কালো গোলাপের আর্তনাদ

কালো গোলাপের আর্তনাদ
রাত দশটার সময় মা এসে বলে গেল আমার বিয়েটা ভেঙে গেছে কারণ আমি দেখতে কালো! দুদিন পর শুক্রবারে আমার বিয়ে হবার কথা ছিল। ছেলে ছোটখাটো একটা ব্যবসা করে।মোটামুটি সচ্ছল পরিবার। বিয়ের কথা সব পাকাপাকি ছিল।বাবা-মা খুব খুশি হয়েছিল কারণ শেষ পর্যন্ত আমার বিয়েটা হতে যাচ্ছিল।
আগে আট-দশটা ছেলে পক্ষ আমাকে দেখে গিয়েছিল। কিন্তু আমাকে কারও পছন্দ হয়নি। এবারে ছেলে পক্ষ যখন বলল তারা আমাকে দেখে পছন্দ করেছে মা-বাবা তখন খুব খুশি হয়েছিল। রিপু এসে বারবার বলছিল- আপু দুলাভাই না অনেক সুন্দর।আমাকে কিন্তু এত্তগুলা চকলেট দিতে বলবে।নইলে আমার আপুকে দুলাভাইয়ের কাছে যেতে দিব না। এখনও বিয়ে হয়নি তার আগেই দুলাভাই! রিপুকে হালকা একটা ধমক দিয়ে থামিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু রিপু যদি আবার এসে জিজ্ঞেস করে আপু দুলাভাই কোথায়। আমার জন্য চকলেট আনছে না কেন? তখন আমি কি জবাব দিব?কিছুই জবাব দেবার থাকবে না কারণ আমার বিয়েটা ভেঙে গেছে।
ছেলের কোন এক চাচা নাকি দেশের বাহিরে ছিল।তিনি আমাকে দেখেননি। কিন্তু দেশে আসার পর আমার ছবি দেখে বেঁকে বসেছেন।এমন কুৎসিত, কালো চেহারার মেয়ের সাথে তার ভাতিজার বিয়ে নাকি তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারেন না।তিনি নাকি চান না তাদের বংশে কালো বউ আসুক, কালো বাচ্চাকাচ্চা হোক! তার কথার বাহিরে ছেলে পক্ষের কেউ যেতে পারল না।তাই বাবাকে জানিয়ে দেয়া হলো এ বিয়েতে তারা রাজি হতে পারছে না।বাবা জানিয়ে দিল মাকে।আমাকে সরাসরি বলার সাহস হয়তো বাবা হারিয়ে ফেলেছেন।ছেলে পক্ষ বিয়েতে রাজি হওয়ায় সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিল বাবা।এখন বাবার মুখটা নিশ্চয়ই লজ্জায় লাল হয়ে আছে। পাড়ার সবার কাছ থেকে মুখ ঢাকতে কয়েকদিন গৃহবন্দী হয়ে থাকবেন হয়তো।মা এসে কাঁদো কাঁদো গলায় সবকিছু বলে গেল।কিন্তু আমি একফোঁটাও কাঁদলাম না।আমি জানি আমি কাঁদতে ভুলে গেছি আজ থেকে অনেক বছর আগেই।
যখন আমার বয়স মাত্র পাঁচ বছর তখন আমি বেড়াতে গিয়েছিলাম ছোট ফুপুর বাসায়। আমরা সব কাজিনরা মিলে মেকাপ বক্স নিয়ে সাজুগুজু করছিলাম।আমাকে সাজতে দেখে এক আন্টি বলছিলেন -এই মেয়ে তুমি তো দেখতে কাকের মতো কালো।তুমি সেজে কি করবে?সাজলে কি আর ফর্সা হতে পারবে?হা হা হা। কথাটা শুনে পাঁচ বছরের আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম।আমি কাদতে শুরু করেছিলাম। আন্টি বললেন -এই মেয়ে কাঁদে না। আমি তো শুধু মজা করছিলাম। হা হা হা। আমার কান্না সেদিন থেমে গিয়েছিল। এরপর থেকে আমি আমি বুকে পাথর চাপা দিয়ে থেকেছি।মনে মনে কাঁদতে শিখেছি।আমার কান্নার জল কেউ দেখতে পেত না। একবার ঈদের সময় বাসার সবার জন্য জামা কিনা হবে।প্রত্যেকের কোন কালারের জামা পছন্দ জিজ্ঞেস করা হচ্ছিল। কিন্তু আমাকে কেউ জিজ্ঞেস করেনি।মা শুধু একবার দরজার আড়াল থেকে বলেছিল -দীপার কোন কালার পছন্দ কিনা জিজ্ঞেস করবেন না?
– ও কালার পছন্দ করে কি করবে?ওকে তো কোন কালারেই ভালো মানাবে না।একটা হলেই হবে।বিরক্তিমাখা মুখে বড় চাচা জবাব দিয়েছিলেন। তারপর সবার জন্য তাদের পছন্দের কালারের জামা কিনা হলো।আমার জন্য কিনা হলো খয়েরি কালারের জামা যেটা আমার একটুও পছন্দ হয়নি।কিন্তু তারপরও আমি সবার চেয়ে বেশি খুশি হয়েছিলাম।সারা বাড়ি মাতিয়ে তুলেছিলাম।জামাটা পড়ে সবাইকে দেখাচ্ছিলাম।মা শুধু একবার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল- এই কালারের জামা তোর পছন্দ হয়েছে?
– হবেনা কেন,দেখো না জামার মধ্যে কি সুন্দর পুথি বসানো আছে।আমাকে মানিয়েছে কিনা বল? আহ্লাদের স্বরে জিজ্ঞেস করলাম।
মা কোন জবাব দিল না।শুধু মুখটা শাড়িতে আড়াল করে ফেলল কারণ আমার মতো মা-ও চায় না তার কান্নার জল কেউ দেখতে পাক। কিছুদিন পর আমাকে যখন স্কুলে ভর্তি করানো হলো আমি তখন মহাখুশি। কিন্তু কালো চামড়ার মানুষদের কপালে সুখ বোধহয় বেশিদিন সয় না।
ক্লাসের সবাই আমাকে অন্য চোখে দেখত।সবার সঙ্গে মিশতে গেলে এড়িয়ে চলত।আমাকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করত।বলত আমি নাকি দেখতে বিদেশিদের মতো।বিদেশি নিগ্রোরা নাকি দেখতে এমন কুচকুচে কালো হয়।এসব কথায় আমি কিছু মনে করতাম না।শুধুমাত্র একটা বোকাবোকা হাসি দিতাম।আমার হাসি-ই ছিল আমার কান্না। পাথর চাপা আর্তনাদের হাসি মিশ্রিত কান্না! একদিন স্কুল থেকে ফিরে বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম- বাবা, আমি কি প্রতিবন্ধী? আমার কথা শুনে বাবা বেশ অবাক হয়েছিলেন। এমন প্রশ্নের কারণ জানতে চাইলেন। স্কুলের সবাই আমাকে দেখে হাসিঠাট্টা করে কেন?আমাকে অন্য চোখে দেখে কেন?আমার সাথে কেউ মিশতে চায় না কেন?শিক্ষকরা পর্যন্ত বলে কেন আমার প্রতি সহানুভূতিশীল হতে?
আমি কি অন্য সবার চেয়ে ভিন্ন? শুধুমাত্র চমড়ার রঙের কারণে মানুষ ভিন্ন হয়ে যায়? আমি ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলাম।আমি সবার কাছে কান্নার জল লুকাতে পারলেও বাবার কাছে পারিনা। বাবা আমাকে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন। আমি বাবার কাছে নালিশ করেছিলাম আমাকে বাকিদের মতো ফর্সা বানানো হয়নি কেন?কেন? বাবা তখনো আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে যাচ্ছিলেন।বাবার সান্ত্বনাকে উপেক্ষা করে আমি জোরে জোরে কাঁদতে লাগলাম। বাবা আমার কপালে একটা চুমু খেলেন। সাথে সাথে বাবার চোখ দিয়েও বর্ষণ হতে লাগলো। বাবা রুমাল দিয়ে আড়াল করার বৃথা চেষ্টা করতে লাগলেন। ছোট চাচা যখন বিদেশ থেকে অাসলেন তখন সব কাজিনদের জন্য আনা হলো খেলনা,চকলেট আর আমার জন্য আনা হলো ক্রিম।ফর্সা হবার ক্রিম!
মা নাকি কার কাছ থেকে শুনেছে বিদেশে ফর্সা হবার খুব ভালো ক্রিম পাওয়া যায়। তাই বাবাকে দিয়ে বলিয়ে ক্রিম আনিয়েছিল।সপ্তাখানেক সেই ক্রিম মাখার পরও কোন পজিটিভ ফলাফল হলো না।বরং মুখে ছোট ছোট বর্ন দেখা দিল।তারপর মা’ই সেই ক্রিম ডাস্টবিনে ফেলে দিল। মেয়েদের কোন ত্রুটি থাকলে সেটা সারানোর জন্য মায়েদের ব্যতিব্যস্ত হতে হয় কারণ মেয়েরা নাকি মায়েদেরই একটা অংশ।মেয়ের কোন ত্রুটি থাকা মানে মায়ের মধ্যেও সেই ত্রুটি আছে।আমার বেচারি মা সেই কলঙ্ক মুছতে নানা বন্দোবস্ত করতে লাগল। কিন্তু সব-কয়টা বিফলে গেল।প্রতিবার কোন বন্দোবস্তের পর মা বলত- এবার নিশ্চয়ই আল্লাহ মুখ তুলে তাকাবেন। কিন্তু এতসব গুরুত্বপূর্ণ কাজের মধ্যে আমাদের দিকে তাকানোর সময় বোধহয় তার ছিল না।
সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে আমার জীবনেও প্রেম এসেছিল।আবির নামের যে ছেলেটা পাড়ায় সবচেয়ে ভালো ফুটবল খেলতো কোন এক অদ্ভুত কারণে ওই ছেলেটাকে ভালো লেগে যায়। তখন আমি বুঝতে পারি আমাদের মতো অবহেলিত রঙের মেয়েদের মনেও ভালোবাসা জাগে।প্রেম নামক রঙিন ভোমর তাদেরকেও রাঙাতে চায়।
তার চেয়েও আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে আবিরেরও নাকি আমাকে ভালো লাগত।আবিরের প্রিয় রং ছিল কালো।আবিরের জন্মদিনে একটা কালো কালারের ঘড়ি গিফট করেছিলাম।আবির খুব খুশি হয়েছিল।
এর ঠিক দুদিন পরেই আবির কালো রঙের একটা গোলাপ ফুল দিয়ে বলেছিল- আমি তোমাকে ভালোবাসি দীপা।তুমি সম্ভবত আমার জীবনের একটা অংশ হয়ে গেছ! তখন আমার মনে হচ্ছিল আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ। মনে হচ্ছিল আরো হাজার হাজার বছর বেঁচে থাকি,জীবনটা উপভোগ করি।জীবন অনেক সুন্দর। কিন্তু তিনমাস যেতে না যেতেই আবির এসে বলল এ সম্পর্ক রাখা তার পক্ষে সম্ভব না। এ তিনমাসে আমার জীবনে অদ্ভুত রকমের পরিবর্তন এসেছিল।প্রতিটা মুহূর্ত আনন্দময় ছিল।আমি হাসতে শিখেছিলাম, পাখিদের কিচিরমিচির শব্দের সাথে ঠোঁট মিলিয়ে গান গাইতে শিখেছিলাম, নতুন করে বাঁচতে শিখেছিলাম। আমার মতো মেয়েদের কারো প্রতি অধিকার খাটানোর কোন যোগ্যতা নেই।আমি শুধু আবিরের চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম- আবির তুমি কি সত্যিই আমার মতো অবহেলিত রঙের মেয়েকে ভালোবাসতে? কালো রং কি তোমার প্রিয় রং?নাকি পুরোটাই মিথ্যা,ছলনা,সাময়িক সময়ের মোহ?
আবির কোন জবাব দিতে পারেনি।শুধু ফ্যালফ্যাল করে নিচের দিকে তাকিয়ে ছিল। কালো রং অনেকের কাছেই প্রিয় কিন্তু কালো রঙের কোন মানুষ কারও কাছে প্রিয় না।ভালোই তো, বস্তু কালো হলে প্রিয় আর ব্যক্তি কালো হলে অবহেলিত! শ্যাওলার পানির মতোই অস্থায়ী সুখগুলো আমার কাছ থেকে চিরবিদায় নিল। আমার দু’দিনের আনন্দময় দিনগুলো আবার বিষাদের কালো মেঘে ছেয়ে গেল। স্কুলের পর কলেজ,কলেজের পর ভার্সিটিতে পা রাখলাম।ভার্সিটিতে সবাই বর্ণবাদীদের ঘৃণা করে ঠিকই কিন্তু আমাকে দেখে মুখে বিরক্তির ভাব আনাটা তাদের জন্য স্বাভাবিক ছিল।বর্ণবাদের বিরুদ্ধে স্যারদের দেয়া লেকচারের সুফলে কেউ কেউ সহানুভূতি দেখাত।কিন্তু সেটাও মাঝেমাঝে মেকি মনে হতো। অনেকেই মজার ছলে জিজ্ঞেস করত- আপু,আর ইউ কাম ফ্রম নাইজেরিয়া?
আমিও কিছু না বুঝার ভান করে ‘নো’ জবাব দিতাম। তারপর তারা অনেক দুঃখিত হবার ভান করে বলত- স্যরি,স্যরি।ডোন্ট মাইন্ড। কিন্তু মনে মনে তারা খুশি হতো ঠিকই। আমি সবই বুঝতাম কিন্তু নিরবে সবকিছু হজম করে নিতাম।আমি কাঁদতাম না কারণ আমি কাঁদতে ভুলে গিয়েছিলাম।আমার চোখের জল কারো মন গলাতে পারতো না। প্রথম যেদিন পাত্র পক্ষ আমাকে দেখতে আসল তার পর থেকে মা আমাকে বুঝিয়ে দিল আমার মতো মেয়ের বিয়ের বাজারে টিকে থাকতে হলে শুধুমাত্র লেখাপড়া থাকলে চলবে না।অন্যান্য গুণও থাকতে হবে।এরপর মা আমাকে নিজ হাতে রান্নাবান্না, সেলাইয়ের কাজ,বিভিন্ন তৈজসপত্র বানানোর কাজ শিখিয়ে দিল।
প্রতিবার ছেলে পক্ষ দেখতে আসলে বাবা ঘুচিয়ে ঘুচিয়ে বলতেন- আমার দীপা মামণি শুধু লেখাপড়াতেই ভালো না রান্নাবান্না থেকে শুরু করে সেলাইয়ের কাজ এবং দরকারি তৈজসপত্রও বানাতে পারে।এতে পাত্র পক্ষের আগ্রহ ক্ষাণিকটা বেড়ে যেত।কিন্তু আমাকে দেখার পর তারা কেমন যেন চুপসে যেত।ফিসফিস করে কি যেন বলত।বাবা পুনরায় ঘুচিয়ে ঘুচিয়ে আমার বিভিন্ন গুণের কথা বলত।কিন্তু আমার কালো চেহারার কাছে আমার সব গুণ হার মেনে যেত।সবাই তো সৌন্দর্যের পূজারী। কেউ তো আর গুণের পূজারী না। যাবার সময় পাত্র পক্ষ বলে যেত তারা কিছুদিন পর সিদ্ধান্ত জানাবে।বাবা-মা সেই সিদ্ধান্তের অধীর অপেক্ষায় থাকত।এভাবে আট-দশটা পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত পাবার আশায় থাকা বাবা-মা আস্তে আস্তে নিরাশ হতে লাগলো।বাবা যখন জানালেন শেষ পক্ষটি বিয়েতে রাজি হয়েছে তখন পরিবারের সবাই আনন্দে আটখানা। কাকে কাকে দাওয়াত করা হবে,কোথায় অনুষ্ঠান হবে,বড় ফুপুর রাগ ভাঙিয়ে কিভাবে বিয়েতে আনা যায় সেই প্ল্যান হতে লাগলো।
রিপু সারা বাড়ি মাতিয়ে তুলেছিল। তার একটাই কথা যেন সারা বাড়ি লাল-নীল বাতি দিয়ে সাজানো হয়।বাবা তার এত বছরের পরিশ্রমের টাকা ব্যাংক থেকে তুলে আনলেন।আমার বিয়েতে দেয়ার জন্য মা যে গহনাগুলো সযত্নে রেখেছিল সেগুলো আলমারিতে ঠিকঠাক আছে কিনা মা বারবার দেখে নিল। একটু আগে বাবা এসে যখন জানালেন পাত্র পক্ষ বিয়েতে রাজি নয় সবাই কেমন যেন মুষড়ে পড়ল।মা আর আলমারির ধারেকাছেও গেল না।বিয়ের দাওয়াতের কার্ড ছাপানোর অর্ডার বাতিল করে দেয়া হলো।রিপু ঘুমিয়ে আছে তাই ও জানে যে আমার বিয়েটা ভেঙে গেছে।সকালে ঘুম থেকে উঠে যখন দেখবে বাসায় লাল-নীল বাতি লাগানো হয়নি তখন নিশ্চয়ই কান্না শুরু করবে। রাত এগারোটার দিকে বাবা আমার রুমে আসলেন।
– বুঝলি মা বিয়েটা ভেঙেছে ভালোই হয়েছে। ছেলেটার নাকি নেশাপানির দোষ আছে।আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যেই করেন।তোকে এর চেয়েও ভালো ছেলের কাছে বিয়ে দিব।তুই কিন্তু একটুও মন খারাপ করিস না।
বাবার চেহারায় অদ্ভুত রকমের পরিবর্তন এসেছে। চিন্তায় ভেঙে পড়া একটা জীবন্ত লাশ যেন আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।কথাগুলো বলতে বলতে বাবার গলাটা ধরে আসল।
– ভালোই হয়েছে গায়ে হলুদের আগেই তারা না করে দিয়েছে।নয়তো অনেকগুলো টাকা নষ্ট হতো।তোমার পরিশ্রমের টাকা যে নষ্ট হয়নি এতেই আমি খুশি। বাবা আতিপাতি করে কি যেন খুজতে লাগলেন।বাবা মনে হয় ভাবছেন বিয়ে ভেঙে যাওয়ায় আমি ফাঁসি দিব নয়তো বিষ খাব।কিন্তু আমার বোকা বাবা হয়তো জানে না তার কালো চামড়ার অবহেলিত মেয়ে সবকিছু সহ্য করতে শিখে গেছে।আমার কাছে মৃত্যু মানে এখন স্রেফ আনুষ্ঠানিকতা।প্রতিদিন তো তিলেতিলে মরছি-ই সেই বা কম কি।
– আচ্ছা বাবা তোমরা আমাকে এমন দূরদূর করে তাড়িয়ে দেয়ার জন্যে উঠেপড়ে লেগেছ কেন?আমাকে কি সারাজীবন তোমাদের সাথে রাখা যায় না?বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম।
– বিয়ের উপযুক্ত মেয়ে ঘরে থাকাটা বাবা-মায়ের জন্য আনন্দের নারে মা।যদি পারতাম এমন লক্ষী মেয়ে কি আর হাতছাড়া করতাম।
– পারবে না কেন বাবা?আমি তো তোমাদের সাথে থাকার জন্য রাজিই আছি।
– তুই যখন মা হবি তখন বুঝতে পারবি বিয়ে উপযুক্ত মেয়ে থাকার পরও বিয়ে দিতে না পারাটা কতটা কষ্টের।
আবারও বাবার গলাটা ধরে আসল।নিজের ভার্সিটি পড়ুয়া মেয়ের সামনে কাঁদতে হয়তো বাবা লজ্জা পান তাই পাশের রুমে চলে গেলেন। বিয়ে ভেঙে যাবার পর আমি মনে করেছিলাম বাবা অন্তত মাসখানেকের জন্য বাসা থেকে বের হবেন না।কিন্তু আমার সাহসী বাবা চক্ষুলজ্জাকে জয় করে তিন দিন পর ঘটকের কাছে নতুন সম্মন্ধের খোঁজে বের হলেন।আজকে ছেলে পক্ষ দেখতে এসেছে।
পাশের রুমে তারা বসে আছে।মা আমাকে খুব যত্ন করে সাজিয়ে দিচ্ছেন।মায়ের শত নিষেধ সত্ত্বেও রিপু বারবার পাশের রুমে উঁকি দিচ্ছে। সে হয়তো বুঝার চেষ্টা করছে আগেরবারের মতো এবারও লোকগুলো তার আপুকে ধোঁকা দিবে কিনা।বাবা আমার সবগুলো গুণ ঘুচিয়ে ঘুচিয়ে বলে যাচ্ছেন। আমাকে হাজির করা হলো পাত্র পক্ষের সামনে।
আমাকে দেখার পর তাদের হাসিখুশি মুখ কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে গেল।বাবা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সবাইকে মিষ্টি খেতে বললেন।কিন্তু তারা কোন খাবারেই হাত দিল না।পাত্র হিসেবে যে লোকটা এসেছে সেই লোকটা নাক সিটকে বলল- বাবা এখান থেকে ওঠ।
বাকি যারা ছিলেন সবাই চলে যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করতে শুরু করল।বাবা কিছু বলার আগেই তারা ওঠে পড়ল।বাবা মিনমিনে গলায় বললেন- চা-টা অন্তত শেষ করে যান।তারা আমার নিরীহ বাবার কথা শুনল না। সবাই যখন চলে গেল তখন আমার মনে হতে লাগলো পাত্র হিসেবে যে লোকটা এসেছে ওই লোকটাকে আমি কোথায় যেন দেখেছি কিন্তু মনে করতে পারছি না। বাবা আমাকে সান্ত্বনা দিতে এসে হু হু করে কেঁদে ফেললেন।বাবার প্রেসার বেড়ে গেল।মা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন বাবার মাথায় পানি ঢালতে। রিপু এসে বারবার বলছে- আপু ওরা চলে গেল কেন? আমার কি দুলাভাই হবে না? আমাকে চকলেট কিনে দিবে না? রিপুর প্রশ্নের জবাব আমার কাছে নেই।কার কাছে আছে সেটাও অজানা।
রাত দশটার সময় আমি বারান্দায় বসে আছি। শা শা করে দক্ষিণা বাতাস আসছে।সামনে খাঁচায় বসে টিটু খাবার ঠোকরাচ্ছে কিন্তু খাচ্ছে না।কোন কারণে হয়তো তার মন খারাপ।টিটু আমার পোষা টিয়াপাখি।আমার সবসময়কার সঙ্গী। বাবার প্রেসারটা একটু আগে কমেছে।কিন্তু বাবা গোঙ্গাচ্ছেন আর বলছেন -মা তোকে এর চেয়েও ভালো জায়গায় বিয়ে দিব।মা জোর করে বাবার মাথায় পানি ঢেলে দিচ্ছে। রিপু অনেকক্ষণ চকলেটের জন্যে কান্নাকাটি করে ঘুমিয়ে পড়েছে। আজকের আকাশটায় মেঘ জমে ঠিক আমার মতোই কালো হয়ে আছে।আকাশের বিষন্নতায় আমার মনে পড়তে লাগলো পাত্র হিসেবে যে লোকটা এসেছে তাকে আমি ভার্সিটিতে দেখেছিলাম বর্ণবাদ নিয়ে এক সেমিনারে বক্তৃতা দিতে।আর বেশি কিছু মনে করার চেষ্টা করলাম না। আমার ইচ্ছে আমি আজীবন বাবা-মায়ের কাছে থাকব।কিন্তু এতে বাব-মা কষ্ট পাবে অনেক বেশি। পৃথিবীর কোন বাবা-মা’ই চায় না তার মেয়ে স্বামীহীন থাকুক।
দায়হীন হতে কিংবা সমাজের লাঞ্ছনা থেকে বাঁচতে সব বাবা-মা’ই চায় তাদের মেয়ের বিয়ে হোক। আমি চাই আমার বিয়ে হোক।সমাজের লান্ঞ্ছনা থেকে বাবা-মাকে বাঁচানোর জন্যে হলেও,মায়ের গহনাগুলো পড়ার সৌভাগ্যের জন্যে হলেও কিংবা বাবার মুখে এক চিলতে হাসি দেখার জন্যে হলেও আমার বিয়ে হোক। টিটুর ডাকে আমার ভাবনায় ছেদ পড়ল।ও নিশ্চয়ই চায় না আমার বিয়ে হোক কারণ ও আমার মতোই সঙ্গীহীন।ঠিক আমার মতোই শত খোজাখুজি করেও ওর কোন সঙ্গী পাওয়া যায়নি।
গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত