পারফেক্ট বাবা হবার গল্প

পারফেক্ট বাবা হবার গল্প
আজ তো ছুটির দিন, বিরিয়ানি রান্না করলে কেমন হয়? না মানে, করতেই হবে এমন না, করতেও তো পারো! ” স্পর্শের এমন কথা শুনে কিছুটা বিরক্ত আর অবাক হয়ে তার দিক তাকাই। স্পর্শ তখন মুখ ফিরিয়ে সঞ্জনার সাথে খেলায় মন দেয়। সঞ্জনা, আমাদের মেয়ে, আদর করে সঞ্জু বলে ডাকি। নামটা ওর বাবারই রাখা, আর মেয়েটাও খুব বাপ নেউটা হয়েছে। তবে হবার কারণ আছে, স্পর্শও মেয়েকে খুব ভালবাসে। স্পর্শ আগে অনেক বাচ্চামি করতো, ওর এই আদর্শ বাবা হবার গল্পটা একটু অন্যরকম। ” মাম্মাম, বিরিয়ানি! ” তিন বছরের সঞ্জু, মোটামুটি সবই বলতে পারে, তবে ভাঙা ভাঙা আর তোতলানো।
– নেও, আর কি করার! বাপ মেয়ে যখন আবদার করেছো, করতেই হয়। যাই দেখি কি কি আছে!
– সঞ্জু, মাঝে মাঝে নরম হতে হয়, নরম হলে অনেক কিছু পাওয়া যায়।
– মেয়েকে কি পাঁচ বছরে পিএইচডি করায় ফেলবে তুমি?
– আমার মেয়ে, আমি যা ইচ্ছা বানাবো, তুমি বলার কে শুনি?
– থাক বাবা, এর মধ্যে গিয়ে কাজ নেই। আমি রান্নাঘরে যাই।  স্পর্শ আর সঞ্জুকে খেলতে দিয়ে রান্নাঘরে যাই, হাজার হলেও মেয়ের বাবা মুখ ফুটে কিছু আবদার করেছে।
স্পর্শ আর আমার ভালবাসার বিয়ে, পাঁচ বছরের ভালবাসার চড়াই-উতরাই পার করে আমাদের বিয়ে হয়। বিয়েটা পারিবারিক ভাবেই হয়। এর জন্য স্পর্শ অনেক কষ্ট করেছে, বলতেই হয়। আমাদের বিয়ের বয়সও পাঁচ বছর পার হয়েছে। ভালবাসার সময়ে স্পর্শ আমাকে কম সময় দিতো, সব সময় বন্ধুদের নিয়ে মেতে থাকতো। ভেবেছিলাম বিয়ের পর হয়তো ঠিক হবে। নাহ, বিয়ের পরেও তার সেই বন্ধুর টান গেলো না। আমি অবশ্য এ নিয়ে হিংসা করছি এমন নয়, তবে আমি যে তার স্ত্রী, আমার মন আছে, সখ আছে, এগুলো কম দেখে সে। সারাদিন অফিস আর সন্ধ্যায় বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে রাত নয়টা দশটায় বাসায় ফিরতো। কোনো কোনো ছুটির দিনে ফিরতোই না। তবে তার যে অন্য মেয়ের প্রতি আকর্ষণ ছিলো, তা কিন্তু নয়।
এভাবে দুই বছর যায়, আমি মানিয়ে নেই। আমিও একটা কোম্পানিতে চাকরি করতাম, তাই সারাদিন কেটে যেত অফিসে, এরপর বাসায় ফিরে রান্না, ঘর গুছানো। এরপর আসে সেই সময়, আমি সন্তান সম্ভবা হই, সঞ্জু পেটে আসে। প্রেগ্ন্যাসি টাইমে সব স্ত্রী চায়, তার স্বামী পাশে থাকুক, কেয়ার করবে। আমি স্পর্শের কাছে এসব দাবি করিনি, আমি জানতাম দাবি করেও পাবো না। আমার প্রেগন্যান্সির খবর শুনে সবাই অনেক খুশি হয়, আমার শ্বশুরবাড়ির সবাই ভাবে এবার হয়তো স্পর্শ ঘরমুখো হবে।
স্পর্শের একটা স্বভাব আছে, এটা দোষ না গুণ জানিনা, ও খুব চাপা স্বভাবের। মনের কথা খুলে বলে না, মাঝে মাঝে আনন্দও কম প্রকাশ করে। তবে সন্তান পেটে আসার পর দেখেছি কিছুটা পরিবর্তন হয়েছিলো। মাঝে মাঝে পেটের কাছে কান দিয়ে বাচ্চার হার্টবিট শোনার চেষ্টা করে, দুই মাসের বাচ্চার কি কিছু বোঝা যায় এভাবে! তাও সে করবে। আমি পাঁচ মাসের প্রেগন্যান্সি পর্যন্ত অফিস সহ সব কাজ করেছি, মাঝে মাঝে আমার শাশুড়ি, আমার মা এসে থাকতেন। অন্য আত্মীয়রা টুকটাক খোঁজ নিয়ে যেত। সেইবার শাশুড়ি মা যাবার সময় অনুরোধ করে বলেন, চাকরিটা ছেড়ে দিতে, বাচ্চার জন্য হলেও। আমার চাকরি না করেও চলতো। আমার বেতনের টাকা খরচ করতে হতো না, সংসারের সব খরচ স্পর্শের হাতে। খুব বেশি শখের হলে আমার টাকা যোগ করে কিনতাম। আমি শাশুড়ি মাকে সেভাবে কিছু বলতে পারি নি সেদিন।
এরপর থেকে স্পর্শ আস্তে আস্তে পরিবর্তন হতে থাকে। সকালে সে আমার আগে উঠে নাস্তা বানাতো। অফিস যাবার আগে যতদূর পারতো সাহায্য করতো। কেন যেন স্পর্শ, অন্য এক মানুষ হতে থাকে। প্রথমে সে আমার চাকরি ছাড়িয়ে দেয়৷ অফিস করেই সোজা বাসায় চলে আসতো, আবার আসার সময় আমার জন্য চকলেট, ফুল নিয়ে আসতো। বন্ধুদের সাথে আড্ডা কমিয়ে দিতে থাকে। তারা ফোন দিলে বলে, যেতে পারবে না। ইউটিউব, গুগল দেখে প্রেগন্যান্সির সময় কি করতে হয়, খেতে হয়, এসব দেখে দেখে শিখতে থাকে। আর আমাকে প্রায় জোর করেই এটা সেটা খাওয়ায়, জলের বোতল ভরে খাটের পাশে রেখে দেয়। একা একা বাথরুম যেতে মানা করে। এত কিছুর পরও তার হয় না, সে অফিসে গেলে কে দেখবে, এই ভেবে সে তার এক ছোট বোনকে নিয়ে এসে রাখে বাসায়, তখন আমার সাত মাস পার হয়েছে।
রাতে ঘুমের সময় একটু নড়লেই স্পর্শ জেগে উঠে জিজ্ঞেস করতো, কোন অসুবিধা কি না! যে ছেলেকে কি না ড্রাম পিটিয়ে জাগানো যায় নি আগে। আর প্রতি মাসে ডাক্তারের চেক-আপ আছেই। আট মাস পার হবার পর আল্ট্রাসোনো করতে যাই, উদ্দেশ্য ছিলো বাচ্চার স্বাস্থ্য, পজিশন দেখা। ছেলে না মেয়ে এ নিয়ে কোন দ্বন্দ্ব নেই। তবে স্পর্শ চায় মেয়ে হোক, কেউ যদি বলে ছেলে হবে, সে অনেক রেগে যেত তার উপর। আল্ট্রাসোনোতে সবকিছু ঠিকঠাক আছে, নরমাল ডেলিভারি হবে আশাবাদী। আর এও বলেছে যে মেয়ে হবে। স্পর্শের খুশি আর দেখে কে, এই মনে হয় দ্বিতীয় বারের মতো স্পর্শ অনেক খুশি হয়েছে, প্রথম খুশি হয়েছিলো আমাদের বিয়ের দিন। অবশেষে এত সংগ্রামের পর আমাকে নিজের করে পাওয়ার খুশি। আর আজ সন্তানের জন্য খুশি, আনন্দ যেন একটু বেশিই। বাসায় এসে বারবার আল্ট্রা রিপোর্ট দেখতে থাকে সে।
– আচ্ছা স্পর্শ, এত দেখার কি আছে?
– ও তুমি বুঝবে না, প্রথম বার বাবা হওয়ার আলদা আনন্দ আছে।
– আচ্ছা, মা হওয়ার আনন্দ নেই?
– সেটা আলাদা, বাবার টা আলাদা। দেইখো স্নেহা, আমার মেয়ে আমার মতো হবে।
– সে হোক, আমার আপত্তি নেই (স্পর্শের ফোন বেজে ওঠে) তোমার ফোন বাজছে।
– ও হ্যাঁ, মৃন্ময় দিয়েছে। এ শালা নিশ্চয় বের হতে বলবে। সম্ভব না।
– মৃন্ময়কে বলো, বাসায় আসতে।
– স্নেহা, তুমি পাগল? এখন বললে সাথে আরও অনেকে আসবে।
– আসুক, আড্ডা দেয়া যাবে।
– তোমার অসুবিধা হবে না?
– কেন? অসুবিধা কেন হবে? আড্ডা দিলে মন ভাল থাকবে, বাচ্চার জন্যও ভাল হবে।
– আচ্ছা, আসতে বলছি হ্যাঁ মৃন্ময়, তোরা আমার বাসায় চলে আয়, আরে না না, স্নেহা কিছু মনে করবে না। আর শোন, আসার সময় সবার জন্য খাবার নিয়ে আসিস, সাথে কিছু চকলেট! আমি টাকা দিয়ে দিব আসলে! আচ্ছা রাখি!
– তুমি ওদের খাবার আনতে বললে যে, আমি কিছু করে দিতাম।
– কি দরকার, তোমার এই অবস্থায় কিচ্ছু করতে হবে না।
– ওরা কি মনে করবে?
– ঘোড়ার ডিম মনে করবে, আর করলেই বা কি!(কলিং বেল বেজে ওঠে)
– ওই এসে গেছে।
– তুমি কই যাও, বসো। আমি দেখছি। একটু যদি স্থির থাকো। (বন্ধুরা আসে)
– ভাল আছেন ভাবি?
– হ্যাঁ ভাই, তোমরা।
– জ্বি ভাবি, এই স্পর্শ, এই নে খাবার আর চকলেট।
– আচ্ছা দে, চকলেট তোর ভাবিকে দে। আর বস তোরা, আমি খাবার গুছিয়ে আনি।
– আরে তুমি বসো, আমি আনছি।
– একদম না, চুপ করে বসো।
– ভাবি, ও কিন্তু খুব কেয়ার করে আপনাকে। আজকাল আমাদের জন্য সময়ই দেয় না। আগে কত্ত দিতো। বিয়ে করলেই বন্ধু পর হয়ে যায়।
– কি যে বলো না ভাই, বাচ্চাটা হয়ে গেলে দেখবে ঠিক হয়ে যাবে।
– কি ঠিক হবে রে সূহাস।
– আরে দেখ, ভাবি বলছে, বাচ্চা হয়ে গেলে তুই আবার আমাদের সময় দিবি।
– সে সময় কই বল? এরপর কত ব্যস্ততা, স্নেহা কি একা পারবে বল?
– এমন করছিস যেন বাচ্চা তুই জন্ম দিচ্ছিস!
– কেন? মেয়েদের একারই কষ্ট স্বীকার করার কথা, আমরা কি কিছুই করবো না। আমরা হয়তোবা নয় মাসের এই কষ্ট, ডেলিভারি পেইন নিতে পারবো না, তবে যা পারবো তা যদি অবহেলা করি, কি করে হবে! আর একটা সন্তানের জীবনে মায়ের পাশাপাশি বাবার গুরুত্ব অনেক, আমি বুঝতে পেরেছি। শুধু সন্তান কেন, স্ত্রীর জন্যও স্বামীর অনেক দায়িত্ব। কয়জন স্বামী এটা পালন করে।
স্পর্শের কথা শুনে সবাই চুপ হয়ে যায়, বুঝতে পারে স্পর্শ সেই আগের মতো নেই। ওর ভিতরের বাচ্চামি বদলে দায়িত্ব এসে গেছে। এই প্রথম স্পর্শের কথাগুলো শুনে খুশিতে চোখে জল এসে গেলো। আমি একদিন বলেছিলাম, ছেলেরা বাবা না হওয়া অবধি ম্যাচিউর হয় না, সেদিন স্পর্শ মানতে চায় নি। আজ সেই স্পর্শ জীবন দিয়ে উপলব্ধি করেছে। হয়তো এই জ্ঞান কেউ ওকে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়েছে, হয়তো ওর মা বা বোন। আমি কৃতজ্ঞ তার কাছে যার জন্য স্পর্শের এই পরিবর্তন)
এরপর শুরু হয় এক মাসের প্রতিক্ষা, অবশেষে আসে সেই ক্ষণ। স্পর্শ অফিসে ছিলো, হঠাৎ আমার ব্যথা শুরু হয়। ওর বোন ফোন দেয় ওকে। আমি জানি না এত দ্রুত সে কি করে আসে, সুহাসকে আগে বলা ছিলো, সুহাসের গাড়িতে করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। আগে থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস গুছিয়ে ব্যাগে রাখা ছিলো। দীর্ঘ কয়েক ঘন্টা পেইনের পর যখন আমাকে ডেলিভারি রুমে নেয়া হয়, আমার ইচ্ছা ছিলো স্পর্শ আমার সাথে যাক। মুখ ফুটে বলি নি, কিন্তু স্পর্শ ঠিকই ডাক্তারের অনুমতি নিয়ে আমার সাথে যায়। প্রসবের পুরো সময় সে আমার হাত শক্ত করে ধরে রেখেছিলো, সাহস দিচ্ছিলো। আমার মনে হচ্ছিলো, আমি মরে গেলেও শান্তি পাবো। অতঃপর সন্ধ্যা ৭টার দিকে সঞ্জনা আমার কোল আলো করে পৃথিবীতে আসে।
ওর কান্না শুনে সব কষ্ট যেন মুছে যায়, স্পর্শের চোখে ছিলো আনন্দের অশ্রু। এরপর আমাদের কেবিনে দেয়া হয়, নরমাল ডেলিভারি তাই বেশি দিন থাকতে হবে না। এর মধ্যে ওর বন্ধুরা গাড়ি করে আমার বাবা মা, আর শশুড় শাশুড়িকে নিয়ে আসে। তারা অনেক খুশি হয়, আর স্পর্শ যেন আরো বেশি সচেতন হয়। কেউ বাচ্চা কোলে নিলে সে অস্থির হয়, ভাবে ফেলে দেবে না তো। আমি পাগলামি দেখে হাসি, এরপর আরও পাগলামি আসে, আমাকে কি কি খেতে হবে না হবে বিশাল লিস্ট করে সে। দুইদিন পর বাসায় আসি মেয়েকে নিয়ে। মেয়ের বয়স চার মাস পর্যন্ত মা, শাশুড়ি মা, ননাশ এসে থাকতো, অবশ্য স্পর্শই বলেছিলো, আর তাদেরও আপত্তি ছিলো না। যতটা কেয়ার আমি করতাম, তার থেকে স্পর্শই বেশি কেয়ার করতো।
আজ তিন বছর প্রায় সঞ্জুর বয়স, কোন আবদার অপূর্ণ রাখে নি মেয়ের, হ্যাঁ শাসন করেছে, তবে শান্ত ভাবে। যেখানে আমি অন্যায় করলেও স্পর্শ কড়াভাবে বলতো। মেয়ের অসুস্থতা, সুস্থতা সব কিছুতেই অতিরিক্ত কেয়ার ছিলো ওর বাবার, মেয়ে কষ্ট পেলে সেও পায়, মেয়ে কাঁদলে সেও কাঁদে। মেয়ে দেখতেও বাবার ধারা পেয়েছে, চোখগুলো একদম যেন কেটে বসানো আর বাপের কোলঘেঁষা হয়েছে। এই ছিলো স্পর্শের, আমার স্বামীর আদর্শ বাবা হবার গল্প। স্বামী হিসেবে কতটা আদর্শ সে হিসাব করতে গেলে গড়মিল হলেও, আদর্শ বাবা হিসেবের কোন গড়মিল নেই। স্রষ্টার কাছে অসংখ্য ধন্যবাদ আর কৃতজ্ঞতা, স্পর্শের এই পরিবর্তন হবার জন্য, তা এমনিই হোক বা কারো দ্বারা প্রভাবিত হয়ে! যাই দুজনের আবদারের বিরিয়ানি করে ফেলি, নাইলে পরে বিপদ হবে।
গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত