্য বায়না ধরেছিলাম। বাবা সারাদিন চৌমুহনী বাজার খুঁজে খুঁজে আমাকে সেই জামা কিনে দিয়েছিল। কোন দোকানেই পাওয়া যায় না। আমাকে আরো সুন্দর সুন্দর দামী দামী জামা দেখায়। কিন্তু আমি নাছোড় বান্দা আমার ওটায় লাগবে। বাবা আমার হাত ধরে দোকানে দোকানে ঘুরে ঠিকই জামাটা কিনে দিল।” আমাদের সুখের দিন গুলো, যখন মা অসুস্থ হয় নাই, ভাইয়া দেখেছে। আমার সেসব দিন মনে নাই। আমার কাছে আছে শুধু একটা ছবি। কক্স’স বাজার সমুদ্র সৈকতে আমাদের ঘুরাঘুরি। আর কিছু মনে নাই। ভাইয়ার মনে আছে সব কিছু। সে বলত, আমি নাকি পানি-বালি খেয়ে একাকার করে ফেলেছিলাম।
সেই এতটুকু বয়সে আমরা সাংসারিক বিষয়ে ঝুনা হয়ে গিয়ে ছিলাম। মায়ের শীর্ণ হাত। হাঁপরের শব্দ। বাবার ছেঁড়া জুতা আমাদেরকে আমাদেরকে পাকা সংসারী করে তুলেছিল। ভাইয়ার বয়সী ছেলেরা যখন ক্রিকেট ব্যাট হাঁকাচ্ছে না হয় পাড়ার কোন মেয়েটা সুন্দরী সেই গবেষণা করছে, প্রেমপত্র ফাঁদছে কিংবা কলেজের ফাংশনে কবিতা আবৃত্তি করছে, সে তখন এক বাসা থেকে আরেক বাসায় ছুটছে। আর আমার বয়স কতটুকু ছিল। শৈশব কি জিনিস সেটা তো আমি জানিই না। কলি থেকে ফোটার আগেই আমি বাবার সংসারের কর্ত্রী হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু ক্লাস এইটে বৃত্তি পাওয়ার পর হঠাৎ করে আমার উপরে শৈশব এসে ভর করল। না, ঠিক বৃত্তি পাওয়ার পর না।
কবি আল মাহমুদ আসার খবরে আমি শিশু হয়ে গিয়েছিলাম। আমি লুকিয়ে লুকিয়ে আবৃত্তি করা শুরু করলাম,
ট্রাক ট্রাক ট্রাক ট্রাকের মুখে আগুন দিতে মতিয়ুর কে ডাক কোথায় পাব মতিয়ুরকে ঘুমিয়ে আছে সে তোরাই তবে সোনা মানিক আগুন জ্বেলে দে। আল মাহমুদের সামনে আমি আবৃত্তি করব। বান্ধবীদের সাথে আমিও শাড়ি পরে স্কুলে যাব। এতসব ঘটনা আমার জীবনে কখনো ঘটেনি। উত্তেজনায় আমার চোখে ঘুম আসত না। মায়ের হাঁপরের শব্দ বেড়ে গেল। ভেবেছিলাম এ তো নৈমত্তিক বিষয়। আমি শাড়ি পরা শিখি। আর বলি, ‘শুয়োর মুখো ট্রাক এসেছে/ দুয়োর বেঁধে রাখ। ’ বাবা-ভাইয়ার চোখে-মুখের চাঞ্চল্য আর টেনশন আমার চোখে ধরা পড়ে না। ভাইয়া কত টাকা জমানো হল হিসাব করে। তারা বাপ-বেটা পরামর্শ করে কিছু ধার-দেনা করে ঢাকায় যাবে। ডাক্তারের খোঁজ খবর করে। আমি বেখবর থাকি।
সেই আলোয় ঝলমলে ছয় জুলাই আমি শাড়ি পরে মাকে সালাম করে স্কুলে গেলাম। আল মাহমুদের হাত থেকে একটা ক্রেস্ট পেলাম। আল মাহমুদ আমাকে বলেছিলেন, ‘তুমি তো মেয়ে, পরীর মতো আবৃত্তি কর’। সেই ক্রস্ট হাতে দৌড়াতে মার কাছে ছুটতেছিলাম। মাকে দেখাতে হবে। মার শীর্ন হাত ধরে সারাদিনের গল্প করতে হবে। ভাবতেছিলাম আমার আনন্দ নিশ্চয় মায়ের মুখে ছড়িয়ে পড়বে। বাড়িতে পৌঁছে দেখি দুনিয়ার মানুষ। কান্নাকাটি। মার অসুখ বেড়ে গেছে নিশ্চয়। আমি মা মা করতে করতে পাগলের মত ছুট দিই। বাবা আর ভাইয়াকে দেখি না কোথাও। মা তখন ড্রইং রুমের ফ্লোরে চাদর মুড়ি দিয়ে শোয়ানো। উত্তরে মাথা। পাগুলো দক্ষিণে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত