রজব বৃওান্ত

রজবের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বটা ছিলো অনেক গভীর, তার জীবনের অনেক কিছুই শেয়ার করতো আমার সাথে, ওর চোখে-মুখে অন্যরকম দীপ্তি দেখতাম, অনেক-অনেক গল্প ছিলো ওর ঝুড়িতে, পারিবারিক-সামাজিক থেকে যৌনতা বিষয়ক বিভিন্ন গল্প প্রায়শ বলতো বেশ রসিয়ে-রসিয়ে, কিন্তু সে গল্পগুলোর একটা ছাঁদ সে দিতো, যদিও আঙ্গিকগত বিষয় সে সেভাবে বুঝতো না, তারপরও পরিণতি থাকতো, মানুষের ভেতরের অনেক গল্প সে প্রকৃতগতভাবে অস্থি-মজ্জায় ধারণ করতো, তাই একদিন বললাম, তোমার এই কথাগুলোকে সাজিয়ে-গুছিয়ে গল্পে রূপ দিলেই তো পারো…
কথা শুনে হাসতো, হবে না আমার দ্বারা ওসব কিছু হবে না!
কাকে দিয়ে কি হয়, তা তুমি কি ভাবে বুঝলে বলো তো, আগে নিজেকে পরখ করে দেখো না বাবা।
আমার কথা শুনে ওর বেশ ভালো লাগতো, হবে বলছো হবে, আমাকে দিয়ে কিছু হবে।
হবে তো বলছি, মিথ্যে বলছি না কি।
সত্যিই তুমি একদিন বড় কিছু হবে, মানুষকে অনুপ্রেরণা দিতে তোমার কাপণ্য নেই।
আমি কাপণ্য করবার কে, তোমার ভেতর আমি একটা ছবি দেখতে পারছি, তাই বলছি।
দেখতে পারছো কিসের ছবি, বলো তো।
নদীর ছবি, আকাশের ছবি, কাশবনের ছবি, সব ছবিগুলো মিলেমিশে কেমন তোমার সঙ্গে মিশতে চাইছে, তুমি তাকে হাত পেতে নেবে না…
রজব আলী আমার দিকে তাকিয়ে থাকতো, ওর চোখদুটো ছিলো কাজলাদীঘিতে অবহেলায় ফুটে থাকা পদ্মফুল, সে ফুল দেখে কেউ করে ভুল, কেউ বা কুড়োয় গোবরেফুল, রজব আলী আমার জীবনের অনেকটা সময় কেড়ে নিয়েছিলো সেই ভুল চোখের চাহনীতে, আমি যেন রাঁধিকা হয়ে কালো শ্যামকে মন দিলাম, প্রাণ সঁপে নিজেকে পোড়ালাম, তারপর যা ছিলো কিছু সব হারালাম। হারাতে-হারাতে নিজেকে নিঃস্ব করে দেখলাম সত্যিই আমি যেন আর আমিতে নেই, একটা প্রজাপতি যেমন দিনমান ঘুরে-ঘুরে ফুলের বুক থেকে রেনু আর মধু আহরণ করে, এবং তারপর সে নিজের আস্তানায় ফিরে যায়, আমিও যেন সেভাবে নিজের খোলসে নিজেকে হারিয়ে ফেলি, সত্যসত্যিই আমরা যেন প্রাগৈতিহাসিক জীব হয়ে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত।
রজব আলীর একটা সমস্যা, কথা বলতে গেলে অতিরিক্ত তোঁতলামি, শেষঅবধি লেখা পড়া শেষ করেও একটা চাকুরি জোটাতে পারেনি, নিজের অনেক আত্মীয়-স্বজন কত্যা-ব্যক্তি হওয়া সর্ত্ত্বে হয়নি, রির্টানে পাশ করেও ইন্টারভিউ বোর্ডে গিয়ে সেই তোঁতলামি, বিশেষ করে নতুন পরিবেশে এবং অপরিচিত মানুষের সামনে ওর ওই স্বভাব মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যেতো, কোনোভাবেই সংবরণ করতে পারতো না নিজেকে।
রজব আলী ভালো বন্ধু ছিলো আমার, মাঝে কিছু গল্পও লিখেছিলো, উত্তমপুরুষে, আগে নাকি কবিতা লিখতো, শুনেছি কিন্তু কোনোদিন সেগুলো আমাকে দেখায়নি, বললে, লজ্জিত হতো এবং বলতো, ওসব কিছু না, সময় কাটানোর জন্য একটা কিছু করা আর কি! কিন্তু তার গল্প, নিজের জীবনের গল্প, আত্মকথা ষ্টাইলের গল্প, আমার কাছে প্রায়শ আসতো, পড়তো বেশ উপভোগ্য করে, উৎসাহ দিয়েছি দ্বিগুণ, শহরের অনেক সাহিত্য আসরে গেছে, কেউ-কেউ বাঁকা চোখে দেখে মিচকি হেসেছে, কথার ভেতর ওই তোঁতলামি শুনে বাজে ইঙ্গিত করেছে, আমার কাছে তাও বলতো, কেউ বা আবার পন্ডিতি ভাব দেখিয়ে, রবীন্দ্রনাথ বা কমলকুমারের ভাবধারায় দুটো উপদেশ বয়ান করেছে, অথচ আমার কাছে গল্প পড়তে বেশি উৎসাহবোধ করতো, হতে পারে আমি তাদের মতো অতো বোদ্ধা নয় বলে, সাহস বেশি দেখাতে পারতো। প্রথম-প্রথম বেশ লজ্জাও পেতো, না কিচ্ছু হয় না গো! হবে না ওসব আমার দ্বারা…
আমি বলতাম সব গল্প-কবিতা বিলাশ-বাসন দিয়েই হয় না, জীবন থেকেও তো নিতে হয়, আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসতো, ওর চোখটা ভারী কমণীয়, টলটল করতো দীঘির জলে ফোঁটা পদ্মর মতো, আমি ওদের সফুরার বখতিয়ারপুরের বাড়িতে কখনো-সখনো যেতাম, অতিথিয়েতার শেষ নেই, পকেটে পয়সা নেই, ঘরে দীর্ণতা, বাড়িতে হাহাকার কিন্তু মুখে ওর সদাসর্বদা হাসি, ভালোবাসাও ছিলো কিন্তু কেউই তা নেয়নি, হয়তো দেখেনি বুকের ভেতর একটা অন্যরকম মানবিক মানুষ আছে, তা দেখার সময়ই বা কার কোথায়। রজব আলী গল্প লিখেছে হয়তো তা শুধু আমাকে খুশি করতে, তার গল্পে প্রাণের প্রাচুর্য যথেষ্ট, জীবনবোধের যে জিজ্ঞাসা, অভাব-অভিযোগের এবং সামাজিক অবক্ষয়ের দাগগুলো সুষ্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে, ওর বেশ কয়েকটা গল্প ঢাকার কাগজে ছাপানোর ব্যবস্থাও করেছিলাম, কয়েকবার সম্মানী এনে দিয়েছিলাম ওকে। ওর সমস্ত কষ্টের গল্প আমাকে বলতো, জীবন প্রকৃত অর্থে জটিল, সমাজের সমস্ত মানুষগুলো মূলত দানব, ওরা একেকজন প্রাগৈতিহাসিক ডাইনোসাস—আমার স্মরণে আছে, রজব আলী আমাকে সর্বপ্রথম কিছু সমাজতন্ত্রের বই-দর্শনের বই এমনকি যৌনতা বিষয়ক গ্রন্থ পড়তে দেয়, সেগুলো সে কোন পুরানো লাইব্রেরী থেকে আনতো জানি না, তবে বেশ পুরানো এবং বইয়ের পাতারা বিবর্ণ-বাঁধাই ছাড়া অনেকটা দুষ্টু শিশুর মতো।
রজব আলীদের কষ্ট ছিলো-অভাব ছিলো, বাড়িতে একটা বৃদ্ধা মা ছিলো, বয়স্ক অসুন্দর বড় বোন ছিলো, সেখানে কবিতা-গল্প থাকবার কথা নয়, তারপরও গল্প লিখেছে, ভালো গল্প, আমি একবার ওকে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের পঞ্চাশটি সেরা গল্পের সংকলন দিয়েছিলাম, পড়তে দিয়েছিলাম রমানাথ রায়ের শ্রেষ্ট গল্প, হঠাৎ একদিন বললো, তুমি যে গল্পসংকলন দুটো দিলে, পড়ে দেখলাম, তাদের কষ্ট-দুঃখ অনেকটা আমার মতোই, খুবই ভালো দুটো গল্পগ্রন্থ দিলে…
একদিন বর্ষণমুখর সন্ধ্যোয় পদ্মার নদীর সানবাঁধানো কংকিটের বেঞ্চে বসে আছি আমরা দুজন। মাথার ওপর ছিলো দুজনের দুটো ছাতা, বৃষ্টির পানি টিপটিপিয়ে নদীর পানিকে পড়ছে, ধূসর পরিবেশ চারদিকে, গাছেদের শরীর থেকে বৃষ্টিধোয়া পানি গড়িয়ে নামছে, দূরে-দূরে জোড়া-জোড়া বেঁধে যুবক-যুবতি বসে গল্পে মেতে আছে, কতো যে গল্প, সে গল্পের আর শেষ নেই যেন। রজব আমাকে আধুনিক যুগের জটিল মানসিকতা ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বের কুটিল প্রভাব সম্পর্কে ধারণা দেয়, বিশ্লেষণ করে জানায়, যেখানে দেখবে একটা ছেলে এবং একটা মেয়ে ঘনিষ্ঠ, সেখানে তৃতীয়টা আসতে আর কতো বাকি, নারী-পুরুষের সম্বণয়ে পরিবেশ-সমাজকে ভারসাম্য রাখবার জন্য তৃতীযজাত… রজব বাংলাসাহিত্যের ছাত্র ছিলো না, সংস্কৃতি বা কালচার বোঝার সময় তার হয়নি, জীবনযুদ্ধের একজন পরাজিত সৈনিক ছিলো, বাড়িতে অসুস্থ মা, তিন তিনটে মুখের সংস্থান করতে জীবন যার অষ্টগত, সে কিভাবে সাহিত্যকে ভালোবেসে জীবন উৎসর্গ করবে, দিনরাত্রি অংকের মতো টানটান তার জীবনপ্রণালী, কর্মাসের ছাত্র সে, রেজাল্ট সর্বদা ভালো, কৈশোর থেকেই প্রাইভেট পড়ানো পেশা, বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে এসেও অনেক ছাত্র-ছাত্রী তার হয়েছিলো কলেজে অধ্যায়নরত, সে টাকা দিয়ে দু’কাঠার বাড়িতে দুটো কামরা করেছিলো, আমাকে বলতো মাথা গোঁজার একটু ঠাঁই না হলে কি গল্প আসে!
কেনো আসবে না, চাঁদের দিকে তাকিয়ে কবি’ রা কতো পদ্য লেখে, নদীর দিকে তাকিয়ে, সুন্দরী প্রিয়তমার দিকে তাকিয়ে…
ওসব তো কল্পনায় রেসের ঘোড়া দৌড়ানো, বাস্তবে আবার হয় নাকি?
হয়-হয় মানুষই তো পথে-ঘাটে পড়ে থাকে, কেউ মরে, কেউ মরেই না শুধু অতৃপ্ত নিয়ে কেঁদে যায় জীবনভর।
চমৎকার কথা বললে তো, অতৃপ্ত নিয়ে কেঁদে মরে, ঠিক আমারই মতো কিছুই হতে পারলাম না, অন্ধকার কালো ছোপ-ছোপ…
তুমি তো লাকি মানুষ হে যুবক, জীবনযুদ্ধের সেনা, যাকে কেউ পরাজিত করতে পারেনি।
কেমন কথা হলো এটা, মানতে পারলাম না, একটু বেশি তোয়াজ করা যেন!
যে যেমনভাবে নিতে পারে একটা কথা, মূলত মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিই একটা কথাকে বিভিন্ন সাইজে বাঁক বদল করে।
আমার কথা শুনে রজব হাসতো, ওর হাসি যেন হাসি নয়, অন্যরকম কিছু, সত্যসত্যিই আমরা রজবের হাসির কোনো অর্থ খুঁজে পায়নি। একদিন গল্পে সে জানাই আশা নামের এক মেয়ের প্রতি সে খানিকটা দূর্বল, মেয়েটি আবার ওর ছাত্রী, ধনীর মেয়ে, সপ্তাহে তিন দিন ওদের বাড়ি পড়াতে যেতে হয়, মূলত অংক, আশাকে নিয়ে রজবের কৌতুকের অন্ত নেই, ওর সম্পর্কে অনেক গল্প অনেক তথ্য ছিলো ঝুড়িতে, সুন্দরী মেয়েদের হাসিতে ঝর্ণা ঝরে, জোনাকির মতো আলো দেয় মিটিমিটি, টোল পড়া গালের ওই হাসি দেখে মানুষ কবি হয়, এ’ সব বস্তাপঁচা সেকেলে কথা রজব বেশ ইনিয়ে-বিনিয়ে বলতো, শেষের দিকে ওর ওসব ফালতু প্যাঁচাল আর ভালো লাগতো না, কেমন একঘেঁয়েমি মনে হতো। ক্রমে-ক্রমে আমি মনের অজান্তে অনেকটা দূরে সরে যায়, ব্যস্ততা-চাকুরি এবং নিরবচ্ছিন্ন সাহিত্যচর্চা আমাকে বড় বেশি এককেন্দ্রীক করে তোলে, আমি নিজের খোলসে হারিয়ে যায় তারপর।
রজবের সঙ্গে সম্পর্কটা থিতু হয়, কেনো যে আর এগুতে পারেনি, জানি না, মাঝে আরো দু’ একটা গল্প পড়ি কাগজে, প্রেমকাহিনী মূলক বলা অপেক্ষা রাখে না। কবি যেন দুঃখের সমুদ্র থেকে স্নান করে প্রেমের সিন্ধুতে ডুবছে, ভাবতে ভালো লাগে, প্রতি মানুষের কামনা-বাসনা থাকতে পারে, রজবের মধ্যে কেনো থাকবে না, থাকতেই পারে, জীবন মানে তো রুদ্ধ কোনো চাতাল নয়, অবারিত সবুজ মাঠ, উদার ধান ক্ষেতের মতো মাতাল বাতাসে ভেসে যাওয়া স্বপ্ন, বিশাল আকাশ, যে আকাশের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই, রজবের জন্য আমার বুকের ভেতর অনেক ভালোবাসা প্রতিনিয়ত, সাহিত্যাঙ্গনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি জাগ্রত কিন্তু বাঁকা চোখের চাহনি, সবজান্তাদের হেঁয়ালিপনা কথা বড় কাঁটা দিতো তার গায়ে, কারণ সে ছিলো নির্ভেজাল সত্য মানুষ।
শেষাবধি একটা চাকুরি জোটাতে পারেনি রজব। তার শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো মূল্য হয়নি, হয়তো একটা চাকুরি তার জীবনের মোড় অনেকটা ঘুরিয়ে দিতে পারতো, মসৃণ পথের অংশটা রজব শেখেনি বা জানতে পারেনি। ওর বুকের ভেতরের হাহাকারের গল্প ধূসর পান্ডুলিপি হয়ে রয়ে গেছে, রজব সাহিত্য পড়েনি কিন্তু সাহিত্যকে ভালোবেসেছিলো, জীবনের কোনো কঠিন অংক তার কাছে কোনো কঠিন মনে হয়নি, কিন্তু জীবনটা কঠিন হয়ে গেলো, রজবের বাপের ছিলো কয়েকটি বিয়ে, বিহার রাজ্যের মানুষ ছিলো ওরা, রজবের মা ছিলো ছোটবৌ, আগের বউয়ের পক্ষের ছেলে-মেয়েরা রজবদের সঙ্গে কোনোপ্রকার যোগাযোগ রাখেনি, বরং ওদের আলুপট্টির পদ্মাপাড়ের যে পৈত্রিক বাড়ি আছে, সেখান থেকেও একটা সময় রজবদের তাড়িয়ে দেয় আগের পক্ষের ছেলে-মেয়েরা, রজবের গল্পগুলো তার জীবনেরই গল্প, আঙ্গিক যতোটা পেরেছে নিজের মতো করে সাজিয়ে নির্মিত করেছে গল্পের বীজ, হয়তো তা নেহাৎ-ই তার জীবনাখ্যান।
শান্ত-স্থির চোখ দুটো শেষপ্রহরের শুকতারাটির মতো জ্বলজ্বল করতো, ওর জীবনের অনেক না বলা কথা যেন ওই চোখে স্পষ্ট প্রতীয়মান ছিলো, রজব আলী একটা চাকুরি পায়নি বলে হযতো সেভাবে তার জীবনটাকে সাজাতে পারেনি, সাহিত্যকে নির্ভেজাল জীবনের অংক করতে চেয়েছিলো, মেঘবালিকার সন্ধান পায়নি, আকাশের দিকে তাকিয়ে শুধুমাত্র আকাশ দেখেছে, নদীর দিকে তাকিয়ে নদী দেখেছে, কিন্তু ওর ভেতরের কথাগুলো কেউ পড়তে পারেনি, পাঠ্যবইয়ের পাতা ছিঁড়ে ফেলে শিশুরা নৌকা-উড়োজাহাজ করে, আর রজব জীবনটাকে কাগজের মতো কুটিকুটি করে ছিঁড়ে নদী এবং আকাশের স্বপ্ন দেখেছে, ভালোবাসার গল্প লিখতে চেয়েছিলো তা কি শুধুই ভালোবাসা, একটা সময় বেশ কিছু কবিতাও লিখেছিলো, কবিতা, সবাই কবি না হতে পারলেও জীবনের কিছু না বলা কথা সাজিয়ে রাখাও তো একটা কবিতা, রজব অনেক দূরে হেঁটে চলে গেছে, নদীর দেশ থেকে, আকাশের দ্রাঘিমা থেকে, কবিতার অনুপ্রাস থেকে অনেক-অনেক দূর, বনটিয়ার দেশে, বনতুলসীর গন্ধ মেখে রজব চলে গেছে ভোর না হওয়া শেষপ্রহরে পাখি যেমন উড়ে যায় নীড় থেকে অসীম আকাশ পেরিয়ে অনেক-অনেক দূরে, সবুজ গাঁয়ের পর গাঁ ছাাড়িয়ে— রজব সেই অজানা গাঁয়ের মেঠো পথের বাঁকে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চেয়েছিলো, শহুরে বিলাসের তকমা তার শরীরে লাগেনি, সে একজন ধোঁপদুরস্ত মানুষ হতে চেয়েছিলো কিন্তু সময় তাকে মানুষ হওয়ার আগেই ছবির দেশে কবির দেশে চিনিয়ে নিয়ে গেলো।
রজবের সেই পৈত্রিকবাড়িটা এখনো সেভাবেই ভাঙাচোরা শরীর দেখিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ওর সৎ-ভাইয়েরা বাস করে, পদ্মানদীর তীর ঘেঁষে কতোদিন আমরা বেরিয়েছি, কতো কথা কতো গল্প নদীর স্রোতরাশির সঙ্গে মিলেমিশে আছে, রজবের বর্তমান বাড়িখানা বেশ জড়জীর্ণ, কেউ থাকে কি না জানি না, ওর মা চলে গেছে সে বছরেই, ছেলের মৃত্যু শোকে বিছানাগত হয়, বড় বোনটার কি হয়েছিলো জানি না, সময় বড় কঠিন, নিজের মতো ছুটে যায়, থামতে জানে না, রজবের মৃত্যু সংবাদ আমি পেয়েছিলাম অনেক পরে, জীবনধারণের তাগিদে এক চাকুরি থেকে আরেক চাকুরি করে মরছি, কোথাও স্থির হতে পারছি না, ঠিক সে’ সময় রজব চলে গেলো একেবারে বাচ্চা ফুটে যাওয়া পাখির মতো, যে ঘুড়ি একবার কেটে যায় তাকে কি আর লাটায়ে বাঁধা যায়, বাঁধা যায় না বলে স্মৃতির কালো সিন্দুকে আটকে থাকে।
সেদিন নদীর কাছাকাছি এসে ভড়কে যায়, অনেক দূর থেকে ভেসে আসে সেই হাসি, সেই হাসির কলকল ধ্বনি, অনেকটা রজবের হাসির মতো, এভাবেই তো রজব কতোদিন হাসতো নদীর কাছে এসে, উদার আকাশ আর নদীর কাছে আসলে মানুষ নাকি প্রকৃতির মতো উদার হয়।
রজব বলতো, মানুষ প্রকৃতির কাছে প্রথম পাঠ্য গ্রহণ করে, আমি ওর কথা শুনে হতবাক হয়ে ভাবতাম, প্রকৃতি সত্যসত্যিই মানুষকে ওমন উদার করে।
আজ অনেকদিন পরে মাঝরাত্রে এলোমেলো বৃষ্টি হলো, আকাশটা বড় শান্ত, গাঢ় অন্ধকার, বৃষ্টির ঘ্রাণে মন মাতোয়ারা হলেও একটা শূন্যতা সর্বক্ষণ বিষাদ ছড়ায়।

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত